ভালো কথা, কর্কটা শুরুতে বোতলের ভেতর থাকলে হবে না। কারণ বোতলটা দর্শক দেখতে চাইবে। কর্কের বল পাম করে হাতে লুকিয়ে রাখতে হবে।
তুমি ভালো থেকো।
ইতি
বিদ্যুত কান্তি
পুনশ্চ : সাপ এবং আপেল বিষয়ের যে বইটি তুমি দিয়েছ, তার মতো খারাপ বই আমি অনেক দিন পড়িনি। সর্বমোট আটটি গল্প। প্রতিটি একটার চেয়ে আরেকটা খারাপ। বইটির
নাম হওয়া উচিত আটটি নিকৃষ্ট গল্প’।
হাবীব চিঠি শেষ করে ভুরু কুঁচকে বসে রইলেন। নাদিয়া তার শিক্ষককে গল্পের বই কেন দিবে! তার সমস্যা কী?
পূর্বপাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা
পূর্বপাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানো?
জানি না স্যার। সবাই জানে, তুমি কেন জানবা না। তুমি দেখি ছাগলের ছাগল।
গভর্নর মোনায়েম খান সাহেবের কথায় যিনি মাথা নিচু করলেন তিনি পূর্বপাকিস্তানের একজন বুদ্ধিজীবী। সম্মানিত মানুষ। অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। সঙ্গত কারণেই তার নাম উল্লেখ করা হলো না। এই অধ্যাপক মোনায়েম খানের মাসিক বেতার ভাষণ মাঝে মাঝে লিখে দেন। এ মাসের বেতার ভাষণ লিখে এনেছেন। মোনায়েম খান এখনো তা পড়েননি। দেশের বড় সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসেছেন।
মোনায়েম খান অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেশের বড় সমস্যা হলো মালাউন সমস্যা। হিটলার যেমন ইহুদির গুষ্টিনাশ করেছিল, আমরাও যদি সেরকম মালাউনের গুষ্টিনাশ করতে পারতাম তাহলে শান্তির একটা দেশ পাওয়া যেত। ঠিক বলেছি কি না বলো?
ঠিক বলেছেন।
গ্যাসের কোনো টোটকা তোমার জানা আছে?
কিসের টোটকা বুঝলাম না!
মন দিয়ে না শুনলে কীভাবে বুঝবে? তোমার মন অন্যত্র পড়ে আছে। গ্যাসের টোটকা চিকিৎসা আছে কি না বলো। আমার পেটে গ্যাস হচ্ছে।
বেশি করে পানি খান স্যার।
মোনায়েম খান পানি দিতে বললেন। সাধারণ পানির সঙ্গে এক দুই ফোটা জমজমের পানি মিশিয়ে খাওয়া তাঁর অনেক দিনের অভ্যাস।
গ্যাসের সমস্যাটা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। শশী-ক্ষিরা এই জাতীয় ফল তার পেটে কখনো সহ্য হয় না। গভর্নর হাউসের বাগানের এক কোনায় মালি কিছু সবজির আবাদ করেছে। এর মধ্যে আছে শশা, কাকরুল, বরবটি তিনি কচি শশা ঝুলতে দেখে লোভে পড়ে তিন-চারটা খেয়ে ফেলেছেন। পাঁচ কোষ কাঁঠাল খেয়েছেন। এই দুইয়ে মিলে পেটে কঠিন গ্যাস তৈরি হয়েছে।
মোনায়েম খান দুই গ্লাস পানি খেয়ে বললেন, বিশিষ্ট মানুষের গ্যাসের সমস্যা—কঠিন সমস্যা। সাধারণ মানুষের জন্যে এটা কিছু না। বিশিষ্ট মানুষের জন্যে বিশিষ্ট সমস্যা। ধরো তোমার পেটভর্তি গ্যাস। ক্লাসে গিয়েছ। ছাত্র পড়াচ্ছ। হঠাৎ ‘পাদ মারলা। কিছু ছাত্র হাসল। ঘটনা এইখানেই শেষ। আমার কথা চিন্তা করো। আজ রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাইস এডমিরাল এ আর খানের সঙ্গে আমার ডিনার। সেখানে যদি হঠাৎ পাদ দেই, বিষয়টা কী রকম হবে?
