সময় ১৯০৫

উৎসর্গ

মেহের আফরোজ শাওন

পরম করুণাময় ত্ৰিভুবনের শ্রেষ্ঠ উপহার তাকে দিয়েছেন। তার কোলভর্তি নিষাদ নামের কোমল জোছনা। আমার মতো অভাজন তাকে কী দিতে পারে? আমি দিলাম। মধ্যাহ্ন। তার কোলে জোছনা, মাথার উপর মধ্যাহ্ন। খারাপ কী?

ভূমিকা

আমার সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা তার নিজের লেখালেখির একটা নাম দিয়েছে- ‘আবজাব’। সে যা-ই লেখে তা-ই নাকি আবজাব! আমি আমার লেখার আলাদা কোনো নাম দিতে পারলে খুশি হতাম। যেমন খুশি সাজো’র মতো যেমন খুশি লেখা। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সে-রকমই। আমি লিখি নিজের খুশিতে। আমার লেখায় সমাজ, রাজনীতি, কাল, মহান বোধ (!) এইসব অতি প্রয়োজনীয় (?) বিষয়গুলি এসেছে কি আসে নি তা নিয়ে কখনো মাথা ঘামাই নি। ইদানীং মনে হয়— আমার কোনো সমস্যা হয়েছে। হয়তোবা ব্রেনের কোথাও শর্ট সার্কিট হয়েছে। যে-কোনো লেখায় হাত দিলেই মনে হয়- চেষ্টা করে দেখি সময়টাকে ধরা যায় কি-না। মধ্যাহেও একই ব্যাপার হয়েছে। ১৯০৫ সনে কাহিনী শুরু করে এগুতে চেষ্টা করেছি। পাঠকরা চমকে উঠবেন না। আমি ইতিহাসের বই লিখছি না। গল্পকার হিসেবে গল্পই বলছি। তারপরেও…

হুমায়ূন আহমেদ
নুহাশপল্লী, গাজীপুর

০১.

হরিচরণ সাহা তার পাকাবাড়ির পেছনে পুকুরঘাটে বসে আছেন।

তাঁর বয়স পঞ্চাশ। শরীর শক্ত। গড়পড়তা মানুষের তুলনায় বেশ লম্বা বলেই হাঁটার সময় কিংবা বসে থাকার সময় ঝুকে বসেন। তাঁকে তখন ধনুকের মতো দেখায়। তার মাথাভর্তি ধবধবে শাদা চুল। হঠাৎ হঠাৎ তিনি চুলে কলপ দেন, তখন তাকে যুবাপুরুষের মতো দেখায়। তার পরনে শান্তিপুরী ধুতি। গরমের কারণে ধুতি লুঙ্গির মতো পরেছেন। খালি গা। তাঁর গাত্ৰবৰ্ণ শ্যামলা। আজ কোনো এক বিচিত্র কারণে তাকে ফর্সা দেখাচ্ছে।

সকাল দশটার মতো বাজে। এই সময়ে হরিচরণ সোহাগগঞ্জ বাজারে তার পাটের আড়তে বসেন। বাজারে তার তিনটা ঘর আছে। পাটের আড়াতের ঘর। তুলনামূলকভাবে ছোট। এই ঘরের গদিতে বসতেই তাঁর ভালো লাগে। এখান থেকে নদীর একটা অংশ দেখা যায়। নদীর নাম বড়গাঙ। বর্ষায় এই নদী কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। বড় বড় লঞ্চ নিয়মিত আনাগোনা করে। তারা কারণে অকারণে ‘ভো’ বাজায়। সেই শব্দ শুনতেও তার ভালো লাগে। আজ বাজারে যাচ্ছেন না, কারণ তার মন সামান্য বিক্ষিপ্ত। পুকুরঘাটে কিছুক্ষণ বসে থাকলে মন শান্ত হবে- এই আশায় তিনি বসে আছেন। ঘাট বাধানো। তিনি নিজেই গৌরীপুর থেকে কারিগর। এনে ঘাট বাঁধিয়েছেন। কারিগরের কাজ তাঁর পছন্দ হয়েছে। ঘাটের ধাপ সে যথেষ্ট পরিমাণে চওড়া করেছে। ভদ্রমাসের গরমে অতিষ্ঠ হলে তিনি এই ঘাটে এসে শুয়ে থাকেন। ঠাণ্ডা পাথরের স্পর্শ বড় ভালো লাগে। পাথরের গা থেকে এক ধরনের গন্ধ এসে তার নাকে লাগে। পাথরের কোনো গন্ধ থাকে না, কিন্তু এই গন্ধ কীভাবে আসে? বিষয়টা নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে চিন্তাও করেন।

এখন আষাঢ় মাসের শুরু। গতরাতে বিরামহীন বৃষ্টি পড়েছে বলে আজ আবহাওয়া শীতল। আষাঢ় মাসের কড়া রোদ অবশ্যি আছে। সেই রোদ তাকে স্পর্শ করছে না। ঘাটের সঙ্গে লাগোয়া বাদাম গাছ তাকে ছায়া দিয়ে আছে। এই গাছের পাতা কাঠগোলাপের পাতার মতো ছায়াদায়িনী।

হরিচরণের মনের বিক্ষিপ্ত ভাব কমল না, বরং বাড়ল। এই সঙ্গে তার সামান্য শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। শ্বাসকষ্টের উপসর্গ কিছুদিন হলো শুরু হয়েছে। মন-মেজাজ ঠিক না থাকলেই শ্বাসকষ্ট হয়। ঘুমের অসুবিধা হলে শ্বাসকষ্ট হয়। কালরাতে তাঁর ঘুমের কোনো অসুবিধা হয় নি। সারারাত টিনের চালে বৃষ্টি পড়েছে। শীত শীত ভাব ছিল। তিনি পাতলা সুজনি দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখে সুখনিদ্রায় গেছেন। তবে ঘুমের কোনো এক পর্যায়ে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নটাই তার মন বিক্ষিপ্ত হবার একমাত্র কারণ।

স্বপ্নে তিনি চার-পাঁচ বছর বয়সি একটি শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুরছেন। শিশুর মাথায় সোনার মুকুট। তার গাত্রবর্ণ ঘন নীল। স্বপ্নে তার কাছে মনে হলো, শিশুটি তারই সন্তান। আবার এও মনে হলো, এই শিশু শ্ৰীকৃষ্ণ। তাঁর নিজের সন্তান শ্ৰীকৃষ্ণ হতে পারে না— স্বপ্নে এটা মনে হলো না। কোলের শিশুটি একসময় বলল, ব্যথা। তিনি বললেন, কোথায় ব্যথা? সে তার হাত দেখাল। হাতটা কনুইয়ের কাছে কাটা, সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। রক্তের রঙও নীল। তিনি রক্ত বন্ধ করার জন্যে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তখন ঘুম ভাঙল। তাঁর বিস্ময়ের সীমা রইল না। হরিচরণের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। প্রথম যৌবনে একটা মেয়ে হয়েছিল। তিন বছর বয়সে মেয়েটা দিঘিতে ড়ুবে মারা যায়। পুরোহিতের কী এক বিধানে মেয়েটাকে দাহ করা হয় নি। মুসলমানদের মতো কবর দেয়া হয়েছে। যেখানে কবর দেয়া হয়েছে সেখানে তিনি একটা শিউলি গাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছ আজ এক মহীরুহ। এই অঞ্চলে এত বড় শিউলি গাছ আছে বলে তিনি জানেন না। তার মেয়ের নামও ছিল শিউলি। এই গাছ বৎসরের পর বৎসর হলুদ বেঁটার শাদা ফুল ফুটিয়েই যাচ্ছে।

প্রথম সন্তানের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন কোনো সন্তানাদি না হওয়ায় তিনি আরেকটি বিবাহ করেন। সেই ঘরেও কোনো সন্তান হয় নি। হরিচরণের দুই স্ত্রীই গত হয়েছেন। তাঁর বিশাল পাকাবাড়ি এখন শূন্য। পাকাবাড়িতে তিনি এখন বাসও করেন না। পাকাবাড়ির দক্ষিণে টিনের দোচালা বানিয়েছেন। টিনের ঘর রাতে দ্রুত শীতল হয়, ঘুমাতে আরাম। বর্ষায় টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ হয়। সেই শব্দ তার কানে আরাম দেয়।

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্যকে আসতে দেখা যাচ্ছে। হরিচরণ স্বপ্ন বিষয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে চান বলে খবর দিয়েছেন। অম্বিকা ভট্টাচার্য এই অঞ্চলের একমাত্র ব্ৰাহ্মণ। শাস্ত্ৰ জানেন। পূজাপাঠ করেন। তাঁর বয়স হরিচরণের চেয়ে কম হলেও তিনি বুড়িয়ে গেছেন। শরীর থলথলে হয়েছে। হাঁটেন কুজো হয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে। তাঁর বাড়ি হরিচরণের বাড়ি থেকে খুব দূরে না, দশ-বারো মিনিটের পথ। এই পথ পাড়ি দিয়েই তিনি ক্লান্ত । ঘাটের পাশে তাঁর জন্যে রাখা কাঠের চেয়ারে বসতে বসতে তিনি বললেন, আগে জল খাওয়াও, তারপর কথা।

জলের সঙ্গে কিছু মিষ্টান্ন দিব?

অবশ্যই। মিষ্টান্ন বিনা জলপান নিষেধ, জানো না? সামান্য গুড় হলেও মুখে দিতে হয়। তবে ফল নাস্তি। জলপানের পরে ফল খাওয়া যাবে না।

অম্বিকা ভট্টাচার্য মুখ গভীর করে হরিচরণের স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনলেন। কিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, স্বপ্নটা ভালো না।

হরিচরণ বললেন, ভালো না কেন?

অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, উঁচু বংশের কেউ যদি দেবদেবী কোলে নেয়া দেখে, তাহলে তার জন্যে উত্তম। সৌভাগ্য এবং রাজানুগ্রহ। নিম্নবংশীয় কেউ দেখলে তার জন্যে দুৰ্ভাগ্য। সে হবে অপমানিত। রাজরোষের শিকার। তার ভাগ্যে অর্থনাশের যোগও আছে।

বলেন কী!

শাস্ত্ৰমতে ব্যাখ্যা করলাম। তোমার পছন্দ না হলেও কিছু করার নাই। যাহা সত্য তাহা সত্য। তাছাড়া তুমি দেবগাত্রে রক্তপাত দেখেছ, এর অর্থ আরো খারাপ।

কী খারাপ?

রক্তপাত হয় এমন কোনো রোগ-ব্যাধি তোমার হতে পারে। যেমন ধর, যক্ষ্মা। শান্তি সস্থায়নের ব্যবস্থা কর। বিপদনাশিনী পূজার ব্যবস্থা কর। অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, আমি কী অপরাধ করলাম?

অম্বিকা বললেন, দেবতা শ্ৰীকৃষ্ণকে কোলে নিয়ে ঘুরেছ, এটাই অপরাধ। অপরাধ দুই প্রকার। জ্ঞান অপরাধ, অজ্ঞান অপরাধ। তুমি করেছ অজ্ঞান অপরাধ।

ও আচ্ছা।

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য উঠে দাঁড়াতে দাড়াতে বললেন, পূজা কবে করতে চাও আমাকে জানাবে। যত শীঘ্ৰ হয় তত ভালো। আগামী বুধবার ভালো দিন আছে। চাঁদের নবমী।

হরিচরণ বললেন, পূজা বুধবারেই করবেন। খরচপাতি যেরকম বলবেন সেরকম করব।

ভালো। ঐদিন তুমি উপবাস করবে। নিরন্তু উপবাস। জলপানও করবে না। সন্ধ্যাবেলা পূজা হবে। পূজার পর উপবাস ভঙ্গ করবে।

হরিচরণ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।

বেলা বেড়েছে। সকালে আকাশ মেঘমুক্ত ছিল। এখন মেঘ করতে শুরু করছে। দিঘির পানি এতক্ষণ নীল ছিল, এখন কালচে দেখাচ্ছে। বড় কোনো মাছ ঘাই দিল। হরিচরণ কৌতূহলী হয়ে তাকালেন। পুকুরে অনেক বড় বড় মাছ আছে। হরিচরণের বর্শি বাইবার শখ আছে। অনেকদিন বর্শি নিয়ে বসা হয় না। আজ কি বসবেন? মুকুন্দ ঘরেই আছে। তাকে বললেই সে নিমিষের মধ্যে চাড় ফেলার ব্যবস্থা করবে। পিঁপড়ার ডিম এনে দিবে। পিপড়ার ডিম বড় মাছের ভালো আধার। হরিচরণের মনে হলো, হুইল বর্শি নিয়ে বসলেই স্বপ্নটা মাথা থেকে দূর হবে। স্বপ্ন নিয়ে এত অস্থির হবার কিছু নাই। স্বপ্ন অস্থির মস্তিষ্কের ফসল। অস্থিরমতিরাই স্বপ্ন দেখে। আলস্য অস্থিরতা তৈরি করে। বর্শি বাওয়াও এক ধরনের আলস্য, তারপরেও দৃষ্টি কাজে ব্যস্ত থাকে। ফাৎনার দিকে তাকিয়ে থাকাও এক ধরনের কাজ। মুকুন্দকে ডাকতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল। চার-পাঁচ বছর বয়সি একটা ছেলে পেয়ারা বাগানে একা হাঁটাহাঁটি করছে। ছেলেটা তার দিকে পেছন ফিরে আছে বলে তিনি তার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না।

ছেলেটার গাত্ৰবৰ্ণ গৌর। খালি গা। পরনে লালরঙের। হাফপ্যান্ট। ঘন সবুজের ভেতর তা লালপ্যান্ট ঝকমক করছে। তিনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকেই উঁচু গলায় মুকুন্দকে ডাকলেন। ছেলেটা চট করে তাঁর দিকে তাকাল। তিনি মোহিত হয়ে গেলেন। কী সুন্দর চেহারা! বড় বড় চোখ। চোখভর্তি মায়া। খাড়া নাক। চোখের ঘন পল্লব এতদূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি হাত ইশারায় ছেলেটাকে ডাকলেন। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পায়ে পায়ে আসতে লাগল। তবে পাশে এসে দাঁড়াল না। একটু দূরে জামগাছের নিচে থমকে দাঁড়াল।

মুকুন্দ তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি মুকুন্দকে বললেন, বর্শি বাইব, ব্যবস্থা কর।

মুকুন্দ বলল, জে আজ্ঞে।

এই ছেলেটা কে?

সুলেমানের পুলা।

মুসলমান?

জে আজ্ঞে।

সুলেমানটা কে?

কাঠমিস্ত্রি। আপনের ঘরের দরজা সারাই করল।

ছেলেটা তো দেখতে রাজপুত্রের মতো!

ছেলে হইছে মায়ের মতো। মায়ের রূপ দেখার মতো। বেশি রূপ হইলে যা হয়। জিনে ধরা। জংলায় মংলায় একলা ঘুরে। গীত গায়। আমরার বাগানে মেলা দিন আসছে।

আমি তো দেখি নাই।

জিনে ধরা মেয়ে। চউক্ষের পলকে সাইরা যায়। দেখবেন ক্যামনে।

ঠিক আছে তুমি যাও। পিঁপড়ার ডিম আর কী কী লাগে ব্যবস্থা কর। পুকুরে চাড় ফেল। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে, মাছ আধার খাবে না। বৃষ্টি হলেই মাছ আধার খাওয়া বন্ধ করে। কী কারণ কে জানে।

মুকুন্দ দ্রুত চলে গেল। হরিচরণ আবার তাকালেন ছেলেটার দিকে। মাটি থেকে কী যেন কুড়িয়ে মুখে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে কালোজাম। কিন্তু জােম এখনো পাকে নি। গাছের নিচে পাকা জাম পড়ে থাকার কথা না। হরিচরণ এইবার গলা উচিয়ে ছেলেটাকে ডাকলেন, খোকা, এদিকে আস।

ছেলেটা ছোট ছোট পা ফেলে আসছে। দূর থেকে তাকে যতটা সুন্দর মনে হচ্ছিল এখন তার চেয়েও সুন্দর লাগছে। তার কপালের একপাশে কাজলের ফোঁটা। তার মা নজর না লাগার ব্যবস্থা করেছেন। ঠিকই করেছেন। নজর লাগার মতোই ছেলে। বয়স কত হবে?

কী নাম তোমার?

ছেলে জবাব দিল না।

নাম বলবে না?

সে না-সূচক মাথা নাড়ল।

কী খাচ্ছ?

ছেলে হা করে তার মুখ দেখাল। মুখের ভেতর জামের লাল একটা বিচি। তিনি বললেন, সন্দেশ খাবে?

ছেলেটা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তিনি ডাকলেন, মুকুন্দ! মুকুন্দ!

মুকুন্দ আশেপাশে নেই। সে পিপড়ার ডিমের সন্ধানে চলে গেছে। পাকা বাড়িতে বৃদ্ধা মায়ালতা থাকেন। হরিচরণের দূরসম্পর্কের বিধবা জেঠি। তিনি কানে শোনেন না। শুনলেও ঘর থেকে বের হবেন না। রান্নার জন্যে একজন ঠাকুর আছে। সে বাজারে গেছে মাছের সন্ধানে। হরিচরণ বললেন, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাক। কোথাও যাবে না। আমি সন্দেশ নিয়ে আসছি।

ছেলেটা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। হরিচরণের প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে ছেলেটাকে কোলে নিতে। কোলে নেবার জন্যে সময়টা ভালো। আশেপাশে কেউ নেই। কেউ দেখে ফেলবে না। তিনি এক মুসলমান কাঠমিস্ত্রির ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন— এই দৃশ্য হাস্যকর। ধর্মেও নিশ্চয়ই বাধা আছে। যবনপুত্ৰ অস্পৃশ্য হবার কথা। ব্ৰাহ্মণ, ক্ষত্ৰিয়,বৈশ্য, শূদ্ৰ। শূদ্রের নিচে যবনের অবস্থান।

হরিচরণ সন্দেশ এবং এক গ্রাস পানি হাতে ফিরলেন। ছেলেটা যেখানে দাড়িয়ে থাকার কথা সেখানে নেই। জামতলাতেও নেই। পেয়ারা বাগানেও নেই। দিঘির পানিতে ড়ুবে যায় নি তো? তাঁর বুক ধ্বক করে উঠল। তিনি দিঘির দিকে তাকালেন। দিঘির জল শান্ত। সবুজ শ্যাওলার যে চাদর দিঘি। জুড়ে ছড়িয়ে আছে সে চাদরে কোনো ভাঙচুর নেই।

ছেলেটার নাম জানা থাকলে তাকে নাম ধরে ডাকা যেত। তিনি নাম জানেন না। এই কাজটা ভুল হয়েছে। দুটা পিঁপড়া যখন মুখোমুখি হয় তখন তারা কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা করে। বেশিরভাগ সময়ই মানুষরা এই কাজ করে না। একজন আরেকজনকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তিনি পেয়ারা বাগানের দিকে গেলেন। পেয়ারা বাগানের পরই ঘন বেতবোপ। ছেলেটা বেতঝোপের ওপাশে যায় নি তো?

সেখানেও তাকে পাওয়া গেল না। আকাশের মেঘ ঘন হয়েছে। যে-কোনো মুহুর্তে বৃষ্টি নামবে। হরিচরণ ঘাটের কাছে ফিরে গেলেন। তার হাতে সন্দেশ। সন্দেশ থেকে অতি মিষ্টি গন্ধ আসছে। দারুচিনির গন্ধ না-কি? সন্দেশে গরম মসল্লা দেয়া নিষেধ। দেবীর ভোগে সন্দেশ দেয়া হয়। সেই সন্দেশ বিশুদ্ধ হতে হয়। এলাচ দারুচিনি দিয়ে বিশুদ্ধতা নষ্ট করা যায় না। তাহলে গন্ধটা কিসের? দুধের গন্ধ? ঘন দুধের কি আলাদা গন্ধ আছে?

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আষাঢ় মাসের বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে ভিজিয়ে দেবে। দৌড়ে ঘরে যেতে ইচ্ছা করছে না। তিনি বৃষ্টিতে ভিজছেন। এই বয়সে বৃষ্টিতে ভেজার ফল শুভ হবে না। তারপরেও তিনি ঘাট ছাড়তে পারলেন না। তার কাছে মনে হলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবেন ছেলেটা ভিজতে ভিজতে আসছে।

মুকুন্দ কলাপাতার ঠোঙ্গায় পিপড়ার ডিম নিয়ে এসেছে। সে অবাক হয়ে বলল, বিষ্টিত ভিজেন? অসুখ বাধাইবেন। ঘরে যান।

হরিচরণ বললেন, যাব একটু পরে। তুমি সন্দেশ দুটা ঐ ছেলেটারে দিয়া আসি।

কোন ছেলে?

কাঠমিস্ত্রির ছেলে। আজ আর বর্শি নিয়ে বসব না।

মুকুন্দ অনিচ্ছার সঙ্গে যাচ্ছে। ভিজতে ভিজতে যাচ্ছে। তার এক হাতে পিপড়ার ডিম অন্য হাতে সন্দেশ। মাছ ও মানুষের খাদ্য। হরিচরণ হঠাৎ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন, ডিমগুলির জন্যে তার খারাপ লাগছে। এই ডিম থেকে আর কোনোদিন পিঁপড়ার জন্ম হবে না। তারা পৃথিবীর অতি আশ্চর্য রূপ-রস-গন্ধের কিছুই জানবে না। বড়ই আফসোসের কথা। তিনি কি মুকুন্দকে বলবেন ডিমগুলি যেখান থেকে এনেছে সেখানে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে? হয়তো এখনো সময় আছে। জায়গামতো পৌঁছে দিলে কিছু ডিম থেকে পিঁপড়া জন্মাবে।

মুকুন্দ অনেকদূর চলে গেছে, এখন ডাকলে সে শুনতে পাবে না। তবু তিনি ডাকলেন, মুকুন্দ! মুকুন্দ!

মুকুন্দ শুনতে পেল না। কিন্তু কেউ একজন হাসল। হরিচরণ চমকে হাসির শব্দ যেদিক থেকে আসছে সেদিকে তাকালেন। কী আশ্চর্য, লাল প্যান্ট পরা ছেলেটা। সে দিঘির অন্যপ্রান্তে। পাড় বেয়ে পানির দিকে নামছে। বৃষ্টির পানিতে দিঘির পাড় পিচ্ছিল হয়ে আছে। ছেলেটা কি একটা দুর্ঘটনা ঘটাবে? পা পিছলে। পানিতে পড়ে যাবে? তিনি ডাকলেন, এই, এই— উঠে আস। উঠে আস বললাম। এই ছেলে, এই!

ছেলেটা তাঁকে দেখল। কিন্তু তার দৃষ্টি দিঘির সবুজ পানিতে। তার হাতে কাদামাখা পেয়ারা। সে পেয়ারা পানিতে ধুবে। তিনি উঁচু গলায় আবারো ডাকলেন, এই ছেলে- এই। তখনি ঝাঁপ করে শব্দ হলো। কিছুক্ষণ ছেলেটির হাত পানির উপর দেখা গেল। তারপরেই সেই হাত তলিয়ে গেল। হরিচরণ পুকুরে ঝাঁপ দিলেন।

হরিচরণ কীভাবে দিঘির অন্যপ্রান্তে পৌঁছলেন, কীভাবে ছেলেটাকে পানি থেকে তুললেন তা তিনি জানেন না। শুধু এইটুকু জানেন- পানি থেকে তোলার পর দেখা গেল, ছেলেটার ডানহাত অনেকখানি কেটেছে। সেখান থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। স্বপ্নে শ্ৰীকৃষ্ণের হাত কেটে এইভাবেই রক্ত পড়ছিল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ও বাবু! বেঁচে আছিস তো! বলেই পুকুরপাড়ে জ্ঞান হারালেন।

তাঁর জ্ঞান ফিরল নিজের খাটে গভীর রাতে। তাঁর চারপাশে মানুষজন ভিড় করেছে। নেত্রকোনা সদর থেকে এলএমএফ ডাক্তার সতীশ বাবু এসেছেন। তিনি বুকে স্টেথিসকোপ ধরে আছেন। পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধা মায়ালতার কান্না শোনা যাচ্ছে। বৃদ্ধ কারণে অকারণে কঁদে। হরিচরণ বললেন, ছেলেটা কি বেঁচে আছে?

মুকুন্দ বলল, বেঁচে আছে।

ছেলেটার নাম কী?

জহির।

জহির তাহলে বেঁচে গেছে?

জে আজ্ঞে।

হরিচরণ বললেন, ঠাকুরঘরের তালা খোল। ঘরে বাতি দাও। ঠাকুরঘরে যাব।

মুকুন্দ বিনীতভাবে বলল, সকালে যান। এখন শুয়ে থাকেন। আপনার শরীর অত্যধিক খারাপ।

ঠাকুরঘরের তালা খোল।

গভীর রাতে ঠাকুরঘরের দরজা খোলা হলো। প্ৰদীপ জ্বালানো হলো। ছোট্ট ঘর। শ্বেতপাথরের জলচৌকিতে কষ্টিপাথরের রাধা-কৃষ্ণ। কৃষ্ণ বাঁশি ধরে আছেন। তাঁর কাধে মাথা রেখে লীলাময় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন শ্ৰী রাধিকা।

হরিচরণ পদ্মাসন হয়ে বসলেন। মুকুন্দকে বললেন, ছেলেটাকে নিয়ে আস, আমি একটু দেখব।

ঠাকুরঘরে নিয়ে আসব? কী বলেন এইসব!

হ্যাঁ, ঠাকুরঘরে নিয়ে আসা। সে আমার কোলে বসবে।

মুসলমান ছেলে তো!

হোক মুসলমান ছেলে।

জহিরের মা জহিরকে কোলে নিয়ে এসেছে। সে তার সবুজ শাড়ি দিয়ে ছেলেকে ঢেকে রেখেছে। তার চোখে উদ্বেগ। বাড়িতে এত লোকজন দেখে হ’কচাকিয়ে গেছে। হরিচরণ উঠানের জলচৌকিতে বসেছেন। তাঁর নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। শরীর ঘামিছে। তিনি জহিরের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাগো! আপনার ছেলে কি ভালো আছে?

জহিরের মা জবাব না দিয়ে ছেলেকে আরো ভালো করে শাড়ি দিয়ে ঢাকল। হরিচরণ বললেন, আমার এখানে ডাক্তার আছে। ছেলেকে দেন, ডাক্তার দেখুক।

আমার ছেলে ভালো আছে।

হরিচরণ মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনেও মুগ্ধ হলেন। কী সুরেলা কণ্ঠ! ঈশ্বর যার প্রতি করুণা করেন। সর্ব বিষয়েই করেন। মেয়েটি খালি পায়ে উঠানে দাড়িয়ে আছে। হরিচরণের মনে হলো, মেয়েটির পায়ের কারণেই উঠান ঝলমল করছে। এত রূপবতী কেউ কি এর আগে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে?

মাগো! আপনার ছেলেকে আমার কোলে দেন। আপনার ছেলে কোলে নিয়ে আমি একটা প্রার্থনা করব।

হরিচরণ ঠাকুরঘরে বসে আছেন। তাঁর কোলে জহির। জহির ঘুমাচ্ছে। শান্তির ঘুম। হরিচরণ হাতজোড় করে বললেন, হে পরম পিতা। হে দয়াময়। আজ রাতে আমি তোমার কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করতে চাই। আমি আমার এক জীবনে যা উপার্জন করেছি, সবই জনহিতকর কার্যে দান করব। আমি যেন আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারি এইটুকু শুধু তুমি দেখবে। আমি পৃথিবীতে নগ্ন অবস্থায় এসেছিলাম, পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বিদায় নিব।

হরিচরণের চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।

পরদিন সকালেই একটি মুসলমান ছেলেকে ঠাকুরঘরে প্রবেশ করানোর অপরাধে হরিচরণকে সমাজচ্যুত করা হলো। সোনাদিয়ার জমিদার শশাংক পালের বৈঠকখানায় সমাজপতিদের বৈঠক বসল। বৈঠকের প্রধান বক্তা ন্যায়রত্ন রামনিধি চট্টোপাধ্যায়। তিনি শাস্ত্ৰ ভালো জানেন। তাঁকে আনা হয়েছে শ্যামগঞ্জ থেকে। শশাংক পাল ঘোড়া পাঠিয়ে আনিয়েছেন। ধর্মবিষয়ক অনাচার তিনি নিতেই পারেন না। ন্যায়রত্ন রামনিধি চট্টোপাধ্যায় কঠিন কঠিন কথা বললেন। মহাভারতের কিছু কাহিনীও বললেন যার সঙ্গে হরিচরণের সমস্যার কোনো সম্পর্কই নেই। সুশোভনার গর্ভে পরিক্ষীতের তিন পুত্ৰ— শল, দল এবং বলের গল্প। শল রাজা হয়েছেন, তিনি ব্ৰাহ্মণ বামদেবের কাছ থেকে দুই ঘোড়া ধার হিসেবে নিয়ে এসেছেন। হরিণ শিকারের জন্যে। হরিণ শিকার হলো কিন্তু রাজা শল দুই ঘোড়া ফেরত পাঠালেন না। বামদেব যখন ঘোড়া ফেরত চাইলেন, তখন রাজা শল বললেন, আপনার ঘোড়ার প্রয়োজন কী? বেদই তো আপনার বাহন।

গল্প শেষ করে ন্যায়রত্ন কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে চোখ খুলে বললেন, হরিচরণের সর্বনিম্ন শাস্তি সমাজচ্যুতি।

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য ক্ষীণস্বরে প্রায়শ্চিত্যের কথা বলে ধমক খেলেন।

ন্যায়রত্ব বিরক্ত গলায় বললেন, তুমি পূজারি বামুন শাস্ত্ৰ জানো না বলে প্ৰায়শ্চিত্যের কথা বললা। ঠাকুরঘর যে অপবিত্র করেছে তার আবার প্রায়শ্চিত্য কী?

অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, ঠিক ঠিক। এই বিষয়টা মাথায় ছিল না।

ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন,

কালী করালী চ মনোজবা চ
সুলোহিতা যা চ সুব্ধূমাবর্ণ।
স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচি চি দেবী
লেলায়মানা ইতি সপ্তজিহবাঃ।

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য আবারো বললেন, ঠিক ঠিক।

ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, ব্যাখ্যা করব?

অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, আমি প্রয়োজন দেখি না। বিধান শুধু বলে দেন।

ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, বিধান আগে একবার বলেছি। আরেকবার বলি। বিধান হলো, হরিচরণ সমাজচ্যুত। হরিচরণের সঙ্গে যারা বাস করে তারাও সমাজচ্যুত। তবে তাদের জন্যে প্ৰায়শ্চিত্যের সুযোগ আছে। তারা টাটকা গোবর ভক্ষণ করে এবং সাধ্যমতো দান করে শুদ্ধ হতে পারে। অন্যথায় তাদের সবার জন্য ধোপা-নাপিত বন্ধ। সামাজিক আচার বন্ধ।

হরিচরণ হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন। হরিচরণের পেছনে হাতজোড় করে মুকন্দি দাঁড়িয়ে আছে। সে সামান্য কাঁপছে। তার চোখ ভেজা। মুকন্দের শব্দ করে কাদার ইচ্ছা। সে ভয়ে কাঁদতে পারছে না। ন্যায়রত্ন বললেন, হরিচরণ, তুমি কিছু বলতে চাও?

হরিচরণ না-সূচক মাথা নাড়লেন।

অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, হরিচরণের ঘরে রাধা-কৃষ্ণ আছে। ঠাকুর পূজা হয়। এর কী বিধান?

ন্যায়রত্ন বললেন, মূর্তি সরিয়ে নিতে হবে। গাভী যদি থাকে গাভী নিয়ে নিতে হবে। সে গাভী সেবা করতে পারবে না।

হরিচরণ বললেন, অন্য জাতের মানুষও গাভী পালন করে। আমার জাত গিয়েছে, আমি গাভী পালন করতে পারব না কেন?

শশাংক পাল হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললেন, ভালো যুক্তি। অতি উত্তম যুক্তি।

ন্যায়রত্ন বললেন, ধর্ম যুক্তিতে চলে না। ধর্ম চলে বিশ্বাসে। ধর্মের সপ্ত বাহনের এক বাহন বিশ্বাস।

শশাংক পাল বললেন, এইটাও ভালো যুক্তি।

ন্যায়রত্ন বললেন, ধর্ম থেকে যে পতিত তার স্থান পাতালের রসাতলে। পাতালের সাত স্তর, যেমন— অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। রসাতল হলো পাতালের ষষ্ঠ তল। এই তলে যে পতিত, তার গতি নাই।

হরিচরণ বললেন, পাতালের সপ্তম তলে কার স্থান?

মাতৃহন্তার স্থান। যাই হোক, তোমার সঙ্গে শাস্ত্ৰ আলোচনায় আমি যাব না। আমার বিধান আমি দিলাম। তুমি ধন্যবান ব্যক্তি। প্রয়োজনে কাশি থেকে নতুন বিধান নিয়া আসতে পার।

হরিচরণ বললেন, আমি কোনো বিধান আনিব না। আপনার বিধান শিরোধার্য।

শশাংক পাল ইকোয় লম্বা টান দিয়ে বললেন, যাগযজ্ঞ করে কিছু করা যায় না? সপ্তাহব্যাপী যাগযজ্ঞ, নাম সংকীর্তন। হরিচরণ বিত্তবান। সে পারবে।

ন্যায়রত্ন কঠিন গলায় বললেন, না। এই বিষয়ে বাক্যালাপে সময় নষ্ট করা অর্থহীন।

শশাংক পাল বললেন, এটাও ঠিক কথা। তুচ্ছ বিষয়ে সময় হরণ।

 

হরিচরণ জাতিচ্যুত হলেন সকালে। দুপুরের মধ্যে তাঁর ঘর জনশূন্য হয়ে গেল। মুকন্দ চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় হলো। তাকে তিনি দুটো দুধের গাই দিয়ে দিলেন। রান্নাবান্নার জন্যে যে মৈথিলি ঠাকুর ছিল, সে চুলা ভেঙে চলে গেল। নিয়ম রক্ষা করল। পতিতজনের ঘরের চুলা ভেঙে দেয়া নিয়ম। যেকোনো একটা ঘরের চালাও তুলে ফেলতে হয়। আত্মীয়স্বজনরা সেই চালা মাড়িয়ে চলে যাবে। হরিচরণের আত্মীয়স্বজন কেউ নেই বলে চালা ভাঙা হলো না।

বৃদ্ধা মায়ালতাকে সন্ধ্যার মধ্যে তিনি নৌকায় কাশি পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। মায়ালতা সঙ্গে করে কষ্টিপাথরের রাধাকৃষ্ণ মূর্তি নিয়ে গেলেন। বিদায়ের সময় হরিচরণ জেঠিমা’কে শেষ প্ৰণাম করতে গেলেন। মায়ালতা আঁৎকে উঠে বললেন, খবরদার পায়ে হাত দিবি না। তুই ড়ুবছস, আমারে ড়ুবাইস না। মায়ালতার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে হরিচরণের বিশাল বাড়ি হঠাৎ খালি হয়ে গেল।

সন্ধ্যা মিলাতে না মিলাতেই বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাস। হরিচরণ পাকা দালানের একপাশে বেতের ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে বৃষ্টি দেখছেন। তামাক খেতে ইচ্ছা করছে, তামাক সাজাবার কেউ নেই। তামাক নিজেকেই সাজাতে হবে। ঘর অন্ধকার। সন্ধ্যার বাতি জ্বালানো প্রয়োজন। কোথায় হারিকেন কোথায় কেরোসিন তিনি কিছুই জানেন না।

বাড়ির পেছনে ছপছপ শব্দ হচ্ছে। ভূত-প্ৰেত কি-না কে বলবে! ভূতপ্ৰেতরা শূন্যবাড়ির দখল নিয়ে নেয়— এমন জনশ্রুতি আছে। হাসনাহেনার ঝোপের কাছে সরসর শব্দ হচ্ছে। সাপ বের হয়েছে না-কি? শূন্যবাড়িতে ভূত প্রেতের সঙ্গে সাপও ঢোকে। বাড়ি পুরোপুরি জনশূন্য হলে আসে বাদুড়। তারা মহানন্দে বাড়ির কড়ি বর্গ ধরে মাথা ঝুলিয়ে দুলতে থাকে। যে বাড়িতে সাপ ও বাদুর সহবাস করে সেই বাড়ির মেঝে ফুড়ে অশ্বখ গাছের চারা বের হয়। বাড়িও তখন হয়। পতিত।

মানুষের যেমন প্ৰাণ আছে, বসতবাড়িরও আছে। পতিতবাড়ি হলো প্রাণশূন্য বাড়ি।

ঢং করে কাসার পাত্র রাখার শব্দ হলো। হরিচরণ চোখ বন্ধ করে ছিলেন। চোখ মেলে চমৎকৃত হলেন। জহিরের মা ঘোমটা দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টিতে সে পুরোপুরি ভিজে গেছে। সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টিতেই। বৃষ্টিতে ভিজে মনে হয় মজা পাচ্ছে। জুলেখা কাসার থালাভর্তি করে খাবার এনেছে। চিড়া, নারিকেল কোড়া, এক গ্লাস দুধ এবং দুটা কলা। হরিচরণ বললেন, মাগো আজি আমি কিছু খাব না। উপাস দিব।

জুলেখা স্পষ্ট গলায় বলল, আপনি না খেলে আমিও খাব না। আমি এইখানে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়ায়ে থাকব।

হরিচরণ হাত বাড়িয়ে দুধের গ্লাস নিলেন।

জুলেখা বলল, ঘর অন্ধকার। বাতি দিতে হবে। হারিকেন কোন ঘরে?

হরিচরণ বললেন, কিছুই তো জানি না।

আপনার সঙ্গে কি কেউ নাই?

না।

আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আপনার সব কাজকর্ম কইরা দিব।

প্রয়োজন নাই। তুমি মেয়েমানুষ— এখানে যদি আসো, লোকে নানান কথা বলবে।

আপনি আমারে মা ডেকেছেন। মা ছেলের কাছে আসবে, এতে দোষ নাই।

তোমার ছেলে কোথায়?

ছেলে বাপের সাথে বিরামদি। হাটে গেছে। রবারের জুতা কিনবে।

জুলেখা অন্ধকার ঘরে হারিকেন খুঁজছে। এক ঘর থেকে আরেক ঘর যাচ্ছে। এমনভাবে যাচ্ছে যেন এটা তার নিজের বাড়িঘর। মেয়েটা আবার গুনগুন করে গানও করছে–

কে বা রান্ধে
কে বা বাড়ে
কে বা বসে খায়।
কাহার সঙ্গে শুইয়া থাকলে
কে বা নিদ্ৰা যায়?

মনায় রান্ধে
তনায় বাড়ে
আতস বসে খায়
সাধুর সঙ্গে শুইয়া থাকলে
সুখে নিদ্ৰা যায়।

কী মিষ্টি মেয়েটার গলা! যেন সোনালি বর্ণের কাঁচা মধু ঝরে ঝরে পড়ছে।

বৃষ্টি থেমে গেছে। শত শত জোনাকি বের হয়েছে। ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। শিউলি গাছ জোনাকিতে ঢেকে গেছে। তারা একসঙ্গে জুলছে, একসঙ্গে নিভছে। কী মধুর দৃশ্য! হরিচরণের হঠাৎ তার মেয়ের কথা মনে পড়ল। মেয়েটা বেঁচে থাকলে কত বড় হতো? সে দেখতে কেমন হতো? চেহারা মনে পড়ছে না। মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল ছিল এটা মনে পড়ছে। কোঁকড়া চুল অলক্ষণ। কারণ দেবী অলক্ষীর মাথায় চুল ছিল কোঁকড়া। তিনি স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে অনেকবার বলেছেন- শৈশবের কোঁকড়া চুল বয়সকালে থাকে না। মেয়েটা জীবিত থাকলে এতদিনে নিশ্চয়ই বিয়ে হয়ে যেত। বাবার দুঃসংবাদ শুনে সে কি ছুটে আসত? না-কি তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে আটকে দিত? শাস্ত্র বিধান কী বলে? পতিত পিতার সন্তানরাও কি পতিত?

বাবা! আমি যাই?

হরিচরণ চমকে উঠলেন। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও তাঁর মনে ভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল। শিউলি কথা বলছে।

দাঁড়িয়ে আছে জুলেখা। তার মুখ হাসি হাসি। সে হারিকেন খুঁজে পেয়েছে। তিনটা ঘরে হারিকেন জ্বলছে। শুধু বারান্দায় আলো দেয়া হয় নি। হরিচরণ বললেন, গান কোথায় শিখেছি মা?

জুলেখা লজ্জিত গলায় বলল, বাপজানের কাছে। আমার ব্যাপজান বাউল। উনি মালজোড়া গান করেন।

মালজোড়া গান কী?

প্ৰশ্ন-উত্তর। এক বাউল প্রশ্ন করে আরেকজন উত্তর দেয়। মালজোড়া গানে আমার ব্যাপজানের সাথে কেউ পারত না।

উনি কি মারা গেছেন?

জে না। বাড়ি থাইকা পালায়া কোথায় জানি গেছে, আর আসে নাই। দশ বছর হইছে। মনে হয়। বিয়াশাদি কইরা নয়া সংসার পাতছে।

জুলেখা খিলখিল করে হাসছে যেন বাবার নতুন সংসার পাতা আনন্দময় কোনো ঘটনা।

হরিচরণ বললেন, মাগো! তোমার কণ্ঠস্বর অতি মনোহর। একদিন এসে আমারে গান শুনাবে।

জুলেখা নিচু হয়ে হরিচরণকে কদমবুসি করল।

 

সময় ১৯০৫। তখন ময়মনসিংহ জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট খাজা সলিমুল্লাহ (ঢাকার নবাব)। ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনের অধীন। ভারতবর্ষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তখন লর্ড কার্জন। তিনি বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা দিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গ অনুযায়ী আসাম, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী নিয়ে হবে পূর্ববঙ্গ। ঢাকা হবে রাজধানী, চট্টগ্রাম বিকল্প রাজধানী। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। ভারতবর্ষের হিন্দু সমাজ ফুঁসে উঠে। বাংলা ভাগ করা যাবে না।

ঢাকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবে- এটিও হিন্দুসমাজ নিতে পারছিল না। পূর্ব বাংলা চাষার দেশ, তারা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী করবে?

হিন্দু-মুসলমান বিরোধ তখন বাড়ছে। সেই বিরোধ মেটাবার জন্যে অনেকেই এগিয়ে আসছেন। সেই অনেকের মধ্যে একজন হলেন ঠাকুরবাড়ির এক কবি, নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি রাখিবন্ধন অনুষ্ঠান করলেন। সবাই সবার হাতে রাখি বেঁধে দেবে। কারো মধ্যে কোনো হিংসা-দ্বেষ থাকবে না।

রাশিয়ায় তখন জারতন্ত্র। শেষ জার নিকোলাই আছেন ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। লেনিন জার্মানিতে। তিনি তখনো রাশিয়ায় পৌঁছেন নি। ম্যাক্সিম গোর্কি নামের এক মহান লেখক একটা উপন্যাসে হাত দিয়েছেন। উপন্যাসের নাম “মা”।

সেইসময়ে ইউরোপের অবস্থাটা একটু দেখি। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে বাইশ বছর বয়সি এক পেটেন্ট অফিসের কেরানি পদার্থবিদ্যার উপর তিন পাতার এক প্রবন্ধ লিখে পাঠিয়েছেন— Annals of Physics-এ। আলো সম্পর্কে তার নিজের চিন্তাধারা প্ৰবন্ধটিতে বলা হয়েছে। প্ৰবন্ধটি পড়ার পর জার্নালের সম্পাদক নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কস প্ল্যাংক মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারছেন পদার্থবিদ্যার এতদিনকার সব চিন্তাভাবনার অবসান হতে যাচ্ছে। আসছে নতুন চিন্তা। শুদ্ধতম চিন্তা। বাইশ বছর বয়সি পেটেন্ট ক্লার্কের নাম আলবার্ট আইনষ্টাইন।

গ্রামের নাম বান্ধবপুর

গ্রামের নাম বান্ধবপুর। পাশের গ্রাম সোনাদিয়া। উত্তরে গারো পাহাড়। পরিষ্কার কুয়াশামুক্ত দিনে উত্তরের দিগন্তরেখায় নীল গারো পাহাড় ঝলমল করে। দুগ্রামের মাঝখানে মাধ্যই খাল। এই খাল বর্ষাকালে ফুলে ফোঁপে নদী। মাধ্যই খাল সোহাগগঞ্জ বাজারে এসে পড়েছে বড়গাঙে। বড়গাঙের অবস্থা বর্ষাকালে ভয়াবহ। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। এমন। লঞ্চ-স্টিমার যাতায়াত করে। সোহাগগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ থেকে গোয়ালন্দ হয়ে কোলকাতা।

বান্ধবপুর অতি জঙ্গলা জায়গা। প্রতিটি বসতবাড়িব চারপাশে ঘন বন। এমন ঘন যে দিনমানে সূর্যের আলো ঢেকে না। শিয়াল বাঘডাশারা মনের আনন্দে ঘোরে। মুরগি চুরিতে এরা বিরাট ওস্তাদ। হঠাৎ হঠাৎ বাঘ দেখা যায়। স্থানীয় ভাষায় এইসব বাঘের নাম ‘আসামি বাঘ’। এরা বর্ষার পানির তোড়ে আসামের জঙ্গল থেকে নেমে এসে জঙ্গলে স্থায়ী হয়। গৃহস্থের গরু-ছাগল খেয়ে ফেলে।

আসামি বাঘের সন্ধান পাওয়া গেলে নিস্তরঙ্গ বান্ধবপুরে হৈচৈ শুরু হয়। সোনাদিয়া জমিদার বাড়িতে খবর চলে যায়। জমিদার বাবু শশাংক পাল হাতির পিঠে চড়ে মাধাই খাল পার হয়ে বান্ধবপুর উপস্থিত হন। তার হাতে দোনলা উইনস্টন বন্দুক। বাঘমারার অনেক কায়দাকানুন করা হয়। জঙ্গল ঘেরাও দেয়া হয়। ঢাকঢোল বাজানো হয়। বাবু শশাংক পাল হাতির পিঠে থেকেই আকাশের দিকে কয়েকবার ফাঁকা গুলি করেন। বাঘ মারা পড়ে না। অন্য কোনো জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। শশাংক পাল হাতির পিঠে করে ফিরে যান। তাকে বড়ই আনন্দিত মনে হয়।

বান্ধবপুর পুরোপুরি হিন্দু গ্রাম। সন্ধ্যায় পুরো অঞ্চলে একসঙ্গে উলুধ্বনি উঠে। শাঁখ বাজানো হয়। প্রতিটি সম্পন্ন বাড়িতে নিত্যপূজা হয়। দুটা কালীমন্দির আছে। একটার নাম বটকালি মন্দির। গ্রাম থেকে অনেকটা দূরে বটগাছের সঙ্গে লাগানো। বিশাল বটবৃক্ষ এক মন্দিরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যে গাছটাকেও মন্দিরের অংশ মনে হয়। বিশেষ বিশেষ দিনে আয়োজন করে বটকালি মন্দিরে কালীপূজা হয়। পূজার শেষে পাঠা বলি।

বান্ধবপুরে অল্প কয়েকঘর মাত্র মুসলমান। এদের জমিজমা নেই বললেই হয়। বাবুদের বাড়িতে জন খাটে। অনেকেই বাজারে কুলির কাজ করে। কেউ কেউ ঘোড়ার পিঠে মালামাল আনা-নেয়া করে। জুম্মাবারে মাথায় টুপি পরে জুম্মাঘরে উপস্থিত হয়। দোয়াকালাম এরা কিছুই জানে না। জানার আগ্রহ বা উপায়ও নেই। তবে শুক্রবারে গম্ভীর মুখে মসজিদে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টা তাদের মাথায় ঢুকে আছে। তারা মাওলানা সাহেবের খুতবা পাঠ অতি আগ্রহের সঙ্গে শোনে। নামাজ শেষে শিন্নির ব্যবস্থা থাকলে অতি আদবের সঙ্গে কলাপাতায় শিন্নি নেয়। বিসমিল্লাহ বলে মুখে দেয়।

দেয়া। জুম্মাঘরের মাওলানার জন্যে মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিও তিনি ঠিক করেছেন। মাওলানার নাম ইদারিস। বাড়ি ফরিদপুরে। মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিতে তার ভালোই চলে যায়। মুসলমান গৃহস্থ বাড়ি থেকে তাকে ধান দেয়া হয়। যেকোনো ভালো রান্না হলে তাকে আগে পাঠানো হয়। বিয়েশাদি হলে মাওলানার জন্যে বিশেষ বরাদ্দ থাকে- তবন (লুঙ্গি), পাঞ্জাবি, টুপি, ছাতা।

মাওলানা ইদারিসের সর্বমোট নয়টা ছাতা বর্তমানে আছে। প্রায়ই ভাবেন বুধবার হাঁটে গিয়ে একটা ভালো ছাতা রেখে বাকিগুলি বিক্রি করে আসবেন। শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয় না। লোকজন তাকে ভালোবেসে ছাতা দিয়েছে, সেই ছাতা কীভাবে বিক্রি করবেন! ইদারিস মাওলানার বয়স ত্ৰিশ। ধবধবে ফর্স গায়ের রঙ। সাধারণের চেয়ে লম্বা। মাথায় সবসময় পাগড়ি পরেন বলে আরো লম্বা লাগে। নিজের ঘরে তিনি লুঙ্গি-গেঞ্জি পরলেও বাইরে লেবাসের পরিবর্তন হয়। চোস্ত পায়জামা, ধবধবে শাদা পাঞ্জাবি, চোখে সুরমা, পাগড়ি এবং দাড়িতে সামান্য আতর। দাড়িতে আতর দেয়া সুন্নত। নবিজি দাড়িতে আতর দিতেন।

জুম্মাঘরের বারান্দায় রাখা বেঞ্চে মাওলানা ইদারিস বসে আছেন। তার সামনে কাঠমিন্ত্রি সুলেমান ছেলেকে নিয়ে বসা। ছেলে বসে থাকতে পারছে না। ছটফট করছে। সুলেমান এক হাতে ছেলেকে শক্ত করে ধরে আছে।

মাওলানা ইদারিস বললেন, ছেলের নাম কী?

সুলেমান বলল, জহির।

জহিরের সাথে আর কিছু নাই?

সুলেমান বলল, জে আজ্ঞে, না।

মাওলানা বললেন, আজ্ঞে বলতেছ। কেন? কথায় কথায় জ্বে আজ্ঞে বলা হিন্দুয়ানি। হিন্দুয়ানি দূর করা লাগবে। বিলো জে-না।

সুলেমান বলল, জে-না।

মাওলানা বললেন, ছেলের নাম রেখেছি জহির। এটা তো হবে না। জহির আল্লাহপাকের ৯৯ নামের এক নাম। এর অর্থ জাহির হওয়া। আল যাহিরু। নাম বদলাতে হবে। এখন থেকে নাম আব্দুল জহির। এর অর্থ জহিরের গোলাম। অর্থাৎ আল্লাহপাকের গোলাম। বুঝেছ?

জি বুঝেছি। এখন ছেলেকে একটা তাবিজ দিয়া দেন। অতি দুষ্ট ছেলে। বনে জঙ্গলে ঘুরে। হরিবাবুর দিঘিতে মরতে বসেছিল। হরিবাবু ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন। ছেলেরে বাচালেন। উনার জন্যে ছেলের জীবন রক্ষা হয়েছে।

মাওলানা ইদারিস বিরক্ত হয়ে বললেন, হরিবাবু তোমার ছেলেকে বাঁচানোর কে? তাকে বাঁচিয়েছেন আল্লাহপাক। মানুষের জীবনের মালিক উনি ভিন্ন কেউ না। বুঝেছ? হায়াত, মাউত, রেজেক, ধনদৌলত এবং বিবাহ এই পাঁচটা বিষয় আল্লাহপাক নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন। এই বিষয় মনে রাখবা।

সুলেমান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মাওলানা বললেন, তাবিজ লিখে রাখব, একসময় এসে নিয়ে যাবে।

জে আজ্ঞে।

আবার জে আজ্ঞে?

অভ্যাস হয়ে গেছে, কী করব?

অভ্যাস বদলাতে হবে। ধুতি পরা ছাড়তে হবে। ধুতি হিন্দুর পোশাক। মুসলমানের লেবাস হবে নবিজির লেবাস।

সুলেমান বিড়বিড় করে বলল, এখন আমি যদি পাগড়ি পরে ঘুরি, লোকে কী বলবো?

মাওলানা বললেন, তোমাকে তো পাগড়ি পরতে বলতেছি না। ধুতি পরতে নিষেধ করতেছি। আর যদি পরতেই হয় লুঙ্গির মতো পরাবা। এতে দোষ খানিকটা কাটা যায়।

ছেলের মায়ের জন্যে কি একটা তাবিজ দিবেন?

তার কী সমস্যা?

জঙ্গলে ঘুরে। নিজের মনে গীত গায়।

নামাজ রোজা কি করে?

রোজা করে। নামাজের ঠিক নাই।

নামাজ ছাড়া রোজা আর নৌকা ছাড়া মাঝি একই বিষয়। তারে নামাজ পড়তে বলবা।

জি বলব। সুন্দরী মেয়েছেলে, তার উপরে জিনের নজর পড়ছে কি-না এইটি নিয়া আমি চিন্তিত।

জিনের নজর পড়া বিচিত্র না। তাবিজ লেইখা দিব, চিন্তা করবা না।

সুলেমান উঠে দাঁড়াল। যাবার সময় বেঞ্চে একটা এক আনি রাখল। এমনভাবে রাখল যেন মাওলানার চোখে না পড়ে। মাওলানা সাহেবকে দেখিয়ে নজরানা দেয়া বেয়াদবি, আবার কোনো নজরানা না দিয়ে চলে আসাও বেয়াদবি।

মাওলানা ইদারিস সুলেমান চলে যাওয়ার পরেও দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। তার ডানপাশে জুম্মাঘর। নিজের একটা জায়গা। অতি আপন। তাকালেই শান্তি শান্তি লাগে। জুম্মাঘরের অবস্থা ভালো না। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। একটা দরজা। উইপোকা পুরোপুরি খেয়ে ফেলেছে। বাঁশের দরমা দিয়ে ভাঙা দরজা বন্ধ করতে হয়। মিম্বার ভেঙে গেছে। খুতবা আগে মিম্বারে দাঁড়িয়ে পড়তেন, এখন মেঝেতে দাঁড়িয়ে পড়েন। অথচ রসুলে করিম মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা পাঠ করতেন। মুসুন্ত্রিদের অজুর ব্যবস্থা নাই। মসজিদের পাশে ডোবার মতো আছে, ডোবায় পাট পচানো হয়, সেখানে অজু করা সম্ভব না। সবচে’ ভালো হতো একটা চাপকলের ব্যবস্থা করলে। কে ব্যবস্থা করবে? মাওলানা ইদরিস দশআনির জমিদার নেয়ামত হোসের কাছে গিয়েছিলেন। নেয়ামত হোসেন রাগী গলায় বললেন, মসজিদ করে দিয়েছি, বাকি দেখভাল আপনারা করবেন। চাঁদা তুলে করবেন। আমি টাকার গাছ লাগাই নাই। প্রয়োজন হলেই গাছ ঝাড়া দিব। আর টুপটুপাইয়া টাকা পড়বে। চান্দা তুলেন, চান্দা।

চাঁদা দেয়ার কোনো মানুষ নাই— এটা বলার আগেই নেয়ামত হোসেন উঠে পড়লেন। সন্ধ্যার পর তিনি বেশিক্ষণ বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন না। সম্প্রতি তিনি লখনৌ থেকে পেয়ারীবালা নামের এক বাইজি এনেছেন। সন্ধ্যা থেকে নিশি রাত পর্যন্ত তার সঙ্গে সময় কাটান। এটা নিয়ে কেউ কিছু মনে করে না। জমিদার শ্রেণীর মানুষদের বিলাস ত্রুটির মধ্যে পড়ে না। তারা আমোদ ফুর্তি করবে না তো কে করবে?

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, মাওলানা ইদারিস বদনায় রাখা পানি দিয়ে অজু করে আযান দিলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন কেউ আসে কি-না। কেউ এলো না। তিনি মোমবাতি জ্বলিয়ে একই নামাজ পড়লেন। সালাম ফেরাবার সময় বাতাসে মোমবাতি নিভে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। তার বুক ধ্বক করে উঠল। নির্জন মসজিদে জিন নামাজ পড়তে আসে। ইমাম নামাজ পড়াতে ভুল করলে তারা বড় বিরক্ত হয়। চড়থাপ্পড় মারে।

জিনের চেয়েও বেশি ভয় ইবলিশ শয়তানকে। মসজিদের আশেপাশেই এদের চলাচল বেশি। মুসল্লিরা নামাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার পথে তারা পিছু নেয়। ভয় দেখায়, ক্ষতি করতে চেষ্টা করে।

তিনি কয়েকবার ইবলিশ শয়তানের হাতে পড়েছেন। প্রতিবারই আয়াতুল কুরসি পড়ে উদ্ধার পেয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে গত মাসে। এশার নামাজ শেষ করে হারিকেন হাতে বাড়ি ফিরছেন। ফাকফাঁকা চাঁদের আলো। ডিসট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় উঠতে যাবেন, হঠাৎ তার চারদিকে ঢ়িল পড়তে লাগল। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার ডানদিকে বিশাল বিশাল শিমুল গাছ। বাতাস নেই কিছু নেই, হঠাৎ শুধু একটা শিমুল গাছের ডাল নড়তে লাগল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে একমনে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলেন। আয়াতুল কুরসি একবার শেষ করেন, দু’হাতে শব্দ করে তালি দেন। আবার পড়েন। আবার তালি দেন। আয়াতুল কুরাসির মরতবা হলো, এই দোয়া পড়ে হাততালি দিলে যতদূর হাততালির শব্দ যায় ততদূর পর্যন্ত খারাপ জিন থাকতে পারে না। আয়াতুল কুরাসির এত বড় ফজিলতের কারণ, এই আয়াতে আল্লাহপাকের এমন সব গুণের বর্ণনা আছে যা মানুষের বোধের অগম্য।

তিনবার আয়াতুল কুরসি পাঠ করে মাওলানা চোখ মেললেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক। শিমুল গাছের পাতা নড়ছে না। কটু একটা গন্ধ চারদিকে ছড়ানো। নাক জ্বালা করে এমন গন্ধ।

মাগরেবের নামাজ থেকে এশার নামাজের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান অল্প। ঘণ্টাখানিক। এই এক ঘণ্টার জন্যে বাড়ি যাওয়া অর্থহীন। মাওলানা মসজিদেই থাকেন। তার ভয় ভয় লাগে। বনের মাঝখানে মসজিদ। সন্ধ্যার পর থেকে বনের ভেতর নানান ধরনের শব্দ উঠে। কোনোটা পাখির শব্দ, কোনোটা জন্তু জানোয়ারের, আবার কিছু কিছু শব্দ আছে সম্পূর্ণ অন্যরকম। হুম হুম করে এক ধরনের শব্দ মাঝে মাঝে আসে। এই শব্দের সঙ্গে কোনো শব্দের মিল নেই। শব্দ শুনলেই শরীর ঠাণ্ড হয়ে আসে। ভয় কাটানোর জন্যে মাওলানা কোরান পাঠ করেন। তিনি ইদানীং শুরু করেছেন কোরান মজিদ মুখস্থ করা। একটা বয়সের পর মুখস্থশক্তি কমে যায়। একই জিনিস বারবার পড়ার পরেও মনে থাকে না। এই সমস্যা তার হচ্ছে। তিনি হাল ছাড়ছেন না। কিছুই বলা যায় না, আল্লাহপাক অনুগ্রহ করতেও পারেন। দেখা যাবে তিনি কোরানে হাফেজ হয়েছেন। সহজ ব্যাপার না। আল্লাহর কথা শরীরে ধারণ করা বিরাট বিষয়। সাধারণ মানুষের শরীর কবর দেয়ার পর পাঁচে গলে যায়। কোরানে হাফেজের শরীর পঁচে না।

মাওলানা এশার নামাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে হাতির গলার ঘণ্টার আওয়াজ পেলেন। সোনাদিয়ার জমিদার শশাংক পালের হাতির গলার রূপার ঘণ্টা। অতি মধুর আওয়াজ। তিনি শুনেছেন সোনাদিয়ার জমিদার আরেকট। হাতি কিনেছেন। মাদি হাতি। এখন তিনি দুই হাতি পাশাপাশি নিয়ে চলেন। মাদি হাতিটা থাকে সামনে, পুরুষটা পিছনে। এরা যখন থেমে থাকে তখন নাকি পুরুষ এবং মেয়ে হাতি শুড় জড়ােজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকে। নিশ্চয়ই খুব মধুর দৃশ্য। তিনি এখনো দেখেননি। একবার সোনাদিয়ায় যাবেন। দেখে আসবেন।

হাতি নিয়ে কোরান মজিদে একটা সূরা আছে। সূরা ফিল। মাওলানা মনে মনে সূরা আবৃত্তি করে তার বঙ্গানুবাদ করলেন। তাঁর ভালো লাগল।

আলাম তারা কাইফা ফা’আ’লা রাব্বুকা বিআছহবিল ফীল।

হস্তিবাহিনীর সাথে তোমার প্রভু কীরূপ আচরণ করলেন তাহা কি তুমি লক্ষ কর নাই?

আলাম। ইয়াজআ’ল কাইদাহুম ফ্ৰী-তাদলীল। তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যৰ্থ করেন নাই?

জঙ্গলের পথ ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠেই মাওলানা শশাংক পালের দেখা পেলেন। হাতির পিঠে। শশাংক পাল বসে আছেন। হাতির গায়ের রঙ অন্ধকারে মিশে গেছে। মাওলানা ইদারিসের মনে হলো, জমিদার শশাংক পাল শূন্যের উপর বসে আছেন।

মাওলানা ইদারিস বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আদাব। বিধমীকে আসসালামু আলায়কুম বলা নিষেধ। তাদের বেলায় আদাৰ। আদাব শব্দের অর্থ আছে কিনা। তিনি জানেন না।

শশাংক পাল বললেন, কে?

মাওলানা বললেন, জনাব আমার নাম ইদারিস। আমি জুম্মাঘরের ইমাম।

আমার অঞ্চলে গরু কাটা নিষেধ এটা জানো তো?

জি জনাব জানি।

নিষেধ জেনেও অনেকে গরু কাটে। গভীর জঙ্গলের ভেতর এই কাজ করে মাংস ভাগাভাগি করে। এরকম সংবাদ যদি পাও আমাকে জানাবে। আমি ব্যবস্থা নিব। ভালো কথা, হরিচরণ মুসলমান হয়েছে এরকম একটা খবর পেয়েছি। খবরটা কি সত্য?

সত্য না, জনাব।

আচ্ছা, ঠিক আছে। পথ ছাড়, আমি যাব।

মাওলানা পথ ছেড়ে রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আরো দূরে সরে গেলেন।

 

শশাংক পাল হাতি নিয়ে হরিচরণের বাড়িতে এসেছেন। হাতি দুটাই সঙ্গে এনেছেন। শশাংক পালের সঙ্গে তাঁর এস্টেটের দুই ম্যানেজার এসেছেন। একজন ইকোবরাদার এসেছে। পান বান্দেস একজন এসেছে। তার কাজ নানান মসলা দিয়ে পান বানানো। শশাংক পালের তামাক খাওয়ার অভ্যাস আছে। অন্যের ইকোয় তিনি তামাক খান না।

শশাংক পালের বয়স চল্লিশ। শরীরের উপর নানান অত্যাচারের কারণে বয়স অনেক বেশি দেখায়। চেহারায় বালকভোব আছে, তবে চোখ জ্যোতিহীন। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে হাতকাপা রোগ হয়েছে। গাছের পাতা কাপার মতো হাতের আঙুল প্রায়ই থারথার করে কাপে। শশাংক পাল এই কারণেই শীতগ্ৰীষ্ম সবসময় মখমলের চাদরে শরীর ঢেকে রাখেন।

হরিচরণ জমিদার বাবুকে অতি যত্নে বৈঠকখানায় বসিয়েছেন। তাকে তামাক দেয়া হয়েছে। একজন পাখাবরদার পেছনে দাঁড়িয়ে বাতাস করছে। এত বড় জমিদার হঠাৎ তার বাড়িতে কেন এই কারণ হরিচরণ ধরতে পারছেন না। একটা অনুমান তিনি অবশ্যি করছেন— ব্রিটিশরাজকে খাজনা দেবার তারিখ এসে গেছে। শশাংক পাল হয়তো খাজনার পুরো টাকার ব্যবস্থা করতে পারেন। নি। খাজনা জমা দেবার সময়ই শুধু জমিদাররা ধনবানদের খাতির করেন।

হরিচরণ!

জে আজ্ঞে।

নতুন হাতি খরিদ করেছি। গৌরীপুরের মহারাজার কাছ থেকে কিনলাম। তিনি কিছুতেই বিক্রি করবেন না। মহারাজা বললেন, আমি কি হাতি বেচাকেনার ব্যবসা করি? তোমার হাতি পছন্দ হয়েছে নিয়ে যাও, কিছু দিতে হবে না। আমি বললাম, ঐটা হবে না। নগদ আট হাজার টাকা উনার খাজাঞ্চির কাছে জমা দিয়ে হাতি নিয়ে চলে এসেছি। ভালো করেছি না?

হরিচরণ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।

হাতির নাম রেখেছি বং। পুরুষটার নাম চং, মাদিটার নাম বং। দুইজনে মিলে বংচং। হা হা হা। ভালো করেছি না?

জে আজ্ঞে, ভালো।

শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, এখন মূল কথায় আসি। হঠাৎ হাতি কেনার কারণে আমি কিঞ্চিৎ অর্থসংকটে পড়েছি। আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে খাজনা পৌঁছতে হবে। পাঁচ হাজার টাকার সমস্যা। টাকাটা দিতে পারবে?

হরিচরণ মুখ খোলার আগেই শশাংক পাল বললেন, আমি জিনিস বন্ধক রেখে টাকা নিব। বং থাকবে তোমার কাছে বন্ধক। একটা বন্ধকনামা তৈরি করে এনেছি। স্ট্যাম্পে পাকা দলিল। আমি বিশেষ বিপদে পড়েছি। বিপদ থেকে উদ্ধার কর।

হরিচরণ বললেন, আপনি নিজে এসেছেন এই যথেষ্ট। বন্ধকনামা লাগবে না। হাতিও রেখে যেতে হবে না।

শশাংক পাল বললেন, এই কাজ আমি করি না। বন্ধকনামায় আমি দস্তখত করি নাই। টিপসই দিয়েছি। ইদানীং দস্তখত করতে পারি না। হাতকাপা রোগ হয়েছে, শুনেছ বোধহয়। জনসমক্ষে বিরাট লজ্জায় পড়ি বিধায় চাদরের নিচে হাত লুকিয়ে রাখি। এখন বলো টাকাটা কি দিতে পারবে?

হরিচরণ বললেন, এত টাকা আমি সঙ্গে রাখি না। সকালে আপনার বাড়িতে দিয়ে আসব।

শশাংক পাল আরো কিছুক্ষণ থাকলেন। শরবত খেলেন, পান খেলেন। কিছুক্ষণ গল্প করলেন।

উড়াউড়া শুনতে পেলাম তোমাকে না-কি সমাজচ্যুত করেছে। কথাটা কি সত্যি।

হরিচরণ একবার ভাবলেন বলেন, সমাজচ্যুতির ঘটনা আপনার বাড়িতেই ঘটেছে। আপনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। তারপর মনে হলো এই মানুষকে পুরনো কথা মনে করিয়ে দিয়ে কোনো লাভ নেই। তিনি কিছুই মনে রাখতে পারেন না।

শশাংক পাল বললেন, তুমি না-কি সবার সামনে এক মুসলমান ছেলেকে চাটোচাটি করেছ? গালে চুমা দিয়েছ?

হরিচরণ জবাব দিলেন না।

শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, আবার কার কাছে যেন শুনলাম। সেই মেয়ের মা রাইত নিশুথে তোমার ঘরে আসে। তুমি একা থাক, রাইত নিশুথে তোমার ঘরে মেয়েছেলে আসা তো ভালো কথা না। সমাজ থেকে পতিত হবে। হরিচরণ বললেন, পতিত তো আছিই। নতুন করে কী হবো? তা ছাড়া রাইত নিশুথে আমার কাছে কেউ আসে না। ঐ মেয়ে আমারে বাবা ডাকে। আমি তাকে কন্যাসম দেখি।

শশাংক পাল মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন, নিজের কন্যা ছাড়া আর কেউ কন্যাসম না। এইটা খেয়াল রাখবা।

আচ্ছা রাখব।

তোমার বাড়িতে তো কোনো লোকজন দেখলাম না। সবাই কি তোমাকে ত্যাগ করেছে?

করেছে। করাই স্বাভাবিক। আমার জাত নাই। সমাজ নাই।

শশাংক পাল বললেন, এইসব নিয়ে চিন্তা করবে না। যার টাকা আছে সে সমাজ কিনবে। আর আমি তো আছি। বামুন পণ্ডিতকে ডেকে ধমক দিয়ে দিব, নিমিষে সে অন্য বিধান দিবে। হা হা হা।

প্ৰচণ্ড শব্দে শশাংক পাল হাসছেন। অথচ এই হাসি প্রাণহীন। মনে হচ্ছে কোনো একটা যন্ত্রের ভেতর থেকে শব্দ আসছে।

হরি!

জে আজ্ঞে।

তোমার এখানে যদি মদ্যপান করি তোমার কি অসুবিধা আছে?

কোনো অসুবিধা নাই।

কলিকাতা থেকে ভালো রাম আনিয়েছিলাম। খাবে একটু?

আমি মদ্যপান করি না।

ভালো। খুব ভালো। মদ্য সর্বগুণনাশিনী। আমার দিকে তাকায়ে দেখ— আমার হয়েছে হাতকাঁপা রোগ। এই সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ রোগ। কিছু মনে থাকে না।

মদ্যপান ছেড়ে দেন।

কেন ছাড়ব? পৃথিবীতে আমরা এসেছি ভোগের জন্যে। ভোগ নিবৃত্তি না হলে বারবার জন্মাতে হবে। আবার জন্মানোর ইচ্ছা নাই। এই জন্যেই ঠিক করেছি, এই জীবনেই সমস্ত ভোগের নিষ্পত্তি করব।

শশাংক পালের জন্যে মদ্যপানের আয়োজন তার লোকজন অতি দ্রুত করে ফেলল। মেঝেতে কার্পেট বিছানো হলো। তাকিয়া এবং কোলবালিশ নামানো হলো। গ্লাস নামল, বোতল নামল। ধূপদানে অগরু’ পোড়ানো হলো। হুকোয় মেশকাত আম্বুরী তামাক ভরা হলো।

শশাংক পাল তাকিয়ায় হেলান দিয়ে গ্লাস হাতে নিতে নিতে বললেন, বরফ ছাড়া এইসব জিনিস খেয়ে কোনো মজা নাই। বরফকলের সন্ধানে আছি। কলিকাতায় সাহেবপাড়ায় বরফকল পাওয়া যায়। কেরোসিনে চলে। অত্যধিক দাম। তারপরেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিনব। ভালো করেছি না?

কথায় কথায় ‘ভালো করেছি না’ বলা শশাংক পালের মুদ্রাদোষ। প্রশ্নটা তিনি করেন, তবে জবাবের জন্যে অপেক্ষা করেন না। তিনি নিশ্চিত যা করেছেন, ভালোই করেছেন।

হরি!

জে আজ্ঞে।

মহাভারতের যযাতির কথা মনে আছে? তার জীবনটাই ছিল ভোগের। বৃদ্ধ হয়ে গেলে ভোগের তৃষ্ণা মেটে না। তখন সে তিনপুত্রকে ডেকে বলল, তোমাদের মধ্যে কেউ কি তোমাদের যৌবন আমাকে দিয়ে আমার জরা গ্ৰহণ করবে। আমি আরো ভোগ করতে চাই। কেউ রাজি হয় না। একজন রাজি হলো। সেই একজনের নামটা কি তোমার মনে আছে, হরি?

সৰ্বকনিষ্ঠ পুত্র রাজি হলো। তার নাম পুরু।

ঐটা ছিল গর্ধব। গর্ধবটা রাজি হয়েছে। হা হা হা। মহা গর্ধব। হা হা হা। হাসতে হাসতে শশাংক পালের হেঁচকি উঠে গেল। হেঁচকি থামানোর জন্যে পানি খেতে হলো। মাথায় পানি দিতে হলো। তবু হেঁচকি থামে না। হেঁচাকি দিতে দিতেই তিনি হাতিতে উঠে চলে গেলেন। মাদি হাতি লোহার শিকলে বাধা থাকিল জামগাছের সঙ্গে। হাতির সঙ্গে আছে হাতির সহিস। সহিস মুসলমান, নাম কালু মিয়া। ছোটখাটো মানুষ। অতি বিনয়ী। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না।

হরিচরণ বললেন, এত বড় হাতি আর তুমি ছোটখাটো মানুষ। তোমার কথা কি মানে?

কালুমিয়া বলল, জে কর্তা, মানে। আমি তার চোখের সামনে থাকলেই সে ঠাণ্ডা থাকে। চোখের আড়াল হলেই অস্থির হয়।

এত বড় জন্তু বশ করলে কীভাবে?

আদর দিয়ে। সব পশু আদর বুঝে। মানুষের চেয়ে বেশি বুঝে।

মানুষ কম বুঝে?

জে। কর্তা।

মানুষ কম বুঝে কেন?

মানুষরে আদর করলে মানুষ ভাবে আদরের পেছনে স্বাৰ্থ আছে। পশু স্বার্থ বুঝে না।

কালু মিয়া! আমি যদি হাতিটাকে আদর করি সে বুঝবে?

অবশ্যই বুঝবে। হাতির অনেক বুদ্ধি। আর হাতি আদরের কাঙ্গাল।

হরিচরণ হাতির গায়ে হাত রাখলেন। হাতি মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখল। হরিচরণ বললেন, কেমন আছিস গো বেটি?

