এখন সে কেমন?
সে ভালো আছে।
তার সঙ্গে একটু দেখা করব।
হাবীব বললেন, আমাদের এই বাড়ি একটা প্রাচীন বাড়ি। প্রাচীন বাড়ির প্রাচীন নিয়মকানুন। অনাত্মীয় পুরুষমানুষের অন্দরমহলে প্রবেশ নিষেধ। নাদিয়ার শরীরের এখনো এমন অবস্থা না যে সে বাইরে এসে আপনার সঙ্গে দেখা করবে। আপনার স্কলারশিপের কী যেন সমস্যার কথা নাদিয়া বলেছিল। কাগজপত্রগুলি যদি রেখে যান, তাহলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারি।
বিদ্যুত কান্তি দে বললেন, স্কলারশিপের সমস্যা সমাধানের চেয়ে নাদিয়ার সঙ্গে দেখা করা এখন আমার অনেক জরুরি।
হাবীবের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ হলো। তিনি তাঁর সামনে বসা যুবকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যুবকের কথাবার্তার মধ্যে উদ্ধত ভঙ্গি আছে। তবে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছেলে। আত্মবিশ্বাস চোখের তারায় ঝলমল করছে। হিন্দুদের চোখেমুখে একধরনের কাঁচুমাচু নিরামিষ ভাব থাকে, এর মধ্যে তা নেই। হাবীব বললেন, আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা হওয়া অত্যন্ত জরুরি কেন?
বিদ্যুত বললেন, এন্টিগ্র্যাভিটি একটা ম্যাজিক শেখার তার খুবই শখ ছিল। ম্যাজিকের আইটেমটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। যেহেতু তার শরীরটা খারাপ, ম্যাজিকটা শিখলে ভালো লাগবে।
হাবীব বললেন, আপনি জিনিসটা রেখে যান, আমি মেয়ের কাছে পৌঁছে দেব।
ম্যাজিকটা কীভাবে দেখাতে হবে সেটা তো তাকে বলতে হবে।
আপনি কাগজে লিখে দিয়ে যান। তাতে হবে না?
হ্যাঁ হবে। আচ্ছা আমি আজ ছটা পর্যন্ত যদি আপনার বাড়িতে থাকি, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
কোনো সমস্যা নেই।
ঠিক সন্ধ্যা ছ’টায় আপনি কি আমাকে দশ মিনিট সময় দেবেন? তখন ম্যাজিকের বোতলটা আপনার হাতে বুঝিয়ে দেব।
হাবীব বললেন, ঠিক আছে। সন্ধ্যা ছ’টায় আমি চেম্বারে উপস্থিত থাকব। একসঙ্গে চা খাব।
বিদ্যুত বলল, আমার ছোট্ট আর্জি আমরা চা-টা খাব দিঘিরঘাটে। বিশেষ একটি কারণে দিঘিরঘাটে উপস্থিত থাকতে বলছি। যদি আপনার তেমন কোনো সমস্যা না হয়।
হাবীব কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালেন।
ছ’টা বাজে। সূর্য ডুবিডুবি করছে। হাবীব দিঘিরঘাটে উপস্থিত হলেন। তাঁর সঙ্গে প্রণব আছেন। রশিদ এসেছে ট্রেতে করে চা নিয়ে। বিদ্যুত হাবীবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি ঘাটের ঠিক এই জায়গাটায় বসবেন? আপনার মেয়ে সন্ধ্যা ছ’টার দিকে এখানে বসে ভয় পেয়েছিল। কষ্ট করে বসুন। প্লিজ।
হাবীব বসলেন।
বিদ্যুত বললেন, এখন আপনি ডানদিকে তাকান। শেষ সূর্যের আলো আপনার গায়ে পড়েছে। সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়েছে দিঘিতে। আপনার কি মনে হচ্ছে—দিঘির পানির ভেতর আপনি নিজেকে দেখছেন?
