আখলাকুর রহমান বিড়বিড় করে বললেন, আমি আপনাকে বড়ভাইয়ের মতো দেখি। এখানে আপনি আমার মুরুব্বি। ছোটভাইয়ের ভুলত্রুটি বড়ভাই যদি ক্ষমা না করে, কে করবে?
হাবীব বললেন, নজরানা যেটা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা কি ঠিক আছে? অবশ্যই ঠিক আছে। অবশ্যই।
হাবীব বললেন, আসামি দিচ্ছি, আসামি নিয়ে যান। তাকে ভালোমতো শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবেন। হাসান রাজা চৌধুরী এবং তার পরিবারের যেন কোনো ঝামেলা না হয়।
আপনি যেভাবে বলবেন ঠিক সেই মতো কার্য সম্পন্ন হবে। আমার পীর সাবের দোহাই।
আখলাকুর রহমান আসামি নিয়ে চলে গেছেন। ঘরে প্রণব এবং হাবীব। পাংখাপুলার রশিদ পাংখা টানছে। যদিও পাংখার প্রয়োজন নাই। আবহাওয়া শীতল। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া আসছে।
প্রণব বললেন, শোকের মুখে নুন পড়েছে। সাধারণ নুন না। সৈন্ধব লবণ।
হাবীব বললেন, লবণ এখনো পড়ে নাই। লবণ পড়বে চার-পাঁচ দিনের ভিতরে। যখন তারে বদলি করা হবে রামু থানায় কিংবা খাগড়াছড়িতে।
প্রণব বললেন, এখন তাকে বদলি করলে তো আমাদের সমস্যা।
হাবীব হাই তুলতে তুলতে বললেন, আমাদের কোনো সমস্যা নাই। ওসি আমার কাছে ছুটে আসবে তদবিরে। আমি তদবির করে বদলি বন্ধ করব। ওসি আমার কাছে বাকিজীবনের জন্যে বান্ধা থাকবে। এখন বুঝেছ?
জলের মতো পরিষ্কার বুঝেছি।
মেয়েছেলের কান্না শুনছি। কে কাঁদে।
ফরিদের বউ।
অল্পদিনেই দেখি স্বামীর প্রতি তার বিরাট দরদ হয়েছে।
প্রণব বললেন, তা হয়েছে।
হাবীব বললেন, হাসান রাজা চৌধুরীকে বলবে আমার বাড়িতে থাকার তার আর প্রয়োজন নাই। সে এখন নিশ্চিন্ত মনে তার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারে।
জি বলব। আপনার সঙ্গে ছোট্ট একটা কথা ছিল।
বলো। তোমার কোনো কথাই তো ছোট না। ডালপালায় বিশাল বটবৃক্ষ। বটবৃক্ষের যেমন ঝুড়ি নামে তোমার কারও তেমন ঝুড়ি নামে। বলো কী কথা?
প্রণব বললেন, নাদিয়া মামণির এক শিক্ষক এসেছেন ঢাকা থেকে। নাদিয়া মামণির সঙ্গে দেখা করতে চান। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। তাঁকে অতিথঘরে থাকতে দিয়েছি। খাওয়দাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। বাড়িতে এত ঝামেলা, এইজন্যে আপনাকে কিছু জানাই নাই।
হাবীব বললেন, না জানিয়ে ভালো করেছ। এখন না জানিয়ে সকালে জানালে আরও ভালো হতো।
হাবীব উঠে পড়লেন। তার ভুরু কুঁচকে আছে। তালেবুল এলেমরা নিচুগলায় দোয়াপাঠ করেই যাচ্ছে। এদের গলা ছাড়িয়ে শোনা যাচ্ছে ফরিদের স্ত্রীর কান্না।
নাদিয়াকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। লাইলী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছেন। ঘরে হারিকেন জ্বালানো। জ্বলন্ত অগ্নির কাছে খারাপ কিছু আসতে পারে না। খাটের নিচে একটা মালশায় সরিষা এবং একগোছা চাবি রাখা হয়েছে। নাদিয়ার গলায় তিনটা ভারী তাবিজ। দুটা দিয়েছেন শম্ভুগঞ্জের পীরসাহেব। একটা মওলানা তাজ কাশেমপুরী। নাদিয়ার ঘরে দুজন কাজের মেয়ে। তারা ঘোমটা দিয়ে জায়নামাজে বসে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নিঃশব্দে কোরান পাঠ করছে।
হাজেরা বিবির মাথা আজ মনে হয় একেবারেই ঠিক নেই। তিনি সুর করে মাতম করছেন—আমার নাতনি মারা গেছে গো! কেউ আমারে খবর দিল না গো! নাতনির মরামুখ আমারে কেউ দেখাইলো না গো! আমি তার শাদি দেখলাম না গো!