হাতি শুড় ঝাকালো।

হরিচরণ বললেন, তুই আমার বাড়ির অতিথি। তুই কী খেতে চাস বল।

কালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনের প্রত্যেকটা কথাই হে বুঝছে। জবান নাই বইলা উত্তর দিতেছে না।

হরিচরণ বললেন, তোমার হাতি কী খেতে সবচে’ পছন্দ করে বলো। আমি তাই খাওয়াব।

এক ধামা আলুচাল দেন। এক ছড়ি কলা দেন, আর নারকেল দেন। আপনি নিজের হাতে তারে খাওয়াটা দিবেন, বাকি জীবন সে আপনারে ভুলবে না।

হরিচরণ নিজের হাতে হাতিকে খাবার খাওয়ালেন। কালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনার আদর হে বেবাকটাই বুঝছে।

তুমি জানলে কীভাবে?

দেহেন না একটু পর পর শুঁড় দিয়া আপনেরে ধাক্কা দিতাছে। এইটা তার খেলা। পছন্দের মানুষের সাথে এই খেলা সে খেলে।

অল্প কয়েক ঘণ্টায় হাতিটার উপর তার অস্বাভাবিক মায়া পড়ে গেল। তৃতীয় দিনে সেই মায়া যখন অনেক গুণ বেড়েছে, তখনি হাতি ফেরত নেবার জন্যে শশাংক পালের দুই ম্যানেজার উপস্থিত। তারা টাকা নিয়ে আসে নি, এসেছে খালি হাতে।

তাদের কাছেই হরিচরণ জানলেন যে, হাতি বন্ধক রেখে টাকা নেবার কোনো ঘটনা ঘটে নি। বন্ধক নামায় যে টিপসই আছে সেটা শশাংক পালের না। তিনি যদি ইচ্ছা করেন বন্ধকনামা নিয়ে কোর্টে যেতে পারেন।

হরিচরণ বললেন, হাতি নিয়ে যাও।

কালু মিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। সে হরিচণের পা ছুঁয়ে বিদায় নিল।

হরিচরণ তাকে রুপার একটা টাকা দিয়ে বললেন, তোমার স্বভাব আচারআচরণ আমার পছন্দ হয়েছে। হাতির সঙ্গে থাক বলেই হাতির স্বভাব তোমার মধ্যে এসেছে। হাতি উত্তম প্রাণী। তুমিও উত্তম।

শশাংক পাল হাতি ফিরিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। তিনি হরিচরণের উপর নানাবিধ নির্যাতনের চেষ্টা করলেন। সমাজচ্যুতির বিষয়টা পাকাপাকি করলেন। তার ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে গেল। সোহাগগঞ্জে পাটের গদিতে আগুন লোগে। সব পুড়ে গেল। কিছু বিশ্বাসী কর্মচারী তাঁকে ছেড়ে চলে গেল। হরিচরণ দমলেন না। নাপিত বন্ধ হওয়ার কারণে তিনি চুল-দাড়ি কাটা বন্ধ করলেন। তার মাথাভর্তি চুল-দাড়ি গজল। চেহারা ঋষি ঋষি হয়ে গেল।

 

মানুষ এমন প্রাণী যে দ্রুত নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। হরিচরণ একা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সকালে গাদিতে বসেন। ব্যবসার কাজকর্ম দেখেন। গদির হিন্দু কর্মচারীদের জাতের সমস্যা হয় নি। তারা আগের মতোই আছে। তাদের দুপুরের খাবার সময় হলেই কিছু সমস্যা হয়। তখন হরিচরণকে গদিঘর থেকে চলে আসতে হয়। তিনি নিজের বাড়িতে রান্না করতে বসেন। ভাত, আলু সেদ্ধ, ঘি। কোনো কোনো দিন। ডিম। খাওয়া-দাওয়ার পর বাড়ির আশেপাশে হাঁটতে বের হন। দেখাশোনার কেউ না থাকায় বাড়ির চারদিকে ঘন জঙ্গল হয়েছে। ঘাস এবং কচুবনে বাড়ি প্রায় ঢাকা পড়ার মতো অবস্থা। কোনো একদিন মনে হয় বাড়ি পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যাবে। সেটাও মন্দ কী! বনের ভেতর হাঁটতে গিয়ে মাঝে মাঝে চমকে যাবার মতো ঘটনাও ঘটে। ঘটনাগুলো নিয়ে তার ভাবতে ভালো লাগে। একবার হিজল গাছের গোড়ায় কয়েকটা সাপের ডিম দেখলেন। আকাশী নীল রঙের ডিম। মাঝে মাঝে হলুদ ছোপ। দেখে মনে হয়, রঙ-তুলি দিয়ে কেউ ডিমগুলো এঁকেছে। সাপের মতো ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীর ডিম এত সুন্দর কেন এই বিষয় নিয়ে ভেবে ভেবে অনেক সময় পার করলেন। ক্লোলকাতায় চিঠি পাঠালেন সাপের উপর বই বুকপোস্টে পাঠানোর জন্যে।

বই পড়ার অভ্যাস তার ছিল না। এই অভ্যাস ভালোমতোই হলো। বেশির ভাগই ধর্মের বই, সাধুদের জীবনকাহিনী। পাশাপাশি ইতিহাসের বই। সন্ধ্যার পর তার প্রধান কাজ— হারিকেন জ্বলিয়ে বই পড়া। সুর করে কাশীদাসীর মহাভারত পড়তেও তার ভালো লাগে। তার মনে হয়। রামায়ণ পাঠের সময় দেহধারী না এমন অনেকেই চারপাশে জড়ো হয়। তারা নিঃশব্দে মন দিয়ে পাঠ শোনে—

হেতায় ভাবিত রাজা আশ্রমে বসিয়া।
ধীরে ধীরে কহিলেন অৰ্জ্জুনে চাহিয়া।।
শুন ভাই ধনঞ্জয়, না বুঝি কারণ।
ভীমের বিলম্ব কেন হয় এতক্ষণ।।
শীঘ্ৰগতি বৃকোদরে কর অন্বেষণ।
বুঝি ভীম কারো সনে করিতেছে রণ।।

জহির ছেলেটা প্রায়ই আসে। তার প্রধান ঝোক পুকুরের পানি। হরিচরণ তাকে সাঁতার শেখালেন। এই কাজটা করেও খুব আনন্দ পেলেন।

নিঃসঙ্গ জীবনে বনে-জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে জহিরের সঙ্গে গল্প করা তার জন্যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা। ছেলেটা অতিরিক্ত বুদ্ধিমান। বড় হলে তার এই বুদ্ধি থাকবে কি-না এটা নিয়েও হরিচরণ চিন্তা করেন। ছেলেটার সঙ্গে জ্ঞানের কথা বলতেও হরিচরণের ভালো লাগে। কারণ এই ছেলে কথাগুলো বুঝতে পারে।

জহির!

হুঁ।

মানুষের যেমন জীবন আছে গাছেরও আছে— এটা জানো?

জানি।

কীভাবে জানো?

আপনি বলেছেন।

মানুষের সঙ্গে গাছের অনেক প্রভেদ আছে। প্ৰভেদ হলো অমিল। অমিলগুলো কি জানো? –

না।

ভেবে ভেবে বলো। চিন্তা করে বলে।

গাছ কথা বলতে পারে না।

হয়েছে। আর কী?

গাছ হাঁটতে পারে না।

হয়েছে। আর কী?

জানি না।

চিন্তা করে বলো। কখনো হুট করে ‘জানি না’ বলবে না। চিন্তা করো।

ছেলেটা গম্ভীর ভঙ্গিতে গালে হাত দিয়ে চিন্তা করে। দেখতে এত ভালো লাগে! আচ্ছা জন্মান্তর কি আছে? এমন কি হতে পারে তাঁর মৃত কন্যা মুসলমান ঘরে পুরুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে? তার মেয়ের মাথায় চুল ছিল কোঁকড়ানো। এই ছেলেরও তাই। আগের জন্মে মেয়েটা পানিতে ড়ুবে মরেছিল। এই জন্মেও একটা ঘটনা ঘটেছে, তবে এই জন্মে সে রক্ষা পেয়েছে।

মাঝে মাঝে হাটের দিন যখন সুলেমান হাটে যায়, জুলেখা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসে। তার হাতে থাকে শলার ঝাড়ু। ছেলের হাতেও থাকে ঝাড়ু। দু’জনে বিপুল উৎসাহে বাড়িঘর ঝাঁট দিতে থাকে। ঘর পরিষ্কার পর্ব শেষ হলো জুলেখা খিচুড়ি রাধতে বসে। হরিচরণ তখন পাশেই থাকেন। রান্না দেখেন। রান্নার সময় জুলেখা নানান গল্প করে।

জগতের সবচে’ সহজ রান্ধন খিচুড়ি। হাতের কাছে যা আছে সব হাড়িতে দিয়া জ্বল। একটু নুন, দুই একটা কাঁচামরিচ। ব্যস।

ছেলে প্রশ্ন করে, জগতের সবচে’ কঠিন রান্ধন কী?

ভাত। ঝরঝরা নরম ভাত রান্ধা বড়ই কঠিন। একটু জ্বল বেশি হইলে ভাত গলগলা। জ্বাল কম ভাত শক্ত চাউল।

কোনো কোনো দিন জুলেখা তার বাবার গল্প শুরু করে। কবে কোনদিন তার ব্যাপজান কবিগানের প্রশ্নোত্তরে বিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন—তার গল্প। এই সময় জুলেখার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। হরিচরণের মনে হয়, মেয়েটার মুখ থেকে আলো বের হচ্ছে।

বুঝলেন বাবা! জাঙ্গির আলী, সেও বিরাট নামি মালজোড়ার গায়েন, আমার বাপজানরে কঠিন একখান সোয়াল করল— মাটি ক্যামনে সৃষ্টি হইল?

বাপজান সঙ্গে সঙ্গে বলল, (জুলেখা এই অংশে গান শুরু করল)

ওরে গুন ধান!
প্রশ্নের কী বিবরণ! সভার মাঝে করিব বর্ণন।
ধৈর্য ধরে শুনো ওরে শ্রোতাবন্ধুগণ।
দুই দিনে হয় মাটির জনম
চারদিনে আল্লাহ সব করিলেন সৃজন।

বিস্ময়কর হলেও সত্যি, হঠাৎ হঠাৎ অম্বিকাচরণ উপস্থিত হন। তিনি প্রতিবারই সমাজ থেকে পতিত হবার পর উদ্ধারের একেকটা উপায় নিয়ে আসেন। পুকুরঘাটে বসে গলা উঁচিয়ে ডাকেন- হরি! আছো? খোজ নিতে আসলাম। আছো কেমন?

ভালো আছি।

তোমার উপর কাজটা অন্যায্য হয়েছে। আমি খোজ নিয়েছি, একটা সোনার চামচে গোবর নিয়া চামচের হাতলে তিনবার দাঁতে কামড় দিলেই শরীর শুদ্ধ হয়। তারপর সেই চামচ কোনো এক সৎ ব্রাহ্মণকে দান করে দিতে হয়। কাশির এক পণ্ডিতের বিধান।

কেমন পণ্ডিত?

বিরাট পণ্ডিত। চার-পাঁচটা ন্যায়রত্ব রামনিধি পানিতে গুলে খেয়ে ফেলতে পারে। তোমার শরীর শুদ্ধির ব্যবস্থা কি করব?

যাক আরো কিছু দিন। তাছাড়া আপনি শরীর শুদ্ধি করলে তো হবে না। কেউ মানবে না। কাশির পণ্ডিতদের লাগবে।

তাও কথা। একটা কাজ করি, কোনো শুভদিন দেখে দু’জনে কাশি চলে যাই। তোমার তো অর্থের অভাব নাই। আমারে খরচ দিয়া নিয়া গেলা। পুণ্যধাম কাশি কোনোদিন দেখি নাই। দেখার শখ আছে।

নিয়ে যাব আপনাকে। কথা দিলাম। আমি উদ্ধার পাই বা না পাই— আপনার শখ মেটাব।

অম্বিকাচরণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন, হরিচরণের জন্যে তার সত্যি খারাপ লাগে।

 

হরিচরণের জন্যে আরেকজন মানুষের খুবই খারাপ লাগে, তার নাম ধনু শেখ। সে লঞ্চঘাটের টিকেট বাবু। মাঝে মাঝে টুকটাক ব্যবসা করে। কোলকাতা থেকে এক ড্রাম লাল কেরোসিন নিয়ে এসে বান্ধবপুরে বিক্রি করে। লঞ্চে পাঠিয়ে দেয় শুকনা মরিচ। এতে বাড়তি আয় যা হয় তা সে ব্যয় করে নতুন বিয়ে করা স্ত্রীর পেছনে। পাউডার, স্নো, শাড়ি, রুপার গয়না। লঞ্চঘাটের কাছেই টিনের এক চালায় তার সংসার। স্ত্রীর নাম কমলা। ধনু শেখ স্ত্রীর খুবই ভক্ত। তার একমাত্র স্বপ্ন একদিন সে একটা লঞ্চ কিনবে। সেই লঞ্চ নারায়ণগঞ্জ সোহাগগঞ্জ চলাচল করবে। লঞ্চের নাম এমএল কমলা। এমএল হলো মোটর লঞ্চ। সেই লঞ্চে কমলা নামের যে-কোনো যাত্রী যদি উঠে সে যাবে ফ্রি। তার টিকেট লাগবে না।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ লঞ্চের টিকেট কাটতে এলেই ধনু শেখ কোনো না কোনো প্রসঙ্গ তুলে হরিচরণের জাত নষ্টের কথা তুলবে।

বাবু, আপনে বলেন- মনে করেন সুন্দর একটা কুত্তার বাচ্চা রাস্তায় হাঁটতেছে। আপনে ‘আয় তু তু’ বললেন, সে লাফ দিয়া আপনের কোলে উঠল। আপনের জাইত কিন্তু গেল না। মুসলমানের এক বাচ্চা কোলে নিছেন— জাইত গেল। এখন মীমাংসা দেন— মুসলমানের বাচ্চা কি কুত্তার চাইতে অধম?

যে সব বাবুদের এ ধরনের প্রশ্ন করা হয় তারা বিব্রত হন না। বিরক্ত হন। কেউ কেউ বলেন, তুমি টিকেট বাবু। তুমি টিকেট বেচবা। এত কথা কী?

জাইত জিনিসটা কী বুঝায় বলেন। শরীরের কোন জায়গায় এই জিনিস থাকে, ক্যামনে যায়? জিনিসটা কি ধুয়াশা?

তুমি বড়ই বেয়াদব। তোমার মালিকের কাছে বিচার দিব। চাকরি চাইলে। যাবে। না খায়া মরবা।

মরলে মরব। তয় জাইতের মীমাংসা কইরা দিয়া মরব।

তুমি জাইতের মীমাংসা করার কে? জাইতের তুমি কী বুঝ?

আমি না বুঝলেও আপনেরা তো বোঝেন। আপনেরা মীমাংসা দেন।

বেয়াদবির কারণেই, ধনু শেখের টিকেট বাবুর চাকরি চলে গেল। লঞ্চ কোম্পানির মালিক নিবারণ চক্রবর্তী তাকে ধর্মপাশা অফিসে ডেকে পাঠালেন। বিরক্ত গলায় বললেন, ধনু, উইপোকা চেন?

ধনু শেখ ভীত গলায় বলল, চিনি।

উইপোকার পাখা কেন উঠে জানো?

উড়াল দিবার জন্যে।

না। উইপোকার পাখা উঠে মরিবার তরে। তুমি উইপোকা ছাড়া কিছু না। তোমার পাখা উঠেছে। তুমি সবেরে জাইত পাইত শিখাইতেছ?

ধনু শেখ বলল, কর্তা ভুল হইছে।

ভুল স্বীকার পাইলে কানো ধরা। কানে ধইরা একশ’বার উঠবোস করা।

ধনু দেরি করল না। কানে ধরে উঠবোস শুরু করল। সে ধরেই নিয়েছিল চাকরি চলে যাবে। কানে ধরে উঠবোসের মতো অল্প শাস্তিতে পার পেয়ে যাচ্ছে দেখে সে আনন্দ। তার হাঁটুতে ব্যথা, উঠবোস করতে কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট কোনো কষ্টই না।

নিবারণ চক্রবর্তী খাতা দেখছিলেন। খাতা থেকে মাথা তুলে বললেন, একশ’বার কি হইছে?

জে কর্তা হইছে।

এখন বিদায় হও। তোমার চাকরি শেষ। লঞ্চঘাটায় নতুন টিকেট বাবু যাবে। আইজ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়বা। নতুন টিকেট বাবু পরিবার নিয়া উঠবে।

আমার চাকরি শেষ?

এতক্ষণ কী বললাম?

ধনু শেখ বলল, চাকরি। যদি শেষই করবেন কান ধইরা উঠবোস করাইলেন। কী জন্যে?

নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, আগেই যদি বলতাম চাকরি শেষ তাহলে কি কানে ধরে উঠবোস করতা? এই জন্যে আগে বলি নাই।

ধনু শেখ বলল, এইটা আপনের ভালো বিবেচনা।

তোমার ছয়দিনের বেতন পাওনা আছে। নতুন টিকেট বাবুর কাছে থাইকা নিয়া নিবা। তার নাম পরিমল। যাও, এখন বিদায়। জটিল হিসাবের মধ্যে আছি।

ধনু শেখ অতি দ্রুত গভীর জলে পড়ে গেল। স্ত্রীকে নিয়ে উঠার কোনো জায়গা নেই। নিজের খরুচে স্বভাবের কারণে সঞ্চয়ও নেই।

সে কিছুদিন বাজে মালের দোকান চালাবার চেষ্টা করল। স্ত্রীর জায়গা হলো নৌকায়। ছাইওয়ালা নৌকার দু’পাশ শাড়ি দিয়ে ঘিরে তার ভেতরে সংসার।

ধনু শেখের দোকান চলল না। হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ তার দোকান থেকে কিছু কেনে না। আশ্চর্যের ব্যাপার, মুসলমানওরাও না। রাতে নৌকায় ঘুমাতে গিয়ে ধনু শেখ হতাশ গলায় বলে, বউ কী করি বলো তো।

নতুন কোনো ব্যবসা দেখবেন?

কী ব্যবসা?

ঘোড়াতে কইরা ধর্মপাশা থাইকা মাল আনবেন।

এই ব্যবসা করব না বউ। যারা ঘোড়ার মাল টানাটানি করে তারার স্বভাব হয় ঘোড়ার মতো। ঘোড়া হওয়ার ইচ্ছা নাই।

নিবারণ চক্রবর্তীর কাছে গিয়া তার পায়ে উপুড় হইয়া পইড়া দেখবেন। পুরান চাকরি যদি ফেরত পান।

ধনু শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, লাভ নাই। উনার নতুন টিকেট বাবু কাজ ভালো জানে। তার জায়গায় আমারে দিবে না।

এখন উপায়?

তাই ভাবতেছি।

অতিদ্রুত অবস্থা এমন পর্যায়ে গেল যে চাল ডাল কেনার টাকায় টান পড়ল। এর মধ্যে আরেক বিপদ কমলা গৰ্ভবতী। তার সারাক্ষণ ভুখ লাগে। এটা সেটা খেতে ইচ্ছা করে। একদিন অর্ধেকটা মিষ্টি কুমড়া কাঁচা খেয়ে ফেলল।

ধনু শেখ বলল, বৌ, তোমারে তোমার মায়ের কাছে পাঠায়া দেই?

কমলা বলল, আপনেরে এতবড় বিপদে ফেইলা আমি বেহেশতেও যাব না। তাছাড়া আমার মা’র নিজেরই খাওন জুটে না। আমার কাছে স্বর্ণের একটা চেইন আছে। এইটা বিক্রি করেন।

ধনু শেখ স্বর্ণের চেইন বিক্রি করতে পারল না। বাজারের একমাত্র স্বর্ণকারের দোকানের মালিক শ্ৰীধর বলল, এর মধ্যে সোনা বলতে কিছু নাই। সবই ক্ষয়া গেছে।

ধনু শেখ বলল, কর্তা! না খায়া আছি। স্ত্রীর সন্তান হবে।

শ্ৰী ধর বলল, তোমার সাথে বাণিজ্য করব না। তুমি জাত নিয়া অন্দ মন্দ কথা বলো। তোমার সাথে বাণিজ্য করলে শ্ৰী গণেশ বোজার হবেন। দোকান লাটে উঠব। আমিও তোমার মতো না খায়া থাকব।

বন্দক রাইখা কিছু দেন।

বন্দক রাখতে হয়। ভগবানের নামে, তোমার আবার ভগবান কী?

ধনু শেখ বলল, তাও তো কথা।

ভাদ্র মাসের একদিন ধনু শেখকে সত্যি সত্যি উপাসে যেতে হলো। সারাদিনে দুই মুঠ চিড়া ছাড়া খাওয়ার নেই। তাও ভালো কমলা খেতে পেরেছে। চাল যা ছিল তাতে একজনের মতো ভাত হয়েছে। ফ্যান ভাতে লবণ ছিটিয়ে কমলা এত আগ্রহ করে খেল যে ধনু শেখের চোখে পানি এসে গেল। সে গম্ভীর গলায় বলল, বউ, একটা জটিল সিদ্ধান্ত নিয়েছি?

কমলা আগ্রহ নিয়ে বলল, কী সিদ্ধান্ত?

ডাকাতি করব। ডাকাতি বিনা পথ নাই।

কমলা হাসতে শুরু করেই হাসি বন্ধ করে ফেলল। ধনু শেখের মুখ গম্ভীর। চোখ জ্বল জ্বল করছে।

ডাকাতি করবেন?

হুঁ।

ডাকাইতের দল থাকে। আপনের দল কই?

দল লাগে না।

কমলা বলল, আমার সন্তানের কসম দিয়া একটা কথা বলি।

ধনু শেখ কিছু বলল না।

আপনি সত্যই ডাকাতি করবেন?

হুঁ।

এই সময় ঘাট থেকে কেউ একজন ডাকল, এটা কি ধনু শেখের নাও?

ধনু নৌকা থেকে বের হয়ে দেখে হরিচরণ পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ধনু বলল, বাবু আদাব।

আদাব। তোমার সঙ্গে গল্প করার জন্যে আসছি। নায়ে উঠি?

উঠেন। আমার সাথে কী গফ করবেন? আমি একজন ছলু। জুতার শুকতলি।

হরিচরণ নৌকায় উঠলেন। ধনু শেখ পাটাতনে গামছা বিছিয়ে দিল। হরিচরণ বসতে বসতে বললেন, কুকুরের বাচ্চা এবং মানুষের বাচ্চা নিয়া তুমি যে এক মীমাংসা দিয়েছ, মীমাংসাটা আমার মনে লেগেছে।

মীমাংসার উত্তর কি আপনের কাছে আছে?

আছে।

বলেন শুনি।

হরিচরণ বললেন, মানুষের তুলনা মানুষের সাথে হবে। অন্য কোনো প্রাণীর সঙ্গে হবে না। একটা মন্দ মানুষের সঙ্গে অন্য একটা মন্দ মানুষের বিবেচনা হবে। কোনো মন্দ প্রাণীর সঙ্গে হবে না। বুঝেছ?

বোঝার চেষ্টা নিতেছি।

হরিচরণ বললেন, আরো একটা কথা আছে।

বলেন শুনি।

মানুষের তুলনায় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী তুচ্ছের তুচ্ছের তুচ্ছ। ধুলিকনার চেয়েও তুচ্ছ। ধুলিকন গায়ে তুললেও কিছু না, গা থেকে ফেলে দিলেও কিছু क†।

ধনু বলল, আপনি জ্ঞানী মানুষ। জ্ঞানী মানুষের জ্ঞানী কথা। আমি তুচ্ছ, তুচ্ছের কথাও তুচ্ছ।

শুনেছি তুমি দুদৰ্শায় পড়েছ। তোমার চাকরি চলে গেছে। আমার কাছ থেকে সাহায্য নিবে?

ধনু বলল, কী সাহায্য করবেন?

কী ধরনের সাহায্য তুমি চাও?

ধনু বিরক্ত গলায় বলল, পারলে একটা লঞ্চ কিন্যা দেন। সোহাগগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ রুটে চলবে। লঞ্চের নাম এমএল কমলা।

কমলা কে?

আমার পরিবারের নাম।

হরিচরণ বললেন, আমি তোমাকে লঞ্চ কিনে দিব। তুমি লঞ্চ ব্যবসার সঙ্গে অনেকদিন ছিলে। এই ব্যবসা তুমি জানো। তোমার বুদ্ধি আছে। চিন্তাশক্তি আছে। তুমি পারবে। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। না বুঝে কিছু করি না।

হতভম্ব, ধনু শেখ বলল, সত্যি লঞ্চ কিনে দিবেন?

হ্যাঁ।

লা ইলাহা ইল্লালাহু। এইগুলা কী বলেন?

পর্দার আড়াল থেকে কমলা মুখ বের করেছে। সে মনের উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছে না। হরিচরণ বললেন, মা, ভালো আছো?

কমলা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার মুখে কথা আটকে গেছে।

ধনু শেখ বলল, আমার কেমন জানি লাগতেছে। শরীর দিয়া গরম ভাপ বাইর হইতেছে। আপনে কিছু মনে নিবেন না। আমি নদীতে একটা ঝাঁপ দিব।

ধনু শেখ ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ে গেল।

 

জমিদার বাবু শশাংক পাল পরের বছরের সদর জমা দিতে পারলেন না। তাঁর জমিদারি বসতবাটিসহ নিলামে উঠল। হরিচরণ সাহা নগদ অর্থে সেই জমিদারি কিনে নিলেন।

এক সন্ধ্যায় দুটা হাতি নিয়ে কালু মিয়া হরিচরণের বাড়িতে উপস্থিত হলো। হরিচরণ বললেন, কালু, ভালো আছ?

কালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনে আপনের বেটির কাছে গিয়া দাঁড়ান। দেখেন আপনের বেটি আপনেরে মনে রেখেছে।

হরিচরণ হাতির পাশে দাঁড়াতেই হাতি তার ঘাড়ে গুড় তুলে দিল। হরিচরণের চোখ ভিজে উঠল।

এই অঞ্চলের প্রথম স্কুল (পরে কলেজ) হলো জমিদার বাবু শশাংক পালের বসত বাড়ি। হরিচরণের নাম হলো ঋষি হরিচরণ। তিনি তার জীবনযাত্ৰা পদ্ধতিও সম্পূর্ণ বদলে ফেললেন। একবেলা স্বপাক নিরামিষ আহার। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পূজার ঘরে চোখ বন্ধ করে আসন। বিলাস তাঁর জীবনে আগেও ছিল না, এখন আরো কমল। তবে নতুন ধরনের একটা বিলাস যুক্ত হলো। তিনি হাতির পিঠে চড়ে সপ্তাহে একদিন মনার হাওর পর্যন্ত বেড়াতে যাওয়া শুরু করলেন।

হাতি হেলতে দুলতে তাকে নিয়ে যায়। মনার হাওরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। ঘণ্টাখানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফিরে আসে।

জমিদারি কেনার কিছুদিনের মধ্যে ন্যায়রত্ন রামনিধি হরিচরণের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তিনি হরিচরণকে বললেন, আপনার জন্যে সুসংবাদ আছে। বিরাট সুসংবাদ। আমি গায়াতে বিশেষ কাজে গিয়েছিলাম। দিকপাল এক বেদান্তকারের কাছ থেকে বিধান নিয়ে এসেছি।

হরিচরণ বললেন, কী বিধান? আমি আবার জাতে উঠতে পারব?

পারবেন। তার জন্যে সাতজন সৎ ব্ৰাহ্মণকে সাতটা স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে। সাতটা বৃষ উৎসর্গ করতে হবে এবং পূণ্যধাম কাশিতে মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি স্থাপন করতে হবে। রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি হতে হবে স্বর্ণের।

হরিচরণ বললেন, আমার জাতে উঠার কোনো ইচ্ছা নাই।

ন্যায়রত্ন বললেন, কী বলেন এইসব? আপনার তো মস্কিঙ্ক বিকৃতি হয়েছে।

হরিচরণ বললেন, তা খানিকটা হয়েছে। আপনি এখন গাত্ৰোখান করলে ভালো হয়। আমার কাজকর্ম আছে।

হরিচরণ এই সময় সামান্য লেখালেখিও শুরু করলেন। দিনপঞ্জি জাতীয় লেখা।

অদ্য চৌবিংশতম আষাঢ় ১৩১৩ বঙ্গাব্দ
ইংরেজি ১৯০৮ সোমবার

গৃহদেবতায় নিবেদনমিদং। কিছুদিন যাবৎ ঈশ্বরের স্বরূপ অনুসন্ধান করিতেছি। ইহা বৃথা অনুসন্ধান। অতীতে কেউ এই অনুসন্ধানে ফল লাভ করেন নাই। আমিও করিব না। তাঁহার বিষয়ে যতই অনুসন্ধান করিব ততই অন্ধকারের গভীর তলে নিমজিত হইব। মানবের কাছে তাহার এক রূপ। মানব তাহাকে মানবের মতোই চিন্তা করিবে। তাহার মধ্যে মানবিক গুণ এবং দোষ আরোপ করিবে। আবার পশু তাহাকে পশুরূপেই চিন্তা করিবে। বৃক্ষরাজী চিন্তা করিবে বৃক্ষরূপে। এটা আমাদের চিন্তার দৈন্য, অন্য কিছু নয়।

হরিচরণ যখন এই রচনা লিখছেন তখন ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথ লিখছেন—

আমারে তুমি করিবে ত্ৰাণ, এ নহে মোর প্রার্থনা
তরিতে পারি শকতি যেন রয়,
আমার ভার লাঘব করি নাই বা দিলে সান্ত্বনা
বহিতে পারি এমন যেন হয়।

বর্মা ফেরত এক যুবা পুরুষ কোলকাতার কাছেই বাজে-শিবপুরে বাসা নিয়েছেন। তিনি একটি উপন্যাস লিখেছেন। উপন্যাসটির বিষয়ে তাঁর বিরাট অস্বস্তি। উপন্যাসটি নিম্নমানের হয়েছে। তিনি ঠিক করলেন এই উপন্যাস প্রকাশ করবেন না। তিনি পাণ্ডুলিপি তালাবদ্ধ করে ফেলে রাখলেন। উপন্যাসের নাম ‘দেবদাস’।

সেই বৎসরই (১৭ মে) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একজন ঔপন্যাসিক জন্মগ্রহণ করলেন।

সেই বৎসরের জুন মাসের দুই তারিখে কোলকাতার কাছেই মানিকতলায় ইংরেজ সরকার একটা বোমা তৈরির কারখানা আবিষ্কার করেন। অরবিন্দ ঘোষকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে হাতকড়া দিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। অরবিন্দের গ্রেফতারের খবরে পুরো বাংলায় প্রচণ্ড বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্বদেশী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে।

কমরেড মোজাফফর আহমেদ তাঁর বিখ্যাত গ্ৰন্থ ‘আমার জীবন ও ভারতীয় কমিউনিষ্ট পাটি’-তে লিখলেন–

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ থেকে আন্দোলনকারীরা প্রেরণা লাভ করিতেন। এই পুস্তকখানি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। এর মূলমন্ত্র ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গান। তাতে আছে

বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গাড়ি মন্দিরে মন্দিরে।
ত্বংহি দুৰ্গা দশপ্ৰহরণ ধরিণী…

স্বদেশ বন্দনার নামে আন্দোলনকারীরা মুসলিম বিদ্বেষমূলক এই ‘বন্দে মাতরম’ গানকে জাতীয়সঙ্গীত হিসেবে চালু করে। একেশ্বরবাদী কোনো মুসলিম কি করে এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারত? এই কথাটা কোনো হিন্দু কংগ্রেস নেতাও কোনোদিন বুঝতে পারেন নি।

ধনু শেখের লঞ্চ

ধনু শেখের লঞ্চটি একতলা। কাঠের বডি। যাত্রী ধারণক্ষমতা পঞ্চাশ। লঞ্চ চলাচল শুরু করেছে। ধর্মপাশা সোহাগগঞ্জ রুটে। লঞ্চের নাম ‘এমএল বাহাদুর’। ‘কমলা’ নামই ঠিক ছিল, এর মধ্যে কমলার এক পুত্রসন্তান হওয়ায় নাম বদলেছে। ছেলের নাম বাহাদুর। তার নামে লিঞ্চের নাম। মেয়েছেলের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া ঠিক না। এতে দোষ লাগে। আয় উন্নতি হয় না।

মাওলানা ইদরিস দোয়া পড়ে লঞ্চে বখাশে দিয়েছেন। কালিবাড়ির পুরোহিত এবং অম্বিকা ভট্টাচাৰ্যও জবাফুল, গঙ্গাজল দিয়ে লঞ্চ শোধন করে দিলেন। সারেঙের ঘরে গণেশ মূর্তি বসানো হয়েছে। যাকে বলে আটঘটি বেঁধে নামা। নিজের লঞ্চ নিয়ে ধনু শেখ গেল ধর্মপাশায়। প্রাক্তন মুনিব নিবারণ চক্রবর্তীর আশীৰ্বাদ নিতে। উনাকে লঞ্চটা দেখানোর শখও আছে। নিবারণ চক্রবর্তী বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি লঞ্চ কোম্পানি খুলেছ?

ধনু বলল, জে কর্তা। একটাই এখন লঞ্চ— নাম দিয়েছি বাহাদুর। দোতলা একটা স্টিল বডি কিনার শখ আছে, যদি আপনের আশীৰ্বাদ পাই।

এত টাকা পাইলা কই? চুরি-ডাকাতি করছ নাকি?

ডাকাতি করার ইচ্ছাই ছিল, হঠাৎ একজন কিছু টেকা দিল।

সেই একজনটা কে?

জমিদার হরিচরণ বাবু।

কাছাখোলা জমিদার? কাছ খুইলা চলাফেরা করে। খড়ম পইরা জমিদারি দেখতে যায়। সে শুনছি। দুনিয়ার টাকা উড়াইতেছে। তোমারে হঠাৎ টাকা দিল কেন? তার মতলবটা কী?

ক্যামনে বলব। কেউ কানে ধইরা উঠবোস করায়, কেউ লঞ্চ কিন্যা দেয়কারণ বোঝা মুশকিল। দুনিয়া বড় জটিল।

ঠিক কইরা বলে তো, তুমি আমার আশীৰ্বাদ নিতে আসছি, নাকি অন্যকিছু?

অন্যকিছুই না।

হরিচরণ কি আমার পিছে লাগছে? তার সাথে তো আমার কোনো বিবাদ নাই। আমার ব্যবসা। তার জমিদারি।

উনার কথা মনেও আনবেন না। সাধু মানুষরে টানাটানি করা ঠিক না। উনি বিরাট সাধু।

আমারে উপদেশ দিবা না। কচুগাছের পাতা বড় হইলেই সে বটগাছ হয় না। কচুগাছ কচুগাছই থাকে।

অবশ্যই থাকে। খাঁটি কথা বলেছেন। এজাজত দেন, বিদায় হই।

ধনু শেখ হাসিমুখে বের হলো। নিজের লঞ্চে করে সোহাগগঞ্জ ফিরল। সারেং-এর ঘরে বাতাস খেতে খেতে ফেরা। এর মজাই অন্যরকম।

প্রথম মাসের লাভের অর্ধেক সে দিতে গেল। জমিদার হরিচরণকে। হরিচরণ বললেন, আমি তো তোমার সঙ্গে লঞ্চের ব্যবসায় নামি নাই।

ধনু শেখ বলল, তাহলে টাকা দিয়েছেন কী জন্যে?

তোমাকে সাহায্য করার জন্যে। বিরাট বিপদে পড়েছিলা। নিরন্ন দিন কাটাইতেছিলা। আমার কারণেই বিপদে পড়লা, তাই সামান্য সাহায্য।

টাকা ফেরত দেয়া লাগবে না?

অন্যভাবে ফেরত দিবা। ডিসিট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায় মনিহারদির পুলটা ভাঙা। ভালো কাঠের পুল বানায়া দিবা।

পুল আপনে বানান।

আমার বানানো পুলে হিন্দুরা কেউ উঠবে না।

না উঠলে না। উঠবে। আপনের কী?

হরিচরণ চুপ করে রইলেন। ধনু শেখ তীব্রগলায় বলল, পুলে উঠবে না এইটা একটা কথা কইলেন? এরারে আমি থাপড়ায়া পুলে তুলব। আমার নাম ধনু।

হরিচরণ বললেন, ধনু নামের মানুষজন কি থাপড়াইতে ওস্তাদ?

ধনু জিব কাটল। মুরুব্বি মানুষের সামনে বেআদবি কথা বলা হয়েছে। তাকে আরো সাবধান হতে হবে। সে এখন বিশিষ্টজন। বিশিষ্টজনরা কথাবার্তা বলবে সাবধানে। হিসাব করে। একটা কথার আগে দশটা হিসাব।

 

বান্ধবপুরের আরেক বিশিষ্টজন মনিশংকর দেওয়ান। থাকেন কোলকাতায়। কাপড়ের ব্যবসা করেন। দুর্গাপূজা উপলক্ষে গ্রামে ফিরেন। বিরাট আয়োজনে দুর্গাপূজা হয়। প্রতিবছরই তিনি পূজা উপলক্ষে কিছু না কিছু মজার আয়োজন করেন। কখনো যাত্রা, কখনো ঘেটু গান, ম্যাজিক শো, সাহেববাড়ির বাজনা। শোনা যাচ্ছে, এ বছর তিনি বাইজি নাচাবেন। দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজা গ্রহণের জন্যে কাৰ্তিকও আসেন। কার্তিক আবার বারবনিতাদের গান-বাজনার ভক্ত। তাঁর অবসর সময় কাটে স্বর্গের নটিদের নৃত্যগীতাদি শুনে। দেবী দুর্গার সঙ্গে মায়ের বাড়ি বেড়াতে এসে নিরামিষ সময় কাটানো তাঁর পছন্দ না। পূজার উদ্যোক্তারা তাঁর আনন্দ বিনোদনের ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা নেন।

দুর্গাপূজার শুরুতে হরিচরণের কাছে এসে উপস্থিত হলেন শশী ভট্টাচার্য। থলেথলে পূজারি বামুন না। মোটামুটি ফিটফাট যুবা পুরুষ। বালক বালক চেহারা, মাথাভর্তি চুল। হালকা পাতলা শরীর। গায়ের বর্ণ গৌর। গায়ে হলুদ রঙের আলপাকার কোট । পায়ে চকচকে বার্নিশ করা জুতা। থিয়েটারের নায়কের পার্ট তাকে যে-কোনো সময় দেয়া যায়।

শশী ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমি ব্ৰাহ্মণ বিধায় আপনাকে প্ৰণাম করতে পারছি না। আপনি প্ৰণম্য ব্যক্তি।

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনার পরিচয়?

আমার নাম শশী ভট্টাচার্য। পিতা এককড়ি ভট্টাচাৰ্য, মাতার নাম যশোদা। তাঁরা বিত্তবান মানুষ। আমি তাদের একমাত্র সন্তান। তাঁরা সম্প্রতি আমাকে ত্যাগ করেছেন বিধায় আমি দেশে বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে এখানে উপস্থিত হয়েছি। এক দুদিন থেকে চলে যাব যদি অনুমতি দেন।

আমি অনুমতি দেবার কে?

আপনার আশ্রয়ে থাকব বলেই অনুমতি প্রয়োজন। গাছতলায় তো থাকতে পারি না। মাথার উপর চাল প্রয়োজন।

হরিচরণ বললেন, আমি জাতিচু্যত মানুষ। একজন ব্ৰাহ্মণ সন্তান আমার সঙ্গে থাকতে পারেন না।

শশী ভট্টাচার্য বললেন, সেটাও কথা।

হরিচরণ বললেন, আমি অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেই?

তাহলে খুবই ভালো হয়। আমি নির্জনে থাকতে পছন্দ করি। জলের কাছাকাছি হলে ভালো হয়। কলিকাতায় আমাদের বসতবাড়ি গঙ্গার উপরে। জল দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে।

হরিচরণ বললেন, মাধাই খালের কাছে আমার টিনের ছোট্ট ঘর আছে, সেখানে থাকতে পারেন। একজন পাঁচকের ব্যবস্থা করে দিব।

শশী ভট্টাচাৰ্য বললেন, পাঁচক ফাচক লাগবে না। আমি নিজেই রাধব। ভালো কথা, আমি অন্যের সাহায্য বা ভিক্ষা গ্ৰহণ করি না। এই যে কয়েকদিন থাকিব তার বিনিময়ে আপনার জন্যে কী করতে পারি?

হরিচরণ বললেন, কিছুই করার প্রয়োজন নেই। আপনি অতিথি। অতিথি হলেন নারায়ণ।

সব অতিথি নারায়ণ না। কিছু অতিথি বিভীষণ। যাই হোক, আমি কর্মী মানুষ। আপনার হয়ে কাজকর্ম করে দিতে আমার কোনোই অসুবিধা নেই। শুনেছি আপনি জমিদারি কিনেছেন। আমি জমিদারির কাগজপত্র দেখে দিতে পারি। খাজনা আদায় বিলি ব্যবস্থা এইসবও করতে পারি।

আপনার পিতার কি জমিদারি আছে?

ছিল। এখন নাই। এখন তারা ধর্মকর্ম নিয়ে থাকেন। তারা থাকেন ধর্মকর্ম নিয়ে, আমি থাকি বাদ্যবাজনা নিয়ে। এই নিয়েই তাদের সঙ্গে আমার বিরোধ।

আপনি বাদ্যবাজনা করেন?

হুঁ, ব্যাঞ্জো বাজাই।

আপনার ঐ বাক্সে কি কলের গান?

ঠিক ধরেছেন। কলের গান। হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির পঞ্চাশটার মতো থােল আমার কাছে আছে।

যন্ত্রটার নাম শুনেছি, কোনোদিন দেখি নাই।

আপনার কি বাদ্যবাজনার শখ আছে?

হরিচরণ বললেন, শখ নাই।

জমিদার মানুষদের শখ থাকে। আপনে কেমন জমিদার?

হরিচরণ হাসিমুখে বললেন, আমি খারাপ জমিদার।

আপনার অনেক সুখ্যাতি শুনেছি। আশা করি আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় শুভ হবে।

বাবা-মা ছেড়ে চলে আসা এই আলাভোলা ছেলেটাকে হরিচরণের অত্যন্ত পছন্দ হলো। তাঁর বারবারই মনে হলো, এই ছেলেটা যদি এখানে স্থায়ী হয়ে যেত। একটা স্কুল শুরু করা তাঁর অনেকদিনের বাসনা। ছেলেটাকে দিয়ে স্কুলের কাজ ধরা যায়। জমিদারি কাজেও মনে হয় এই ছেলে দক্ষ হবে। সমস্যা একটাই, কিছু মানুষ থাকে। কলমিশাকধর্মী। শিকড়বিহীন। কলমিশাক জলে ভাসে বলে শিকড় বসাতে পারে না। জলের উপর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। এই ছেলেটাও মনে হচ্ছে জলেভাসা।

শশী ভট্টাচার্য নিজেকে কমী মানুষ বলে পরিচয় দিয়েছিল। বাস্তবেও সেরকম দেখা গেল। অতি অল্প সময়ে হরিচরণের টিনের ঘর ভেঙে মাধ্যই খালের আরো কাছে নিয়ে গেল। এত কাছে যে বাড়ির বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসলে পা খালের পানি স্পর্শ করে। ঝোপঝাড় কেটে নিয়া বসতি। কাঠের কাজ করে দিচ্ছে মিন্ত্রি সুলেমান। করাত দিয়ে কাঠ কাটতে কাটতে সে অবাক হয়ে নতুন মানুষটাকে দেখছে। নতুন মানুষটা হাত-পা নেড়ে বিড়বিড় করে কী বলে এটা তার জানার শখ। তার ধারণা যাত্ৰা থিয়েটারের কোন পাট।

শশী ভট্টাচার্য হাত-পা নেড়ে যা করে তার নাম কবিতা আবৃত্তি। গানবাজনা ছাড়াও তার কবিতা লেখার বাতিক আছে। তার লেখা কবিতা ‘উপাসনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

সুলেমান কাজ বন্ধ করে হা করে তাকিয়ে আছে। শশী ভট্টাচার্য একটা জবাগাছের দিকে তর্জনী উঠিয়ে বলছে—

সেই তুমি মুক্ত আজি জয়ধ্বনি উঠে বাজি
অমরাবতীর সভাতলে,
ছন্দে ছন্দে কানপাতি উর্বশী নাচিছে মাতি
মহেন্দ্রের লুব্ধ আঁখিজলে।

পূজার ঢাকের বাদ্য বাজতে শুরু করেছে।

তাক দুমাদুম তাক দুমাদুম শব্দে বান্ধবপুর মুখরিত। আনন্দের ছোয়া লেগেছে মুসলমানদের মধ্যেও। ছেলেপুলেরা মহানন্দে পূজাবাড়ির উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কিছু মনে করছে না। বয়স্ক মুসলমানরা আসছে। আজ তাদেরও কেউ কিছু বলছে না।

গারোদের ধুতি পরা মনিশংকর বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যেককেই আলাদা করে বলছেন, শেখের পো’রা প্রাসাদ না নিয়া কেউ যাবে না। সাইন্ধ্যাকালে বাইজি নাচ হবে। দলে-বলে আসবা। মেয়েছেলেদের জন্যে চিকের পর্দার ব্যবস্থা प्उछ्।

পূজা নিয়ে জুলেখার সংসারে বিরাট অশান্তি শুরু হলো। জুলেখা স্বামীর কাছে বায়না ধরেছে পূজা উপলক্ষে তাকে নতুন লাল শাড়ি দিতে হবে। সুলেমান বিস্মিত হয়ে বলেছে, তোমারে শাড়ি দিব কেন? তুমি কি হিন্দু?

জুলেখা বলল, ঈদেও শাড়ি দেন নাই।

পয়সার অভাবে দিতে পারি নাই।

এখন তো পয়সা হইছে। নিয়া বারুর কাম করেছেন। এখন দেন।

সুলেমান মহাবিরক্ত হয়ে বলেছে, পূজার সময় শাড়ি দেয়া ইসলামধর্মে নিষেধ আছে। বিরাট পাপ হয়। যে শাড়ি দিবে। সে যেমন পুলসেরাত পার হইতে পারবে না, যে শাড়ি পরবে সেও পারবে না।

আপনেরে বলছে কে?

বলাবলির কিছু নাই। সবাই জানে। প্রয়োজনবোধে জুম্মাঘরের ইমাম সাবরে জিগাইতে পার।

আমার একটা মাত্র শাড়ি। ভিজা শাড়ি শরীরে শুকাইতে হয়।

সুলেমান দরাজ গলায় বলল, পূজার ঝামেলা শেষ হোক, একটা শাড়ি কিন্যা দেব।

লাল শাড়ি।

সন্তান হওনের পর লাল শাড়ি পরা নিষেধ। জিন-ভূতের নজর থাকে লাল শাড়ির দিকে। তারপরেও দেখি বিবেচনা করে।

 

জুলেখার লাল শাড়ির শখ অদ্ভুত উপায়ে মিটে গেল। মনিশংকর বাবু পূজা উপলক্ষে বিতরণের জন্যে একগাদা শাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। পূজার দ্বিতীয় দিনে তিনি ঝাকাভর্তি শাড়ি নিয়ে বিতরণে বের হলেন। হিন্দু মুসলমান বিবেচনায় না। এনে সবাইকে শাড়ি দিতে লাগলেন। জুলেখার বাড়ির সামনে যখন এসে দাঁড়ালেন তখন দুপুর। জুলেখা পুকুরে গোসল সেরে ভেজা শাড়িতে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। সুলেমান বাড়িতে নেই। তার ছেলেও বাড়িতে নেই। মনিশংকরকে দেখে গায়ে লেপ্টে থাকা ভেজা শাড়ির জন্যে তার লজ্জার সীমা রইল না। তার ইচ্ছা করল আবার ঝাঁপ দিয়ে পুকুরে পড়তে।

মনিশংকর বললেন, মাগো, আমি আপনার পুত্র। পুত্রের কাছে মাতার লজ্জার কিছু নাই। দেবী দুর্গা আপনার জন্যে সামান্য উপহার পাঠিয়েছেন। গ্ৰহণ করলে ধন্য হবো।

জুলেখা বলল, কে পাঠায়েছেন?

আমার মাধ্যমে দেবী দুর্গা পাঠিয়েছেন।

আমি মুসলমান।

জানি। মাগো, পছন্দ করে একটা শাড়ি নেন।

জুলেখা কাঁপা কাঁপা হাতে একটা শাড়ি নিল। তার কাছে মনে হলো সে তার জীবনে এত সুন্দর শাড়ি দেখে নি। জবাফুলের মতো লালশাড়ি। আঁচলে সোনালি ফুল। ফুলগুলি থেকে সোনালি আভা যেন ঠিকরে পড়ছে। শাড়ি নিয়ে সুলেমান কোনো ঝামেলা করল না। পূজার পরে তাকে শাড়ি কিনে দিতে হবে না। এই স্বস্তিই কাজ করল।

হরিচরণের বাড়িতে মনিশংকর উপস্থিত হয়েছেন। তার হাত ধরে আছে পুত্র শিবশংকর। ছেলেটা বাবার ন্যাওটা। বাবাকে ছেড়ে একমুহুৰ্তও থাকতে পারে না। পূজাবাড়ির হৈচৈ ফেলে সে বাবার হাত ধরে ঘুরছে।

হরিচরণ ব্যস্ত হয়ে উঠানে এসে দাঁড়াতেই মনিশংকর বললেন, আমার বাড়িতে মা এসেছেন। আপনি নাই কেন?

হরিচরণ বললেন, আমি কীভাবে যাব? আমি পতিতজন।

মনিশংকর বললেন, মা’র কাছে কেউ পতিত না। আমি আপনাকে নিতে এসেছি।

পূজামণ্ডপে আমি উপস্থিত হলে অন্যরা আপনাকে ত্যাগ করবে।

অন্যরা ত্যাগ করলে করবে। মা আমাকে ত্যাগ করবে না। আপনি যদি আমার সঙ্গে না যান। আমি কিন্তু আপনার উঠানে উপবাস করব।

দীর্ঘদিন পর হরিচরণের চোখে পানি এসে গেল। মনিশংকর ছেলেকে বললেন, যাও কাকাকে প্ৰণাম কর।

হরিচরণ আঁৎকে উঠে বললেন, না। না।

মনিশংকর বললেন, আপনি অতি পূণ্যবান ব্যক্তি। আপনাকে প্ৰণাম না করলে কাকে করবে!

মূল মণ্ডপের বাইরে উঠানে হাঁটুগেড়ে জোড় হস্তে হরিচরণ বসেছেন। তাঁর চোখ বন্ধ। ঘণ্টা এবং ঢাকের আওয়াজ কানে আসছে। নাকে আসছে ধূপের গন্ধ। তাঁর উচিত দেবী দুর্গার বন্দনা করা। তিনি একমনে বলছেন, কৃষ্ণ কোথায়? আমার কৃষ্ণ! কৃষ্ণ।

এইসময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মোটামুটি অপরিচিত লোকজনের মধ্যে পরিচিত একজনকে দেখে দৌড়ে এসে তার কোলে ঝাপ দিয়ে পড়ল জহির। হরিচরণ অনেকদিন আগে দেখা স্বপ্লে ফিরে গেলেন। তার মনে হলো, সত্যি স্বয়ং শ্ৰীকৃষ্ণ তার কোলে। জ্ঞান হারিয়ে উঠানে পড়ে গেলেন। চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। পূজারি ঠাকুর ঘোষণা করলেন, ধর্মচ্যুত মানুষ দেবীর কাছাকাছি আসায় এই বিপত্তি। দেবী বিরক্তি হয়েছেন। দেবীর বিরাত্ত্বিও, দূৰ্গা করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। আলাদা পূজাপাঠ লাগবে।

হরিচরণ দুর্বল শরীরে শুয়ে আছেন। তাঁকে দেখতে এসেছেন। শশী। ভট্টাচার্য। ডাক্তার কবিরাজের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে নাড়ি ধরে থেকে বলেছে, আপনার কি মৃগী আছে? হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মৃগীর লক্ষণ।

আমার মৃগী নাই।

নাই, হতে কতক্ষণ? সাবধানে থাকবেন। একাডোজ ওষুধ দিচ্ছি, খেয়ে ঘুমিয়ে থাকুন। ওষুধের কারণে সুনিদ্রা হবে। ক্লান্তি দূর হবে।

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি ডাক্তারি কর না-কি?

শশী ভট্টাচাৰ্য বললেন, আমি শখের চিকিৎসক। বায়োকেমিক চিকিৎসা করি। বায়োকেমিক চিকিৎসা বিষয়ে কি আপনি কিছু জানেন?

না।

আমাদের বায়োকেমিক শাস্ত্ৰে ওষুধের সংখ্যা মাত্র বারো। বারোটা ওষুধে সর্বরোগের উপশম। লক্ষণ বিচার করে ঠিকমতো ওষুধ দিতে পারলেই হলো।

 

শশী ভট্টাচাৰ্য মনে হয় বান্ধবপুরে স্থায়ী হয়ে গেছেন। বান্ধবপুরে প্রাইমারি স্কুল চালু হয়েছে। তিনি তার শিক্ষক। ছাত্রসংখ্যা তিন। তাঁর প্রধান কাজ ছাত্র সংগ্ৰহ করা। অপ্রধান কাজ হরিচরণের জমিদারির হিসাব-নিকাশ দেখা।

শশী ভট্টাচার্যের বর্তমান পরিচয়- পাগলা মাস্টার।

যে মাস্টার কালো একটা চামড়ার ব্যাগ হাতে ঘুরে বেড়ায়। ছোট ছেলে।পুলে দেখলে পেছন থেকে এসে ঘাড় চেপে ধরে বলে— তোর বাবার কাছে আমাকে নিয়ে যা। ভোকে স্কুলে ভর্তি করাব। পেট এত মোটা কেন? পেটভর্তি কৃমি গজগজ করছে। হা কর— ওষুধ খাবি।

রোগী পালাতে চেষ্টা করে। ঝেড়ে দৌড় দেয়। পেছনে পেছনে দৌড়ান শশী মাস্টার।

একদিন রোগীর পেছনে ছুটতে শশী মাস্টার শশাংক পালের সামনে পড়ে গেল। শশাংক পাল বললেন, আপনার পরিচয়?

রোগী ধরার জন্যে দৌড়াচ্ছি।

ও আচ্ছা! আপনি পাগলা মাস্টার। আপনার কথা শুনেছি। আমার নাম শশাংক পাল। জমিদারি ছিল। হাতিতে চড়ে ঘুরতাম। এখন হাঁটাহাঁটি করি।

শশী মাস্টার বললেন, হাঁটাহাঁটি করা শরীরের জন্যে ভালো। ভিক্ষুক শ্রেণীর যারা সারাদিন হাঁটার মধ্যে, তারা রোগমুক্ত।

শশাংক পাল বললেন, আমি বর্তমানে ভিক্ষুক শ্রেণীতেই পড়ি, তবে রোগমুক্ত না। নানান রোগ শরীরে স্থায়ী হয়েছে। ভালো কথা, আপনি কি মদ্যপান করেন?

না।

শশাংক পাল বললেন, মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে ভালো হতো। আপনার সঙ্গে মদ্যপান করতাম। একা মধ্যপান করা বড়ই কষ্টের।

শশী মাস্টার বললেন, আপনি বোতল নিয়ে আমার এখানে চলে আসবেন। আপনি বোতল নামাবেন আমি ব্যাঞ্জো বাজাব। কলের গানের গানও শুনতে পারেন। আমার একটা কলের গানও আছে।

আপনার কলের গানের কথা শুনেছি। কলের গানের গান আমি পছন্দ করি না। যে গানে গায়ককে দেখা যায় না সেই গান মূল্যহীন। আপনার চামড়ার বাক্সে কি ওষুধ? লিভারের ব্যথার কোনো ওষুধ যদি থাকে দিন। খেয়ে দেখি। আমি আবার ওষুধ খেতে খুব পছন্দ করি। যে-কোনো ওষুধ আগ্রহ করে খাই।

 

বৈশাখ মাসের এক রাতের কথা। আকাশে নবমীর চাঁদ উঠেছে। শশী মাস্টারের টিনের চালে চাঁদের আলো পড়েছে। টিনের চাল ঝলমল করছে। বনভূমির ঝাঁকড়া সব গাছ মাথায় জোছনা মেখে দুলছে। সৃষ্টি হয়েছে অলৌকিক এক পরিবেশ। শশী মাস্টার কলের গান ছেড়ে জোছনা দেখতে ঘরের বার হয়ে থমকে দাঁড়ালেন। জামঘাছের নিচে টুকটুকে লালশাড়ি পরে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।

শশী ভট্টাচার্যের হঠাৎ মনে হলো, এ কোনো মানবী না। নিশ্চয়ই স্বর্গের উৰ্বশীদের কেউ। কিংবা দেবী স্বরস্বতী স্বয়ং মর্তভূমে নেমে এসেছেন। শশী ভট্টাচার্য বললেন, কে?

তরুণী চমকে উঠল। কিন্তু জবাব দিল না। ছুটে পালিয়েও গেল না।

শশী ভট্টাচার্য বললেন, আপনি কে? এখানে কী করেন?

তরুণী নিচু গলায় বলল, গান শুনি।

আপনি কি এই অঞ্চলের?

তরুণী হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশী ভট্টাচার্য বললেন, কলের গানে গান হচ্ছে। চোঙের ভেতর দিয়ে গান আসে। একটা যন্ত্র। হাত দিয়ে দম দিতে হয়। আপনি কি যন্ত্রটা দেখবেন?

না।

আপনি কি প্রথম গান শুনতে এসেছেন? নাকি আগেও এসেছেন?

আগেও আসছি।

তরুণী চারটা আঙুল দেখাল।

শশী মাষ্টার বললেন, গান শুনতে ভালো লাগছে?

হুঁ।

আরেকটা থাল দিব!

থাল কী?

গোল থালের মতো জিনিস। যেখানে গান বাঁধা থাকে।

তরুণী বলল, গান কি দই যে বাঁধা থাকব?

একটা থাল এনে আপনাকে দেখাই? থালটা যন্ত্রের ভেতর দিয়ে হ্যান্ডল চাপলেই থাল থেকে গান হয়।

তরুণী হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশী মাস্টার বললেন, আপনার নাম কী?

নাম বলব না।

বলতে না চাইলে বলবেন না। আপনি দাঁড়ান, আমি থাল এনে দেখাচ্ছি।

তরুণী বলল, আচ্ছা।

শশী মাস্টার রেকর্ড নিয়ে এসে তরুণীকে দেখতে পেলেন না। জামগাছের নিচে কেউ নেই। আশেপাশেও নেই। কোনো এক বিচিত্র কারণে তার সারারাত ঘুম হলো না। তিনি গভীররাতে ডায়েরি খুলে লিখলেন—

I saw an Indian lady at the dead of night. Her captivating beauty was all engulfing. For a moment I lost all my senses, I felt like bowing down at her feet.

 

শ্রাবণ মাস। হাওরে পানি এসেছে। নদীনালা ফুলে ফোঁপে উঠছে। ধনু শেখ তার একতলা লঞ্চ বিক্রি করে দোতলা লঞ্চ কিনেছেন। এই লঞ্চের প্রধান বিশেষত্ব তার হর্ন। ঘাটে ভিড়েই এমন বিকট শব্দে ‘ভো’ দেয় যে বাজারের লোকজন চমকে উঠে। লঞ্চের দ্বিতীয় বিশেষত্ব হিন্দু মুসলিমের আলাদা আসন। হিন্দুরা দোতলায়। মুসলমানরা একতলায়। কোনো মুসলমান দোতলায় উঠতে পারবে না। দোতলায় ভাতের হোটেল আছে। ব্ৰাহ্মণ বাবুর্চির হাতে হোটেল। ছয় আনায় অতি উত্তম ব্যবস্থা। পেটচুক্তি ভাত। সবজি, ডাল, ছোট মাছের চচ্চড়ি। খাওয়ার শেষে একবাটি মিষ্টি দই।

মুসলমানদের জন্যে আলাদা হোটেল নেই। যারা খেতে চায় দোতলার খাবার নিচে চলে আসে। তবে মুসলমানরা সাধারণত কিছু খায় না। তাদের এত পয়সাকড়ি নেই।

দোতলা লঞ্চ চালুর দিনও ধনু শেখ গেল নিবারণ চক্রবর্তীর কাছে। তাঁর আশীৰ্বাদ নিতে।

নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, দোতলা লঞ্চ কিনেছ খবর পাইছি। অল্পদিনে ভালো দেখাইলা।

ধনু শেখ বিনীত গলায় বলল, আপনার আশীৰ্বাদ। আপনার আশীৰ্বাদ বিনা এই কাজ সম্ভব ছিল না।

লঞ্চের নাম নাকি দিছ- জয় মা কালী সার্ভিস?

জে। কর্তা।

তুমি মুসলমান হইয়া লঞ্চের নাম দিলা জয় মা কালী?

ধনু শেখ বলল, বাতাস বুইজ্যা পাল তুলছি। হিন্দু যাত্রী বেশি। সেই কারণে হিন্দু নাম।

নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, মুসলমান যাত্রী যদি বেশি হওয়া শুরু করে তখন কি নাম পাল্টাইবা?

ধনু শেখ হাসিমুখে বললেন, অবশ্যই। তখন নাম হইব ‘মা ফাতেমা সার্ভিস’।

মা ফাতেমাটা কে?

আমাদের নবিজির কন্যা।

ভালো। ভালো। খুব ভালো।

আমার অনেক দিনের ইচ্ছা আপনেরে লঞ্চ করে সোহাগগঞ্জ বাজারে নিয়া যাব। একটু ইজ্জত করব।

নিবারণ চক্রবর্তী বিরক্ত গলায় বললেন, ইজ্জত আমার যথেষ্টই আছে। তোমার ইজ্জতের প্রয়োজন নাই।

ধনু শেখ বলল, অবশ্যই অবশ্যই।

এই ঘটনার দু’দিন পরই নিবারণ চক্রবর্তীর দোতলা লঞ্চ সোহাগীগঞ্জে অচল হয়ে পড়ে গেল। ইঞ্জিনে যে ডিজেল দেয়া হয়েছিল। সেখানে নাকি পানি মেশানো ছিল। ডিজেল কেনা হয়েছিল ধনু শেখের দোকান থেকে। সে ডিজেল এবং কেরোসিনের ডিলারশিপ পেয়েছে। তার কাছ থেকে ডিজেল না কিনে উপায় নেই।

 

শশী মাস্টার ভোরবেলা ঘর ছেড়ে বের হন। মাধাই খালে একঘণ্টা সাতার কাটেন। ভেজা কাপড়েই যান স্কুলে। ভেজা কাপড় গায়ে শুকালে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এই যুক্তিতে ভেজা কাপড় গায়ে শুকান। স্কুলের ছাত্র পড়ানো শেষ করে, জমিদারির কাগজপত্র নিয়ে বসেন। দুপুরে হরিচরণের সঙ্গে ফলাহার করেন। হরিচরণের সঙ্গে টুকটাক কিছু কথাবার্তা হয়। সবই ধর্মবিষয়ক। ঈশ্বরের স্বরূপ কী? উপনিষদ বলছে- জগত মায়া। মায়ার অর্থ কী? জগৎ যদি মায়া হয়। তাহলে কি প্ৰেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতাও মায়া? শশী মাস্টারের নিজের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বরাবরই সন্ধ্যা হয়। নিত্যদিনের এই রুটিনে একদিন ব্যতিক্রম হলো। হঠাৎ জ্বর এসে যাওয়ায় স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি ফিরে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। জামগাছের নিচে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটি তাঁর ঘরে। কলের গানের সামনে বসে আছে। পেতলের চোঙের ভেতর চোখ রেখে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছে। শশী মাস্টারকে দেখে তরুণী ফ্যাকাশে হয়ে গেল। শশী মাস্টার নিজের বিস্ময় গোপন রেখে বললেন, ঐ রাতে আপনাকে দেখাবার জন্যে থাল এনে দেখি আপনি নাই। চলে গেলেন কেন?

তরুণী জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল।

শশী মাস্টার বললেন, কলের গান কীভাবে বাজে দেখাব?

তরুণী হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশী মাস্টার বললেন, আপনি কি আমার বাড়িতে এর আগেও ঢুকেছেন।

তরুণী হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে তিনটা আঙুল উঁচিয়ে দেখাল। সে তিনবার ঢুকেছে।

কলের গান দেখার জন্যে?

হুঁ।

আপনার নাম জানতে পারি? আজ কি আপনি আপনার নামটা বলবেন?

জুলেখা।

মুসলমান?

হুঁ।

গান খুব পছন্দ করেন?

জুলেখা হঁহা-সূচক মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আপনি নিজে একটা বাজনা বাজান আমি দেখছি। বেঞ্জো।

হ্যাঁ, ব্যাঞ্জো।

আপনার বাজনা ভালো না। তাল কাটে।

আপনি কি গান গাইতে পারেন?

হুঁ।

আমি কি আপনার একটা গান শুনতে পারি?

না। কলের গানটা বাজান। আমি দেখি।

শশী মাস্টার কলের গান চালু করলেন। মীরার ভজন হচ্ছে। শশী মাস্টার অবাক হয়ে লক্ষ করলেন- গান শুনতে শুনতে এই অস্বাভাবিক রূপবতী মেয়েটি চোখের পানি ফেলছে।

শশী মাস্টার বললেন, কলের গানটা আপনি নিয়ে যান। আমি আপনাকে দিলাম। উপহার।

জুলেখা বলল, আপনার জিনিস। আমি নিব কী জন্যে? আপনে আমার কে?

আরেকটা থাল দিব? অন্য গান।

জুলেখা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

 

সেই রাতে হারিকেন জ্বলিয়ে শশী মাস্টার ডায়েরি লিখতে বসলেন- What a shame! I am deeply in love with the muslim lady—মুনিগণ ধ্যান ভেঙে দেয় পয়ে তপস্যার ফল।

অনেক রাতে শশী মাস্টার একটি কবিতাও লিখলেন–

এক জোড়া কালো আঁখি; এত মূল্য তারি!
নিতান্ত পাগল ছাড়া কে করে প্রত্যয়?
জগতের যন্ত রত্ন লাজে মানে হারি—
বিনিময়ে দিতে পারি, যা কিছু সঞ্চয়!

অনেকদিন পর হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি ইসলামি গান’ শিরোনামে রূপবতী জুলেখার একটি রেকর্ড প্রকাশ করে। সেখানে তার নাম লেখা হয় চান বিবি। গানের প্রথম কলি- ‘কে যাবি কে যাবি বল সোনার মদিনায়।” সেই গল্প যথাসময়ে বলা হবে। এই ফাঁকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থাটা বলে নেই। সম্রাট পঞ্চম জর্জ এবং রানী মেরী বেড়াতে এসেছেন ভারতবর্ষে (ডিসেম্বর, ১৯১১)। তাঁদের সম্মানে দিল্লিতে এক মহা দরবার অনুষ্ঠিত হলো। সেই দরবারে সম্রাট হঠাৎ বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করলেন। মুসলমানরা মর্মাহত। মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্যে যে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন তার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ইংরেজের প্রিয়পাত্র হয়েও তিনি বঙ্গভঙ্গের কঠিন সমালোচনা করলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন আইনজীবী মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলি, মাওলানা জাফর আলি খান। রাজনীতির আসরে এই সময় যুক্ত হয়েছেন বরিশালের চাখার থেকে আসা এক তরুণ। তার নাম এ কে ফজলুল হক।

কার্তিক মাসের শেষ

কার্তিক মাসের শেষ।

উত্তরের গারো পাহাড় থেকে শীতের হিমেল হাওয়া উড়ে আসতে শুরু করেছে। এবারের লক্ষণ ভালো না। মনে হয় ভালো শীত পড়বে। দু’বছর পরপর হাড় কাঁপানো শীত পড়ে। গত দু’বছর তেমন শীত পড়ে নি।

হরিচরণ চাদর গায়ে পুকুরপাড়ে এসে বসেছেন। তাঁর মন বেশ খারাপ। তিনি খবর পেয়েছেন ধনু শেখের দোতলা লঞ্চে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভেদবমি করতে করতে একজন মারা গেছে। বান্ধবপুরে কলেরা এসে ঢুকেছে। গ্রামের পর গ্রাম শূন্য করে দেয়া এই ব্যাধির কাছে মানুষ অসহায়। তিনি মনে মনে বললেন, দয়া কর দয়াময়। যেন দেবী ওলাউঠা লঞ্চে করে বান্ধবপুর না নামেন। তার প্রার্থনার সময় বিস্ময়কর এক ঘটনা ঘটল। তার দিঘিতে একজোড়া শীতের হাঁস নামল। শীতের পাখি নামে হাওরে, মনে হচ্ছে এই প্রথম কোনো দিঘিতে নামল। দিঘিও এমন কিছু বড় দিঘি না। এরা কি মনের ভুলে নেমে পড়েছে? নাকি কোনো কারণে দলছুট হয়েছে? দলছুট হবার সম্ভাবনাই বেশি।

দুটি হাঁসের একটি পানিতে স্থির হয়ে আছে। অন্যটি একটু পরপর ড়ুব দিচ্ছে। এদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত, ঘটনা কী?

হরিচরণ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। দুটা পাখিই ঘাটের কাছে। ভয় পেয়ে ওদের উড়ে যাওয়া উচিত, তা গেল না। সম্ভবত এরা মানুষ দেখে অভ্যস্ত না। মানুষ যে বিপদজনক প্রাণী এই তথ্য এখনো জানে না। হরিচরণ বললেন, তোদের সমস্যা কী রে? একটা হাঁস তার দিকে তাকাল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ ক্লান্ত। রোগা শরীর। দুই থেকে আড়াই মাস এরা থাকবে। মোটাতাজা হয়ে দেশে ফিরে যাবে। একটা পাখি তার একজীবনে কতবার আসা যাওয়া করে এই তথ্য কি কেউ জানে? হরিচরণ ঠিক করে ফেললেন গদিতে পৌঁছেই পাখিবিষয়ক কোনো বইপত্র পাওয়া যায় কি-না জানতে চেয়ে কোলকাতায় চিঠি লিখবেন। ‘মানব বুক হাইস’ নামে একটা বইয়ের দোকানের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। তার প্রয়োজনীয় বইপত্র এরাই পাঠায়।

জুলেখা বাটিভর্তি খেজুরের রস নিয়ে এসেছে। নিজেদের গাছের রস। সে জ্বল দিয়ে ঘন করেছে। অপূর্ব ঘ্রাণ ছেড়েছে। খেজুরের রস খেজুরপাতা দিয়ে জ্বাল না দিলে ভালো ঘ্ৰাণ হয় না। জুলেখা খেজুরপাতা দিয়েই রস জ্বাল দিয়েছে।

জুলেখা লজ্জা লজ্জা গলায় বলল, আপনার জন্যে খেজুরের রস আনছি।

ভালো করেছ। রস ভালো হয়েছে। সুঘ্ৰাণ ছেড়েছে। তাকিয়ে দেখ দিঘিতে দুটা হাঁস নেমেছে।

ও আল্লা। কী আচানক! আরো কি নামবে?

নামতে পারে। সব পশুপাখি নিজেদের ভেতর যোগাযোগ রাখে। এই দুটা পাখি হয়তো অন্যদের খবর দিবে। আমি ঠিক করেছি আজ আর গদিতে যাব না। ঘাটে বসে থাকব। দেখি আরো পাখি নামে কি-না।

জুলেখা মুখে আঁচল চাপা দিতে দিতে বলল, বাবা, আপনি আজব মানুষ।

হরিচরণ বললেন, আমরা সবাই আজব মানুষ। তুমি আজব, তোমার ছেলে আজব, তোমার স্বামী আজব। ঈশ্বর নিজে আজব, সেই কারণে তিনি আজব জিনিস তৈরি করতে পছন্দ করেন। রসের বাটিটা দাও, এক চুমুকে খেয়ে ফেলি।

জুলেখা বিস্মিত হয়ে বলল, এতটা রস একসঙ্গে খাবেন?

কোনো অসুবিধা নাই, দুপুরে ভাত খাব না।

হরিচরণ তৃপ্তি করে বাটিভর্তি ঘন খেজুরের রস শেষ করলেন। পুকুরের পানিতে ঠোঁট ধুতে ধুতে বললেন, মা, তুমি নানান সময়ে নানান ভাবে আমার সেবা করছি। তোমাকে একটা উপহার দিতে চাই। কী পেলে তুমি খুশি হবে?

জুলেখা জবাব দিল না। যদিও তার ইচ্ছা করছে বলে, আমাকে একটা কলের গান কিনে দেন। এই যন্ত্রটার জন্যে আমি আমার জীবন দিয়ে দিতে রাজি। কী অদ্ভুত জিনিস! পিতলের এক চোঙ। চোঙের ভেতর দিয়ে আসে কী সুন্দর গান। একটা গান ইচ্ছা করলে দশবার শোনা যাবে। সুরে ভুল হবে না। তালে ভুল হবে না। বাজনায় ভুল হবে না। কী আজব যন্ত্ৰ! ইশ সে যদি তার বাপজানকে যন্ত্রটা দেখাতে পারত!

হরিচরণ বললেন, তোমার মনের মধ্যে কিছু আছে, বলে ফেল।

জুলেখা বলল, মনের মধ্যে কিছু নাই। বলতে বলতে সে হরিচরণের পাশে বসল। হরিচরণ বললেন, এই হাঁসের একটা নাম আছে, সেটা জানো?

জুলেখা বলল, না। এর নাম ‘দেশান্তরী পাখি’। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়, এই জন্যেই দেশান্তরী।

জুলেখার মনে হলো— কী সুন্দর নাম! দেশান্তরী। পাখিদের মতো দেশান্তরী মানুষও তো আছে যাদের কাজ এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া। তার নিজের বাবাও তো দেশান্তরী। জুলেখার ইচ্ছা করছে দেশান্তরী দিয়ে একটা গান লেখে। প্রথম লাইন—

দেশান্তরী বান্ধই গো, কোন দেশেতে যাও?

পরের লাইনটা মাথায় আসছে না। সে যদি লেখাপড়া জানত এই লাইনটা লিখে রাখত। লেখাপড়া শেখা খুব কি জটিল? সে কোরান মজিদ পাঠ করতে পারে। লিখতে পারে না।

হরিচরণ বললেন, জুলেখা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও? বলতে চাইলে বলো।

জুলেখা মাথা নিচু করে বলল, আমি বাংলা লেখা বাংলা পড়া শিখতে চাই।

হরিচরণ বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকা তরুণীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি নিজে তোমাকে শেখাব। তুমি তোমার স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখবে। মুসলমানদের মধ্যে এই বিষয়টা দেখেছি। তারা স্ত্রীদের লেখাপড়া পছন্দ করে না।

জুলেখা বলল, স্ত্রী লেখাপড়া শিখলে স্বামীর হায়াত কমে, এইজন্যে পছন্দ করে না।

এইসব তো ভুল কথা।

সবাই জানে ভুল কথা, তারপরও ভুল কথাই মানে।

তুমি সুলেমানকে আমার কাছে পাঠাবা, আমি তারে বুঝায় বলব।

সে দেশে নাই। মৈমনসিং গেছে কমে। ফিরতে একমাস লাগব। আমি কি এর মধ্যে শিখতে পারব না?

