এক শুক্রবারের কথা। নাপিতের দোকানে চুল কাটাতে যাব, আমাকে হলের বেয়ারা বলল, আপনাকে একজন ডাকে।
কে ডাকে?
অ্যাসিসটেন্ট হাউস টিউটর সাহেবের ঘরে যান। দেখলে চিনবেন।
তোমার নাম বলতে অসুবিধা কী?
অসুবিধা আছে।
অ্যাসিসটেন্ট হাউস টিউটরের ঘরে ঢুকে আমার বুকে ছোটখাটো ধাক্কার মতো লাগল। পাচপাত্তুর একজনকে নিয়ে বসে আছে। পাচপাত্তুর অতি ভদ্র গলায় বললেন, শুনেছি আপনি ভালো হত দেখতে পারেন। হাত দেখে দিন।
পাচপাত্তুরের হাতে গোমেদ পাথরের আংটি। আমি বললাম, আপনি গোমেদ ব্যবহার করবেন না।
পাথর চিনেন?
হ্যাঁ। আপনার সামনে মহাবিপদ। মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেলে আপনি বহুদূর যাবেন।
মহাবিপদ কবে?
সেটা বলতে পারছি না।
আমার বিয়ের বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন?
আমি বললাম, আপনার হাত দেখে মনে হচ্ছে আপনি বিবাহিত।
ঠিক আছে আপনি যান। আপনার কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন। কেন্টিনে আমি বলে দিব, ফ্রি খাবেন।
আমি বললাম, তার দরকার হবে না।
ছাত্রলীগের নেতাগোছের একজন রাত দশটায় আমার ঘরে উপস্থিত। কথাবার্তা, হাভভাব খুবই উগ্র।
হুমায়ূন আপনার নাম?
জি।
ছাত্র ইউনিয়ন করেন?
জি-না।
তাহলে কী করেন?
পড়াশোনা করি।
হাত দেখে টাকা নেন?
হাত দেখি, তবে টাকা নেই না।
আমার হাত দেখে দিন।
রাত দশটার পর আমি হাত দেখি না।
কেন?
আমি বললাম, হাত দেখায় আমার যে গুরু তাঁর নাম বেনহাম। উনি রাতে হাত দেখা নিষেধ করে গেছেন।
বেনোম কোন দেশের?
জার্মানির।
উনি আপনার গুরু হলেন কীভাবে?
তাঁর বই পড়ে হাত দেখা শিখেছি। কাজেই তিনি আমার গুরু।
আপনি মানুষকে হিপনোটাইজ করতে পারেন বলে শুনেছি। এটা কি সত্যি?
সত্যি।
আমাকে হিপনোটাইজ করুন। যদি করতে না পারেন আপনার খবর আছে।
আমি মহাবিপদে পড়লাম। হিপনোটাইজের আমি কিছুই জানি না। একজন ম্যাজিশিয়ানকে স্টেজে হিপনোটাইজ করতে দেখেছি। পুরোটাই আমার কাছে ভাওতাবাজি মনে হয়েছে। ম্যাজিশিয়ান দর্শকদের ভেতর থেকে একজনকে চেয়ারে বসালেন। তার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ হাত দিয়ে পাস দিলেন। তারপর বললেন, এখন হাজার চেষ্টা করলেও আপনি আর চেয়ার থেকে উঠতে পারবেন না। ভদ্রলোক অনেক চেষ্টা করলেন, চেয়ার থেকে উঠতে পারলেন না। দর্শকদের মধ্যে হাসির ফোয়ারা। আমি নিশ্চিত, যাকে মঞ্চে ডাকা হয়েছে তিনি ম্যাজিশিয়ানের নিজের লোক। হিপনোটাইজ হবার ভান করেছে। ম্যাজিকের ভাষায় এদের বলে ‘কনফিডারেট’।
ছাত্রলীগের পাণ্ডা আমার সামনে চেয়ারে বসা। তার চোখমুখ চোয়াল সবই শক্ত। সে খড়খড়ে গলায় বলল, কই শুরু করেন।
আমি বাধ্য হয়ে স্টেজে দেখা ম্যাজিশিয়ান যা যা করেছিলেন তা করতে শুরু করলাম। একপর্যায়ে বললাম, এখন আপনি চেয়ারের সঙ্গে আটকে গেছেন। হাজার চেষ্টা করলেও চেয়ার থেকে উঠতে পারবেন না।
