হাবীব বললেন, আমার মেয়ের ধর্মশিক্ষা আছে। তাকে মুনশি রেখে কোরানপাঠ শিখানো হয়েছে। প্রতি রমজান মাসে সে কোরান খতম দেয়।
মাওলানা বললেন, আপনার মেয়ে সত্যি সত্যি পুকুরঘাটে গিয়েছে, এটা চিন্তার বিষয়। আমি একটা তাবিজ পাঠায়ে দিব। চেষ্টা নিবেন যেন তাবিজটা পরে। আমার কেন জানি মনে উঠছে, আপনের মেয়ের উপর খারাপ বাতাসের নজর আছে। লক্ষণ বিচারে সেরকম পাই।
হাবীব বললেন, তাবিজ পাঠিয়ে দিবেন। আমি ব্যবস্থা করব যেন সে পরে।
সময় সন্ধ্যামাখা বিকাল। নাদিয়া ঘাটে, পানিতে পা ডুবিয়ে বসেছে। পুকুরভর্তি শাপলা ফুল। ফুল রাতে ফোটে। দুপুরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
নাদিয়া মাথার বাঁধা চুল খুলে দিতে দিতে মনে মনে বলল, আয় খারাপ বাতাস আয়। আমার চুল ধরে ঝুলে পড়। তোকে আমি নিজের ঘরে নিয়ে পুষব।
এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। হঠাৎ নাদিয়া দেখল, শাপলা ফুলের ঝাঁকের মধ্যে একটি ডুবন্ত মেয়ের মুখ। মেয়েটির চোখ খোলা। সে পানির ভেতর থেকে নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
নাদিয়া বিকট চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে ঘাটে পড়ে গেল। বাড়ির প্রায় সবাই। ছুটে এল। সবার আগে উপস্থিত হলেন প্রণব। তিনি অজ্ঞান নাদিয়াকে কোলে তুলে নিলেন।
হাবীব বললেন, কী সর্বনাশ! মাওলানা সাহেবকে আবার খবর দাও। ডাক্তার ডাকো।
নাদিয়ার জ্ঞান ফিরল এক ঘণ্টা পর। ততক্ষণে বাড়িতে কোরান পাঠ শুরু হয়েছে। মাদ্রাসার একদল তালেবুল এলেম এসে দোয়া ইউনুস খতম দিচ্ছে। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার বার এই দোয়া পাঠ করা হবে।
হাবীব শম্ভুগঞ্জ থেকে ভাইপীরকে আনতে লোক পাঠালেন। যত রাতই হোক ভাইপীর যেন উপস্থিত হন। হাবীব একটা গরু সদগার ব্যবস্থা করলেন।
নাদিয়ার মা জায়নামাজে বসলেন। মেয়ের জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত তিনি জায়নামাজ ছেড়ে উঠবেন না।
নাদিয়ার জ্ঞান ফিরল রাত আটটা পঁচিশ মিনিটে। সে বাবার একটা হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। সে থরথর করে কাঁপছে। হাবীব বললেন, মা, আর কোনো ভয় নাই। ভাইপীর সাহেব চলে এসেছেন। তিনি এখনো দোয়াতে আছেন।
নাদিয়া বলল, বাবা, আমি ভয় পেয়েছি। আমি খুব ভয় পেয়েছি।
হাবীব বললেন, আর ভয় নাই মা। আমার সারা দুনিয়া একদিকে আর তুমি একদিকে। কেন ভয় পেয়েছ বলতে চাও? বলতে না চাইলে বলতে হবে না।
নাদিয়া বলল, বাবা, দিঘির পানির নিচ থেকে একটা মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মেয়েটা মৃত না বাবা, জীবিত। মেয়েটা চোখের পাতা ফেলছিল। মেয়েটা খুব সুন্দর। গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো।
থাক, আর বলার দরকার নাই। তোমার মা আজ সারা রাত তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবে।
হাজেরা বিবি তখন থেকে ‘ও হাবুরে, ও হাবুরে’ বলে চিৎকার করছেন। তার কাছে কেউ নেই। সবাই নাদিয়াকে ঘিরে আছে। তার চিৎকার সবাই শুনেও শুনছে না।
হাবীব মায়ের ঘরে ঢুকলেন। হাজেরা বিবি বললেন, শুনলাম তোর মেয়ে নাকি মারা গেছে?