হরিচরণ কিছুক্ষণ জুলেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, অবশ্যই পারবা। বলো—অ।

জুলেখা বলল, অ।

এখন বলো, আ।

জুলেখা বলল, আ।

এক টুকরা কয়লা আনা। আমি অক্ষর দুইটা লিখব। আজ সন্ধ্যায় তোমার জন্যে বাল্যশিক্ষা কিনে আনব।

জুলেখা এক টুকরো কয়লা এনেছে। শ্বেতপাথরে সেই কয়লার দাগ বসছে না। হরিচরণ উঠে দাঁড়ালেন। ঘাটে বসে থাকার পরিকল্পনা তিনি বাদ দিয়েছেন। তিনি বাজারে যাবেন। মেয়েটার জন্যে প্লেট পেন্সিল কিনবেন। বাল্যশিক্ষা কিনবেন।

হরিচরণ ঘাট থেকে যাবার কিছুক্ষণ পরই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। দিঘিতে ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস নামতে শুরু করল। দেখতে দেখতে দিঘি হাঁসে পূর্ণ হলো। অদ্ভুত দৃশ্য। যেন দিঘিতে হাঁসের সর পড়েছে। সেই সার উঠানামা করছে। হাঁসদের কারণে দিঘি থেকে হোঁ হোঁ হোঁ, জাতীয় গম্ভীর ধ্বনি উঠছে।

একই সময় বাবু মনিশংকরের বাড়ি থেকে অসময়ে শাখের শব্দ হতে লাগল। মনিশংকরের এক জেঠির ভেদ বমি শুরু হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে দেবী ওলাউঠার দয়া। দেবীকে দূর করার জন্যেই শঙ্খধ্বনি। অদ্ভুত শব্দ আসছে শঙ্খ থেকেও। ভোঁ ভোঁ ভোঁ। যেন দূর থেকে লঞ্চ ভোঁ দিচ্ছে। শঙ্খের শব্দের সঙ্গে হাসের শব্দ মিলে একাকার হয়ে গেল।

 

সুলেমানের স্ত্রী জুলেখা আয়োজন করে পায়ে আলতা দিচ্ছে। সে বসেছে বেতের মোড়ায়। তার পা জলচৌকিতে রাখা। পাটকাঠির মাথা কলমের নিচের মতো কেটে তুলি বানানো হয়েছে। জহির মুগ্ধ চোখে মা’র পায়ের শিল্পকর্ম দেখছে। একটু দূরে ছোট ধামা ভর্তি মুড়ি এবং খেজুর গুড় নিয়ে বসেছে সুলেমান। সে তিন দিন হলো ফিরেছে। স্ত্রীর জন্যে। কচুয়া রঙের একটা শাড়ি এনেছে। এই বিষয়ে স্ত্রীর কোনো উৎসাহ নেই দেখে আহত হয়েছে। জুলেখা সেই শাড়ির ভাজ এখনো খুলে নি। নতুন শাড়ি পেয়ে কদমবুসি করা প্রয়োজন, তাও করে নি। তার পুত্র জহির মুড়ি খাওয়া বাদ দিয়ে মায়ের সাজ দেখছে, এতেও সুলেমান মহা বিরক্ত। আজ জুম্মাবার। জুম্মাবারে এত সাজসজ্জা কী?

সুলেমান জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ পুলা, মুড়ি খাইয়া যা।

জহির মা’র দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল, না।

জুলেখা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, পাও আলতা দিতে ইচ্ছা করে?

জহির সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার ছোট্ট পা জলচৌকিতে তুলে দিল। জুলেখা ছেলের পায়ে লাল টুকটুকে একটা মাছ। এঁকে দিল। জহিরের মুখভর্তি হাসি।

রাগে সুলেমানের শরীর জুলে যাচ্ছে। ছেলেকে নিয়ে সে জুম্মার নামাজ পড়তে যাবে, এর মধ্যে পায়ে আলতা! তার উচিত ছেলের গালে শক্ত করে একটা চড় দেয়া। এটা সে করতে পারছে না। জহিরের শরীর ভালো না। কালরাতেও জ্বর ছিল। এখনো হয়তো আছে।

সুলেমান বলল, সক্কালবেলা আলতা নিয়া বসিলা। কাজটা উচিত হয়েছে?

জুলেখা বলল, সক্কালে আলতা দেওয়া যাবে না। এমন কথা কি হাদিস কোরানে আছে?

এইটা কেমন কথা? তোমার উপরে কি জিন ভূতের আছর হইছে? জিন ভূতের আছর হইলে মেয়েছেলে স্বামীর মুখের উপরে ফড়িফড় করে। জঙ্গলায় ঘুরে। সময় অসময়ে গীত ধরে।

জুলেখা জবাব না দিয়ে ছেলের অন্যপায়ে আরেকটা মাছ আঁকছে। সুলেমান বলল, পুরুষ মাইনষের পাও আলতা দিতাছ?

জুলেখা বলল, জহির পুলাপান। পুলাপানের পায়ে আলতা দিলে দোষ হয় না।

এই কথা কোন বুজুর্গ আলেম তোমারে বলেছে?

জুলেখা জবাব দিল না। স্বামীর বেশিরভাগ প্রশ্নেরই সে জবাব দেয় না।

সুলেমান বলল, জহিররে নিয়া জুম্মার নামাজ পড়তে যাব। তখন যদি পাও রাঙা থাকে–

জুলেখা ফিক করে হেসে ফেলল।

সুলেমান বলল, হাসলা যে? কী কারণে হাসলা?

জুলেখা বলল, কী কারণে হাসছি আপনেরে বলব না।

জুলেখা হাসছে কারণ সে তার স্বামীকে ভালো ফাঁকি দিয়েছে। তাকে না। জানিয়ে লেখাপড়া শিখে ফেলেছে। যে-কোনো লেখা সে এখন পড়তে পারে।

সুলেমান বলল, তুই অবশ্যি বলবি।

তুই তোকারি কইরেন না।

সুলেমান কঠিন গলায় বলল, আগে বল তুই হাসলি কী জন্যে? হাসির কথা কী হইছে?

জুলেখা কিছুই বলল না, নিজের মনে পায়ে আলতা দিতে লাগল। সুলেমান মুড়ি খাওয়া বন্ধ করে উঠে এলো। প্রথমে ভেবেছিল স্ত্রীর গালে কষে থাপ্লড় দিবে। বেয়াদব স্ত্রীকে শাসন করার অধিকার সব স্বামীর আছে। মাওলানা সাহেব বলেছেন আল্লাহপাক পুরুষ মানুষরে এই অধিকার দিয়েছেন। কারণ পুরুষের অবস্থান নারীর উপরে। তবে শাসনের সময় খেয়াল রাখতে হবে স্ত্রীর মুখমণ্ডলে যেন মারের চিহ্ন না থাকে। সুলেমান থাপ্পড় উঠিয়ে এগিয়ে এলেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলাল। থাপ্পড় দেবার বদলে আলতার শিশি উঠানে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

জুলেখার একপায়ে আলতা দেয়া হয়েছে। অন্য পা খালি। আবার কবে আলতা কেনা হবে, কবে পায়ে দেয়া হবে কে জানে! বেদেবহর নৌকা করে এখনো আসে নি। তারা চলে এলে সমস্যা নেই। গাইন বেটির ঝুড়ি ভর্তি করে কাচের চুড়ি, আলতা, গন্ধতেল নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরবে। বাহারি জিনিস বেচবে। একইসঙ্গে কাইক্যা মাছের কাটা দিয়ে শরীরের বন্দ রক্ত দূর করবে। গাইন বেটিদের কাছ থেকে শখের জিনিসপত্র কেনার জন্যে এবং বাদ রক্ত বের করার জন্যে সব মেয়েই টাকা-পয়সা জমিয়ে রাখে। জুলেখারও জমা টাকা আছে।

সুলেমান বলল, ঝিম ধইরা বইসা থাকবা না। ছেলের পাওয়ের আলতা ঘইসা তোলা। আইজ জুম্মাবার। নামাজে যাব। ছেলেরে ঘাটে নিয়ে যাও। রিঠা গাছের পাতা দিয়া ডলা দাও।

জুলেখা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ছেলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছেলের দুই পায়ে দুই মাছ। কী সুন্দরই না দেখাচ্ছে মাছ দুটা! এই সুন্দর দুটা মাছ তুলে ফেলতে হবে? কাজটা বড়ই কঠিন। সুন্দর নষ্ট করা যায় না। সুন্দর নষ্ট করলে পাপ হয়। এই কথা তার ব্যাপজান তাকে বলেছিলেন।

পুকুরঘাটে পা ড়ুবিয়ে জহির বসেছে। জুলেখা তার সামনে। জুলেখার হাতে গায়ে মাখা গন্ধ সাবান। এই সাবান গত বছর গাইনবেটিদের কাছ থেকে কেনা, গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখা। সুলেমান এত দামের সাবান দেখতে পেলে রাগবে।

জহির বলল, মা গীত কর।

কোন গীত?

পাও ধুয়ানি গীত।

জুলেখা সঙ্গে সঙ্গে গাইল—

সোনার পায়ে সোনার মাছ
বিলমিল বিলমিল করে।
এই মাছেরে দিয়ে আসব
দক্ষিণ সায়রে।

গানের কথাগুলি জুলেখা এখনই তৈরি করল। তার এত ভালো লাগল। তার বাপজানের গুণ কি তার মধ্যে আছে? কোনোদিন কি সে তার ব্যাপজানের মতো মুখে মুখে গান বাঁধতে পারবে?

 

মাওলানা ইদরিস খুতবা পাঠ শেষ করলেন। মুসুল্লিদের দিকে তাকালেন। মাত্র নয়জন। তাঁর হিসেবে আরো বেশি হবার কথা। কাঠমিন্ত্রি সুলেমান তার পুত্ৰকে নিয়ে এসেছে। এটা ভালো। সুলেমান সবসময় আসে না। মাঝেমধ্যে একা আসে, ছেলেকে আনে না। শিশুদের শুরু থেকেই ধর্মকর্মে আগ্রহী করা পিতামাতার কর্তব্য। যে পিতা-মাতা এই কর্তব্যে অবহেলা করবেন। রোজ হাশরে তাদের জন্যে কঠিন শাস্তির বিধান আছে।

মাওলানা বললেন, আপনাদের জন্য সামান্য শিন্নির ব্যবস্থা আছে।

মাওলানা শিন্নির হাঁড়ি এবং চামচ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুসুল্লিরা কলাপাতা হাতে নিলেন। নবিজি মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন। নবিজির পছন্দের জিনিস করা তার উম্মতের জন্যে সোয়াবের কাজ।

শিন্নি মাওলানা নিজেই তাঁর বাড়িতে প্ৰস্তুত করেছেন। দুধ, আলোচল, গুড়, সঙ্গে কিছু কিশমিশ এবং তেজপাতা। খাঁটি দুধ। দীর্ঘসময় জ্বাল হয়ে অপূর্ব স্বাদু বস্তু তৈরি হয়েছে। সবাই আগ্রহ করে খাচ্ছে। মাওলানা দ্বিতীয়বার শিন্নি দিতে দিতে বললেন, আল্লাহপাক আমার উপর বড় একটা দয়া করেছেন বলেই এই শিন্নির ব্যবস্থা। আপনারা আমার জন্যে আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করবেন। সবাই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। কেউ জানতে চাইল না— বড় দয়াটা কী?

মাওলানা নিজেই খোলাসা করলেন। তিনি কোরান মজিদ পুরোটা মুখস্থ করেছেন। এখন তাকে কোনো আলেম হাফেজের কাছে যেতে হবে। তাকে কোরানমজিদ মুখস্থ শোনাতে হবে। হাফেজ সাহেব যদি বলেন ঠিক আছে, তাহলে নামের শুরুতে তিনি হাফেজ টাইটেল ব্যবহার করবেন। তার টাইটেল হবে হাফেজ মাওলানা ইদরিস।

জীবনের একটা আকাঙ্ক্ষাই তখন অপূর্ণ থাকবে- নবিজির মাজার জেয়ারত। হজ্ব তাঁর জন্যে ফরজ না। তিনি বিত্তহীন সামান্য মাওলানা। হজে তাঁর না গেলেও হবে, কিন্তু নবিজির মাজার জেয়ারত করা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। তিনি নবিজির মাজারের কাছে যাবেন, দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলে বলবেন, হে জগতের আলো, পেয়ারা নবি! আসসালামু আলায়কুম। আমি আল্লাহপাকের নাদান বান্দা গুনাগার ইদরিস। যে পাক কোরান। আপনার মাধ্যমে দুনিয়াতে এসেছে সেই পাক কোরান। আমি মুখস্ত করেছি। আমার দিলের একটা খায়েশ আপনেরে কোরান মজিদ আবৃত্তি করে শোনাব। যদি অনুমতি দেন।

 

জুমার নামাজ শেষ করে মাওলানা নিজের ঘরে ফিরেছেন। আজকের দিনটি স্মরণে যেন থাকে। এইজন্যে বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা লিচুগাছের চারা লাগালেন। গাছ বড় হবে’। একসময় ফল আসবে। নবিজি গাছ রোপণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একবার এক হত্যাঅপরাধীর মৃত্যুদণ্ড রদ করে গাছ রোপণের দণ্ড দিয়েছিলেন। তার শাস্তি হয়েছিল সে একশ’ খেজুর গাছ লাগবে এবং প্রতিটি গাছকে সেবাযত্নে ফলবতী করবে।

এই অঞ্চলে লিচুগাছ নেই। হিন্দুবাড়িতেও নেই, মুসলমান বাড়িতেও নেই। লোকজ বিশ্বাস— বসতবাড়ির আশেপাশে লিচুগাছ লাগানো যাবে না। লিচুগাছ মানুষকে নির্বংশ করে।

মাওলানার চালাঘরটা সুন্দর। উঠানে একটা পাতা পড়ে নেই। দু’বেলা এই উঠান মাওলানা নিজে ঝাঁট দেন। সপ্তাহে একদিন গোবর-মাটির মিশ্রণ লেপে দেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর ইসলাম ধর্মে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

লিচুগাছ লাগানোর পরপরই মাওলানা অনুভব করলেন তাঁর জ্বর আসছে। শরীর কেমন যেন করছে। গা গুলাচ্ছে। বমি আসছে। আজকের দিনের অতিরিক্ত উত্তেজনায় কি এমন হচ্ছে? মাওলানা ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন। দীর্ঘ কয়েক বছর পর আজ প্রথম তাঁর আসরের নামাজ কাজা হলো। মাগরেবের নামাজ কাজা হলো। বমি করে তিনি ঘর নষ্ট করলেন, নিজের পায়জামা-পাঞ্জাবি নষ্ট করলেন।

একজন কোরানে হাফেজ অপবিত্র থাকতে পারেন না। তাকে সবসময় অজুর মধ্যে থাকতে হবে। কারণ তাঁর শরীরে পবিত্র কোরান মজিদ। তিনি জ্বর গায়েই গোসল করলেন। ধোয়া পায়জামা-পাঞ্জাবি পরলেন।

 

সুলেমানের বাড়ি অন্ধকার। সন্ধ্যার পরপর বাড়িতে আলো দিতে হয়। সন্ধ্যায় আলো না দিলে বসতবাড়িতে ভূত-প্ৰেত ঢোকে। খারাপ বাতাস কপাটের পেছনে স্থায়ী হয়ে যায়। সুলেমানের স্ত্রী জুলেখা বাড়ির পেছনের উঠানের জলচৌকিতে বসে আছে। তার হাতের কাছে কুপি, সে এখনো কুপি ধরায় নি। সন্ধ্যা থেকে কাদছিল, এখন কান্না বন্ধ। গালে পানির দাগ বসে গেছে। আজ তাকে কঠিন শাস্তির ভেতর দিয়ে যেতে হবে তা সে জানে। শাস্তি কী হবে জানে না বলেই অশান্তি।

আজ সে অপরাধও করেছে গুরুতর। দুপুরে যখন ঘরে কেউ ছিল না। (সুলেমান গেছে হাটে। তার পুত্ৰ গেছে হরিচরণের বাড়িতে হাতি দেখতে।) তখন সে বাড়ির পেছনের পুকুরে গোসল করতে গেল। পুকুর ঠিক না, বড়সড় ডোবা। বর্ষায় পানি হয়। সুলেমান কাঠের কয়েকটা গুড়ি ফেলে ঘাটের মতো করে দিয়েছে। ডোবার চারদিকেই ঘন জঙ্গল। আরু রক্ষার আলাদা ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। জুলেখা গোসল করতে ঘাটে গেল। পানিতে নামল সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে। গায়ে কোনো কাপড় ছাড়া পানিতে ভেসে থাকার অন্যরকম আনন্দ। কেউ তো আর দেখছে না।

জুলেখা অতি রূপবতীদের একজন। আজ তাকে আরো সুন্দর লাগছে। শঙ্খর মতো শাদা গা থেকে অলো ঠিকরে আসছে। খাড়া নাক আজ অনেক তীক্ষ্ণ লাগছে। বড় বড় চোখ। ছায়াদায়িনী দীর্ঘ পল্লব যেন আরো গাঢ় হয়েছে। পান না খেয়েও ঠোঁট লাল। মাথার চুল ঈষৎ পিঙ্গল। সেই চুল নেমে এসেছে হাঁটু পর্যন্ত।

বাড়ির সীমানার বাইরে যাওয়া জুলেখার নিষেধ। বাপের দেশে নাইয়র যাওয়াও নিষেধ। বিয়ের পর সে একবার মাত্র তিনদিনের জন্যে বাপের দেশে যাবার সুযোগ পেয়েছিল। যেতে হয়েছে বোরকা পরে। সুলেমান কঠিন নিষেধ করে দিয়েছিল, পুরুষ আত্মীয়ের সামনেও বোরকার মুখ খোলা যাবে না। বাবা এবং ভাইদের সামনে খোলা যেত। জুলেখার বাবা কোথায় কেউ জানে না। ভাই যারা তারা সৎ মায়ের গর্ভের, কাজেই বোরকার মুখ খোলার প্রয়োজন পড়ছে না।

হাট থেকে সুলেমান ফেরে সন্ধ্যায়। সেদিন কোনো কারণে বা ইচ্ছা করেই সে হাটে না গিয়ে দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরল। বসত বাড়ির সদর দরজা দিয়ে সাড়াশব্দ করে না। ঢুকে ঢুকল বাড়ির পেছন দিয়ে। চুপি চুপি ঘাটলার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। কী দেখছে সে! জুলেখা সাঁতার কাটছে। চোখ বন্ধ করে চিৎ সাতার দিচ্ছে। তার নগ্ন শরীরের পুরোটাই পানির উপর ভাসছে। গুনগুন শব্দও আসছে। গান করছে না-কি! সুলেমান চাপা গর্জন করল— এই বান্দি! তুই করস কী?

মুহুর্তের মধ্যে জুলেখা পানিতে ড়ুব দিল। মানবী জলকন্যা না, দীর্ঘ সময় সে জলে ড়ুবে থাকতে পারে না। জুলেখাকে ভেসে উঠতে হলো। সে অতি দ্রুত গায়ে কাপড় জড়াল। আতঙ্কে অস্থির হয়ে সে তাকাল সুলেমানের দিকে।

সুলেমান বলল, কারে শরীর দেখানোর জন্যে নেংটা হইছস?

জুলেখা বলল, কাউরে দেখানোর জন্যে না।

সুলেমান বলল, মিথ্যা বইল্যা আইজ পার পাবি না। অবশ্যই কেউ আছে। তারে খবর দেয়া আছে। সে জংলার কোনো চিপায় আছে। তার নাম বল।

এমন কেউ নাই।

মুরগি যেমন জবেহ করে তোর গলা সেই মতো কাটব। নাম বল। তুই তো কারণে অকারণে ঐ হিন্দুর বাড়িতে বইসা থাকাস। তার ঘর ঠিক করাস। উঠান ঝাড় দেস। তার সাথে তোর কী?

উনারে আমি বাবা ডেকেছি। উনার বিষয়ে কিছু বলবেন না।

মালাউন হইছে তোর বাবা? আমারে বাবা শিখাস?

জুলেখা চুপ করে গেল। রাগে উন্মাদ একজন মানুষের সঙ্গে যুক্তি তর্ক করা অর্থহীন। সুলেমান দা হাতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাটে বসে রইল। দু’জন মুখোমুখি বসা। জহির এখনো ফিরে নি। এটা ভালো। হরিবাবুর বাড়িতে আরো কিছুক্ষণ থাকুক। হাতি দেখবে। খেলবে। রাতে তাকে নিয়ে আসবে। সবচে’ ভালো হয় রাতে ছেলে ঐ বাড়িতে যদি থেকে যায়। এখানে কী ঘটনা ঘটবে কিছুই বলা যায় না। খুন খারাবিও হয়ে যেতে পারে। পুলাপানদের এইসব দেখা ঠিক না।

সুলেমান ফিরল বিছুটি পাতার বড় একটা ঝাড় হাতে নিয়ে। তার মুখভঙ্গি শান্ত। রাগের প্রথম ঝড় পার হয়েছে। প্রথম ঝড়ের পর দ্বিতীয় ঝড় আসতে কিছু সময় নেয়। সুলেমান কুপি জ্বলিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, নেংটা হইতে তোর মজা লাগে। এখন নেংটা হা।

জুলেখা বলল, না।

সুলেমান বলল, কোনো কথা না। যা করতে বললাম করবি। শাড়ি খোল।

না।

আবার বলে না! এক্ষণ খুলিবি। তোর নেংটা হওনের স্বাদ জন্মের মতো মিটায়ে দিব। শাড়ি খোল।

জুলেখা শাড়ি খুলল। সুলেমান বিছুটি পাতার বাড়ি শুরু করল। দু’হাতে মুখ ঢেকে জুলেখা পশুর মতো গোঙাতে শুরু করল। তার শরীর ফুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। জায়গায় জায়গায় কেটে রক্ত বের হচ্ছে। ফর্সা শরীর হয়েছে ঘন লাল। বিষাক্ত বিছুটি পাতার জুলুনিতে জায়গায় জায়গায় চামড়া জমে গেছে। জুলেখার মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। দুটা চোখই টকটকে লাল।

সুলেমান বিছুটি পাতার ঝাড় ফেলে দিয়ে বলল, শাস্তি শেষ, এখন শাড়ি পর।

জুলেখা পশুর মতো গোঙাতে গোঙাতে বলল, শাড়ি পরব না। এই বাড়িতে আমি যতদিন থাকব নেংটা থাকব।

সুলেমান বলল, কী বললি?

জুলেখা বলল, কী বলেছি আপনি শুনেছেন। আমি বাকি জীবন এই বাড়িতে নেংটা ঘুরাফেরা করব।

সুলেমান বলল, জহিররে আনতে যাইতেছি। কাপড় পর। ঠাণ্ডা মাথায় কইরা দেখ—আমার জায়গায় অন্য কোনো পুরুষ হইলে শাস্তি আরো বেশি হইত।

সুলেমান ছেলেকে নিয়ে রাত ন’টার দিকে ফিরল। দরজায় খিল দেয়া। অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কানোর পর খিল খুলল। জুলেখা কাপড় পরে নি। সে সম্পূর্ণ নগ্ন। এক হাতে কেরোসিনের কুপি নিয়ে সে স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিছুই হয় নি।

সুলেমান স্ত্রীর হাত থেকে কুপি নিয়ে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। এমন দৃশ্য ছেলের দেখা ঠিক না। জহির কাঁদতে শুরু করল।

সুলেমান চাপা গলায় বলল, তুই নেংটা থাকবি?

হুঁ।

তোরে তো জিনে ধরেছে।

ধরলে ধরেছে।

আমার ঘরে তোর জায়গা নাই।

না থাকলে চইল্যা যাব।

তোরে তালাক দিলাম। তালাক। তালাক। তালাক। এখন ঘর থাইকা যাবি। নেংটা অবস্থায় যাবি।

জুলেখা স্বাভাবিক গলায় বলল, আচ্ছা।

 

মাওলানা ইদরিসের জ্বর আরো বেড়েছে। শরীর এবং হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। আরেকবার বমি আসছে। দ্বিতীয়বার বিছানা নষ্ট করা কোনো কাজের কথা না। তিনি অনেক কষ্টে হারিকেন হাতে দরজা খুলে বারান্দায় এসে খুঁটি ধরে বসলেন। শরীর উল্টে বমি আসছে, তিনি চোখে অন্ধকার দেখছেন। মনে হচ্ছে তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন এবং আজ রাত্রিতেই তাঁর মৃত্যু হবে।

শরীরের এই অবস্থায় তাঁর মনে হলো, অতি রূপবতী এক নগ্ন তরুণী। উঠানের কাঁঠাল গাছের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। শয়তান তাকে ধান্ধা দেখাতে শুরু করেছে। মৃত্যুর সময় তিনি যাতে আল্লাহখোদার নাম নিতে না পারেন শয়তান সেই ব্যবস্থা করেছে। পরীর মতো এক মেয়ের রূপ ধরে এসেছে।

মাওলানা ইদরিস বললেন, হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে শয়তানের ধোকা থেকে রক্ষা কর। তিনি আয়াতুল কুরসি পাঠ শুরু করলেন। তাঁর দৃষ্টি কাঁঠাল গাছের দিকে। মেয়েটা এখনো আছে। মাওলানা ভীত গলায় বললেন, তুই কে?

নগ্ন মেয়ে কাঁঠাল গাছের আড়ালে চলে গেল।

মাওলানা বললেন, ইবলিশ দূর হ। তোকে আল্লাহর দোহাই লাগে তুই দূর হ। দূর হ কইলাম।

মেয়েটা দূর হলো না। কাঁঠাল গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। মাওলানা জ্ঞান হারালেন।

গভীর রাতে তার জ্ঞান ফিরল। তিনি বারান্দাতেই শুয়ে আছেন। তবে তার গায়ে চান্দর। মাথার নিচে বালিশ। তারচেয়ে আশ্চর্য কথা, শয়তানরূপী মেয়েটা আছে। হারিকেন হাতে তাঁর পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে। তার গায়ে বিছানার চাদর জড়ানো।

মাওলানা ভীত গলায় বললেন, তুমি কে?

মেয়েটা জবাব দিল না। স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।

মাওলানা দৃষ্টি ফেরাতে পারলেন না। কী সুন্দরই না মেয়েটার মুখ! বেহেশতের হুরদের যে বর্ণনা আছে। এই মেয়ে সে-রকম। মাওলানা আবারো বললেন, তুমি কে?

মেয়েটা বলল, আমি জুলেখা।

মাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, জুলেখা। জুলেখা। জুলেখা। কোরান মজিদে জুলেখার কথা উল্লেখ না থাকলেও তাঁর স্বামী নবি ইউসুফের কথা অনেকবার বলা হয়েছে।

মেয়েটা বলল, আপনের কলেরা হয়েছে।

মাওলানা বললেন, জুলেখা, পানি খাব।

জুলেখা বলল, কলেরা রোগীরে পানি দেওয়া যায় না। পানি খাইলে রোগ বাড়ে।

মাওলানা বললেন, পানি খাব। জুলেখা পানি খাব।

জুলেখা ঘরে ঢুকে গেল। মাওলানার মনে হলো, শয়তান তাকে নিয়ে যে খেলা দেখাচ্ছিল সেই খেলার অবসান হয়েছে। মেয়েটা ফিরবে না।

মেয়েটা কিন্তু ফিরল। হাতে কাসার গ্রাস নিয়ে ফিরল। মাওলানা আবার বমি করতে শুরু করলেন। জুলেখা তাকে এসে ধরল। মাওলানা বললেন, তুমি কে গো?

জুলেখা জবাব দিল না।

বাজারের দিক থেকে কাসার ঘণ্টা বাজার শব্দ শুরু হয়েছে। খুব হৈচৈ হচ্ছে। কেউ একজন মারা গেছে কলেরায়। ঘণ্টা বাজিয়ে ওলাউঠা দেবীকে দূরে সরানোর চেষ্টা। দেবী একবার যখন এসেছেন এত সহজে যাবেন না। তিনি এসেছেন মায়ের বাড়ির দেশে।

 

ওলাউঠা দেবী কোনো সহজ দেবী না। বড়ই কঠিন দেবী। তিনি যখন দেখা দেন অঞ্চলের পর অঞ্চল শেষ করে দেন। শীতলা দেবীর মতো তিনি তার চেহারা দেখান না। তিনি ঘোমটায় মুখ আড়াল করে হাঁটেন। হৈচৈ পছন্দ করেন না। ধূপ ধোনার গন্ধ পছন্দ করেন না। তাঁর সবচেয়ে অপছন্দ নদী। শীতলা দেবী যেমন অনায়াসে নদীর পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে যান, তিনি তা পারেন না। তাকে খেয়ামাঝির সাহায্য নিয়ে নদী পারাপার করতে হয়।

ওলাদেবীর হাত থেকে বান্ধবপুরের হিন্দুদের রক্ষার জন্যে বীটকালীর মন্দিরে কালীপূজা দেয়া হয়েছে। পাঠা বলি হয়েছে। মাটির হাড়িতে পশুর রক্ত সংগ্ৰহ করা হয়েছে। সেই রক্ত দিয়ে সবাই ভক্তিভরে কপালে ফোঁটা দিয়েছে। কপালে যতক্ষণ এই রক্ত থাকবে ততক্ষণ ওলাউঠা দেবী কাছে ভিড়বে না। তিনি পূজার পশুর রক্ত পছন্দ করেন না। মন্ত্রপূত একটা কালো ছাগলের গলা সামান্য কেটে ছেড়া দেয়া হলো। যন্ত্রণাকাতর এই পশু যেদিকে যাবে তার পেছনে পেছনে যাবেন ওলাদেবী। ছাগল যদি ভিন্ন গ্রামে গিয়ে মরে যায় দেবীকে সেখানেই থাকতে হবে। এই ছাগলটা প্রথমে ছুটে গ্রাম সীমানার বাইরে গিয়েও কী মনে করে আবার ফিরে এলো। মারা গেল বাজারের মাঝখানে।

ওলাদেবীকে দূর করার জন্যে মুসলমানরাও কম চেষ্টা চালাল না। তারা গায়ে আতর মেখে ধূপকাঠি হাতে বের হলো। ওলাদেবী তাড়ানোর মুসলমানী মন্ত্র একটু ভিন্ন। দলের প্রধান বলেন—

বলা দূর যাওরে
আলী জুলফিকার
এই গেরাম ছাড়িয়া যাও
দোহাই আল্লাহর।

দলের প্রধানের বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্র বাকি সবাই বুক থাপড়ে জিগির ধরে –

হক নাম, পাক নাম
নাম আল্লাহর হু।
আল্লাহর নূরে নবী পয়দা
হু আল্লাহ হু।।

হরিচরণ খুব চেষ্টা করলেন ভয়াবহ এই দুর্যোগে কিছু করার জন্যে। কোনো হিন্দুবাড়িতে তিনি ঢুকতে পারলেন না। এই সময়েও জাত অজাত কাজ করতে লাগল। ওলাদেবী কিন্তু জাতিভেদ করলেন না। তিনি শূদ্রের ঘরে যেমন উপস্থিত হলেন, ব্ৰাহ্মণের ঘরেও গেলেন। দেখা গেল তার কাছে সবই সমান। ঝাপ দিয়ে পড়ল। শশী মাস্টার। যেখানেই রোগী সেখানেই তিনি। অতি আদরে রোগীর শুশ্রুষা করছেন। ডাবের পানি খাওয়াচ্ছেন। কোলে করে রোগীকে ঘর থেকে বের করছেন, আবার উঠান থেকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন।

রোগের প্রকোপ সবচে’ বেশি জেলেপল্লীতে। শশী মাস্টার সেখানে উপস্থিত হতেই একজন জোড়হস্ত হয়ে বলল, বাবু আমার নামশূদ্র। আপনি ব্ৰাহ্মণ, আমাদের এখানে ঢুকবেন না।

শশী মাস্টার বললেন, কিছুদিনের জন্যে আমিও নমশূদ্র। এখন ঠিক আছে?

ওলাদেবীকে আটকানোর জন্যে প্রথম খেয়া পারাপার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বান্ধবপুরের মুরুব্বিারা পরে চিন্তাভাবনা করে ঠিক করল, খেয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্তটা ভুল। তাদের উচিত ওলাদেবীকে নদী পার করে দেয়া। দেবীর বিদায় মানেই রাহুমুক্তি। খেয়া বন্ধ করে দেবীকে আটকে রাখার অর্থ বিপদ মাথায় নেয়া।

দেবী দিনে চলাফেরা করেন না। উনার হাঁটাচলা সূর্য ডোবার পর। বড়গাঙে সন্ধ্যার পর খেয়া চলাচলের ব্যবস্থা নেয়া হলো। খেয়া পারাপার করবে শেখ মার্দ। অতি সাহসী মানুষ। তাকে বলে দেয়া হলো, ঘোমটায় মুখ ঢাকা কেউ যদি উঠে তাকে পার করতে হবে। তার সঙ্গে কোনো কথা বলা চলবে না। পারানি চাওয়া যাবে না। দেবী যেন নৌকায় উঠেন। সেই ব্যবস্থাও করা হলো। বান্ধবপুরে সন্ধ্যার পর থেকে কাসার ঘণ্টা বাজে, ঢোল খোল করতাল বাজে। মশাল হাতে লোকজন ছোটাছুটি করে।

এমন অবস্থায় রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে ঘোমটায় মুখ ঢেকে কেউ একজন শেখ মৰ্দর নৌকার পাশে এসে দাঁড়াল। অসীম সাহসী শেখ মর্দর বুক কেঁপে উঠল। সে কোনো কথা না বলে নৌকা ছাড়ল।

আকাশে মেঘ। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঘোমটা পরা তরুণী দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে আছে। তরুণীর নাম জুলেখা। একসময় সে অস্ফুট স্বরে বলল, কী সৌন্দর্য গো! কী সৌন্দর্য

ঠিক একই সময় জুলেখার বয়সি একটা মেয়েও জাহাজে করে আটলান্টিক পার হচ্ছিল। সে একা একা জাহাজের ডেকে বসেছিল। সেও মহাসাগরের শোভা দেখে জুলেখার মতোই মুগ্ধ বিস্ময়ে বলেছিল— কী সুন্দর! কী সুন্দর!

মেয়েটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মাদাম কুরি। তিনি রেডিও অ্যাকটিভিটি আবিষ্কার করেছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ট্রাষ্টের আমন্ত্রণে বেড়াতে যাচ্ছেন আমেরিকায়।

আমাদের জুলেখার সেই বৎসর স্থান হলো কেন্দুয়ার বিখ্যাত নিষিদ্ধ পল্লীতে। স্থানীয় ভাষায় যার নাম রঙিলা নটিবাড়ি’।

————-

Encyclopedia Britanica’র প্রাচীন সংস্করণে কেন্দুয়ার উল্লেখ ছিল। সেখানে লেখা ছিল Kendua a place for dancing girls. আনন্দদায়িনী নর্তকীদের মিলনমেলা।

রঙিলা নটিবাড়ি

রঙিলা নটিবাড়ি সোহাগগঞ্জ বাজারের শেষ মাথায়। মাছের আড়ত পার হয়েও আট-দশ মিনিট হাঁটতে হয়। রাস্তার দু’পাশে আপনাতে গজিয়ে ওঠা বেশকিছু শিমুলগাছ। যে-কেউ দেখে ভাববে কোনো এক বৃক্ষপ্রেমী চিন্তাভাবনা করে শিমুলের সারি লাগিয়েছেন। চৈত্রমাসে শিমুলের টকটকে লাল ফুল ফোটে। দেখতে ভালো লাগে। মনে হয়। চৈত্রের তীব্ৰ উত্তাপে গাছের মাথায় আগুন লেগে গেছে।

মূল বাড়ি কাঠের। উপরে টিন। মূল বাড়ি ঘিরে এক রুমের বেশ কিছু ছোট ছোট ঘর। কাঠের মূল বাড়িটা দর্শনীয়। উচ্চতায় প্রায় দোতলা বাড়ির সমান। দরজা এবং পাল্লায় ফুল লতাপাতা আঁকা। টিনের চৌচালাতেও নকশা কাটা। লখনৌ-এর বাইজি আংগুরি অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে মূল বাড়ি তৈরি করে। এই বাড়িতে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। তার নাম বেদানা। তিন বছর বয়সে বেদানা পানিতে ড়ুবে মারা যায়। বেদানার মৃত্যুর পর আংগুরির আর কোনো খোজ পাওয়া যায় নি। কেউ বলে আংগুরিও মেয়ের মতো পানিতে ড়ুবে গেছে। আবার কারো কারো মতে আংগুরি দেশান্তরী হয়েছে।

‘দেশান্তরী’ শব্দটা এলাকার মানুষের অতি প্ৰিয়। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হলেই স্বামীরা বলে, দেশান্তরী হবো, আসাম চলে যাব। দেশান্তরী হয়ে আসাম চলে যাবার বাসনার কারণ— আসাম খুব দূরের দেশ না। বন-জঙ্গল পাহাড়-পর্বতের অঞ্চল। সেখানেই আছে কামরূপ কামাক্ষ্যা। জাদুবিদ্যার দেশ। কামরূপ কামাক্ষ্যার অতি রূপবতী নারীরা পুরুষদের বশ করে চিরদিনের জন্যে রেখে দিতে পছন্দ করে। দেশান্তরী হয়ে আসাম চলে গেলে ফেরা হয় না। সেই কারণেই।

জুলেখা রঙিলা নটিবাড়িতে আনন্দে আছে। জায়গাটা তার পছন্দ হয়েছে। অনেক উঁচু, প্রায় টিলার মতো। বর্ষাকালে সোহাগগঞ্জ বাজারের অনেকটা ড়ুবে যায়। রঙিলা বাড়ি শুধু ভেসে থাকে। দূর থেকে দেখা যায় পানির উপর নকশা কাটা কাঠের একটা বাড়ি ভাসছে। বাড়ির চারদিকে টিনের ছোট ছোট ঘরের চাল থেকে সূর্যকিরণ প্রতিফলিত হয়ে ঝলমল করে। সন্ধ্যাবেলা হারমোনিয়াম এবং সারেঙ্গির শব্দ ভেসে আসে। বড়ই রহস্যময় লাগে। বর্ষাকালে এই রহস্যময় জায়গায় লোকজনকে আসতে হয় নৌকায়। বেশিরভাগ খদের ভাটি অঞ্চলের পয়সাওয়ালা শৌখিনদার। হাওরের মাছ বিক্রির কাঁচা টাকা নিয়ে এরা আসে। কোমরে টাকার থলি বাধা থাকে। একটু নড়াচড়া করলেই ঝন ঝন শব্দ হয়। নটি মেয়েদের কাঁচা রূপার টাকা নজরানা দেয়া দস্তুর। ময়লা কাগুজে নোটে শৌখিনদারি প্রকাশ পায় না। রঙিলা বাড়ির ঘাটে যখন নৌকা ভিড়ে তখন তারা চারদিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসে। তাদের বড়ই অস্থির মনে হয়। পরিচিত কেউ দেখে ফেলল। কি-না এই চিন্তাতেই তারা অস্থির।

অতিরিক্ত পয়সাওয়ালা শরিফ আদমিদের মধ্যে অস্থিরতা থাকে না। তারা বজরা নিয়ে আসে। বজরা থেকে নামে না। তাদের সঙ্গে মাহফিল করতে রঙিলা

ব্যাপারে সাবধানি। হিসাব ছাড়া খরচ করে ভাটি অঞ্চলের বেকুবরা। এরা সব টাকা শেষ করে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে যায়। তখনও তাদের মধ্যে হাসি থাকে। সেই হাসি অন্যরকম। যেন তারা একটা কাজের কাজ করেছে।

জুলেখা রঙিলা বাড়িতে ভর্তি হয়ে নতুন নাম নিয়েছে চান বিবি। নতুন নাম নেয়াই দস্তুর। অতীত পেছনে ফেলে আসতে হবে। যা গেছে তা গেছে। অতীত নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। এও এক ধরনের সংসার। প্রতিরাতে স্বামী বদলের সংসার। এটাই মন্দ কী?

চান বিবি একটা টিনের ঘর পেয়েছে। ঘরটা তার বড়ই পছন্দের। সামনেই বড়গাঙ। ঘরের বারান্দায় বসে থাকলে বড়গাঙ ছাড়িয়ে দৃষ্টি অনেক দূরে চলে যায়। তখন খুব উদাস লাগে। ঘরের সামনেই বিশাল এক কামরাঙা গাছ। এই গাছে সারা বছরই কামরাঙা হয়। ভয়ঙ্কর টক, কাক দেশান্তরী জাতের কামরাঙা (কাক দেশান্তরী : যে টক ফল খেলে কাক দেশান্তরে পালিয়ে যায়)। এই গাছটাও চান বিবির পছন্দ। গাছের নিচে বসলে চিড়ল চিড়ল পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে গায়ে পড়ে। এত ভালো লাগে। চান বিবি ঠিক করেছে, তার যদি কিছু টাকা-পয়সা হয় তাহলে সে কামরাঙা গাছের তলাটা নিজ খরচে বঁধিয়ে দেবে। বাধানো ঘাটে শীতলপাটি বিছানো থাকবে। শীতলপাটির উপরে পরিষ্কার ফুলতোলা বালিশ। কখনো সে বালিশে শুয়ে আকাশ দেখবে। আবার কখনো গাছে হেলান দিয়ে অতি দূরের গ্রামের সীমানা দেখবে।

চান বিবির ফুট ফরমাস খাটার জন্যে তাকে সাত-আট বছরের একটা মেয়ে দেয়া হয়েছে। মেয়েটার নাম হাছুন। চান বিবি হাছুনকে নিজের মেয়ের মতো যত্ন করে। মাথায় তেল দিয়ে চুল বেঁধে দেয়। সপ্তাহে একদিন জলেভাসা সাবান দিয়ে তার গা ডলে দেয়। হাছুন চান বিবিকে মা ডাকে। সারাদিনই সে ঘর পরিষ্কার করে। সন্ধ্যাবেলা কার্তিকের মূর্তিতে প্ৰদীপ জ্বেলে দেয়। ধূপদানে ধূপ জ্বলে। রঙিলা বাড়ির প্রতিটি ঘরেই কার্তিকের মূর্তি আছে। কাৰ্তিক পতিতাদের দেবতা। পতিতা হিন্দু হোক মুসলমান হোক, তার ঘরে কার্তিকের মূর্তি থাকবেই।

রঙিলা বাড়ির মালেকাইন হিন্দুস্থানি। নাম সরাজুবালা। এই হিন্দুস্থানি মালেকাইনকেও চান বিবির পছন্দ। বয়স পঞ্চাশের উপরে। গায়ের রঙ পাকা ডালিমের মতো। সন্ধ্যাবেলা। তিনি যখন চোখে কাজল দিয়ে সারেঙ্গি নিয়ে বসেন তখন তাকে দেখলে চান বিবির অদ্ভুত লাগে। তার কাছে মনে হয় এই মহিলা পৃথিবীর কেউ না। অন্য কোনো জগতের। তার গানের গলাও চমৎকার। মীরার ভজন গাওয়ার সময় সরাজুবালার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। এই দৃশ্য দেখেও চান বিবি মুগ্ধ।

রঙিলা বাড়িতে প্রথম ঢোকার পর মালেকাইন তাকে সামনে বসিয়ে গায়ে হাত রেখে যে কথাগুলি বলেন, সে কথাগুলি চান বিবির মনে গেথে আছে। তিনি কথা বলেন বাংলা এবং হিন্দুস্থানি মিশিয়ে। সেই কথাও চান বিবির গানের মতো লাগে।

শোন জুলেখা, তুমি রূপ নিয়ে দুনিয়াতে আসছি। গরিব ঘরের মেয়ে। এইটাই তোমার পাপ। যে নিজেই পাপ তার কপালে পাপ ছাড়া আর কী থাকবে? সে তো পাপের বাড়িতেই ঢুকবে। এই বাড়িতে পাপ কাটার ব্যবস্থা কিন্তু আছে। যে পুরুষ তোমার কাছে আসবে, সে যদি তোমার সেবায় সন্তুষ্ট হয় তাহলে তোমার কিছু পাপ কাটা যাবে। কারণ মানুষ ভগবান। মানুষকে তুষ্ট করা ভগবানকে তুষ্ট করা একই জিনিস।

তোমার রূপ আছে। সেই রূপ ধরে রাখতে হয়। রূপ ধরে রাখার নিয়মকানুন আছে। আমি তোমাকে শেখাব। তোমার যদি গানের গলা থাকে আমি তোমাকে গান শেখাব। নাচ শেখােব। যদি তোমার কপালে থাকে, তুমি বহু টাকা উপার্জন করবে। যারা তোমার কাছে আসবে, তাদের মধ্যে কারো সঙ্গে যদি আশনাই হয় তাকে বিবাহ করতে পাের। আমার কোনো অসুবিধা নাই। খাওয়া খাদ্যের মধ্যে নিরামিষ খাবে। নিরামিষ শরীর ঠিক রাখবে। শরীরই আমাদের সম্পদ- এটা মাথায় রাখবে।

ড্যান্স মাস্টার তোমাকে নাচ শেখাবে। শরীরের ভেতরে যদি নাচ থাকে। তাহলে নাচ শিখতে পারবে। যদি না থাকে, তাহলে শিখতে পারবে না। তারপরেও ড্যান্স মাষ্টার তোমাকে নাচ শেখাবে। নাচ করলে শরীর ঠিক থাকবে। ঠিকমতো নাচ করলে মন ঠিক থাকে। সেবাদাসীরা মন্দিরে দেবতার সামনে নাচ করে শরীর এবং মন দুটাই ঠিক রাখে।

আমাদের এই বাড়িটাও মন্দির। যেসব পুরুষ এই বাড়িতে আনন্দের খোজে আসে তারা দেবতা।

কখনো নিলাজ হবে না। পুরুষমানুষ। নটি বেটির কাছেও লজ্জা আশা করে। কোনো যক্ষ্মারোগীকে ঘরে নিবে না। যত টাকাই সে দিক তাকে ঘিরে নেয়া যাবে না। যক্ষ্মীরোগী চেনার উপায় আছে। আমি তোমাকে শিখায়ে দেব। তোমার স্বামী, স্বামীর দিকের আত্মীয় কাউকে ঘরে নিবে না। স্বামীকে কোনো অবস্থাতেই না। খদেরদের কারো কারো স্ত্রীরা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। তাদের সঙ্গে কখনো কোনো অবস্থায় দেখা করবে না। খদের আমাদের দেবতা। খন্দেরের স্ত্রীরা উপদেবতা। উপদেবতারা ভয়ঙ্কর। তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়।

যদি কখনো মনে কর এই জায়গা, এই জীবন তোমার পছন্দ না, তুমি চলে যেতে চাও, তাহলে চলে যাবে। কেউ তোমাকে আটকাবে না। আমি জেলখানা খুলে বসি নাই। দুঃখী মানুষের জন্যে আনন্দ-ফুর্তির ব্যবস্থা করেছি। মানুষকে আনন্দ দেয়ার মধ্যে পুণ্য আছে। তুমি নিজেও আনন্দে থাকার চেষ্টা করবে।

চান বিবি আনন্দে থাকার চেষ্টা ছাড়াই আনন্দে আছে। নতুন জীবনের শুরুতে প্রথম পুরুষটিকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে। ভাটি অঞ্চলের বোকাসোকা চেহারার একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। ফর্সা, লম্বা। চোখেমুখে দিশাহারা ভাব। সে খুব ভয়ে ভয়ে বিছানায় পেতে রাখা শীতলপাটিতে বসল। পকেট থেকে ফুলতোলা ময়লা রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল। বিড়বিড় করে বলল, পানি খাব ।

চান বিবি ঝকঝকে কাসার গ্রাসে পানি এনে দিল। লোকটা এক চুমুক পানি খেয়েই গ্রাস নামিয়ে রাখতে রাখতে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, খুবই গরম।

চান বিবি বলল, বাতাস করব?

না, বাতাস লাগবে না।

দরজার আড়ালে হাছুন উকিঝুকি দিচ্ছিল। চান বিবি তাকে ইশারা করতেই সে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস শুরু করল। লোকটি বিস্মিত হয়ে বলল, আপনার মেয়ে?

চান বিবি বলল, আমার মেয়ে না। তবে মেয়ের মতোই। আমাকে আপনি আপনি বলতেছেন কী কারণে? আমি বয়সে আপনার ছোট।

লোকটি চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাই।

চান বিবি বলল, চলে যাবেন? কিছুক্ষণ জিরান। বাতাস খান। শরীর ঠাণ্ড। করেন। মন ঠাণ্ডা করেন। আসেন, গল্প করি।

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে বসল। আবার পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল। তবে এবার রুমালটা পকেটে ঢুকাল না। হাতে নিয়ে বসে রইল। চান বিবি বলল, রুমালে সুন্দর ফুলের কাজ। কে করেছে? আপনার স্ত্রী?

হুঁ।

আপনার ছেলেমেয়ে আছে?

দুই মেয়ে।

তারা দেখতে সুন্দর?

হুঁ।

আপনার স্ত্রীর চেহারা কেমন? সুন্দর?

হুঁ।

আমার চেয়েও সুন্দর?

না

আপনি কি কিছু খাবেন? শরবত বানায়ে দিব?

না।

ঘরে মিষ্টি আছে। মিষ্টি দিব? বেগমগঞ্জের লাড্ডু।

না।

আপনার স্ত্রীর নাম কী? বলতে না চাইলে বলতে হবে না। বলতে ইচ্ছা করলে বলেন।

তার নাম বলব না।

মেয়ে দুটার নাম কী? বলতে না চাইলে বলতে হবে না। বলতে ইচ্ছা করলে বলেন।

বড় মেয়ের নাম শরিফা। ছোট মেয়ের নাম তুলা।

তুলা নাম রেখেছেন কেন? জন্মের সময় খুব হালকা ছিল?

হুঁ। সাত মাসে হয়েছে। বাঁচার আশা ছিল না। হালিমা তাকে শিমুল তুলার বস্তায় ভরে বাঁচায়ে রেখেছিল। এখন তুলার স্বাস্থ্য খুবই ভালো। সারাদিন মারামারি করে। কামড় দেয়া শিখেছে। কামড় দিয়ে রক্ত বের করে দেয়।

আপনার স্ত্রীর নাম হালিমা?

হুঁ।

নাম বলে ফেলেছেন, এখন কি আপনার খারাপ লাগছে?

লোকটা চুপ করে রইল। প্রসঙ্গ পাল্টে জুলেখা বলল, আপনার মেয়ে তুলা আপনাকে কামড়ায়?

অনেকবার। আমার সারা গায়ে তার কামড়ের দাগ। সে শুধু তার মারে কামড়ায় না।

চান বিবি বলল, আপনার মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে।

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে গেল। কয়েকবার টোক গিলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কালো কাপড়ের ছোট্ট থলি বের করে পাশে রাখতে রাখতে বলল, এখানে দশটা রুপার টাকা আছে। টাকার পরিমাণ কি ঠিক আছে?

চান বিবি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। লোকটা উঠে দাঁড়াল। চান বিবি বলল, চলে যাবেন?

হুঁ।

বিশ্রাম করেন। রাতটা থাকেন, সকালে যান।

न।

তাহলে আরেকদিন আসেন। সেদিন টাকা ছাড়াই আসেন।

আমি আর আসব না।

আমার উপর কোনো কারণে কি আপনি নারাজ হয়েছেন?

না। তুমি ভালো মেয়ে।

আপনার স্ত্রীর চেয়েও কি ভালো?

লোকটার চেহারা সামান্যক্ষণের জন্যে কঠিন হয়ে গেল। চান বিবি আগ্ৰহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। কঠিন মুখভঙ্গি সহজ হলো। লোকটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না।

রুপার টাকার থলেটা চান বিবি সরাজুবালার কাছে পাঠিয়ে দিল। এটাই নিয়ম। সরাজুবালা সেখান থেকে নিজের অংশ রেখে ফেরত পাঠাবেন। চান বিবির পুরো টাকাই সরাজুবালা ফেরত পাঠালেন। প্রথম রোজগারে ভাগ বসালেন না। চান বিবি প্রথম রোজগারের টাকায় তার ছেলে জহিরের জন্যে জামা, জুতা কিনল। বান্ধবপুর জুম্মা মসজিদের ইমাম সাহেবের জন্যে একটা তুর্কি ফেজ টুপি কিনল। শশী মাস্টারের জন্যে কিনল নকশি করা সিলেটের শীতলপাটি। জিনিসগুলি হাতে নিয়ে সে কিছুক্ষণ কাঁদল।

 

ভদ্রঘরের একটি মেয়ের স্থান হয়েছে। রঙিলা বাড়িতে— এই ঘটনা বান্ধবপুরে কোনো আলোড়ন তুলল না। অনেক দিন এই বিষয়টা কেউ জানলও না। সুলেমান সবাইকে বলল, স্ত্রীকে সে তালাক দিয়েছে। স্ত্রী চলে গেছে তার বাপ ভাইয়ের কাছে। মুসলমান সমাজে স্ত্রীকে তালাক দেয়া এবং স্ত্রীর বাপ-ভাইয়ের কাছে চলে যাওয়া অতি স্বাভাবিক ঘটনা। এক স্ত্রী চলে যাবে অন্য স্ত্রী আসবে। স্ত্রী একা আসবে না, সঙ্গে দাসী নিয়ে আসবে। স্ত্রীর গর্ভে যেমন সন্তান হবে, দাসীর গর্ভেও হবে। স্ত্রীর গর্ভের সন্তানরা সম্পত্তির ভাগ পাবে। বান্দির গর্ভের সন্তানরা পাবে না। তারা কামলা খাটবে। তাদের বিয়েশাদি হবে তাদের মতোই বান্দি বংশের লোকজনদের সঙ্গে। সহজ হিসাব।

তখনকার ব্যবস্থায় রঙিলা বাড়ি এমন কিছু খারাপ জায়গা না। পুরুষ মানুষদের আমোদ-ফুর্তির অধিকার আছে। তারা খাটাখাটনি করে অর্থ উপার্জন করে। সেই অর্থের খানিকটা যদি নিজের আনন্দের জন্যে ব্যয় করে, তাতে ক্ষতি কী? পুরুষ মানুষ দিনরাত স্ত্রীর আঁচলে বাধা থাকলে ধরতে হবে সে পুরুষ মানুষই না। তার কোনো সমস্যা আছে। ক্ষমতাবান পুরুষদের হতে হবে শৌখিনদার। তারা বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করবে। রঙিলা বাড়িতে যাবে। কিছুদিনের জন্যে বাড়িতে ঘাটুগানের ছেলে নিয়ে আসবে। ঘাটুগানের এইসব ছেলে নৃত্যবিদ্যা এবং সঙ্গীতে পারদশী। শৌখিনদার পুরুষের নানান আবদার (!) এরা মিটাবে। এইসব কর্মকাণ্ডে স্ত্রীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার কিছু নাই। ঘাটুছেলেরা তাদের সতিন না। এরা কিছুদিনের জন্যে এসেছে। সতিনের মতো চিরস্থায়ী সত্ত্ব নিয়ে আসে নি।

বান্ধবপুর সেই সময় অতি বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। রমরমা পাটের ব্যবসা। লবণের ব্যবসা। মাছের ব্যবসা। নতুন লঞ্চঘাট হয়েছে। দিনরাত লঞ্চের ভোঁ শোনা যায়। বরফকল বসেছে। প্যাটরায় বরফ ভর্তি হয়ে দৈত্যকৃতির মাছ চলে যায় নারায়ণগঞ্জ, কোলকাতায়। জলমহাল নিয়ে মারামারি খুনখুনি হয়। সাহেব পুলিশ অফিসার হাতিতে করে তদন্তে আসেন। তদন্ত শেষে পাখি শিকার করেন। সন্ধ্যার পর তাঁবুতে রঙিলা উৎসব হয়। নর্তকীরা নাচ-গান করে। ঘাটছেলেরা বুকে নারিকেলের মালা বেঁধে ঠোঁটে রঙ দিয়ে অশ্লীল ভঙ্গিমায় অতি নোংরা গান ধরে। সাহেবরা ঘনঘন মাথা নেড়ে বলেন, Not bad, Not bad at all.

এই বিপুল কর্মকাণ্ডে আমাদের জুলেখা অতি নগণ্য একজন। আপাতত তার কথা থাকুক। আমরা চলে যাই হরিচরণের স্কুলে। স্কুলের ছাত্র সংখ্যা নয়। নয়জনের মধ্যে একজন মাত্র মুসলমান। তার নাম জহির। এই ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো। শুধু ভালো বললে কম বলা হবে। অতিরিক্ত ভালো। স্মরণশক্তি অসাধারণ। একবার কিছু পড়লেই তার মনে থাকে। শশী মাস্টার তার এই ছাত্রটিকে কোনো এক বিচিত্র কারণে সহ্য করতে পারেন না।

ব্রিটিশ সরকার সে সময়ে একটি বৃত্তি চালু করেছিলেন। সমগ্ৰ ভারতে ক্লাস টুর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বৃত্তি দেয়া হতো। মাসিক দুটাকা হারে এক বৎসরের জন্যে বৃত্তি। সুলেমানের ছেলে জহির এই বৃত্তি পেয়ে সবাইকে চমকে দিল। জেলা শিক্ষা অফিসার আলহাজ রমিজউদ্দিন সাহেব বৃত্তির খবর নিয়ে বান্ধবপুরে উপস্থিত হলেন। জহিরের মাথায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে দোয়া করলেন। তারপর জহিরকে কাছে টেনে গলা নামিয়ে বললেন, তোমার মা নাকি তোমাদের সঙ্গে থাকে না। এটা কি সত্য?

জহির বলল, সত্য।

সে থাকে কোথায়?

জহির চুপ করে রইল। জবাব দিল না।

কোথায় থাকে জানো না?

জহির এই প্রশ্নেরও জবাব দিল না। আলহাজ রমিজউদ্দিন গলা আরো খাদে নামিয়ে বললেন, লোকমুখে শুনলাম তোমার মা রঙিলা নটিবাড়িতে থাকে, এটা কি সত্য?

সত্য।

ঠিক আছে। ঠিক আছে। যা হয় সবই আল্লাহ পাকের হুকুমেই হয়। উনার হুকুম বিনা কিছু হয় না। তুমি নিজের মতো লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। তোমার মা কোথায় থাকে কী সমাচার তা নিয়া মাথা ঘামাবে না। ঠিক আছে?

হুঁ।

ছি না, বলো জি আচ্ছা, জনাব। এইসব সাহি আদব। শুধু লেখাপড়া শিখলে হবে না। আদবও শিখতে হবে। বিলো, জি আচ্ছা, জনাব।

জি আচ্ছা, জনাব।

আলহাজ্বরমিজউদ্দিন জহিরকে একটা ফাউন্টেনপেন উপহার হিসেবে দিয়ে গেলেন। ফাউন্টেনপেনের নাম রাইটার।

 

শশী মাস্টারের কাছে জুলেখার শীতলপাটি পৌঁছেছে। যে নিয়ে এসেছে তার নাম সামছু সদাগর। মিশাখালি বাজারে তার পাটের আড়ত। শশী মাস্টার বললেন, পাটি কে দিয়েছে?

সামছু সদাগর বললেন, রঙিলা নটিবাড়ির এক নটি দিয়েছে। রাখলে রাখেন, না রাখলে ফেলে দেন। নটির নাম চান বিবি।

চান বিবি নামে কাউকে আমি চিনি না।

আপনি মাস্টার মানুষ। আপনার না চেনাই ভালো। তার আরেক নাম জুলেখা।

জুলেখা? সামছু সদাগর বললেন, এখন কি চিনেছেন?

হ্যাঁ চিনেছি।

পরিচয় ছিল আপনার সাথে?

ছিল।

চাইপা যান। কাউরে কবেন না। মাস্টার সাব, উঠি?

শশী মাস্টার সারা দুপুর ঝিম ধরে বসে রইলেন। সন্ধ্যার পর কলের গান ছেড়ে জামগাছের নিচে গভীর রাত পর্যন্ত বসে রইলেন।

মাওলানা ইদরিসের কাছে জুলেখার পাঠানো তুর্কি টুপি পৌঁছেছে। সামছু সদাগরই নিয়ে গেছে।

মাওলানা বললেন, আপনারে তো চিনলাম না।

সামছু সদাগর বললেন, আমারে চেনার প্রয়োজন নাই। আপনার কাছে একটা জিনিস পৌঁছায়ে দেওয়ার কথা। দিলাম।

জিনিসটা দিয়েছে কে?

চান বিবি দিয়েছে।

চান বিবিকে তো চিনি না!

সামছু সদাগর উদাস গলায় বললেন, এখন তারে না চেনাই ভালো। সময়ে চেনা সময়ে না-চেনা বুদ্ধিমান মানুষের লক্ষণ। আপনি বুদ্ধিমান।

মাওলানা ইদরিস বললেন, একজন এত সুন্দর একটা টুপি পাঠায়েছে, তারে চিনিব না- এটা কেমন কথা?

সামছু বলল, চিনতে হইলে রঙিলা নটি বাড়িতে যান। ঐ মেয়ে রঙিলা বাড়ির নটি।

মাওলানা হতভম্ব গলায় বললেন, এইটা কী কথা?

সত্য কথা। নটি বেটি আপনারে টুপি পাঠায়েছে। বড়ই সৌন্দর্য মেয়ে। বেহেশতের হুর বরাবর সুন্দর। তার টুপি আপনি মাথায় দিয়ে জুম্মার নামাজ। না গাঙের পানিতে ফেলবেন— এটা আপনার বিবেচনা। আমি উঠলাম।

তুর্কি ফেজ টুপিটা টিনের ট্রাঙ্কের উপর রাখা। টুপিটা কোথেকে এসেছে মাওলানা এখন বুঝতে পারছেন। এই টুপি মাথায় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। গাঙের পানিতে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। টুপির মতো পবিত্র একটি বস্তু পানিতে ফেলে দেওয়া কি ঠিক? এই বিষয়ে হাদিস কোরানের পরিষ্কার ব্যাখ্যা কী তাও তিনি জানেন না। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবেন তাও সম্ভব হচ্ছে না। হাদিস কোরান জানা লোক আশেপাশে কেউ নেই। তাঁর খুবই ইচ্ছা দেওবন্দ মাদ্রাসায় যাওয়া। তার মনে অনেক প্রশ্ন আছে। তিনি হাতির ছবি আঁকা একটা দু’নম্বরি খাতায় প্রশ্নগুলি লিখে রেখেছেন। যেমন, রোজার সময় ধূমপান করলে কি রোজা ভাঙে? চিংড়ি মাছ খাওয়া মাকরুহ। কাকড়া খাওয়াও কি মাকরুহ? মাওলানা টুপি বিষয়ক একটি প্রশ্ন খাতায় লিখলেন–

কোনো ব্যক্তি (পুরুষ বা মহিলা) যদি অসৎপথে উপার্জন করা অর্থের বিনিময়ে কাউকে টুপি, তসবিহ কিংবা জয়নামাজ দেয়। তখন সেই টুপি, তসবিহ, জয়নামাজ ব্যবহার করা কি জায়েজ আছে?

টুপিটা ঘরে আসার পর থেকে মাওলানা ভালো সমস্যায় আছেন। প্রায়ই রাতে জুলেখাকে স্বপ্নে দেখছেন। স্বপ্নের ধরন দেখে তিনি নিশ্চিত স্বপ্নগুলি ইবলিশ শয়তান দেখাচ্ছে। একটি স্বপ্নে তিনি দেখলেন জুলেখা তার স্ত্রী (নাউজুবিল্লাহ)। সে তার বাড়িতেই থাকে। ঘরদুয়ার ঠিকঠাক রাখে। রান্না করে। রাতে সব কাজকর্ম শেষ করে বানানো পান হাতে নিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘুমাতে আসে (নাউজুবিল্লাহ)।

এরচেয়েও খারাপ স্বপ্ন একবার দেখলেন। এমন স্বপ্ন যা কাউকে বলা যাবে। না। তার অত্যন্ত মনখারাপ হলো। ইবলিশ শয়তান কোনো এক জটিল খেলা শুরু করেছে, এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। তাঁর মতো নাদান মানুষ কীভাবে শয়তানের হাত থেকে বাঁচবেন? তার কতটুকই বা ক্ষমতা? হযরত আদমের মতো মানুষ শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে পারেন নাই। এমনকি একবার আমাদের নবিজিকেও শয়তান ধোঁকা দিয়েছিল। নবিজির মুখ দিয়ে ওহি হিসেবে মিথ্যা আয়াত বলিয়েছিল। (Satanic Verses)

গভীর রাতে ইবলিশ শয়তান কিংবা তার সাঙ্গাপাঙ্গ যে তার বাড়ির চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, গাছের ডাল নড়ায়, এটা তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন। বাতাস নেই কিছু নেই, গাছের ডাল নড়ছে। একবার রাতে তসবি পড়ছিলেন, হঠাৎ পেছনের জানালা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। আবার খুলল। আরেক রাতে তাহজ্জুতের নামাজ পড়বেন, অজু করার জন্যে বারান্দায় রাখা জলচৌকিতে বসেছেন। অজুর দোয়া পড়ে শেষ করলেন। দোয়ার অর্থ—

নাপাকি দূর করিবার, নামাজ শুদ্ধভাবে পড়িবার এবং আল্লাহ তালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আমি অজু করিতেছি।

অজুর দোয়া শেষ করামাত্র তাঁর মনে হলো কেউ একজন তার ঘাড়ে ফুঁ দিয়েছে। গরম বাতাস। তিনি প্ৰচণ্ড ভয় পেলেও পেছন ফিরে তাকালেন না। অজু শেষ করলেন। তখন কেউ একজন পেছন থেকে হেসে উঠল। মেয়ে মানুষের গলা। তিনি চমকে পেছনে ফিরলেন, কাউকে দেখলেন না, তবে তাঁর হাতের ধাক্কা লেগে পিতলের বদনা জলচৌকি থেকে নিচে পড়ে গেল। বদনা উঠাতে গিয়ে দেখেন বদনার ভেতর একটা ইঁদুরের বাচ্চা মরে পড়ে আছে। ইবলিশ শয়তান অজু নিষ্ট করার জন্যে একটা ইদুরের বাচ্চা বদনার পানিতে রেখে দিয়েছিল।

 

এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা বাড়িতে ফিরে রান্না বসিয়েছেন। চালডালের খিচুড়ি। এক চামচ ঘি দিয়েছেন, সুন্দর গন্ধ ছেড়েছে। এমন সময় হঠাৎ তাঁর কাছে মনে হলো শুকনা পাতায় খসখসে শব্দে কেউ একজন আসছে। মাওলানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শয়তানার উপদ্রব। আবার শুরু হয়েছে। মাওলানা আয়াতুল কুরসি পাঠ করে হাততালি দিলেন। তখন মনে হলো উঠানে কে একজন কাশছে। মাওলানা ভীত গলায় বললেন, কে কে?

আমি।

আমি কে? আমি কে?

মাওলানা হারিকেন হাতে বের হয়ে এলেন। চাদর গায়ে হরিচরণ দাড়িয়ে আছেন। একহাতে বেতের একটা লাঠি। অন্য হাতে হারিকেন। সঙ্গে আর কেউ নেই।

কেমন আছেন মাওলানা সাহেব?

জি জনাব, ভালো। আপনি এত রাতে!

রাত তো বেশি হয় নাই। আপনি কি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছেন?

মাওলানা বললেন, সামান্য ভয় পেয়েছি। আমার কাছে কোনো কারণে কি এসেছেন?

হরিচরণ বললেন, ছোট্ট একটা কারণ আছে। শুনেছি আপনি পুরো কোরান শরীফ মুখস্থ করেছেন, এটা কি সত্য?

মাওলানা হঁহা-সূচক মাথা নাড়লেন। লজ্জিত গলায় বললেন, হাফেজ টাইটেল এখনো পাই নাই। কোনো বড় মাদ্রাসায় গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। যেমন ধরেন দেওবন্দ মাদ্রাসা।

পরীক্ষা দিতে যান না কেন?

খরচপাতি আছে। আমি দরিদ্র মানুষ। অর্থের সংস্থান নাই।

হরিচরণ বললেন, আমি খরচ দিলে কি যাবেন?

মাওলানা চুপ করে রইলেন। হরিচরণ বললেন, আপনাদের ধর্মে কি আছে যে অমুসলমানের সাহায্য নেয়া যাবে না?

এরকম কিছু নাই।

তাহলে আমার সাহায্য নিন। দেওবন্দ থেকে ঘুরে আসুন।

জি আচ্ছা। বহুত শুকরিয়া।

হরিচরণ সামান্য ইতস্তত করে বললেন, যদি কিছু মনে না করেন একটা অনুরোধ কি করতে পারি?

মাওলানা বললেন, অবশ্যই।

আপনার মুখস্থবিদ্যার একটা নমুনা কি আমাকে শোনাবেন?

মাওলানা বললেন, অবশ্যই। অজু করে আসি।

অজু করতে হবে?

জি। নাপাক অবস্থায় কোরান মজিদ আবৃত্তি করা ঠিক না।

হরিচরণ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মাওলানা ইদরিস জায়নামাজে বসে কোরান আবৃত্তি করছেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।

একসময় কোরান পাঠ শেষ হলো। মাওলানা বললেন, খিচুড়ি পাক করেছি। আপনি কি আমার সঙ্গে খানা খাবেন?

অমুসলিমকে খানা খাওয়াতে আপনাদের কোনো সমস্যা নাই?

জি-না। সমস্যা কী জন্যে থাকবে?

আপনাদের ধর্মের এই জিনিসটা ভালো। আমি আগ্রহের সঙ্গেই খানা খাব। একজনের জন্যে রোধেছেন। দুইজনের কি হবে?

বেশি করে রোধেছি। যেটা বাঁচে সেটা দিয়ে সকালে নাশতা করি।

 

হরিচরণ তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন। হাত ধুতে ধুতে বললেন, আরাম করে খেয়েছি। ধন্যবাদ।

মাওলানা বললেন, ধন্যবাদ কেন? আপনার তো আজ রাতে আমার এখানেই খাওয়ার কথা। সব আগে থেকে ঠিক করা।

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, কে ঠিক করেছে?

আল্লাহপাক ঠিক করেছেন। মানুষ পশুপাখি সবার রিজিক আল্লাহপাক নিজে ঠিক করে রাখেন। কে কবে কোথায় খানা খাবে সেটা তার জন্মের সময়ই ঠিক করা।

উঠানের কাঁঠালগাছের ডাল নাড়ছে। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে। মাওলানা দুঃখিত গলায় বললেন, একটা শয়তান কিছুদিন ধরে বড়ই ত্যক্ত করছে।

হরিচরণ বললেন, কী বলছেন। এইসব?

হরিচরণের কথা শেষ হবার আগেই বিকট শব্দে জানালার পাল্লা বন্ধ হলো। হরিচরণ চমকে উঠলেন। মাওলানা বললেন, চলুন আপনাকে বাড়িতে দিয়ে আসি। একা যেতে পারবেন না। ভয় পাবেন।

হরিচরণ উঠে দাঁড়ালেন।

মাওলানা হারিকেন হাতে আগে আগে যাচ্ছেন। পেছনে পেছনে হরিচরণ। তিনি বেশ ভয় পাচ্ছেন।

হরিচরণ বললেন, আপনি একা বাস করেন, ভয় পান না?

পাই। তবে দোয়াকালাম আছে। দোয়াকালাম পাঠ করি।

আপনার একা একা থাকা ঠিক না। একটা বিবাহ করেন।

জি, বিবাহ করব। আমাদের ধর্মে সংসার করার নির্দেশ আছে।

কন্যা কি ঠিক করেছেন?

