খামে কী আছে?
একটা চিঠি আছে। আর কিছু না। আচ্ছা আমি যাই।
আমি খাম খুললাম। সম্বোধনহীন একটা চিঠি। সেখানে লেখা—
আমার নাম নাদিয়া। আমি আপনার সঙ্গে ম্যাথ সাবসিডিয়ারি করি। আপনার যেমন ম্যাজিকে আগ্রহ আমারও তাই। টেলেন্ট শোতে আমি আপনার Antiqravity খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আপনি খুব মন দিয়ে আমার হাতের ছাপ পরীক্ষা করবেন। আমি শুধু একটা জিনিসই জানতে চাই। আমার পছন্দের একজন মানুষ আছেন। তাকে কি আমি বিয়ে করতে পারব?
ক্লাসে শুরুর দিকে আপনি একটা লাল শার্ট পরে আসতেন। এই শার্টে আপনাকে খুব মানাত। এখন আপনাকে এই শার্ট পরতে দেখি না। হয়তো শার্টটা চুরি হয়ে গেছে, কিংবা নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে একশটা টাকা আছে। আপনি অবশ্যই একটা লাল শার্ট কিনবেন। আপনি যেমন নেত্রকোনার ছেলে, আমিও নেত্রকোনার মেয়ে। ধরে নিন আমি আপনার একজন বোন। বোন কি তার ভাইকে একটা শার্ট কিনে দিতে পারে না? আমি হিন্দু মেয়ে হলে রাখি পাঠিয়ে আপনাকে ভাই বানাতাম। দিল্লির সম্রাট হুমায়ূনকে এক রাজপুত রানী রাখি পাঠিয়ে ভাই পাতিয়েছিল।
ইতি
নাদিয়া।
একশ টাকা খরচ করে আমি লাল শার্ট কিনলাম না। দামি রেডিওবন্ড কিছু কাগজ কিনলাম। এই কাগজে কবিতা লেখা হবে। একটা ফাউনটেন পেন কিনলাম। কবিতা ভালো কলমে লেখা হবে। আমার জীবনের প্রথম কবিতা নাদিয়ার দেওয়া টাকায় কেনা কলমে লেখা হয়েছে। আমার রচনার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা এই কবিতাটির সঙ্গেও পরিচিত।
দিতে পারো একশ ফানুস এনে
আজন্ম সলজ্জ সাধ
একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।।
হাবীব খানের বাড়িতে মাওলানা এসেছেন
হাবীব খানের বাড়িতে মাওলানা এসেছেন। তিনি ময়মনসিংহ জামে মসজিদের পেশ ইমাম। নাম মাওলানা তাজ কাশেমপুরী। জনশ্রুতি আছে, তিনি একটি জ্বিন পালেন। জিনের নাম খামজী। জ্বিনের মাধ্যমে তিনি জ্বিনের দেশ থেকে গাছগাছড়ার ওষুধ এনে চিকিৎসা করেন। খামজার সঙ্গে না-কি জ্বিনের বাদশার সখ্য আছে। জ্বিনের বাদশা তার প্রিয় একজনকে মানুষের হাতে বন্দি দেখে ক্ষুব্ধ। মাওলানা তাজ কাশেমপুরী কঠিন লোক বলেই এখনো কিছু করে উঠতে পারছে না। তবে যে-কোনো সময় অঘটন ঘটবে। মাওলানা তাজ কাশেমপুরী অত্যন্ত সাবধানে জীবনযাপন করেন। পুকুরে বা নদীতে গোসল করেন না। মানুষকে পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে মারতে জ্বিনরা না-কি পারদর্শী। তিনি তোলা পানিতে গোসল করেন। গলায় একটা তাবিজ পরেন। তাবিজটা আল্লাহর এক অলি স্বপ্নে তাকে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে তিনি ঘুমুতে গেছেন, তখন স্বপ্নে দেখেন সাদা আলখাল্লা পরা এক সুফী দরবেশ তাঁকে বলছেন, তাজ! জ্বিনের বাদশার হাত থেকে সাবধান। একটা তাবিজ তোকে দিলাম। সবসময় গৃলায় পরে থাকবি। না হলে মহাবিপদ। মাওলানা তাজের ঘুম ভাঙল। তিনি দেখেন, তার হাতের মুঠিতে রুপার এক তাবিজ। সেই থেকে তিনি তাবিজ গলায় পরছেন।
