সম্পূর্ণ নিজের ভুবনে আমি তখন সুখে আছি। মাঝে মাঝে কবিতা লেখার ব্যর্থ চেষ্টাও চলে। মিল আসে তো ছন্দ আসে না। ছন্দ এলে মিল আসে না। বাইরের অশান্ত পরিস্থিতির সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি আছি আমার আপন ভুবনে।
বাইরের অশান্ত পরিস্থিতি বিষয়ে একটু বলি। অশান্তির শুরুটা পশ্চিম পাকিস্তানেলান্ডিকোটাল নামের এক বাজারে। বেশকিছু ছাত্র সেখানে গিয়েছে (নভেম্বর, ১৯৬৮)। কী কর্ম করেছে কে জানে, তবে সেখান থেকে ফেরার পথে চোরাচালানের কিছু মালামাল নিয়ে ফিরেছে। ল্যান্ডিকোটাল চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। তাদের মালামাল বাজেয়াপ্ত করে।
ছাত্ররা শুরু করে গ্রেফতার করা ছাত্রদের মুক্তির আন্দোলন। জুলফিকার আলি ভুট্টো এই সুযোগ হাতছাড়া করেন না। তিনি তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। আয়ুববিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।
ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে আবদুল হামিদ নামের পলিটেকনিকের সতেরো বছরের এক ছাত্র নিহত হয়। আবদুল হামিদ আয়ুববিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ।
আয়ুব খান নিরাপত্তা আইনে প্রচুর ছাত্র গ্রেফতার করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তার প্রমাণ, আয়ুব খান পেশোয়ারে পৌঁছলে ছাত্ররাই তাকে স্বাগত জানায়। তিনি বক্তৃতা দিতে মঞ্চে উঠলে হঠাৎ হাসিম উমর জাই নামের এক ছাত্র তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে সভা পণ্ড হয়ে যায়।
হাসিম উমর জাইকে গ্রেফতার করা হয়। সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলে—দীর্ঘদিন জনগণকে নির্যাতনকারী অত্যাচারীকে খুন করতে না পেরে আমি দুঃখিত।
লৌহমানব আয়ুব খানের মধ্যে তখন তাম্রমানব ভাব প্রকাশিত হয়। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করা শুরু করেন। জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং ওয়ালি খানকে দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়।
পূর্বপাকিস্তানের অবস্থা তখন মোটামুটি শান্ত। পশ্চিম পাকিস্তানে গ্রেফতার হওয়া ছাত্র এবং রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির দাবিতে সংগ্রামী ছাত্র সমাজ ১৯ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমের সামনে একটি সভা করে। সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর সদস্য জনাব মফিজুর রহমান। অনেকের মধ্যে বক্তৃতা করেন ছাত্রলীগের আব্দুর রউফ।
২২ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তানের কিছু কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী পশ্চিম পাকিস্তানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন কবি জসিম উদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, কবি হাসান হাফিজুর রহমান, কবি ফজল শাহাবুদ্দিন, জনাব আবদুল গাফফার চৌধুরী, লেখক শহীদুল্লাহ কায়সার।
পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই তখন জেলে। যেমন শেখ মুজিবুর রহমান, শ্রী মণি সিং, তোফাজ্জল হোসেন, শ্রী সত্যেন সেন, ছাত্র নেতা জনাব নুরে আলম সিদ্দিকী, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন।
পশ্চিম পাকিস্তানে যে আন্দোলনের সূত্রপাত পূর্বপাকিস্তানে সেই আন্দোলন শুরুতে প্রায় এককভাবেই শুরু করেন মাওলানা ভাসানী। এই অদ্ভুত মানুষটিকে নিয়ে লেখা কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতাটি উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না।
সফেদ পাঞ্জাবি
শিল্পী, কবি, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,
খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা,
নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানি,
সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন
দুর্গত এলাকা প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী
কী বলেন। রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,
যেন মহা-প্লবনের পর নূহের গম্ভীর মুখ
সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি
উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে। বুক তাঁর বিচূর্ণিত দক্ষিণ বাংলার
শবাকীর্ণ হু-হু উপকূল, চক্ষুদ্বয় সংহারের
দৃশ্যাবলিময়, শোনালেন কিছু কথা, যেন নেতা
নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার।…
এখন গল্পাংশে ফিরে যাই। গল্পপিপাসু পাঠকরা রাজনীতির গল্প শুনতে চান না। সত্য তাঁদের আকর্ষণ করে না। তাদের সকল আকর্ষণ মিথ্যায়।
ছুটির দিনের এক দুপুর। বাইরে ঝাঝালো রোদ। দুপুরটা কীভাবে কাটাব বুঝতে পারছি না। ঘরে থাকতে ইচ্ছা করছে না, আবার ঘরের বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না। হলের দারোয়ান এসে খবর দিল আমার কাছে একজন ছাত্রী এসেছে। গেস্টরুমে বসে আছে।
কে আসবে আমার কাছে? শার্ট গায়ে দিয়ে চিন্তিত মুখে নিচে নামলাম। যে মেয়েটি বসে আছে তাকে চেহারায় চিনি, নামে চিনি না। আমরা একসঙ্গে ম্যাথমেটিকস সাবসিডিয়ারি ক্লাস করি। সে পড়ে ফিজিক্সে। শ্যামলা মেয়ে। তার চেহারায় এবং চোখে এমন এক আশ্চর্য সৌন্দর্য আছে যে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। এই তাকিয়ে থাকার জন্যে কোনোরকম লজ্জাবোধও হয় না।
মেয়েটি বলল, আমরা একসঙ্গে ম্যাথ সাবসিডিয়ারি করি।
আমি বললাম, জি।
শুনেছি আপনি খুব ভালো হাত দেখেন। আমি হাত দেখাতে এসেছি।
আমি বললাম, গেস্টরুমে আমি আপনার হাত ধরে যদি হাত দেখি বিরাট সমস্যা হবে।
মেয়েটি বলল, আপনাকে আমার হাত ধরতে হবে না। আমি দুই হাতের ছাপ কাগজে নিয়ে এসেছি।
আমি বললাম, ছাপ কীভাবে নিলেন?
মেয়েটি বলল, স্ট্যাম্পের কালি হাতে মেখে সেই কালি দিয়ে ছাপ দিয়েছি। ছাপগুলি আপনি রেখে দিন। আপনি অবসর সময়ে ধীরেসুস্থে দেখবেন। পরে আপনার কাছে শুনব। আর এই খামটা রাখুন।