জি-না। আল্লাহপাক ব্যবস্থা করে দিবেন। যথাসময়ে শুভ কাৰ্য সমাধা হবে। রিজিকের মতো বিবাহ উনার নির্দেশে হয়।

হরিচরণ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সেই অর্থে সব কিছুই তাঁর নির্দেশ হওয়ার কথা।

মাওলানা বললেন, পাঁচটা বিষয় আলাদা করে বলা আছে— হায়াত, মউত, বিবাহ, রিজিক এবং দৌলত।

হরিচরণ বললেন, আপনাকে আর আসতে হবে না। এখন যেতে পারব। এক কাজ করলে কেমন হয়- এখন আমি আপনাকে এগিয়ে দেই। তারপর আবার আপনি আসবেন। এই করতে করতে রাত কাবার।

মাওলানা হাসছেন। হাসির স্বরগ্রাম বেশ উঁচু। তিনি জানেন এইভাবে উচ্চস্বরে হাসা ঠিক না। নবিয়ে করিম উচ্চস্বরে হাসতেন না। সমস্যা হলো, মানুষের নিজের উপর সবসময় দখল থাকে না।

হরিচরণ বাড়িতে ঢুকলেন। দিঘির বাঁধানো ঘাটে বসে রইলেন। মাওলানার বাড়িতে ভয় ভয় লাগছিল। এখানে লাগছে না। যদিও এই জায়গাটাও নির্জন এবং জঙ্গুলে। দিঘির চারদিকের ঘাস মানুষ সমান উঁচু হয়েছে। মাঝে মাঝে ঝুপড়ি ভাটগাছ। ভাটফুল গন্ধবিহীন হলেও রাতে হালকা নেশা ধরানো গন্ধ ছাড়ে। পাকাবাড়ির সামনে কামিনী ফুলের ঝাড়। কামিনী ফুলের সুবাসও রাতেই পাওয়া যায়। পূজায় ব্যবহারের জন্যে রক্তজবার বেশ কিছু গাছ নানান দিকে লাগানো আছে। জবাফুল গন্ধবিহীন। কিন্তু হরিচরণের মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি জবা ফুলের গন্ধও পান। এটা একধরনের ভ্রান্তি। তিনি জানেন, মানুষকে সারাজীবন নানান ভ্রান্তির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভ্রান্তির পরিমাণ বাড়তে থাকে। হরিচরণের মা গোলাপদাসির ক্ষেত্রে এরকম হয়েছিল। শেষ বয়সে তার কাছে মনে হয়েছিল, দিঘিটা গঙ্গার অংশ।

গঙ্গায় তর্পনের ভঙ্গিতে তিনি দিঘিতে প্রায়ই এটা সেটা দিতেন। ফুল, মিষ্টি, দেবতার ভোগ। শেষের দিকে পিতলের হাঁড়ি বাসন, সোনাদানা ফেলতে লাগলেন। হরিচরণের ধারণা, দিঘির জল সেঁচে ফেললে অনেক জিনিসপত্র পাওয়া যাবে। বিশাল দিঘির জল সিঞ্চন সহজ ব্যাপার না। তারপরেও একবার চেষ্টা নেয়া যেতে পারে।

হরিচরণ গায়ের চাদর বিছিয়ে শ্বেতপাথরের ঘাটে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঠাণ্ডা হাওয়ায় তাঁর সুনিদ্রা হলো।

 

বান্ধবপুরের বর্তমান আলোচনার বিষয় মাওলানা ইদরিসের বাড়িতে হরিচরণ গো-মাংস খেয়েছেন। বিষয়টা নিয়ে হৈচৈ শুরু করেছেন অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য। বিভিন্ন দিকে নানা দেনদরবার করছেন। হরিচরণ আগেই জাতিচ্যুত হয়েছেন। গো-মাংস ভক্ষণজনিত গুরুতর অপরাধে নতুন করে কিছু হবার কথা না। তারপরেও অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য যথেষ্ট ঘোট পাকিয়ে ফেলেছেন। হরিচরণ এবং মাওলানা ইদরিস দুজনেই গুরুতর অপরাধ করেছে। একজন গো-মাংস খেয়েছে, আরেকজন ধর্ম নষ্ট করার জন্যে খাইয়েছে। এই দুজনকেই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।

বান্ধবপুরের সীমান্তে জাগ্রত বটগাছের নিচে যে বটকালি মন্দির সেই মন্দিরের মূর্তি মাথা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। অম্বিকা ভট্টাচার্য নিশ্চিত, এই ভয়াবহ অন্যায় কার্যের পেছনেও আছে মাওলানা ইদরিস। কারণ কয়েক দিনই তাকে এই রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখা গেছে। তাছাড়া মা কালী স্বপ্নে দেখা দিয়ে ইশারায় তাকে বলেছেন, মূর্তি যে ভঙেছে তার মুখভর্তি দাড়ি।

শাল্লার দশআনি মুসলমান জমিদার নেয়ামত হোসেন মাওলানা ইদরিসকে ডেকে বলেছেন, আপনি কী শুরু করেছেন! গো-মাংস রোধে রোধে খাওয়াছেন।

ইদরিস বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, গো-মাংস কোথায় পাব বলেন? বান্ধবপুরে গরু জবেহ হয় না।

কথা কম বলেন। লম্বা দাড়ির মানুষ কথা বেশি বলে। আপনার দাড়ি লম্বা। জলে বাস করলে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা যায় না। বাস করেন হিন্দু অঞ্চলে। হিন্দুরা এখানে কুমির। কিছু বুঝেছেন?

জি, বুঝেছি।

কিছুই বুঝেন নাই। আপনি হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাধাতে চান— এটা এখন পরিষ্কার। কোন সাহসে আপনি কালীমূর্তি ভাঙলেন?

জনাব এই কাজ আমি করি নাই।

আপনি না করলেও আপনার নির্দেশে হয়েছে। এই বিষয়ে আমার কাছে খবর আছে। রঙিলা বাড়িতেও আপনি কয়েকবার গিয়েছেন। চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে গিয়েছেন। এই বিষয়েও আমার কাছে খবর আছে।

মাওলানার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি পাঞ্জাবির আস্তিনে ঘনঘন চোখ মুছছেন। তাঁর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই দৃশ্য নেয়ামত হোসেনকে মােটেই স্পর্শ করল না। তিনি কঠিন গলায় বললেন, আপনার মাসিক বৃত্তি আজ থেকে আমার ষ্টেট আর দিবে না। আপনি অন্য কোথাও চলে যান। আপনার কারণে হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে, এটা বুঝেছেন?

জি, জনাব।

নানান জায়গায় হিন্দু মুসলিম হাঙ্গামা হুজ্জত হচ্ছে। আমি আমার অঞ্চলে এটা হতে দেব না। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব এই বিষয়ে আমাকে পত্র দিয়েছেন।

জনাব, আমাদের কাঁধের দুই ফেরেশতা কেরামন কাতেমিন সাক্ষী, আমি কিছুই করি নাই।

আপনি দুই ফেরেশতাকে সাক্ষী মেনেছেন। খুবই ভালো কথা। এরা কোর্টে উকিলের জেরার জবাব দিবে না। এটা বোঝার মতো বুদ্ধি কি আপনার আছে? আমার তো মনে হয় নাই। আচ্ছা এখন বিদায় হন, অনেক কথা বলে ফেলেছি।

মসজিদের কাজ কি তাহলে আর করব না?

না। তবে যদি সব অপরাধ স্বীকার করে সবার কাছে ক্ষমা চান, তাহলে বিবেচনা করে দেখব।

যে অপরাধ করি নাই সেই অপরাধ কীভাবে স্বীকার করব?

আপনি বুরবাক। এখন বিদায় হন। বুরবাকের সাথে কথা বলতে নাই। বুরবাকের সঙ্গে কথা বললে আয়ুক্ষয় হয়।

অনেকদিন এই অঞ্চলে আছি, একটা মায়া পড়ে গেছে।

আপনার অন্তরভর্তি মায়া। এত মায়া নিয়া এক জায়গায় থাকা ঠিক না। বিভিন্ন জায়গায় যান। মায়া দিতে থাকেন। মায়ার চাষ করেন।

মাওলানা চলে এলেন। বাড়িতে না গিয়ে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। আজ সারাদিন এবাদত বন্দেগি করবেন। তার ধারণা, নিজের অজান্তে তিনি কোনো একটা অপরাধ করেছেন বলেই আল্লাহপাক তাকে এই শাস্তি দিচ্ছেন। শরীরকে শুদ্ধ রাখার জন্যে কয়েকটা নফল রোজা রাখতে হবে। রোজা শরীর শুদ্ধ রাখার মহৌষধ। শরীর শুদ্ধ হলেই মন শুদ্ধ হবে। নেয়ামত হোসেনের কথা শুনে মন অশান্তও হয়েছে। মনকে শান্ত করতে হবে। রিজিক নিয়ে তিনি বেশি। চিন্তা করছেন আল্লাহপাকের উপর ভরসা করছেন না,- এটা একটা নাফরমানি। তিনি যে ব্যবস্থা করে রেখেছেন তাই হবে। তাঁর সমস্ত সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে। এর নাম ঈমান।

মসজিদের বারান্দায় সুলেমানের ছেলেটা বসে আছে। তার চোখেমুখে দিশাহারা ভাব। দূর থেকে দেখেই মনে হচ্ছে, সে বড় কোনো সমস্যায় পড়েছে।

মাওলানা বললেন, তোর কী হয়েছে?

ছেলে জবাব দিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইল। তার চোখমুখ কঠিন।

মাওলানা বললেন, আমারে কিছু বলবি?

জহির উঠে চলে গেল। ছেলেটা অল্প সময়ে কয়েকটা বেআদবি করে ফেলেছে। মুরুব্বি মানুষকে দেখেও সালাম দেয় নাই। প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেছে। মাওলানার উচিত রাগ করা, তিনি রাগ করতে পারছেন না। মানসিক কষ্টের সময় মানুষ ভুলভ্রান্তি করে। সেই ভুলভ্রাত্তি ক্ষমার চোখে দেখতে হয়। সুলেমান দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছে। সেই কারণেই হয়তো ছেলেটা কষ্টে আছে।

মাগরেব এবং এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা বাড়ি ফিরে গেলেন। সঙ্গে টর্চ ছিল না, তাতে সমস্যা হলো না। ফকফকা চান্নি। জঙ্গলের মাথার উপর বিশাল চাদ। পূর্ণিমার রাতে জিন ভুত থাকে না। ওদের কর্মকাণ্ড অমাবশ্যায়। চাঁদের হিসাবে তাদের চলাচল। তারপরেও মাওলানা আয়াতুল কুরাসি পড়তে পড়তে এগুচ্ছেন। বেতঝোপের পাশে তাঁর গা ছমছম করতে লাগল। এই জায়গাটা সবচে’ খারাপ। এখান থেকে নদীর পাড়ের শ্মশানঘাট দেখা যায়। শ্মশানঘাটে প্রতিদিনই একটা দুটা মারা পোড়ানো হয়। মাংসপোড়া গন্ধ এবং কাঠকয়লার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে, শরীর গুলায়। আজও মরা পোড়ানো হচ্ছে। তবে মরা পোড়ানোর গন্ধ আসছে না। উত্ত্বরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। গন্ধ ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণে।

মাওলানা বাড়ি ফিরে অবাক হলেন। উঠানে জহির বসে আছে। তার সঙ্গে টিনের ট্রাংক। সে বসে আছে ট্রাংকের উপর। তার গায়ে চাঁদের আলো পড়েছে। টিনের ট্রাংকটা নতুন। চাঁদের আলোতে ট্রাংক ঝলমল করছে। মাওলানা বললেন, তোর ঘটনা কী?

জহির অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আইজ থাইক্যা আপনার লগে থাকব।

মাওলানা বললেন, তুই যে এইখানে তোর বাপ জানে?

জহির হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

দুপুরে খাওয়া দাওয়া হইছে?

জহির জবাব দিল না।

মাওলানা বললেন, আয় খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থা করি। বেগুন পুড়া, ডাইল ভাত চলিব?

হুঁ।

ঘরে ডিমের সালুন আছে। ডিমের সালুন খাইতে চাস?

হুঁ।

মাওলানা রাঁধতে বসলেন। জহির তার সামনে বসে আছে। তার বসে থাকার ভঙ্গিতেই মনে হচ্ছে সে ক্ষুধায় কাতর। রান্না শেষ না হওয়া পর্যন্ত গল্পগুজব করে ছেলেটাকে ভুলিয়ে রাখতে হবে।

নতুন মা’র নাম কী?

হালিমা।

বড়ই ভালো নাম। নেক নাম। বিবি হালিমার নাম শুনছস?

না।

কস কিরে পুলা? বিবি হালিমা নবিজির দুধমা। হারিস হইল। উনার দুধ পিতা। স্মরণে রাখিস।

হুঁ।

তোর নতুন মা তোরে কষ্ট দেয় না-কি রে?

না।

মারধোর করে?

না।

তাইলে তুই আমার কাছে থাকতে আসছস, ঘটনা কী?

জহির জবাব দিল না। মাওলানা বললেন, আমার এই বাড়ি খারাপ। জিনের আনাগোনা। আপনাআপনি জানালা বন্ধ হয়, জানালা খুলে। গাছের ডাল নড়ে। তুই ভয়ে মইরা যাবি।

জহির মাথা নিচু করে হাসছে।

মাওলানা অবাক হয়ে বললেন, হাসছ কেন?

জহির বলল, আপনের বাড়িত বান্দর আছে। বান্দরে ত্যক্ত করে।

তুই জানস ক্যামনে?

আমি দেখছি। বান্দরে জানালা টানাটানি করে। দুইটা বান্দর।

মাওলানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাড়িতে জিন ভূতের এত সহজ ব্যাখ্যা তার মাথায় আসে নি।

পুলা, তোর বুদ্ধি তো ভালো।

জহির মাথা নিচু করে হাসল।

হাত-মুখ ধুইয়া আয়। খানা হইছে।

জহির অতি দ্রুত খাচ্ছে। মাওলানা খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছেন। ক্ষুধার্ত একটি শিশু আগ্রহ করে খাচ্ছে, এরচে’ সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে কি আছে?

 

হরিচরণের বাড়িতেও একজন খেতে বসেছেন। তিনিও খুব আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছেন। তার নাম শশাংক পাল। এই অঞ্চলের প্রাক্তন জমিদার। আজ তার হতদৈন্য দশা। গায়ের কাশ্মীরি শালটা অবশ্যি দামি। শালের নিচে রুপার থালা দুটো দামি। তিনি এসেছেন। থালা দুটা হরিচরণকে দিয়ে কিছু টাকা নিতে। খুব বেশি না, পঞ্চাশটা রুপার টাকা। হরিচরণ থালা রাখেন নি, তবে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছেন।

শশাংক পাল বললেন, তোমার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়েছি। হাতি গর্তে পড়লে সবাই খারাপ ব্যবহার করে, তুমি তা করো নি। মানুষ হিসেবে তুমি উত্তম।

হরিচরণ বললেন, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ক্ষুধার্তা। আপনি কি আমার এখানে খান খাবেন?

শশাংক পাল বললেন, খাব। পোলাও খেতে ইচ্ছা করছে। পোলাও খাব। মুরগির মাংস খাব। ঝাল দিয়ে রাঁধতে বলো। ইদানীং ঝাল ছাড়া মুখে কিছু রুচে না। শরীর পুরোপুরি গেছে। রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। একদিক দিয়ে ভালো। খাওয়া জুটে না।

কলিকাতা চলে যান না কেন? শুনেছি সেখানে আপনার বড় বড় আত্মীয়স্বজন আছে।

ঠিকই শুনেছ। যাই না, ওদের মুখ দেখােব কীভাবে?

আপনার যে অবস্থা, এত কিছু ভাবেন কেন?

তাও ঠিক। মুরগির মাংসের সঙ্গে ডিমের ভুনা করতে বলো। বেশি করে পিয়াজ দিতে বলবে। যখন কষা কষা হবে তখন চায়ের চামচে আধা চামচ চিনি দিবে। ত্রিপুরার মহারাজার পূণ্যার সময় একবার উনার নিমন্ত্রণে ত্রিপুরা গিয়েছি। নীরমহলে দুইরাত থেকেছিলাম। তখন ডিমের এই রান্না খেয়েছি।

আপনার যখন ভালো কিছু খেতে ইচ্ছা করে আমাকে জানাবেন, আমি ব্যবস্থা করব।

বললেই তো ব্যবস্থা করতে পারবে না। ময়ুরের মাংস খেতে ইচ্ছা করে। গৌরীপুরের মহারাজার বাড়িতে খেয়েছিলাম। তিনি ময়ুর আনিয়েছিলেন রাজস্থান থেকে। বাবুর্চিও রাজস্থান থেকে এসেছিল। ময়ূরের মাংস খেয়ে এত আনন্দ পেয়েছিলাম যে বাবুর্চিকে বিশটা রুপার টাকা দিয়েছিলাম।

ময়ূরের মাংস খাওয়াতে পারব না।

পারবা না জানি। কী আর করা। ঘটনা শুনেছি?

কী ঘটনা?

মসজিদের যে মাওলানা তার পাছায় লাথি দিয়ে তাকে অঞ্চল ছাড়ার ব্যবস্থা করেছেন।

কে করেছেন?

তারই স্বজাতি। শাল্লার জমিদার। মাওলানা ধরা খেয়েছে তার স্বজাতির

কাছে।

আপনি মনে হয় খুশি।

শশাংক পাল হাই তুলতে তুলতে বললেন, অবশ্যই আমি খুশি। কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে আমার খুশি লাগে।

হরিচরণ বললেন, মাওলানা ভালো মানুষ। আমি তাকে বিপদে পড়তে দেব না।

শশাংক পাল বললেন, একমাত্ৰ তুমিই এখন তাকে রক্ষা করতে পারবে। তোমার ক্ষমতা আছে। এই দুনিয়ায় ক্ষমতাই সব। জমিদারি কেমন চলছে?

ভালো। আপনার পুরনো কর্মচারীরাই কাজকর্ম দেখছে। তাদের সঙ্গে আছে শশী মাষ্টার।

শশী মাস্টার নাকি পাগল?

ভাবের মধ্যে থাকে, তবে পাগল না।

ভাবের পাগল কিন্তু বড় পাগল, এটা খেয়াল রাখবা।

আচ্ছা খেয়াল রাখব।

খাওয়া শেষ করে শশাংক পাল হরিচরণের বৈঠকখানাতে শুয়ে পড়লেন। তার হাঁপানির টান উঠেছে। এই অবস্থায় হেঁটে কোথাও যাওয়া সম্ভব না।

শশাংক পাল আধশোয়া হয়ে পালংকে বসে আছেন। তাঁর মুখভর্তি পান। ঠোঁট বেয়ে পানের রস গড়াচ্ছে। এদিকে তার খেয়াল নেই। হরিচরণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

শশাংক পাল বললেন, তুমি কি জোড়াসাঁকোর রবি ঠাকুরের নাম শুনেছ?

শুনেছি।

গান লেখে, গান গায়। তার গান জোড়াসাঁকোর বাড়িতে শুনেছি, মধুর গলা।

তার কথা হঠাৎ উঠল। কেন?

উনি বিরাট পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেল পুরস্কার। তার অবস্থা দেখ। আর আমার অবস্থা দেখ। গান-কবিতা আমিও লিখতাম। ট্রাংকভর্তি লেখা ছিল। সবই নিয়তি।

 

সময় ১৯১৩ সন। ঔপন্যাসিক টমাস হার্ডি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন এই বিষয়ে সবাই যখন নিশ্চিত তখন হঠাৎ নোবেল কমিটি মত পাল্টালেন। বাংলাভাষী এক কবিকে এই পুরস্কার দিয়ে দিলেন।

উকিল মুনসি

মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের মসজিদের ইমাম আব্দুল হক আকন্দ এসেছেন বান্ধবপুরে। যেহেতু ইমাম মানুষ, লোকজনের কাছে তাঁর পরিচয় মুনসি। মুনসি সাহেবের ডাকনাম উকিল। বাবা-মা’র আশা ছিল এই ছেলে বড় হয়ে উকিল হবে। সেই থেকে তাঁর পরিচয় উকিল মুনসি। বড়ই আশ্চর্যের কথা, মুনসি মানুষ হয়েও তিনি গানবাজনা করেন। লোকজন তাঁর গানবাজনা খুব যে মন্দ চোখে দেখে তা-না। তখনকার মুসলিম সমাজে উগ্রতা ছিল না। মসজিদের ইমাম সাহেব ঢোল বাজিয়ে গান করছেন, বিষয়টাতে অন্যায় কেউ খুজে পায় নি। বরং তাঁর গান লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

মাওলানা ইদরিস উকিল মুনসির আগমনের খবর পেয়ে নদীর ঘাটে গেছেন। আদর করে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসবেন। উকিল মুনসি বরান্তর মসজিদের ইমাম। তিনি নিজেও ইমাম। একজন ইমাম থাকবেন। আরেকজন ইমামের কাছে। এইটাই সহবন্ত।

বড়গাঙের বাজারের ঘাটে উকিল মুনসির নৌকা বাধা। নৌকার ছই সবুজ শাড়ি দিয়ে ঘেরাটোপ দেয়া। তার ভেতর বসে আছেন ‘লাবুসের মা’।

তিনি লাবুস নামের কারো মা না। তাঁর নামই লাবুসের মা। তিনি উকিল মুনসির স্ত্রী। জনশ্রুতি- লাবুসের মায়ের মতো রূপবতী কন্যা অতীতে কখনো জন্মায় নি। ভবিষ্যতেও জন্মাবে না।

লাবুসের মা’র জন্ম ভাটি অঞ্চলের জালালপুরে। একবার মাত্র এই মেয়েকে চোখের দেখা দেখে উকিল মুনসি আধাপাগল হয়ে যান। প্রথম গান লেখেন—

ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে
সোনার জালালপুর
সেইখানে বসত করে
লাবুসের মা
উকিলের মনচোর।

মাওলানা ইদরিস নদীর পাড়ে গিয়ে দেখেন, উকিল মুনসির নৌকা ঘিরে অনেক নৌকা। নৌকাভর্তি মানুষ। পাড়েও লোকজন দাঁড়িয়ে আছে।

উকিল মুনসি গান ধরেছেন—

আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে
পুবলি বাতাসে
বাদাম দেইখ্যা চায়া থাকি
আমার নি কেউ আসে রে।।

যেদিন হতে নতুন পানি
আসল বাড়ির ঘাটে
অভাগিনীর মনে কত
শত কথা উঠে রে।।

কত আসে কত যায়।
নায় নাইয়ারির নৌকা
মায়ে ঝিয়ে ভইনে ভইনে
হইতেছে যে দেখা রে।।

আমি যে ছিলাম ভাই রে
বাপের গলায় ফাঁস
আমারে যে দিয়া গেল
সীতা বনবাস রে।।

আমারে নিল না নাইয়র
পানি থাকতে তাজা
দিনের পথ আধিলে যাইতাম
রাস্তা হইত সোজা রে।।

ভাগ্য যাহার ভালো নাইয়র
যাইবে আষাঢ় মাসে
উকিলের হইবে নাইয়র
কাৰ্তিক মাসের শেষে রে।

মাওলানা ইদরিসের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। এত সুন্দর গান! এমন গলা! মাওলানা চোখের সামনে আষাঢ় মাসে নাইয়ারিদের নৌকার পাল দেখতে পাচ্ছেন। তিনি কয়েকবার গাঢ় স্বরে বললেন, আহা রে! আহা রে!

উকিল মুনসি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মাওলানা ইদরিসের সঙ্গে কয়েকদিন থাকতে রাজি হলেন। উকিল মুনসি মুখভর্তি পান নিয়ে বললেন, আমি কিন্তু তাহাৰ্জ্জুদের নামাজের শেষে গানবাজনা করি। অসুবিধা হবে?

মাওলানা বললেন, আমার বাড়ি জঙ্গলের ভেতরে। কেউ শুনবে না।

উকিল মুনসি বললেন, আমি তো গান করি সবেরে শুনানোর জন্যে। কেউ না শুনলে ফায়দা কী?

আমি শুনব। আমাদের ভাবি সাব শুনবেন।

উকিল মুনসি বললেন, সেটাও খারাপ না। অধিকে শোনার চেয়ে মন দিয়া যদি অল্পে শুনে সেটা ভালো। আপনার ভাবি সাব বিরাট রাধুনি। সে সবচে’ ভালো রাধে রিঠা মাছ। রিঠা মাছ জোগাড় করেন।

যেভাবে পারি জোগাড় করব।

আপনার ভাবি সাবের রূপ বেহেশতের হুর বরাবর। তাকে দেখলে বেহেশতের হুর কেমন হবে এই বিষয়ে আন্দাজ পাবেন। আমি তাকে বলব, সে যেন আপনার সামনে পর্দা না করে। নবিজির স্ত্রীদের জন্যে পর্দা বাধ্যতামূলক। আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের স্ত্রীদের জন্যে পর্দা বাধ্যতামূলক না।

ইদরিসের বাড়িতে পা দিয়ে উকিল মুনসি মুগ্ধ গলায় গান ধরলেন—

আমি না বুঝিয়া কার ঘরে আসিলাম
কারে করলাম আমার নাওয়ের সাথি।

উকিল মুনসির স্ত্রী তাঁর পেছনেই ঘোমটা পরে দাড়িয়ে ছিলেন। উকিল মুনসি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঘোমটা খুইলা দেখ— কী সুন্দর বাড়ি! কী সুন্দর জংলা! আহারে কী সৌন্দর্য! আমি স্বপ্নে দেখেছি বেহেশত এই রকম হবে। প্রত্যেকের জন্য থাকবে বেহেশতি জঙ্গল। সেই জঙ্গলে কাঠের বাড়ি। বাড়ির পাশে পানির নাহর। গাছে গাছে মনোহর পাখপাখালি।

মাওলানা ইদরিস রিঠা মাছের সন্ধানে মাছবাজারে গেলেন। আজ হাটবার। বাজারে প্রচুর মাছ থাকার কথা। রিাঠা মাছ পাওয়া গেল না, তবে বড় বড় বাছা মাছ পাওয়া গেল। এই অঞ্চলের বাছা মাছ বিখ্যাত। মাছের বাজারে দেখা হলো। হরিচরণের সঙ্গে। তিনি মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তবে নিয়ম করে হাটের দিন তিনি মাছবাজারে আসেন। তাজা বড় বড় মাছ দেখতে তার ভালো লাগে। জমিদার মানুষ, পাইক বীরকন্দাজ নিয়ে চলাফেলা করার কথা। তিনি চলাফেরা করেন একা। চামড়ার এক জোড়া চটি, ধুতি হাঁটু পর্যন্ত তোলা। গায়ে ঘিয়া রঙের চাদর।

হরিচরণ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, শুনলাম বিখ্যাত গাতক বাউল সাধক উকিল মুনসি আপনার বাড়িতে এসেছেন?

ইদরিস বললেন, জি এসেছেন।

কয়েক দিন কি থাকবেন?

বলেছেন তো থাকবেন। তবে এরা ভাবের মানুষ। হুট করে যদি বলেন চলে যাব, তাহলে চলে যাবেন।

উনার স্বকণ্ঠে গান শোনার বাসনা ছিল। বিখ্যাত বিচ্ছেদি গান। সম্ভব কি হবে? নিমন্ত্রণ করলে আমার বাড়িতে কি উনি যাবেন? হাতির পিঠে করে উনাকে নিয়ে যেতাম।

বলে দেখব। নিরহঙ্কারী মানুষ। বললেই রাজি হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

আমি উনার জন্যে একটা মাছ কিনে দেই। কী মাছ উনার পছন্দ জানেন?

রিঠা মাছ পছন্দ। আজ বাজারে রিঠা মাছ উঠে নাই।

হরিচরণ বললেন, রিঠা মাছের ব্যবস্থা আমি করব। আজ আমার পছন্দের মাছ নিয়ে যান।

হরিচরণ বাজারের সবচে’ বড় রুই মাছটা কিনলেন। প্ৰকাণ্ড লাল মুখের জ্যান্ত রুই। জীবনের আনন্দে ছটফট করছে। এমন এক মাছ যাকে দেখতেও আনন্দ।

ইদরিস বললেন, এত বড় মাছ কে খাবে? মাছ কুটাও তো মুশকিল।

কোনো মুশকিল না। মাছ কুটার লোক আমি পাঠাব। মাছ কুটে দিয়ে আসবে। আস্ত মাছ দেখে উকিল মুনসি সাহেব হয়তো খুশি হবেন। বড় মাছ দেখে খুশি হয় না। এমন মানুষ কম। আপনি নিয়ে যান।

 

উকিল মুনসি মাছ দেখে মুগ্ধ। তিনি নিজেই মাছ কুটিতে বসলেন।

ইদরিস বললেন, আপনার জন্যে মাছটা হরিচরণ বাবু পাঠিয়েছেন। অতি বিশিষ্ট মানুষ। লোকে তাঁর নাম দিয়েছে ঋষি হরিচরণ।

উকিল মুনসি বললেন, মানুষের মুখে জয়, মানুষের মুখে ক্ষয়। অনেক মানুষ যাকে জয় বলে, তার অবশ্যই জয়। এত বড় মাছ উনি পাঠিয়েছেন। তাকে দাওয়াত দেন। তার সঙ্গে খাই।

উনি মাছ-মাংস খান না। নিরামিষ আহার করেন।

ভালো, খুবই ভালো।

উনার খুব ইচ্ছা স্বকণ্ঠে আপনার বিচ্ছেদি গান শুনেন। আপনি রাজি হলে আপনার জন্যে হাতি পাঠায়ে দিবেন।

উনার হাতি আছে না-কি?

জি আছে। শশাংক পালের সাত আনি জমিদারি খরিদ করেছেন।

সইন্ধ্যাকালে উনারে হাতি পাঠাইতে বলেন। লাবুসের মারে নিয়া হাতির পিঠে চড়ব। এই বলেই উকিল মুনসি গান ধরলেন– মাছ কুটিতে কুটিতে গান। বারান্দায় ঘোমটা দেয়া লাবুসের মা হাসছেন। স্বামীর আনন্দ দেখে উনি আনন্দিত।

উকিল মুনসি হাতির পিঠে
লইড়া চইরা বসে।
সেই হাতি কদম ফেলে
লিলুয়া বাতাসে
ঘোমটা পরা লারুসের মা
ঘোমটার ফাঁকে চায়
তাহারে পাগল করছে
উকিলের মায়ায়।।

লাবুসের মা’র সঙ্গে মাওলানা ইদরিসের কথাবার্তা হলো। মাওলানা কখনোই সরাসরি তাকালেন না। যে-কোনো তরুণীর দিকে দৃষ্টি ফেলা অপরাধ। অথচ লাবুসের মা’র মধ্যে কোনো সঙ্কোচ নেই। যেন মাওলানা তার অনেক দিনের চেনা।

লাবুসের মা বললেন, আমার সাথে ধর্মের ভাইন পাতাইবেন। ও মাওলানা, আমার দিকে চায়া কথা বলেন। ভাই ভইনের দিকে তাকাইতে পারে।

আপন ভাই ভইনের দিকে তাকাতে পারে।

আপন ভাবলেই আপনা। আপন ভাইব্যা। আমার সঙ্গে কথা বলেন।

কী কথা বলব?

বয়স হইছে, শাদি করেন না কেন? আপনে মাওলানা মানুষ, শাদি যে ফরজ এইটা জানেন না?

জানি।

কইন্যা দেখব? আমার সন্ধানে ভালো পাত্রী আছে। ওমা, মাওলানা দেখি লইজ্যা পায়। নাক-মুখ হইছে লাল।

 

উকিল মুনসি এসেছেন। হরিচরণের বাড়িতে। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। মাওলানা ইদরিস আসেন নি।

লাবুসের মা স্বামীর সঙ্গে এলেও হরিচরণের বাড়িতে ঢুকে আলাদা হয়ে পড়েছেন। পুরুষদের গানের আসরে তিনি কখনো থাকেন না। লাবুসের মা হরিচরণের বাড়িঘর ঘুরে ঘুরে দেখছেন। বাগান দেখছেন। দিঘি দেখছেন।

হরিচরণ দামি কার্পেটে উকিল মুনসিকে বসতে দিয়েছেন। রুপার পানদানিতে পান দেয়া হয়েছে। ইকো প্রস্তুত। আম্বরী তামাকের সুগন্ধ বাতাসে। ইকোর নল হাতে অপেক্ষা করছে জহির। সে মাওলানার বাড়ি ছেড়ে হরিচরণের বাড়িতে চলে এসেছে। কোথাও থিতু হতে পারছে না।

উকিল মুনসি বললেন, এই ছেলে কে?

হরিচরণ বললেন, এর নাম জহির। আমার এখানে থাকে।

মুসলমান ছেলে?

জি।

অতি লাবণ্যময় চেহারা। সে কি ঘাটুগানের ছেলে?

হরিচরণ বললেন, না। সে আমার পুত্ৰসম।

উকিল মুনসি বললেন, গোস্তাকি মাপ হয়। আমি খারাপ কিছু ভেবেছিলেম। বড় মানুষদের এইসব দোষ থাকে। আমি কিশোর বয়সে ঘাটুর দলে ছিলাম। গানবাজনা সেখানে শিখেছি। শৌখিনদার মানুষ ঘাটুছেলে কীভাবে ব্যবহার করে আমি জানি। যাই হোক, আপনি কি গান শুনবেন?

বিচ্ছেদের গান শুনতে আমার আগ্রহ, তবে আপনি আপনার পছন্দের গান করেন।

উকিল মুনসি বললেন, আমারও পছন্দ বিচ্ছেদের গান। কী জন্যে জানেন?

হরিচরণ বললেন, জানি না কী জন্যে?

উকিল মুনসি বললেন, আল্লাহ বা ভগবান যে নামেই তাকে ডাকা হোক, তিনি থাকেন বিচ্ছেদে।

সুন্দর কথা!

উকিল মুনসি ঢোলে বাড়ি দিয়ে গান ধরলেন। তিনি এক পায়ে নূপুর পরেছেন। গানের সঙ্গে নূপুর বাজছে। নূপুরের শব্দ করুণ রস তৈরি করে না, কিন্তু এখন করল। হরিচরণের চোখ ছলছল করতে লাগল।

উকিল মুনসি গাইছেন—

সোনা বন্ধুয়া রে।
এত দুঃখু দিলি তুই আমারে
তোর কারণে লোকের নিন্দন, করেছি অঙ্গের বাসন রে।
কুমারিয়ার ঘটিবাটি, কুমার ঘরে পরিপাটি
মাটি দিয়া লেপ দেয়। উপরে।
ভিতরে আগুন দিয়া, কুমার থাকে লুকাইয়া
তেমনি দশা করলি তুই আমারে।

উকিল মুনসি গান শেষ করলেন। হরিচরণ চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আরেকটা গান।

উকিল মুনসি বললেন, নিজের গান না। আমার শিষ্যের লেখা একটা গান করি। তার সমস্ত গানই কাটা বিচ্ছেদ। গান শুনলে কলিজা কাইটা যায়- এই জন্যেই এর নাম কাটা বিচ্ছেদ। শিষ্যের কাছে পরাজিত হওয়ায় আনন্দ আছে। আনন্দের জন্যে গানটা করব।

অবশ্যই করবেন।

আমার শিষ্যের নাম সিরাজ আলি। তার বাড়ি আটপাড়া।

উকিল মুনসি গান ধরলেন—

সোনা বন্ধুরে
অপরাধী হইলেও আমি তোর
আমি তোর পিরিতের মরা
দেখলি না এক নজর।
অপরাধী হইলেও আমি তোর।

অনেক রাতে গানবাজনা শেষ হলো। হরিচরণ বিনীত ভঙ্গিতে হাতজোড় করে বললেন, আপনার কোনো সেবা করতে পারি? এই সৌভাগ্য কি আমার হবে?

সেবা করতে চান?

চাই। অন্তর থেকে চাই।

আমি আপনাদের অঞ্চলে ঘুরতে আসি নাই। বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছি। যে উদ্দেশ্যে এসেছি মাওলানা ইদরিস তার কিছু করতে পারবে না। সে কঠিন মাওলানা।

হরিচরণ বললেন, কী উদ্দেশ্য বলেন। আমি ব্যবস্থা করব।

উকিল মুনসি বললেন, আমি শুনেছি আপনাদের রঙিলা বাড়িতে এক রঙিলা মেয়ে আছে, যার রূপ দেখে বেহেশতের হুররা লজ্জা পায়। তাকে এক নজর দেখব। সে কী লাবুসের মায়ের চেয়ে সুন্দর কি-না তার পরীক্ষা হওয়া দরকার। শুনেছি তার কণ্ঠ কোকিল পক্ষীর কণ্ঠের চেয়েও মধুর। সে না-কি উকিল মুনাসির গান ছাড়া অন্য গান করে না। তার কণ্ঠে আমার একটা গান শুনব।

হরিচরণ বললেন, ব্যবস্থা করে দেব। এই মেয়ের কথা কার কাছে শুনেছেন?

অনেকের কাছেই শুনেছি। মানুষের গুণ বাতাসের আগে যায়।

আর দোষ? দোষ কীভাবে যায়?

দোষ চলে না জনাব। দোষ থাকে নিজের অঞ্চলে। দোষের পা নাই। সে ছুটতে পারে না।

উঠানে হাতি প্ৰস্তৃত। উকিল মুনসি স্ত্রীকে নিয়ে হাতিতে ফিরবেন। ঘোমটা পরা লাবুসের মা হরিচরণের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন, আপনি দরিদ্র এক বাউলকে যে সম্মান করেছেন তার বিনিময়ে আল্লাহপাক আপনাকে আরো সম্মান দেবেন।

হরিচরণ বললেন, মাগো, আমি সম্মানের কাঙালি না। তারপরেও আপনার সুন্দর কথায় খুশি হয়েছি।

আপনি আমাকে মা ডাকলেন। সব মেয়েকেই কি আপনি মা ডাকেন?

হরিচরণ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন। লাবুসের মা বললেন, আমি আপনার দিঘির ঘাটলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে দেখি শিউলি গাছের নিচে অল্পবয়সি বাঁচ্চা একটা মেয়ে হাঁটাহাঁটি করতেছে। গোল মুখ, কোঁকড়ানো চুল। মেয়েটা কে?

হতভম্ব হরিচরণ কোনো জবাব দিলেন না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন। লাবুসের মা বললেন, আপনার কোনো কন্যা কি অল্পবয়সে মারা গিয়েছিল?

হরিচরণ বললেন, হ্যাঁ।

লাবুসের মা হতাশ গলায় বললেন, আমি মৃত মানুষজন মাঝে মাঝে দেখতে পারি। কেন যে পারি নিজেও জানি না।

লাবুসের মা হাতির দিকে রওনা হলেন।

 

জুলেখার ঘরে অতিথি এসেছে। আলাভোলা চেহারা, গায়ে চাদর। পরনে লুঙ্গি। রঙিলা বাড়িতে লুঙ্গি পরে কেউ আসে না। বাবু সেজে আসে। ক্যানের লতিতে আতর দেয়।

অতিথি বললেন, আপনার নাম কী?

জুলেখা বলল, সবার প্রথম প্রশ্ন আপনার নাম? নামের কি প্রয়োজন? আমার নাম ফুলবিবি হলেও যা চানবিবি হলেও তা, আবার জুলেখা হলেও ক্ষতি নাই। মনে করেন আমার নাম জুলেখা। পান খাবেন? ভালো জর্দা আছে। ময়মনসিংহের সাধুবাবা জর্দা।

পান খাব।

জুলেখা পানদান এবং পিক ফেলার পিকদান পাশে এনে রাখল। পিকদান পিতলের। কিছুদিন হলো কিনেছে। রোজ তেঁতুল দিয়ে মাজা হয় বলে ঝকঝাক করে। জুলেখার কাছে মনে হয় ‘সন্নের’ পিকদান।

অতিথি বললেন, জুলেখা, শুনেছি তোমার কণ্ঠস্বর মধুর। আমি দূরদেশ থেকে এসেছি তোমার গান শুনতে। বাদ্যবাজনার প্রয়োজন নাই। খালি গলায় গান করবে, আমি শুনব।

জুলেখা পান সাজতে সাজতে বলল, আমার গানের কথা শুনেছেন। রূপের কথা শুনেন নাই?

রূপের কথাও শুনেছি। স্বীকার পাইলাম তোমার রূপ আছে। শোনা কথা বেশির ভাগ সময় মিলে না। তোমার বেলায় মিলেছে।

জুলেখা অতিথিকে এক খিলি পান দিয়ে নিজে এক খিলি পান মুখে নিল। তার পানে খয়ের বেশি করে দেয়া, যাতে কিছুক্ষণের মধ্যে ঠোঁট টকটকে লাল হয়ে যায়। সে পান চাবাতে চাবাতে বলল, কী গান শুনবেন?

তুমি উকিল মুনসির গান ভালো জানো বলে শুনেছি। তাঁর একটা গান Qasirv8।

তাঁর গান আইজ গাব না। অন্য গান শুনেন।

তাঁর গান গাবা না কেন?

যেদিন আমার মন ভালো থাকে না, সেইদিন উনার গান করি। আইজ আমার মন ভালো।

আমি তোমার কাছে উকিল মুনসির গান শুনতে আসছি। অন্য গান না।

টাকা কত এনেছেন?

বিশটা রুপার টাকা এনেছি। চলবে?

হ্যাঁ, চলবে। জুলেখা পিকদানে চাবানো পান ফেলে ঠোঁট মুছেই গান ধরল—

আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়
নিঠুর বন্ধুরে
বিচ্ছেদের বাজারে গিয়া
তোমার প্ৰেম বিকি দিয়া
করব না প্ৰেম আর যদি কেউ কয়।

জুলেখার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। চোখের কাজল পানিতে ধুয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। তার ফর্সা মুখে তৈরি হচ্ছে কালো রেখার আঁকিবুকি।

গান শেষ করে জুলেখা বলল, আরো কি গাইব?

অতিথি বললেন, বিশটা রুপার টাকায় যে কয়টা হয়। সেই কয়টা গান Crs

জুলেখা বলল, উকিল মুনসির একটা গানের দাম এক কলসি সোনার মোহর।

অতিথির ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল। তিনি দ্রুত সেই হাসি মুছে ফেলে বললেন, তোমার ঘরে ঢোল তবলা কিছু থাকলে আমারে দাও, গানের সাথে তাল দেই। তাল বিনা গান গাইতে তোমার অসুবিধা হইতেছে। আচ্ছা থাক, লাগবে না।

অতিথি পিকদান কাছে টেনে নিলেন। হাতের বাড়িতে পিকদান থেকে সুন্দর ধাতব শব্দ হলো।

জুলেখা হাসিমুখে বলল, আপনি তো বিরাট উনসুনি লোক (উনসুনি : সূক্ষ্ম কলাকৌশলে ওস্তাদ ব্যক্তি)। উকিল মুনসির গান পিয়ার করেন?

হুঁ।

জুলেখা দ্বিতীয় গান ধরল—

রজনী প্রভাত হলো ডাকে কোকিলা
কার কুঞ্জে ভুলিয়া ভুলিয়া…

অতিথি বললেন, তুলিয়া ভুলিয়া হবে না। হবে ভুলিয়া রহিলা।

রজনী প্ৰভাত হলো ডাকে কোকিলা
কার কুঞ্জে ভুলিয়া রহিলা।

জুলেখা বলল, আপনার পরিচয় কী?

অতিথি বললেন, আমার নাম উকিল মুনসি।

ঘরে যেন বজ্ৰাঘাত হলো। কিছুক্ষণ নিম্পলক তাকিয়ে থেকে হিন্দুদের প্ৰণামের ভঙ্গিতে জুলেখা উকিল মুনসির পায়ে মাথা রাখল। তার শরীর কেপে কেঁপে উঠছে। চাপা ফোঁপানির শব্দ আসছে।

উকিল মুনসি বললেন, তোমার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি। আমি তোমাকে দোয়া দিলাম।

জুলেখা বলল, কী দোয়া দিলেন?

সব কিছু তোমাকে ছেড়ে গেলেও গান কোনোদিন ছেড়ে যাবে না। পা থেকে মাথা সরাও, আমি এখন উঠব। ঘাটে নাও নিয়া আমি আসছি। নাও-এ। আমার স্ত্রী অপেক্ষা করতেছেন। আমাকে বেশিক্ষণ না দেখলে তিনি অস্থির বোধ করেন।

জুলেখা বলল, আমার মাথা সরাব না। আপনার যদি যেতে হয় পাও দিয়া আমার মাথায় লাথি দিবেন। মাথা সরবে। তারপর আপনি যাবেন।

উকিল মুনসি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। মেয়েটা এখন ঘোরের মধ্যে আছে। তাকে উঠে বসানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন। ঘোরের মধ্যে যে আছে তার ঘোর ভাঙানো কঠিন। ঘোরের বিষয়টা তিনি জানেন।

জুলেখা!

জি।

আরো কয়েকটা গান করো শুনি।

জুলেখা উঠে বসতে বসতে বলল, আমি সারারাত গান করব। অল্প নাচ শিখেছি, যদি বলেন নাচ দেখাব।

নাচের প্রয়োজন নাই। গান করো। ঘাটুগান জানো? ঘাটুগানের সুর অতি মনোহর।

আপনার সামনে আমি আপনার গান করব। অন্য কোনো গান না। জুলেখা গানে টান দিল।

 

লাবুসের মা নৌকায় অপেক্ষা করছেন। তিনি একা না। নৌকার দু’জন মাঝি ছাড়াও জহির নামের ছেলেটা সঙ্গে আছে। এই ছেলের চেহারা দেবদূতের মতো। অতি রূপবতীদের যেমন বিপদ, অতি রূপবান বালকের তেমন বিপদ। ছেলেটির জন্যে তিনি মমতা বোধ করছেন। লাবুসের মা’র হাতে তসবি। তিনি তসবি টানতে টানতে নিচু গলায় ছেলেটির সঙ্গে গল্প করছেন।

বাংলা পড়তে শিখেছি?

জি।

আলহামদুলিল্লাহ। হাতের লেখা সুন্দর আছে?

হাতের লেখা সুন্দর।

আলহামদুলিল্লাহ। পিতামাতা জীবিত?

হুঁ।

শুকুর। আলহামদুলিল্লাহ। তোমার উপরে আল্লাহপাকের খাস রহমত আছে।

জহির স্পষ্ট গলায় বলল, রহমত নাই।

লাবুসের মা’র হাতের তসবি থেমে গেল। তিনি চমকে তাকালেন। পুতুলের মতো ছেলেটি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। তিনি বললেন, কেউ যদি বলে আমার উপরে আল্লাহর রহমত নাই, তাহলে সে নাফরমানি করে। এই কাজ আর করব না। বিলো, আল্লাহপাক আমাকে ক্ষমা করো।

বলব না।

লাবুসের মা বড়ই অবাক হলেন। ছেলেকে দেখে মনে হয় নরমসরম কিন্তু কথাবার্তায় কাঠিন্য আছে। বাঁশ নুয়ে পড়ে। এই ছেলে কিঞ্চির মতো সোজা। লাবুসের মা বললেন, তুমি অন্যদিকে তাকায়ে আছ কেন? আমার দিকে তাকাও। আসো আমরা গল্প করি।

জহির ফিরে তাকাল। লাবুসের মা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করলেন, ছেলেটার চোখ ভেজা। তিনি বললেন, আমার নাম লাবুসের মা। আমার যখন দুই বছর বয়স তখন থাইকা আমি লাবুসের মা। অথচ আমার কোনো সন্তানাদি নাই। কোনোদিন হইব তারো ঠিক নাই। তারপরও সবার মুখে লাবুসের মা। মজা না?

জহির হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মাথা নাড়ার ফাঁকে চট করে চোখের পানি মুছে নিল।

তোমাকে এখন যদি আমি লাবুস নাম দেই, কেমন হয়?

জহির ফিক করে হেসে ফেলল। লাবুসের মা বললেন, আইজ থাইকা তোমার নাম লাবুস। ওই পুলা, লাবুস!

জহির হাসি চাপিতে চাপতে বলল, জি।

জি কিরে পুলা? আমি লাবুসের মা। তুই আমারে মা ডাকবি না? বল জি भी।

লইজ্যা লাগে।

মা’র কাছে পুলার কী লইজ্যা? ও লাবুইচ্যা!

কী মা?

তুই যাবি আমার লগে?

যাব।

সত্যি যাবি?

হুঁ যাব।

বল–

উপরে আল্লা নিচে মাটি
যে কসম কাটছি। সেই কসম খাঁটি।

জহির বলল—

উপরে আল্লা নিচে মাটি
যে কসম কাটছি। সেই কসম খাঁটি।

 

উকিল মুনসি যে রাতে জহিরকে নিয়ে রওনা হলেন, সেই রাতে বান্ধবপুরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। জহিরের বাবা সুলেমান তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিল। এই স্ত্রীর নাম হালিমা। সে মোটাসোটা অল্পবুদ্ধির হাসি-খুশি মেয়ে। তার জীবনের একটাই শাখ- সারাদিন পান চিবানো। পান খাওয়ার মতো অতি তুচ্ছ ঘটনাই তালাকের কারণ। সুলেমান বলেছিল— তুই কি ঘোড়া? সারাদিন জাবর কাটস? পান খাইয়া আমার সংসার ড়ুবাইছস। আমারে পথের ফকির করছিস।

সুলেমানের কথায় অতি বিস্মিত হয়ে হালিমা বলেছিল, পান তো আপনের পয়সায় খাই না। পান। আর গুয়া আমার বাপের বাড়ি থাইক্যা আসে।

এই অপমানসূচক কথায় সুলেমানের মাথায় আগুন ধরে যায়। সে বলে, কী এত বড় কথা! বাপের বাড়ির খোটা? যা, বাপের বাড়িত গিয়া পান খাইতে থাক, তোরে তালাক দিলাম। আইন তালাক, বাইন তালাক, গাইন তালাক। তিন তালাক। তুই তোর বান্দি বেটি নিয়া বিদায় হ।

তিন তালাকের পর আর এই বাড়িতে থাকা যায় না। যে কিছুক্ষণ আগেও স্বামী ছিল, তার মুখ দর্শনও করা যায় না। সে এখন পরপুরুষ। হালিমা কাঁদতে কান্দতে শাড়ির আঁচলে লম্বা ঘোমটা দিয়ে বলল— হোসনার গর্ভ হয়েছে। সে কী করব? (হোসনা, হালিমার দাসী। সে-সময় স্বামী কর্তৃক দাসীদের গর্ভসঞ্চার স্বীকৃত ছিল।)

সুলেমান বলল, সন্তান হোক। সন্তান হইলে সন্তান নিয়া আসব। হোসনা থাকবে তোর সাথে। সে তোর বান্দি। আমার না।

হালিমা কান্দতে কাঁদতে দাসীকে নিয়ে নৌকায় উঠল।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটল ধনু শেখের বাড়িতে। ধনু শেখ তার বাড়িতে লাখের বাতি জ্বালালো। তখনকার নিয়মে নব্যধনীদের সঞ্চিত অর্থ এক লক্ষ অতিক্রম করলে সবাইকে তা জানানোর নিয়ম ছিল। এই জানান দেয়া হতো লাখের বাতি জ্বলিয়ে এবং বাড়িতে ঘাটুগানের আয়োজন করে। যে মানুষটি লাখের বাতি জ্বলিয়েছে, তাকে সমীহ করা দস্তুর ছিল।

ধনু শেখের বাড়ির উঠানে লম্বা বাঁশ টানিয়ে বাঁশের মাথায় হারিকেন ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রচুর লোকজন এসেছে। তাদের জন্যে মিষ্টির ব্যবস্থা হয়েছে। ঘাটুগান শুরু হয়েছে। এই গান সারারাত চলবে। সূর্য উঠার পর গান বন্ধ। তখন শিন্নির ব্যবস্থা। শিন্নি হচ্ছে খাসির মাংস এবং খিচুড়ি। লাখপতির উৎসবের জন্যে চারটা খাসি জবেহ হয়েছে।

ঘাটুগানের অধিকারী তিনটি ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। তিনজনই রূপবান। এরা মেয়েদের ফ্রক পরে মেয়ে সেজেছে। পায়ে নূপুর পরেছে। অধিকারীর ইশারায় গান শুরু হলো। একজন মঞ্চে এসে নারিকেলের মালার বুক চেপে ধরে গান ধরল—

আমার মধু যৌবন কে করিবে পান?

দোহার এবং বাদ্যযন্ত্রীরা বিপুল উৎসাহে বাজনা বাজাতে বাজাতে দোহার ধরিল–

কে করিবে পান গো? কে করিবে পান?

ধনুর একমাত্র স্ত্রী কমলা, চিকের পর্দার আড়াল থেকে ঘটু নাচ দেখছে। তার বুক কাঁপছে। কেন জানি মনে হচ্ছে এই ছেলেটাকে তার স্বামী রেখে দিবে। পালঙ্কে এখন সে আর তার স্বামী শুবে না। তাদের মাঝখানে ঘাটুছেলেটা শুয়ে থাকবে। কী লজ্জা! কী লজ্জা!

 

ঘাটুছেলেটা যখন নাচছে তখন ঠিক তার বয়সি একজন আসানসোলের এক রুটির দোকানে লেটো নাচের কাহিনী এবং গান লিখছে। আশ্চর্য কাণ্ড! গানে সুরও দিচ্ছে। (ঘাটু এবং লেটো নাচের মধ্যে পার্থক্য তেমন নেই।- লেখক)। তার বয়স এগারো। রুটির দোকানে তার মাসিক বেতন পাঁচ টাকা। কিশোরের নাম কাজী নজরুল ইসলাম। ডাকনাম দুখু মিয়া। কারণ দুঃখে দুঃখেই তার জীবন কাটছে।

বান্ধবপুরের পশ্চিমে মাধাই খাল

বান্ধবপুরের পশ্চিমে মাধাই খালের দু’পাশে পাঁচমিশালি গাছের ঘন জঙ্গল। বাঁশঝাড়, ডেউয়া, বেতঝোপ, ভূতের নিবাস ঝাঁকড়া শ্যাওড়া গাছ। জায়গায় জায়গায় বুনো কাঁঠাল গাছ— যে গাছ কখনো ফল দেয় না। এমনই এক কাঁঠাল গাছের নিচে আজ ভোর রাতে একটা বকনা, গরু জবাই হয়েছে। জবাই করেছেন মাওলানা ইদরিস। ধনু শেখের মানতের গরু। ধনু শেখকে গতবছর কলেরায় ধরেছিল। জীবন যায় যায় অবস্থায় তিনি মানত করেন— যদি এই দফায় প্ৰাণে বাচেন তাহলে গরু শিন্নি দেবেন।

গরুর শিন্নির কঠিন বিষয় জঙ্গলের ভেতর করতে হয়েছে। ধনু শেখ বাড়ির দু’জন কমলা এবং তার ছোটভাইকে নিয়ে এসেছেন। গরু জবাইয়ের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে। চামড়া হাড়গোড় গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কেউ যেন বুঝতে না পারে। শিন্ত্রির মাংস সবাইকে ভাগ করে দেয়া নিয়ম। ধনু শেখ নিজে এই কাজটি করছেন। মুসলমান ঘর হিসাব করে করে মাংস ভাগ করছেন। পদ্মপাতায় মাংস পুটলি করা হচ্ছে। দিনের মধ্যেই বাড়ি বাড়ি মাংস পৌঁছে যাবে।

মাওলানা ইদরিস একটু দূরে বসেছেন। তাকে সামান্য চিন্তিত মনে হচ্ছে। গোপনে গরু জবেহ করার খবর চাপা থাকবে তার এরকম মনে হচ্ছে না। সামনে মহাবিপদ।

ধনু শেখ বললেন, মাওলানা, আপনারে দুই ভাগ দেই?

মাওলানা বললেন, প্রয়োজন নাই। এক ভাগ দিলেই চলবে। আমি একজন মোটে মানুষ।

ঘরে তেল আছে তো? গরুর মাংসের সোয়াদ তোলে। অর্ধেক মাংস অর্ধেক তেল, যতটুকু মাংস ততটুক পেঁয়াজ। পেয়াজের অর্ধেক আদা। অল্প আঁচে দুপুরে বসাবেন সন্ধ্যারাতে নামাবেন— অমৃত।

ধনু শেখের এক কামলা বলল, অন্য মশলা পাতি লাগবে না?

ধনু শেখ বললেন, মশলাপাতি থাকলে দিবা, না থাকলে দিবা না। ইলিশ মাছে যেমন মশলা লাগে না, গরুর মাংসেও লাগে না। একটু লবণের ছিটা, একটু কাঁচামরিচ, ইলিশ মাছের জন্যে এই যথেষ্ট। রুই মাছের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। পাকের নানান হিসাব।

রান্নাবান্নার গল্প শুনতে মাওলানার মোটেই ভালো লাগছিল না। ধনু শেখ এত আগ্রহ করে রান্নার গল্প করছে, কিছু না বললে ভালো দেখায় না বলে তিনি বললেন, রুই মাছের হিসাবটা কী?

ধনু শেখ বললেন, রুই মাছ তরিবত করে রাঁধতে হয়। কথায় আছে—

অরাঁধুনীর হাতে পড়ে রুই মাছ কাঁদে
না জানি রাঁধুনী মোরে কেমন করে রাঁধে।

মাওলানা নিম্পূহ গলায় বললেন, ও আচ্ছা।

ধনু শেখ বললেন, আপনি কি চিন্তাযুক্ত?

মাওলানা হঁহা-সূচক মাথা নাড়লেন।

ধনু শেখ বিড়ি ধরাতে ধরাতে বললেন, কোনো চিন্তা করবেন না। কেউ কিছু জানবে না। আর জানলেও অসুবিধা নাই। ব্যবস্থা নেয়া আছে।

কী ব্যবস্থা?

সেটা আপনার না জানলেও চলবে। সবার সবকিছু জানতে নাই। আপনি মাওলানা মানুষ। হাদিস কোরান নিয়া থাকবেন। যার যে কৰ্ম সে সেই কর্ম নিয়া থাকবে।

ধনু শেখের চেহারা আনন্দে ঝলমল করছে। ছোটখাটো মানুষ। লাখের বাতি জ্বালাবার পর থেকে ছোটখাটো মানুষটাকেই বড় লাগছে। যেন মানুষটা এখন বিশেষ কেউ। তাকে অগ্রাহ্য করা যাবে না।

মাওলানা, দেশের খবর কিছু রাখেন?

দেশের কী খবর?

স্বরাজের খবর। স্বরাজ শুরু হইছে।

সেইটা কী?

স্বাধীন হওয়ার জন্যে মারামারি কাটাকাটি। হেন্দুরা এরে বোমা মারতেছে ওরে বোমা মারতেছে।

ক্ষুদিরামের কথা শুনেছি।

ধনু শেখ তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বোকার দল স্বরাজ কইরা মরুক, আমরা এর মধ্যে নাই।

মাওলানা বললেন, আমরা নাই কেন?

ধনু শেখ গলা নামিয়ে বললেন, দেশ তো মুসলমানের। দিল্লির সিংহাসনে কি কোনো হেন্দু ছিল? ছিলাম আমরা। হেন্দুরা দেশ স্বাধীন কইরা দিব। আমরা গদিতে বসব। এরার চোখের সামনে গরু, কাঁইট্টা খাব। হেন্দুরাও পেসাদ পাইব। হা হা হা।

জঙ্গল থেকে তারা বের হলো দুপুরের আগে আগে। ধনু শেখ পদ্মপাতায় মোড়া মাংসের ঝাকা এবং দলবল নিয়ে মাধাই খালে এসে নৌকায় উঠল। নৌকা সরাসরি ধনু শেখের বাড়ির পেছনে থামলা। ধনু শেখ নিজ বাড়িতে ছেলের আকিকা উপলক্ষে দুটা খাসি জাবেহের ব্যবস্থা করেছেন। খাসি জবেহতে কোনো বাধা নেই। এই কাজ প্রকাশ্যে করা যায়।

ধনু শেখ খাসির মাংসের সঙ্গে সব মুসলমান বাড়িতে এক পোটলা গরুর মাংসও দিয়ে দিলেন। হতদরিদ্ররা যেন মাংস ঠিকমতো রাধতে পারে তার জন্যে তেলমসলা কেনা বাবদ একটা করে আধুলি পেল। বাড়িতে বাড়িতে মাংস রান্না হবে। গন্ধ ছড়াবে। কারোর কিছু বলার নেই। খাসির মাংস রান্না হচ্ছে।

এক পোটলা মাংস গেল অম্বিকা ভট্টাচার্যের কাছে। ধনু শেখ নিজেই নিয়ে গেলেন। অতি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ঠাকুর! আমার ছেলের আকিকার খাসির মাংস। আত্মীয় বান্ধবদের বাড়িতে এই মাংস বিলি করার বিধান আছে। এই মাংস আপনি কি গ্ৰহণ করবেন?

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য বললেন, খাসির মাংসে কোনো দোষ নাই। তবে মুসলমানের বাড়ির মাংস বিধায় শোধন করে নিতে হবে। শোধন করার খরচা যদি দাও মাংস নিতে পারি।

খরচ কত?

এক টাকার কমে হবে না। কপূর লাগবে। একশ’ বছরের পুরনো ঘিতে কপূর দিতে হবে। সেই ঘি পুড়িয়ে তার ধোঁয়া মাংসের গায়ে লাগাতে হবে। বিরাট ঝামেলা।

ধনু শেখ এক টাকার জায়গায় দুটাকা দিলেন। মাংস শোধন বাবদ এক টাকা। তেল এবং মশলা পাতি কেনা বাবদ এক টাকা।

ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দ করে সেই রাতে গরুর মাংস খেলেন।

ধনু শেখ যাবেন নটিবাড়িতে। সপ্তাহে একদিন (মঙ্গলবার) তিনি নটিবাড়িতে রাত্রিযাপন করেন। আজ মঙ্গলবার। চাদরে আতর মাখিয়ে পাম্পশু পায়ে রওনা হয়েছেন, পথে ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্যের বাড়িতে থামলেন। বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন, পুত্রের আকিকার মাংস ঠাকুর খেয়েছেন কি-না।

অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, সবাইকে নিয়ে খেয়েছি। তৃপ্তি করে খেয়েছি।

ধনু শেখ বললেন, শুনে খুশি হলাম। তবে ঠাকুর একটা বিষয়। মাংস গরুর। ভুলক্রমে খাসির মাংস ভেবে আপনাকে গরুর মাংস দিয়েছি। গোপনে একটা গরু জবেহ করেছিলাম। সেই গরুর মাংস।

হতভম্ব অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য বললেন, কী বললা?

ধনু শেখ বললেন, যা বলেছি। সত্য বলেছি। তবে আপনার চিন্তার কিছু নাই। কেউ জানবে না।

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য বিড়বিড় করে বললেন, কেউ জানুক বা না-জানুক, জাত তো চলে গেছে।

ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, জাত চলে গেলেও চুপ করে থাকেন। আপনার কন্যা আছে। তার বিবাহ দিতে হবে না? ঠাকুর, যাই।

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য ঘোর লাগা মানুষের গলায় বললেন, কোথায় যাও?

ধনু শেখ বললেন, আজ মঙ্গলবার। নটিবাড়িতে যাই। মঙ্গলবার রাতটা আমি নটিবাড়িতে কটাই। জানেন নিশ্চয়ই?

অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য কাদো কাদো গলায় বললেন, এইটা তুমি কী করলা?

ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, আপনাদের এমন কিছু কি আছে যা খেলে মুসলমানের জাত যাবে? থাকলে দেন খাই। সমানে সমান হবে।

ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্যের সপরিবারে গো-মাংস ভক্ষণ কাহিনী তৃতীয় দিনের দিন প্রকাশিত হয়ে পড়ল। বিধান দেবার জন্যে শ্যামগঞ্জ থেকে ন্যায়রত্ন রামনিধি চলে এলেন। তিনি বললেন, গরু যদি অল্পবয়স্ক হয় তাহলে জাত যাবে না। প্ৰায়শ্চিত্ত করলেই হবে। কারণ পাৰ্বতীর পিতা, শিবের শ্বশুর মহারাজা দক্ষ যে যজ্ঞ করেছিলেন সেখানে গোবৎস বধ করা হয়েছে। ব্ৰাহ্মণরা গোবৎসের খেয়েছেন।

জানা গেল ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য যে মাংস খেয়েছেন তা বয়স্ক গরুর মাংস।

ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, এরও বিধান আছে। যে পরিমাণ গো-মাংস প্ৰত্যেকে খেয়েছে সেই পরিমাণ কাঁচা গোবর এক সপ্তাহ খাবে। তাতে শরীর শোধন হবে। শরীর শোধিত হবার পর গঙ্গায় একটা ড়ুব দিলে গো-মাংস ভক্ষণজনিত বিষ শরীর থেকে চলে যাবে।

ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য শরীর শোধনের প্রাথমিক পরীক্ষায় ফেল করলেন। এক চামচ গোবর মুখে দিয়ে বমি করতে করতে মৃতপ্রায় হলেন। সপরিবারে মুসলমান হবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এক শুক্রবার জুমা নামাজের পর তিনি মাওলানা ইদরিসের কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিলেন। সবাই মুখে তিনবার বললেন—

লা ইলাহা ইল্লাললাহ।
আল্লাহ ছাড়া কোনো মারুদ নাই।
মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
মুহাম্মদ তাঁর রসুল।

মাওলানা ইদরিস প্রত্যকের ডান কানে তিনবার করে সূরা ইয়াসিন পাঠ করে ফুঁ দিয়ে দিলেন। ফু’র পরপরই ডান হাতে কান বন্ধ করতে হলো। সূরা ইয়াসিন দীর্ঘ সময় ক্যানের ভেতর থাকে।

হাজাম ধারালো বাঁশের কঞ্চি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ইসলাম ধর্মগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়া মাত্র সে দলের পুরুষদের খতনা শুরু করল। তাদের চোখের জল এবং চাপা গোঙানির ভেতর দিয়ে ইসলামধর্মে দাখেলের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হলো। অম্বিকা ভট্টাচার্যের নাম হলো— মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। সবাই ডাকা শুরু সিরাজ ঠাকুর। ঠাকুর থেকে মুসলমান হয়েছিল এই জন্যই নামের শেষে ঠাকুর।

এই ঘটনার বিস্তৃত ব্যাখ্যার একটা কারণ আছে। বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের মাতুল বংশের একটা শাখার পূর্বপুরুষ ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য। বর্তমান পুরুষরা হিন্দুয়ানির সব ছেড়েছেন, ঠাকুর পদবি ছাড়েন নি। ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের এক নানার নাম আনিসুর রহমান ঠাকুর। তিনি কঠিন ধাৰ্মিক মানুষ ছিলেন। তাঁর রাত কাটতো এবাদত বন্দেগি করে।

 

জুলেখার বাড়িতে আজ নতুন অতিথি। অতিথিকে জুলেখার চেনা চেনা লাগছে। ঠিক চিনতে পারছে না। তবে এই মানুষটাকে সে যে দেখেছে। এই বিষয়ে সে নিশ্চিত।

অতিথি খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসেছেন। এই খাট জুলেখা নতুন কিনেছে। ময়ূর খাট। ময়ুরের কাজ করা। অতিথি বলল, তোমার সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছি। তোমার নাম কী গো?

জুলেখা বলল, পিতামাতা নাম রাখতে বিস্মরণ হয়েছেন। আপনে সুন্দর দেইখা নাম দেন।

অতিথি বলল, আমার সাথে মীমাংসায়’ (ধাধায়) কথা বলব না। আমি মীমাংসা পছন্দ করি না। তোমার নাম বলো, ধর্ম বলো।

জুলেখা বলল, আমার যেমন নাম নাই, ধৰ্মও নাই। আমার ঘরে যে আসে তার ধর্মই আমার ধর্ম।

নাম বলো। নাম না বললে উইঠ্যা চইলা যাব।

অতিথি উঠার ভঙ্গি করল। জুলেখা চুপ করে রইল। চলে যেতে চাইলে চলে যাবে। জুলেখা বাধা দিবে না। অতিথি বলল, তুমি সুন্দর ঠিক আছে, কিন্তু অতি বেয়াদব মেয়ে। সঙ্গে বন্দুক থাকলে গুল্লি করতাম। বেয়াদব মেয়ের একটাই শাস্তি— নাভি বরাবর গুল্লি।

জুলেখা এই কথায় অতিথিকে চিনল। ইনি এককালের জমিদার শশাংক পাল। হাতি নিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতেন। বাঘের সন্ধান করতেন। জুলেখা বলল, আপনের মাথা সামান্য গরম হয়েছে। শরবত খাবেন? শরবত খাইলে মাথা ঠাপ্ত হবে।

তুমি তোমার নাম বলো। নাম বললে মাথা ঠাণ্ডা হবে।

আমার এক নাম জুলেখা। আরেক নাম চান বিবি।

কোনটা আসল?

দুইটাই আসল।

মুসলমান?

হুঁ।

কালো ব্যাগটা খোল। বোতল আছে। গোলাসে কইরা বোতলের জিনিস দেও। আইজ এই জিনিস বেশি কইরা খাইতে হবে। মন অত্যধিক খারাপ।

মন খারাপ কী জন্যে?

আইজ অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য দলেবলে মুসলমান হইছে, খবর পাও নাই?

জুলেখা বলল, তার গরু খাওনের ইচ্ছা হইছে সে মুসলমান হইছে। আপনের কী? আপনে ফুর্তি করতে আইছেন ফুর্তি করেন। গান শুনবেন?

গান জানো?

শিখতেছি।

শিখা শিখির গানের মধ্যে আমি নাই। সারাজীবন বড় বড় ওস্তাদের মাহফিলে গান শুনেছি। বড় বড় বাইজিদের নাচ গান শুনে সোনার মোহর দিয়েছি।

জুলেখা চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলল, এখন তো আপনের হাতে সোনার মোহর নাই। আমার গান ছাড়া গতি কী?

শশাংক পালের ভুরু কুঁচকে গেল। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। এই মেয়ে কথার পিঠে কথা বলার বিদ্যায়। ওস্তাদ। এর সঙ্গে সাবধানে কথা বলতে হবে।

জুলেখা গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে নিচু গলায় গান ধরল—

ও পক্ষী আমার চক্ষু খাইও না।
সৰ্বাঙ্গ খাইও পক্ষী
চক্ষু খাইও না।

শশাংক পালের মুগ্ধতার সীমা রইল না। মেয়ের যেমন কণ্ঠ তেমন গান। সে এক জায়গায় বসে বসে গান করছে না। ঘুরাফেরা করতে করতে গাইছে। কখনো কাছে আসছে, কখনো দূরে যাচ্ছে। গান গাইতে গাইতে সুপারি। কাটছে। ছড়তার শব্দটাও তখন তালে হচ্ছে। শশাংক পালের মনে হলো, আগেকার দিন থাকলে অবশ্যই এই মেয়ের দিকে একটা বা দুটা স্বর্ণমুদ্রা ছুঁড়ে দেয়া যেত।

অ্যাই মেয়ে, তোমার নাম যেন কী?

কমলা রানী।

একটু আগে বলেছ। জুলেখা, এখন কমলা রানী বলতেছ। কেন?

নাম তো আপনের মনে আছে, আবার জিজ্ঞাস করলেন কেন?

তামুক খাব। ব্যবস্থা কর। তামাক সঙ্গে আছে। ইকার নল ভালো করে ধুয়ে তারপর দিবা।

জুলেখা হাসল।

শশাংক পাল ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল— আফসোস, সময়কালে তোমার সঙ্গে দেখা হয় নাই।

জুলেখা বলল, সময়কালে দেখা হইলে কী করতেন?

শশাংক পাল জবাব দিলেন না। গ্লাস শূন্য। তিনি গ্লাস বাড়িয়ে দিলেন। জুলেখা গ্লাস ভর্তি করতে করতে বলল, আমার জন্যে টাকা পয়সা কী এনেছেন?

তুমি কত নাও?

যে যা দেয়। তাই নেই। আপনে জমিদার মানুষ, আপনে দিবেন। আপনের সম্মান মতো।

আজ সেই রকম দিতে পারব না। কাল দিব।

আইজ কি খালি হাতে আসছেন?

শশাংক জবাব দিলেন না। তিনি ঠিক খালি হাতে আসেন নি। রুপার একটা ফুলদানি নিয়ে এসেছেন। দামি জিনিস। এই মেয়ে কি তার কদর বুঝবে?

আইজ খালি হাতে আসলেও ক্ষতি নাই। আইজ খালি হাতে আসছেন, কাইল ভরা হাতে আসবেন। জগতের এই নিয়ম। আইজ পূর্ণিমা কাইল অমাবস্যা। খানা খাবেন না? খানা দেই।

খানা খাব? হাবিজাবি জিনিস বেশি খাইলে খানা খাইতে পারবেন না। কী খাওয়াবে?

আলোচলের ভাত। গাওয়া ঘি। বেগুন ভাজি আর মুগের ডাল। নিরামিষ খাওয়া। দিব?

দাও।

আসেন হাত-মুখ ধুয়ায়ে দেই, তারপর খানা খান।

জুলেখা।

জি।

তুমি অতি ভালো মেয়ে।

আপনেও অতি ভালো মানুষ। আপনের হাত কাঁপতেছে কেন?

আমার হাতকাঁপা রোগ হয়েছে।

চিকিৎসা কইরা হাত ঠিক করেন। হাতকাঁপা রোগ নিয়া গুল্লি করবেন ক্যামনে?

জুলেখা খিলখিল করে হাসছে। মুগ্ধ চোখে শশাংক পাল তাকিয়ে আছেন।

জুলেখা!

জি।

তুমি কি আমাকে বিবাহ করবে? এখন আমার কিছুই নাই, তারপরেও মরাহাতি লাখ টাকা বইলা কথা। তোমারে আমি আদর সোহাগে রাখব।

রাখবেন কই?

কলিকাতা নিয়া চইল্যা যাব। মালিটোলায় আমার ঘর আছে। দোতলা ঘর।

জুলেখা বলল, যাব। কইলকাতা শহর দেখা হয় নাই। দেখার শখ আছে।

তোমারে সবকিছু দেখাব। বজরা ভাড়া করব। কালিঘাট থাইকা বজরা ছাড়ব। সমুদ্র বরাবর বজরা যাবে। তুমি আমি ছাদে বইসা থাকব। তুমি গান করবা, আমি শুনব।

জুলেখা বলল, বাহ!

শশাংক পাল বললেন, যৌবনে আমি অনেক গান লিখেছি। ট্রাংকভর্তি ছিল লেখা। গানগুলা থাকলে সুবিধা হইত। তুমি গাইতে পারতা।

কোনোটা মনে নাই?

উহু। মনে করার চেষ্টা নিতেছি। মনে পড়লেই তোমারে বলব। বৃদ্ধ বয়সের এক সমস্যা— কিছু মনে থাকে না।

শশাংক পালকে জুলেখা যত্ন করে খাওয়ালো। নিরামিষ শশাংক পাল খেতে পারেন না। আজ তৃপ্তি করেই খেলেন। খাওয়ার শেষে হাতে পান দিতে দিতে জুলেখা বলল, এখন বাড়ি যান।

শশাংক পাল বিস্মিত হয়ে বললেন, বাড়ি যাব কেন? তোমার এখানে নিরামিষ খাওয়ার জন্যে আসি নাই। রাত্রি যাপন করতে আসছি।

জুলেখা বলল, আরেকদিন আসবেন। টাকা-পয়সা নিয়া আসবেন। রঙিলা বাড়ির মালেকাইন সরাজুবালা, উনার কঠিন নিয়ম। উনি বলেছেন— তেল মাখার আগে কড়ি ফেলতে হবে।

তুমি তাকে আমার নাম বলো। নাম বললেই মন্ত্রের মতো কাজ হবে। তাকে বলো জমিদার শশাংক পাল এসেছেন। এটা তার বাড়ির জন্য একটা ইজ্জত।

সরাজুবালা ঘুমায়ে পড়েছেন। একবার ঘুমায়া পড়লে তারে জাগানো যাবে माँ।

তোমার জন্যে আমি রুপার ফুলদানি এনেছি।

শশাংক পাল ব্যাগ খুলে ফুলদানি বের করলেন। জুলেখা হাই তুলতে তুলতে বলল, ফুলদানি এনেছেন ভালো করেছেন। পরেরবারে যখন আসবেন দেখবেন ফুলদানি ভর্তি ফুল। এখন বাড়িতে যান।

বাইরে বৃষ্টি পড়তেছে। বৃষ্টির মধ্যে আমি কই যাব? ছাতা দিতেছি।

ছাতা মাথায় দিয়া চইলা যাবেন।

জুলেখা শোন। আমি রাতে যাব না। চারদিকে আমার শত্রু। রাতে বিরাতে আমার চলাচল নিষেধ।

জুলেখা হাসিমুখে বলল, ধানাই পানাই কইরা লাভ নাই। আপনার যাইতে হবে। বৃষ্টির মধ্যেই যাইতে হবে। আগে আপনাকে বলেছিলাম ছাতা দিব। ভুল বলেছিলাম। ছাতা দিতে পারব না। ঘরে ছাতা নাই। আপনি যাবেন ভিজতে ভিজতে।

 

হরিচরণ টিনের চালাঘরে খাটের উপর বসেছিলেন। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ শুনতে ভালো লাগছে। রাত অনেক হয়েছে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, তিনি ঘুমুতে যাচ্ছেন না। চোখে প্রবল ঘুম নিয়ে জেগে থাকার আনন্দ আছে। তার কোলের উপর লালসালু কাপড়ে বঁধানো খাতা এবং ঝর্ণা কলম। সন্ধ্যায় খাতায় অনেক কিছু লিখেছেন। আরো লেখার ইচ্ছা হচ্ছে কিন্তু আলসি লাগছে। বৃষ্টির শব্দ মানুষকে অলস করে দেয়। হরিচরণ খাতার পাতা উল্টালেন—

অদ্য ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্যের ধর্মান্তরের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করিলাম। তাঁহাকে ভুলুষ্ঠিত বিষাদ বৃক্ষের মতো মনে হইল। তাহার দীর্ঘ দেহ ছটফট করিতেছিল। এক পর্যায়ে তিনি ‘জল জল’ বলিয়া চিৎকার করিলেন, তখন আসরে উপস্থিত ধনু শেখ বলিল, জল কবেন না। এখন থাইকা পানি কবেন। অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য বিড়বিড় করিয়া বলিলেন, পানি। পানি।

হরিচরণকে লেখা বন্ধ করতে হলো। টিনের দরজা নাড়ার শব্দ হচ্ছে। রাত অনেক হয়েছে। বাইরে দুর্যোগ। এই দুর্যোগে কে আসবে তার কাছে!

