রাতের খাবার শেষ হয়েছে। হাবীব ওসি এবং সেকেন্ড অফিসারকে নিয়ে চেম্বারে বসেছেন। প্রণব নিজেও উপস্থিত আছেন। হাবীব বললেন, খানা কি মনমতো হয়েছে ওসি সাহেব?
ওসি আখলাকুর রহমান বললেন, গত দশ বছরে এমন খানা খাই নাই। পেট ফেটে মারা যাওয়ার অবস্থা। হজমি বড়ি খাওয়া লাগবে। এখন হাবীব ভাই বলেন, আপনার জন্য কী করব?
আমার জন্য কিছু করা লাগবে না। আপনাদের সামান্য সাহায্য করতে চাই। কইতরবাড়িতে যে খুন হয়েছে, সেই খুনের আসামিকে আমি খবর দিয়ে এনেছি। ফরিদ নাম। তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান।
আখলাকুর রহমান প্রণবের দেওয়া পান মুখে দিয়ে সরু চোখে তাকালেন। হাবীব বললেন, প্রণব, ওসি সাহেবকে ঘটনা খুলে বলো। বাড়িতে এত ঝামেলা! পরিষ্কার করে কিছু চিন্তাও করতে পারছি না। বলতেও পারছি না। দুনিয়ার কথা বলার দরকার নাই! সারসংক্ষেপ বলে।
প্রণবের মুখভর্তি পান। তিনি চিলুমচিতে মুখের পান ফেলে দিয়ে বললেন, ফরিদ ছিল হাসান রাজা চৌধুরীর খাস কামলা। উনার কাপড় ধােয়া, হাত-পা টিপে দেওয়া, গোসল দেওয়া সব দায়িত্ব তার। হাসান তাকে নিয়ে পাখি শিকারে যাবেন। বন্দুক পরিষ্কার করতে বললেন। বন্দুক পরিষ্কারের সময় দুর্ঘটনা। আচমকা গুলি বের হয়ে গেল। কাছেই হাসানের মামা ফজরের নামাজে বসেছিলেন। এক গুলিতে শেষ। স্যার, ফরিদকে নিয়ে আসি?
নিয়ে আসুন।
ফরিদ ঘরে ঢুকে জড়সড় হয়ে রইল। তার মাথায় টুপি। পরনে পাঞ্জাবি, হাতে তসবি। সে এতক্ষণ তালেবুল এলেমদের সঙ্গে দোয়া ইউনুস খতম দিচ্ছিল।
আখলাকুর রহমান বললেন, তুমি হাসান সাহেবের খাস লোক?
জি স্যার।
শিকারে যাওয়ার আগে কি উনার বন্দুক আগেও পরিষ্কার করেছ?
জি স্যার।
সেফটি ক্যাচ কাকে বলে?
ফরিদ হতাশ চোখে একবার হাবীবের দিকে আরেকবার প্রণবের দিকে তাকাল।
সেফটি ক্যাচ কী জানো না?
জি-না।
পাখি শিকারের জন্যে ছররা গুলি ব্যবহার হয়। ফায়ার করলে একসঙ্গে অনেক ছোট ছোট গুলি বের হয়। এতে পাখি মরে। মানুষের গায়ে লাগলে মানুষ জখম হয়। মরে না। সেদিন বন্দুকে ছররা গুলির বদলে বুলেট ছিল কী জন্যে?
স্যার, আমি জানি না।
বন্দুকে ট্রিগার থাকে। ট্রিগার চাপলে গুলি বের হয়, এটা তো জানো?
জি স্যার।
তোমার হাসান স্যারের বন্দুকে ট্রিগার কয়টা?
জানি না স্যার।
মোহনভোগ বলে একটা মিষ্টি আছে। মিষ্টিটা কী?
হালুয়া স্যার।
এই হালুয়াকে অল্প আঁচে অনেকক্ষণ জ্বাল দিলে হালুয়ার রস কমে যায়। হালয়া টাইট হয়। থানায় নিয়ে আমরা প্রথম যে কাজ করি, রস কমিয়ে হালয়া টাইট করি। তুমি বন্দুক জীবনে কোনোদিনও দেখো নাই। আর বলছ বন্দুক দিয়ে গুলি করে মানুষ মেরেছ? অপরাধ করেছে অন্য একজন। দোষ নিজের কাঁধে নিচ্ছ। ঘটনা তো এইটা?
