আমি কেবিনে ঢুকলাম। মনির ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। স্ট্যান্ড করা। হিপনোটিজম জানে। ম্যাজিক জানে।
দোলন বিরক্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, কাটলেট খাবেন?
আমি বললাম, না।
অন্য কিছু খাবেন?
না।
দোলন আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মন দিলেন। আলোচনার বিষয় NSF দুই ভাগে ভাগ হয়ে ভালো হয়েছে। ভাগাভাগি আরও আগে হওয়াই উচিত ছিল।
NSF দুই ভাগে ভাগ হয়েছে এই তথ্য আমি জানতাম না। লিবার্টি কাফেতে ঢোকার কারণে জানলাম NSF-এর এক ভাগ আয়ুবপন্থী এবং পুরোপুরি পাকিস্তানপন্থী। তাদের প্রধান জমির আলী। দ্বিতীয় ভাগের প্রধান দোলন। তারা মোনায়েম-বিরোধী।
এই সময় আমার এক বন্ধু জনৈকা তরুণীর প্রেমে পড়ল। তরুণীর নাম রূপা। বন্ধুর প্রেমপত্র লিখে দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব পড়ল আমার হাতে। রূপার চিঠি সে আমাকে এনে দেয়। আমি আগ্রহ নিয়ে পড়ি। উত্তর লিখতে বসি। চিঠি চালাচালি চলতে থাকে। রূপা আমাকে চেনে না। আমিও তাকে চিনি না। গভীর আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে তাকে চিঠি লিখে যাই। মাতাল সময়ে লেখা প্রেমপত্রগুলিই হয়তোবা আমার প্রথম সাহিত্যকর্ম।
আমার বন্ধুর সঙ্গে রূপা মেয়েটির বিয়ে হয়নি। আমার বন্ধু তার পরিচিত এক আত্মীয়াকে বিয়ে করে শ্বশুরের পয়সায় ইংল্যান্ড চলে গেল। তার বিয়ের দাওয়াতে কুমিল্লা গিয়েছিলাম। বিয়ের আসরে বন্ধুপত্নীকে দেখে ধাক্কার মতো খেলাম। অতি স্বাস্থ্যবতী কন্যা। মাথা শরীরের তুলনায় ছোট। মেয়েটিকে অত্যন্ত আনন্দিত মনে হলো। সে সারাক্ষণই হাসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটির সারাক্ষণ হাসির কারণ বের করলাম। তাঁর দাত মুখের বাইরে। ঠোট দিয়েও সেই দাত ঢেকে রাখা যায় না।
রূপাকে আমি দেখি নি। তার ছবি দেখেছি। কী মিষ্টি কী শান্ত চেহারা! পটে আঁকা ছবি। রূপা যেন হারিয়ে না যায় তার জন্যেই হিমুর বান্ধবী হিসেবে আমি তাকে নিয়ে আসি। হিমুকে নিয়ে লেখা প্রতিটি উপন্যাসে রূপা আছে।
আমরা কাউকেই হারাতে চাই না, কিন্তু সবাইকেই হারাতে হয়।
ফরিদের মামলা কোর্টে উঠেছে
ফরিদের মামলা কোর্টে উঠেছে। পুলিশ চার্জশিট আগেই দিয়েছিল। ফরিদ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন উকিল মুসলেম উদ্দিন। হাবীব খানের জুনিয়র। রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছে খুন হয়েছে। মুসলেম উদ্দিন বলছেন, দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মামলা সাজানোর পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আছে। ফরিদকে দেখানো হচ্ছে হাজি রহমত সাহেবের কেয়ারটেকার হিসাবে। বন্দুকের লাইসেন্স হাজি সাহেবের নামে। তাঁর কেয়ারটেকারের পক্ষেই বন্দুক পরিষ্কার করা যুক্তিযুক্ত। তাছাড়া হাসানকে কোনো কিছুতেই রাখা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের সময় সে অকুস্থলেই ছিল না। ময়মনসিংহে এসেছিল সিনেমা দেখতে। দুই রাত হোটেলে ছিল। হোটেলের রেজিস্ট্রারে ব্যাকডেটে তার নাম তোলা হয়েছে।
হাজি সাহেবের সাক্ষ্য ভালোমতো হয়েছে। তিনি কোনো ভুল করেননি। বেফাস কথা বলেন নি। যা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে তা-ই বলেছেন। বিশ্বাসযোগ্যভাবে সুন্দর করে বলেছেন।
আপনি এই বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করেন? (বন্দুক দেখানো হলো)
জি।
রোজ শিকার করেন?