হরি, দরজা খোল। আমি শশাংক।

হরিচরণ দরজা খুলে বিস্মিত হলেন। শশাংক পাল কাদায়-পানিতে মাখামাখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ রক্তবর্ণ। শীতে থারথার করে কাঁপছেন।

হরি, বিশটা কাঁচা রুপার টাকা দিতে পার? বায়না হিসেবে দাও।

কিসের বায়না?

কলিকাতা শহরে আমার একটা দোতলা বাড়ি আছে। ঐ বাড়ি আমি লেখাপড়া করে তোমাকে দিয়ে দিব। ভগবান সাক্ষী, কথার অন্যথা হবে না।

হরিচরণ বললেন, আপনি ঘরে এসে বসুন। আপনাকে শুকনা কাপড় দেই। তোয়ালে দেই। মাথা মুছেন। আগুন করে দেই, আগুনের পাশে বসেন।

আমার এখনই যেতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন। তুমি বিশটা টাকা দাও। দিতে পারবো? ঘরে টাকা আছে?

আছে।

তাহলে আরেকটা কাজ করো। তোমার হাতিটা আমাকে কিছুক্ষণের জন্যে ধার দাও। আমি হাতির পিঠে করে এক জায়গায় যাব।

কোথায় যাবেন?

কোথায় যাব তোমার জানার প্রয়োজন নেই। অনেক দিন হাতির পিঠে চড়ি না। হাতির পিঠে চড়তে ইচ্ছা করতেছে।

হরিচরণ বললেন, আপনার শরীর ভালো না। দেখে মনে হয় জ্বর এসেছে। রাতটা আমার এখানে থাকেন। হাতিতে চড়ে সকালে যেখানে যাবার সেখানে যাবেন।

হরিচরণ! আমার এখনি যেতে হবে। আমি যেখানে যাব সেখানে দিনের আলোয় কেউ যায় না। ঠিক আছে, তোমারে খোলসা করে বলি। আমি যাব রঙিলা বাড়িতে। এখন বুঝেছ?

হরিচরণ কিছু বললেন না। শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, মৃত্যুর পরে কিছু নেই। শরীর পুড়ায়ে ফেলবে। ছাই পড়ে থাকবে। ছাইয়ের ভোগের ক্ষমতা নেই। আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা নেই। দেহধারীর আছে। এখন বুঝেছ? টাকা বের করো।

হরিচরণ টাকা বের করলেন।

কাগজে লেখে— কলিকাতা ১৮ ধর্মচরণ সড়কের বাড়ি মজু ভিলার ক্রয়ের বায়না বাবদ বিশ টাকা। আমি টিপসই দিতেছি।

টিপসই দিতে হবে না, আপনি টাকা নিয়ে যান।

হাতি বের করতে বলো। হাতির পিঠে হাওদা দিতে বলো।

 

গভীর রাতে হাতির পিঠে চড়ে শশাংক পাল রওনা হলেন। হাতির গলায় রুপার ঘণ্টা বাজতে লাগল-টুন টুন টুন।

পথ কর্দমাক্ত। হাতির চলতে অসুবিধা হচ্ছে। কাদায় পা ডেবে যাচ্ছে। তবে হাতি আপত্তি করছে না। বাজার পার হয়ে উত্তরের সরু পথের কাছে হাতি থমকে দাঁড়াল। শুঁড় দোলাতে লাগল। সে আগাবে কি আগাবে না। এই সিদ্ধাও নিচ্ছে।

ধনু শেখ এই সময় বাজারের দোকান বন্ধ করে ফিরছে। তার মাথায় একজন ছাতি ধরে আছে। পেছনে আরেকজন, তার হাতে বাঁশের পাকা লাঠি। হাতি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। হাতির পিঠে বসে থাকা মানুষটাকে চেনা যাচ্ছে না। ধনু শেখের হাতে হারিকেন। সে হারিকেন উঁচু করে ধরে বলল, কে? হাতির পিঠে কে?

শশাংক পাল বললেন, নিজের পরিচয় আগে দাও। তুমি কে?

ধনু শেখ বলল, গোস্তাকি মাফ হয়। আপনাকে চিনতে পারি নাই। সালাম। হুজুর কই যান?

শশাংক পাল বললেন, বিষ্টি বাদলার দিনে আলাপ পরিচয় করতে ভালো লাগতেছে না। তুমি ধনু শেখ না?

জে।

খাসির মাংস বইলা তুমিই তো অম্বিকা ভট্টাচার্যকে গরু দিলা?

ভুলক্রমে দিয়েছি। আমি বিরাট অপরাধ করেছি।

ভুলক্রমে কর নাই। কাজটা তুমি করেছ সজ্ঞানে। আগের ক্ষমতা যদি থাকতো তোমারে আমি নেংটা কইরা গ্রাম চক্কর দেওয়াইতাম।

ধনু শেখ বলল, দশজন বললে এখনো আমি নেংটা হইয়া গ্রাম চক্কর দিতে পারি। কোনো অসুবিধা নাই।

তুমি অতি ধুরন্ধর।

কথা সত্য।

আমার একটা দোনলা বন্দুক আছে, খরিদ করতে চাও?

অবশ্যই চাই।

দোনলাটা নেত্রকোনা সদরে বন্ধক দেয়া আছে। বন্ধকি ছুটায়ে বিক্রি করতে রাজি আছি। আমার অর্থের প্রয়োজন।

ধনু শেখ বললেন, আমি আগামীকাল নিজে উপস্থিত হব।

হাতি নড়তে শুরু করেছে, সম্ভবত তার বিবেচনায় এখন যাওয়া যায়। বৃষ্টি কমে এসেছে। চারপাশে ঘন অন্ধকার। দূরে রঙিলা বাড়িতে আলো দেখা যায়।

ধনু শেখ দোটানায় পড়েছে। রঙিলা বাড়ির দিকে যাবে, না নিজ বাড়িতে যাবে? আজি মঙ্গলবার না, তারপরেও ঝড়বৃষ্টির রাতে গানবাজনা, আমোদ ফুর্তি ভালো লাগে। আজ সারাদিন নানান ঝামেলা গিয়েছে। ঝামেলার শেষ করতে হয়। আমোদ দিয়ে। এইটাই নিয়ম।

ধনু শেখ নিয়মের ব্যতিক্রম করে বাড়ির দিকে রওনা হলো। বাড়িতেও আনন্দের ব্যবস্থা আছে। তারা নামের যে ঘাটুছেলেকে দুই মাসের চুক্তিতে রাখা হয়েছে সেই ছেলেটা ভালো। তার গানের গলাও ভালো। দুই মাসের চুক্তি শেষ হওয়ার পথে। ছেলের বাবা এসেছিল ছেলেকে নিয়ে যেতে। অনেক দেনদরবার করে তাকে ফেরানো হয়েছে। লোকটা বিদের হাডি। নতুন চুক্তিতে যাবে না। সে না-কি জমি কিনেছে। খেতের কাজে ছেলেকে দরকার। চাপ দিয়ে চুক্তির টাকার পরিমান বাড়াতে চায় এটা পরিষ্কার। ধনু শেখ চাপ খাওয়ার বস্তু না।

বাড়িতে পৌঁছে ধনু শেখ গরম পানিতে গোসল করল। খাওয়া দাওয়া সেরে পালঙ্কে গা ছেড়ে দিল। ধনু শেখের স্ত্রী কমলা পানের বাটা নিয়ে এলো। পান মুখে দিতে দিতে ধনু শেখ জড়ানো গলায় বলল, তারাকে ডাক। গানবাজনা হোক।

কমলা বলল, সে তো নাই।

হতভম্ব ধনু শেখ বলল, নাই মানে কী?

চইলা গেছে।

কই চইলা গেছে?

তার দেশের বাড়িতে।

কখন গেছে?

সাইন্ধ্যা কালে।

ধনু শেখ কঠিন গলায় বলল, মাগি তুই নিজেরে কী ভোবস? সইন্ধ্যা কালে গেছে, তুই আমারে খবর দিবি না? আমার বন্দুক নাই। বন্দুক থাকলে আইজ তরে গুলি কইরা মারতাম।

ধনু শেখ পালঙ্ক থেকে নামছে। চাদর গায়ে দিচ্ছে। কমলা ভীত গলায় বলল, আপনে যান কই?

ঐ বলদ পুলারে আনতে যাই। আইজ রাইতের মধ্যে যদি তারে না। আনছি, ঘুংঘুর পরাইয়া না নাচাইছি তাইলে আমার নাম ধনু শেখ না। আমার নাম কুত্তা শেখ।

কমলা ক্ষীণস্বরে বলল, সকালে যান।

ধনু শেখ বলল, মাগি চুপ! আমি এখনই যাব। ঐ পুলারে আইন্যা মাওলানা ডাকায়া শাদি করব। সে-ই হইব তোর আসল সতিন।

পুরুষের সাথে পুরুষের বিবাহ হয়?

টাকা থাকলে সবই হয়।

ধনু শেখ দুর্যোগের রাতেই বের হয়ে গেল। পথে কালী মন্দির পড়ল। বাজারের কালী মন্দির। ধনু শেখ কালীমূর্তির মাথা ভেঙে ফেলল। গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাওয়ার সময় কোনো মুসলমান যদি হিন্দু মন্দিরের কোনো ক্ষতি করে তাহলে বিনা ঝামেলায় কাৰ্য সমাধা হয়। এই ছিল তখনকার লোকজ বিশ্বাস।

শশী মাস্টার

শশী মাস্টার মাছ মারার কনুই জাল নিয়ে বের হয়েছেন। জাল ফেলার কৌশল তার এখনো রপ্ত হয় নি। জালের মুখ গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা। তা হচ্ছে না, জাল জড়িয়ে যাচ্ছে। শশী মাস্টারের জেদ চেপে গেছে, তিনি জাল ফেলেই যাচ্ছেন। পুরো কর্মকাণ্ড হচ্ছে শুকনায়, পানিতে না। শশী মাস্টারের কাজ আগ্ৰহ নিয়ে দেখছে সুলেমান। সে মাস্টারকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসে ফেসে গেছে। শুকনায় জাল ফেলার দৃশ্যে সে অভিভূত।

শশী মাস্টার বললেন, তুমি আমাকে কিছু বলতে এসেছ?

সুলেমান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশী মাস্টার বললেন, বলে ফেলো। কাজের সময় কেউ হা করে তাকিয়ে থাকলে ভালো লাগে না।

আপনার কাজ শেষ করেন, তারপর বলি। অপেক্ষা করি।

শশী মাস্টার জবাব দিলেন না। জাল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। জালের একটা অংশ হাতের কনুইয়ে জড়িয়ে রাখতে হয় বলেই এর নাম কনুই জাল। জাল ছুঁড়ে মারার সময় বিশেষ এক মুহুর্তে কনুই নামিয়ে দিতে হয়। সেই বিশেষ মুহূর্ত বের করা যাচ্ছে না বলেই বিপত্তি।

সুলেমান বলল, আমি দেখায়া দেই?

শশী মাস্টার বললেন, না। কৌশলটা আমি নিজে নিজে বের করব। তুমি কী বলতে এসেছি বলে চলে যাও। হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না। কোনো উপদেশ বা পরামর্শের জন্যে এসে থাকলে ‘নো’। আমি উপদেশ দেই না, পরামর্শও দেই না।

সুলেমান বলল, উপদেশ পরামর্শ না। আমি একটা আচানক জিনিস দেখছি। সেই বিষয়ে আপনারে বলতে চাই।

আমাকে বলে লাভ কী?

আপনি জ্ঞানী মানুষ। আচানক জিনিস ক্যান দেখলাম। আপনি বলতে পারবেন। আমি একজন মানুষরে শূন্যে ভাসতে দেখছি।

শূন্যে ভাসতে দেখেছি?

জে। মাটি থাইকা দুই তিন হাত উপরে সে ভাসতেছে।

শশী মাস্টার বললেন, গাজটা কম খাবে, তাহলে আর এইসব জিনিস দেখবে না। গাজা মনে হয় অতিরিক্ত খাচ্ছি।

মাস্টার বাবু, আমি গাজা খাই না। অনুমতি দেন পুরা ঘটনাটা বলি। মন দিয়া শোনেন।

শশী মাস্টার অনিচ্ছায় রাজি হলেন। বিরক্তিতে তাঁর ভ্ৰ কুঁচকে গেল। অশিক্ষার কারণে এইসব ঘটছে। ভূত-প্ৰেত, শূন্যে ভাসাভাসি, সবকিছুর মূলে অশিক্ষা। শশী মাস্টার সুলেমানের পাশে এসে বসতে বসতে বললেন, ঘটনা বলো। তবে সংক্ষেপে বলবে। ডালপালা দিয়ে বলবে না। আমি বৃক্ষ পছন্দ করি, ডালপালা পছন্দ করি না।

সুলেমানের ঘটনাটা এরকম— কয়েকদিন আগে সে গিয়েছে হরিচরণের বাড়িতে তার ছেলের সন্ধানে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। মাগরেবের আজান হয় হয়ে গেছে কিংবা এখনি হবে। ছেলেকে সে খুঁজে পেল না। ফিরে আসছে, হঠাৎ চোখ পড়ল। হরিচরণ বাবুর দিকে। তিনি পুকুরের শ্বেতপাথরের ঘাটে কান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। মনে হয়। ঘুমাচ্ছেন। ভর সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে থাকা খুব খারাপ, এইজন্যে সে উনাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার জন্যে ঘাটের কাছে গিয়ে থ’ হয়ে গেল। কারণ হরিচরণ শূন্যের উপরে শুয়ে আছেন। শ্বেতপাথরের ঘাট তাঁর দুই তিন হাত নিচে। এই হলো ঘটনা।

শশী মাস্টার বললেন, তুমি কী করলে? তাঁকে ডেকে তুললে?

সুলেমান বলল, আমি কিছুই করলাম না। দৌড় দিয়া পালায়া আসলাম। হারিকেন জ্বালায়া পরে আরেকবার গেছি। দেখি উনিও লণ্ঠন জ্বলায়ে বই श्रएহুঁ0ठgछ्न्म।

তাকে কি তুমি সন্ধ্যার ঘটনা বললে?

জে না।

বললে না কেন?

সাহসে কুলাইল না।

তুমি মদ, ভাং, গাজা, আফিম— এর কিছু খাও?

একবার তো বলছি- না। আমি মুসলমান। আমাদের ধর্মে এইসব খাওয়া নিষেধ আছে।

কোনোদিন খাও নাই?

একবার আফিং খাইছিলাম। পেটে বেদনা হইছিল। কবিরাজ চাচা বললেন, সরিষার দানা পরিমাণ আফিং দুধে দিয়া তিনদিন খাইতে। আমি দুইদিন খাইছি। দুইদিনেই আরাম হইছে।

হরিচরণ বাবু যে শুয়েছিলেন তাঁর গায়ে কি চাদর ছিল?

জে না।

মাথার নিচে বালিশ ছিল?

জে না।

তুমি যা দেখেছ, তার নাম ধান্ধা।

ধান্ধা কেন দেখাব?

ধান্ধা দেখার জিনিস তাই দেখেছি। দুনিয়ায় অনেকেই ধান্ধা দেখে। মরুভূমিতে দেখে মরীচিকা। চারদিকে ধুধু বালি— এর মধ্যে দেখে টলটলা পানি।

সুলেমান বলল, পানি দেখা আর মানুষ শূন্যে ভাসতে দেখা তো এক না।

শশী মাস্টার বললেন, জিনিস একই। তোমার মাথার কিছু দোষ আছে, এইজন্যে শূন্যে ভাসা মানুষ দেখেছ।

আরো একজন দেখেছে। তার মাথায়ও দোষ?

সেই একজন কে?

সুলেমান চাপা গলায় বলল, সে বিরাট পাপিষ্ঠ। তার নাম মুখে আনাও পাপ। একসময় আমার পরিবার ছিল, এখন নটিবাড়ির নটি। তার জন্যে আমার ইজ্জত গেছে। কাউরে মুখ দেখাইতে পারি না।

শশী মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, তার নাম কি জুলেখা?

হুঁ। এই নাম আমার সামনে নিয়েন না। সেই বান্দি প্রথম দেইখা আমারে বলছিল। সেও হরিবাবুরে একই জায়গা দেখেছে। উনি ঘুমের মধ্যে ছিলেন।

শশী মাস্টার বললেন, তোমার স্ত্রীও ধান্ধাই দেখেছে। তোমাকে বলার পর তোমার মন তৈরি ছিল ধান্ধা দেখতে। যথাসময়ে দেখেছি। এই ঘটনা কি তুমি আর কাউকে বলেছ?

মাওলানা সাবরে বলেছি। মাওলানা ইদরিস।

উনি কী বলেছেন?

উনি বলেছেন, দুষ্ট জিনের কাজ।

জিন শুধু শুধু উনাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখবে কেন?

সেটা আমি ক্যামনে বলব? জিনের সাথে তো আমার আলাপ পরিচয় নাই।

শশী মাস্টার বললেন, তুমি এই ঘটনা নিজের মধ্যে রাখবে। কাউরে বলে বেড়াবে না। বলাবলি করলে বিপদ হবে।

কী বিপদ?

দেশের মানুষ অশিক্ষিত। কুসংস্কারে ড়ুবে আছে। ঘটনা জানাজানি হলে সবাই ভাববে হরিবাবু বিরাট আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধুপুরুষ। ঝাড়ফুকের জন্যে দলে দলে লোক আসবে। কবচ দরকার, ঝাড়ফুক দরকার।

সুলেমান বলল, উনার কাছে তো আগে থাইকাই অনেকে যায়। ফুঁ নিতে যায়।

শশী মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, কই আমি তো জানি না!

আপনে থাকেন আপনের মতো। জানবেন ক্যামনে? মাস্টার বাবু, উঠি? ঘটনা কাউরে বলতে না করছেন, বলব না।

 

মাধাই খাল যেখানে বড়গাঙে পড়েছে সেখানে বিশাল এক পারুল গাছ। ফুলগুলি জবার মতো দেখতে, রঙ নীল মেশানো হালকা শাদা। শীতের সময় গাছতলা ফুলে ফুলে ঢেকে থাকে। হরিচরণ গাছের নিচটা বঁধিয়ে দিয়েছেন। শীতের সময় প্রায়ই তিনি বাধানো গাছতলায় এসে বসেন। পারুলের হালকা সুঘ্ৰাণে তার নেশার মতো হয়। মাঝে মাঝে তিনি খাতাপত্র সঙ্গে নিয়ে যান। লেখালেখি করেন। কী মনে করে যেন একটি গ্রন্থ রচনায় হাত দিয়েছেন। গ্রন্থের নাম—- ‘দেবদেবী অভিধান’। গ্রন্থে দেবদেবীর ঠিকুজি কুলিজি লিখছেন। তাদের কর্মকাণ্ডও লিখছেন।

মাঘ মাসের শেষ।

প্ৰচণ্ড শীত ছিল। আজ হঠাৎ ধাপ করে শীত নেমে গেছে। হরিচরণ পারুল গাছের নিচে আয়োজন করে বসেছেন। একটু দূরে কালু মিয়া হাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। জায়গাটা মোটামুটি জনশূন্য। হরিচরণ লিখছেন—

দেবী লক্ষ্মী

জগত তখনো সৃষ্ট হয় নাই। সনাতন কৃষ্ণের বাম অংশ হইতে এক অপরূপ নারীর সৃষ্টি হইল। তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ এই নারী দ্বাদশ বৰ্ষিয়া বালিকার ন্যায়। মুখমণ্ডল পূৰ্ণচন্দ্ৰ সদৃশ। এই নারীই লক্ষ্মী। তিনি হরিকে স্বামীরূপে কামনা করিলেন। হরি নিজ স্বরূপকে দুই অংশে বিভক্ত করিলেন। এক অংশের নাম চতুৰ্ভুজ নারায়ণ। অপর অংশ দ্বিভূজা কৃষ্ণ। চতুৰ্ভুজ নারায়ণ লক্ষ্মীকে পত্নীরূপে গ্রহণপূর্বক বৈকুণ্ঠে স্থায়ী সংসার গড়িলেন। দেবী লক্ষ্মী স্বৰ্গলক্ষ্মী হিসেবে অবস্থান করেন স্বর্গে, আবার একই সঙ্গে যোগমহিমায় গৃহলক্ষ্মী হিসেবে অবস্থান করেন মানুষের গৃহে গৃহে।

দেবী রাধা

সনাতন কৃষ্ণের ডান অংশ হইতে সৃষ্ট হইলেন অপরূপা রাধা। তিনিও লক্ষ্মীর ন্যায় হরিকে স্বামীরূপে প্রার্থনা করিলেন। হরির যে অংশ দ্বিভূজ কৃষ্ণ সেই অংশ রাধাকে লীলাসঙ্গীনি হিসেবে গ্রহণ করিয়া গোলকবিহারী হইলেন।

হরিচরণের লেখায় বাধা পড়ল। জেলেপাড়ার মুকুন্দ তার ছেলেকে নিয়ে এসেছে। ছেলের প্রচণ্ড জ্বর। মুকুন্দ ভীতগলায় ডাকল, কর্তা!

হরিচরণ বললেন, তোর খবর কিরে মুকুন্দ? আছিস কেমন?

মুকুন্দ বলল, কর্তা আছি ভালা। পুলাটার বেজায় জ্বর। আপনের কাছে নিয়া আসছি।

আমার কাছে কেন? সতীশ কবিরাজের কাছে নিয়া যা।

আপনে কপালে হাত দিলেই জ্বর। কমবে। ডাক্তার-কবিরাজ লাগব না।

হরিচরণ বললেন, আমি কপালে হাত দিলে জ্বর কমবে কেন?

মুকুন্দ বলল, ভগবান আপনেরে এই ক্ষমতা দিছে। কেন দিছে সেইটা উনার বিষয়। পুলাটার কপালে হাত দেন কর্তা। জুরে শ‍ইল পুইড়া যাইতেছে।

হরিচরণ মুকুন্দের জুরতপ্ত পুত্রের মাথায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘসময় একমনে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করলেন। এবং একসময় বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন— মুকুন্দের পুত্রের কপালে ঘাম হচ্ছে, জ্বর ছেড়ে দিচ্ছে। এই ঘটনা কেন ঘটছে তার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। একটাই ব্যাখ্যা- জগত অতি রহস্যময়।

কর্তা!

বল মুকুন্দ।

পুলার জ্বর নাই। শ‍ইল পানির মতো ঠাণ্ডা।

হুঁ।

আইজ নাও নিয়া হাওরে মাছ ধরতে যাব। পরথম মাছ যেটা পাব সেটা আপনের জন্যে।

আমার জন্যে মাছ আনতে হবে না। আমি মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।

আপনে মাছ খান না-খান আপনের জন্যে নিয়া আসব। আপনের নামে মানত করেছি। মাছ একখান যে উঠব।

হরিচরণ লেখায় মন দিলেন। মুকুন্দের খেজুরে আলাপ ভালো লাগছে না। মুকুন্দ যাচ্ছে না। ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে। পিতা-পুত্র মুগ্ধ হয়ে হরিচরণকে দেখছে।

হরিচরণ বললেন, বসে আছিস কেন চলে যা। ছেলেটার গায়ে রোদ লাগাচ্ছিাস, আবার জ্বর আসবে।

মুকুন্দ তৃপ্তির গলায় বলল, আসলে আসব। আমরার কবিরাজ এইখানে বসা। কর্তা, আমার পুলা একটা হপন দেখছে। হপন শুনলে আপনে হাসতে হাসতে পেট ফাইট্টা মরবেন।

কী স্বপ্ন?

হাপনে দেখছে হে হাতিতে চইড়া বিয়া করতে যাইতেছে। হা হা হা।

হরিচরণ মাহুত কালুকে ডেকে বললেন, মুকুন্দের ছেলেটাকে হাতিতে করে বাড়িতে দিয়ে আস।

মুকুন্দের মুখ হা হয়ে গেল।

 

আধমান ওজনের দর্শনীয় এক বোয়াল মাছ মুকুন্দ পৌঁছে দিয়েছে। সেই মাছ রান্না হচ্ছে। রান্না করছে। হাতির মাহুত কালু মিয়া। বিশেষ বিশেষ রান্নায় সে পারদশী। বড় বোয়াল রান্না করা জটিল ব্যাপার। সামান্য নাড়াচাড়াতেই পেটি ভেঙে যেতে পারে। পেটি ভাঙা মানেই মাছ নষ্ট।

মাছ খাওয়ার দাওয়াত পেয়েছেন মাওলানা ইদরিস এবং শশী মাস্টার। শশী মাস্টার জানালেন যে, তিনি তাঁর জীবনে এত স্বাদু মাছ কখনো খান নি। বোয়ালের মতো নিম্নশ্রেণীর একটা মাছ যে এত স্বাদু হতে পারে এটা তার কল্পনাতেও কখনো আসে নি। মাওলানা ইদরিস মাছ নিয়ে কিছু বললেন না, তবে খাওয়া শেষে হাত তুলে মোনাজাত করলেন- ‘হে আল্লাহপাক! যে বাড়িতে আমার জন্যে এত সুন্দর খাবার আয়োজন হয়েছে তার বাড়িতে যেন এরচেও অনেক সুন্দর আয়োজন প্রতিদিনই হয়।’ এই মোনাজাত করতে গিয়ে মাওলানার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল।

শশী মাষ্টার বললেন, মাওলানা সাহেব, আপনার সঙ্গে আমার সেইভাবে পরিচয় হয় নাই। তবে সর্বজনের কাছে আপনার সুনাম শুনেছি। আপনি যে প্রার্থনা করলেন সেটা শুনেও ভালো লাগল। এ ধরনের প্রার্থনা আমি কাউকে করতে শুনি না।

মাওলানা ইদরিস বললেন, এই ধরনের দোয়া আমাদের নবি-এ-করিম সাল্লালাহু আলাহেস সালাম করতেন। তাকে দাওয়াত করে নানা আয়োজনে কেউ যখন খাওয়াত তখন তিনি এই দোয়াটা করতেন।

শশী মাস্টার বললেন, দোয়াটা খুব সুন্দর। কিন্তু আপনি এই দোয়া করতে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন কেন, একটু জানতে পারি?

মাওলানা বললেন, জানতে পারেন। আজ আমার ঘরে কোনো খাবার ছিল না। মাঝে মাঝে এরকম হয়। টিন খুলে দেখি সামান্য চিড়া আছে। মনটা হলো খারাপ। আমি আল্লাহপাককে বললাম, ইয়া আল্লাহ, তোমার বান্দা কি আজ উপাস থাকবে? আল্লাহপাক সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করলেন। উনার রহমতের নমুনা দেখালেন। আল্লাহপাকের কাছে শুকুর গোজার করতে গিয়ে চোখে পানি এসেছে।

মাওলানার চোখে আবার পানি এসেছে। তিনি চোেখ মুছলেন। মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকলেন শশী মাস্টার।

রাত ভালোই হয়েছে। হরিচরণের সঙ্গে শশী মাস্টার পুকুরঘাটে বসে আছেন। শীত পড়েছে। চারদিক অন্ধকার করে কুয়াশা পড়েছে। হরিচরণ বললেন, রাত হয়েছে, বাড়িতে যাবে না?

শশী মাস্টার বললেন, আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে বসে जाछि।

কিছু তো জিজ্ঞাস করছ না।

অস্বস্তির কারণে জিজ্ঞাস করতে পারছি না।

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, অস্বস্তি কেন?

শশী মাস্টার বললেন, আপনি কিছু মনে করেন কি-না। এই ভেবে অস্বস্তি। আমি চাই না, আমার কোনো কারণে আপনি মনে কষ্ট পান। আমি আপনাকে অসম্ভব শ্ৰদ্ধা করি।

কী জিজ্ঞাস করতে চাও জিজ্ঞাস কর।

আপনার বিষয়ে যে অনেক গুজব প্রচলিত এটা কি জানেন? আপনি গায়ে হাত দিলে অসুখ সেরে যায়। এই ধরনের গুজব।

জানি।

এর কারণ কী?

হরিচরণ বললেন, কারণ কী আমি জানি না। কারণ নিয়ে মাথাও ঘামাই না। এটাই কি তোমার কথা?

না। মূল কথা না।

বলো, মূলটা শুনি।

শশী মাস্টার ইতস্তত করে বললেন, আপনি মহাপ্ৰাণ ব্যক্তি, এই বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জুলেখা নামের একটি মেয়ে আপনাকে বাবা ডাকত। শুনেছি আপনিও তাকে স্নেহ করতেন।

ঠিকই শুনেছে।

সেই মেয়ে বেশ্যাবাড়িতে স্থান নিয়েছে। আপনার মতো মহাপ্ৰাণ ব্যক্তি কিছুই করলেন না। আপনি ইচ্ছা করলেই মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনতে পারতেন। কেন তা করলেন না এটাই আমার জিজ্ঞাসা। প্রশ্নের জবাব দিতে না চাইলে দিতে হবে না। আমি বুঝে নেব।

হরিচরণ বললেন, প্রশ্নের জবাব দিব। মেয়েটির প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা তৈরি হয়েছিল বলে কিছু করি নাই। তাছাড়া মেয়েটিকে ফিরিয়ে আনলেও লাভ কিছু হতো না। কে গ্ৰহণ করত এই মেয়েকে। সে পতিতজন। যেখানে সে বাস করছে এর বাইরে তার স্থান নাই। কোনো পুরুষ তাকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করবে না। মেয়েটি অসাধারণ রূপবতী। অনেকেই হয়তো তাকে রক্ষিতা হিসেবে গ্ৰহণ করতে রাজি হবে। তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি কি হবে?

শশী মাস্টার চুপ করে রইল। হরিচরণ হঠাৎ শশী মাস্টারকে চমকে দিয়ে বললেন, তুমি মেয়েটিকে খুব পছন্দ কর, তাই না?

শশী মাস্টার বললেন, আপনি কীভাবে জানেন?

হরিচরণ বললেন, জুলেখার কথা থেকে অনুমান করেছি। তুমি তাকে কলের গান উপহার দিতে চেয়েছ। মোহের কাছে পরাজিত হওয়া ঠিক না। যাও, বাড়িতে যাও। বিশ্রাম কর।

শশী মাস্টার ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন।

হরিচরণ বললেন, পিতামাতার সঙ্গে কি কোনো যোগাযোগ হয়েছে?

শশী মাস্টার না-সূচক মাথা নাড়লেন। হরিচরণ বললেন, যোগাযোগ করা উচিত। তাদের রাগ নিশ্চয়ই এতদিনে পড়ে গেছে। তারা তোমার জন্যে ব্যাকুল হয়ে আছেন।

শশী মাস্টার কিছু বললেন না। হরিচরণ বললেন, আমি কি তাদের কাছে একটা পত্ৰ দিব?

দিতে পারেন।

পত্র লিখে আমি তোমার হাতে দিব। পত্রটা মন দিয়ে পড়ে তুমি যদি মনে করো পাঠানো যায় তাহলে পাঠাবে।

আচ্ছা।

তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার মন পীড়িত। আমার কথায় যদি মন পীড়িত হয় তাহলে সেটা আমার জন্যে কক্টের ব্যাপার। আমি তোমাকে অত্যন্ত স্নেহ করি।

শশী মাস্টার বললেন, আমি জানি।

হরিচরণ বললেন, পত্রটা আমি আজ রাতেই লিখে রাখব। পত্ৰলেখার জন্যে রাত্রি অতি উত্তম।

শশী মাস্টার বললেন, আমি যাই।

কালু মিয়াকে সঙ্গে দিয়ে দেই। এতটা পথ একা যাবে!

শশী মাস্টার বললেন, প্রয়োজন নাই।

 

ঘন কুয়াশায় শশী মাস্টার হাঁটছেন। উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। ডিসট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক ধরে সোজা চলে গেলেন বটকালি মন্দিরের কাছে। কিছুক্ষণ মন্দিরের সামনে দাড়িয়ে বাজারের দিকে রওনা হলেন। শিমুলতলা থেকে রওনা হলেন হরিবাবুর কাঠের পুলের দিকে। কাঠের পুলের সেগুন কাঠের রেলিং যথেষ্ট চওড়া। পা ঝুলিয়ে বসে থাকা যায়। শশী মাস্টার আগেও কয়েকবার এখানে এসে বসেছেন। যখন আশেপাশে কেউ থাকে না তখন পুলের উপর বসে কবিতা আবৃত্তি করা যায়।

শশী মাস্টার পুলের উপর পা ঝুলিয়ে বসলেন। চোখের সামনে যতদূর দৃষ্টি যায় মাধাই খাল। চাঁদের আলোয় চকচক করছে। শশী মাস্টারের প্রবল ইচ্ছা করছে ঝাপ দিয়ে খালে পড়তে। নিচে বাঁশের খুঁটি পোতা আছে কি-না ভেবে

ঝাঁপ দিতে পারছেন না। শশী মাস্টার কবিতা আবৃত্তি শুরু করলেন—

সূর্য গেল অস্তাচলে, দিগন্ত রেখায়
স্বর্ণ আভা, রাখি–
বাবলার শাখা হতে নমি তারি পায়
কহিল জোনাকি

কে, মাস্টার বাবু না? কী করেন?

প্রশ্ন করেছে ধনু শেখ। তার চোখে রাজ্যের বিস্ময়। শশী মাস্টার বললেন, কিছুই করি না। জেগে বসে আছি।

নিশি রাইতে জাইগা থাকে দুই কিসিমের মানুষ, সাধু আর শয়তান। আপনি কোন কিসিমের?

শশী মাস্টার জবাব দিলেন না। ধনু শেখ আগ্রহ নিয়ে বলল, আমি শয়তান। এই কারণেই নিশি রাইতে আমার চলাফেরা। রঙিলা বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিলাম। পেটে উঠেছে বেদনা- ফিরত যাইতেছি। আমার বাড়িতে কি যাবেন? বিলাতি শরাব ছিল, এক চুমুক দিতেন, শরীর গরম হইত। আপনাদের ধর্মে তো শরাব নিষেধ নাই।

শরাব খাওয়ার ইচ্ছা নাই।

জোয়ান বয়সে এক আধা চুমুক খাবেন না, এইটা কেমন কথা? ধর্মে যখন নিষেধ নাই তখন কত সুবিধা। আমরার ধর্মেনিষেধ, যে কারণে গোপনে খাইতে হয়।

আপনি তো শুনেছি প্ৰকাশ্যেই খান।

ঠিকই শুনেছেন। পুলের উপরে বইসা করতেছিলেন কী?

কবিতা আবৃত্তি করছিলাম। নিজের কবিতা। আমি আবার একজন কবি। শুনবেন কবিতা?

জে না। কবিতা, গানবাজনা শোনার মতো মনের অবস্থা না। শরীর ভালো না। শরীর ভালো থাকলে শুনতাম। আপনি বাদ্যবাজনা পারেন। শুনেছি— একদিন আপনার বাড়িতে গিয়া বাদ্য শুনব। যদি অনুমতি পাই।

অনুমতি দিলাম।

রাগ না করলে একটা উপদেশ দিতাম। শশী মাস্টার বললেন, উপদেশ শুনতে আমার ভালো লাগে না। তারপরেও দিন, রাগ করব না।

ধনু শেখ গলা নামিয়ে বলল, আপনের জোয়ান বয়স। পুলের উপরে খামাখা বইসা আছেন কোন কামে? আমার কথা শোনেন, রঙিলাবাড়িতে যান। কুয়াশা। যা পড়ছে। কেউ আপনেরে দেখবে না। আর দেখলেই কী? আমি যাই, পেটের বেদনাটা বাড়তেছে। বেদনা কম থাকলে আরো কিছুক্ষণ গফ করতাম। আপনার বিষয়ে অনেক কিছু শুনেছি— পরিচয় হয় নাই।

কী শুনেছেন?

আপনে পাগলা মানুষ। পাগলা মানুষ আমার পছন্দ, তবে পাগলা মেয়েমানুষ পছন্দ না। যাই?

ধনু শেখ চলে যাচ্ছে। শশী মাস্টার তাকিয়ে আছেন। ধনু শেখের পেছনে তিনজন যাচ্ছে। এরা মনে হয় পাহারাদার। একজনের হাতে তালিকাঠের বর্শা। এতক্ষণ আড়ালে ছিল। তিনজনের একজন শশী মাস্টারের পরিচিত। অম্বিকা ভট্টাচার্য। বর্তমান নাম সিরাজুল ইসলাম। সে ধনু শেখের অধীনে চাকরি নিয়েছে হয়তো। তার মাথায় কিস্তি টুপি। অন্ধকারে শাদা কিস্তি টুপি জ্বলজ্বল করছে।

 

জুলেখা সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, আসেন গো। মনে হয় আপনেরে ‘জারে ধরছে (শীতে ধরেছে), কাঁপিতেছেন। এমন শীত তো নাই। আসেন আসেন। পানি দিতেছি, হাত-মুখ ধোন।

শশী মাস্টার স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ইচ্ছে করছে দৌড়ে পালিয়ে যেতে। সেটা সম্ভব হচ্ছে না। পা স্থানু হয়ে আছে। দরজার গোড়ায় পিতলের দু’টা কুপি জুলছে। জুলেখার হাতে কাশেমপুরি পেটমোটা হারিকেন। এই হারিকেন শাদা কেরোসিনে জ্বালাতে হয়। এর আলো হ্যাজাকবাতির মতো উজ্জ্বল। হারিকেনের আলো পড়েছে জুলেখার মুখে। তাকে ইন্দ্রনীর মতো দেখাচ্ছে। পানের রঙে ঠোঁট লাল। চোখে কাজল। কাজলের কারণেই চোখ হয়েছে বিষন্ন। জুলেখা বলল, আপনি যে আসবেন আমি জানতাম।

শশী মাস্টার বললেন, কীভাবে জানতে?

ঘরে আইস বসেন তারপরে বলি।

ঘরে ঢুকব না জুলেখা।

দোয়ার থাইকা চইলা যাবেন?

হ্যাঁ। ঘোরের মধ্যে চলে এসেছিলাম।

ঘোর কি কাটছে?

শশী মাস্টার জবাব দিলেন না। তার ঘোর কাটে নি, বরং বাড়ছে। জুলেখা বলল, আপনে আমার গান শুনতে চাইছিলেন। আইজ গান শুনবেন? বিচ্ছেদের গান। উকিল মুনসির বিচ্ছেদি।

শশী মাষ্টার দাঁড়িয়ে আছেন। এই শীতেও তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। জুলেখা হাত ধরে তাকে ঘরে ঢুকাল।

কী সুন্দর পরিপাটি ঘর! সামান্য আসবাব। কার্তিকের মূর্তির সামনে পাথরের ফুলদানিতে টকটকে লাল রঙের জবাফুল। ফুল এখনো সতেজ। বিছানায় বকুলফুল ছড়ানো। হালকা মিষ্টি স্বাণ আসছে।

তুমি জানতে যে আমি কোনো একদিন আসব?

হুঁ।

কীভাবে জানতে?

আপনের চোখে লেখা ছিল। আমি চোখের লেখা পড়তে পারি।

এখন আমার চোখে কী লেখা?

এখন কিছু লেখা নাই?

নিশ্চয়ই লেখা আছে। পড় কী লেখা।

জুলেখা বলল, এখন আপনের চোখে লেখা— আমি বাকি জীবন এই মেয়েটার সঙ্গে থাকব। এরে ছাইড়া যাব না। লেখা ঠিকমতো পড়ছি না?

শশী মাস্টার জবাব না দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। তার প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেয়েছে। মনে হচ্ছে বুক শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে।

জুলেখা, জল খাব।

একটু ঠাণ্ডা হন তারপর খান।

শশী মাস্টার বললেন, আমার ভিন্ন একটা পরিচয় আছে। পরিচয়টা তোমাকে দিতে চাচ্ছি।

কেন?

তোমাকে গোপন কিছু বলতে ইচ্ছা করছে। আমার নাম শশী না। আমার নাম কিরণ গোস্বামী। বিপ্লবী কিরণ গোস্বামী। আমি একজন ইংরেজ সাবজজ এবং দু’জন ইংরেজ কনস্টেবল বোমা মেরে মেরেছি। এখন আমি পলাতক। আমার অনুপস্থিতিতে বিচারে আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছে। ইংরেজ পুলিশ আমাকে ধরতে পারলেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে।

জুলেখা বলল, আপনে ঘামতেছেন। একটু বাতাস করি?

করো। জল খাব।

একগ্লাস শরবত বানায়ে দেই? লেবুর শরবত?

দাও।

জুলেখা শরবতের গ্রাস নিয়ে এসে দেখে, শশী মাস্টার বিছানায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে। বাচ্চাদের মতো হাত-পা কুণ্ডুলি পাকিয়ে আছে। তৃষ্ণা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া ঠিক না। ঘুমুতে যেতে হয় যাবতীয় তৃষ্ণা মোচনের পর। জুলেখা কী করবে বুঝতে পারছে না। সে কি এই মানুষটাকে ডেকে তুলবে?

 

হরিচরণ রাত জেগে শশী মাস্টারের বাবাকে একটি চিঠি লিখছেন—

মহাশয়,
সম্মানপ্রদর্শন পূর্বক নিবেদনমিদং। অধীনের নাম হরিচরণ। আপনার আদরের সন্তান শশী আমার আশ্রয়ে আছে। নিরাপদে আছে। সে আপনাদের সান্নিধ্যের জন্যে অতিব ব্যাকুল। আমি সিদ্ধান্ত নিয়াছি তাহাকে সঙেগ করিয়া আপনার আতিথ্য গ্ৰহণ করিব…

বান্ধবপুর গ্রামের নৌকাঘাটায়

বান্ধবপুর গ্রামের নৌকাঘাটায় চৈত্রমাসের এক সকালে ছইওয়ালা একটা নৌকা ভিড়েছে। নৌকার আরোহী তরুণ এক যুবাপুরুষ। তার চোখে বাহারি চশমা। গাত্রবর্ণ গীের। এই গরমেও তার গায়ে ঘিয়া রঙের চাদর। কালো চামড়ার একটা ব্যাগ তার সঙ্গে। নৌকা ঘাটে ভেড়ার পরও যুবাপুরুষ নৌকা থেকে নামছে না। কাছেই কোথাও গুলির শব্দ হচ্ছে। একটা শব্দ না। অনেক শব্দ।

এই নিস্তরঙ্গ গহীন গ্রামে গোলাগুলির শব্দ হবে কেন? যুবাপুরুষ অবাক হয়ে নৌকার মাঝিকে জিজ্ঞেস করল, শব্দ কিসের গো?

মাঝি বলল, শিমুল ফুলের বিচি ফাটতাছে। এই অঞ্চলে শিমুল গাছ বেশি। মাছহাঁটায় আছে সাতটা শিমুল গাছ।

যুবাপুরুষ ব্যাগ হাতে নৌকার ছাঁইয়ের ভেতর থেকে বের হয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। গাছ থেকে মেঘের ছোট ছোট খণ্ডের মতো শিমুল তুলা বিচি ফেটে বের হচ্ছে, বাতাসে উড়ে উড়ে যাচ্ছে। তার কাছে মনে হলো, সে তার জীবনে এত সুন্দর দৃশ্য দেখে নি।

মাঝি বলল, আপনে যাবেন কই?

শশী মাস্টারের কাছে যাব। শশী মাস্টারকে চেন?

চিনব না কী জন্যে? উনারে কে চিনে না বলেন। পাগলা মাস্টার।

পাগল না-কি?

বিরাট পাগল। চরের বালি দিয়া শরীর ঢাইক্যা শুইয়া থাকে। সারারাইত হাঁটে।

কেন?

ক্যামনে বলব? পাগল মানুষের কাজের কোনো ঠিকানা থাকে না। তয়। লোক ভালো। শিক্ষক ভালো। আমার এক পুলা তার স্কুলে যায়। পুলার নাম তমিজ মিয়া।

বাহ, সুন্দর নাম।

আপনার নাম কী? আমার নাম মফিজ।

মোহাম্মদ মফিজ।

মাঝি অবাক হয়ে বলল, আপনি মুছলমান?

নাম শুনে কী মনে হয়?

আমি ভাবছিলাম আপনে হেন্দু। আপনের চেহারার মধ্যে হেন্দু আছে।

আমার গালে দাড়ি দেখছি না?

অনেক হেন্দুর মুখেও দাড়ি আছে। শশী মাস্টারের গালেও দাড়ি।

শশী মাস্টারের কাছে যাব কীভাবে বলে দাও।

বাজারের রাস্তা বরাবর যাবেন। শেষ মাথায় দেখবেন ডাইনে এক রাস্তা। বঁয়ে আরেকটা। ডাইনের রাস্তায় যাবেন। জুম্মাঘর পাইবেন। জুম্মাঘরে মাওলানা ইদরিস সাহেবরে পাইবেন, সে পথ বাতলায়া দিবে। পাগলা মাস্টার নদীর ধারে ঘর বানায়া একলা থাকে। হরিবাবুর বাড়ি পুরা খালি। সেখানে থাকবে না। তার নাকি ‘জল’ না দেখলে ঘুম আসে না।

মোহাম্মদ মফিজ নৌকা থেকে নামল। শিমুল গাছের নিচ থেকে কিছু তুলা কুড়ালো, তারপর হাঁটতে শুরু করল। আজ হাটবার না থাকায় দোকানপাট বেশিরভাগই বন্ধ। যুবাপুরুষকে কেউ লক্ষ করল না।

এই রূপবান যুবাপুরুষের আসল নাম জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়। বাড়ি ঢাকা জেলার পাত্রসারে। পিতা জানকিনাথ। ১৯০৭ সনে ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রথম গ্রেপ্তার হন। প্রমাণাভাবে ছাড়া পান। আলীপুর বোমা মামলার পর বাঘা যতীনের সংস্পর্শে আসেন। এখন তিনি পলাতক। পুলিশ ভয়ানক সন্ত্রাসী হিসেবে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার মাথার দাম পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণা করেছে। জীবনলাল এসেছেন। আত্মগোপন করতে।

 

মাওলানা ইদরিস মসজিদের সামনে কাঠের টুলে বসে আছেন। তার চোখেমুখে মুগ্ধতা। মুগ্ধতার কারণ মসজিদের টিউব কল। হরিচরণ এই টিউবওয়েল করে দিয়ে জায়গাটা বাঁধিয়ে দিয়েছেন। লোকজন পাত্র নিয়ে পানি নিতে আসে, তাঁর দেখতে খুব ভালো লাগে। আল্লাহর অসীম রহমতে পানি বের হয়েছে অতি স্বাদু। যে একবার এই পানি খাবে, তার স্বাদ মনে থাকবে। তাঁর মনে একটাই কষ্ট – হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ পানি নিতে আসছে না। পানির তো আর হিন্দু মুসলমান নেই। মসজিদের টিউব কলের পানি যে-কেউ খেতে পারে। হিন্দুরা খায় না। ন্যায়রত্ন রামনিধি ঘোষণা দিয়েছেন, যে এই জল পান করবে সে মহাপাতকি হবে।

আসসালামু আলায়কুম!

মাওলানা ঘাড় ঘুরিয়ে অচেনা আগন্তুককে দেখলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ওয়ালাইকুম সালাম। জনাব, আপনার পরিচয়?

আমার নাম মোহাম্মদ মফিজ। আমি বাবু হরিচরণের স্কুলের নতুন শিক্ষক।

মাওলানার মন আনন্দে পূর্ণ হলো। আশেপাশের অঞ্চলের কোনো স্কুলেই মুসলমান শিক্ষক নেই। এই প্রথম একজন পাওয়া গেল। মাওলানা এগিয়ে গেলেন। হাত মেলালেন।

শশী মাস্টারের বাড়িতে যাব। কোনদিকে যাব যদি বলে দেন।

মাওলানা বললেন, আমি নিজে আপনাকে নিয়ে যাব। প্রথম এই অঞ্চলে এসেছেন, জুম্মাঘরের সীমানায় পা দিয়েছেন, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন, তারপর চলেন। আপনাকে নিয়ে যাই। আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?

জব্বলপুর।

শুনে খুশি হলাম। আপনি কোন মাজহাবের?

আমি হানাফি। ইমাম আবু হানিফার মাজহাব।

আলহামদুলিল্লাহ। আমি নিজে হানাফি মাজহাবের। একটা কথা বলব, যদি কিছু মনে না নেন।

অবশ্যই বলবেন।

আপনি অল্পবয়সে সুন্নতি দাড়ি রেখেছেন দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু ভাই সাহেব, দাড়ির সঙ্গে গোঁফ রাখা ঠিক না। আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হেস সালাম গোঁফ রাখতেন না। দাড়িগোঁফ একসঙ্গে রাখা সুন্নতের বরখেলাফ। কোনো খাদ্যদ্রব্যের সাথে যদি গোঁফের স্পর্শ হয় সেই খাদ্যদ্রব্য নাপাক হয়ে যায়।

আগুন্তুক বলল, আমার মায়ের কারণে গোঁফ রাখতে হয়েছে। মা বলেন গোঁফ ছাড়া দাড়িতে আমাকে না-কি খুবই খারাপ দেখায়।

তাহলে ঠিক আছে। মায়ের মনে কষ্ট দেয়া কোনোক্রমেই ঠিক না। নবিজির হাদিস আছে- ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ আপনার কি অজু আছে? না-কি অজু করবেন?

অজু করব।

আসেন অজু করেন। আমি কল চাপব। এই কল নতুন বসানো হয়েছে। অতি সুমিষ্ট পানি। এক চুমুক খেলে দিল ঠাণ্ড হয়।

মাওলানা তাকিয়ে আছেন। আগন্তুক অজু ঠিকমতো করতে পারছে কি-না এটাই তাঁর দেখার বিষয়। বেশিরভাগ মানুষ অজু ঠিকমতো করতে পারে না। হাতে ধরে অজু শেখাতে হয়। অজুর দোয়া শেখাতে হয়।

আপনি কি অজুর নিয়ত জানেন?

আরবিতে জানি না। নিয়ত বাংলায় পড়ি।

বাংলায় পড়লেও হবে। সোয়াব সামান্য কম হবে। আমি আপনাকে আরবি নিয়ত শিখায়া দিব।

আগুন্তুক বললেন, শুকরিয়া।

আগন্তুক সুষ্ঠুমতে অজু করল। মাওলানা আনন্দ পেলেন।

 

মোহাম্মদ মফিজ শশী মাস্টারের বাড়ি দেখে বলল, বাহ্।

শশী বলল, বাহ মানে কী? আনন্দের বাহ না অবজ্ঞার বাহ?

মফিজ বলল, বিস্ময়ের বাহ। তোর বাড়িঘর দেখে মনে হচ্ছে ইংরেজ থাকুক। ইংরেজের মতো। আমরা এইখানে জীবন পার করে দেই। মৎস্য মারিব খাইব সুখে।

শশী মাস্টার বলল, এক্কেবারে আমার মনের কথা।

মফিজ বলল, এটা কি তোর মাছ মারার জায়গা?

হুঁ। সুন্দর কি না বল?

‘বাহ্’। টাইপ সুন্দর।

মাছ ধরার জায়গাটা বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া। হিজল গাছের বড় দুটা ডাল মাধাইখালের উপর দিয়ে কিছুদূর যাবার পর উপরের দিকে উঠেছে। ডাল দুটার উপর পাটাতন বিছিয়ে মাছ ধরার জায়গা করা হয়েছে। রোদ যেন মাথায় না। লাগে সেই ব্যবস্থাও আছে।

শশী মাস্টার বলল, নিজের হাতে মাছ ধরি, রান্না করি।

মফিজ বলল, কাজকর্ম না থাকলে তুই না-কি চরের বালি মেখে শুয়ে থাকিস?

হুঁ। বালু চিকিৎসা।

এতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। আমাদের উচিত লো প্রোফাইলে থাকা, দৃষ্টি আকর্ষণ করা না।

শশী মাস্টার বলল, আমি একমত হলাম না। হাই প্রোফাইলের মানুষ সবসময় চোখের সামনে থাকে বলে তাদের নিয়ে মাথা ঘামায় না। কৌতূহল তৈরি হয় লো প্রোফাইলের মানুষের দিকে।

মফিজ বলল, বিনোদের ফাঁসি হয়েছে, খবর পেয়েছিস?

হুঁ।

ফাঁসির সময় হঠাৎ না-কি খুব ভড়কে গিয়েছিল। চিৎকার চেচামেচি শুরু করেছিল। কিছুতেই ফাঁসিতে ঝুলিবে না। টেনে হিঁচড়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

শশী মাস্টার বলল, গাধা।

গাধা তো বটেই। এতে অন্য বিপ্লবীদের মন দুর্বল হয়। ভালো কথা, আমার থাকার জায়গা কি তোর এখানে?

না। আমি সাত্ত্বিক ব্ৰাহ্মণ। তোর মতো যবনকে নিজের বাড়িতে স্থান করে দেব কেন! তুই থাকিবি ঋষি হরির বাড়িতে।

ঋষি হরিটা কে?

যার স্কুলের আমি শিক্ষক তাঁর নাম হরিচরণ। লোকে তাঁকে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন সাধুপুরুষ হিসেবে জানে। যদিও তিনি জাতিচ্যুত। ধর্মচুত। ভালো কথা, তুই থাকিবি কতদিন?

জানি না কতদিন। তবে তোকে চলে যেতে হবে। তোর ডাক এসেছে। নতুন মিশন।

কবে যেতে হবে?

শিগগিরই যেতে হবে। তুই যাবি চট্টগ্রামে। মাস্টারদার সঙ্গে যোগ দিবি।

গুড। গেটআপ ভালো নিয়েছিস। দেখেই মনে হচ্ছে, অতি ধর্মপ্ৰাণ মাওলানা। নামাজের নিয়মকানুন জানিস?

অবশ্যই।

শশী মাস্টারের বর্শিতে মাছ ধরা পড়েছে। সে বর্শি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাছের ঝাঁপাঝাপিতে মনে হচ্ছিল বিশাল কোনো মাছ। দেখা গেল বিশাল কিছু না, মাঝারি আকৃতির আড় মাছ।

শশী মাস্টার বলল, আমার মায়ের কোনো খবর রাখিস?

না। প্ৰাণ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

তোর বাবা মা’র খবর কী?

জানি না। তোর গানাবাজনা কি চলছে?

হুঁ।

তোর জন্যে দুটা রেকর্ড এনেছি। কানা কেস্টর কীর্তন। এখনই বের করে দেব, না পরে নিবি?

এখন দে। সেলিব্রেট করি।

সেলিব্রেশনটা কিসের?

দুই বন্ধুর মিলন।

কলের গানে গান বাজছে। দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে আছে।

তনু যৌবনে তপন তাটিনি
খেলে। কৃষ্ণ দ্বজ যায়…
যমুনায়, যমুনায়।…

শশী মাস্টার গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে বলল, ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে আমি প্রথম কাজ কী করব জানিস? বিবাহ করব।

অতি উচ্চশ্রেণীর কোনো চিন্তা বলে তো মনে হচ্ছে না।

এটা যে কত বড় উচ্চশ্রেণীর চিন্তা বিবাহের পর বুঝতে পারবি। পতিত কন্যা বিবাহ করব।

ডোম কন্যা? আছুৎ?

শশী মাস্টার জবাব না দিয়ে দ্বিতীয় রেকর্ডটি কলের গানে রাখল।

 

মোহাম্মদ মফিজের স্থান হলো হরিচরণের বাড়িতে।

শশী মাস্টার ব্যবস্থা করে দিলেন। শশী মাস্টার বললেন, মোহাম্মদ মফিজ আমার পরিচিত। জব্বলপুরের মানুষ। শহরের নোংরা আবহাওয়ায় শরীর খারাপ করেছে বলে কিছুদিন গ্রামে থাকবেন। আমি বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাব। আমার অনুপস্থিতিতে উনি ছাত্র পড়াবেন।

হরিচরণ বললেন, কোনো অসুবিধা নাই। যতদিন ইচ্ছা থাকবেন। আমার বাড়ি তো খালি পড়ে আছে।

অতিথিকে হরিচরণের পছন্দ হলো। নির্বিরোধী ভালো মানুষ। পড়াশোনায় খুবই আগ্ৰহ। বেশিরভাগ সময় বই নিয়ে আছেন। বই পড়ার স্থানও বিচিত্র। কখনো পুকুরঘাটে, কখনো শতরঞ্চি পেতে শিউলিতলায়, আবার কখনো বা বই হাতে হাঁটতে হাঁটতে পড়া। হরিচরণের সঙ্গে অতিথির কথাবার্তা হয় না বললেই চলে। মানুষটা স্বল্পবাক।

টুকটাক কথা যা হয় খাবার সময় হয়। একদিন মফিজ বললেন, শুনেছিলাম আপনার দুটা হাতি আছে। হাতি কই?

হরিচরণ বললেন, পুরুষ হাতিটা বিক্রি করে দিয়েছিলাম। দুটা হাতি বাহুল্য ভেবেছি। মেয়ে হাতিটা আসামের জঙ্গলে পাঠিয়েছি। পুরুষ সঙ্গী খুঁজে বের করবে। কিছুদিন তার সাথে থাকবে, তারপর গর্ভবতী হয়ে ফিরে আসবে।

মফিজ বললেন, এও কি সম্ভব!

হরিচরণ বলল, সম্ভব কি-না জানি না। একটা পরীক্ষা বলতে পারেন। হাতির অন্তরে মায়াভোব প্রবল। সে গৃহকতাঁর কাছে ফিরে আসে। গৌরীপুরের মহারাজার একটা মাদী হাতি পালিয়ে আসামের জঙ্গলে চলে গিয়েছিল। গৰ্ভবতী। হয়ে সে মহারাজার কাছে ফিরে আসে। হাতি জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসার বুদ্ধি সেখান থেকে পাওয়া।

আপনার এই জংলি বাগান অতি মনোহর। কত ধরনের গাছ আপনার আছে জানেন?

না।

আমি গাছের একটা পূর্ণ তালিকা তৈরি করছি। আপনার এখানে কিছু দুর্লভ গাছ আছে। কপূর গাছ যে আছে আপনি জানেন?

না। আমার বাবার গাছের শখ ছিল, তিনি নানান জায়গা থেকে গাছ এনে লাগিয়েছিলেন। আমার গাছের শখ নাই।

আপনার কিসের শখ?

আমার কোনোকিছুর শখ নাই। তবে আপনার গাছের প্রতি আগ্রহ দেখে ভালো লাগল।

আমাদের নবিজির গাছপালার প্রতি প্ৰবল আগ্রহ ছিল। একটা হাদিসে আছে তিনি বলেছেন– ‘তুমি যদি জানো পরের দিন রোজ কেয়ামত, তারপরেও একটা গাছ রোপণ করো।’

হরিচরণ মুগ্ধ গলায় বললেন, বাহ সুন্দর কথা তো!

মফিজ বললেন, নবিজির অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আছে। আপনি আগ্রহী হলে আমি আপনাকে বলব।

হরিচরণ বললেন, আরেকটা বলুন।

মফিজ বললেন, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আরবের অন্ধকার যুগে কন্যা শিশুদের নানাভাবে নির্যাতন করা হতো। অনেককে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। নবিজি। সারাজীবন চেষ্টা করেছেন শিশুকন্যাদের মঙ্গল করতে। তার একটা হাদিস আছে, তিনি বলেছেন— ‘যারা শিশুকন্যাদের জন্যে কোনো উপহার নিয়ে আসে, তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে খাদ্যসামগ্ৰী আনার মতো পুণ্যের কাজ করে।’

হরিচরণ বললেন, আপনার তো ধর্ম বিষয়ে অনেক জানাশোনা, কিন্তু আপনাকে ধর্মকর্ম করতে দেখি না। মুসলমানদের দৈনিক পাঁচবেলা নামাজ পড়ার বিধান আছে বলে শুনেছি।

ঠিকই শুনেছেন। আমি সেরকম ধাৰ্মিক মানুষ না। আমি শুধু জুম্মাবারে মসজিদে যাই। এখন আপনি যদি বিব্রত না হন, তাহলে আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?

করুন।

আপনি ধর্মচ্যুত হয়েছেন বলে শুনেছি। আপনি আমাদের পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্ৰহণ করছেন না কেন?

হরিচরণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সমাজ আমাকে ধর্মচ্যুত করেছে। আমি তো নিজেকে করি নাই।

ব্ৰাহ্মধর্ম গ্ৰহণ করতে পারেন। অনেক বিশিষ্টজন ব্ৰাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাদের মধ্যে একজন।

ব্ৰাহ্মধর্ম বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

আপনি অনুমতি দিলে এই বিষয়েও আপনাকে কিছু বলব।

ব্ৰাহ্মধর্মের বিষয়ে আমি জানতে চাই।

আমি যা জানি আপনাকে বলব। এই ধর্মের প্রচলন করেন রাজা রামমোহন রায়। ইসলামধর্ম এবং খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে উনার প্রচুর জ্ঞান ছিল। এই ধর্মে প্রভাবিত হয়ে তিনি ব্ৰাহ্মধর্ম শুরু করেন। এই ধর্মের মূল বিষয় একেশ্বরবাদ। ব্ৰাহ্মরা মূর্তিপূজার ঘোরবিরোধী। আপনি জনহিতকর কাজ করতে চান এমন শুনেছি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে সাহায্য করবেন?

হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, তার সাহায্যের প্রয়োজন কী?

তিনি বিশ্বভারতী নামের ইউনিভার্সিটি শুরু করেছেন। তাঁর প্রচুর অর্থ প্রয়োজন।

আমার মতো অভাজনের অর্থ কি তিনি গ্রহণ করবেন?

অবশ্যই করবেন। আমি কি আপনার হয়ে অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থা করব?

করলে ভালো হয়।

হরিচরণ আনন্দিত। এই তরুণের বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বিস্মিত।

বান্ধবপুরের আরো একজনকে মফিজ বিস্মিত করল। তার নাম ইদরিস। মসজিদের ইমাম। জুম্মার দিনে, নামাজের পরে দু’জন বসে থাকেন। ধর্মের নানান খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। মফিজ ধর্ম নিয়ে নবিজিকে নিয়ে নানান কথা বলেন। মাওলানা ইদরিসের বড় ভালো লাগে। নবিজি কখনো তসবি পড়তেন না, হাতের আঙুলে গুনতেন- এই তথ্য মাওলানা ইদরিস জানতেন না। নবিজি ঘাড় পর্যন্ত উঁচু একটা লাঠি সবসময় ব্যবহার করতেন, এই তথ্যও মাওলানা ইদরিসের অজানা। তিনি জানতেন নবি হযরত মুসা। আলায়হেস সালামই শুধু লাঠি ব্যবহার করতেন— যে লাঠি মাটিতে ফেললে সাপ হয়ে যেত।

জুম্মাবারে নামাজ পড়ার কারণে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় সবার সঙ্গেই মোহাম্মদ মফিজের সখ্য হলো। সবচে’ বেশি হলো ধনু শেখের সঙ্গে। ধনু শেখের বাড়িতে যে-কোনো উৎসবে মোহাম্মদ মফিজের ডাক পড়ে। ছেলের খৎনা, মেয়ের জন্ম উপলক্ষে আকিকা, অন্য কেউ থাকুক না-থাকুক মোহাম্মদ মফিজ আছে। খাওয়া-দাওয়ার শেষে খাসকামরায় গল্পগুজব।

ধনু শেখ পান চাবাতে চাবাতে হুক্কার নল টানতে টানতে দরাজ গলায় বলে, মফিজ ভাই! আমি যে দিলখোলা লোক এইটা বুঝেন তো? পূর্ব-পশ্চিম-উত্তরদক্ষিণ সবদিক আমার খোলা।

মফিজ বলেন, শুধু চারদিক কেন? বাকি ছয়দিকও আপনার খোলা।

বাকি ছয়দিক কী? ঈশান, নৈঋত, বায়ু, অগ্নি, উর্ধ্ব, অধ।

বাহবা। আপনার তো জ্ঞানের সীমা নাই। আমি মূর্থি, মহামুর্থ। তবে এমন মুর্থ যার ধন আছে।

শুধু ধন না, বুদ্ধিও আছে। বুদ্ধি বিনা ধন আসে না।

মারহাবা। ভালো বলেছেন। এইজন্যেই আপনাকে পিয়ার করি। আমার বুদ্ধি কেমন সেই বিষয়ে একটা গল্প শুনবেন?

শুনব।

ধনু শেখ গলা নামিয়ে বলল, আপনাকে অতি আপনা লোক ভেবে বলতেছি। আর কাউরে এই ঘটনা বলা যাবে না। যৌবন বয়সে এই বুদ্ধি মাথায় আসল। কোনো হিন্দুমেয়েকে যদি কোনোরকমে পাট খেতে ঢুকায়ে ফেলা যায়, তার সঙ্গে কুকর্ম করা যায়, সে এই কথা প্রকাশ করবে না। প্রকাশ করলে তার জাত যাবে। তার গুষ্ঠির জাত যাবে। কাজেই কুকর্মের কথা কেউ জানবে না।

মফিজ বললেন, বুদ্ধিমতো কাজ করেছেন?

কয়েকবার করেছি। যা ভেবেছিলাম। তাই হয়েছে। কেউ মুখ ফুটে কিছু বলে নাই। হিন্দুর কাছে জাত বিরাট জিনিস। ঠিক না?

হুঁ।

বুঝেছি। কাজটা অন্যায়। দুষ্ট বয়সে কিছু অন্যায় সবাই করে। আমিও করেছি। পাপ হয়েছে মানি। সেই পাপ কাটান দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি।

কী ব্যবস্থা?

এই অঞ্চলে মাদ্রাসা দিব। মাদ্রাসায় তালেবুল এলেমরা আল্লাখোদার নাম নেবে। তারা যে সোয়াব কামাবে তার একটা অংশ আমি পাব। ভালো বুদ্ধি না?

হুঁ।

আরো ব্যবস্থা রেখেছি। প্রতি ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে আমি তওবা করি। এতে আগের সব পাপ কাটা যায়। নিম্পাপ অবস্থা শুরু হয়। বুদ্ধি ঠিক আছে না?

যিনি পাপ পুণ্য দেন। তিনি কি আর আপনার কূটবুদ্ধি বুঝবেন না?

তাও ঠিক। তারপরেও চেষ্টা চালায়ে যাব। কোনো এক ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যাব। কানি জাল ফেলার পরে জাল যখন টানা হয়, তখন দেখা যায় কিছু মাছ ফাক দিয়ে আরামসে বের হয়। হয় না?

হয়।

মাদ্রাসার ব্যাপারে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। টাইটেল পাশ মাওলানা রাখব। ছাগলা ইদরিসকে দিয়ে কাজ হবে না।

ইদরিস মাওলানা মানুষ হিসেবে প্রথম শ্রেণীর।

ইদরিস মানুষ খারাপ। এইটা আমি বলব না, তবে তার প্রধান দোষ–মালাউনরে তোয়াজ করা। মালাউনরে তোয়াজের কী আছে?

মফিজ বললেন, হিন্দুদের প্রতি আপনার এই প্রবল বিদ্বেষের কারণ কী?

কারণ একটাই— এরা মুসলমানদের মানুষই মনে করে না। মনে করে আমরা কুকুরের অধম। ছোটবেলায় এক মিষ্টির দোকানে ভুলে ঢুকে পড়েছিলাম। ময়রা কী করল শুনেন। দোকানের সব মিষ্টি নিয়ে পুকুরে ফেলল। আমারে মারতে মারতে মিষ্টির উপরে ফেলল। কেউ কিছুই বলল না। মুসলমানরাও না। আফসোস কি-না বলেন?

অবশ্যই আফসোস।

বদগুলা স্বরাজ স্বরাজ করতেছে। স্বরাজ আসুক, পিটায়া লাশ বানাব। ইংরাজ পুলিশের ভয়ে এখন কিছু করতে পারতেছি না। হিসাব মতো হিন্দুস্থানের মালিক আমরা। দিল্লির সিংহাসন ছিল আমাদের। যদি স্বরাজ হয়, হিন্দুস্থানের নাম বদলায়া করব।– মুসলমান স্থান।

 

সপ্তাহে একদিন হরিচরণের কাছে ‘কলিকাতা গেজেট’ নামের পত্রিকাটি আসে। মফিজ পত্রিকাটি অতি আগ্রহের সঙ্গে পড়েন। বিপ্লবীরা কোথায় কী করছে সব খবর পাওয়া যায়। পুলিশের কর্মকাণ্ডের খবরও থাকে।

ব্রিটিশ সিংহ কিছুটা নরম হয়েছে এটা বোঝা যাচ্ছে। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের ভারতবাসীর সমর্থন দরকার। তাদের ভাবভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে, তারা যুদ্ধে জিতলে কিছুটা ছাড় দেবে। অনেকেই ব্রিটিশদের কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম তখন শিয়ারশোল রাজ

যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে নিজেকে সরাসরি যুক্ত করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বঙ্গদেশের মুসলমানদের জন্যে শুভ হয়েছিল। মুসলমানদের বড় অংশ চাষী শ্রেণীর। পাট তাদের প্রধান কৃষিপণ্য। যুদ্ধের কারণে পাটের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। পাঁচ টাকা মণ থেকে সত্তর টাকা মণে পৌঁছে যায়।

হতদরিদ্র চাষী মুসলমান শ্রেণীর হাতে প্রথম কিছু কাঁচা টাকা চলে আসে। বেশিরভাগই সেই কাঁচা টাকা ব্যয় করে ফুর্তির পেছনে। রঙিলা বাড়ি ঝলমল করতে থাকে। ঘাটু গান এবং যাত্ৰা গানের জোয়ার শুরু হয়।

চাষী মুসলমান শ্রেণীর একটা ক্ষুদ্র অংশ কাঁচা টাকা ব্যয় করেন সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে। বেশকিছু মুসলমান ছাত্র প্রথমবারের মতো স্কুলে ভর্তি হলো। কোলকাতায় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়েল গার্লস স্কুলযার যাত্রা শুরু হয়েছিল এগারোজন ছাত্রী নিয়ে তার ছাত্রী সংখ্যা বেড়ে হলো সত্তর। বেশিরভাগই মুসলমান ছাত্রী।

 

হরিচরণ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছেন। মোটা হলুদ কাগজে টানা লেখা। শেষে নামসই করা— শ্ৰী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চিঠিতে লেখা—

শ্ৰী হরিচরণ সাহা, প্রীতিভাজনেষু,

বিনয় সম্ভাষণপূর্বক নিবেদন— আপনার প্রেরিত অর্থ পাইয়াছি। এই অর্থ গ্রীষ্মের তাপদাহে শীতল জলধারার মতো বোধ হইয়াছে। আপনার কল্যাণ হোক।

ইতি
শ্ৰী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শান্তিনিকেতন।

হরিচরণ এই চিঠি। দীর্ঘসময় কপালে ছুইয়ে রাখলেন। তারপরেও মনে হলো চিঠির যথাযোগ্য সম্মান করা হলো না।

চিঠি তাকে মহাবিব্রত করল। সেই চিঠি পত্ৰবাহক মারফত হাতে হাতে পাঠিয়েছেন মনিশংকর দেওয়ান। সেই চিঠিতে লেখা–

আমি মহাবিপদে পড়িয়া আপনার শরণাপন্ন হইলাম। একমাত্র পুত্র শিবশংকর দুরারোগ্য রোগে মৃত্যুপথযাত্রী। ডাক্তার-কবিরাজ কেহই রোগের কারণ বা প্ৰতিকারের পথ দিতে পরিতেছে না। আমি সাহেব ডাক্তার দেখাইয়াছি। ইউনানী চিকিৎসাও করিয়াছি। আমার পুত্রের যন্ত্রণা সীমাহীন। পিতা হিসেবে এই যন্ত্রণা দেখা আমার পক্ষে অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছে। লোকমুখে শুনতে পাই আপনি ঈশ্বরের আশীর্বাদে রোগহরণ করিতে পারেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে আপনার দ্বারস্থ হইলাম। আমি পুত্রকে নিয়া যেকোনো সময় বান্ধবপুরে উপস্থিত হইব। আপনি যথাসাধ্য করিবেন। ইহাই আমার প্রার্থনা। যাত্রার শুভদিন নির্ণয়ের জন্যে পঞ্জিকা দেখিতেছি। বুধবার বারবেলা শুভদিন পড়িয়াছে। ঐ দিন রওনা হইবার সম্ভাবনা আছে। বুধবার রওনা হইলে শুক্রবার নাগাদ পৌছিবার কথা। বাকি ঈশ্বরের ইচ্ছা।

মাস্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসি

মনিশংকর তাঁর পুত্ৰকে বান্ধবপুরে নিয়ে এসেছেন। তাঁর দোতলা বাড়ির বারান্দায় খাটের উপর পাটি পেতে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ছেলের পায়ের কাছে মনিশংকর মাথা নিচু করে বসে আছেন। ছেলের যন্ত্রণা তিনি সহ্য করতে পারছেন না, আবার উঠে চলেও যেতে পারছেন না। ছেলের মা ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন। সেখানে পূজা চলছে। পূজার জন্যে দু’জন ব্রাহ্মণ এসেছেন কোলকাতা থেকে।

উঠানে নাম সংকীর্তন হচ্ছে। অনেক লোকজন ভিড় করেছে। দুর্গাপূজার মতো জমজমাট অবস্থা। গভীর বিষাদেও এক ধরনের উৎসবের ছোয়া থাকে।

শিবশংকরের বয়স মাত্র নয়। তীব্র ব্যথা সে নিতে পারছে না। ব্যথার একেকটা ধাক্কা আসে, ছেলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে— বাবা, ব্যথা কমায়া দাও। বাবা, ব্যথা কমায়া দাও। অসহায় বাবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।

খবর পেয়ে হরিচরণ এসেছেন। তাঁকে দেখে মনিশংকর ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, আমাকে বিষ। এনে দেন। আমি বিষ খেয়ে মরে যাই। ছেলের যন্ত্রণা নিতে পারছি না।

হরিচরণ খাটের পাশে এসে দাঁড়ালেন। শিবশংকর বলল, হরিকাকু, ব্যথা! दgशों!

