আমেনা : যিনি খুন হইছেন তারে ফরিদ মামা ডাকত। উনারে ফরিদ অত্যধিক সম্মান করত। মামা মামা ডাইকা পিছনে ঘুরত।
হাবীব : আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নাই।
আমেনা : স্যার, ঘটনা ক্যামনে ঘটছে সেইটা জিগান। বৰ্ণনা করি। আরেকটু হইলে আমি গুলি খায়া মরতাম। ভাইগ্নার হাতে খালার মৃত্যু। বন্দুকের নল ছিল আমার দিকে। ইয়া মাবুদে এলাহি।
হাবীব নিজের জায়গায় এসে বসলেন। প্রণব চাপা গলায় বলল, সাক্ষী কেমন জোগাড় হয়েছে দেখেছেন স্যার! সব ঠোটস্থ। প্রশ্নের আগে উত্তর।
হাবিব বললেন, বেশি মুখস্থ হওয়াও ভালো না। বেশি মুখস্থের স্বাক্ষী সন্দেহজনক। কেউ বিশ্বাস করে না।
প্রণব গলা আরও নামিয়ে বলল, গতকালের ময়মনসিংহ বার্তা পড়েছেন স্যার?
ময়মনসিংহ বার্তা আমি পড়ি না।
প্রণব বলল, আমিও পড়ি না। একজন আমার হাতে দিয়ে গেছে। নেন পড়েন। পড়া প্রয়োজন। শেষ পৃষ্ঠা।
হাবীব ময়মনসিংহ বার্তর শেষ পৃষ্ঠা পড়লেন। সেখানে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে’ নামে একটা খবর ছাপা হয়েছে। খবরের বিষয়বস্তু হলো—খুন করেছে একজন, বিচার হচ্ছে আরেকজনের। ফরিদের মামলার পুরো বিবরণ সেখানে লেখা। মূল খুনি কে এই নাম শুধু বাদ।
হাবীব বললেন, পত্রিকার সম্পাদককে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবে।
কবে দেখা করবে?
আজ রাত আটটার পর। ওসি সাহেবকেও বলবে।
রেলওয়ে রিফ্রেশমেন্ট থেকে জিনিস আনায়ে রাখব?
অবশ্যই। হেকিমের দোকানের পরোটা মাংস যেন থাকে। ওসি সাহেব পছন্দ করেন।
নাদিয়া আম্মা আজ ঢাকা যাবে না?
না। এই গণ্ডগোলে তারে ঘরের বাইরে পাঠাব না। প্রয়োজনে এক বৎসর মিস দিবে, পরের বৎসর পড়বে।
আম্মা কি রাজি হবেন?
তার রাজি হওয়া না-হওয়ার কিছু নাই।
বৌদি স্বীকার পেয়েছেন?
তারও স্বীকার পাওয়া অস্বীকার পাওয়ার কিছু নাই। সংসার একটা গাড়ির মতো। সেই গাড়ির চালক একজন। দুইজনে একসঙ্গে গাড়ি চালায় এমন কথা কেউ শুনে নাই।
হাবীবের অতি কঠিন সিদ্ধান্তের কারণ গত বৃহস্পতিবার রাতে, ফজরের আজানের আগে আগে দেখা একটা স্বপ্ন। অতি পরিষ্কার স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, রোকেয়া হল থেকে মিছিল বের হয়েছে। আয়ুববিরোধী মিছিল। অনেকের হাতে প্লাকার্ড। প্লাকার্ডে সাধারণ যে সব কথাবার্তা থাকে সেই সবই লেখা। শুধু নাদিয়ার প্লাকার্ডে লাল কালি দিয়ে লেখা–
রক্ত খাই।
আয়ুব খানের রক্ত খাই।
স্বপ্নের মধ্যেই তার মনে হলো, এটা কী! আয়ুব খানের ফাঁসি চাই’ লেখা থাকতে পারে, কিন্তু তার রক্ত পাবে কেন?