হঠাৎ হঠাৎ করি, রোজ না।
কী পাখি? বক, হরিয়াল, ঘুঘু। জুররা গুলি ব্যবহার করেন? জি। তাহলে বন্দুকের ভেতর ছররা গুলি থাকার কথা। বুলেট ছিল কেন?
একটা বাঘডাশা খুব উপদ্রপ করছিল। হাঁসমুরগি নিয়ে যায়। একটা ছাগলও নিয়ে গিয়েছিল। বাঘডাশা মারার জন্য বুলেট ভরেছিলাম।
বাঘডাশা মরিতে পেরেছিলেন?
জি জনাব। দু’নলা বন্দুকের একটা গুলি খরচ হয়েছে। আরেকটা হয় নাই। বন্দুকে একটা গুলি আছে, ফরিদ বুঝতে পারে নাই। বন্দুক পরিষ্কার করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এখানে তার যতটা দোষ, আমারও ততটাই দোষ। বুলেট আমি কেন সরায়ে রাখি নাই? আপনারা শাস্তি দিতে চাইলে আমাকে দিবেন। আমারই শাস্তি হওয়া উচিত।
হাজি সাহেব শেষের কথাগুলি জজ সাহেবের দিকে হাতজোড় করে বললেন। বলার সময় তাঁর গলা ভেঙে গেল। তার কাঁধে রাখা চাদরে চোখ মুছলেন।
ডিসট্রিক জজ বললেন, ঠিক আছে আপনি যান। অন্য কোনো সাক্ষী থাকলে আসুক।
পরের সাক্ষীর নাম আমেনা বেগম। সে প্রত্যক্ষদর্শী। হাবীব জেরা করার জন্যে তার জুনিয়রকে উঠতে দিলেন না। নিজেই উঠলেন।
হাবীব : আপনার নাম আমেনা বেগম?
আমেনা : জি।
হাবীব : আপনি কী করেন?
আমেনা : আমি কইতরবাড়িতে পাকশাকের কাম করি।
হাবীব : ফরিদকে আপনি চেনেন?
আমেনা : জে। হে আমারে খালা ডাকে।
হাবীব : ফরিদ ছেলে কেমন?
আমেনা : হে ফেরেশতার মতো। আমি তার মধ্যে খারাপ কিছু দেখি নাই।
হাবীব : ওইদিনের ঘটনা আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?
আমেনা : জি।
হাবীব : কী দেখেছেন বলুন।
আমেনা : ফরিদ সকালবেলা আমারে কইল, খালাজি, আমারে এককাপ চা দেন। চা খায়া বন্দুক সাফ করব।
আমি বললাম, কাইল একবার বন্দুক সাফ করলি, আইজ আবার?
সে বলল, গতকাইল বাঘডাশা মারা হইছে—নলে ময়লা জমেছে। বড়সাব যদি পক্ষী শিকারে যাইতে চান।
আমি বললাম, তুই যা বন্দুক সাফা কর, আমি চা নিয়া আসতেছি।
সে বলল, মামার জন্যেও এক কাপ চা আনা। মামা নামাজে দাঁড়াইছেন। নামাজ শেষ কইরা চায়ে চুমুক দিলে ভালো লাগত।
হাবীব : মামা কে?