হরিচরণ বললেন, বাবা, কোথায় ব্যথা?

শিবশংকর তার পেটের দিকে ইশারা করল। হরিচরণ হাঁটু গেড়ে ছেলের পাশে বসলেন। তার পেটে হাত রেখে চোখ বন্ধ করলেন। মনে মনে ডাকলেন, হে পরম পিতা। হে দয়াময়। তোমার সৃষ্ট এই ক্ষুদ্রপ্রাণের প্রতি তুমি দয়া কর। হরিচরণ অতি দ্রুত প্রার্থনার গভীরে পৌঁছে গেলেন। তিনি কোথায় আছেন, কী করছেন কিছুই তাঁর মনে রইল না। তাঁর শুধুই মনে হলো, তিনি কোনো এক অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন। গৃহ মন্দিরের পূজার ঘন্টার শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসছে। লোকজনের চলাচল, কথাবাতাঁর কোনো শব্দই তার কানে আসছে না। তিনি গভীর বিশ্বাস থেকে বলে যাচ্ছেন- দয়া কর দয়াময়। দয়া করা। দয়া কর। হরিচরণের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। একসময় হঠাৎ তার কাছে মনে হলো, তিনি সাঁতরাতে শুরু করেছেন। কুল কিনারা নেই এমন কোনো দিঘি। যার জল স্বচ্ছ ও শীতল। একটি শিশু ড়ুবে যাচ্ছে। তাকে ধরতে হবে। এই তাকে আবছা দেখা যাচ্ছে, এই দেখা যাচ্ছে না। অনেক দিন আগে এরকম ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর শরীর অবসন্ন। তিনি দম পাচ্ছেন না। জলের শীতলতায় তাঁর শরীর জমে যাচ্ছে। তিনি হাত-পা নাড়তে পারছেন না।

উঠান থেকে অনেকটা দূরে বাবলা গাছের নিচে শশী মাস্টার এবং মফিজ দাড়িয়ে। দু’জনের দৃষ্টি হরিচরণের দিকে। দোতলার রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে হরিচরণের মুখ দেখা যাচ্ছে। হরিচরণ সামান্য দুলছেন। শশী মাস্টার বললেন, দৃশ্যটার মধ্যে অলৌকিক কিছু আছে। যদিও আমি জানি অলৌকিকত্ব বলে কিছু নেই। প্রার্থনায় কিছু হয় না। প্রার্থনায় কিছু হলে পৃথিবীর মানুষ সব ফেলে প্রার্থনাই করে যেত।

মফিজ বললেন, প্রার্থনায় কিছু হয় না, তারপরেও আমরা কিন্তু প্রতিনিয়তই প্রার্থনা করি।

শশী মাস্টার বললেন, হরিবাবুর এই প্রার্থনা কতক্ষণ চলবে বলে তোর মনে হয়?

মফিজ বললেন, বুঝতে পারছি না। আমার ধারণা উনি Trance State-এ চলে গেছেন। Trance ভাঙতে সময় লাগবে।

শশী মাস্টার বললেন, যতক্ষণই লাগুক আমি অপেক্ষা করব।

হরিচরণ এসেছিলেন দুপুরের আগে আগে- সন্ধ্যা হয়ে গেল। মনিশংকরের বাড়িতে সন্ধ্যা প্ৰদীপ জ্বালানো হলো। পূজার ঘণ্টা এবং শাখ বাজতে লাগল। হরিচরণ ছেলের গা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। শিবশংকর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা জল খাব।

মনিশংকর কাসার গ্লাসে করে পানি নিয়ে এলেন। চামচ, আনলেন, চামচে করে খাওয়ানোর জন্যে। শিবশংকর বলল, বাবা আমাকে উঠারে বসাও, আমি হাত দিয়ে গ্রাস ধরে চুমুক দিয়ে জল খাব। আমার ব্যথা নাই।

মনিশংকর হতভম্ব গলায় বললেন, ব্যথা নাই? সত্যি ব্যথা নাই?

ছেলে না-সূচক মাথা নাড়ল।

মনিশংকর এই আনন্দ নিতে পারলেন না, অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন। [মনিশংকরের পুত্র শিবশংকর পরিণত বয়সে যক্ষায় মারা যান। প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার এবং পরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংলার।]

 

হরিচরণ বারান্দার বেতের চেয়ারে শুয়ে আছেন। তিনি ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। তার চোখ বন্ধ। তিনি বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলছেন। কিছুক্ষণ আগেও তীব্র মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল, এখন নেই। রাত অনেক হয়েছে। দ্বিতীয় প্রহরের শেয়াল ডাকাডাকি শুরু করেছে। হরিচরণের সামনে কাঠের চেয়ারে কাসার জগভর্তি পানি এবং গ্লাস। তিনি কিছুক্ষণ পরপরই পানির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন। তাঁর পেছনে শশী মাস্টার বসে আছেন। মফিজ আছেন মনিশংকরের বাড়িতে।

শশী মাস্টার বললেন, এখন কি একটু ভালো বোধ করছেন? হরিচরণ বললেন, না।

মাথার যন্ত্রণা কমে নাই?

মাথার যন্ত্রণা কমেছে, বুকে চাপ ব্যথা।

পালংকে শুয়ে থাকবেন?

না।

শশী মাস্টার বললেন, যদি অনুমতি দেন তাহলে আপনার সঙ্গে রাতটা কাটাই।

হরিচরণ বললেন, আমি বারান্দাতেই বসে থাকব।

শশী মাস্টার বললেন, আমিও থাকব। অলৌকিক কোনো কিছুতে আমার বিশ্বাস নাই, কিন্তু আজকের ঘটনাটা নিতে পারছি না।

হরিচরণ বললেন, আমিও না। তবে প্রবল ঘোরের মধ্যে আমার বিশেষ এক ধরনের উপলব্ধি হয়েছে। হয়তো পুরোটাই ভ্ৰান্তি, মনের ভুল। জগৎ সৃষ্টি রহস্য, পরকাল- এইসব নিয়ে খুব চিন্তা করি বলেই হয়তো দেখেছি।

কী দেখেছেন?

আজ থাক। আরেকদিন বলব।

আচ্ছা।

অভিজ্ঞতা বলে বোঝাতে পারব সেরকমও মনে হচ্ছে না। পুরো ব্যাপারটা অস্পষ্ট।

অস্পষ্ট?

হরিচরণ বললেন, অস্পষ্ট বলাটাও ঠিক না, খুব স্পষ্ট; তবে সেই স্পষ্টতার ধরন ভিন্ন।

কথাটা বুঝতে পারলাম না।

হরিচরণ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। সমস্ত বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডকে আমার কাছে হঠাৎ মাকড়সার জালের মতো মনে হলো। কেউ আলাদা না, সবাই যুক্ত এবং প্রত্যেকেরই প্ৰাণ আছে। ইট, কাঠ, বালুকণাসবই জীবন্ত। আরেকটা উপলব্ধি হয়েছে…

আপনি ক্লান্ত। বিশ্রাম করুন। আরেকদিন শুনব। তবে আজ না বললে আপনি আর কোনোদিন কথা বলতে পারবেন না।

হরিচরণ বললেন, কেন বলতে পারব না?

শশী মাস্টার বললেন, আমি যতদূর অনুমান করছি আপনার অভিজ্ঞতা স্বপ্নের মতো। স্বপ্নের স্মৃতি অতি অল্প সময়ের স্মৃতি। আপনি ভুলে যাবেন।

হরিচরণ গ্লাসে পানি ঢেলে চুমুক দিলেন। চেয়ারে শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। ঘুমের মধ্যে তিনি একটা সুখ স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নের মধ্যেও তিনি একই জায়গায় ঘুমুচ্ছেন, শিউলির মা রাণীবালা এসে তার ঘুম ভাঙালেন। তিনি উঠে বসতে বসতে বললেন, বউ কোনো সমস্যা?

রাণীবালা বললেন, আপনার কন্যার বিবাহ, আর আপনি এখানে শুয়ে আছেন!

শিউলির বিবাহ?

হুঁ। কিছুক্ষণের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান হবে। নিন। গরদের চাদরটা গায়ে দিন।

তিনি অতি ব্যস্ত ভঙ্গিতে চাদর গায়ে দিতেই দৃশ্য বদলে গেল। তিনি দেখলেন বিয়ের আসরে পুরুতের পাশে তিনি দাঁড়িয়ে। তার সামনেই তাঁর বাবা প্রিয়নাথ। হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, বাবা তুমি এসেছ!

প্রিয়নাথ বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি আসব না। কীভাবে ভাবলি? তুই ছোটবেলায় যেরকম গর্ধব ছিলি এখনো তো গর্ধবই আছিস। উন্নতি কিছুই তো হয় নাই।

বাবা, মা কি এসেছে?

তাকে ছাড়া আমি আসব। এটা ভাবলি কীভাবে? সবাইকে নিয়ে এসেছি। কেউ বাদ নাই। শুধু আমার মেজদা আসেন নি।

উনি আসেন নি কেন?

মেজদা সন্ন্যাস নিয়ে কোথায় যে চলে গেল। অনেক সন্ধান করেও খোঁজ পাই নি।

হরিচরণ অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। বাড়ি গমগম করছে। মৃতজীবিত সবাই উপস্থিত। প্রিয়নাথ ধমক দিলেন, হা করে দেখছিস কী? সবাইকে প্ৰণাম কর। কেউ যেন বাদ না থাকে। নারায়ণ। নারায়ণ।

হরিচরণের স্বপ্নভঙ হলো ‘নারায়ণ নারায়ণ’ শব্দে। খাটে শুয়ে আছেন। ঘুমের মধ্যেই কেউ তাঁকে ধরাধরি করে খাটে শুইয়ে দিয়েছে।

 

এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা ইদরিস মনিশংকর বাবুর ছেলের খোঁজ নিতে।{क्लনা।

ছেলে ভালো আছে। আরাম করে ঘুমাচ্ছে। সারাদিন কিছু খায় নি। ঘুমানোর আগে এক বাটি দুধ খেয়েছে। মাওলানা বললেন, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।

মনিশংকর এখনো স্বাভাবিক হতে পারেন নি। কিছুক্ষণ পর পর ছটফট করে উঠেন, এদিক ওদিক তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, আমি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো দিন এক পুণ্য করেছিলাম। সেই মহাপুণ্যটা কী? তোমরা কেউ আমাকে বলবে কী সেই মহাপুণ্য?

মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকেই এসেছেন। তারা উঠোনের এক কোনায় গোল হয়ে বসা। তাদের মধ্যমণি সুলেমান, এক সন্ধ্যায়। সে হরিচরণের বাড়ির দিঘির ঘাটে কী দেখেছিল। সেই গল্প নিচু গলায় বলছে। চোখ বড় বড় করে সবাই শুনছে। শ্রোতাদের মধ্যে কাউকেই শূন্যে ভাসার বিষয়টির অস্বাভাবিকতা স্পর্শ করছে না। মোহাম্মদ মফিজ বললেন, আপনি নিজে দেখেছেন?

সুলেমান বলল, অবশ্যই। আমি যদি মিথ্যা বলি আমার মাথায় যেন ঠান্ডা পড়ে। মাওলানা সাবও তার বিষয়ে একটা জিনিস দেখছেন, তারে জিজ্ঞাস করতে পারেন। মাওলানা, ঘটনাটা বলেন।

মাওলানা আসর ছেড়ে উঠে পড়লেন। তাঁর প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে। বাড়িতে যাবেন, রান্না করবেন তারপর খাওয়া। ইদানীং রাতের খাওয়া তাকে কষ্ট দিচ্ছে। প্রায়ই মনে হচ্ছে, কেউ একজন যদি থাকত যে রান্না করে রাখবে। এবাদত বন্দেগি শেষ করে যাকে নিয়ে তিনি খেতে বসবেন। খেতে খেতে সুখ-দুঃখের কিছু গল্প। সবার ভাগ্যে সব কিছু হয় না। ভাগ্যকে দোষ দেওয়াও ঠিক না, কারণ আল্লাহপাক স্বয়ং বলেছেন, ‘ভাগ্যকে দোষ দিও না, কারণ আমিই ভাগ্য।’

মাওলানা রান্না চড়িয়েছেন। চাল ডালের খিচুড়ি। ঘরে ঝিংগা ছিল, কুচি কুচি করে ঝিংগা দিয়েছেন। খুঁজে পেতে দুটি আলু পাওয়া গেল। আলু দুটি দিয়ে দিলেন। খিচুড়ি নামাবার আগে আগে এক চামচ ঘি দিয়ে দেবেন। ঘিয়ের সুঘ্ৰাণে সমস্ত ত্রুটি ঢাকা পড়ে যাবে।

মাওলানা, বাড়িতে আছেন?

মাওলানা ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন, মোহাম্মদ মফিজ।

আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।

মাওলানা আনন্দিত গলায় বললেন, অবশ্যই অবশ্যই।

কী করছিলেন?

রান্না বসায়েছি জনাব। আসেন রান্নাঘরে চলে আসেন। বাড়িতে কোনো স্ত্রীলোক নাই। পর্দা করার কেউ নাই।

কী রান্না করছেন?

সামান্য খিচুড়ি। দুই ভাই মিলে খেয়ে ফেলব।

দুই ভাইটা কে?

মাওলানা বললেন, আমি আর আপনি। জনাবের নিশ্চয়ই খাওয়া হয় নাই?

জি-না। আপনার সঙ্গে অতি আগ্রহের সঙ্গে খাব।

মাওলানা বললেন, আল্লাপাক আপনার আজ রাতের রিজিক আমার হাঁড়িতে দিয়েছেন। উনার অশেষ মেহেরবানি।

মোহাম্মদ মফিজ বললেন, আপনার মতো খোদাভক্ত মানুষ খুব বেশি আছে বলে আমি মনে করি না। এই ধরনের ভক্তি দেখাতেও আনন্দ।

দু’জন রান্নাঘরে বসেছেন। মাওলানা আরেক মুঠ চাল হাঁড়িতে দিয়ে দিয়েছেন। মাওলানা রান্নার প্রক্রিয়ায়ও একটা পরিবর্তন করেছেন। খিচুড়ি ডালের মতো বাগাড় দেবেন বলে ঠিক করেছেন। সিদ্ধ হয়ে গেলে অন্য একটা হাঁড়িতে ঘি’র সঙ্গে পেঁয়াজ ভোজ বাগাড়। অতিথির কারণে উন্নত ব্যবস্থা।

মাওলানা সাহেব!

জি জনাব?

সুলেমান নামের লোকটা বলছিল, আপনি হরিবাবুর একটা বিশেষ জিনিস आनन, 6না না?

উনি সাধু প্রকৃতির মানুষ। উচ্চশ্রেণীর সাধু। এর বেশি কিছু জানি না।

সুলেমান যে বলল, আপনি বিশেষ কিছু জানেন।

গ্রামের মানুষ অন্যকে সাক্ষী মেনে কথা বলতে পছন্দ করে। তাদের অনেক দোষের মধ্যে এটা বড় দোষ।

আজ যে ঘটনা ঘটল। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মাওলানা বললেন, আল্লাহপাক মনিশংকর বাবুর পুত্রকে দয়া করেছেন। উনি যখন যাকে ইচ্ছা দয়া করেন।

হরিচরণ বাবুর এখানে কোনো ভূমিকা নাই?

আছে। আল্লাহপাক উনার মাধ্যমে দয়া করেছেন। উনার মাধ্যমে দয়া করেছেন বলে উনাকেও দয়া করা হয়েছে। আমাদের ঈসা নবির কথা মনে করেন, উনি অন্ধকে দৃষ্টি দিতেন, কুণ্ঠরোগী ভালো করতেন।

হরিচরণ বাবু নিশ্চয়ই ঈসা নবি না।

অবশ্যই না। আমরা কেউ কারো মতো না। সবাই আলাদা।

মোহাম্মদ মফিজ বললেন, আল্লাহপাকের কাছেও কি প্রতিটি মানুষ আলাদা, না-কি তার কাছে সবাই এক?

মাওলানা ইদরিস। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, অতি জটিল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাব দিবার মতো জ্ঞান আমার নাই। তবে কথাটা আমার মনে থাকবে। যদি কখনো কোনো প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের সন্ধান পাই তাকে জিজ্ঞেস করব। খানা তৈয়ার হয়েছে, আসেন খানা খাই।

খাওয়া শেষ করে মোহাম্মদ মফিজ বললেন, আমি আমার এক জীবনে অনেক ভালো ভালো খাবার খেয়েছি- এত ভালো খাবার খাই নি। যত দিন বেঁচে থাকব আপনার হাতের রান্না মনে থাকবে।

মাওলানা বললেন, সবই আল্লাহপাকের খেলা, তিনি আমাদের মুখে রুচি দিয়েছেন। উনার দরবারে শুকরিয়া। আসেন। দুই ভাই মিলে আল্লাহপাকের দরবারে মোনাজাত করি।

মোহাম্মদ মফিজ বললেন, কিছু মনে করবেন না। এই দোয়াটা আপনি একা করুন। আমি পাশে বসে দেখি।

 

হরিচরণ পারুল গাছের নিচে বসে আছেন। তাঁর শরীর দুর্বল। রোজ রাতে নিয়ম করে জ্বর আসছে। সকালে জ্বর সেরে যায়। কিন্তু তার থাবা রেখে যায়। সারাটা দিন কাটে ক্লান্তিতে এবং রাতে জ্বর আসবে তার প্রতীক্ষ্ণয়।

কড়া রোদ উঠেছে। হরিচরণের গায়ে রোদ চিড়বিড় করছে। একটু সরে বসলেই রোদের হাত থেকে বাচা যায়। সরে বসতেও ইচ্ছা করছে না। হরিচরণের চোখ বন্ধ। তাঁর ঝিমুনির মতো এসেছে। কে যেন তার পায়ে হাত দিল। হরিচরণ চমকে উঠে চোখ খুললেন। কিশোরী এক মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে। শাড়ি পরায় তাকে বড় বড় দেখাচ্ছে। মেয়েটার মুখে অস্বাভাবিক মায়া। হরিচরণ বললেন, এই তুই কে?

আমার নাম যমুনা।

তুই করিরাজ সতীশ বাবুর মেয়ে না?

হুঁ।

এতবড় হয়ে গেলি কবে?

যমুনা খিলখিল করে হাসল। হরিচরণ বললেন, তুই যে আমার পায়ে হাত দিলি তোর তো জাত গেছে।

যমুনা বলল, কেউ দেখে নাই।

হরিচরণ বললেন, তাও ঠিক। জাত যাবার জন্যে কাউকে না কাউকে দেখতে হবে। তুই এত দূরে একা এসেছিস?

যমুনা বলল, আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে আসছি।

বলিস কী! কী জন্যে?

যমুনা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, বলতে লজ্জা করে।

হরিচরণ হাসতে হাসতে বললেন, চোখ বন্ধ করে বল। চোখ বন্ধ করে বললো লজ্জা লাগবে না।

যমুনা চোখ বন্ধ করল না, অন্যদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আপনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীৰ্বাদ করবেন।

কী আশীৰ্বাদ?

আমার যেন বিবাহ হয়।

বিবাহ তো এমনি হবে। এর জন্যে আশীৰ্বাদ লাগবে কেন?

যমুনা জবাব দিল না, গা মোড়ামুড়ি করতে লাগল। লজ্জায় তার গালে লালচে আভা দেখা দিল। হরিচরণ বললেন, বিশেষ কারো সঙ্গে বিবাহ?

হুঁ।

নাম কী? সুরেন। কলিকাতায় থাকে। কলেজে পড়ে।

তোর ধারণা আমি আশীৰ্বাদ করলেই সুরেনের সঙ্গে তোর বিয়ে হবে?

হুঁ।

হরিচরণ হাসতে হাসতে বললেন, কাছে আয়, আশীৰ্বাদ করে দিচ্ছি।

যমুনা তাঁর সামনে মাথা নিচু করল। হরিচরণ উচ্চস্বরে প্রার্থনা করলেন, হে ভগবান! হে পরমপিতা! তোমার এই সন্তানটির অন্তরের গোপন বাসনা তুমি পূর্ণ কর। সুরেনের সঙ্গে তোমার এই সন্তানের শুভবিবাহ যেন হয়। সেই বিবাহ যেন মঙ্গলময় হয়। তুমি তোমার এই অবোধ সন্তানকে দয়া কর।

যমুনা প্রার্থনা শুনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হরিচরণের হঠাৎ মনে হলো যমুনা কাঁদছে না। কাঁদছে। তাঁর কন্যা শিউলি। এই ধরনের ভ্রান্তি আজকাল তার ঘন ঘন হচ্ছে।

 

ন্যায়রত্ন রামনিধি কাশির এক পণ্ডিত নিয়ে এসেছেন। পণ্ডিতের নাম নগেন্দ্ৰনাথ ভট্টাচার্য তর্কালঙ্কার। তারা সরাসরি হরিচরণের বাড়িতে এসেছেন। হরিচরণ অতি সমাদরে তাদেরকে বসিয়েছেন। তাদের আগমনের হেতু বিচিত্র। হরিচরণ পতিত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেয়েছেন। এখন তিনি আর জাতিচ্যুত না। তার বাড়িতে অতি উচ্চবর্ণের ব্ৰাহ্মণরাও জল গ্রহণ করতে পারবেন। বিধান এসেছে। সরাসরি কাশি থেকে।

রামনিধি বললেন, তোমার বাড়িতে ফলাহার করতেও এখন আর আমাদের আপত্তি নাই। এই মীমাংসা করতে অনেক পরিশ্রম হয়েছে। কয়েকবার কাশি যেতে হয়েছে। তুমি ইচ্ছা করলে এই খরচ দিতে পার, না দিলেও ক্ষতি নাই।

হরিচরণ বললেন, এত ঝামেলা করেছেন কী জন্যে? তোমার দিকে তাকিয়ে করেছি। তুমি বিশিষ্টজন। ভালো কথা, উড়া উড়া অনেক কথা তোমার বিষয়ে শুনি। তুমি শরীরে হাত দিলে নাকি রোগ সারে?

হরিচরণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন, কিছু বললেন না। রামনিধি গলা নামিয়ে বললেন, দীর্ঘ দিন শূল বেদনায় কষ্ট পাচ্ছি। দেখ কিছু করতে পার কিনা। তুমি হাত দিলেই কাজ হয়, না-কি মন্ত্র পাঠ করতে হয়? কী মন্ত্র পড়? নগেন বাবুর বাম হাঁটুতেও বিরাট সমস্যা। হাঁটতে পারেন না বললেই হয়। তাঁর বিষয়েও কিছু করা যায় কি-না দেখ।

হরিচরণ বললেন, আমি শরীরে হাত দিলে রোগ সারে না। আমি কোনো অবধূত না। আমি সাধারণ মানুষ। আপনার শরীরে হাত রাখতে আমার কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি ভেবে দেখেন হাত রাখা ঠিক হবে কি-না? আমার এই বাড়িতে একজন মুসলমান শিক্ষক থাকেন। তাঁর নাম মোহাম্মদ মফিজ।

রামনিধি এবং তর্কালঙ্কার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। হরিচরণ বললেন, তারচেয়েও বড় সমস্যা, এক ডোমের মেয়ে আমাকে বাবা ডাকে। সে মাঝে মাঝে এসে ঘরদুয়ার পরিষ্কার করে।

রামনিধি বললেন, সর্বনাশ! আগে বলবা না! তুমি দেখি আমাদের নরকবাসী করার বুদ্ধি করেছি। রাম রাম।

হরিচরণ বললেন, ডোম কন্যাদের সঙ্গে যৌন কর্মে বৰ্ণহিন্দুর সমস্যা নাই। এতে তাদের জাত যায় না, কিন্তু এরা বর্ণহিন্দুর বাড়িতে এসে ঘর ঝাঁট দিলে জাত যায়- এটা কেমন কথা?

তোমার সঙ্গে শাস্ত্ৰ আলোচনার জন্যে আমি আসি নাই। শাস্ত্ৰ বোঝার মতো জ্ঞান বুদ্ধি তোমার হয় নাই। আমরা উঠলাম। আজকাল হাড়ি ডোম মেথর নিয়া আছে আমাদের জানা ছিল না।

দুই শাস্ত্ৰ পণ্ডিত হরিচরণের বাড়ি থেকে বের হয়েই গঙ্গাজলে স্নান করে পবিত্র হলেন। বোতলভর্তি গঙ্গাজল তাদের সঙ্গেই ছিল। এই জলের কয়েক ফোঁটা স্নানের পানিতে মিশিয়ে নিলেই গঙ্গা স্নান হয়।

 

শশী মাস্টার চলে যাবেন, তার ডাক এসেছে। তাকে যেতে হবে চট্টগ্রামে। সূর্যসেন নামের একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। যাকে সবাই চেনেন ‘মাস্টারদা’ নামে। হরিচরণকে বললন, মা’র শরীর ভালো না। উনি আমাকে ক্ষমা করে কাছে ডেকেছেন। হরিচরণ বললেন, অতীব আনন্দ সংবাদ। রওনা হবার আগে আগে শশী মাস্টার হরিচরণের পা ছুঁয়ে প্ৰণাম করলেন। হরিচরণ আঁতকে উঠে বললেন, কর কী, কর কী, তুমি ব্ৰাহ্মণ!

শশী মাস্টার বললেন, আপনার চেয়ে বড় ব্ৰাহ্মণ তো আপাতত চোখে পড়ছে না।

তোমার পিতা-মাতাকে আমার প্রণাম দিও। তুমি কি এখনই রওনা দিচ্ছ?

শশী মাস্টার বললেন, আমি রাতে যাব। সন্ধ্যাবেলায় এক জায়গায় যাব। একজনের সঙ্গে দেখা করব। তাকে একটা জিনিস দেব। তার নাম যদি জানতে চান বলতে পরি।

হরিচরণ বললেন, নাম বলার প্রয়োজন নাই।

 

জুলেখার কাছ থেকে শশী মাস্টার বিদায় নিয়েছেন। কলের গান জুলেখাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কীভাবে দম দিতে হয় কীভাবে পিন বদলাতে হয় শিখিয়ে দিয়েছেন।

হাসিমুখে বলেছেন, জুলেখা যাই?

জুলেখা বলল, একটু বসেন। শরবত দেই। শরবত খান।

শশী মাস্টার বসতে বসতে বললেন, বসতে যখন বলছি বসে যাই। তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ।

জুলেখা বলল, রাতটা থাকেন, আরাম করে ঘুমান। আমি সারারাত আপনার পায়ে হাত বুলায়ে দিব।

সেবা নেওয়ার অভ্যাস নাই জুলেখা।

জুলেখা বলল, মানুষ মানুষের সেবা নেয়। পশু পশুর সেবা নিতে পারে না।

সেবার প্রয়োজন নাই। একটা গান শোনাও। তুমি কি রবিবাবুর কোনো গান কখনো শুনেছ?

না।

উনার গান সম্পূর্ণ অন্য ধারার। শুনলে তোমার ভালো লাগত। আমার গলায় সুর নাই। তারপরেও শোন–

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না?
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যাবে পাই দেখিতে
হারাই-হারাই সদা হয়। ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।।

জুলেখা বলল, আপনাকে একটা অদ্ভুত কথা বলব। কথাটা শোনার পর আপনি আমাকে খুব খারাপ ভাববেন। তারপরেও বলব।

বলো।

আমার মনে হয় আমার অনেক ভাগ্য যে রঙিলা বাড়িতে আমার স্থান হয়েছে।

বলো কী?

জুলেখা চাপা গলায় বলল, এইখানে আছি বইলাই আপনার মতো মানুষের সাথে পরিচয় হইছে। গান আমার অন্তরের জিনিস। গান গাইতে পারতেছি। শিখতেছি।

শশী মাস্টার বললেন, অতি কুৎসিত জীবনের বিনিময়ে যেটা পাচ্ছ সেটা কি অতি তুচ্ছ না?

জুলেখা বলল, আমার কাছে না।

শশী মাস্টার বললেন, তুচ্ছ না। তাহলে কাদছ কেন?

জুলেখা বলল, আপনারে আর দেখব না। এই দুঃখে কাঁদতেছি। রবিবাবুর আরেকটা গান করেন, আমি গলায় তুলব।

শশী মাস্টার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গান ধরলেন–

চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে—
জীবন মরণ সুখ দুখ দিয়ে বক্ষে ধরিব জড়ায়ে।
স্খলিত শিথিল কামনার ভার বহিয়া বহিয়া ফিরি কত আর–
নিজ হাতে তুমি গেঁথে নিয়ো হার, ফেলো না আমারে ছড়ায়ে।।
চিরপিপাসিত বাসনা বেদনা বাঁচাও তাহারে মারিয়া।
শেষ জয়ে যেন হয় সে বিজয়ী তোমারি কাছেতে হারিয়া।

 

শশী মাস্টার মাস্টারদা সুর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় পুলিশের গুলিতে মারা যান। তারিখ ১৮ এপ্রিল ১৯৩০ সাল। অসীম সাহসী মাস্টারদা সূর্যসেনের কারণে ৪৮ ঘণ্টা চট্টগ্রাম শহর ছিল স্বাধীন শহর। ব্রিটিশ শাসনের আওতার বাইরের এক নগরী।

মাস্টারদা ধরা পড়েন অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের তিন বছর পরে। তারই জ্ঞাতি ভাই নেত্র সেন তাঁকে ধরিয়ে দেন। চট্টগ্রাম জেলে বাংলার বীর সন্তান সূর্যসেনকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।

চৈত্র মাসের শেষ দিকের কথা

চৈত্র মাসের শেষ দিকের কথা। কিছুক্ষণ আগে সন্ধ্যা মিলিয়েছে। হরিচরণের শরীর খারাপ করেছে। তার প্রবল শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। শরীর খারাপের কারণ আধিভৌতিক। সন্ধ্যাবেলায় তিনি ঘাটে বসেছিলেন। আকাশে ঘন মেঘ থাকায় আগেভাগে অন্ধকার নেমেছে। দিঘির ডানপাশে জোনাকি পোকার বড় একটা ব্যাক বের হয়েছে। এরা দলবেঁধে পশ্চিম দিকে এগুচ্ছে। হরিচরণ গভীর আগ্রহে এদের গতি-প্রকৃতি লক্ষ করছেন। দিঘির পাড় থেকে বের হয়ে এরা লেবুতলায় কিছুক্ষণ স্থির হলো। সেখান থেকে উড়তে উড়তে বেত ঝোপের পাশে কিছুক্ষণের জন্যে অদৃশ্য হয়ে আবার দেখা দিল। এখন এরা যাচ্ছে শিউলি গাছের দিকে।

হরিচরণ তাকালেন শিউলি গাছের দিকে। হঠাৎ তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তিনি স্পষ্ট দেখলেন- শিউলি গাছের নিচে ফ্রক পরা এক মেয়ে। মেয়েটার দৃষ্টি তাঁর দিকে। সে হয়তো অনেকক্ষণ ধরেই তাকিয়ে আছে। তার দিকে দৃষ্টি পড়ার পর সে গাছের আড়ালে চলে গেল। অতি দ্রুত যে গেল তাও না। ধীরে পা ফেলে গেল, তবে সে তার দৃষ্টি একবারের জন্যেও ফিরিয়ে নিল না। হরিচরণের মেয়েটাকে চিনতে কোনো সমস্যা হলো না। মেয়েটা শিউলি। ঢেউ খেলানো চুল, রোগা শরীর, লম্বাটে মুখ।

হরিচরণ চাপা গলায় ডাকলেন, কে! কে গো! গাছের আড়াল থেকে কেউ উত্তর দিল না। তবে হরিচরণ কিশোরীর পাতলা হাসির শব্দ শুনলেন। এটা কি কোনো বিভ্রান্তি? কোনো মায়া? তিনি যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। তাহলে কি মেয়েটা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে? হরিচরণ পুকুরের দিকে তাকালেন। মনে মনে বললেন—

যা দেবীযু ভ্ৰান্তরূপেনু সংস্থিতা
দেবী ভ্ৰান্তিরূপে অবস্থান করেন।

তিনি আবার তাকালেন শিউলি গাছের দিকে। হ্যাঁ, মেয়েটাকে আবার দেখা যাচ্ছে। সে এখন গাছে হেলান দিয়ে আছে। মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই তো তার রোগা রোগা ফর্সা পা। হরিচরণ উঠে দাড়াতে দাঁড়াতে চাপা গলায় ডাকলেন- মা শিউলি!

মেয়েটি এবার হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। হরিচরণ মন্ত্ৰমুগ্ধের মতো এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি চোখে পালকও ফেলছেন না। তার কাছে মনে হচ্ছে, পলক ফেললেই এই ছায়াময়ীকে আর দেখা যাবে না।

জঙ্গল আলো করে বিদ্যুৎ চমকালো। মেয়েটাকে আর দেখা গেল না।

 

হরিচরণ নিজের ঘরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। তার মাথার কাছে হারিকেন জুলছে। বী-দিকের জানালা খোলা। খোলা জানালায় বৃষ্টির ছাট আসছে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। হরিচরণ মাঝে মাঝে সামান্য কাঁপছেন। তিনি বুকের ব্যথা নিয়ে শুয়েছিলেন। সেই ব্যথা বাড়ছে। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

হারিকেন হাতে মফিজ ঢুকলেন। চিন্তিত গলায় বললেন, আপনার শরীর কি খারাপ করেছে?

হরিচরণ বললেন, একটা কাগজ-কলম নিয়ে আমার পাশে বসো? কিছু কাজ আছে।

আপনার কি শরীরটা খারাপ করেছে?

হুঁ।

ডাক্তার খবর দেই?

ডাক্তার কবিরাজ পরে খবর দিবে। আগে কাগজ-কলম নিয়ে বসো।

মফিজ কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন। হরিচরণ বললেন, আমার ধারণা আমি বাঁচব না। আমি আমার বিষয়সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা করব। সাক্ষী হিসেবে থাকবে তুমি এবং মাওলানা ইদরিস।

মফিজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, আমার পক্ষে সাক্ষী হওয়া সম্ভব না।

সম্ভব না কেন?

আমার নাম মফিজ না। আমার নাম জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়।

হরিচরণ বিছানা থেকে উঠে বসলেন। তাকালেন তীক্ষ্ণচোখে। জীবনলাল বললেন, আমি আপনার আশ্রয়ে আত্মগোপন করে আছি।

বিপ্লবী?

জীবনলাল হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।

হরিচরণ বললেন, আমি কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। যাই হোক, আমি আমার সমুদয় বিষয়সম্পত্তি একজনকে দান করতে চাই–তার নাম জহির। সে মুসলমান ছেলে। তার বিষয়ে একটি বিচিত্র স্বপ্ন দেখেছিলাম বলে এই সিদ্ধান্ত।

জীবনলাল বললেন, স্বপ্নের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক না।

হরিচরণ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, স্বপ্ন তুচ্ছ না। এই বিষয়ে তোমার সঙ্গে তর্কে যাব না। যা লিখতে বলেছি লেখা। কাগজ-কলম নিয়ে বসো। আমার শরীর এখন ভালো। এই ভালো থাকবে না। শরীর স্পর্শ করে অনেকের রোগ সারিয়েছি। নিজেরটা পারব না।

জীবনলাল বললেন, সাধারণ কাগজে লেখা দানপত্র টিকবে না। আপনার

ঘরে কি স্ট্যাম্প আছে? আপনি এত বড় ব্যবসায়ী। জমিদারিও আছে। কোম্পানির স্ট্যাম্প তো থাকার কথা।

হরিচরণ বললেন, বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছ। স্ট্যাম্প আছে। বড় ঘরের সিন্দুকে স্ট্যাম্প আছে।

সিন্দুকের চাবি কোথায়? হরিচরণ বালিশের নিচ থেকে চাবি বের করে দিলেন।

জীবনলাল স্ট্যাম্প এবং কলম নিয়ে পাশে বসলেন। শান্ত গলায় বললেন, ছেলের বাবার নাম কী? বাবার নাম লাগবে।

বাবার নাম ভুলে গেছি। মায়ের নাম মনে আছে। জুলেখা।

ঠিকানা কী?

জুলেখা থাকে বেশ্যাপল্লীতে। রঙিলা বেশ্যাপল্লী।

জীবনলাল চমকে তাকালেন। হরিচরণ বললেন, তুমি যা ভাবছ তা-না। জুলেখা আমাকে বাবা ডাকত। আমি তাকে কন্যাসম জ্ঞান করেছি।

দানপত্র লেখা হলো। হরিচরণ দস্তখত করলেন। বুড়ো আঙুলের ছাপ দিলেন। জীবনলালের দিকে তাকিয়ে বললেন, সাক্ষী হিসেবে তুমি নিজ নামে দস্তখত কর।

জীবনলাল দস্তখত করলেন। হরিচরণ বললেন, দানপত্রে মাওলানা ইদরিসের দস্তখত নিয়ে আস। ভালোকথা, দানপত্র তোমার হেফাজতে রাখবে। ব্যবস্থা নিবে যেন দানপত্র মতো কাজ হয়।

ঠিক আছে।

এখন আমাকে ধরাধরি করে বারান্দায় নিয়ে যাও।

আপনার শরীর খুবই খারাপ, আপনি শুয়ে থাকুন, আমি ডাক্তার ডেকে আনি।

হরিচরণ হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, তোমাকে যা করতে বলছি সেটা কর। তারপর ডাক্তার-কবিরাজ যা আনবার আনবে।

হরিচরণকে বারান্দার ইজিচেয়ারে শুইয়ে জীবনলাল ডাক্তারের সন্ধানে গেলেন। বৃষ্টি নেমেছে জোরেশোরে। বাতাস দিচ্ছে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। হরিচরণ চোখ বন্ধ করলেন। উপনিষদের মঙ্গলাচরণ আবৃত্তি করলেন—

ওঁ ভদ্ৰং কর্নেভি; শৃণুয়াম দেবা
ভদ্ৰং পশ্যেমাক্ষ ভিৰ্যজত্ৰাঃ।
ধ্যাশেম দেবহিতং যদায়ু :
ওঁ শান্তি : শান্তি : শান্তি।

হে দেবগণ, কান দিয়ে যা কিছু ভালো তাই যেন শুনতে পাই। যা কিছু ভালো তাই যেন চোখ দিয়ে দেখতে পাই। আমার জন্যে নির্দিষ্ট যে আয়ু দেবতারা ঠিক করে দিয়েছেন, তা যেন শান্তিময় হয়।

হরিচরণ চোখ খুললেন, অবাক হয়ে দেখলেন, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তাঁর কন্যা শিউলি এগিয়ে আসছে। কী আশ্চর্য, তার পায়ে লাল টুকটুক জুতা। এই জুতাই তো পূজার সময় তিনি এনে দিয়েছিলেন। জুতাজোড়া পায়ে দেবার আগেই তার মৃত্যু হলো। তার মা জুতাজোড়া সিন্দুকে তুলে রেখেছিলেন। আহারে কতদিন আগের কথা। শিউলি এসে হরিচরণের সামনে থমকে দাড়িয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি!

হরিচরণ দু’হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। শিউলি ঠোঁট টিপে হাসছে এবং পায়ে পায়ে এগুচ্ছে। হরিচরণ অপেক্ষা করছেন কখন তার মেয়ে এসে তার হাত ধরে। হরিচরণ ঢোলের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। ঢোল, করতাল বাজিয়ে নাম জপ হচ্ছে। বহু মানুষ একত্রে হরি হরি করছে। সেই শব্দ সমুদ্র গর্জনের মতো।

 

হরিচরণের বাড়িতে ঢোল, করতাল বাজছে না। নামজপও হচ্ছে না। তবে জহির যে প্ৰকাণ্ড কেরায়া নৌকায় নিরুদ্দেশ যাত্ৰা করেছে সেখানে নাম জপ হচ্ছে। নৌকা কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। জানার আগ্রহও বোধ করছে না। তার হাতে একটা কানাকড়িও নেই। সকাল থেকে সে কয়েক দফা পানি ছাড়া কিছুই খায় নি। এখন ক্ষিধেয় নাড়িতুড়ি জুলে যাচ্ছে। সে গভীর আগ্রহে নৌকার গলুইয়ে বসা এক বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধ কোঁচড়ভর্তি মুড়ি নিয়ে বসেছে। তার হাতে পাকা মৰ্তমান কলা। সে এক গাল মুড়ি মুখে দিচ্ছে এবং কলায় কামড় দিচ্ছে। জহিরের মনে হচ্ছে, এরচে’ সুন্দর কোনো দৃশ্য সে তার জীবনে দেখে নি।

বৃদ্ধ জহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, মুড়ি খাইবা?

জহির বলল, না।

বৃদ্ধ বলল, না কেন? মুখ দেইখা বোঝা যায় ভুখ লাগছে।

জহির বলল, আমি মুসলমান।

বৃদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে একটু সরে গিয়ে বলল, সেইটা বলো। সে একটা মৰ্তমান কলা জহিরের দিকে গড়িয়ে দিয়ে বলল, ফল খাও। ফলে দোষ লাগে না।

কলাটা গড়াতে গড়াতে জহিরের পায়ের কাছে এসে থামল। জহির কলাটার দিকে তাকিয়ে রইল। হাতে নিল না।

বৃদ্ধ বললেন, তোমার নাম কী?

জহির বলল, আমার নাম লাবুস। মোহাম্মদ লাবুস।

বৃদ্ধ বলল, লাবুস আবার কেমন নাম?

জহির বলল, খুবই ভালো নাম।

 

উকিল মুনসির স্ত্রী লাবুসের মা’র মন বিষণ্ণ। লাবুস কাউকে কিছু না বলে নিরুদ্দেশ হয়েছে। অথচ এই ছেলেটার প্রতি তাঁর মমতার কোনো সীমা ছিল না। লাবুসের মা তাহাজুদের নামাজ শেষ করে দীর্ঘসময় নিয়ে প্রার্থনা করলেন। যেন তার লাবুস ভালো থাকে সুখে থাকে। কোনো একদিন যেন ফিরে আসে। তার কাছে।

রাত অনেক। লাবুসের মা খাটে হেলান দিয়ে বসেছেন। উকিল মুনসি বাড়িতে নেই। গানের দল নিয়ে সুনামগঞ্জ গিয়েছেন। কবে ফিরবেন তার ঠিক নেই। লাবুসের মা নিঃসঙ্গ বোধ করছেন। স্বামীর জন্যে খুব খারাপ লাগছে। তিনি ঠিক করলেন, রাতে ঘুমাবেন না। এবাদত বন্দেগি করে রাতটা পার করবেন।

দরজার পাশে খুঁট করে শব্দ হলো। লাবুসের মা ঘাড় ফিরিয়ে অবাক হলেন। ফুটফুটে একটা মেয়ে ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে চাপা হাসি। যেন বড়ই আনন্দময় কোনো ঘটনা তার জীবনে ঘটেছে। লাবুসের মা বললেন, তুমি কে গো? তুমি কোন বাড়ির?

মেয়েটি বলল, আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি আপনাকে একটা খবর দিতে এসেছি।

কী খবর?

আমার বাবা মারা গেছেন।

লাবুসের মা অবাক হয়ে বললেন, তোমার বাবা মারা গেছেন। কিন্তু তোমার মনে আনন্দ। ঘটনা। কী? তোমার নাম কী? তোমার বাবার পরিচয় কী?

আমার নাম শিউলি। আমার বাবার নাম হরিচরণ। তিনি বান্ধবপুরের ছয় আনির জমিদার। আমি যাই?

মেয়েটা খুব স্বাভাবিকভাবেই দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। লাবুসের মা মেয়েটার পেছনে পেছনে গেলেন। কাউকে দেখতে পেলেন না।

 

মাওলানা ইদরিস বিসমিল্লাহ বলে দানপত্রে দস্তখত করতে করতে বললেন, জীবনলাল নামের যে সাক্ষী উনাকে তো চিনলাম না। উনি কে?

জীবনলাল বললেন, আমার নাম জীবনলাল। আমি আপনার কাছে মিথ্যা পরিচয় দিয়েছি। তার জন্যে ক্ষমা করবেন।

মিথ্যা পরিচয় কেন দিয়েছেন জানতে পারি?

আমি বিপ্লবী দলের মানুষ। মিথ্যা নাম নিয়ে পালিয়ে আছি। হরিচরণ বাবুও আমার আসল পরিচয় আজ জেনেছেন। আমরা আসল পরিচয় কখনো প্ৰকাশ করি না।

আমার কাছে তো করেছেন।

জীবনলাল বললেন, আপনার কাছে পরিচয় কেন প্ৰকাশ করলাম নিজেও বুঝতে পারছি না। দুর্বল মুহূর্তে মানুষ এইসব কাণ্ড করে। অসুস্থ হরিচরণ বাবুকে দেখে মনটা দুর্বল হয়েছে।

মাওলানা ইদরিস ইতস্তত করে বললেন, ইসলাম ধর্ম বিষয়ে আপনি আমাকে অনেক কিছু বলেছেন। সবই আমি মনেপ্ৰাণে বিশ্বাস করেছি। কথাগুলি কি সত্য?

যা বলেছি। সবই সত্য। একজন বিধমীও তো আপনাদের ধর্ম বিষয়ে জানতে পারে। পবিত্র কোরান শরিফ বাংলাভাষায় একজন হিন্দু প্ৰথম অনুবাদ করেছেন। এটা কি জানেন?

মাওলানা ইদরিস বিস্মিত হয়ে বললেন, জানি না। আজ প্রথম শুনলাম। উনার নাম কী?

গিরিশ চন্দ্র সেন। তাঁর এই কাজের জন্যে মুসলমানরা তাকে সারাজীবনই যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছে। মুসলমানরা তাকে ডাকত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন।

মুসলমান কখনোই তাঁকে শুধু গিরিশ চন্দ্র ডাকত না। তিনি সবার কাছে ভাই গিরিশ চন্দ্ৰ।

মাওলানার চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, বড় সুন্দর একটা ঘটনা আপনার কাছে শুনলাম। খুবই আনন্দ পেয়েছি। আনন্দে চোখে পানি এসেছে। আপনাকে শুকরিয়া। এই বাংলা কোরান শরিফ কীভাবে সংগ্ৰহ করা যায় একটু বলবেন?

আমি ব্যবস্থা করে দিব। উঠি? আসসালামু আলায়কুম।

মাওলানা বললেন, ওয়ালাইকুম সালাম। তার ভেতরে সামান্য অস্বস্তি কাজ করছে। একজন বিধমীর সালামের উত্তরে ওয়ালাইকুম সালাম বলা কি ঠিক হচ্ছে? এই বিষয়ে হাদিস-কোরানের বিধানইবা কী? নিজের স্বল্পজ্ঞানের জন্য নিজের উপরই রাগ লাগছে।

জীবনলাল ঘর থেকে বের হবার আগে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, মাওলানা সাহেব, একটা কথা। আপনার একটা বিষয় দেখে অবাক হয়েছি। হরিচরণ বাবু বিপুল বিষয়সম্পত্তি একজন অনাত্মীয় ছেলেকে দিয়ে গেছেন। এই বিষয়ে আপনার কোনো কৌতূহল হলো না কেন?

মাওলানা বললেন, একটা হাদিসে পড়েছিলাম, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হিস সালাম বলেছেন, ‘প্রতিবেশীর বিষয়ে অকারণ কৌতূহল দেখাইবে না।’ হাদিসটা মানি। তাছাড়া হরিচরণ বাবু অতি সাধু পুরুষ। উনি যা সিদ্ধান্ত নিবেন ঠিকই নিবেন। তারপরও আসল ব্যাপার অন্যখানে।

আসল ব্যাপার কী?

সমস্ত সিদ্ধান্তই আল্লাহপাকের। উনি ঠিক করেছেন জহির বিপুল সম্পত্তির মালিক হবে। বাকি সবই উছিলা।

 

বান্ধবপুর বাজারে একজন ক্যাম্বেল পাশ এলএমএফ ডাক্তার আছেন। নাম সুধিন দাস। তিনি সারাবছরই নানান রোগব্যাধিতে শয্যাশায়ী থাকেন। আজও তাই। প্রবল জ্বরে তিনি অচেতন প্ৰায়। তাঁর দুই মেয়ের একজন তাঁর পায়ে তেল মালিশ করছে, অন্য মেয়ে মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। এই অবস্থাতেই তিনি হরিচরণের বিষয়ে বিধান দিলেন, রসুন-সরিষার তেলের মালিশ। এতেই রাতটা নির্বিঘ্নে কাটবে। সকালে মিকচার দিয়ে দিব।

জীবনলাল বললেন, উনার বুকে ব্যথা। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

সুধিন ডাক্তার হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, রসুন এই রোগের একমাত্র বিধান। আজ অমাবস্যাও না, পূর্ণিমাও না। রোগী মারা যাবে না। বেশিরভাগ বৃদ্ধ মারা যায় অমাবস্যা পূর্ণিমার টানে। রোগী টিকে থাকবে। সকালে নাড়ি দেখে মিকচার দিব।

জীবনলাল সুধিন ডাক্তারের ঘর থেকে বের হলেন। বাজারে নামকরা একজন কবিরাজ থাকেন। চান্দসির ক্ষত চিকিৎসা করেন। রাতে তিনি বাজারে থাকেন না। তাঁর বাড়ি খুঁজে বের করতে হলে স্থানীয় কারো সাহায্য দরকার। দুৰ্যোগের রাতে বাজারে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

মফিজ ভাই, এত রাতে এখানে কী করেন?

ধনু শেখ ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। অনেকখানি দূরে তাঁর তিনসঙ্গী। একজনের হাতে বর্শা। ধনু শেখের মুখ দিয়ে ভকভক করে দেশী মদের গন্ধ আসছে। জীবনলাল কিছু বলার আগেই ধনু শেখ বলল, আসল খবর কি শুনছেন?

আসল খবর কী?

ময়মনসিংহ থেকে পুলিশের এসপি জনকিন্স সাহেব স্বয়ং এসেছেন লঞ্চ নিয়ে। তারা খবর পেয়েছেন, এই অঞ্চলে একজন বিপ্লবী লুকিয়ে আছে।

জীবনলাল কিছু বললেন না।

ধনু শেখ বলল, আপনাকে সাবধান করার জন্যে বললাম। আপনি তো সেই লোক, ঠিক বলেছি না? আমার অনুমান ঠিক আছে না ভাইসাহেব?

জীবনলাল বললেন, পুলিশকে খবর দিয়ে কি আপনি এনেছেন?

ধনু শেখ বলল, আমি যদি পুলিশ খবর দিয়ে আনতাম—আপনাকে সাবধান করতাম না। পুলিশ নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হতাম। আপনাকে ধরিয়ে দিতাম। ব্রিটিশ রাজ বলত, মারহাবা। একটা কথা, আপনার সঙ্গে কি অস্ত্ৰ আছে?

জীবনলাল বললেন, আছে।

ধনু শেখ বলল, আমার বুদ্ধি শোনেন। নৌকা নিয়া হাওর পাড়ি দেন। ব্রিটিশ পুলিশ রাত বিরাতে হাওর পাড়ি দিবে না। তারা হাওর ভয় পায়। আমি নৌকার ব্যবস্থা করে দিব। আমার নিজের নৌকা আছে। ভালো মাঝি আছে।

জীবনলাল বললেন, আমাকে সাহায্য করতে চাচ্ছেন কেন?

আপনাকে বন্ধু হিসেবে নিয়েছিলাম। এই কারণে। আমি লোক খারাপতবে যত খারাপ সবাই ভাবে তত খারাপ না। একবার আমি যারে বন্ধু ভাবি সে বাকি জীবনের বন্ধু। আপনি আমার বন্ধু। আপনার সঙ্গে অনেক সুখ দুঃখের আলাপ করেছি। এখন ইচ্ছা করলে আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন। ইচ্ছা না করলে নাই।

জীবনলাল বললেন, নৌকা ঠিক করে দিন। হাওর পাড়ি দিব। তার আগে রঙিলা বাড়ির একটা মেয়েকে আমার দেখার শখ।

হতভম্ব ধনু শেখ বলল, রঙিলা বাড়ির মেয়ের সাথে আপনার কী?

মেয়েটার রূপের প্রশংসা শুনেছি।

চান বিবির কথা বলছেন? আসল নাম জুলেখা।

হ্যাঁ জুলেখা।

ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বলল, খামাখা সবাই তার রূপের কথা বলে। এমন কিছু না। এরচে’ পরীবিবি নামে একজন আছে— ছোটখাটো। কিন্তু ধানী মরিচ।

আমি জুলেখাকে একনজর দেখব।

চলেন ব্যবস্থা করে দেই। তবে দেরি করা ঠিক হবে না। ইংরেজ পুলিশ, এরা জোকের চেয়েও খারাপ। লবণ দিলে জোঁক ছেড়ে দেয়, ইংরেজ পুলিশ ছাড়ে না।

 

জীবনলাল দাঁড়িয়ে আছেন জুলেখার সামনে। ঘরে তৃতীয় ব্যক্তি নেই। ধনু শেখ দরজার বাইরে। তার লোকজন নৌকা আনতে গেছে। নৌকা রঙিলা বাড়ির ঘাট থেকে ছাড়বে। রঙিলা বাড়ি জায়গাটা উঁচু। পুলিশের আগমন আগেই টের পাওয়া যাবে।

জীবনলাল বললেন, তোমার নাম জুলেখা?

জুলেখা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

এই কাগজটা যত্ন করে রাখ।

কাগজটা কী?

এটা একটা দানপত্র। হরিচরণ বাবুর দানপত্র। এর বেশি ব্যাখ্যা করতে পারব না। তুমি কি বাংলা পড়তে পার?

পারি।

অবসর সময়ে পড়বে। আর এই পুঁটলিটা রাখা। পুঁটলিতে একটা রিভলবার আছে। আমার লোকজন এসে কোনো একদিন তোমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে।

 

রঙিলা বাড়ির ঘাটে নৌকা চলে এসেছে। জীবনলাল নৌকায়। ধনু শেখ বন্ধুকে বিদায় জানাতে নৌকায় উঠেছে। সে জীবনলালের হাত ধরে বলল, নিশ্চিন্ত মনে যান। মাঝিকে বুঝিয়ে বলে দিয়েছি। সোজা চলে যাবেন মদনপুর। মদনপুর থেকে লঞ্চে উঠবেন সোজা নারায়ণগঞ্জ। একবার নারায়ণগঞ্জ পৌঁছলে কোনো বাপের ব্যাটা আপনেরো ধরতে পারবে না। ইচ্ছা করছে। আমি নিজেই আপনার সঙ্গে যাই। সেটা সম্ভব না। অতিরিক্ত মদ্যপান করেছি। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আচ্ছা ভাইসাহেব তাহলে বিদায়। আল্লাহ হাফেজ।

পুলিশ তখন হরিচরণের বাড়ি ঘেরাও করেছে। বাড়িতে বারান্দায় মরে পড়ে থাকা বৃদ্ধ হরিচরণ, আর কেউ নেই। জীবনলাল নৌকা নিয়ে সরে পড়েছে, এই খবর তাদের কাছে অজানা।

 

এসপি জনকিন্সের কাছে ধনু শেখ হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত লঞ্চ নিয়ে হাওরের দিকে গেলে বিপ্লবী জীবনলালকে পাওয়া যাবে- এই খবর দেয়া হয়েছে। জীবনলালের সঙ্গে অস্ত্ৰ আছে, এই তথ্যও জানানো হয়েছে। জনকিন্স সাহেব দলবল নিয়ে তৎক্ষণাৎ রওনা হলেন। যাবার আগে ধনু শেখকে বললেন, এই ভয়ঙ্কর বিপ্লবী যদি ধরা পড়ে তাহলে তিনি চেষ্টা নেবেন যেন ধনু শেখ ‘খান সাহেব’ টাইটেল পান।

 

তারিখ ১৩ই এপ্রিল। সন ১৯১৯। ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ড তখন তুঙ্গে।

এই দিনেই পাঞ্জাবে জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে অমৃতসরের জালিওয়ানওয়ালাবাগে এক হাজার মানুষ নির্মমভাবে নিহত এবং দুই হাজার আহত হয়। ডায়ার তখনই কার্ফু জারি করে, যে কারণে কোনো চিকিৎসা সাহায্য না পৌঁছায়, ময়দানে ও রাস্তায় শত শত মানুষ প্ৰাণ ত্যাগ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ রাজের ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন।

তুরস্কের সুলতান ছিলেন ভারতীয় মুসলমানসহ পৃথিবীর সকল সুন্নি মুসলমানের খলিফা। প্রথম মহাযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষ নেয়ায় ব্রিটিশ রাজ সুলতানের পদচ্যুতি ঘটায়। সুলতানের অধিকার রক্ষার জন্যে শুরু হয় খেলাফত আন্দোলন। মহাত্মা গান্ধী এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।

বিপ্লবী জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়

ভয়ঙ্কর বিপ্লবী জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়কে ধরিয়ে দেবার পুরস্কার হিসেবে ধনু শেখ ‘খান সাহেব’ উপাধি পেয়েছেন। জীবনলাল আছেন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে। বিচার শুরু হয়ে যাবে। জীবনলালের ফাঁসি হবে, এ বিষয়টা মোটামুটি নিশ্চিত।

খান সাহেব ধনু শেখ বসে আছেন। হরিচরণের বাড়ির উঠানে। মাঘ মাস। শীত পড়েছে প্রচণ্ড। তার হাতে কাচের বড় গ্লাসভর্তি খেজুরের রস। খেজুরের রস খেতে হয়। সূৰ্য উঠার আগে। বেলা হয়ে গেছে। রস খানিকটা টকে গেছে, তবে খান সাহেব ধনু শেখ টিকে যাওয়া রস খেয়ে যথেষ্টই আনন্দ পাচ্ছেন। ইদানীং সবকিছুতেই তিনি আনন্দ পান। বেদানা নামের তের বছর বয়সি এক বালিকাকে সম্প্রতি বিবাহ করেছেন। মেয়েটি রূপবতী না। গাত্রবর্ণ কালো। মাথার চুল পিঙ্গল। তারপরেও তার সঙ্গে গল্পগুজব করেও তিনি আনন্দ পাচ্ছেন। কেন এরকম হচ্ছে তিনি জানেন না। তাঁর প্রথম স্ত্রী কমলার ধারণা, বেদানা জাদুটোনা করেছে। সম্ভাবনা যে একেবারেই নেই, তা-না।

হরিচরণের বিষয়সম্পত্তির দখল ধনু শেখ নিয়ে নিয়েছেন। তেমন কোনো সমস্যা হয় নি। হরিচরণ নাকি মৃত্যুর আগে আগে কোম্পানির স্ট্যাম্পে সব দিয়ে গেছেন ধনু শেখকে। স্ট্যাম্পে তিনি দস্তখত করেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দস্তখত সামান্য আঁকাবঁকা হয়েছে। সে-কারণেই তিনি বুড়ো আঙুলের ছাপও দিয়েছেন। দু’জন সাক্ষীর দস্তখতও আছে। একজন প্রাক্তন জমিদার শশাংক পাল। অন্যজন অম্বিকা ভট্টাচার্য। মুসলমান হবার পর যার নাম সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর।

ধনু শেখের কারণে জানা গেছে, হরিচরণ মৃত্যুর আগে আগে কলেমা তৈয়ব পাঠ করে মুসলমান হয়েছেন। তাঁকে দাহ করা হয় নি। মসজিদের পাশের গোরস্তানে তার কবর হয়েছে। ধনু শেখ নিজ খরচায় কবর বাঁধিয়ে দিয়েছেন। কবরে লেখা— বিশিষ্ট দানবীর, সমাজসেবক মোহাম্মদ আহম্মদ। যারা শেষ সময়ে মুসলমান হয়, আকিকা করে নাম রাখার সুযোগ হয় না, তাদের নাম মোহাম্মদ আহম্মদ রাখাই না-কি বিধান। কবরের ভেতর একটা স্বর্ণচাঁপা গাছ লাগানো হয়েছে। অল্পদিনেই গাছ তরতাজা হয়েছে। মাওলানা ইদরিস গাছটার যত্ন নেন। অজুর শেষে পানি ছিটিয়ে দেন। কবরের উপর গাছ থাকা রহমতের ব্যাপার। গাছ আল্লাহপাকের নাম জিগির করে, তার সোয়াবের কিছু অংশ কবরবাসী পায়। আল্লাহপাক তার বান্দাদের উদ্ধারের নানান ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

মাঝে মাঝে কবরের পাশে একজন তরুণীকে ঘোমটায় মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার চোখে থাকে বিস্ময়।

একদিন মাওলানা ইদরিস অবাক হয়ে দেখলেন, মেয়েটি বাঁধানো কবরের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমনভাবে হাত বুলাচ্ছে যেন সে ঘুমন্ত মানুষের গায়ে হাত বুলাচ্ছে। মাওলানা কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, মাগো আপনি কে?

তরুণী চমকে উঠে। ভীত গলায় বলল, আমার নাম যমুনা।

এখানে কী করেন?

কিছু না।

মেয়েছেলের উচিত না পুরুষের কবরে হাত রাখা।

আর রাখব না।

অনেকবার আপনারে এই কবরের কাছে আসতে দেখেছি। কেন আসেন?

যমুনা ক্ষীণ গলায় বলল, আর আসব না।

 

মাঘ মাসের শীতের সকালে ধনু শেখের সঙ্গে সাক্ষী দুজনও উপস্থিত। সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর বসেছেন টুলে। তিনি দাড়ি রেখেছেন। মুখভর্তি চাপদাড়িতে তাকে খুব মানিয়েছে। ধনু শেখ তাকে স্থায়ী চাকরি দিয়েছেন। এখন মাসে পঁচিশ টাকা করে পান। বিনিময়ে হরিচরণের বাড়িঘর দেখাশোনা করেন।

শশাংক পাল হরিচরণের টিনের ঘরে থাকেন। তার অরুচি রোগ হয়েছে। কোনোকিছুই হজম করতে পারেন না। তাঁকে লবণ দিয়ে সাগু জ্বাল দিয়ে দেয়া হয়। সকালবেলা চামচ দিয়ে তাই খানিকটা খান। কিছুক্ষণ পর পুরোটাই বমি করে দেন। ধনু শেখ কথা দিয়েছেন তাকে কোলকাতায় নিয়ে চিকিৎসা করাবেন। কোলকাতায় ধন্বন্তরী আয়ুৰ্বেদশাস্ত্রী আছেন। আয়ুৰ্বেদশাস্ত্রে অরুচির ভালো চিকিৎসা আছে।

শশাংক পাল বললেন, খান সাহেব, আমরা যাব কবে?

ধনু শেখ বললেন, সময় হলেই যাব। সময় এখনো হয় নাই।

সময় কবে হবে?

ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বললেন, ঢাকার কমিশনার সাহেব পাখি শিকারে আসবেন। পাখি শিকারের পরে যাব।

শশাংক পাল বললেন, ততদিন আমি বাঁচব না।

ধনু শেখ নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, মরে গেলে খাঁটি ঘি দিয়ে দাহর ব্যবস্থা করব। চিন্তার কিছু নাই।

শশাংক পাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। কঠিন কিছু কথা তাঁর ঠোঁটে এসে গেছে। অনেক কষ্টে কথাগুলি আটকালেন। ধনু শেখ এখন এমন ব্যক্তি যার সঙ্গে কঠিন কথা বলা যায় না। সামলে কথা বলতে হয়।

ধনু শেখ গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, সিরাজ ঠাকুর?

সিরাজ ঠাকুর ব্যস্ত হয়ে বললেন, জে খান সাব।

এইবারের কোরবানির ঈদে মসজিদের সামনে আমি কোরবানি দিব বলে মনস্থ করেছি।

মনস্থ করেছি।

হিন্দুরা লাফালাফি ঝাপঝাঁপি করতে পারে। করলে করবে। আপনি কী বলেন?

অবশ্যই। তারা ধর্মকর্ম করবে, আমরা করব না— এটা কেমন কথা? আমাদেরও ধর্মকর্মের হক আছে।

ধনু শেখ বললেন, মাগরিবের নামাজের সময় এরা মন্দিরে ঘণ্টা বাজায়। মুসুল্লিদের নামাজের অসুবিধা হয়। এরও একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘণ্টা বাজাইতে দোষ নাই। নামাজের সময় বাদ দিয়ে।

সিরাজ ঠাকুর জোরের সঙ্গেই বললেন, অবশ্যই।

ধনু শেখ বললেন, ভালো দেখে একটা ঘোড়া খরিদ করা দরকার। ঘোড়া বিনা বিশিষ্ট মানুষের ইজ্জত রক্ষা হয় না।

সিরাজ ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, অবশ্যই। শাদা রঙের ঘোড়া, যেন দূর থেকে নজরে আসে।

শশাংক পাল বললেন, উ ছ। ঘোড়াতে কোনো ইজ্জত নাই। থানার ওসি ঘোড়ায় চড়ে। ইজ্জত হাতিতে। হাতি খরিদ করেন।

ধনু শেখ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তার হাতি-ভাগ্য ভালো না। হরিচরণ বেকুবের মতো তার হাতি আসামের জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন। সেই হাতি ফিরে আসে নি। ধনু শেখ শাল্লার দশআনি জমিদার নেয়ামত হোসেনের কাছে হাতি কিনতে গিয়ে অপদস্ত হয়েছেন। নেয়ামত হোসেন ধনু শেখকে ‘তুমি তুমি’ করে বলেছেন, যেন ধনু শেখ তার অধস্তন কর্মচারী।

হাতি কিনতে চাও?

জি। শুনেছি আপনি আপনার হাতি বিক্রি করবেন। খরিদার অনুসন্ধান করছেন।

হাতি দিয়া তুমি করবা কী?

বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া আসা করতে হয়।

পালকিতে যাওয়া আসা করব। হাতি একটা ইজ্জতের প্রাণী। তার ইজ্জতের দিকে আমাদের লক্ষ রাখা দরকার। যে মুচি, জুতা সেলাই করে, তার বাড়িতে হাতি দেওয়া যায় না। এতে হাতির ইজ্জতের হানি হয়।

ধনু শেখ আহত হয়ে বলেছেন, আমি কি মুচি?

নেয়ামত হোসেন হাই তুলতে তুলতে বলেছেন, কথার কথা বলেছি। নিজের ঘাড়ে টান দিয়া নিবা না। ছোটলোকের স্বভাব কি জানো? সবকথা নিজের ঘাড়ে টান দিয়া নেয়। সে ভাবে সবাই তাকে অপমান করতে নামছে। তুমি বড় মানুষ হওয়ার চেষ্টায় আছ— এইসব শিখবা না?

ধনু বিড় বিড় করে বলেছেন, অবশ্যই। অবশ্যই।

নেয়ামত হোসেন ইকোয় টান দিয়ে উপদেশের ভঙ্গিতে বলেছেন, হাতির চিন্তা বাদ দাও। আমার কথা শোন, হাঁটাহাঁটির মধ্যে থাক। এতে শরীর স্বাস্থ্যু ভালো থাকে। শরীর ঠিক রাখা প্রয়োজন না?

ধনু শেখ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমি উঠি।

নেয়ামত হোসেন দরাজ গলায় বললেন, আরো এখনই কি উঠাবা? শরবত খাও, মিষ্টি খাও। মিষ্টি মুখে না দিয়া আমার বাড়ি থেকে কেউ যায় না। তোমার সঙ্গে আমার বিশেষ জরুরি কিছু কথাও ছিল।

কী কথা?

দুষ্ট লোকে বলে, তুমি নাকি মরা। হরিচরণের আঙুলের ছাপ দিয়া দলিল বানিয়েছ— এটা কি সত্য?

দুষ্ট লোকটা কে?

দুষ্ট লোকের আলাদা পরিচয় থাকে না। তারা গলায় সাইনবোর্ড বুলিয়ে ঘুরে না। কথা সত্য কিনা বলো।

নেয়ামত হোসেন চেয়ারে গা এলিয়ে গড়গড়া টানছেন। তার চোখ বন্ধ। ধনু শেখকে আচমকা এই প্রশ্ন করে ‘তবদা’ বানিয়ে দিতে পারার আনন্দেই তিনি আত্মহারা। তবে ধনু শেখ জবাব দিলেন। এই জবাব শোনার জন্যে নেয়ামত হোসেন প্রস্তুত ছিলেন না। নেয়ামত হোসেন মনে মনে ধনু শেখের সাহসের প্ৰশংসা করলেন।

ধনু শেখ বললেন, দুষ্ট লোক বা শিষ্ট লোক আমার বিষয়ে কী কথা বলেছে আমি জানি না, তবে আপনার কাছে স্বীকার করছি— ঘটনা সত্য!

নেয়ামত হোসেন বললেন, ঘটনা সত্য?

জি জনাব সত্য। হরিচণের না আছে কোনো ওয়ারিশান না আছে কিছু। তার বিষয়সম্পত্তি সাত ভূতে লুটে খাবে, এটা কেমন কথা!। এইসব বিবেচনা করে দখল নিয়েছি। জনাব, উঠি?

হাতি বিষয়ক এইসব কথাবার্তা যখন হয়েছে তখনো ধনু শেখ খান সাহেব হন নাই। জমিদার নেয়ামত হোসেন তাকে অপমান করতে পারে। ধনু শেখ অপমান গায়ে মাখেন নাই। হাসিখুশি অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন। বালিকা বধূর সাথে লুড়ু খেলেছেন। তিন দান খেলা হয়েছে। দুইবারই তিনি জিতেছেন। বেদান লুড়ুতে হারার অপমান নিতে না পেরে কান্নাকাটি করেছে। তাকে শান্ত করতে ধনু শেখের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে।

বেদানাকে ধনু শেখ বড়ই পিয়ার করেন। তাঁর এই বালিকা বধূ ভাগ্যবতী। তাকে বিয়ে করার পরই আচমকা ‘খান সাহেব’ টাইটেল। ইংরেজ জাতি হিসেবে ভালো, তারা উপকারীর উপকার ভোলে না।

ধনু শেখ ধরেই নিয়েছিলেন টাইটেল পাওয়ার পর নেয়ামত হোসেনের বাড়িতে তার দাওয়াত হবে। তা হয় নি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তিনবার লোক মারফত খবর পাঠিয়েছেন। নেয়ামত হোসেন কথা বলতে চান। বিশেষ জরুরি।

প্রথমবার খবর পাঠালেন তার নিজ বাড়িতে ডাকাতি হবার পর। দ্বিতীয়বার খবর পাঠালেন, তার বজরায় ডাকাত দলের গোলাগুলির ঘটনার দিনে। তৃতীয় দফায় খবর পাঠিয়েছেন কিছুদিন আগে। ধনু শেখ ঠিক করে রেখেছেন, যাবেন। সদর খাজনা দেবার তারিখ হবার আগে আগে। নেয়ামত হোসেন যেন সদর খাজনা দিতে না পারেন এই ব্যবস্থা তিনি নিয়ে রেখেছেন। টাকা নিয়ে যারা যাবে তারা ডাকাতের হাতে পড়বে। দুই চারজনের প্রাণহানী ঘটবে। কী আর করা। সবই উপরের হুকুম। জগত চলে উপরের হুকুমে, মানুষের করার কিছু নাই। ভালো ব্যবস্থা। তবে সব ব্যবস্থা সবসময় কাজ করে না।

 

মাওলানা ইদরিস হাফেজ টাইটেলের পরীক্ষায় ফেল করেছেন। দেওবন্দে চারজন হাফেজের সামনে পরীক্ষা দিতে বসে পদে পদে ভুল করেছেন। চারজন হাফেজই বিরক্ত হয়েছেন, যদিও তাঁরা মনের ভাব প্রকাশ করেন নি।

একজন মাওলানা ইদরিসের কাঁধে হাত রেখে বলেছেন, সবাই হাফেজ হতে পারে না। হওয়ার প্রয়োজনও নাই। আপনি এই পথ ছেড়ে দেন। আল্লাপাকের কালাম ভুলভাল বলে আপনি মহাপাপী হচ্ছেন। প্রয়োজন কী?

মাওলানা বললেন, এক দুই বৎসর পরে আবার আসি? আপনাদের চারজনকে একসঙ্গে দেখে ভয় পেয়েছি বিধায় সব আউলা ঝাউলা হয়েছে।

এক বৎসর পর যখন আসবেন তখনো তো আমরা চারজনই থাকব। তখন কি মাথা আউলা হবে না?

মাওলানা ইদরিস এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন নি। বিষণ্ণ হৃদয়ে বান্ধবপুরে ফিরে এসেছেন। হাফেজ টাইটেল পাওয়ার পর বিবাহ করবেন। এরকম বাসনা ছিল। সেই বাসনা এখন তার আর নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোরান মজিদ আবারো ভালোমতো মুখস্থ করবেন। আবারো দেওবন্দ যাবেন। শুদ্ধ নিয়তের প্রতি আল্লাহপাকের মমতা আছে। তার নিয়ত শুদ্ধ।

বৈশাখ মাসের এক রাত। মসজিদে এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা বাড়ি ফিরে দেখেন ভেতর বাড়িতে হারিকেন জুলছে। তিনি খুবই বিস্মিত হলেন। তার বাড়ি থাকে অন্ধকার। তিনি এসে হারিকেন জ্বালান। কে এসে বাড়িতে হারিকেন জ্বালাবে? তাঁর ক্ষীণ সন্দেহ হলো, জহির হয়তো ফিরে এসেছে। জহিরের নিরুদ্দেশের খবর তিনি উকিল মুনসির মাধ্যমে পেয়েছেন।

মাওলানা উঠানে দাঁড়িয়ে বললেন, কে?

ভেতর থেকে নারীকণ্ঠে কেউ একজন বলল, আমি।

মাওলানা বললেন, আপনার পরিচয়?