হাবীব বিরক্ত হয়ে বললেন, কেন ক ডাক ডাকো? নাদিয়া মারা যাবে কেন? সে ভালো আছে, সুস্থ আছে। একা পুকুরঘাটে গিয়েছিল। সেখানে কী দেখে যেন ভয় পেয়েছে।
কী দেখছে?
কী দেখেছে সেটা জানার কোনো প্রয়োজন নাই মা।
অবশ্যই প্রয়োজন আছে। বল কী দেখছে?
হাবীব বললেন, সে দেখেছে দিঘির পানির নিচে একটা মেয়ে। নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
হাজেরা বিবি বললেন, এক্ষণ দিঘিতে জাল ফেলার ব্যবস্থা কর।
জাল ফেলতে হবে কেন?
হাজেরা বিবি বললেন, কোনো এক মাইয়ারে খুন কইরা দিঘির পানিতে ফেলছে। নাদিয়া দেখছে মরা লাশ। জাল ফেলার ব্যবস্থা কর।
হাবীব মা’র ঘর থেকে বের হলেন। থানায় খবর দিলেন। জাল ফেলার সময় পুলিশের উপস্থিতির প্রয়োজন আছে।
রাত দশটায় জেলেরা পুকুরে জাল ফেলল। ঘাটে চারটা হ্যাজাক লাইট জুলছে। থানার ওসি সাহেব এবং সেকেন্ড অফিসার এসেছেন। তাদের জন্যে ঘাটের কাছে চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। তারা অন্ধকারে বসেছেন। সন্ধ্যার পর ওসি সাহেবের সামান্য পানের অভাস আছে। তার জন্যে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের রিফ্রেশমেন্ট রুম থেকে জিনিস এসেছে। জিনিসের সঙ্গে চিকেন কাটলেট এসেছে। (সে সময় রেলের রিফ্রেশমেন্ট রুমে বিয়ার, ভদকা এবং হুইস্কি পাওয়া যেত।) প্রণব তাদের দেখাশোনা করছেন। ওসি সাহেব বললেন, হাবীব ভাইয়ের ব্যবস্থা নিখুঁত। সবদিকে তাঁর নজর এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার। এই ধরনের মানুষ দেশের লিডার হলে দেশ পাল্টে যেত।
প্রণব বললেন, রাতে কিন্তু স্যার খাওয়াদাওয়া করে তারপর যাবেন। খাসি জবেহ করা হয়েছে। হাজি নূর মিয়া বাবুর্চি চলে এসেছে।
ওসি সাহেব বললেন, তার কোনো প্রয়োজন নাই। যা ব্যবস্থা করে রেখেছেন, তারচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর কিছু হতে পারে না।
প্রণব বললেন, স্যার প্রয়োজন আছে। খাওয়াদাওয়ার পর স্যার আপনাকে বিশেষ কিছু কথা বলবেন। জরুরি কথা।
হাবীব ভাই কোথায়? তাঁকে দেখছি না তো।
প্রণব বললেন, গভর্নর সাহেব ঢাকা থেকে টেলিফোন করেছেন নাদিয়ার খোঁজ নিতে। এই নিয়ে ব্যস্ত আছেন।
ওসি সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, অবশ্যই। অবশ্যই।
পুকুরে জাল ফেলে কিছুই পাওয়া গেল না। দুটা বিশাল সাইজের কাতল মাছ ধরা পড়ল। গায়ে শ্যাওলা পড়া কাতল। প্রণবের নির্দেশে একটা মাছ ওসি সাহেবের বাসায়, একটা মাছ সেকেন্ড অফিসারের বাসায় চলে গেল।
সেকেন্ড অফিসার ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, জমিদারি আইনের সময় এমন মেহমানদারি দেখেছি, তার পরে দেখি নাই।
