অধ্যাপক বললেন, কথা সত্য।
মোনায়েম খান বললেন, কথা সত্য হলে এই বিষয়ে লেখালেখি করো। মুখে বড় বড় কথা বললে তো হবে না। মোনায়েম খান বিরক্ত মুখে চোখ বন্ধ করলেন। হঠাৎ প্রবল ঘুমে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। এই ব্যাপারটা তার ঘনঘন ঘটছে। অসময়ে ঘুম পাচ্ছে।
বিয়ারিং চিঠি এসেছে
হঠাৎ আমার নামে রসায়ন বিভাগের ঠিকানায় একটা বিয়ারিং চিঠি এসেছে। টিকিট ছাড়া চিঠি। পিয়নের কাছ থেকে চিঠি নিতে হলে দু’আনা দিতে হবে। দু’আনায় দুই কাপ চা পাওয়া যায়। আমি নিজে এক কাপ খেতে পারি। একজন বন্ধুকেও খাওয়াতে পারি। কী করব বুঝতে পারছি না। বাসার চিঠি না। বাসার চিঠি বাবার আরদালি আনা-নেওয়া করে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি কেউ টিকিট ছাড়া পাঠাবে না। পিয়নকে ফিরিয়েই দিচ্ছিলাম। কী মনে করে দু’আনা গচ্চা দিয়ে খাম নিলাম। খুলে দেখি নাদিয়া পাঠিয়েছে। সে লিখেছে (সম্বোধনহীন চিঠি)–
প্রথমেই বলি বিয়ারিং চিঠি কেন পাঠিয়েছি। বিয়ারিং চিঠি কখনো মিস হয় না। রেজিস্ট্রি চিঠিও প্রায়ই হারায়। পোস্টাপিস থেকে খুলে দেখে ভেতরে টাকা আছে কি না। বিয়ারিং চিঠি কেউ খোলে না।
এখন সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে কথা বলব। আমরা ক্লাসের মেয়েরা নিজেরা তুমি তুমি করে বলি। ছেলেরাও নিজেদের মধ্যে তুমি তুমি করে বলে। অথচ একটা ছেলে যখন একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে তখন আপনি। ব্যাপারটা কি যথেষ্টই হাস্যকর না? এখন থেকে আমি তোমাকে তুমি করে বলব। তুমিও অবশ্যই আমাকে তুমি বলবে।
আমি এই চিঠিটা তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্যে লিখছি। তুমি আমার হাতের ছাপ দেখে খুব গুছিয়ে অনেক কিছু লিখেছ। তুমি লিখেছ—আমার হাত বিজ্ঞানীর হাত।
আমি মাদাম কুরির মতো বড় বিজ্ঞানী হব।
মাদাম কুরী হওয়ার আমার কোনো শখ নেই। আমি পার্ল এস বাকের মতো লেখিকা হতে চাই।
আমি প্রথম যে উপন্যাসটা লিখব তার নাম ‘হাজেরা বিবির উপাখ্যান’। হাজেরা বিবি হচ্ছেন আমার দাদি।
উপন্যাসের প্রথম লাইনটাও ঠিক করা—আজ হাজেরা বিবির বিয়ের দিন।’ এই লাইনটা আমি অবশ্যি পার্ল এস বাকের কাছ থেকে চুরি করেছি। উনার লেখা গুড আর্থ উপন্যাসের প্রথম লাইন হচ্ছে—আজ ওয়াং লাং-এর বিয়ের দিন।
আমি অবশ্যি আমাকে নিয়েও একটা উপন্যাস লিখতে পারি। সেটাও খারাপ হবে না। নিজেকে নিয়ে যদি লেখি তার প্রথম লাইনও হবে–“আজ তেজল্লীর বিয়ের দিন। তোজল্লী আমার আরেকটি নাম। এই নামে শুধু দাদি আমাকে ডাকেন।
তুমি আমার হাতের ছাপ দেখে লিখেছ—আপনার বিয়ে নিয়ে আপনি যতটা ঝামেলা হবে বলে আশা করছেন তত ঝামেলা হবে না। আপনি আপনার পছন্দের কাউকে বিয়ে করবেন, তবে আপনি বিয়ের পরপর দেশ ত্যাগ করবেন। কখনো দেশে ফিরবেন না।