জগতে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, আরেকটি ঘটল। ছাত্রলীগের পাণ্ডা চেয়ার থেকে উঠতে পারে না। সে হতভম্ব। তার সঙ্গের সাঙ্গপাঙ্গরা হতভম্ব। সবচেয়ে হতভম্ব আমি নিজে।
যথেষ্ট হয়েছে, এখন ঠিক করে দিন।
আমি বললাম, এখন আমি দু’বার হাততালি দিব। হাততালির শব্দ শোনার পর উঠতে পারবেন।
দু’বার হাততালি দিলাম, তারপরেও কিছু হলো না। আমি ভয়ে অস্থির হয়ে পড়লাম। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। বিপদ এইদিক দিয়ে আসবে তা কখনো ভাবিনি।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হবে। তার শরীর চেয়ারে বসা অবস্থায় বেঁকে লোহার মতো শক্ত হয়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই চ্যাংদোলা করে তাকে পাঁচতলা থেকে নামানো হলো। আমাকে অপরাধী হিসেবে সঙ্গে যেতে হলো। মহসিন হলের গেটে বিরাট জটলা–এক স্যার বেঁকে গেছে।
ডাক্তাররা বললেন, যে-কোনো কারণেই হোক শরীরের কিছু কিছু মাসল শক্ত হয়ে গেছে। তারা মাসল Relax করার ইনজেকশন দিলেন। আমি একমনে দোয়া ইউনুস পড়তে লাগলাম।
তখন জানতাম না, বইপত্র পড়ে এখন জানি–মানুষকে হিপনোটাইজ করা কঠিন কর্ম না। মানুষের মস্তিষ্কের একটা অংশ সাজেশান নেওয়ার জন্যে তৈরি থাকে। অতি প্রাচীন সময়ে বিপদসংকুল জীবনচর্যায় লিভারের প্রতি আনুগত্য বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত ছিল। আমাদের জিনে এই বিষয়টি ঢুকে গেছে। হিপনোটিস্ট লিডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার কথা মস্তিষ্ক মেনে নেয়। তিনি যখন সাবজেক্টকে ঘুমিয়ে পড়তে বলেন, সাবজেক্ট ঘুমিয়ে পড়ে। তিনি যখন সাবজেক্টকে বলেন, তুমি চেয়ারের সঙ্গে আটকে গেছ। সে আটকে যায়।
হিপনোটিজমের ঘটনায় মহসিন হলের ছাত্রমহলে আমি বিশেষ এক সমীহের স্থান দখল করলাম। ছাত্রদের প্রতিভা প্রদর্শন অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়ে এবং ডিআইটি ভবনে যখন টিভি কেন্দ্র ছিল সেখানে ম্যাজিক দেখিয়ে আমি ক্ষেত্রটা প্রস্তুত করে রেখেছিলাম।
আমাকে এখন আর কেউ ঘটায় না। আমি মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে মানুষের মাথার খুলি এনে চিকন সুতা দিয়ে আমার ঘরের এককোনায় ঝুলিয়ে দিলাম। দেয়ালের রঙ সাদা, সুতার রঙও সাদা। ব্ল্যাক আর্টের মতো তৈরি হলো। হঠাৎ দেখলে মনে হতো, মানুষের মাথার একটা খুলি শূন্যে ভাসছে। বেশ কয়েকজন এই দৃশ্য দেখে ছুটে ঘর থেকে বের হয়েছে। আর ঢোকেনি। [এক গভীর রাতে এই খুলি চাপা গলায় আমাকে ডাকল, এই ছেলে। এই। ভয়াবহ আতঙ্কে শরীর জমে গেল। পরদিনই আমি খুলি ফেরত দিয়ে এলাম। অন্য কোনো সময়ে এই গল্প বলা যাবে।]
