যমুনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, হরিকাকু আমার ভয় লাগছে। ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। আবারো হাত ইশারায় ডাকল। বিদ্যুৎ চমকানোর সময় ছায়ামূর্তি স্পষ্টই দেখতে পাওয়ার কথা। তখন কিন্তু দেখা যায় না। তখন ছায়ামূর্তি বড় কোনো গাছের আড়ালে চলে যায়।
যমুনা ছায়ামূর্তি অনুসরণ করতে করতে জঙ্গলের শেষ সীমানায় চলে এলো। ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখন সে আর যমুনাকে ইশারায় কাছে ডাকছে না। বরং আঙুলের ইশারায় বিশেষ এক দিকে যেতে বলছে। যমুনা ভীত গলায় বলল, হরিকাকু ভয় পাচ্ছি। ছায়ামূর্তি নড়ল না। জঙ্গলের উত্তর সীমানার দিকে আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস দিচ্ছে, ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। যমুনা পায়ে পায়ে উত্তর দিকে এগুচ্ছে। হঠাৎ তার কাছে মনে হচ্ছে, যেদিকে সে যাচ্ছে সেদিকে শুভ কিছু তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বনের বাইরে পা দিয়েই সে মাওলানা ইদরিসকে পেল। মাওলানার মাথায় ছাতা। হাতে হারিকেন। সারা শরীর কাদায় পানিতে মাখামাখি।
মাওলানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এত সহজে তোমারে পাব ভাবি নাই। আল্লাহপাকের মেহেরবানি পেয়ে গেছি। এত বড় জঙ্গল, কোথায় খুঁজব? চল যাই।
যমুনা বলল, কই যাব?
মাওলানা বললেন, আমার বাড়িতে যাবা। তোমার ভাবি সাব, আমার স্ত্রী আমারে পাঠায়েছে। সে তোমার ঘটনা শুনে মিজাজ খারাপ করেছে। যে জীবনে কোনোদিন উচা গলায় কথা বলে নাই সে আমাকে দিয়েছে ধমক। চিন্তা করেছ অবস্থা?
যমুনা অবাক হয়ে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বিচিত্ৰ মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটা এমনভাবে কথা বলছে যেন যমুনা তার অনেক দিনের চেনা।
মাওলানা বললেন, দাঁড়ায়া আছ কেন? চল রওনা দেই। তোমার ভাবি চিন্তাযুক্ত আছে। মেয়েছেলেরে বেশি সময় চিন্তার মধ্যে রাখা ঠিক না। পুরুষমানুষ দীর্ঘ সময় চিন্তায় থাকতে পারে। মেয়েরা পারে না। তোমার কি ভুখ লেগেছে?
হুঁ।
ঘরে যাবা। গরম পানি দিয়া গোসল দিবা, তারপরে গরম গরম খিচুড়ি খাবা। অমৃতের মতো লাগবে।
যমুনা বলল, আমাকে যে বাড়িতে নিতেছেন। আপনার অসুবিধা হবে না?
মাওলানা বললেন, অসুবিধা হলে হবে। কী আর করা! তোমারে জঙ্গলে ফালায়া গেলে তোমার ভাবি কী পরিমাণ বেজার হবে তুমি বুঝতেই পারবে না। আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিতে পারে। চল চল হাঁটা দাও। নাও ছাতিটা মাথার উপর ধর।
ছাতি লাগবে না।
তোমার কি গাল কেটেছে? রক্ত পড়তেছে।
হুঁ।
কোনো চিন্তা নেই। তোমার ভাবি দূর্বা পিষে মলম বানায়ে দিবে। গালে দিলেই আরাম। এইসব টোটকা সে ভালো জানে। বুদ্ধিমতী মেয়ে, যেখানে যা দেখে শিখে রাখে। পরে কাজে লাগে।
যমুনা রওনা হলো। অনেক দুঃখের পর তার এখন হাসি পাচ্ছে। পাগল একজন মানুষের পেছনে পেছনে সে যাচ্ছে যার ধারণা ঘরে তার মমতাময়ী স্ত্রী। তাদের ভালোবাসা সুখের সংসার। আহারে!