আমার নাম জুলেখা, আমি জহিরের মা। মাওলানা সাহেব, আপনাকে আসসালাম।

মাওলানার শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। কী সর্বনাশের কথা! রঙিলা বাড়ির অতি পাপিষ্ঠ নারীদের একজন তার ঘরে। জানাজানি হলে বিরাট সর্বনাশ হবে। জানাজানি না হলেও ঘরদুয়ার অপবিত্র হয়েছে। কুকুর যে ঘরে ঢুকে সেই ঘর নাপাক হয়ে যায়। সেখানে নামাজ হয় না। এরা তারও অধম।

জুলেখা বলল, মাওলানা সাহেব, ভেতরে আসবেন? আপনার সঙ্গে দুইটা কথা বলব।

মাওলানা বললেন, আপনি আমার বাড়িতে এসে বিরাট অন্যায় করেছেন।

অন্যায়ের জন্যে ক্ষমা চাই। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা ছিল বলে এসেছি। কথা শেষ করে চলে যাব।

মাওলানা বললেন, আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নাই। আপনি চলে গেলেন।

বাড়ির ভেতর থেকে মৃদু হাসির শব্দ পাওয়া গেল। এই পরিস্থিতিতে কোনো মেয়ে হাসতে পারে তা মাওলানার কল্পনাতেও নেই। মাওলানা বললেন, আপনাকে আল্লাহর দোহাই লাগে আপনি চলে যান।

জুলেখা বলল, আমি যে আপনার স্ত্রী এইটা কি জানেন?

মাওলানা হতভম্ব গলায় বললেন, তুমি কী বললা?

মাওলানা এতক্ষণ আপনি করে বলছিলেন, হঠাৎ তুমি সম্বোধনে চলে গেলেন।

জুলেখা শান্ত গলায় বলল, পুরান কথা মনে কইরা দেখেন। আপনের কলেরা হয়েছিল। আপনি মরুতে বসেছিলেন। আমি ছিলাম। আপনার সাথে। আপনার সেবা করেছিলাম। মনে আছে?

মাওলানা চাপা গলায় বললেন, মনে আছে।

জুলেখা বলল, এক রাতে আপনি আমারে বললেন, কোনো অনাত্মীয় তরুণী পুরুষের সেবা করতে পারে না। দুইজনেরই বিরাট পাপ হয়। তখন আমি বললাম, এক কাজ করেন, আমাকে বিবাহ করেন। আপনার কি মনে আছে?

মাওলানা চুপ করে রইলেন। তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এই মেয়েটা ভয়ঙ্কর কথা বলছে। মেয়েটা মিথ্যাও বলছে না। তার আবছা আবছা মনে পড়ছে।

জুলেখা বলল, আপনার মনে না থাকলেও আমি আপনাকে দোষ দিব না। আপনি তখন মরতে বসেছিলেন। মৃত্যুর সময় মানুষ অনেক কিছু করে। আপনি কি উঠানে দাঁড়ায়ে থাকবেন? ভেতরে আসবেন না?

মাওলানা এই প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। তিনি হঠাৎ লক্ষ করলেন, তাঁর কথা বলার শক্তি চলে গেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ইবলিশ শয়তান আশেপাশে আছে এটা বোঝা যাচ্ছে। সে মজা দেখার জন্যে অপেক্ষা করছে। মাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, আল্লাহপাক আমাকে ইবলিশের হাত থেকে বাঁচাও।

জুলেখা ঘরের ভেতর থেকে উঠানে এসে দাঁড়াল। তার সমস্ত শরীর বোরকায় ঢাকা। চিকের পর্দার আড়ালে চোখ। অন্ধকারের কারণে সেই চোখও দেখা যাচ্ছে না। জুলেখা বলল, তখন আপনি আমারে কবুল বলতে বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম। আপনার হাত ধরে তিনবার বলেছি- কবুল, কবুল, কবুল।

মাওলানা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, তুমি বলেছিলে, আমি বলি নাই।

আপনি বলেছিলেন। ইয়াদ করে দেখেন।

আমার ইয়াদ নাই।

আমি আপনারে ফেলে চলে যেতাম না। আমি ভেবেছিলাম আপনার মৃত্যু হয়েছে। চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো পথ ছিল না।

মাওলানা বললেন, এইটাই কি তোমার জরুরি কথা?

জুলেখা বলল, এইটা কোনো জরুরি কথা না। রোগের যন্ত্রণায় আপনি কী করেছেন না করেছেন সেটা কিছু না। আমার কথাবার্তা শুনে আপনি বড়ই অস্থির হয়েছেন। মন শান্ত করেন। মন শান্ত করার জন্য তিনবার তালাক বলে দেন। আমাদের ধর্মে বিবাহ যেমন সোজা তালাকও তেমন সোজা।

ধর্ম নিয়া কথা বলব না।

গোস্তাকি হয়েছে। আর বলব না।

জরুরি কথাটা বলো।

আমার কাছে একটা কাগজ আছে। দানপত্র। জীবনলাল নামের এক লোক পাঠায়েছে। সেখানে আপনার দস্তখত আছে।

মাওলানা দ্বিতীয়বার চমকালেন।

জুলেখা বলল, ধনু শেখ এতবড় অন্যায় করেছে, আপনি সব জেনেও কিছু বলেন নাই।

মাওলানা বিড় বিড় করে বললেন, আমি ছোট মানুষ।

জুলেখা বলল, আপনি আল্লাওলা মানুষ। আল্লাওলা মানুষ জানে মানুষের মধ্যে বড় ছোট নাই। সবাই সমান। আপনি জানেন না?

মাওলানা চুপ করে রইলেন। জুলেখা বলল, কাগজটা কি আপনার কাছে রেখে যাব?

মাওলানা বললেন, না। তুমি চলে যাও।

জুলেখা বলল, এক কথায় চলে যাব? আমি আপনার স্ত্রী। ভাব ভালোবাসার দুইটা কথা বলেন। শুইন্যা যাই।

তুমি চলে যাও।

জুলেখা বলল, আপনার কাছে একটা প্রস্তাব আছে। দোষ না নিলে প্রস্তাবটা দিব। দোষ ধরলেও দিব।

কী প্ৰস্তাব?

চলেন অনেক দূরের কোনো দেশে চইল্যা যাই। যেখানে আপনারে কেউ চিনে না। আমারেও না।

তুমি অতি পাপিষ্ঠ।

জুলেখা হাসতে হাসতে বলল, আপনার মতো এত বড় মাওলানা যার স্বামী তার চিন্তা কী? সে তওবা করায়া আমারে পবিত্র করব।

স্বামী নাম আর কোনোদিন মুখে আনবা না।

আচ্ছা আনব না।

এখন বিদায় হও। তোমার সাথে কথা বলাও পাপ।

জুলেখা বলল, অনেক পুণ্য তো সারাজীবন করেছেন। কিছু পাপ করলেন। এই বিষয়ে আমার ব্যাপজানের একটা গান আছে। শুনবেন?

চুপ বললাম। চুপ।

জুলেখা নিচু গলায় গান ধরল—

ভালো চিনতে মন্দ লাগে
মন্দ চিনতে ভালো।
শাদা কেউ চিনে না বান্ধব
না থাকিলে কালো।

মাওলানা উঁচু গলায় বললেন, বিদায় হও। বিদায়।

জুলেখা হাঁটা শুরু করল। মাওলানা তাকিয়ে আছেন। কালো বোরকার কারণে জুলেখা মুহুর্তের মধ্যেই অন্ধকারে ঢেকে গেল। মাওলানা অনেক রাত পর্যন্ত উঠানে বসে আল্লাহর নাম জপলেন। কিছুক্ষণ পর পর হাত উঠিয়ে মোনাজাত করলেন, হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে একটা ইশারা দাও। বলে দাও আমি কী করব।

মাওলানার শরীর দিয়ে ঘােম পড়ছে। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন পায়ের থপথপ শব্দ। তাকে ঘিরে কে যেন হাঁটছে। নাকে কটু গন্ধ আসছে। পশুদের গা থেকে যেমন গন্ধ আসে তেমন গন্ধ। আকাশে মেঘ করেছিল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলি গরম। এরকম তো কখনো হয় না।

 

খান সাহেব ধনু শেখ শাল্লার জমিদার বাড়িতে এসেছেন। খান সাহেব হবার পর এটা তার প্রথম আসা। আয়োজন করে আসা উচিত। তা-না, তিনি একা এসেছেন, খালি পায়ে এসেছেন। তাঁর দুই পাভর্তি ধূলা। পায়ের ধূলা ধুয়ে ফেলার জন্যে তাকে রূপার বদনা ভর্তি করে পানি দেয়া হয়েছে। একজন খানসামা তাঁর পায়ে পানি ঢালছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছেন নেয়ামত হোসেন। তার চোখ তীক্ষ্ম। মুখ গভীর। নেয়ামত হোসেন বললেন, খান সাহেব মানুষ খালি পায়ে পথ চলে, এটা কেমন কথা?

ধনু শেখ বললেন, ঠিক করেছি। হাতি খরিদ না করা পর্যন্ত খালি পায়ে হাটব। এইটা আমার একটা জিদ।

খারাপ না। পুরুষমানুষের জিদ থাকা ভালো। আমার কাছে কী জন্যে এসেছেন?

ধনু শেখ মনে মনে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষটা আপনি’ বলা শুরু করেছে। ধনু শেখ বললেন, আপনি কয়েকবার খবর পাঠিয়েছেন দেখা করার জন্য। নানান কাজকর্মে থাকি, সময় করতে পারি নাই। আজ আমি অবসর। ভাবলাম যাই। গফসফ করে আসি। আপনার মতো বিশিষ্ট মানুষ থাকতে আমার গফের মানুষ নাই। এটা আফসোসের বিষয়।

নেয়ামত হোসেন ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আপনি অবসর এই জন্যে এসেছেন এটা বিশ্বাস করা যায় না। কারণ ছাড়া আপনি আসেন নাই। কারণটা বলেন।

সদর খাজনার সময় হয়েছে। টাকার জোগাড় কি হয়েছে?

নেয়ামত হোসেন বললেন, খাজনার টাকা আছে। যদিও কয়েকবার আমার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতরা কিছু নিতে পারে নাই— এই খবর আপনার জানার কথা।

ধনু শেখ বললেন, আমি কী করে জানিব? আমি তো ডাকাতের দলে ছিলাম না। না-কি আপনার ধারণা আমিও ছিলাম?

নেয়ামত কিছু বললেন না। ধনু শেখের এ বাড়িতে আসার উদ্দেশ্য এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না। খারাপ কোনো মতলব আছে। এটা বোঝা যাচ্ছে।

ধনু শেখ বললেন, জমিদার সাব। আপনাকে অত্যধিক চিন্তাযুক্ত মনে হইতেছে। আমি কী কারণে আসছি। বুঝতে পারতেছেন না বইলা চিন্তিত। আমি আসছি আপনাৱে সাবধান করতে।

আমাকে সাবধান করতে এসেছেন?

ধরেন সদর খাজনা নিয়া আপনার ম্যানেজার রওনা হইল। পথে পড়ল ডাকাতের হাতে। বিপদ না? খাজনা দিতে পারলেন না। জমিদারি উঠল। নিলামে। শশাংক পালের ঘটনা।

নেয়ামত হোসেনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি ‘তুমিতে ফিরে গেলেন। কঠিন গলায় বললেন, তুমি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছ? ডাকাতির ভয়?

ধনু শেখ বললেন, আপনি ব্যবস্থা ভালো নিয়েছেন। এমন এক পথে খাজনা যাবে যে পথে কেউ যায় না। খাজনা যাবে ঘোড়ার পিঠে। মিশাখালির বাজারের পথে। ঠিক বলেছি না? আপনার নিজের লোকই যদি সব বলে দেয়। তখন তো ভয় আপনাতেই আসে। তার উপরে দেশ ভর্তি হয়েছে স্বরাজের বোমাবাজাদের দিয়ে। টাকা লুটপাটে এরা ওস্তাদ। এরা পরিচয় দেয় স্বদেশী, বিপ্লবী। আসলে ডাকাত।

নেয়ামত হতভম্ব। সদর খাজনা মিশাখালি বাজার দিয়ে ঘোড়ার পিঠে যাবে। এটা সত্য। এই সত্য বাইরের মানুষের জানার কথা না।

ধনু শেখ উঠে দাঁড়ালেন। চলে যাবার প্রস্তুতি। নেয়ামত হোসেন বললেন, একটু বসেন।

জরুরি কাজ ছিল। একটু আগে বলেছেন। আজ আপনি অবসর। গফসফ করতে এসেছেন। ও আচ্ছা, আসলেই তো আজ কোনো কাজকর্ম নাই। দুপুরে আমার সঙ্গে খানা খান। ধনু শেখ বললেন, মন্দ না। আপনার বাবুর্চির সুনাম শুনেছি। তার হাতের রান্ধন চাখবার সৌভাগ্য হয় নাই। আমি বিরাট ভাগ্যবান।

নেয়ামত বললেন, আপনার সঙ্গে আমি কোনো বিবাদে যেতে চাই না। আপোস করতে চাই। আপনি বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়েছেন। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরে দেখবে এই নিয়ম। আপনি আমার স্বাৰ্থ দেখবেন, আমি আপনার স্বাৰ্থ দেখব।

ধনু শেখ বললেন, অবশ্যই। খাঁটি কথা বলেছেন। এই কথার দাম লাখ টাকার উপরে।

নেয়ামত বললেন, মাঝে মাঝে আমরা দুই ভাই মজলিশে বসব। গানবাজনা হবে। লখনৌ-এর এক বাইজি আমার এখানে আছে। শুনেছেন বোধহয়।

শুনেছি।

তার ঘাঘড়া নৃত্য দেখার মতো জিনিস। আজ রাতেই নাচের ব্যবস্থা করব, যদি মেয়েটার শরীর ভালো থাকে।

ধনু শেখ বললেন, আপনার বিরাট মেহেরবানি।

নিয়ামত বললেন, আমার খাজনা নিয়ে যখন যাবে তখন তাদের সাথে আপনার কয়েকজন বিশ্বাসী লোক দিয়ে দিবেন।

অবশ্যই।

নেয়ামত বললেন, এক কাজ করুন, রাত পর্যন্ত থাকেন। রাতে ভালো আয়োজন করি। সামান্য গানবাজনার আয়োজনও থাকল।

মন্দ না।

ধনু শেখ গিয়েছিলেন খালি পায়ে, ফিরলেন হাতিতে চড়ে। নেয়ামত হোসেন বন্ধুকে হাতিতে করে ফেরত পাঠালেন।

এত করেও শেষরক্ষা হলো না। নেয়ামত হোসেনের খাজনার দলে ডাকাত পড়ল। বন্দুকের গুলিতে নেয়ামত হোসেনের তহসিলদার এবং এক নায়েব মারা গেল। স্বদেশী ডাকাতদের কাজ। এদের জন্যে টাকা পয়সা নিয়ে বের হওয়াই মুশকিল। পুলিশের এসপি সাহেব স্বয়ং নিজে কয়েকবার এসে তদন্ত করে গেলেন। কোনো হদিস পাওয়া গেল না।

 

ধনু শেখের শরীর ভালো না। জ্বর জ্বর ভাব। সারাদিনই তিনি বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছেন। সন্ধ্যার পর বেদানার সঙ্গ সাপলুড়ু নিয়ে বসেছেন। সাপলুড়ু পুরোপুরি ভাগ্যের খেলা। বেদানার গুটি খাওয়ার পারদর্শীতা সাপলুড়ুতে কাজে লাগে না। তারপরেও এই খেলাতেও সে জেতে। ধনু শেখ ভালোই খেলছিলেন। তার গুটি তরতর করে উঠে যাচ্ছিল। নিরান্নব্বইতে এসে সাপের মুখে পড়ে দুইয়ের ঘরে চলে যেতে হলো। বেদানার মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। দু’জনেরই বড় সুখের সময়।

সুখের সময়ে বাধা পড়ল। সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর এসে খবর দিল, জুম্মাঘরের ইমাম এসেছেন। দেখা করতে চান।

ধনু শেখ বললেন, এখন ব্যস্ত আছি। পরে আসতে বলো। তিন দান লুড়ু খেলা হলো। তিনটিতেই বেদোনা জিতলা। ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, ঐ বান্দি, তোর সাথে পারা মুশকিল।

স্ত্রীর প্রতি অতিরিক্ত মমতা তৈরি হলে ধনু শেখ তাকে ‘বান্দি সম্বোধন করেন এবং তুই তোকারি করেন।

বেদানা বলল, আপনের শরীর কি এখনো খারাপ?

ধনু শেখ বললেন, হঁ। দুই দানা আফিং খাইলে মনে হয় শরীর ঠিক হইত। [সে-সময় আবগারী দোকানে আফিম বিক্রি হতো। যে-কেউ আফিম কিনে খেতে পারত।]

বেদানা বলল, আফিং খান। দুধ জ্বাল দিয়া দিতে বলি, দুধ দিয়া খান।

ধনু শেখ বললেন, শরাব খাইলেও চলে। শরাব শরীর ম্যাজমেজানির আসল ওষুধ।

বেদানা বলল, শরাব খাইতে চাইলে খান। গেলাস দিতে বলি?

বল।

শরাব আর আফিং একসাথে খাইলে কী হয়?

কিছুই হয় না। ‘নিশা’ ভালো হয়।

দুইটা একসাথে খান। আমিও আপনের সাথে খাব।

মেয়েছেলের এইসব খাওয়া ঠিক না।

ঠিক না হইলেও খাব। আপনের গেলাসে একটা চুমুক দিব।

ধনু শেখ দরাজ গলায় বললেন, আচ্ছা যাও দিও।

অতি আনন্দময় এই মুহূর্তে খবর পাওয়া গেল, মাওলানা ইদরিস যায় নি। এখনো বৈঠকখানায় বসে আছে। ধনু শেখের বিরক্তির সীমা রইল না। তিনি মাওলানাকে শোবার ঘরেই ডাকলেন। বেদানাকে কিছু সময়ের জন্যে বাইরে পাঠালেন। বেদোনা পুরোপুরি গেল না। দরজায় কান পেতে রাখল। পুরুষ মানুষদের জটিল কথা শুনতে তার বড় ভালো লাগে। মামলা মোকদ্দমার কথা, ব্যবসার কথা। এদের কথাবাতাঁর ধরনই অন্যরকম।

আসসালামু আলায়কুম।

ওয়ালাইকুম সালাম। মাওলানা, তোমার কী ব্যাপার? [ধনু শেখ আগে মাওলানাকে আপনি করে বলতেন। খান সাহেব হবার পর থেকে তুমি বলছেন।]

আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম। শরীরটা ভালো না। কথা শোনার মতো মনের অবস্থা না। তারপরেও বলো।

হরিচরণ বাবুর বিষয়সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা নিয়া একটা দলিল হয়েছিল, এই বিষয়ে কি আপনি জানেন?

ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বললেন, জানব না কেন? দলিল আমার কাছে। আরেকটা কথা, তুমি হরিচরণ হরিচরণ করতেছ। কোন কামে? তার নাম মোহাম্মদ আহম্মদ।

মাওলানা বললেন, আপনার কাছে যে দলিল আছে তার বিষয়ে বলতেছি না। মূল দলিল।

গাধার মতো কথা বলব না। তুমি মাওলানা, গাধা না।

দলিলটা একজনের কাছে রক্ষিত আছে।

তোমার কথা কি শেষ হয়েছে? কথা শেষ হয়ে থাকলে বিদায় হও। লোকমুখে শুনেছি। তুমি হাফেজ পরীক্ষায় ফেল করেছ। এটা কি সত্য?

জি জনাব।

ফেলটুস মাওলানা দিয়ে তো আমাদের চলবে না। তুমি অন্য কোনোখানে কাজ দেখ। আমি পাশ করা ভালো মাওলানার সন্ধানে আছি। বুঝেছি কি বলেছি?

জি।

এখন বিদায় হও। জুমার নামাজের খুতবা ঠিকমতো পড়তে পার তো? নাকি তোমার পেছনে দাঁড়ায়ে আমরা সবাই গুনাগরি হইতেছি? দাঁড়ায়া থাকবা না, যাও বিদায়।

মাওলানা চলে গেলেন। ধনু শেখ শরাব নিয়ে বসলেন। বেদানার এক চুমুক খাওয়ার কথা, সে কয়েক চুমুক খেয়ে ফেলল। মুখ বিকৃত করে বলল, মজা পাইতেছি না তো।

ধনু শেখ বললেন, ঝিমভাব হয়, এইটাই মজা।

আমার তো ঝিমভাব হইতেছে না। আরো একটা চুমুক দিব?

ধনু শেখ দরাজ গলায় বললেন, দেও।

বেদানা বড় করে চুমুক দিয়ে শাড়ির আঁচলে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল, মূল দলিল কার কাছে খোঁজ নেয়া উচিত না?

ধনু শেখ বিস্মিত হয়ে বললেন, দলিলের বিষয়ে তুমি কি জানো?

আড়াল থাইক্যা শুনছি।

কাজটা ঠিক করা নাই।

আপনেরে এক নিমিষ না দেখলে অস্থির লাগে, এইজন্যে দরজার চিপা দিয়া দেখতে ছিলাম। ভুল হইলে মাফ চাই। এই আপনের পায়ে ধরলাম।

ভুল তো অবশ্যই হয়েছে।

বেদানা বললেন, মূল দলিল উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন।

ধনু শেখ বললেন, মূল দলিল বইল্যা কিছু নাই। আমি যখন হরিচরণের বাড়িতে উপস্থিত হইলাম তখন সে মইরা ‘চেগায়া’ পইড়া আছে। তার দলিল লেখনের সময় কই? আর দলিল কইরা সে কারে বিষয়সম্পত্তি দিবে? তার আছে কে?

বেদানা বলল, আমরার মাওলানা সাব কিন্তু মিথ্যা কথা বলে না।

মিথ্যা বলে না। এইটা ঠিক আছে, তবে ভুলভাল কথা বলে। তার মাথাতে সামান্য দোষও আছে। ঐদিন আমারে বলতেছিল। সে না-কি ইবলিশ শয়তানরে দেখছে। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এইসব মাথা খারাপ লোকের কথা।

বেদান আগ্রহের সঙ্গে বলল, ইবলিশ শয়তান দেখতে কেমন? জিজ্ঞাস করছিলেন?

না।

আমার জানতে ইচ্ছা করতেছে। উনারে খবর পাঠায়া আনাই?

ঝামেলা করব না। আমি ঝামেলা পছন্দ করি না। গ্লাস শেষ হইছে। গ্রাসে জিনিস চাও।

বেদানা গ্লাস ভর্তি করে দিল।

 

পরের বছর নেয়ামত হোসেনের জমিদারি নিলামে উঠল। খান সাহেব ধনু শেখ জমিদারি কিনে নিলেন। জমিদারি কেনা উপলক্ষে তিনি বান্ধবপুরের সবার জন্যে মেহমানির আয়োজন করলেন। হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ নাই, সবাই খাবে। হিন্দুদের পাক ব্ৰাহ্মণ বাবুর্চি করবে। তাদের পাক এক জায়গায়, মুসলমানদের পাক আরেক জায়গায়। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা খাওয়ার শেষে এক টাকা করে পাবেন। মুসলমানদের ক্ষেত্রে শুধু সৈয়দ বংশীয়দের জন্যে এই ব্যবস্থা। খাওয়াদাওয়ার শেষে সারারাত যাত্ৰা পালা। পালার নাম ‘রাজা হরিশচন্দ্ৰ’। মেয়েরাও যেন যাত্রা দেখতে পারে সে ব্যবস্থা হয়েছে। চিক দিয়ে ঢেকে একটা অংশ আলাদা করা হয়েছে।

খান সাহেব ধনু শেখ রাত জেগে যাত্রা দেখলেন। রাজা হরিশচন্দ্রের দুঃখে বারবার তার চোখ পানিতে ভর্তি হয়ে গেল।

ইদুল ফিতরের নামাজ শেষ হয়েছে

ইদুল ফিতরের নামাজ শেষ হয়েছে। কোলাকুলিপর্ব শুরু হবার আগে আগে মাওলানা ইদরিস বললেন, সুলেমান আপনাদের কিছু বলবে।

কাঠমিস্ত্রি সুলেমান মাওলানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার মুখ বিষণ্ণ। চোখে হতাশা ও লজ্জা। সে কারো দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে যে কথা বলল তার অর্থ— সে অনেকের কাছে দেনাগ্ৰস্ত। দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেবার পর দেনমোহরানার টাকা দিতে হওয়ায় বসতবাড়ি এবং সামান্য যে জমি ছিল বিক্রি করতে হয়েছে। উপায় না দেখে আজ থেকে সে নিজেকে ভিক্ষুক ঘোষণা করেছে। কাঠের কাজ সে আজ থেকে করবে না। বাকি জীবন ভিক্ষা করে কাটাবে। ভিক্ষার সুবিধার জন্যে সে একটা ঘোড়া কিনেছে। সে সবার দয়া এবং করুণা চায়।

ঘোষণা করে ভিক্ষুক হবার প্রচলন তখন ছিল। পাওনাদারদের হাত থেকে চিরমুক্তির একটাই পথ।

ঈদের দিন থেকেই সুলেমান ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষাবৃত্তির নতুন জীবন শুরু করল। ঘোড়ার পিঠে দুটা বস্তা বাধা। একটা চালের জন্যে, একটা ধানের জন্যে। ঘোড়া নিয়ে সে একেক বাড়ির সামনে দাঁড়াচ্ছে। ক্ষীণ গলায় বলছে‘ভিক্ষুক বিদায় করেন গো।’ ঘোড়ার গলায় ঘণ্টা বঁধা। মাথা নাড়লে ঘণ্টাও বেজে উঠছে। ভিক্ষুকের ঘোড়ার ঘণ্টাধ্বনিও গিরস্তজনের চেনা। কেউ চাল আনে, কেউ ধান। ঘোড়ায় চড়া ভিক্ষুকের সামাজিক অবস্থান খারাপ না। এরা ভিক্ষা পায়।

খান সাহেব ধনু শেখ দয়াপরবশ হয়ে সুলেমানকে থাকতে দিয়েছেন। তার স্থান হয়েছে হরিচরণের পুরনো বাড়িতে। শশাংক পালও সেখানেই থাকেন। তিনি এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। সারাদিন উঠানে পড়ে থাকেন, সন্ধ্যার পর তাকে ধরাধরি করে ঘরের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। ঘরে নিয়ে যাওয়া, পানি খাওয়ানো, এই কাজগুলি করে সুলেমান। কাজেই সুলেমানের সঙ্গে তাঁর একধরনের সখ্য হয়েছে। প্রায়ই দেখা যায় শশাংক পাল আগ্রহ নিয়ে গল্প করছেন সুলেমানের সঙ্গে। গল্পের ধরাবাঁধা কোনো বিষয়বস্তু নেই। একেকদিন একেকরকম। শশাংক পাল পছন্দ করেন। পুরনো দিনের শানশওকতের গল্প করতে। সুলেমানের পছন্দ তার বর্তমান জীবনের গল্প। ভিক্ষুক-জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প সে আনন্দের সঙ্গে করে। সে তার ঘোড়ার বুদ্ধিমত্তাতে মুগ্ধ। ইশারা ছাড়াই ঘোড়া যে সব বাড়িতে দাঁড়াচ্ছে এবং গলায় ঘণ্টা নেড়ে উপস্থিতি জানান দিচ্ছে এই গল্প বারবার করেও তার মন ভরে না। ভিক্ষা বিষয়ক গল্প তো আছেই।

বুঝলেন কর্তা, এক বাড়িতে গেলাম। ঘণ্টা বাজাইলাম। ভিতর থাইকা বলল, আইজ না। আইজ বুধবার।

আমি বললাম, বুধবারে বিষয় কী?

বুধবারে ভিক্ষা দেই না।

দেন না কেন?

বড়কর্তার নিষেধ।

কোনদিন নিষেধ নাই বলেন, সেই দিন আসব।

মঙ্গলবার।

গেলাম মঙ্গলবার। তখন কী হইছে শুনেন কর্তা। ভিতর থাইকা বলল, আইজ মঙ্গলবার। মঙ্গলবারে আমরা ভিক্ষা দেই না। সোমবারে আসেন।

শশাংক পাল উত্তেজিত গলায় বললেন, বিরাট বজাত তো!

সুলেমান উদাস গলায় বলে, ভিক্ষুকের সঙ্গে মিছা কথা। এখন চিন্তা করেন। সমাজ কই গেছে!

সমাজ রসাতলে গেছে।

দুজনেই সমাজের সাম্প্রতিক রসাতলে প্রবেশে দুঃখিত বোধ করে। তাদের ভেতর এক বিচিত্র সহমর্মিতা দেখা যায়। মাঝে মাঝে গভীর রাতেও তাদের গল্পের আসর বসে। আসরের কথক শশাংক পাল। শুরু হয় তার যৌবনের গল্প—

রায়নার ছোটবাবুর সঙ্গে একবার এক মুজরায় গিয়েছিলাম। রায়নার ছোটবাবু বিরাট জমিদার, সেই তুলনায় আমি নস্যি। মুজরার বাইজির নাম কুন্দন বাই। আহারে, গায়ের কী রঙ, যেন তুষের আগুন! আর কণ্ঠ? মধু! গানাবাজনা চলছে, আমার মন খারাপ। কিছুতেই মজা পাচ্ছি না।

কেন?

কুন্দন বাই আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তার হাসি-তামাশা সবই রায়নার ছোটবাবুর সাথে। তাঁকে নিজের হাতে পান বানিয়ে দিচ্ছে। ফরাসীর নল এগিয়ে দিচ্ছে। আমি কেউ না। আমি ছোটবাবুর গোমস্তা।

সুলেমান বলল, আপনার উচিত ছিল উইঠা চাইলা আসা।

শশাংক পাল তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, শোন না ঘটনা। রাত একটার দিকে গানবাজনা কিছু সময়ের জন্যে থামল। রায়নার ছোটবাবু কুন্দন বাইকে একটা আশরাফি নজরানা দিলেন। কুন্দন বাই সালামের পর সালাম দিচ্ছে। আশরাফি পেয়ে তার দিলখোশ। তখন আমি নজরানা দিলাম।

কী দিলেন?

আমি দিলাম। তিনটা আশরাফি।

বলেন কী?

তখন টাকা ছিল, খরচ করেছি। পরে কী হবে চিন্তা করি নাই। তারপরের ঘটনা শোন— রায়নার ছোটবাবুর মুখ হয়ে গেল ছাইবৰ্ণ। তার জন্যে বিরাট অপমান। কুন্দন বাই-এর চোখে পলক পড়ে না। আমাকে বলল, বাবুজি আপকা তারিফ?

তারিফ মানে কী?

তারিফ মানে নাম। আমার নাম জানতে চাইল। নাম বললাম। পরের ঘটনা না বলাই ভালো। রাতে থেকে গেলাম। মধু মধু।

উনি বিরাট শিক্ষার মধ্যে পড়লেন। জন্মের শিক্ষা। জুরিগাড়ি নিয়া চলে গেলেন।

সুলেমান বলল, উচিত শিক্ষা হয়েছে। পাছায় লাখি খাইছে।

শশাংক পাল বললেন, জীবন নিয়া আমার কোনো আফসোস নাই, বুঝেছি। সুলেমান। মধুদিন কাটিয়েছি। এখন সামান্য বেকায়দায় আছি, তবে বেকায়দা যে-কোনো সময় কাটতে পারে। সুতা ভগবানের হাতে। উনি সুতা কীভাবে টান দিবেন। কে জানে। উনার সুতার এক টানে দেবী লক্ষ্মী এসে আমার পাশে বসতে পারেন। পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

দেবী লক্ষ্মীর গল্প শুনবা?

শুনব।

লক্ষ্মী এবং তার স্বামী নারায়ণ বৈকুণ্ঠে বসে রসালাপ করছিলেন। এমন সময় তাদের সামনে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। সূর্যপুত্র রোবন্ত। লক্ষ্মী তাঁর ঘোড়ার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন। সেই ঘোড়া তো আর তোমার ঘোড়ার মতো মরা ঘোড়া না। স্বর্গের ঘোড়া, নাম উচ্চশ্ৰবা। যাই হোক, নারায়ণ বললেন, লক্ষ্মী, তুমি চোখ বড় বড় করে কী দেখ? লক্ষ্মী ঘোড়া দেখে এতই মাজেছেন যে উত্তর দিলেন না। নারায়ণের উঠল রাগ। উনি বললেন, ঘোড়া দেখে তুমি মজেছ, তোমাকে অভিশাপ দিলাম। তুমি পৃথিবীতে ঘোড়ী হয়ে জন্মাবে। ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গম করবে এবং তোমার একটা ঘোড়াপুত্র হবে।

সুলেমান বলল, সর্বনাশ!

শশাংক পাল বললেন, দেবদেবীদের কাছে এইসব কোনো ব্যাপার না। তারা অভিশাপ দেওয়ার মধ্যেই থাকেন।

লক্ষ্মী কি ঘোড়া হয়ে জন্মেছিলেন?

অবশ্যই। তাঁর একটা ঘোড়াপুত্ৰও হয়েছিল। বিষ্ণুর আশীর্বাদে তার শাপমুক্তি ঘটে। ঘোড়াপুত্র মানুষ হয়। একবীর নামে সে দীর্ঘদিন পৃথিবী শাসন করে। নতুন এক বংশ স্থাপন করে। বংশের নাম ‘হৈহয়’ বংশ।

আজিব ব্যাপার।

দেবতাদের কাছে আজিব কোনো ব্যাপার নাই। তারা যদি ঘোড়া থেকে মানুষ বানাতে পারেন তাহলে আমাকে দুর্দশা থেকে কেন উদ্ধার করতে পারবেন না?

সুলেমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, অবশ্যই পারবেন।

নিশিরাতে শশাংক পালের সঙ্গে গল্প করতে সুলেমানের ভালো লাগে। জীবন আনন্দময় মনে হয়।

ভিক্ষুক জীবন যে এত সুখের হবে তা সুলেমানের কল্পনাতেও ছিল না। অল্পদিনেই ঘোড়ার পিঠে ঘুমিয়ে পড়ার দুর্লভ বিদ্যাও সে আয়ত্ত করেছে। ঘণ্টা বাজিয়ে হালকা চালে ঘোড়া চলে, সুলেমান লাগাম ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে শোনে— টুনটুনি টুনটুন। শান্তির আনন্দযাত্রা।

 

সুলেমান যতটুকু আনন্দে আছে ঠিক ততটাই কষ্টে আছেন মাওলানা ইদরিস। তিনি কষ্টে আছেন দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃস্বপ্নটা তিনি এই নিয়ে তিনবার দেখেছেন। একই স্বপ্ন- ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা। স্বপ্নে হরিচরণ এসে তাকে ডাকেন। মাওলানা আছ? মাওলানা! মাওলানা ব্যস্ত হয়ে বের হন। তখন হরিচরণ বলেন, কাজটা কি ঠিক করেছ মাওলানা? আমি মুসলমান হই নাই। তুমি জানাযা পড়িয়ে আমাকে কবর দিয়ে দিলে। আমাকে দাহ করা উচিত ছিল না?

প্রতিবারই মাওলানা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, ধনু শেখ যেটা বলেছেন। আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি। আমি ভেবেছি মৃত্যুর আগে আপনি মুসলমান হয়েছেন।

হরিচরণ বলেন, উঁহু! তুমি বিশ্বাস কর নাই। তুমি আমার লেখা দানপত্রে দস্তখত করেছ। তুমি বিশ্বাস করবে। কেন? তুমি কাজটা করেছ ভয়ে। আমাকে মাটিচাপা দিয়েছ।

এখন কী করব সেটা বলে দেন।

আমার লাশটা কবর থেকে তোল। তারপর দাহ করার ব্যবস্থা কর। মুখাগ্নি তুমিই করবে।

আমি কী করে মুখাগ্নি করব? আমি মাওলানা মানুষ!

জহিরকে খবর দাও। সে আমার পুত্ৰসম। পুত্ৰই মুখাগ্নি করে।

তাকে কই পাব বলেন! সে নিরুদ্দেশ হয়েছে। কেউ তার খোঁজ জানে না।

খোঁজ বের কর। বেশি দেরি করলে মহাবিপদে পড়বা।

কী বিপদ? আমি নিজেই কবর থেকে বের হয়ে পড়ব। তখন বিরাট বিশৃঙ্খলা হবে।

কী বিশৃঙ্খলা?

বের হই, তারপর দেখা কী বিশৃঙ্খলা।

এই পর্যায়ে আতঙ্কে মাওলানার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জেগে উঠে দেখেন তার বুক ধড়ফড় করছে। সারা শরীর ঘামে ভেজা। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম।

স্বপ্লের বিষয়ে তিনি খান সাহেব ধনু শেখের সঙ্গে আলাপ করলেন। ধনু শেখ অতি বিশিষ্ট ব্যক্তি। লোকজন সবসময় তাকে ঘিরে রাখে। সরাসরি তিনি এখন কারো সঙ্গে কথাও বলেন না। আগে তাঁর মুনসির সঙ্গে কথা বলতে হয়। মুনসির অনুমতি পেলে তবেই খান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত।

খান সাহেব মাওলানার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেন। মন দিয়ে স্বপ্ন শুনলেন। তারপর দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, স্বপ্ন নিয়া তুমি চিন্তিত? (খান সাহেব কিছুদিন হলো দাড়ি রেখেছেন। দাড়িতে চেহারার ক্রটি অনেকটাই ঢাকা পড়েছে।)

জি জনাব।

ভালো জিনিস নিয়া চিন্তা করা শিখো। স্বপ্ন কি কোনো বিষয়?

স্বপ্নটা কয়েকবার দেখলাম। এই কারণে মন অস্থির।

মাত্র কয়েকবার? একটা স্বপ্ন আমি এই নিয়া একশ’বার দেখেছি। স্বপ্নে আমি গেছি ছোটলাট সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে। খান বাহাদুর টাইটেল দেয়া হবে। আমার খান বাহাদুর টাইটেল পাওয়ার কথা। সেখানে আরো অনেক বিশিষ্টজনরা আছেন। অতি মনোহর তাদের পোশাক। একমাত্র আমার শরীরে কোনো কাপড়-চোপড় নাই। পুরা নেংটা। একটা সুতাও নাই। ছোটলাট এই অবস্থাতেই আমার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তুমি বলো, খারাপ স্বপ্ন না?

জি।

এই স্বপ্ন আমি একশ’বার দেখেছি, তাতে কী হয়েছে? নাকি তুমি ভাবতেছ। হরিচরণ মৃত্যুর আগে কলেমা তৈয়ব বলে মুসলমান হয় নাই? আমি সবেরে মিথ্যা বানিয়ে বলেছি। একজন হিন্দুরে মুসলমান পরিচয় দিয়া কবর দেওয়ার মধ্যে আমার কোনো ফয়দা আছে? চুপ করে থাকবা না। বিলো ফয়দা আছে?

জি-না। স্বপ্নের তফসির জানলে মনের অস্থিরতা কমত। আল্লাহপাক স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের অনেক কিছু জানান দেন।

খান সাহেব বললেন, তফসির জানতে চাইলে জানো। বিশিষ্ট আলেমদের কাছে যাও। রাহাখরচ যদি চাও আমার দিতে আপত্তি নাই। মুনসির কাছে দস্তখত দিয়া কুড়ি টাকা রাহাখিরচ নেও।

মাওলানা বললেন, আপনার মেহেরবানি। আমি যেন খান বাহাদুর টাইটেল পাই এই জন্যে দোয়াখায়ের সর্বক্ষণ করবা। অঞ্চলে একজন খান বাহাদুর থাকলে সবের লাভ। এতে অঞ্চলের ইজ্জত বাড়ে। বুঝেছ?

জি।

তোমার বৃত্তি এই মাস থেকে পাঁচ টাকা বাড়াইলাম। আমি দরাজ হাতের লোক। সাল্লার নেয়ামত হোসেনের মতো কিরপিন’ না। নেয়ামত হোসেন কী করেছে শুনেছে?

জি না।

লখনৌ-এর যে বাইজি নিয়া আসছিল তারে ফালায়া থুইয়া ভাগছে। সেই মেয়েরে যেসব গয়না দিয়েছিল তাও শুনছি। নিয়া গেছে। মেয়ের না আছে টাকা পয়সা, না আছে কিছু। খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থাও করে নাই। বাধ্য হয়ে আমি ব্যবস্থা নিয়েছি।

ভালো করেছেন।

খান সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন, কেউ বিপদে পড়লে তার জন্যে কিছু না করা পর্যন্ত অস্থির থাকি। এইটাই আমার সমস্যা।

লখনৌ-এর বাইজি পিয়ারীকে খান সাহেব ময়মনসিংহে ঘর ভাড়া করে। রেখেছেন। পিয়ারীর সঙ্গে আছে তবলচি এবং সারেঙ্গিবাদক। তাদের রান্নাবান্নার জন্যে একজন বাবুর্চি আছে। দেখাশোনার জন্যে দারোয়ান আছে।

খান সাহেবকে কাজেকর্মে প্রায়ই ময়মনসিংহ যেতে হয়। তিনি পিয়ারীর ভাড়া বাড়িতে উঠেন। অনেক রাত পর্যন্ত গানবাজনা হয়। পিয়ারীর সঙ্গ তাঁর বড় মধুর মনে হয়। রাতে সুনিদ্রা হয়। মাঝে মাঝে লাটসাহেবকে দেখা স্বপ্নটা তাকে বিরক্ত করে।

 

দেওবন্দের আলেমরা মাওলানা ইদরিসের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। তবে দেওবন্দ যাওয়ায় মাওলানার একটা লাভ হলো, তিনি ‘হাফেজ’ টাইটেল পেয়ে গেলেন। নির্ভুল কোরান পাঠ করলেন। তাঁর ইচ্ছা করল তিনি দেওবন্দে থেকে যাবেন। আলেমদের সঙ্গে ধর্মালোচনা করে জীবন কেটে যাবে। বান্ধবপুরে ফিরে যাওয়া মানেই স্বপ্নে হরিচরণের সঙ্গে সাক্ষাত। এছাড়া রঙিলাবাড়ির বিষয়ও আছে। রঙিলাবাড়ির বিষয় তিনি চিন্তাও করতে চান না। তারপরেও হঠাৎ হঠাৎ চিন্তাটা আসে, তখন বড়ই অস্থির লাগে। শান্তির জীবন আল্লাহপাক তাকে দেন নাই। আল্লাহপাক দিয়েছেন ধারাবাহিক দুঃশ্চিন্তার জীবন।

হাফেজ মাওলানা ইদরিস বান্ধবপুরে ফিরেছেন। এখন আর কেউ তাঁকে মাওলানা ডাকছে না। সবই বলছে হাফেজ সাব’। সম্বোধনই বলে দিচ্ছে এই লোক কোরান মজিদ কণ্ঠস্থ করেছেন। ইনি সহজ কেউ না। শুনতে আনন্দ লাগছে। আনন্দের সঙ্গে গভীর শঙ্কাও জড়িত। মাওলানা জানেন। ইবলিশ শয়তান এখন সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকবে। তাঁকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করবে। একজন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেয়ে কোরানে হাফেজকে বিভ্ৰান্ত করায় অনেক লাভ। ইবলিশ প্ৰাণপণে চেষ্টা করে যাবে তাকে দিয়ে মিথ্যা বলাতে। পাপ চিন্তা করাতে। পাপ কাজে যেমন গুনাহ, পাপ চিন্তাতেও একইরকম গুনাহ।

ইবলিশ যে এই বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রসরও হয়েছে সেটাও তিনি বুঝতে পারছেন। কয়েকদিন আগে এশার নামাজ শেষ করে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো বাড়িতে ঢুকেই দেখবেন জুলেখা উঠানে বসে আছে। (চিন্তাটা অবশ্যই ইবলিশ শয়তান তাঁর মাথায় ঢুকিয়েছে। তিনি নিজে কখনো এ ধরনের নাপাকি চিন্তা করবেন না। আস্তাগাফিরুল্লাহ।)

চিন্তাটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে দূর করে দেয়া প্রয়োজন, তা না করে তিনি চিন্তাকে প্রশ্ৰয় দিলেন (আবারো ইবলিশের কাজ)। তিনি কল্পনা করেই যেতে লাগলেন। কী ঘটছে তিনি চোখের সামনে দেখতেও পাচ্ছেন- এই তিনি উঠানে পা দিলেন। জুলেখা জলচৌকিতে বসেছিল। পরনে শাড়ি। মাথায় ঘোমটা নেই। মাথাভর্তি চুল। তাঁকে দেখে লজ্জা পেয়ে জুলেখা উঠে দাঁড়াল।

তিনি বললেন, এখানে কী চাও? তোমাকে না বলেছি। এ বাড়িতে আসবে না? আবার কেন আসছ?

আপনাকে দেখার জন্যে আসছি।

কেন?

আমি যত মন্দই হই, আপনি আমার স্বামী।

এরকম নাপাকি কথা বলব না।

আমি নাপাক, কিন্তু আপনি আমার স্বামী— এর মধ্যে নাপাকি। কী? আমি তাওবা করব। তওবা করে আপনার সঙ্গে সংসার করব।

চুপ।

ধমক দিয়েন না। অজুর পানি দেন। আমি অজু করে তওবা করব। বাকি জীবন বোরকা পরে থাকব। কেউ জানবে না। আমি কে!

এইখানে থাকলেই জানাজানি হবে।

তাইলে চলেন নাও নিয়া দূরে চইলা যাই। ভাটি অঞ্চলে যাইবেন? ভাটির শেষ সীমায়?

চুপ করব?

না, চুপ করব না।

উঠানে পা দিয়ে মাওলানার চিন্তা বন্ধ হলো। উঠানে কেউ নেই। জলচৌকি শূন্য। তাঁর মনটা খারাপ হলো। সব শয়তানের খেলা। মাওলানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। রাতে গোসল করে পবিত্র হলেন। শয়তানের হাত থেকে বাঁচার জন্যে তিনবার সূরা ইয়াসিন পাঠ করলেন। মন পবিত্র করার জন্যে এরচে’ ভালো সূরা নাই।

তার মন ততটা পবিত্র হলো না। রাতে খেতে বসার সময় মনে হলো— জুলেখাকে ভাত খাইয়ে দেয়া উচিত ছিল। না খাইয়ে তাকে বিদায় করেছেন, কাজটা ঠিক হয় নাই। আজকে আয়োজনও ভালো ছিল। কাঠালের বিচি দিয়ে মুরগির সালুন। হাফেজ সাহেবের জন্যে রান্না করে কেউ একজন পাঠিয়েছে। আজ ডালটাও ভালো হয়েছে। আমচুর দিয়ে টক ডাল, এর স্বাদই অন্যরকম। মেয়েরা টিক পছন্দ করে।

মাওলানার একবারও মনে হলো না— জুলেখা এ বাড়িতে আসে নি। পুরোটাই তাঁর কল্পনা। কিংবা তার ভাষায়— শয়তানের জটিল খেলা। মাওলানার মস্তিষ্ক বিকৃতির সেটাই শুরু।

ফজরের নামাজ পড়ার জন্যে ঘুম ভাঙতেই মাওলানা শুনলেন পাশের ঘর থেকে জুলেখা মধুর স্বরে কোরান আবৃত্তি করছে। তিনি বললেন, জুলেখা, নিচু গলায় পড়। পরপুরুষ তোমার কণ্ঠস্বর শুনবে, এইটা ঠিক না।

জুলেখা বলল, জঙ্গলার মধ্যে বাড়ি। আপনি ছাড়া এইখানে তো কেউ নাই।

মাওলানা বললেন, এইটাও যুক্তির কথা। তারপরেও নিচু গলায় পড়া ভালো। ধর, জঙ্গলে কেউ লাকড়ির সন্ধানে যদি আসে। কিংবা হারানো গরু, যদি খুঁজতে খুঁজতে আসে।

জুলেখা মনে হয় যুক্তি মেনেছে। এখন তার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ।

 

রঙিলাবাড়ির ঘাটে মাঝারি আকৃতির বজরা এসে থেমেছে। বজরায় আছেন মোহনগঞ্জের বাম গ্রামের শৈলজারঞ্জন মজুমদার। রসায়নশাস্ত্ৰে M.Sc করা দারুণ পড়ুয়া মানুষ। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ডাক পেয়েছেন। শান্তিনিকেতনের বিজ্ঞান ভবনে যোগ দেবার চিঠি। মানুষটা গানপাগল। চান বিবি নামের অতি সুকণ্ঠী গায়িকার খবর পেয়ে এসেছেন। রঙিলাবাড়িতে উপস্থিত হতে তার রুচিতে বাঁধছে। তিনি চান বিবিকে খবর পাঠিয়েছেন। যদি সে বজরায় এসে কয়েকটা গান শোনায়। অপ্রচলিত গান সংগ্রহেও তার ঝোক আছে। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় (শ্রাবণ মাস এবং ভদ্র মাস) নৌকায় ঘুরে ঘুরে গান সংগ্রহের বাতিকও তাঁর আছে। তিনি শুধু যে গান লিখে রাখেন তা না, গানের সুরও আকার মাত্রিক স্বরলিপিতে লিখে ফেলেন। স্বরলিপি লেখার বিষয়ে তার দক্ষতা আছে।

চান বিবি সন্ধ্যাবেলায় বজরায় উপস্থিত হলো। তার সঙ্গে দুজন দাসি। একজনের হাতে কার্পেটের আসন। অন্যজনের হাতে রূপার পানদানিতে সাজানো পান। চান বিবি কর্পেটের আসনে বসতে বসতে বলল, কী গান শুনবেন গো?

শৈলজারঞ্জন মজুমদার বললেন, তুমি তোমার পছন্দের গান কর।

চান বিবি বলল, আমার পছন্দের গান আমি করি আমার জন্য। আপনের জন্য কোন করব?

শৈলজারঞ্জন বললেন, সেটাও তো কথা। তোমার যে গান গাইতে ইচ্ছা করে গাও।

ধামাইল শুনবেন?

শুনব।

নাকি আমিন পাশার পাগলা গান শুনবেন।

পাগলা গান কী?

পদে পদে তালফেরতা মজা আছে।

তোমার সঙ্গে তো তবলা নেই। তাল আসবে কোথেকে।

আমার গলায় তাল আছে।

শৈলজারঞ্জন তিনটি গান শুনেই বললেন, আর লাগবে না। চান বিবি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, আমার গান কি আপনার পছন্দ হয় নাই?

পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আর শুনব না। আমি অতি বিখ্যাত একজন মানুষকে তোমার গান শোনার ব্যবস্থা করে দেব। উনাকে গান শুনিও। উনি যদি খুশি হন তাহলে তোমার মানবজন্ম ধন্য হবে।

চান বিবি অবাক হয়ে বলল, এই মানুষ কে?

শৈলজারঞ্জন বললেন, উনি বাংলাগানের রাজার রাজা। তার নাম রবীন্দ্ৰনাথ ঠাকুর। তুমি নিশ্চয়ই তার গান কখনো শোন নি?

আমি উনাকে চিনেছি। উনার গানরে বলে রবিবাবুর গান। একটা গানের সুর পরিষ্কার মনে আছে। কথা মনে নাই। এক দুই পদ মনে আসে।

শৈলজারঞ্জন অবাক হয়ে বললেন, এক দুই পদ শোনাও তো।

চান বিবি শুদ্ধ সুরে গাইল–

চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে–
নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।

শৈলজারঞ্জন আগ্রহের সঙ্গে বললেন, আমি গানটা ঠিক করে লিখে দেই? তুমি ভালোমতো শিখে রাখ। সত্যি যদি কোনোদিন সুযোগ হয়। রবীন্দ্রনাথকে গানটা শোনাবে।

চান বিবি হ্যাঁ-সূচক ঘাড় কাত করল।

 

মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নিমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছেন ময়মনসিংহে। তিনদিন থাকবেন। শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রমের উপর কয়েকটা বক্তৃতা দেবেন। ময়মনসিংহের ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চে থিয়েটার দেখবেন। তার জন্যে পাখি শিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তিনি শিকার পছন্দ করেন না বলে সেই প্রোগ্রাম বাতিল করা হয়েছে। তার বদলে ব্ৰহ্মপুত্র নদে বিহার এবং সঙ্গীতানুষ্ঠান।

রবীন্দ্ৰনাথ ময়মনসিংহে পৌঁছে জমিদারদের টানাটানিতে পড়ে গেলেন। কোথায় রাত কাটাবেন এই নিয়েও সমস্যা। শশীকান্ত আচার্য চাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন তাঁর বাড়ি শশীলজ’-এ। গৌরীপুরের মহারাজা ব্ৰজেন্দ্র রায়চৌধুরী চাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ রাত কাটাবেন ‘গৌরীপুর লজ’-এ। তাঁর ধারণা সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই দোতলা বাড়ি কবিগুরুর পছন্দ হবে। বাড়িটা তিনি চীনা মিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করেছেন। সুদূর বাৰ্মা থেকে আনা হয়েছে সেগুন কাঠ। এদিকে মুক্তাগাছার আরেক জমিদার রাজা জগত কিশোর আচাৰ্য চাচ্ছেন রবীন্দ্ৰনাথ থাকবেন তার নতুন বাড়ি ‘আলেকজান্দ্ৰা ক্যাসেল’-এ।

তিনদিনের ক্লান্তিকর ময়মনসিংহ ভ্রমণের শেষে রবীন্দ্ৰনাথ চলে এলেন কেন্দুয়ার আঠারোবাড়িতে। আঠারোবাড়ির জমিদার বাবু প্রমোদ রায়চৌধুরী মহাসমাদরে তাকে নিয়ে এলেন। যে বাড়িতে তাকে রাখা হলো সেই বাড়িটা কাঠের। বাড়ির দোতলায় বিশাল বারান্দা। বারান্দায় কবির জন্যে আরামদায়ক কেদারা পাতা। ভ্ৰমণে ক্লান্ত কবি আরাম কেদারায় শুয়ে সারা সন্ধ্যা বাংলাদেশের ঘন বর্ষণ দেখলেন। রাতে গান রচনা করলেন–

আজি ঝরে ঝরো মুখর বান্দরদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।।
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদভ্ৰান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ওই বিলাকার পথখানি নিতে চিনে।।
মেঘমাল্লারে সারা দিনমান
বাজে ঝরনার গান।
মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা— মন চায়
মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে।।

কবিকে আনন্দ দেবার জন্যে নৈশভোজের পর গানবাজনার আয়োজন করা হলো। একজন বংশীবাদক বাঁশি বাজাল। কবি মন দিয়ে শুনলেন না। হাই তুলতে তুলতে বললেন, শরীরটা ক্লান্ত লাগছে। আজ শুয়ে পড়ি।

মহারাজা বললেন, অবশ্যই। শোবার আগে একটা গান কি শুনবেন? আপনার রচিত গান। সুকণ্ঠী গায়িকা। মনে হয় আপনার ভালো লাগবে। বাবু শৈলজারঞ্জন মজুমদার আমাকে পত্র দিয়ে এই গায়িকার কথা বলেছেন। তাকে পালকি করে আনিয়েছি। অবশ্য সামান্য কিন্তু আছে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, কিন্তু আছে মানে কী?

মেয়েটির বাস ভদ্রঘরে না। তার বাস পঙ্কে।

পঙ্কে বাস তো পদ্ম’র। শুনি পদ্ম’র গান।

মহারাজা ইশারা করতেই পর্দার আড়াল থেকে জুলেখা বের হলো। জড়সড় হয়ে বসল। পায়ের কাছে। মহারাজা বললেন, এর উচ্চারণ শুদ্ধ হবে না, কিন্তু কণ্ঠ মধুর।

জুলেখা খালি গলায় গাইল, চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে—

কবি চোখ বন্ধ করে গান শুনলেন। গান শেষ হবার পর চোখ মেলে। বললেন, কণ্ঠের মাধুর্যে উচ্চারণের ত্রুটি ঢাকা পড়েছে। তোমার নাম কী?

জুলেখা বিড়বিড় করে বলল, চান বিবি। তুমি তাহলে চন্দ্রের স্ত্রী? ভালো তো। তুমি শান্তিনিকেতনে আসবে? গান শিখবে?

কোনোকিছু না বুঝেই জুলেখা ঘাড় কাত করল। রবীন্দ্রনাথ মহারাজার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার এই গান পূজাপর্বের। কিন্তু মেয়েটির গলায় গানটা শোনার পর মনে হচ্ছে গানটা প্রেমের। মানব-মানবীর প্ৰেম। কথা শেষ করেই তিনি জুলেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, চন্দ্র-স্ত্রী, কাছে এসো, আশীৰ্বাদ করে দেই।

জুলেখা এগিয়ে এলো। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মাথায় হাত রাখলেন। জুলেখা কি টের পেল যে আজ তার পঙ্কের জীবন ধন্য হলো?*

১৯২৬ ইংরেজি।

————-

* গানের উপর অসাধারণ দখল দেখে শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিজ্ঞান ভবন থেকে কলা ভবনে নিয়ে আসেন। শৈলজারঞ্জনের প্রধান কাজ হয় রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি তৈরি করা। -লেখক

বঙ্গবাসী কাগজের শিরোনাম

‘বঙ্গবাসী’ কাগজের শিরোনাম—

দুর্ধর্ষ বিপ্লবী জীবনলালের পলায়ন।

ঘটনার বিবরণে বলা হচ্ছে, আলীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে বন্দি স্থানান্তরের সময় জীবনলাল হাতকড়া বাধা অবস্থায় পলায়ন করেন। ওঁৎ পেতে থাকা বিপ্লবীরা পুলিশের গাড়িতে বোমাবর্ষণ করলে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন জীবনলাল।

‘ময়মনসিংহ গেজেট’ পত্রিকার শিরোনাম—

খান সাহেব ধনু শেখ মুসলিম লীগের
ময়মনসিংহ জেলার আহবায়ক নির্বাচিত।

দুই পত্রিকায় দুইজনের ছবি। ধনু শেখের মাথায় তুর্কি ফেজ টুপি। গায়ে আচকান। জীবনলালের ছবিতে ফুল হাতা গেঞ্জি পরা এক যুবক, যার চেহারায় লজ্জাভাব প্রবল। ক্যামেরায় ছবি তোলা হচ্ছে এই কারণে সে বিব্রত।

এই দুই পত্রিকার কোনোটিতেই তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীর এক যুবকের ছবি বা খবর ছাপা হয় নি। যুবকের নাম চন্দ্ৰশেখর ভেঙ্কটরমন। তিনি ১৯৩০ সনে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, তাঁর আপন ছোটভাইয়ের ছেলে সুব্ৰমনিয়াম চন্দ্ৰশেখরও পঞ্চাশ বছর পর ১৯৮৩ সনে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। ভারতীয় পত্রিকাগুলি এই খবর ছাপাতেও কেন জানি ভুলে গিয়েছিল।

 

বান্ধবপুর পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কার নিয়ে চিন্তিত না। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার সমস্যা নিয়ে চিন্তিত না। গান্ধীজি হঠাৎ করেই অসহযোগ আন্দোলন কেন ভেঙে দিলেন তা নিয়েও চিন্তিত না। বান্ধবপুর চিন্তিত তার মানুষজন নিয়ে। মাওলানা ইদরিসকে নিয়ে। মানুষটার হয়েছে কী? এই রোগের কি কোনো চিকিৎসা আছে? তাকে ধরে বেঁধে একটা বিয়ে দিয়ে দিলে কেমন হয়?

জঙ্গলে অমাবস্যা তিথিতে হো হো শব্দ কেন হয় তা নিয়ে বান্ধবপুর চিন্তিত। ভূতপ্রেতের বিষয় বোঝা যাচ্ছে। কন্ধকাটারা এমন শব্দ করে। কন্ধকাটা যতক্ষণ জঙ্গলে থাকবে ততক্ষণ ঠিক আছে, কিন্তু পাড়ায় ঢুকলে সমূহ বিপদ।

কবিরাজ সতীশ পরিবারের মেয়ে যমুনাকে নিয়ে বান্ধবপুর চিন্তিত। সালিশ বসা উচিত। এখনো বসছে না কেন? সালিশে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, ঘটনা কে ঘটিয়েছে? হিন্দু না মুসলমান? ডাকাতদল যেহেতু যুক্ত, মুসলমান হবার সম্ভাবনাই বেশি। ডাকাতি বেশিরভাগ মুসলমানরাই করে।

ভারতীয় এক বিজ্ঞানী সমুদ্রের পানির রঙ নীল দেখায় কেন তা বের করে ফেলেছেন, এটা কি কোনো বিষয়! ঈশ্বর ঠিক করে রেখেছেন সমুদ্রের পানি নীল দেখাবে, এই কি যথেষ্ট না?

হাফেজ মাওলানা ইদরিসের মাথা যে পুরোপুরি গেছে এই বিষয়ে বান্ধবপুরের মানুষদের মনে এখন আর কোনো সংশয় নেই। বান্ধবপুরের মতো এতবড় অঞ্চলে একজন ‘আউল’ মাথা থাকবে না, এটাই বা কেমন কথা? গ্রামে এক দুইজন ‘আউল’ মাথা থাকা ভালো, এতে গ্রামের উন্নতি। বদ্ধ উন্মাদ হলে ভিন্ন কথা। বদ্ধ উন্মাদকে নৌকায় করে দূরের কোনো গঞ্জে গোপনে ছেড়ে আসাটা বিধি। মাওলানা ইদরিস বদ্ধ উন্মাদ না। তিনি একটা বিষয় ছাড়া সর্ব বিষয়ে অতি স্বাভাবিক। মসজিদের নামাজ নিয়মমতো পড়াচ্ছেন। জুম্মাবারে একটা হাদিস বয়ান করা এবং তার ব্যাখ্যা করা তার অনেকদিনের অভ্যাস। এই অভ্যাসেরও পরিবর্তন হয় নি। গত জুম্মাবারে তিনি নবিজির হাদিস বয়ান করলেন।

মুসুল্লিদের আজ যে হাদিসটা বলব। এই হাদিস আমরা পেয়েছি। ইয়াজিদের কন্যা বিবি আসমার কাছ থেকে। তিনি বলছেন, একদিন নবিজি (সাল্লালালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) এর সামনে খাবার আনা হয়েছে। তিনি সেই খাবার আমার এবং আমার সঙ্গে উপস্থিত কিছু মহিলার সামনে রেখে বললেন, খাও। আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম ক্ষুধার্ত, তারপরেও ভদ্রতা করে বললাম, আমাদের ক্ষুধা নাই। তখন নবিজি বললেন, ‘হে মহিলাবৃন্দা! ক্ষুধার সঙ্গে মিথ্যা মিশিও না।’

এখন মুসল্লিগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যা চিন্তা করেন। ব্যাখ্যা হলো, ভদ্রতার কারণে মিথ্যা বলা যাবে না। যেই মিথ্যায় ক্ষতি নাই সেই মিথ্যাও বলা যাবে না। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা বলা যাবে না। সবাই বলেন— আলহামদুলিল্লাহ।

সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলল। মাওলানা দোয়া শুরু করলেন। কোথাও ভুল নেই। কোনো ভ্ৰান্তি নেই। শুধু এক জায়গাতেই সমস্যা। মাওলানার ধারণা ঘরে তার স্ত্রী আছে। অতি রূপবতী স্ত্রী।

বাড়িতে ঢোকার আগে উঠানে দাঁড়িয়েই তিনি কয়েকবার গলা খাকারি দেন। যেন তার স্ত্রী গায়ের কাপড় বেশামাল থাকলে ঠিকঠাক করে নিতে পারেন। স্ত্রীকে স্বামীর সামনেও আব্রু রক্ষা করার বিধান।

বাড়িতে ঢুকে পাগড়ি খুলতে খুলতে মাওলানা বলেন, বউ, রান্না কিছু হয়েছে?

তাঁর প্রশ্নের কেউ জবাব দেয় না। কিন্তু মাওলানা জবাব শুনতে পান এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন, থাক থাক, জ্বর গায়ে নিয়ে এখন রান্না করতে বসতে হবে না। সামান্য চাল-ডাল আমি নিজেই ফুটিয়ে নিতে পারব। তুমি বরং কিছুক্ষণ শুয়ে থাক। গোসল করবে? পানি এনে দেব? তাহলে থাক গোসলের দরকার নাই। জ্বর সারুক। বউ, আমার কিন্তু ধারণা তোমার ম্যালেরিয়া হয়েছে। প্রতিদিন একই সময় জ্বর, এইটা ম্যালেরিয়া ছাড়া আর কিছু না। আমাকে মনে করিয়ে দিও, সতীশ কবিরাজের কাছ থেকে মিকচার এনে দিব। পাঁচ দাগ মিকচার খেলেই জ্বর শেষ। খেতে তিতা। নিষিন্দার রসের চেয়েও তিতা। কিন্তু ম্যালেরিয়ার যম।

মাওলানা বারান্দায় রান্না করতে বসেন। চোঙা দিয়ে চুলায় ফুঁ দিতে দিতে পরিষ্কার শুনতে পান উঠান ঝাট দেয়া হচ্ছে। পাতা জমানো হচ্ছে। মাওলানা দুঃখিত গলায় বললন, বউ, তুমি দেখি আমার কোনো কথাই শুন না। শরীরে জ্বর নিয়া উঠান ঝাঁট দিতে শুরু করলা। কয়েকটা শুকনা পাতা পইড়া আছে, এতে হইছে কী? বন কর।

ঝাড় দেয়ার শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। মাওলানা বড়ই আনন্দ পান।

হাটের দিনে মাওলানাকে তাঁর অদৃশ্য স্ত্রীর জন্যে টুকটাক অনেক কিছু কিনতে দেখা যায়। সস্তার জিনিস- কাঁচের চুড়ি, ফিতা, কাঠের কােকই। দোকানিরা এই সময় তাঁর সঙ্গে নানান রহস্য করে। তিনি সেই রহস্যের কিছুই বোঝেন না। তাদের কথার জবাব দিয়ে যান। স্ত্রী প্রসঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগে।

মাওলানা সাব, কাচের চুড়ি যে কিনতেছেন ভাবি সাবের হাতের মাপ দরকার না?

এই মাপেই চলবে। মাপ আমি জানি।

সবুজ চুড়ি কিনলেন, ভাবি সাবের গায়ের রঙ কী? গায়ের রঙ শাদা না হইলে চুড়ি ফুটব না।

গাত্ৰবৰ্ণ অতি পরিষ্কার।

মাশাল্লাহ।

নতুন এক সাবান বাইর হইছে কোম্পানির, জলে ভাসা সাবান। পুসকুনিতে ছাইড়া দিবেন। পানিতে ভাসতে থাকব। ভাবি সাবের জন্যে সাবান একটা দিব?

না। সে পুকুরে স্নান করে না।

পুকুরে স্নান করতে সমস্যা কী?

সমস্যা আছে। পর্দার সমস্যা। চাইর দিক খোলা।

সেইটাও তো একটা কথা।

মাওলানাকে নিয়ে নানান আমোদ হয়। বান্ধবপুরের লোকজন আমোদ করে। পরিচিতজনরা করে। অপরিচিতজনারাও করে। সবচে’ বেশি আমোদ করেন। ধনু শেখ। আজকাল তাঁর সময়ের খুব অভাব। নানান মিটিং করতে হয়। সভা সমিতিতে যেতে হয়। ময়মনসিংহ শহরে নিজের থাকার জন্যে তিনি বাড়ি বানিয়েছেন। বাড়ির নাম ‘খান ভিলা’। বান্ধবপুরে মাসে এক দুই বারের বেশি। আসতে পারেন না। যখনই আসেন মাওলানাকে ডেকে পাঠান। ধনু শেখের সময়টা ভালো কাটে।

মাওলানা, তোমার স্ত্রী আছে কেমন?

জি জনাব ভালো। শুকুর। আলহামদুলিল্লাহ।

গতবারে তোমার কাছে শুনেছিলাম। উনার ম্যালেরিয়া হয়েছে।

জি। সতীশ কবিরাজের কাছ থেকে এনে ওষুধ খাইয়েছি। এতে আরাম হয়েছে।

এখন আর জ্বর আসে না?

জি-না। আল্লাপাকের মেহেরবানি।

এখন পর্যন্ত কেউ উনারে চউক্ষে দেখল না, এইটা কেমন কথা?

পর্দা-পুসিদার মধ্যে থাকে।

স্ত্রীলোকের সামনেও কি পর্দা করে?

জি।

ভালো তো। খুবই ভালো। তা তোমাদের সন্তানাদি কিছু হবে? আছে কোনো খবর?

এখনো খবর নাই।

খবর হইলে আগেভাগে বলবা। নয়তো একদিন হঠাৎ শুনব তোমার সন্তান হয়েছে, তারেও কেউ চোখে দেখে না।

খবর হইলে আপনারে জানাব।

তোমার স্ত্রীর নাম তো জুলেখা। নাম ঠিক বলেছি না?

জি।

সে রঙিলা নটিবাড়ির জুলেখা না তো?

জি-না। তওবা। আপনি কী বলেন!

না হইলেই ভালো। মাওলানা হইয়া নটি বিবাহ করলে লোকজন তোমার পেছনে দাঁড়ায়া নামাজ পড়বে না। ঠিক না?

জি ঠিক।

রঙিলাবাড়ির জুলেখার খবর কিছু রাখ? শুনেছি সে নাকি কলিকাতায় থাকে। তাঁর গানের থাল বাইর হইছে। দুইটাকা কইরা থালের দাম।

আমি কিছু জানি না।

না জানাই ভালো। তুমি স্ত্রীকে নিয়া আছ ভালোই আছ। ভালো কথা, তোমার কি স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ হয়?

হয় না।

দুইজন মানুষ একসাথে বাস করতেছ, কিছু ঝগড়া তো হওয়ার কথা। ধমক ধামাক কোনোদিনও দেও নাই?

একবার দিয়েছিলাম, শুরু করুল কান্দন। কান্দন দেইখা মন খারাপ হয়েছিল বিধায় ঠিক করেছি। আর ধমক ধামক না।

তোমার স্ত্রীর মতো স্ত্রী সবের প্রয়োজন। এই রকম স্ত্রী জনপ্রতি দশবারোটা থাকলেও ক্ষতি নাই। শোন মাওলানা, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়া একবার আমার ময়মনসিংহের বাড়িতে আসা। কী বাড়ি বানাইলাম দেইখা যাও। বাড়িতে ফুঁ দিয়া যাও। স্ত্রী পর্দার মধ্যে থাকবে, অসুবিধা কী? বোরকা পইরা যাবে। বোরকা পইরা ফিরবে।

জি আচ্ছা যাব।

 

ধনু শেখের ময়মনসিংহের বাড়িতে মাওলানার যাওয়া না হলেও অন্য এক অতিথি হঠাৎ রাতদুপুরে উপস্থিত। মাঘ মাস। শীত পড়েছে জব্বর। সেই সঙ্গে কুয়াশা, এক হাত দূরের মানুষ দেখা যায় না। এমন অবস্থা। ধনু শেখ রাতের খাবার শেষ করেছেন। পানের জন্যে অপেক্ষা করছেন। জর্দা দিয়ে পান খেতে খেতে ইকো টানবেন। বাবুর্চি ছগীর পায়ে গরম তেল মালিশ করে দিবে। শরীর ভালো বোধ করলে পিয়ারীকে খবর দিয়ে আনবেন। কিছু গানবাজনা হবে। ইদানীং রাত জেগে দীর্ঘসময় গান শুনতে পারেন না। ঘুমিয়ে পড়েন। গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার মধ্যেও আনন্দ আছে। ধনু শেখ পিয়ারীকে আনতে পাঠাবেন কি পাঠাবেন না তা নিয়ে আরামদায়ক অনিশ্চয়তায় আছেন। এই সময় অতিথি শোবার ঘরেই ঢুকে পড়ল। অতিথির মাথায় মাফলার। গায়ে ছাই রঙের চাদর।

ধনু শেখ চেচিয়ে উঠতে গিয়েও চুপ করে গেলেন। অতিথি অপরিচিত না। মাফলারে অতিথির মুখ প্রায় ঢাকা। তারপরেও তাকে চেনা যাচ্ছে। অতিথির নাম জীবনলাল। এই লোকের ফাঁসি হয়ে যাবার কথা। সে এখানে কী করছে? বাড়িতে দারোয়ান আছে। সে ঢুকলইবা কীভাবে? ধনু শেখের স্ত্রীদের কেউই এ বাড়িতে নেই। খানসামা এবং বাবুর্চি নিয়ে সংসার। বাবুর্চি জর্দা আনতে গিয়ে মারা গেছে নাকি কে বলবে!

আমাকে চিনেছেন? আমার নাম জীবনলাল।

ধনু শেখ ভীত গলায় বললেন, চিনেছি।

এই সময় বাবুর্চি জর্দা এবং ইকো নিয়ে ঢুকল। শোবার ঘরে অচেনা এক লোক বসে আছে। এই নিয়ে তাকে মোটেই চিন্তিত মনে হলো না। সে ব্যস্ত ইকো ঠিক করতে। জীবনলাল বললেন, আপনার ইকোবরাদারকে যেতে বলুন। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। কথা শেষ করি।

ধনু শেখ বাবুর্চিকে চলে যেতে ইশারা করলেন। বাবুর্চি চলে গেল। ধনু শেখ চাচ্ছিলেন বাবুর্চি যেন পুরোপুরি না যায়। দরজার পাশে থাকে। ডাকলেই ছুটে আসতে পারে এমন। কিন্তু হারামজাদা যে যাচ্ছে যাচ্ছেই। একবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছেও না। ধনু শেখের নিজেকে খুবই অসহায় লাগছে। পিস্তলের লাইসেন্স তিনি কমিশনার সাহেবের কাছ থেকে পেয়েছেন। আলসেমি করে পিস্তল কেনা হয় নাই। বিরাট বোকামি হয়েছে।

খান সাহেব, আছেন কেমন?

ধনু শেখ ক্ষীণগলায় বললেন, ভালো। আপনাকে একটা কথা আগেই বলা দরকার। আগে না বললে আপনি ধারণা করতে পারেন। আমি ঐ রাতে খবর দিয়ে পুলিশ এনেছিলাম। ঘটনা সত্যি না। তবে পুলিশের চাপে পড়ে ঐ দিন স্বীকার করেছিলাম যে আপনি হাওরের দিকে গিয়েছেন। পুলিশের চাপ কী জিনিস আপনি নিশ্চয়ই জানেন।

জানি। পুলিশের চাপের প্রসঙ্গ থাক। এখন আমার চাপটা শুনুন। মন দিয়ে শুনতে হবে।

মন দিয়ে শুনছি।

আপনি কাল পরশুর মধ্যে বান্ধবপুর যাবেন। হরিবাবুর বিষয়সম্পত্তি যা দখল করেছেন সেসব ফেরত দিবেন।

কাকে ফেরত দেব?