স্যার, বক্তৃতাটা পড়ে দেখবেন ঠিক হয়েছে কি না?
সবুর করো। এত ব্যস্ত কেন? তুমি যে বক্তৃতা লিখে নিয়ে এসেছ, তার পাখা নাই যে উড়াল দিয়ে চলে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে, সেগুলা সারব। তারপর বক্তৃতা।
তিনি সেক্রেটারিকে বললেন, ডিআইজি সাহেবকে টেলিফোনে ধরো। পাঁচ মিনিট সময়, এর মধ্যে লাইন লাগিয়ে দিবে।
সেক্রেটারি তিন মিনিটের মাথায় লাইন লাগিয়ে দিলেন।
স্যার মালিকুম।
স্লমালিকুম বলবেন না। স্লা আর শালার মধ্যে তফাত কিছু নাই। পরিষ্কার করে বলবেন আসসালামু আলায়কুম।
জি স্যার। এখন থেকে তাই বলব।
ময়মনসিংহ থানার ওসির নাম কী?
একটু জেনে তারপর বলি।
জেনে বলতে হবে না। তার নাম আখলাকুর রহমান। তাকে বদলি করে দেন দুর্গম কোনো জায়গায়। রামু, নাইক্ষংছড়ি আর কী সব আছে না।
বদলি করে দেব?
অবশ্যই। তবে আপনার কাজ সহজ করে দিচ্ছি—বদলির অর্ডার যাবে। তিন দিনের মাথায় অর্ডার ক্যানসেল হবে। সে যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে।
বিষয়টা স্যার বুঝতে পারছি না।
কিছু বোঝার কি প্রয়োজন আছে? অর্ডার পেয়েছেন অর্ডার পালন করবেন। এর জন্যে কি আপনার আইজির পারমিশন লাগবে?
জি-না।
গুড। আপনাকে অত্যন্ত স্নেহ করি, এটা কি জানেন?
জেনে ভালো লাগল স্যার।
আমি খবর পেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক গোপনে মদ্যপান করে। তার তালিকা প্রস্তুত করে আমাকে দিবেন।
জি স্যার।
আচ্ছা বিদায়।
খোদা হাফেজ স্যার।
খোদা হাফেজ আবার কী? বলেন আল্লাহ হাফেজ।
স্যার সরি। আল্লাহ হাফেজ।
ইসলাম বিষয়টা মাথার মধ্যে রাখবেন এবং কথায় কথায় বলবেন, আল্লাহু আকবর। এতে দিলে সাহস হবে। আপনারা পুলিশ অফিসার। আপনাদের সাহসের দরকার।
মোনায়েম খান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। সাহসের তারই প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ভাইস এডমিরাল এ আর খানের সঙ্গে রাতে খানা খেতে হবে ভেবে এখনই যেন শরীর কেমন করছে। সে আবার শরাব খায়। পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেললে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করবে। মান্যগণ্য করে কিছু বলবে না। আর আগের বার তার পিঠে থাবা দিয়ে বাংলায় বলেছে-গভর্নর! তুমি দুষ্ট আছ!
অল্প বাংলা শেখার এই ফুল। দুষ্ট হবে পলাপান। তার মতো বয়স্ক একজন মানুষকে দুষ্ট বলা আদবের বরখেলাফ। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে ইংরেজিতে। এটা একটা বিরাট সমস্যা। কথার পিঠে ইংরেজিতে কথা বলা মানে মুসিবত।
মোনায়েম খান অধ্যাপকের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, দেখি কী লিখেছ। না থাক, দেখব না। তুমি পড়ে শোনাও। দেশবাসী ভাই ও বোনেরা বাদ দিয়ে পড়ো।