যমুনা অনেক সময় নিয়ে সাবান ডলে গরম পানিতে গোসল করল। নতুন সুতির শাড়ি পরল। সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাওলানার সঙ্গে খেতে বসল। যমুনা বলল, আপনি যে অচেনা মেয়েমানুষের সঙ্গে খেতে বসেছেন। আপনার পাপ হবে না? আপনাদের ধর্মে মেয়েছেলের মুখের দিকে তাকানো নিষেধ। ঠিক না?
মাওলানা বললেন, তা ঠিক। তবে রোজ কেয়ামতের সময় পুরুষ রমণীতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। তোমার এখন রোজ কেয়ামত।
আপনার স্ত্রী খাবেন না?
মাওলানা হতাশ গলায় বললেন, এই তার এক অভ্যাস। একা খাবে। আমার সামনে খেতে লজ্জা পায়। কতবার তাকে বলেছি— বউ, আমি তোমার স্বামী। স্বামীর সামনে কিসের লজ্জা? শোনে না।
যমুনা বলল, খিচুড়ি খুব স্বাদ হয়েছে। কে রোধেছে? আপনি না বৌদি?
তোমার ভাবি জোগাড়যন্ত্র করে দিয়েছে। আমি রেঁধেছি। যমুনা বলল, যে দয়া আপনি আমাকে করেছেন তারচেয়ে অনেক বেশি দয়া ভগবান যেন আপনাকে করেন।
মাওলানা ব্যস্ত হয়ে বললেন, আমি কিছুই করি নাই। যা করার তোমার ভাবি করেছে। অতি আচানক মেয়ে। কেউ বিপদে পড়েছে শুনলে অস্থির হয়ে যায়।
যমুনা অনেক রাতে ঘুমাতে গেল। পরিপাটি বিছানা। গায়ে দেয়ার ধোয়া চান্দর। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। হঠাৎ করেই যমুনার মনে হলো, তার মতো সুখী মেয়ে এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ঘুমের মধ্যে অতি আনন্দের একটা স্বপ্নও দেখল। স্বপ্নে সে এবং সুরেন বনে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে চার-পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে। মেয়েটা তাদেরই। সে বড় দুষ্টুমি করছে। এই এক গাছের আড়ালে চলে গেল। ধরতে গেলে অন্য এক গাছের আড়ালে। সুরেন কপট বিরক্ত ভাব করে বলল, মেয়েটাকে এত দুষ্ট বানায়েছ। কীভাবে? যমুনা বলল, একা একা মেয়ে মানুষ করছি, দুষ্ট তো হবেই। তুমি থাক কলিকাতায়, আমি মেয়ে নিয়ে জঙ্গলে বাস করি।
জঙ্গলে বাস কর কেন?
কেউ আমাকে বাড়িতে জায়গা দেয় না। জঙ্গলে বাস না করে করব কী? মাওলানা সাহেব তো তোমাকে জায়গা দিয়েছেন। টেলিগ্রামে খবর পেয়েছি।
ভুল খবর পেয়েছ। মাওলানা সাহেব এবং তার স্ত্রীকেও লোকজন তাড়িয়ে দিয়েছে। তিনিও এখন আমাদের সঙ্গে জঙ্গলে থাকেন। জঙ্গলে আমরা ঘর বানিয়েছি। কী যে সুন্দর ঘর। চল তোমারে দেখায়ে নিয়ে আসি।
আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের করা। আমরা মেয়েটাকে ফেলে ঘর দেখতে যাব, সে যাবে হারিয়ে। আরেক যন্ত্রণা হবে।
আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যমুনা মাওলানা ইদরিসের বাড়িতে থাকছে। এ নিয়ে বাহ্মণপুরে কোনো সমস্যা হলো না। মনে হলো মেয়েটার গতি হয়েছে এই ভেবে সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এক গভীর রাতে দেখা গেল মাওলানার বাড়ির উঠানে টিনের এক ট্রাংক। ট্রাংকভর্তি যমুনার জিনিসপত্র। শাড়ি, চুড়ি, গায়ের চাদর। স্যান্ডেল। তবে মাওলানা সামান্য বিপদে পড়ল। মুসুল্লিরা ঠিক করল তার পেছনে কেউ নামাজে দাঁড়াবে না। পাগল মানুষ ইমামতি করতে পারে না। তার পেছনে নামাজে দাড়ানো নাজায়েজ।
