ভালো থেকো।
তোজল্লী, নাদিয়া, দিয়া
পুনশ্চ : পদ্ম মেয়েটিকে নিয়ে যা লিখলাম সবই মিথী। পদ্ম নামে কেউ নেই। আমি যে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলা শিখে গেছি তা প্রমাণ করার জন্যেই পদ্ম। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করে ফেলেছ পদ্ম বলে একজন আছে।
মোটামুটি অপরিচিত কোনো তরুণীর কাছ থেকে পাওয়া আমার জীবনের দীর্ঘতম পত্র। প্রথমেই ইচ্ছা হলো, কেমিস্ট্রির সব ছাত্রছাত্রীকে একত্র করে চিঠিটা পড়ে শোনাই।
অনেক কষ্টে এই লোভ সামলালাম। বিকালে কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ছিল। ক্লাস বাদ দিয়ে চলে গেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। গুড আর্থ আগেই পড়া ছিল। মনে হলো আমার এই বই আরেকবার পড়া উচিত।
রাত আটটা পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা। আটটা পার করে হলে ফিরলাম। হলে তখন ভয়ঙ্কর অবস্থা। তিনটা ডেডবডি গেস্টরুমের সামনে পড়ে আছে। রক্তে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।
ডেডবডিগুলি কার? এখানে কেন? ঘটনা কী? কিছুই জানি না। ডেডবড়ি মানেই কান্নার শব্দ, আতরের গন্ধ। এখানে তার কিছুই নেই। হলের কর্মকর্তা প্রভোস্ট হাউজ টিউটর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। দারোয়ানদের শুকনো মুখে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। হলের ভেতরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া কিছুই হচ্ছে না।
ডাইনিং হল খোলা আছে। ক্ষুধার্ত ছাত্ররা রাতের খাবার খেতে যাচ্ছে। আমিও খেতে গেলাম। ইমপ্রুভড ডায়েট ছিল। পোলাও-মাংস-দৈ। খাওয়া শেষ করে হলের স্টোর থেকে দশ পয়সা দিয়ে একটা ক্যাপসর্টেন সিগারেট কিনে লম্বা টান দিলাম। জীবনের প্রথম সিগারেট। যেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি, সেখান থেকে তিনটা ডেডবড়ি দেখা যাচ্ছে। আমি বিকারশূন্য অবস্থায় সিগারেট টানছি। যেন আশেপাশের জগতের সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। আমি সিস্টেমের ভেতরের কেউ না। আমি সিস্টেমের বাইরের একজন।
তার পরদিন দুপুরে আরেকটি ঘটনা ঘটল মহসিন হলের পাশেই জিন্নাহ হল। জিন্নাহ হলের পাঁচতলায় একজন এনএসএফ নেতার ঘরে সতেরো-আঠারো বছরের এক তরুণী। এক পর্যায়ে এই তরুণী নিজেকে বাঁচানোর জন্যে পাঁচতলার জানালা থেকে লাফ দিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল। কাকতালীয়ভাবে এই মেয়েটির নামও নাদিয়া। অনেকের সঙ্গে আমিও মেয়েটিকে দেখতে গেলাম। মধ্যবিত্ত ঘরের মায়া মায়া চেহারার এক তরুণী। চোখে কাজল দেওয়া। তার গায়ে গাঢ় নীল রঙের শাড়ি। নীল শাড়ির ওপর রক্ত ভেসে উঠছে। সালভাদর দালিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সৌন্দর্য কী?’