মাওলানাকে আনা হয়েছে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে ফু দেওয়ার জন্যে। সিঁড়ির শেষ ধাপে অনেকবার হাবীবের পা পিছলিয়েছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে ঘটতে ঘটেনি। তার ধারণা সিড়ির এই ধাপে দোষ আছে। দোষ কাটানোর ব্যবস্থা।
মাওলানা তাজ কাশেমপুরী সিড়িতে ফু দিলেন। একটা তাবিজ সিড়ির রেলিং-এ বেঁধে সিঁড়ি বন্ধন দিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘দোষী’ জিনিসটা থাকে পুকুরঘাটে। সেখান থেকে উড়ে আসে। জিনিসটা যথেষ্ট শক্তিধর। তাকে পুকুরঘাট থেকে বিদায় করা যাবে না। তবে সে যেন মূলবাড়িতে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা তিনি করে দিচ্ছেন। তবে বাড়ির মেয়েদের চুলখোলা অবস্থায় এবং হয়েজ-নেফাজ চলাকালে পুকুরঘাটে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। খারাপ জিনিস মেয়েদের খোলা চুলের মুঠি ধরে বাড়িতে ঢোকে।
নাদিয়া বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মাওলানার কথা শুনছিল। সে বিরক্ত গলায় বলল, খারাপ জিনিস বলতে কী বোঝাচ্ছেন?
মাওলানা বললেন, এটা একটা হাওয়া। খারাপ হাওয়া।
এর জীবন আছে?
অবশ্যই আছে। তবে তাদের জীবন এবং মানুষের জীবন একরকম না। মানুষ খাদ্যগ্রহণ করে, এরা খাদ্যগ্রহণ করে না।
নাদিয়া বলল, যার জীবন আছে তার মৃত্যুও আছে। এরা কি মারা যায়?
হাবীব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মা, চুপ কর তো। সব বিষয় নিয়ে কথা বলা ঠিক না।
নাদিয়া বলল, একটা খারাপ জিনিস আমাদের পুকুরঘাটে বসে থাকবে, আর তার বিষয়ে জানতে চাইব না—এটা কেমন কথা! আমি এখনই এলোচুলে একা পুকুরঘাটে যাব। কিছুক্ষণ পুকুরঘাটে বসে থাকব। তারপর ঘরে ফিরব। খারাপ জিনিসটা আমার চুলের মুঠি ধরে ঘরে ঢুকবে। তখন তাকে আমি শায়েস্তা করব।
হাবীব বললেন, কীভাবে শায়েস্তা করবি?
নাদিয়া বলল, আমি কানে ধরে তাকে উঠবোস করাব।
হাবীব গম্ভীর হয়ে রইলেন। প্রণব শব্দ করে হেসে ফেলে চারদিকের পরিস্থিতি দেখে হাসি সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। হাবীব বললেন, মা, ঘরে যা।
নাদিয়া বলল, আমি ঘরে যাব না। আমি পুকুরঘাটে যাব।
সে সত্যি সত্যি সিড়ি বেয়ে নামতে থাকল। হাবীবের মনে হলো মেয়েকে কঠিন ধমক দেওয়া প্রয়োজন। ধমক দিতে পারলেন না। বাইরের একজন মানুষ আছে। তাছাড়া মেয়েটার সাহস দেখে তার ভালো লাগছে।
মাওলানা তাজ বললেন, উচ্চশিক্ষার কিছু কুফল আছে জনাব। প্রধান কুফল মুরুব্বিদের অবাধ্য হওয়া। ধর্মশিক্ষা না হলে এটা হয়।