হুঁ।
নাদিয়ার ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনা ঘটেছে। সে ভয় পেয়েছে পানিতে নিজের ছায়া দেখে। যে-কোনো কারণেই হোক, সে আগে থেকেই ভয়ে অস্থির ছিল। দিঘির পানিতে নিজেকে দেখে সেই ভয় তুঙ্গস্পর্শী হয়েছে।
হাবীব চুপ করে রইলেন।
বিদ্যুত বললেন, সে নিজেকে চিনতে পারেনি, তার কারণ আছে। শেষ বিকেলের আলো হয় গাঢ় হলুদ থেকে লাল। অর্থাৎ Longer wave length এর আলো। নাদিয়ার গায়ের রঙ শ্যামলা। সে দেখেছে প্রায় হলুদ রঙের এক তরুণীকে।
প্রণব বললেন, আপনার বুদ্ধিতে চমকৃত হয়েছি। বিশেষভাবে চমৎকৃত হয়েছি। স্যার কী বলেন?
হাবীব বললেন, এমন জটিল একটি বিষয়ে এত সহজ ব্যাখ্যা চিন্তা করি নাই।
বিদ্যুত বললেন, আমরা প্রকৃতিকে অতি রহস্যময় কিছু ভেবে দূরে সরিয়ে রাখি। প্রকৃতি কিন্তু মোটেই রহস্যময় না। প্রকৃতি বিশাল একটা সরল অংকের মতো। যার উত্তর আমাদের জানা। হয় শূন্য আর নয় ১, এর বাইরে না। আমরা দিঘিরঘাটে বসে একটা সরল অংক কষেছি। উত্তর পেয়েছি শূন্য। অর্থাৎ ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই।
প্রণব বললেন, ঘাটে ভূত না থাকলেও এই বাগানে অবশ্যই আছে। একটা ঘটনা বলি—শীতের সময়, কার্তিক মাস, বাগানের দু’টা খেজুরগাছ কাটানো হবে। গাছি খবর দিয়েছি…
হাবীব প্রণবকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এই গল্প এখন থাকুক।
বিদ্যুত বললেন, এই খামটা আপনি রাখুন। নাদিয়াকে পৌঁছে দেবেন। এন্টিগ্র্যাভিটি ম্যাজিকের কৌশলটা এখানে লেখা আছে। আমি চা খেয়েই ঢাকার দিকে রওনা হব।
হাবীব মেয়েকে চিঠি দেওয়ার আগে খাম খুলে নিজে পড়লেন কাজটা যে অন্যায় তাও না। মেয়ে বড় হলে তার ওপর নজর রাখতে হয়। সন্তানের প্রতি অনেক কর্তববার মতো এটাও কর্তব্য। যারা কর্তব্য পালনে ভুল করে তারাই বিপদে পড়ে হাবীব মন দিয়ে চিঠি পড়লেন দু’বার পড়লেন। সাধারণ চিঠি, তারপরেও সাংকেতিক কিছু থাকতে পারে।
নাদিয়া,
তুমি অসুস্থ বলে তোমার সঙ্গে দেখা হলো না। অসুস্থতার মূল কারণ ধরে দিয়েছি, কাজেই তুমি দ্রুত আরোগ্য লাভ করবে বলে আমার ধারণা।
তোমার অতি পছন্দের এন্টিগ্র্যাভিটি বটলের ম্যাজিকের কৌশলটা শোনো। বাদামি রঙের একটা কাচের বোতল এবং দড়ি দিয়ে যাচ্ছি। বোতলের মুখের ব্যাস দড়ির মুখের ব্যাসের চেয়ে বড়। কাজেই দড়ির মাথা কামড়ে ধরে বোতল শূন্যে ঝুলতে পারবে না। গ্র্যাভিটির কারণে পড়ে যাবে। বোতলের ভেতর কর্কের একটা গোল বল আছে। ম্যাজিকের মূল কৌশল ওই গোল বলে। ম্যাজিশিয়ান হিসেবে তোমার কাজ হলো কোনোভাবে দড়ি এবং বোতলের মুখের মাঝখানে কর্কটা নিয়ে আসা।
তাহলেই কার্য সিদ্ধি হবে। বোতল মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কলা দেখিয়ে দড়ির মাথা কামড়ে ঝুলতে থাকবে।