তিনি বলেছিলেন, সৌন্দর্য হচ্ছে রঙের সঙ্গে রঙের খেলা।
যে ছাত্রের ঘর থেকে লাফিয়ে পড়ে মেয়েটি মারা গেল, তার কিছুই হলো না। সে বহাল তবিয়তে বাস করতে লাগল। তার একটা ভারী মোটর সাইকেল ছিল। সে বিকট শব্দে মোটর সাইকেলে করে ঘুরতে লাগল।
মহসিন হলের ক্যান্টিনে সে কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেতে বসেছে। আমি তাদের পাশের টেবিলে আছি। তাদের আলোচনা শুনছি। আলোচনার বিষয়বস্তু রাশিয়ান ছবি ‘Baliad of a Soulder’। মোটরসাইকেলওয়ালা নাকি এই ছবি পাঁচবার দেখেছে। এবং প্রতিবারই কেঁদেছে।
পাঠ্যবই পড়তে কারোরই ভালো লাগার কথা না। শুকনা বই থেকে বিদ্যা আহরণ। সন্ধ্যার পর দরজা লাগিয়ে এই কাজটি নিয়মিত করি। আমাকে খুব ভালো রেজাল্ট করে পাশ করতে হবে। বাবার স্বপ্ন CSP অফিসার হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। শুনেছি cSP-দের ইংরেজির ভালো দখল থাকতে হয়। হলের রিডিংরুমে পত্রিকা আসে। প্রায়ই গম্ভীর মুখে Observer পত্রিকার এডিটরিয়েল পড়ি। ইংরেজি শেখার জন্যে না-কি এডিটরিয়েলের বিকল্প নেই। ইংরেজি গল্পউপন্যাসও পড়ি। পড়ার আনন্দের জন্যে পড় না, ইংরেজি শেখার জন্যে পড়া।
দেশ যখন সংঘাতের দিকে যাচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ বোনা হচ্ছে, তখন আমি চোখ বন্ধ করে পাকিস্তানের অফিসার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
নাদিয়া লেখিকা হতে চায় এই বিষয়টা আমাকে অবাক করেছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর এইসব হওয়া যায়। লেখক কি হওয়া যায়? লেখক হওয়ার সুযোগ থাকলে ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার ব্যবস্থা থাকত। আগ্রহীরা ঔপন্যাসিক হবার ক্লাসে অনার্স নিত।
নাদিয়ার চিঠি কি কোনোভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছিল? মনে হয় করেছে। এক হরতালের দিনে আমি দরজা বন্ধ করে একটা ছোটগল্প লিখে ফেললাম। নাম ‘গন্ধ। লেখা শেষ করে নিজে পড়লাম। আমার পাশের রুমে থাকতেন ফিজিক্সের ছাত্র আনিস সাবেত। তাকে পড়তে দিলাম। তিনি বললেন, গল্পের নাম ‘গন্ধ না দিয়ে দুর্গন্ধ দিলে ভালো হতো। গল্প থেকে দুর্গন্ধ আসছে।
গল্প ছিড়ে কুটিকুটি করে কেমিস্ট্রিতে মন দিলাম।
বাইরে অশান্ত নগরী। মিটিং, মিছিল, হরতাল। আমার জীবন তরঙ্গহীন। ক্লাস থাকলে ক্লাসে যাই। ক্লাস না থাকলে দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকি। নিউ মার্কেটের ভেতর একটা চায়ের দোকান আছে, নাম “লিবার্টি কাফে’। এই কাফেতে চা ছাড়াও মহার্ঘ পানীয় কফি পাওয়া যায়। চায়ের দাম দুআনা, কফি আট আনা। আমার খুব যখন মেজাজ খারাপ থাকে, তখন লিবার্টি কাফেতে কফি খেতে যাই। একটা বইয়ে পড়েছি কফি এবং চকলেট মেজাজ ঠিক করে একদিন লিবার্টি কাফেতে কফি খেতে গেছি। কেবিন থেকে একজন কেউ ডাকল, হুমায়ূন, চলে আসেন।
তাকিয়ে দেখি মনিরুজ্জামান ভাই। NSF-এর পাতিনেতা। সঙ্গে অনেকে আছেন। দোলনকে চিনলাম। ভয়ে বুক কেঁপে গেল। কেবিনে যাওয়ার অর্থই হয় না। না গিয়েও উপায় নেই।