মিছিল পাবলিক লাইব্রেরির কাছে আসতেই পুলিশ গুলি করল। কারও গায়ে গুলি লাগল না। শুধু নাদিয়ার পেটে গুলি লাগল। রাস্তায় কোনো লোকজন নাই, পুলিশও নাই। নাদিয়া চিৎকার করছে, পানি! পানি! তখন বিদ্যুত কান্তি ছুটে এল। সে পানি খাওয়ানোর বদলে নাদিয়ার শাড়ি-ব্লাউজ টেনে খুলতে শুরু করল। এই পর্যায়ে হাবীবের ঘুম ভেঙে গেল।
এমন এক স্বপ্ন দেখার পর মেয়েকে ঢাকা পাঠানোর প্রশ্নই আসে না। স্বপ্নের দোষ কাটানোর জন্যে তিনি একটা মোরগ ছদকা দিয়েছেন, দশটা কবুতর আজাদ করেছেন। তিনজন এতিম খাইয়েছেন। শম্ভুগঞ্জের পীরসাহেবের কাছে লোক পাঠিয়েছেন। তিনি চিল্লায় বসে বিশেষ দোয়া করবেন।
হাবীব মেয়েকে স্বপ্নের কথা বলেছেন। বিদ্যুত নামে শিক্ষকের অংশটি বলেননি। নিজের মেয়েকে এই বিষয় বলা যায় না। নাদিয়া বলেছে, দেশজুড়ে আন্দোলন হচ্ছে, এই কারণেই এমন স্বপ্ন। এই স্বপ্ন নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার কিছু নাই।
হাবীব বললেন, আমি তোমার মতো জ্ঞানী না। আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হই। তোমার ঢাকা যাওয়া বন্ধ। দেশ যদি কোনোদিন শান্ত হয় চাকায় যাবে।
শান্ত না হলে যেতে পারব না?
না।
আমি এখানে থেকে কী করব?
যা করতে ইচ্ছা হয় করবে। আমি তোমার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তোমার দাদি মৃত্যুশয্যায়। তিনি নাতজামাইয়ের মুখ দেখতে চান।
বাবা, আমার খুব ইচ্ছা আমি পড়াশোনা শেষ করি। Ph.D করি। ইউনিভার্সিটিতে মাস্টারি করি।
তোমার কপালে থাকলে যা চাও হবে। কপালে না থাকলে হবে না। শেখ মুজিব পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন করে তার প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিল–এখন সে ঝুলবে ফাঁসিতে, কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াড। ফায়ারিং স্কোয়াড হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মিলিটারিরা ফাঁসি পছন্দ করে না। তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?
নাদিয়া বলল, না।
জানি তুমি রাগ করেছ। আমি তোমার রাগ নিয়ে থাকতে পারব। অনেকেরই আমার উপর রাগ আছে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
নাদিয়া বলল, সেটাই ভালো। বাবা আমি উঠলাম। দিঘির ঘাটে গিয়ে বসে থাকব। আমাকে নিয়ে চিন্তা করবে না। আমি তোমার সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি, কিন্তু যাব না।
সন্ধ্যাবেলা হাজেরা বিবি নাতনির জন্যে অস্থির হয়ে গেলেন। চিলের মতো চিৎকার, ও তেজল্লী! ও তোজল্লী! আমার তোজল্লী কই?
নাদিয়া দাদির কাছে ছুটে গেল। হাজেরা বিবি করুণ গলায় বললেন, এইটা কী খবর শুনলাম?
দাদি, কী শুনেছ?
পুলিশ নাকি তোর পেটে গুলি করেছে? তোর মৃত্যু হয়েছে?
নাদিয়া বলল, যার মৃত্যু হয় সে কি তোমার খাটে বসে গল্প করতে পারে?
হাজেরা বিবি বললেন, তোর মৃত্যু যদি না হয়ে থাকে তাইলে এমন কথা কেন রটল? সবাই জানে, যাহা রটে তাহা বটে।
নাদিয়া শান্ত গলায় বলল, দাদি। বাবা আমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে। তুমি এই দুঃস্বপ্নের কথা শুনেছ। তুমি ভালোমতোই জানো আমি বেঁচে আছি, তারপরেও নাটক করার জন্যে কিছুক্ষণ হইচই করলে। তুমি প্রমাণ করতে চাও তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তোমার মাথা যে যোলআনা ঠিক আছে সেটা আর কেউ না জানুক আমি জানি।