ফরিদ হতাশ চোখে হাবীবের দিকে তাকাল।
হাবীব বললেন, ওসি সাহেব ঠিকই ধরেছেন। এইটাই ঘটনা।
আখলাকুর রহমান বললেন, আপনার মতো অতি বুদ্ধিমান লোক এত বড় ভুল করে! আসামি শিখিয়ে পড়িয়ে নিবেন না?
হাবীব বললেন, ওসি সাহেব, শিখানোর জন্যে দায়িত্ব আপনার। আপনি শিখিয়ে নিবেন। আপনাদের জন্যে ভালো নজরানার ব্যবস্থা করা আছে। প্রণব! নজরানার পরিমাণ ওসি সাহেবকে কানে কানে বলো। উনার দিলখোশ হবে।
প্রণবের কথা শুনে ওসি সাহেবের দিলখোশ হলো না। তিনি বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে বললেন, হাবীব ভাই, আপনি হয়তো জানেন না আমি জুমনপুরের পীরসাহেবের মুরিদ হয়েছি। এইসব কাজ ছেড়ে দিয়েছি। পীর বাবার পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছি, বাকিজীবন দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করব। এর অন্যথা হবে না।
হাবীব সিগারেট ব্রাতে ধরাতে বললেন, এটা অত্যন্ত ভালো খবর। এরকম অফিসারই আমাদের দরকার। সেকেন্ড অফিসার সাহেব কী বলেন?
সেকেন্ড অফিসার শুকনামুখে বললেন, অবশ্যই অবশ্যই।
হাবীব বললেন, যেহেতু পীরসাহেবের মুরিদ হয়েছেন, আপনার উচিত কোনো নির্জন জায়গায় বসে আল্লাখোদার নাম নেওয়া। গর্ভনর সাহেবকে বলে কাল-পরশুর মধ্যে আপনাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেই। নির্জন পরিবেশ পাবেন। আল্লাখোদার নাম নিবেন চিল্লায় চলে যাবেন।
আখলাকুর রহমান ছোটখাটো ধাক্কার মতো খেলেন। হাবীব বললেন, আপনি মদ্যপান বেশি করেছেন বলে কার সঙ্গে কী কথা বলছেন হিসাব নাই। এইজন্যেই আল্লাহপাক কোরান মজিদে বলেছেন, মদ এবং জুয়া উভয়ের মধ্যেই কিঞ্চিৎ উপকার আছে। তবে উপকারের চেয়ে অপকার অধিক। ইহার পরেও কি তোমরা মদ্যপান থেকে বিরত হবে না? ওসি সাহেব! আপনি তো জুয়াও খেলেন, তাই? সালাহউদ্দিনের বজরায় জুয়ার আড্ডা বসে। নটবাড়ির অল্পবয়স্ক একটা নটি মেয়েকে মাঝেমধ্যে বজরায় নিয়ে যান। মেয়েটার নাম রানী। তাকে আপনি একটা সোনার চেইন বানিয়ে দিয়েছেন। চেইনটা কেনা হয়েছে সুবল স্বর্ণকারের দোকান থেকে। ঠিক বলছি? না-কি কোনো ভুলত্রুটি করলাম?
আখলাকের নেশা সম্পূর্ণ কেটে গেছে। তার চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। হাবীব বললেন, আমি বলেছিলাম রানী মেয়েটার সঙ্গে আপনার কিছু ঘনিষ্ঠ ছবির ব্যবস্থা করে দিতে। কিছু ছবি তারা পাঠিয়েছে। ছবি ভালো আসে নাই। আপনার চেহারা বোঝা যায়, কিন্তু রানী মেয়েটার চেহারা স্পষ্ট আসে নাই। প্রণব, ওসি সাহেবরে ছবি তিনটা দেখাও।
প্রণব দ্রুত আদেশ পালন করল।
হাবীব বললেন, ওসি সাহেব কিছু বলবেন? রানী মেয়েটাকে দিয়ে আমি একটা মামলা করতে পারি, অপহরণ এবং ধর্ষণ মামলা। দশ বছরের জন্যে জেলে চলে যাবেন। আপনার সুবিধা হবে, জুমনপুরের পীরসাহেবের তরিকায় চলার সুযোগ পাবেন।