আমার বিয়ে নিয়ে নানান ঝামেলা কিন্তু হচ্ছে। হঠাৎ একদিন শুনলাম, আমার বিয়ে হবে পশ্চিম পাকিস্তানের এক নওজোয়ানের সঙ্গে। এতে পূর্বপাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তানের সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। ইত্যাদি। আমি তখন বাবাকে গিয়ে বললাম, পিতাজি হামনে মাগরেবি পাকিস্তানকা নওজোয়ান শাদি নাহি করুন্সি।
বাবা আমার বেয়াদবি দেখে হতভম্ব হলেন। তার মেয়ে উর্দু কথা বলে তার সঙ্গে ফাজলামি করবে এটা তিনি নিতেই পারলেন না। আমি কিন্তু মোটেই ফাজলামি করছিলাম না।
আমি দাদিজানকে ঘটনা বললাম। দাদিজান বললেন, আমারে একটা হাছুন দে। হাছুন দিয়া পিটায়া তোর বাপের মাথা খাইকা পশ্চিম পাকিস্তান বাইর করতেছি।
ওই সমস্যার সমাধান হলেও নতুন সমস্যায় আছি। বাবা এখন যে ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছেন সে একজন খুনি। নিজের মামাকে গুলি করে খুন করেছে। এই খুনি কিন্তু দেখতে রাজপুত্রের মতো। মাইকেল এঞ্জেলে তাকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে পাথর কেটে মূর্তি বানানো শুরু করতেন।
দেখলে কত লম্বা চিঠি লিখছি! রাত জেগে চিঠি লিখতে আমার খুব ভালো লাগে। তুমি জানিয়েছ আমার হাতে সুলেমানস রিং আছে। যাদের হাতে এই চিহ্ন থাকে, তারা আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন হয়।
আমার কোনোই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নেই। ভয় পাওয়ার ক্ষমতা আছে। দিঘির জলে নিজের ছায়া দেখে এমনই ভয় পেয়েছিলাম। কয়েক ঘণ্টা অচেতন ছিলাম। এখন ভালো। বাবা বলছেন, শরীর পুরোপুরি সারলে ঢাকায় যেতে পারব, কিন্তু দিঘির ঘাটে কখনোই যেতে পারব না।
তবে আমি নিয়মিতই দিঘির ঘাটে যাচ্ছি। মা আমার জন্যে তার দেশের বাড়ি থেকে বারো বছর বয়েসী একটি মেয়ে আনিয়ে দিয়েছেন। মেয়েটার নাম বিছুন (অর্থাৎ পাখা)। আমি তার নাম বদলে রেখেছি পদ্ম। কারণ সে পদ্মের মতোই সুন্দর। মেয়েটার ডিউটি হচ্ছে, সে এক সেকেন্ডের জন্যেও আমাকে চোখের আড়াল করতে পারবে না।
তা সে করছে না। সে আমার সঙ্গে ছায়ার চেয়েও ঘনিষ্ঠভাবে আছে। অন্ধকারে মানুষের ছায়া থাকে না। সে অন্ধকারেও থাকে এবং টকটক করে সারাক্ষণ কথা বলে। তার প্রধান আগ্রহ শিল্লুকে। রোজ আমাকে চার-পাঁচটা শিল্লুক ধরবে। উদ্ভট উদ্ভট সব শিল্লুক। যেমন—
কৈলাটির নানি
হাত দিয়া ধরলে পানি।
এই শিল্লুকের অর্থ হলো, আকাশ থেকে পড়া শিল। শিল হাত দিয়ে ধরলে পানি হয়ে যায়। এখন তুমি বলো কৈলাটির নানির সঙ্গে শিলের কী সম্পর্ক?
তোমাকে দীর্ঘ চিঠি লিখলাম। আমার মন বলছে, তুমি এই চিঠি তোমার সব বন্ধুদের পড়াবে এবং বলবে, নাদিয়া নামের একটি মেয়ে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এই কাজটি করো না। আমি প্রেমেপড়াটাইপ না।