রাত তিনটায় নাদিয়ার ঘুম ভাঙল। সে চাপা গলায় ডাকল, মা!
লাইলী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এই যে আমি।
নাদিয়া বলল, পুকুরের পানির নিচে আমি যে মেয়েটাকে দেখেছি সে কাঁদছে। আমি তার কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ মা?
লাইলী বললেন, পাচ্ছি। কাঁদছে ফরিদের পোয়াতি বউটা।
কেন কাঁদছে?
লাইলী বললেন, এরা গরিব দুঃখী মানুষ। এদের নানান কষ্ট। কোন কষ্টে কাঁদে কে জানে!
একটু খোঁজ নিবে মা?
সকালে খোঁজ নিব। এখন তোক ছেড়ে যাব না।
নাদিয়া বলল, অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছি মা। স্বপ্নটা বলি?
দিনের বেলা বলিস। রাতে স্বপ্ন বলতে নাই।
কিচ্ছু হবে না মা। শোনো। আমি স্বপ্নে দেখি পানিতে বিরাট বড় একটা ডেগ। আমি সেই ডেগের ভেতর বসে আছি। ডেগটা ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমি ডেগের ভেতর থেকে মাথা বের করছি। তখন দেখি চারদিকে পানি। সমুদ্রের মতো, কিন্তু কোনো ঢেউ নেই। বাতাসও নেই। তারপরেও ডেগটা ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে। ৩য়র স্বপ্ন, কিন্তু আমার একটুও ভয় লাগছে না!
লাইলী বললেন, ভালো কোনো তফসিরকারীর কাছে স্বপ্নটা বলে পাঠাব। উনি তফশির করবেন।
আমার যে স্যারের কথা তোমাকে বলেছি উনি যে-কোনো স্বপ্নের লৌকিক ব্যাখ্যা করতে পারেন।
তোর ওই হিন্দু স্যার?
হুঁ। উনার অনেক বুদ্ধি। ছাত্রদের কাছে স্যারের অনেকগুলি নাম আছে। একটা নাম হলো মালাউন শার্লক হোমস।
স্যারের কথা থাকুক মা। তুই আরাম করে ঘুমা। আমি সারা রাত তোর মাথায় বিলি করে দেব। এক গ্লাস গরম দুধ খাবি?
খাব। মা, আমার দাদির সঙ্গে ঘুমাতে ইচ্ছা করছে।
লাইলী বললেন, তুই এইখানেই ঘুমাবি।
হাবীব নাদিয়ার স্যারের সঙ্গে বসেছেন। মেহমানদের সঙ্গে তিনি বাংলাঘরে বসেন। মামলা-মোকদ্দমার লোকজনের সঙ্গে চেম্বারে।
জনাব, আমার নাম বিদ্যুত কান্তি দে।
হাবীব বললেন, আপনার নাম আমি আমার কন্যার কাছ থেকে শুনেছি। সে আপনার কাছ থেকে কী একটা ম্যাজিকও যেন শিখেছে। রাতে আপনার থাকার কি কোনো সমস্যা হয়েছিল?
না।
খাওয়াদাওয়ায় কোনো তকলিফ কি হয়েছে? আমার মেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তাকে নিয়ে ব্যস্ততা গেছে।