মূল মালিককে দেবেন।

মালিকটা কে?

মাওলানা ইদরিসকে জিজ্ঞাস করলেই জানতে পারবেন।

মাওলানা ইদরিসকে কী জিজ্ঞাস করব? তার তো মাথা নষ্ট। পুরাই নষ্ট।

হরিচরণের জমিজমার ওয়ারিশানের নাম জহির। তার মা’র নাম জুলেখা।

ধনু শেখ বললেন, কোনো একটা গণ্ডগোল হয়েছে। হরিচরণ বাবু বেশ্যাবেটির ছেলেকে সম্পত্তি কেন দিবেন? যদি দিয়ে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে উনার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মাথা খারাপ মানুষের দলিল গ্রাহ্য না। ভালো কথা, আপনি কি খাওয়াদাওয়া করবেন? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ক্ষুধার্তা। বাবুর্চিকে খানা লাগাতে বলব?

জীবনলাল চাদরের নিচ থেকে পিস্তল বের করে নিজের হাঁটুর উপর রাখতে রাখতে বললেন, আপনার বাবুর্চিকে খাবার গরম করতে বলুন। খাওয়া শেষ করে বিদায় নেবার সময় আপনার পায়ে একটা গুলি করব। আপনি মরবেন না, তবে পায়ের হাডিড চুরমার হবে। এই কাজটা করব যাতে আপনি বুঝতে পারেন আমি সহজ পাত্র না।

ধনু শেখ হাসির চেষ্টা করতে করতে বললেন, এইসব কী বলেন? আপনার কথামতোই কাজ হবে। যা বলবেন তাই করব। আপনার নিজের যদি টাকা পয়সা লাগে সেটাও বলেন। স্বরাজ করতে টাকা লাগে। টাকা ছাড়া কিছুই হয়। না।

জীবনলাল হাই তুলতে তুলতে বললেন, গুলি খাওয়ার পরই আপনি আমার কথামতো কাজ শুরু করবেন। তার আগে না। ভয় পাবেন না, আপনার বাড়ি থেকে হাসপাতাল দূরে না। অল্প সময়েই হাসপাতালে পৌঁছতে পারবেন। আরেকটা কথা, গুলি যে আমি করেছি। এটা পুলিশকে না বললে ভালো হয়।

ধনু শেখ বললেন, ভাই সাহেব, খাওয়াদাওয়া করেন। আপনি ক্ষুধার্তা। ক্ষুধার্ত অবস্থায় কী বলতেছেন নিজেও বোধহয় জানেন না। রহমত কই? বাড়িতে অতিথি। খাবারের ব্যবস্থা কর।

ভাই সাহেব, আপনি কি রাতে আমার এখানে থাকবেন? থাকতে পারেন। দুইটা ঘর সাজানো আছে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আসেন। দুই ভাই মিলে পুরানা দিনের মতো গল্প করি। মাওলানা মাথা খারাপ হবার পরে কী করে আপনারে বলব, আপনি যদি মজা না পান দুই কান কাঁইট্যা ফেলব।

জীবনলাল তাকিয়ে আছে। তার চোখ শান্ত। ধনু শেখ বললেন, দাড়ি ফেলে দিয়ে ভালো করেছেন। আপনার চেহারা সুন্দর। দাড়ির কারণে আগে বুঝতে পারি নাই। আপনার ভাগ্যও কিন্তু ভালো। আজ বাড়িতে মাশুল মাছ রান্না হয়েছে। মাশুল মাছের নাম শুনেছেন?

না

অনেকে বলে মহাশোল। রুই মাছ, তবে দেখতে শউল মাছের মতো। পাহাড়ি নদীতে থাকে, দু’একটা নিচে নেমে আসে। এই মাছ একবার খেলে বাকি জীবন মুখে লেগে থাকবে। ভালো কথা, দেশ স্বাধীনের দেরি কত?

দেরি নাই।

আমারও সেইরকমই ধারণা, দেরি নাই।

ধনু শেখ ভরসা ফিরে পাচ্ছেন। জীবনলাল গল্পগুজবে অংশ নিচ্ছে, এটা শুভ লক্ষণ। খাওয়াদাওয়া করার পর পেট শান্ত হবে। পেট শান্ত হলেই মাথা শান্ত। কিছু করবে বলে মনে হচ্ছে না। পিস্তল এনেছে ভয় দেখাবার জন্যে। এর বেশি কিছু না।

 

ধনু শেখের সমস্ত অনুমান মিথ্যা প্রমাণ করে জীবনলাল ঠাণ্ডা মাথায় কাছ থেকে পায়ে গুলি করল। ছিটকে পা সরিয়ে নিতে গিয়েও লাভ হলো না, পায়ের হাড় ভেঙে গুলি বের হয়ে গেল।

 

সবাই এসেছেন। মুসলমানদের মধ্যে আছেন মাওলানা ইদরিস। ন্যায়রত্ন রামনিধিও আছেন। মূল সিদ্ধান্ত তিনি দেবেন। রামনিধির শরীর খুবই খারাপ, তারপরেও গুরুতর এই বিষয়ে তাকে আসতেই হয়েছে।

ঘটনা এরকম— কালবোশোখী ঝড়ের সময় যমুনা ঘোষবাড়ির আমবাগানে আম কুড়াতে গিয়েছিল। শুরুতে ঝড় তেমন কিছু ছিল না— এলোমেলো বাতাস। হঠাৎ ঝড় প্রবল হলো। সঙ্গে তুমুল বর্ষণ। যমুনা দৌড়ে ঢুকল ঘোষবাড়িতে। ঝড় বাড়তেই থাকল। বিপদের উপর বিপদ। এই সময় ঘোষবাড়িতে ডাকাত পড়ল। তারা চিৎকার চেঁচামেচি করছে, কেউ শুনছে না। ডাকাতির শেষে ডাকাতরা, যমুনাকে ধরে নিয়ে গেল। তাকে উদ্ধার করা হয় শেষ রাতে উলঙ্গ অবস্থায়।

রামনিধি বললেন, এ তো মহাসর্বনাশ। কবিরাজ, তোমার মনে কী আছে বলো। মেয়েরে কী করব?

সতীশ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

রামনিধি বললেন, এই মেয়ে নিজ দোষে দোষী না। তস্করের কারণে দোষী। যে ঘটনা ঘটেছে তাতে তার গর্ভ সঞ্চারের সমূহ সম্ভাবনা। সেটা কোনো বিষয় না, গৰ্ভ নষ্ট করা যায়। কিন্তু মেয়ে যে পতিত হয়েছে তার গতি কী?

সমাজপতিদের একজন মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, কোনো গতি নাই।

রামনিধি বললেন, কঠিন বাস্তবতা হলো সমাজ এই মেয়েকে গ্ৰহণ করবে না। আত্মীয়স্বজন গ্ৰহণ করবে না। সে যেখানে যাবে যার কাছে যাবে সে পতিত হবে। তার ইহকাল পরকাল সবই শেষ।

সমাজপতিদের মধ্যে বিশিষ্টজন বিধান বাবু বললেন, মেয়ের বয়স অল্প এবং সে সুন্দরী বিধায় সমস্যা আরো প্রকট।

সতীশ কবিরাজ চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ফাঁসিতে ঝুলায়া মাইরা ফেলি?

বিধান বাবু বললেন, বোকার মতো কথা বলব না। ফাঁস নিয়া মরলে অসুবিধা আছে। থানা পুলিশ হবে। তোমারে ধরবে। একটা কাজ করা যায়, মেয়ের মাথা কামায়া তারে বাল বিধবা পরিচয়ে কাশিতে পার করা যায়। কাশি পূণ্যধাম। সেখানে রোজ গঙ্গাস্নান করলে এক পর্যায়ে পাপ কাটা যাবে।

সতীশ কবিরাজ বললেন, কাশিতে আমার কেউ নাই।

বিধান বাবু বললেন, আমি একটা প্রস্তাব দিতে পারি। শুনতে খারাপ লাগলেও প্রস্তাব উত্তম।

রামনিধি বললেন, কী প্রস্তাব?

মেয়েটারে রঙিলাবাড়িতে পাঠায়ে দেওয়া। আমরা ধরে নিব যমুনা নামে কেউ সমাজে ছিল না।

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে থাকল। মাওলানা ইদরিস বললেন, এটা আপনি কী বললেন?

বিধান বাবু বললেন, অন্যায় কী বলেছি? আপনার মুসলমান সমাজ কি এই মেয়েরে নেবে? বলেন নেবে? আপনি মুসলমান বানায়া এই মেয়েরে বিবাহ করবেন?

মাওলানা বললেন, জনাব আমার স্ত্রী আছে। আমি কীভাবে বিবাহ করব? এক স্ত্রী আছে আরেক স্ত্রী হবে। আপনাদের সমাজে তিন চাইরটা স্ত্রী কোনো বিষয় না।

মাওলানা বললেন, আমার স্ত্রী রাজি হবে না। সংসারে সতীন তার পছন্দ না।

সমাজপতিদের কেউ কেউ হেসে উঠলেন। রামনিধি বিরক্ত গলায় বললেন, মূল বিষয়ে আসা। খামাখা কথা বইলা সময় নষ্ট করার কিছু নাই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্ত অতি অপ্রিয়, তারপরেও নিতে হবে। বিধান বাবুর কথা আমার পছন্দ হয়েছে। রঙিলাবাড়ি কিংবা এই ধরনের পতিত বাড়ি ছাড়া পতিত মেয়ের গতি নাই। আগের জন্মে। এই মেয়ে বিরাট পাপ করেছিল বলে এই জন্মে শান্তি। এই জন্মে শান্তি ভোগের পরে পরের জন্মে। সে উদ্ধার পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

কয়েকজন একসঙ্গে বলল, খাঁটি কথা।

যমুনা এতক্ষণ কোনো কথা বলে নি। বাবার কাছ থেকে সামান্য দূরে মাথা নিচু করে বসেছিল। এইবার সে মাথা তুলে বলল, আমি রঙিলাবাড়িতে যাব না।

বিধান বাবু বললেন, তুমি কী করবা, কী করবা না এটা কেউ জিজ্ঞাস করে নাই। তুমি চুপ করে থাক।

যমুনা বলল, আমি রঙিলাবাড়িতে যাব না। বাবা, আমি রঙিলা বাড়িতে যাব না।

সতীশ কবিরাজ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, মা’রে চুপ করে থাক।

রামনিধি বললেন, আমার শরীর ভালো না। জ্বর এসেছে। সভা এইখানেই শেষ। মেয়ে নিজের ইচ্ছায় রঙিলাবাড়িতে যাবে না। যাওয়ার কথাও না। তাকে জোর করে দিয়ে আসতে হবে। সমাজ রক্ষার জন্যে এটা ছাড়া গতি নাই। ব্যবস্থা আজই নিতে হবে। অনেক দেরি হয়েছে আর দেরি করা যাবে না।

যমুনা এই সময় দৌড় শুরু করল। তাকে ধরার ব্যবস্থা নেয়ার আগেই সে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। যেখান থেকে প্রতি অমাবশ্য রাতে হো হো শব্দ হয়।

সমাজপতিরা বিচলিত হলেন না। জঙ্গল থেকে যমুনাকে বের হতে হবে। কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। বের হলে ধরে বেন্ধে রঙিলা বাড়িতে পার করা। সেখানে মেয়ে কেনাবেচার ব্যবস্থাও আছে। ভালো মহাজন পেলে বিক্রি হয়ে যাবে। সেবাদাসী হিসেবে জীবন কেটে যাবে। আগের জন্মের পাপের শাস্তি তো নিতেই হবে।

 

যমুনা জঙ্গলে ঢুকেছে। সন্ধ্যাবেলায়। বর্ষার জঙ্গলে নির্বিয়ে ঘোরাফেরা করা অসম্ভব ব্যাপার। ঝোপঝাড়, কাটালতা। সাপে কাটার ভয় আছে। গরু-ছাগল জঙ্গলে ঢুকে অনেক সময় সাপের কামড়ে মারা গেছে। সাপখোপ ছাড়াও ভয় আছে। ভূতপ্রেতের ভয়। খারাপ বাতাসের ভয়। বিশেষ এক ধরনের অপদেবতা আছে যারা জঙ্গলেই বাস করে। এরা ভয়ঙ্কর। নিষ্ঠুরতা তাদের খেলা।

যমুনা জঙ্গলের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ঘন জঙ্গল। জঙ্গলে এক ধরনের কুয়াশা পড়ে, তার নাম জংলি, কুয়াশা। দেয়ালের মতো এই কুয়াশায় কিছুই দেখা যায় না। হাতড়ে পথ চলতে হয়। দৌড়ে আসার কারণে যমুনা হাঁপাচ্ছে। গা দিয়ে গরম বাতাস বের হচ্ছে। তৃষ্ণায় কলজে ফেটে যাচ্ছে। তৃষ্ণার চেয়ে বেশি লেগেছে ক্ষুধা। তার কাছে মনে হচ্ছে, গাছ থেকে পাতা ছিড়ে সে এখন খেতে পারবে, তার কোনো সমস্যা হবে না। জঙ্গলের ভেতর মাধ্যই খালের একটা শাখা গেছে। পানি খেতে হলে খালটা খুঁজে বের করতে হবে। খালটা কোথায় কে জানে! যমুনা দম নেবার জন্যে বসে আছে। তার প্রায় গা ঘেসে একটা শিয়াল দৌড়ে গেল। তার ভয় পাওয়া উচিত, সে কেন জানি ভয় পেল না। মহাবিপদের সময় ভগবানকে ডাকতে হয়। সে ভগবানকেও ডাকল না। তার জীবন হঠাৎ করেই ভয়শূন্য এবং ভগবানশূন্য হয়ে গেল।

 

শশাংক পালের জীবন এখন হয়েছে ভগবানময়। তিনি সময় পেলেই ভগবানকে ডাকছেন। তাঁর শরীরের অবস্থা আরো খারাপ করেছে। তিনি এখন উঠে বসতেও পারেন না। সারাক্ষণ শুয়ে থাকতে হয়। তাঁর পা ফুলে পানি এসেছে। নিজের পায়ের দিকে তাকালেই ভয়ে তার শরীর কাপে। পায়ের দিকে তাকালেই মনে হয়, মৃত্যু দ্রুত এগিয়ে আসছে। ভগবান ছাড়া গতি নেই। ভগবান দয়া করলেই বৈতরণী পার হওয়া যাবে। ভগবান দয়া করবেন। এমন মনে হচ্ছে না।

শশাংক পালের ছোট শ্যালক এসেছে জামাইবাবুর খোজে। ছোট শ্যালকের নাম পরিমাল। তার নানান ব্যবসা আছে। পয়সাকড়ি ভালোই করেছে। তবে টাকা-পয়সার প্রকাশ নেই। সে হিসেবি ব্যবসায়ী।

পরিমল বলল, জামাইবাবু, আপনার একী অবস্থা!

শশাংক পাল বললেন, অবস্থা খারাপ কী? শুয়ে আছি। দিনরাত শুয়ে থাকার ভাগ্য সবার হয় না। আমার হয়েছে।

চিকিৎসা করাচ্ছেন?

সর্ব চিকিৎসা শেষ হয়েছে। এখন চলছে। ‘কেরোসিন’ চিকিৎসা।

‘কেরোসিন’ চিকিৎসাটা কী?

রোজ দুই চামচ করে কেরোসিন খাচ্ছি। কেরোসিন হলো বিষ। আমার উদরে আছে বিষ। বিষে বিষক্ষয়।

আমার সঙ্গে চলেন। দিদি আপনাকে নিতে বলেছে।

শশাংক পাল বললেন, সে বাঁশি বাজিয়েছে বলেই আমি দৌড় দিয়ে চলে যাব! সে শ্ৰীকৃষ্ণ না, আর আমিও রাধিকা না।

ভিক্ষুকের মতো পরের বাড়িতে থাকবেন?

শুধু যে ভিক্ষুকের মতো থাকব তা-না, ভিক্ষাবৃত্তিও শুরু করব। একটা ঘোড়া কিনব, তারপর ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা।

আপনি সত্যি যাবেন না?

না।

কিছু টাকা-পয়সা এনেছিলাম।

কত?

একশ’।

সারাজীবন তোমাদের টাকা-পয়সা দিয়েছি, আজ একশ’ টাকা নিয়ে হাত গান্ধা করব না। টাকা নিয়ে বিদায় হও।

চলে যাব?

সেটা তোমার বিবেচনা। আমোদ ফুর্তি করতে চাইলে রঙিলা বাড়িতে চলে যাও। আমাকে একশ’ টাকা দিয়ে নষ্ট করার চেয়ে একশ’ টাকার আমোদ কিনে নাও। দুই রাত থাকবা, খরচ হবে পঞ্চাশ। মদ্যপান করবা। খাওয়া-দাওয়া করবা। বখশিশ। এতে খরচ করবা পঞ্চাশ। একশ’ টাকার হিসাব পেয়েছ?

জামাইবাবু আমি যাই?

যাও যাও। ভাগো।

দিদিকে কিছু বলব?

বলবা যে জামাইবাবু তোমাকে প্রতিদিন স্নানের আগে এক চামচ করে বিষ্ঠা খেতে বলেছে। বিষ্ঠা শরীরের জন্যে ভালো। গ্রামের কুকুর এত মোটাতাজা কীভাবে থাকে? বিষ্ঠা খেয়ে। তুমিও খেয়ে দেখতে পার। তোমার শরীরও দুর্বল। দুর্বল শরীরের জন্যে বিষ্ঠা মহৌষধ।

পরিমল জামাইবাবুকে প্ৰণাম না করেই বিদেয় হলো।

শশাংক পাল সুখেই আছেন। মনটা কয়েকদিন সামান্য খারাপ, কারণ সুলেমান ভিক্ষা করতে গিয়ে ফিরছে না। চারদিন হয়ে গেল। দূরে ভিক্ষা করতে গেলে ফিরতে এক দুই দিন দেরি হয়। তবে এতদিন অনুপস্থিতি এই প্রথম। শশাংক ঠিক করে রেখেছেন, এবার সুলেমান ফিরলে তার ঘোড়ায় চড়ে তিনি প্রতিদিনই খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ ঘুরবেন। স্বাস্থ্যের জন্যে খোলা হাওয়ায় ঘোরাঘুরি অত্যন্ত উপকারী। তবে ঘোড়ার পিঠে সোজা হয়ে বসে থাকতে পারবেন না। ঘোড়ার গলা জড়িয়ে শুয়ে পড়তে হবে।

এক সপ্তাহ শেষ হলো, সুলেমান ফিরল না। শশাংক পাল যখন চিন্তায় অস্থির তখনই তিনি ধনু শেখের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলেন। কোলকাতা থেকে পাঠানো চিঠিতে ধনু শেখ লিখেছেন–

শ্ৰী শশাংক পাল
জনাব,

বিশেষ কারণে পত্র দিলাম। পত্রের নির্দেশ মোতাবেক কার্য করবেন। আমার শরীর ভালো না। এক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পাইয়াছিলাম। আঘাতে পচন ধরিবার কারণে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে পা কাটিয়া বাদ দিতে হইয়াছে। রোগ এখনো আরোগ্য হয় নাই। চিকিৎসা চলিতেছে।

এখন মূল বিষয়ে আসি। হরিচরণের বিষয়সম্পত্তির অধিকার আমি বিশেষ কারণে পরিত্যাগ করিয়াছি। সম্পত্তির প্রকৃত ওয়ারিশন পাওয়া গেলে তাঁহাতে সব কিছু বর্তাইবে। ওয়ারিশান পাওয়া না গেলে সরকার বাহাদুর এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন। এতদিন আপনি ভোগদখল করিলেন। নায়েবকে আমি এই বিষয়ে পত্ৰ দিয়াছি। সে আপনাকে হিসাবপত্র বুঝাইবে।

আমি সহসা বান্ধবপুরে আসিব এইরূপ মনে হইতেছে না। আর যদিও আসি হরিচরণের বাড়িঘরে উপস্থিত হইব। না। আপনি বিবেচনা মতো কাৰ্য করবেন।

ইতি
খান সাহেব ধনু শের
কলিকাতা

শশাংক পাল চিঠি পড়ে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে রইলেন। তারপর ডেকে পাঠালেন নায়েবকে। নায়েবের নাম বিনয়। সে নামের মতোই বিনয়ী। হরিচরণের (বর্তমান ধনু শেখের) জমিদারির দেখাশোনার প্রধান দায়িত্ব তার। কাজকর্মে অতি দক্ষ।

বিনয়!

জে আজ্ঞে।

খান সাহেবের কোনো পত্র পেয়েছ?

পেয়েছি।

বিষয় কিছু বুঝেছ?

আজ্ঞে না। তবে বিষয় জটিল।

জটিল ভাবলেই জটিল। জটিল ভাববা না।

আপনে যেমন বলবেন।

ক্যাশে নগদ টাকা-পয়সা যা আছে আমার কাছে দিয়া যাবা।

যা বলবেন করব। চিঠিতে সেই রকম লেখা।

আমার জন্যে বিলাতি একটা বোতল জোগাড় করবা, রঙিলা বাড়িতে পাওয়া যাবে। নিজে যাইতে না চাও অন্যেরে দিয়া আনাইবা।

আচ্ছা।

রাতে মুরগির কোরমা আর পোলাও খাব। জামাই পছন্দ চাউল জোগাড় করতে পার কি-না দেখ।

আপনার শরীরের অবস্থা যেমন গুরুভোজন কি ঠিক হবে?

আমার শরীর আমি বুঝব। তোমার চিন্তার কিছু নাই।

আচ্ছা।

একজন কর্মঠ কাউরে জোগাড় করো যার কাজ আমার সেবা করা। মেয়েছেলে হলে ভালো হয়। পুরুষমানুষ রোগীর সেবা করতে পারে না। মেয়েছেলে পারে। শরীর স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে। মুখের কাটিং ভালো হওয়া প্রয়োজন। বয়স হইতে হবে কুড়ির নিচে।

বিনয় হতাশ গলায় বলল, কই পাব এমন মেয়েছেলে?

শশাংক পাল বললেন, নিচা জাতের মধ্যে খোঁজ। নিচা জাতের মধ্যে পাইবা। চণ্ডাল, হাড়ি, ডোম। এদের মেয়েছেলেদের শরীর স্বাস্থ্য ভালো হয়। এখন আমারে ধরাধরি করে আরাম কেদারায় শোয়ার ব্যবস্থা করো। শরীরটা আজ ভালো ঠেকতেছে।

বিনয় তাকিয়ে আছে। কী বলবে বুঝতে পারছে না। শশাংক পাল বললেন, এক মেয়ে শুনেছি জঙ্গলে পালায়া আছে, তার খোঁজ নিতে পার। আমার আশ্রয়ে থাকবে, অসুবিধা কী?

বিনয় বলল, এইগুলা কী বলেন?

শশাংক পাল বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি যা বলি চিন্তাভাবনা করে বলি। আমার শরীরে পচন ধরেছে, মনে পচন ধরে নাই। বুঝেছ?

হুঁ।

সময় ফুরায়ে আসছে। আনন্দ ফুর্তি যা করার এখনই করতে হবে। হাতে সময় নাই। খাঁটিয়া ঘাড়ে নিয়া বলা হরি হরি বলের সময় আগত।

শরীরটা ঠিক করেন। চলেন কইলকাতা যাই।

কইলকাতা যাব না। কইলকাতার ডাক্তার-কবিরাজ এইখানে নিয়া আসি। সোনার মোহর দিয়া ভিজিট দিব। বুঝেছ? এখন আমার টাকার অভাব নাই। রঙিলা বাড়ির জুলেখার খোঁজ পাও কি-না দেখ। প্রতি সন্ধ্যায়। সে এই বাড়িতে গান করবে। টাকা-পয়সা যা লাগে দিব। নিয়মিত সঙ্গীত শুনলে শরীর আরোগ্য হয়। বুঝেছ?

কিছু না বুঝেই বিনয় মাথা নাড়াল। সে বুঝেছে।

যমুনা বেতঝোঁপের উপর

যমুনা বেতঝোঁপের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। ঝোঁপের কাটায় তার শাড়ি আটকে গেছে। হাত এবং গাল কেটেছে। তার মুখে নোনতা ভাব। কাটা গালের রক্ত গড়িয়ে ঠোঁট পর্যন্ত এসেছে। যমুনা অবাক হয়ে লক্ষ করল, রক্তের নোনতা স্বাদ তার খারাপ লাগছে না। সে ঝোঁপের পাশে বসে বেতকাটা থেকে শাড়ি ছাড়াবার চেষ্টা করছে। কাজটা সে করছে যত্ন নিয়ে এবং এই কাজটা করতেও তার ভালো লাগছে। কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা।

জঙ্গলের অন্ধকার তার চোখে সয়ে এসেছে। আবছা আবছা ভাবে অনেক কিছুই চোখে আসছে। জোনাকি পোকার দল বের হয়েছে। অনেকগুলি ছোট ছোট দল। তারা মাঝে মাঝে একত্র হচ্ছে, আবার ছড়িয়ে পড়ছে। তাকে কে যেন বলেছিল জোনাকি পোকার দলের সঙ্গে মা লক্ষ্মী থাকেন। ঘরের বন্দিজীবন যখন তাঁর অসহ্য বোধ হয় তখন তিনি খোলা মাঠে বা জংলায় বেড়াতে বের হন। জোনাকি পোকরা হয় তার খেলার সাথি। জোনাকিদের পেছনে পেছনে তিনি মনের আনন্দে নাচতে নাচতে ছুটেন।

যমুনা জোনাকির ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করে বলল, মা লক্ষ্মী! আমি মহাবিপদে পড়েছি, আমাকে উদ্ধার করা।

যমুনার ঠিক মাথার উপরে একটা ডাল নড়েচড়ে উঠল। কিচকিচি শব্দ হলো। গাছের দিকে না তাকিয়েই যমুনা বুঝল বাঁেদর। এই বনে বাঁেদর আছে। হনুমানও আছে। এরা মানুষ ভয় পায় না। হনুমানও দেবতা। তার কাছেও প্রার্থনা করা যায়। যমুনা গাছের দিকে তাকিয়ে আবারো হাতজোড় করল।

আকাশে সন্ধ্যা থেকেই মেঘের আনাগোনা ছিল। এখন বিজলি চমকাতে লাগল। একেকবার বিজলি চমকায় বন আলোয় ঝিলমিল করে উঠে। বানর এবং হনুমানের দল ঝাপাঝাপি শুরু করে। বজ্ৰপাতের সময় বনে থাকতে নেই। তখন চলে আসতে হয় খোলা প্রান্তরে। তা না করে যমুনা খুঁজে পেতে লম্বা একটা তাল গাছের নিচে দাঁড়াল। তার মন চাচ্ছে এই গাছে একটা বজ্ৰপাত হোক। আকাশের বাজ যখন নেমে আসবে তখন সে তালগাছ দুহাতে জড়িয়ে ধরবে।

পুরো আকাশ ছিন্নভিন্ন করে বিদ্যুৎ চমকাল, আর তখনি যমুনা স্পষ্ট দেখল বেতঝোঁপের উল্টোদিকে কুজো হয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। শুধু যে দাঁড়িয়ে আছে তা-না, হাত ইশারায় যমুনাকে ডাকছে। কুজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সারা শরীর চাদরে ঢাকা। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষটা যে হরিচরণ এই বিষয়ে যমুনার কোনো সন্দেহ নেই। যমুনা অবাক হয়ে ডাকল, হরিকাকু!

ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। আবারো হাত ইশারা করল। যমুনার মনে রইল না, মানুষটা জীবিত না। একজন মৃত মানুষ গভীর বনে উপস্থিত হতে পারে না। যমুনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগুচ্ছে। ছায়ামূর্তি সরে সরে যাচ্ছে। যতবার যমুনা থমকে দাঁড়াচ্ছে ততবার ছায়ামূর্তিও দাঁড়াচ্ছে। তাকে কি ভুলোয় ধরেছে? ভুলো ভয়াবহ জিনিস। সে প্রিয় মানুষের রূপ ধরে কাছে আসে। নাম ধরে ডাকে। তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে পেছনে যেতে হয়। একসময় ভুলো তার শিকারকে জলে ড়ুবিয়ে মারে।

যমুনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, হরিকাকু আমার ভয় লাগছে। ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। আবারো হাত ইশারায় ডাকল। বিদ্যুৎ চমকানোর সময় ছায়ামূর্তি স্পষ্টই দেখতে পাওয়ার কথা। তখন কিন্তু দেখা যায় না। তখন ছায়ামূর্তি বড় কোনো গাছের আড়ালে চলে যায়।

যমুনা ছায়ামূর্তি অনুসরণ করতে করতে জঙ্গলের শেষ সীমানায় চলে এলো। ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখন সে আর যমুনাকে ইশারায় কাছে ডাকছে না। বরং আঙুলের ইশারায় বিশেষ এক দিকে যেতে বলছে। যমুনা ভীত গলায় বলল, হরিকাকু ভয় পাচ্ছি। ছায়ামূর্তি নড়ল না। জঙ্গলের উত্তর সীমানার দিকে আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস দিচ্ছে, ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। যমুনা পায়ে পায়ে উত্তর দিকে এগুচ্ছে। হঠাৎ তার কাছে মনে হচ্ছে, যেদিকে সে যাচ্ছে সেদিকে শুভ কিছু তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বনের বাইরে পা দিয়েই সে মাওলানা ইদরিসকে পেল। মাওলানার মাথায় ছাতা। হাতে হারিকেন। সারা শরীর কাদায় পানিতে মাখামাখি।

মাওলানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এত সহজে তোমারে পাব ভাবি নাই। আল্লাহপাকের মেহেরবানি পেয়ে গেছি। এত বড় জঙ্গল, কোথায় খুঁজব? চল যাই।

যমুনা বলল, কই যাব?

মাওলানা বললেন, আমার বাড়িতে যাবা। তোমার ভাবি সাব, আমার স্ত্রী আমারে পাঠায়েছে। সে তোমার ঘটনা শুনে মিজাজ খারাপ করেছে। যে জীবনে কোনোদিন উচা গলায় কথা বলে নাই সে আমাকে দিয়েছে ধমক। চিন্তা করেছ অবস্থা?

যমুনা অবাক হয়ে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বিচিত্ৰ মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটা এমনভাবে কথা বলছে যেন যমুনা তার অনেক দিনের চেনা।

মাওলানা বললেন, দাঁড়ায়া আছ কেন? চল রওনা দেই। তোমার ভাবি চিন্তাযুক্ত আছে। মেয়েছেলেরে বেশি সময় চিন্তার মধ্যে রাখা ঠিক না। পুরুষমানুষ দীর্ঘ সময় চিন্তায় থাকতে পারে। মেয়েরা পারে না। তোমার কি ভুখ লেগেছে?

হুঁ।

ঘরে যাবা। গরম পানি দিয়া গোসল দিবা, তারপরে গরম গরম খিচুড়ি খাবা। অমৃতের মতো লাগবে।

যমুনা বলল, আমাকে যে বাড়িতে নিতেছেন। আপনার অসুবিধা হবে না?

মাওলানা বললেন, অসুবিধা হলে হবে। কী আর করা! তোমারে জঙ্গলে ফালায়া গেলে তোমার ভাবি কী পরিমাণ বেজার হবে তুমি বুঝতেই পারবে না। আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিতে পারে। চল চল হাঁটা দাও। নাও ছাতিটা মাথার উপর ধর।

ছাতি লাগবে না।

তোমার কি গাল কেটেছে? রক্ত পড়তেছে।

হুঁ।

কোনো চিন্তা নেই। তোমার ভাবি দূর্বা পিষে মলম বানায়ে দিবে। গালে দিলেই আরাম। এইসব টোটকা সে ভালো জানে। বুদ্ধিমতী মেয়ে, যেখানে যা দেখে শিখে রাখে। পরে কাজে লাগে।

যমুনা রওনা হলো। অনেক দুঃখের পর তার এখন হাসি পাচ্ছে। পাগল একজন মানুষের পেছনে পেছনে সে যাচ্ছে যার ধারণা ঘরে তার মমতাময়ী স্ত্রী। তাদের ভালোবাসা সুখের সংসার। আহারে!

 

যমুনা অনেক সময় নিয়ে সাবান ডলে গরম পানিতে গোসল করল। নতুন সুতির শাড়ি পরল। সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাওলানার সঙ্গে খেতে বসল। যমুনা বলল, আপনি যে অচেনা মেয়েমানুষের সঙ্গে খেতে বসেছেন। আপনার পাপ হবে না? আপনাদের ধর্মে মেয়েছেলের মুখের দিকে তাকানো নিষেধ। ঠিক না?

মাওলানা বললেন, তা ঠিক। তবে রোজ কেয়ামতের সময় পুরুষ রমণীতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। তোমার এখন রোজ কেয়ামত।

আপনার স্ত্রী খাবেন না?

মাওলানা হতাশ গলায় বললেন, এই তার এক অভ্যাস। একা খাবে। আমার সামনে খেতে লজ্জা পায়। কতবার তাকে বলেছি— বউ, আমি তোমার স্বামী। স্বামীর সামনে কিসের লজ্জা? শোনে না।

যমুনা বলল, খিচুড়ি খুব স্বাদ হয়েছে। কে রোধেছে? আপনি না বৌদি?

তোমার ভাবি জোগাড়যন্ত্র করে দিয়েছে। আমি রেঁধেছি। যমুনা বলল, যে দয়া আপনি আমাকে করেছেন তারচেয়ে অনেক বেশি দয়া ভগবান যেন আপনাকে করেন।

মাওলানা ব্যস্ত হয়ে বললেন, আমি কিছুই করি নাই। যা করার তোমার ভাবি করেছে। অতি আচানক মেয়ে। কেউ বিপদে পড়েছে শুনলে অস্থির হয়ে যায়।

যমুনা অনেক রাতে ঘুমাতে গেল। পরিপাটি বিছানা। গায়ে দেয়ার ধোয়া চান্দর। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। হঠাৎ করেই যমুনার মনে হলো, তার মতো সুখী মেয়ে এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ঘুমের মধ্যে অতি আনন্দের একটা স্বপ্নও দেখল। স্বপ্নে সে এবং সুরেন বনে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে চার-পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে। মেয়েটা তাদেরই। সে বড় দুষ্টুমি করছে। এই এক গাছের আড়ালে চলে গেল। ধরতে গেলে অন্য এক গাছের আড়ালে। সুরেন কপট বিরক্ত ভাব করে বলল, মেয়েটাকে এত দুষ্ট বানায়েছ। কীভাবে? যমুনা বলল, একা একা মেয়ে মানুষ করছি, দুষ্ট তো হবেই। তুমি থাক কলিকাতায়, আমি মেয়ে নিয়ে জঙ্গলে বাস করি।

জঙ্গলে বাস কর কেন?

কেউ আমাকে বাড়িতে জায়গা দেয় না। জঙ্গলে বাস না করে করব কী? মাওলানা সাহেব তো তোমাকে জায়গা দিয়েছেন। টেলিগ্রামে খবর পেয়েছি।

ভুল খবর পেয়েছ। মাওলানা সাহেব এবং তার স্ত্রীকেও লোকজন তাড়িয়ে দিয়েছে। তিনিও এখন আমাদের সঙ্গে জঙ্গলে থাকেন। জঙ্গলে আমরা ঘর বানিয়েছি। কী যে সুন্দর ঘর। চল তোমারে দেখায়ে নিয়ে আসি।

আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের করা। আমরা মেয়েটাকে ফেলে ঘর দেখতে যাব, সে যাবে হারিয়ে। আরেক যন্ত্রণা হবে।

 

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যমুনা মাওলানা ইদরিসের বাড়িতে থাকছে। এ নিয়ে বাহ্মণপুরে কোনো সমস্যা হলো না। মনে হলো মেয়েটার গতি হয়েছে এই ভেবে সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এক গভীর রাতে দেখা গেল মাওলানার বাড়ির উঠানে টিনের এক ট্রাংক। ট্রাংকভর্তি যমুনার জিনিসপত্র। শাড়ি, চুড়ি, গায়ের চাদর। স্যান্ডেল। তবে মাওলানা সামান্য বিপদে পড়ল। মুসুল্লিরা ঠিক করল তার পেছনে কেউ নামাজে দাঁড়াবে না। পাগল মানুষ ইমামতি করতে পারে না। তার পেছনে নামাজে দাড়ানো নাজায়েজ।

বান্ধবপুর জুম্মা মসজিদের জন্যে নতুন ইমাম এসেছেন। আব্দুল করিম কাশেমপুরী। তাঁর জন্মস্থান কাশেমপুরে বলেই কাশেমপুরী টাইটেল। তাঁর বয়স অল্প। তবে ভাবে ভঙ্গিতে অত্যন্ত কঠিন। প্রথম জুম্মার দিনেই তিনি মাওলানা ইদরিসকে নামাজ পড়তে দিলেন না। মাওলানা ইদরিসের অপরাধ, তিনি বাড়িতে যুবতী মেয়েমানুষ পুষছেন। এত বড় গুনার কাজ যে করে সে আমজনতার সঙ্গে নামাজে শরিক হতে পারে না। যুবতী বিদায় করে তওবা করতে হবে, তারপর বিবেচনা। খুতবা শেষ করে মাওলানা আব্দুল করিম কাশেমপুরী প্রথম ফতোয়া দিলেন–

যে মুসলমানের স্ত্রীর চেহারা পরপুরুষ দিনে তিনবারের অধিক দেখে ফেলে তার বিবাহ বাতিল। তার সন্তানরা জারজ বলে গণ্য হবে।

মুসুল্লিরা হতভম্ব হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। মাওলানা আব্দুল করিম বললেন, বিধর্মীদের বিষয়ে সাবধান। তারা সাক্ষাৎ শয়তানের অংশ। শয়তানকে যেমন বিনষ্ট করা প্রয়োজন তাদেরও বিনষ্ট করা প্রয়োজন। কাফেরের বিষয়ে এছলাম ধর্ম কোনো ছাড় দেয় নাই। কাফের বিনদ্ষ্টে যে মুসলমান মৃত্যুবরণ করবেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে শহীদের দরজা পাবেন। তাদের স্থান হবে জান্নাতুল ফেরদৌসে। তারা পরীকালে নজিবী (দঃ)-র আশেপাশে থাকার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। বলেন আল্লাহু আকবার।

মুসুল্লিরা আল্লাহ আকবর বললেন, তবে তাদের গলায় তেমন জোর পাওয়া গেল না।

মাওলানা আব্দুল করিম বললেন, যারা আমাদের ধর্মে থেকেও কাফেরদের মতো কাজ কারবার করেন, তারা অতি বড় কাফের এবং মোনাফেক। মোনাফেকদের জন্যে আছে কঠিন শাস্তি। আমাদের মধ্যে যারা মোনাফেক। তারা সাবধান হয়ে যান’। মোনাফেককে কেউ সাহায্য করবেন না। সমাজ থেকে তাকে আলাদা করে রাখবেন। যেমন মাওলানা ইদরিস। তাকে যে চাল-ডাল টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করবেন। তিনি তার নিজের বিপদ ডেকে আনবেন। সবাই বলেন আল্লাহু আকবর।

মাওলানা ইদরিস মহাবিপদে পড়লেন। তাঁর বেতন বন্ধ। গ্রাম থেকে খরচের চাল-ডাল আসা বন্ধ। এক রাতে ঘরে রান্না হলো না। মাওলানা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি সন্তুষ্ট যে আজ আমার ঘরে খানা নাই।

যমুনা বলল, আপনি সন্তুষ্ট কেন?

মাওলানা বললেন, আমাদের নবিজির জীবনে কতবার এরকম ঘটেছে। ঘরে নাই খানা। এটা আল্লাহপাকের এক পরীক্ষা। সবেরে আল্লাহপাক এই পরীক্ষায় ফেলেন না। শুধু তাঁর পেয়ারা বান্দাদের এই পরীক্ষার ভেতর যেতে হয়।

যমুনা বলল, আমার চারগাছি স্বর্ণের চুড়ি আছে। বাজারে নিয়া বিক্রি করেন। চাল ডাল কিনেন।

মাওলানা হতভম্ভ হয়ে বললেন, এইটা তুমি কী বললা?

যা বলেছি ঠিক বলেছি। একবেলা না খেয়ে থাকতে পারবেন, তারপরে কী হবে?

রহমানুর রহিম ব্যবস্থা নিবেন। দেখবা সকালের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়েছে।

কীভাবে?

কীভাবে জানি না। তবে সমস্যার সমাধান যে হবে এটা জানি।

যমুনা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনার মতো মানুষ যে দুনিয়াতে আছে এইটাই জানতাম না। আমি বড় কোনো পুণ্যের কাজ করেছি বলেই আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।

মাওলানার সমস্যার সমাধান হলো পরদিন দুপুরের আগেই। বিচিত্ৰ ভাবেই হলো। মাওলানা একশ এক টাকার একটা মনি অর্ডার পেলেন। টাকাটা পাঠিয়েছেন কোলকাতা থেকে ধনু শেখ। তিনি মনি অর্ডারের কুপনে লিখেছেন–

মাওলানা ইদরিস,

আসসালামু আলায়কুম। আমি যে মহাবিপদে পতিত হইয়াছি তাহার কোনো কুল কিনারা নাই। বিপদ হইতে উদ্ধারের কোনো আশা দেখিতেছি না। আমার পা যে কাটা গিয়াছে এই সংবাদ নিশ্চয়ই পাইয়াছেন। কাটা পায়ে পচন ধরিবার কারণে আধ হাত উপরে আবার কাটিতে হইয়াছে। সেই স্থানেও পচন ধরিয়াছে। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়াছেন আবার পা কাটিবেন। যে মহাযন্ত্রণায় আছি তার কোনো সীমা নেই। সৰ্বক্ষণ মনে হয় আমার কাটা পা কড়াইয়ের জ্বলন্ত তেলে ফুটিতেছে।

মাওলানা, আপনি সুফি মানুষ। আপনি আমার জন্যে কোরান খতম করিবেন এবং আমার রোগমুক্তির জন্যে খাস দিলে দোয়া করিবেন। মৃত্যু হইলে আমি রক্ষা পাই। কিন্তু আমার মরিতে ইচ্ছা করে না।

ইতি
ধনু শেখ (খান সাহেব)

পুনশ্চ : লোকমুখে শুনিতেছি আমাকে খান বাহাদুর টাইটেল দিবার জন্যে সুপারিশ গিয়াছে। এই বিষয়েও পৃথকভাবে দোয়া করিবেন। মিলাদের আয়োজন করিবেন।

 

শশাংক পালের শারীরিক অবস্থাও ভয়াবহ। পায়ে পানি এসে ফুলে ঢোল হয়েছে। একেকবার তিনি নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেন। বিড়বিড় করে বলেন, হাতির পা নাকি? এ্যাঁ হাতির পা?

উদ্ভট উদ্ভট সব চিকিৎসার ভেতর দিয়ে তিনি এখন যাচ্ছেন। ফোলা পায়ে মৌমাছি হুল ফোঁটালে আরাম হবে। তিনি মৌমাছির সন্ধানে লোক পাঠিয়েছেন। কাচের বোয়মে কয়েকটা মৌমাছি ধরে আনাও হয়েছে। তিনি বোয়ামের খোলা মুখ পায়ে অনেকবার চেপে ধরেছেন। কোনো মৌমাছি হল ফুটায় নি। হতাশ হয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন— বদ মৌমাছি! এইগুলারে পানিতে চুবায়া মারো। বোয়ামে পানি ঢেলে মৌমাছি চুবিয়ে মারা হয়েছে, তাতে তাঁর পায়ের সমস্যার কোনো সমাধান হয় নি।

মুখ থেকে রুচি সম্পূর্ণ চলে গেছে। জাউ ভাত হজম হয় না। টক ঢেকুর উঠে। বুক জ্বালাপোড়া করে। এর মধ্যে খবর পেয়েছেন মুসলমান বাড়ির বেশি করে তেল মশলা দেয়া মাংস খেলে রুচি ফিরবে। সেই চেষ্টাও করা হয়েছে। তার ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। ক্রমাগত দাস্ত হচ্ছে। সেবাযত্নের চূড়ান্ত করছে সুলেমান। দাস্ত পরিষ্কার করানো, গোসল করানো, পাখা দিয়ে বাতাস- সব একা করছে। এর মধ্যে সবচে’ কষ্টকর কাজ হলো বাতাস করা। কোনো এক বিচিত্র কারণে শশাংক পালের গায়ে সারাক্ষণ মাছি বসে। মাছি তাড়ানোর জন্যেই বাতাসের আয়োজন। সুলেমান শশাংক পালকে মশারির ভেতর রাখার প্ৰস্তাব দিয়েছিল। শশাংক পাল রাজি হন নি। তাঁর নাকি দমবন্ধ লাগে। সুলেমান ক্লান্তিহীন বাতাস করে যায়, শশাংক পাল ক্লান্তিহীন কথা বলতে থাকেন। রোগের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বেশি কথা বলার সমস্যা শুরু হয়েছে। তাঁর সব কথাই রোগব্যাধি নিয়ে।

সুলেমান!

জি কর্তা?

আমার মরণ তাহলে ঘনায়ে আসছে। কী বলো?

সেই রকমই মনে হয়।

গঙ্গাতে পা ড়ুবায়ে মরতে পারলে ভালো হইত। মৃত্যুর সাথে সাথে স্বর্গ। তোমাদের ধর্মে এই রকম কিছু আছে?

না। তবে তওবা করলে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। তওবা করলে সব গুনা মাফ হয়ে যায়। এই জন্যেই আমাদের ধর্মে মৃত্যুর আগে আগে সবেই তওবা করে।

তোমাদের ব্যবস্থাও তো খারাপ না। শরীরে রোগ নিয়া গলায় পা ড়ুবায়া শুয়ে থাকার চেয়ে বিছানায় চাদর গায়ে দিয়ে তওবা কর।

কথা ঠিক।

তবে সুলেমান, আমি কিন্তু আরো কিছুদিন আছি। কীভাবে বুঝলাম শুনতে চাও?

চাই।

মৃত্যুর আগে কিছুদিনের জন্যে মুখে রুচি ফিরে আসা। রোগী তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া খাদ্য করে। আমার রুচি এখনো ফিরে নাই। কাজেই আছি আরো কিছুদিন।

ভালো বলেছেন কর্তা।

তোমার পুত্ৰ যে নিরুদেশ হয়েছে তার কোনো সন্ধান পেয়েছ?

না।

মনে হয় না। সন্ধান পাবা। অল্পবয়সে যারা গৃহত্যাগী হয় তারা আর ফিরে না। মধ্যবয়সে যারা ঘর ছাড়ে তারা কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে। কী জন্যে জানো?

জি-না।

মধ্যবয়সে ভোগের জন্যে মায়া জন্মে। বুঝেছ এখন?

জি।

তোমার ছেলের নামটা যেন কী?

জহির।

সে ফিরে আসলে তার জন্যে সুসংবাদ ছিল। কিন্তু সে ফিরবে না, এটা একটা আফসোস।

অবশ্যই আফসোস।

দুটা নীল রঙের মাছি শশাংক পালের মুখের উপর ভোঁ ভো করছে। বাতাসের ঝাপ্টায় তাদের কিছু হচ্ছে না। শশাংক পাল হতাশ চোখে মাছি দুটিার দিকে তাকিয়ে আছেন।

 

লাবুসের মা চরম হতাশা এবং বিরক্তি নিয়ে রান্নাঘরে বসে আছেন। কে একজন বিশাল আকারের এক বোয়াল মাছ দিয়ে গেছে। মাছ খাওয়ার মানুষ নেই— শূন্য বাড়ি। উকিল মুনসি গিয়েছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া। তাঁর শিষ্য জালাল খাঁর বাড়িতে। শিষ্য গুরুকে অতি আদরে নিয়ে গেছেন। গানবাজনার ফাঁকে গৃঢ় তথ্য নিয়ে গোপনে আলাপ হবে। আলাপের বিষয় হাবলঙ্গের বাজার। সাধক বাউলরা ‘হাবলঙ্গের বাজার’ কথাটা মাঝে মাঝেই তাদের গানে ব্যবহার করেন। শ্রোতারা আর দশটা বাজারের মতোই হাবলঙ্গের বাজারকে দেখে। এর গূঢ় অর্থ জানে না। গৃঢ় অর্থ সাধকরা জানেন। তাঁরা প্রকাশ করেন। না। বাতেনি বিষয় সাধারণের কাছে প্ৰকাশ করতে নেই। জালাল খাঁ বিশেষ একটা গানের অর্থ নিয়ে অস্থিরতার মধ্যে আছেন। তিনি একভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যাখ্যা সঠিক কি-না ধরতে পারছেন না। গুরুর সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করবেন। গানটা হলো–

‘হাবলঙ্গের বাজারে গিয়া
এক টেকা জমা দিয়া
আনিও কন্যা কিনিয়া মনে যদি লয়’

হাবলঙ্গের বাজার যদি হয় শেষ বিচারের হাশরের মাঠ তাহলে সেখানে এক টাকা জমা দিয়ে কন্যা কেনার অর্থ কী? ‘কন্যা’ মানে কি পুণ্য? পুণ্য তো হাশরের মাঠে কেনা যাবে না। পাপ পুণ্যের বাজার তার আগেই শেষ।

 

লাবুসের মা কাঁচা টাকার মতো ঝকঝকে জীবন্ত বোয়াল মাছ থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না। মাছটা দেখলে যে দু’জন সবচে’ খুশি হতো সে দু’জন নেই। একজন ফিরে আসবে, অন্যজন মনে হয় না ফিরবে।

মা।

লাবুসের মা চমকে পেছনে তাকালেন। কয়েক মুহুর্তের জন্যে মনে হলো তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়েছে। কারণ তাঁর ঠিক পেছনে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লাবুস দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখভর্তি ফিনফিনে দাড়ি গোঁফ। চুল লম্বা হয়েছে। তার গায়ে হলুদ রঙের চাদর। চাদরটা পরিষ্কার। লাবুসের মুখ হাসি হাসি।

লাবুস বলল, বঁটিতে সরিষার তেল দাও মা, সিনান করব। ঘরে সাবান আছে?

লাবুসের মা’র হতভম্ব ভোব কাটছে না। কত স্বাভাবিকভাবেই না। এই ছেলে কথা বলছে। যেন সে কখনো বাড়ি ছেড়ে পালায় নি। আজ সকালে কাজে গিয়েছিল, দুপুরে খেতে এসেছে।

লাবুসের মা প্রাণপণ চেষ্টা করলেন নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। ছেলে যেমন আচরণ করছে তিনিও সে রকমই করবেন। তিনিও ভাব করলেন যেন এই ছেলে ঘরেই ছিল। কখনো পালিয়ে যায় নি। লাবুসের মা স্বাভাবিক গলায় বললেন, উঠানে জলচৌকির উপর বোস। আমি গোসল দিব। গামছা সাবান নিয়ে যা। গরম পানি লাগবে?

না। মা, বোয়ালটায় বেশি করে কাঁচামরিচ দিও। তরকারিতে কাঁচামরিচের গন্ধ এত ভালো লাগে। কাগজি লেবুর গাছটা কি আছে মা?

আছে।

তরকারিতে লেবুর কয়েকটা পাতা দিয়ে দিও, আলাদা ঘ্রাণ হবে। আর কিছু?

ধনিয়া পাতা দিও।

 

লাবুসের মা ফোড়ল দিয়ে ছেলের গায়ে সাবান ডলছেন। ছেলে চোখ বন্ধ করে মূর্তির মতো বসে আছে। লাবুসের মা’র মনে হচ্ছে, রোদে বৃষ্টিতে ছেলের গায়ের রঙের কোনো সমস্যা হয় নি। রঙ যেন ফুটে বেরুচ্ছে।

মনে করে দাড়ি কামাবি।

আচ্ছা। এতদিন পরে কী মনে করে ফিরলি?

স্বপ্ন দেখে মন অস্থির হয়েছে, এইজন্যে ফিরেছি।

কী স্বপ্ন দেখলি?

হরিকাকাকে দেখলাম। উনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, এক্ষণ বাড়ি যা। এক্ষণ বাড়ি না গেলে মায়ের দেখা পাবি না। আমি ভেবেছিলাম দেখব তুমি মৃত্যুশয্যায়।

লাবুসের মা বললেন, দেখলি তো আমি ভালোই আছি। এখন কী করবি, আবার চলে যাবি?

লাবুস শব্দ করে হাসল, যেন তার মা মজাদার কোনো কথা বলেছেন।

লাবুসের মা সেই দিন সন্ধ্যায়। লাবুসের কোলে মাথা রেখে হঠাৎ করেই সন্ন্যাস রোগে মারা গেলেন।

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। লক্ষণ ভালো না। খনা বলেছেন– ‘যদি বর্ষে আগনে, রাজা যান মাগনে।’ এখন অঘাণ মাস। বৃষ্টির কারণে ধুম করে শীত নেমে গেছে। মাওলানার বাড়ির উঠানে বৃষ্টির পানি। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। বিকেলের দিকে বৃষ্টি ধরে এসেছিল, এখন আবার জোরে নেমেছে। পানি বরফের মতো বিধছে। শরীর কাটা দিয়ে উঠছে।

বৃষ্টি মাথায় করে এক লোক মাওলানার উঠানে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর পায়ে গামবুট। মাথায় ছাতা। ছাতায় বৃষ্টি মানছে না। লোক গলা উঁচিয়ে ডাকলেন, মাওলানা সাহেব আছেন?

কেউ জবাব দিল না। তবে ঘরে মানুষ আছে বোঝা যাচ্ছে। দুটা কামরাতেই বাতি জ্বলছে। লোক বারান্দা থেকে উঠানে উঠে এসে দরজায় ধাক্কা দিলেন।

মাওলানা সাহেব আছেন?

দরজা সামান্য ফাঁক করে যমুনা উত্তর দিল, উনি বাড়িতে নাই।

তোমার নাম যমুনা?

যমুনা ভীত ভঙ্গিতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। লোক বললেন, আমি তোমাকে চিনি। তোমার কথা শুনেছি। মাওলানা সাহেব আমার পরিচিত। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দাও। তোমার ভয়ের কিছু নাই।

যমুনা বলল, আপনার পরিচয়? পরিচয় জানতে চাও, না নাম জানতে চাও? একেক সময় একেক নাম নিয়ে চলাফেরা করি। তোমাকে মূল নামটাই বলি। আমার নাম জীবনলাল। জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়। আমাকে কি চিনেছ?

চিনেছি। আপনি ভিতরে আসেন।

আমাকে গা মোছার গামছা দাও। শুকনা কাপড় দাও। যে ঠাণ্ডা লেগেছে। ঠাণ্ডায় মারা যাব। আমার সঙ্গে চা পাতা আছে। চা বানাতে পার পার?

না।

জটিল রান্না না। গরম পানিতে পাতা ছেড়ে দেবে। পানিতে যখন রঙ ধরবে তখন ছেকে দিবে। চিনি দুধ থাকলে দিতে পার। না থাকলেও ক্ষতি নাই।

যমুনা অতি দ্রুত ব্যবস্থা করল। মাওলানার লম্বা পিরান এবং পায়জামা পরে জীবনলাল চৌকিতে বসে রইলেন। তাঁর সামনে মাটির মালশায় কাঠকয়লার আগুন। জীবনলাল আগুনে পা সেঁকছেন। তার হাতে গ্লাসভর্তি চা। শেষ মুহুর্তে তিনি চায়ে আদা দিতে বলেছেন। আদার সুঘ্ৰাণ আসছে।

জীবনলাল বললেন, অতি আরামদায়ক অবস্থা। কিন্তু মাওলানা কোথায়?

যমুনা বলল, উনি তাঁর স্ত্রীকে স্নান করাতে নিয়ে গেছেন।

বিবাহ করেছেন না-কি?

না। উনার মাথায় সামান্য দোষ হয়েছে। উনার ধারণা বিবাহ করেছেন। তার স্ত্রী আছে। স্ত্রীর সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলেন। মাঝে মাঝে রাতে স্ত্রীকে স্নান করাতে নদীতে নিয়ে যান।

আজও নদীতে নিয়ে গেছেন?

হুঁ।

অনেক রকম পাগলের কথা শুনেছি, এরকম শুনি নাই।

যমুনা বলল, বড়ই দুঃখী মানুষ। অনেকরাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, স্ত্রীর সঙ্গে कश्री दब्लনা।

জীবনলাল বললেন, উল্টাও হতে পারে। হয়তো উনি আনন্দে আছেন। কল্পনার স্ত্রী বাস্তবের চেয়ে ভালো হবার কথা।

যমুনা বলল, আপনি কি রাতে এখানে থাকবেন?

না।

খাবেন না?

না। রাতে শশাংক পালের বাড়িতে খাব। এবং রাতেই চলে যাব। যমুনা তুমি বলো— আমাকে দেখতে কি একজন মাওলানার মতো লাগছে?

যমুনা বলল, লাগছে। আপনার দাড়ি আছে, মাওলানার পোশাক পরছেন।

ঘরে কি সুরমা আছে? সুরমা থাকলে চোখে সুরমা দেব।

সুরমা আছে। আতরও আছে।

যমুনা সুরমা এবং আতর। এনে দিল। জীবনলাল বললেন, আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার স্ত্রী হিসেবে তুমি বোরকা পরে যাবে। কোথায় যাবে সেটা বলব না।

যমুনা বলল, আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আপনার সঙ্গে আমি কেন যাব? পরিষ্কার করে বলেন।

জীবনলাল হাই তুলতে তুলতে বললেন, পরিষ্কার করে বলতে পারব না। আমি সুরেনের একটা পত্র নিয়ে এসেছি। পত্র পড়লেই বুঝতে পারবে। তুমি যদি রাজি থাক, আমি ভোর রাতে রওনা হব।

যমুনা হতভম্ব গলায় বলল, কার চিঠি এনেছেন?

জীবনলাল বললেন, সুরেনের। সুরেনকে চেনো না? এই নাও চিঠি। অন্য ঘরে নিয়ে পড়। আমার সামনে পড়তে হবে না। চিঠি শেষ করে আমাকে আরেক গ্লাস চা দিও।

যমুনা সুরেনের চিঠি নিয়ে পাশের কামরায় চলে গেছে। তার হাত-পা কাঁপছে। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে, সে যে-কোনো মুহুর্তে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। চিঠিটা পড়তে পারবে না। জগতে এত বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটে!

সুরেন লিখেছে—

যমুনা,

তুমি জানো না। আমি বিপ্লবীদলে যোগ দিয়েছি। নানান কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। তবে তোমার সব খবর পেয়েছি। যে ভয়াবহ সময় তুমি পার করেছ তা সমস্তই জানি। তখন কিছুই করতে পারছিলাম না। যে মাওলানা তোমাকে আশ্রয় দিয়েছেন তাকে আমার প্রণাম। যদি কখনো তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয় তাহলে আমি অবশ্যই ভক্তিভরে তাকে প্ৰণাম করব।

তোমাকে সাধারণ নিয়মে বিবাহ করার অনুমতি আমি আমার পিতা-মাতা এবং জ্ঞাতি গোষ্ঠীর কাছ থেকে পাব না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ব্ৰাহ্মমতে তোমাকে বিয়ে করব। বিশ্বাস করো, অতীতে তোমার জীবনে কী ঘটেছে তা আমার মাথায় নাই। কোনোদিন থাকবেও না। বিয়ের পর আমরা দুইজনেই দেশমাতৃকার চরণে জীবন উৎসর্গ করব। তুমি জীবনলালের সঙ্গে চলে আসবে। বন্দে মাতরম।
সুরেন

একটা গুরুত্বপূর্ণ চিঠি মানুষ কতবার পড়ে? বেশ কয়েকবার। যমুনা একবারই মাত্র চিঠিটা পড়ল এবং চিঠি মুঠিবদ্ধ করে বৃষ্টির মধ্যে ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল। তার শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে প্ৰচণ্ড জ্বর আসছে। কোনোকিছুই সে স্পষ্ট দেখতে পারছে না।

 

হরিচরণের কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে যমুনা বসে আছে। মনে মনে বলছে, হরিকাকু, আমার জীবন যে এরকম হবে আমি জানতাম। আপনি আমাকে আশীৰ্বাদ করেছিলেন। সুরেনের চিঠি আপনাকে দেখানোর জন্যে আমি নিয়ে এসেছি। যমুনা কবরের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে হাঁটু গেড়ে আছে। তার মাথার দীর্ঘচুল মাটিতে লুটাচ্ছে। তার শরীরে অঝোর ধারায় বৃষ্টির পানি পড়ছে। সে ঠিক করেছে, ভোরের আলো না ফোঁটা পর্যন্ত সে এইভাবেই থাকবে। একচুলও নড়বে না।

 

মাওলানা ঘরে ফিরেছেন। জীবনলালের সঙ্গে আগ্রহের সঙ্গে গল্প করছেন। জীবনলাল বললেন, যমুনা মেয়েটা হঠাৎ করে কোথায় চলে গেল? ডেকেও পাচ্ছি না। তার কাছে আরেক গ্লাস চা চেয়েছিলাম।

মাওলানা বললেন, সে তার ভাবির সঙ্গে গল্প করতেছে। মেয়েদের নিজেদের অনেক কথা থাকে।

আপনি আপনার স্ত্রীকে নদীতে স্নান করিয়ে এনেছেন?

জি জনাব। হঠাৎ শখ করেছে নদীতে স্নান করবে। মেয়েদের ছোটখাটো শখ মেটানো উচিত। এতে নবিয়ে করিম (দঃ) খুশি হন।

ভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনার তো খুব ভালো চিকিৎসা হওয়া প্রয়োজন।

মাওলানা বললেন, আমার চিকিৎসা হওয়ার প্রয়োজন নাই জনাব। আমার শরীর ভালো আছে। শশাংক বাবুর চিকিৎসা দরকার, উনি বিরাট কষ্টে আছেন।

সবাইকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।

মাওলানা বললেন, আপনার কথায় সামান্য ভুল আছে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা কোনো পাপ করেন নাই। কিন্তু কঠিন কষ্টের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন। আল্লাহপাকের অনেক ইচ্ছাই বুঝা মুশকিল। আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি অতি সীমিত। একটু বসেন, আপনার ভাবি সাহেব আমাকে ডাকে।

আমি কিন্তু কোনো ডাক শুনি নাই।

চুড়ির শব্দ করে ডেকেছে। মুখে কিছু বলে নাই। মেয়েদের গলার স্বর পরপুরুষের শোনা নিষেধ বলেই কথা বলে নাই।

জীবনলাল বললেন, বৌদি কী বলেন, শুনে আসুন।

মাওলানা চলে গেলেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত হলেন। হাসিমুখে বললেন, আপনার ভাবি সাহেব আপনাকে খানা খেতে বলেছেন। আয়োজন সামান্য। আলুভর্তা। ডিমের সালুন। বেগুন দিয়ে ডিমের সালুন সে ভালো রান্না করে।

জীবনলাল বললেন, বৌদির রান্না আমি আরেকদিন এসে খেয়ে যাব। আমাকে এখন শশাংক পালের বাড়িতে যেতে হবে। উনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। খাওয়া-দাওয়া উনার ওখানেই করব।

আপনার ভাবি সাব মনে কষ্ট পাবেন।

আপনি বুঝিয়ে বলবেন। ভালো কথা, আমি আপনার জন্যে একটা উপহার এনেছি।

কী উপহার?

আপনাকে বলেছিলাম, ভাই গিরিশের বাংলা কোরান শরীফ আপনাকে দেব। নিয়ে এসেছি।

আলহামদুলিল্লাহ। কী বলেন! আপনার মনে ছিল? আমি নিজে ভুলে গিয়েছিলাম।

আমি ভুলি নাই। ভাই আমি উঠি। আপনি যমুনা মেয়েটিকে খুঁজে বের করুন। সকালে সে আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবে। তার অতি নিকট একজন তাকে গ্রহণ করেছেন। ব্ৰাহ্মমতে তারা বিবাহ করবে।

শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।

 

শশাংক পালকে দেখে জীবনলাল সত্যিকার অর্থেই দুঃখিত হলেন। জড় পদার্থের মতো একজন মানুষ। সমস্ত শরীরে পানি এসেছে। চোখ ঘোলাটে। কথাবার্তা সম্পূর্ণ এলোমেলো। ক্ষণে ক্ষণে মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। জীবনলাল বললেন, আমাকে চিনেছেন?

শশাংক পাল বললেন, কেন চিনব না? আপনি বিশিষ্ট চিকিৎসক। আমার চিকিৎসার জন্যে এসেছেন। ঠিকমতো চিকিৎসা করেন। পয়গাম পাবেন সোনার মোহর।

আমার নাম জীবনলাল। জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়।

নামে কিছু যায় আসে না। আপনার পরিচয় আপনার চিকিৎসায়। বৃক্ষকে জিজ্ঞাস করা হলো, বৃক্ষ তোমার নাম কী? বৃক্ষ বলল, ফলেন পরিচয়তে। অর্থাৎ ফলে পরিচয়। আপনার বেলাতেও তাই- আপনার পরিচয় চিকিৎসায়। চিকিৎসা কখন শুরু করবেন?

আগে রোগ নির্ণয় করি, তারপর চিকিৎসা।

অতি সত্য কথা। তবে রোগ নির্ণয়ের কিছু নাই। আমার রোগের নাম মৃত্যুরোগ। মৃত্যুরোগের চিকিৎসা নাই এইটাও জানি। শুধু ব্যবস্থা করে দেন একবেলা যেন আরাম করে খেতে পারি। জামাই পছন্দ চালের পোলাও, ঝাল দিয়ে রান্না কচ্ছপের ডিম, মুরগি মোসাল্লাম। ভরপেট খাব। তারপর তেঁতুলের টকা খাব জামবাটিতে এক বাটি। তেঁতুলের টিকে জিরাবাটা দিতে হবে। সামান্য গোলমরিচ। গৌরীপুরের মহারাজার বাড়িতে একবার খেয়েছিলাম। স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

জীবনলাল বললেন, আপনার কি ধনু শেখের কথা মনে আছে?

শশাংক পাল বললেন, কেন মনে থাকবে না! উনি বিশিষ্ট ব্যক্তি- খান সাহেব।

এখন আরো বিশিষ্ট হয়েছেন। এখন তিনি খান বাহাদুর। বলুন মারহাবা।

শশাংক পাল বললেন, মারহাবা।

উনার পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়েছিল। গ্যাংগ্রিন আরাম হয়েছে। এখন তিনি ঠ্যাং কাটা খান বাহাদুর।

শশাংক পাল আনন্দিত গলায় বললেন, আপনি উনার চিকিৎসা করেছেন? আপনি তো মহাশয় ব্যক্তি। আমার চিকিৎসা শুরু করেন। আমার ধারণা আমার উদরি রোগ হয়েছে। যে চিকিৎসক খান সাহেব ধনু শেখকে আরোগ্য করেছে সে আমাকেও পারবে।

জীবনলাল বললেন, যত কঠিন রোগই আপনার হোক আপনাকে কিন্তু কাবু করতে পারে নাই। অন্যের জায়গা জমি দখল করে আরামে বাস করছেন। এই বিষয়সম্পত্তির মালিক কে বলুন তো দেখি?

শশাংক পাল বললেন, মালিক কেউ না। মানুষ সামান্য দিন ভোগ করতে আসে। কেউ ভোগ করতে পারে কেউ পারে না। যার জমি তারই থাকে।

কথা মন্দ বলেন নাই। জীবনের শেষ পর্যায়ে সবাই ভালো ভালো কথা বলে।

শশাংক পাল বললেন, ভালো ভালো কথা বলে না। সাধারণ কথাই বলে। অন্যদের শুনতে ভালো লাগে।

জীবনলাল বললেন, আপনি কিন্তু আমাকে ঠিকই চিনেছেন। চিনেও না চেনার ভান করেছেন। মৃত্যুর কাছাকাছি সময়েও আপনার বুদ্ধি ঠিক আছে। সচরাচর এরকম দেখা যায় না। এখন বলুন আমাকে চিনেছেন না?

হুঁ। আপনার বন্ধু শশী মাস্টার। তার কি ফাঁসি হয়েছে?

হয়েছে।

শশাংক পাল দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, মানুষটা ভালো ছিল। নিজের মনে গান করত, নিশি রাতে কলের গান বাজাত। জীবনের আনন্দ কিছুই দেখল না। ফাঁসিতে ঝুলে পড়ল। ভালো কথা, আপনি কি আমাকে শাস্তি দিতে এসেছেন?

জীবনলাল বললেন, যে শাস্তি আপনি পাচ্ছেন তাই যথেষ্ট।

শশাংক পাল বলল, শুনে আরাম পেয়েছি। আপনাকে দেখে কলিজা নড়ে গিয়েছিল। ভাবলাম ধনু শেখ যেমন গুলি খেয়েছে, আমিও খাব।

জীবনলাল বললেন, আমার ক্ষুধা পেয়েছে। খাবারের আয়োজন করেন।

অবশ্যই। অবশ্যই খাওয়ার আয়োজন করব। সপ্ত ব্যঞ্জন থাকবে। নিজে খেতে পারি না তাতে কী। অন্যের খাওয়া আগ্রহ করে দেখি। কী খেতে চান বলেন? কচ্ছপের ডিম খাবেন? সংগ্রহ করে রেখেছি।

নিরামিষ খাব।

বিধবার খাবার খেয়ে কী করবেন? এখনো হজমের ক্ষমতা যখন আছে— আরাম করে খান। যখন হজমের ক্ষমতা চলে যাবে তখন ঘাস লতাপাতা খাবেন।

 

জীবনলাল খেতে বসেছেন। আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন শশাংক পাল। যেন অতি আনন্দময় দৃশ্য দেখছেন। শশাংক পাল বললেন, খবরাখবর কিছু বলেন, আপনার কাছ থেকে শুনি। গান্ধিজি না-কি ডিগবাজি খেয়েছেন?

জীবনলাল বললেন, ডিগবাজি খেয়েছেন কি-না জানি না, তবে অহিংস আন্দোলন থেকে উনার মন উঠে গেছে।

এটা ভালো না খারাপ?

সময় বলবে ভালো না খারাপ।

আরেকটা যুদ্ধ নাকি হবে?

হতে পারে। মানুষ যুদ্ধ পছন্দ করে। মুখে বলে শান্তি শান্তি। পছন্দ করে যুদ্ধ। তবে আনন্দের কথা, হিটলার সাহেব রাশিয়ার স্তালিনের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। এরা কেউ কারো বিরুদ্ধে কোনো দিন যুদ্ধ করবে না।

বাহ ভালো তো।

দুই পররাষ্ট্র সচিব চুক্তিতে দস্তখত করেছেন। জার্মানির পক্ষে রিবেনট্রোপ, রাশিয়ার পক্ষে মালোটভ। চুক্তি সইয়ের দশদিনের মধ্যে দুই দেশ পোলান্ড আক্রমণ করে পোলান্ড ভাগাভাগি করে নিয়ে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগল বলে।

বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আমরা কার পক্ষে থাকব?

আমরা থাকব জাপানের সম্রাট হিরোহিতের পক্ষে। নেতাজির তাই ইচ্ছা। এশিয়ানরা থাকব এশিয়ানদের সঙ্গে।

শশাংক পাল বললেন, অবশ্যই। শরীরটা সুস্থ থাকলে আমি যুদ্ধে চলে যেতাম। সবই দেখা হয়েছে, যুদ্ধ দেখা হয় নাই। যুদ্ধ দেখার মধ্যেও মজা আছে। কী বলেন?

জীবনলাল হেসে ফেললেন।

শশাংক পাল বললেন, খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছেন?

পেয়েছি।

ধূমপান করবেন? ভালো তামাক আছে। মেশক-এ-আম্বুরী।

জীবনলাল বললেন, ধূমপান করব না। আপনার আতিথেয়তায় আনন্দ পেয়েছি। আমি আপনাকে বিশেষ এক চিকিৎসার কথা বলতে পারি। চিকিৎসাটা করে দেখতে পারেন। রেইন ফরেষ্টের পিগমী জাতীয় মানব গোষ্ঠীর কেউ কেউ জীবনের শেষ চিকিৎসা হিসেবে এই চিকিৎসা করেন।

শশাংক পাল আগ্রহ নিয়ে বললেন, চিকিৎসাটা কী বলুন। যত অৰ্থ ব্যয় হয় হবে। চিকিৎসা করব। টাকা এখন আমার কাছে তেজপাতা।

জীবনলাল বললেন, এই চিকিৎসায় কোনো খরচ নাই। আপনাকে একটা স্বাস্থ্যবান গাছ খুঁজে বের করতে হবে। তারপর নগ্ন অবস্থায় এই গাছ জড়িয়ে ধরতে হবে। বারবার বলতে হবে— হে বৃক্ষ, তুমি আমার রোগ গ্রহণ করে আমাকে রোগমুক্ত কর।

কতবার বলতে হবে?

এর কোনো হিসাব নাই। দিনের পর দিন বলতে হবে। এক মুহুর্তের জন্যেও গাছের স্পর্শ থেকে দূরে থাকা যাবে না। কোনো খাদ্য খাওয়া যাবে না। পারবেন?

পারব। নগ্ন হওয়া লজ্জার বিষয়। মরতে বসেছি, এখন আর লজ্জা কী? আসছি নেংটা, যামু নেংটা। আপনি এখনি শুয়ে পড়বেন? আসুন আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজব করি। রাতে আমার ঘুম হয় না। আগে মদ্যপান করে ঘুমাতাম, এখন মদ্যপানও করতে পারি না। আফসোস।

জীবনলাল বললেন, আমি রাতে থাকব না, চলে যাব। মন দিয়ে আমার কথা শুনুন। জহির নামে কেউ যদি আসে তাকে বিষয়সম্পত্তি সব বুঝিয়ে দেবেন।

শশাংক পাল বললেন, অবশ্যই। অবশ্যই। মা কালীর চরণ স্পর্শ করে প্ৰতিজ্ঞা করলাম।

আমি কিন্তু আবার আসব।

যতবার ইচ্ছা আসেন। কোনো সমস্যা নেই। শশাংক পাল সারাজীবন এক কথা বলে।

 

হরিচরণের কবরের পাশে সকাল থেকেই জবুথবু হয়ে এক লোক বসে আছে। তার পা নগ্ন, চোখ রক্তাভ। মাথার চুল উসকু খুসকু। তার গায়ে হলুদ রঙের চান্দর। চাদরের প্রায় সবটাই মাটিতে। কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে আছে।

মসজিদের নতুন মাওলানা দৃশ্যটা লক্ষ করছেন। তিনি একসময় এগিয়ে এলেন। কঠিন গলায় বললেন, তুই কে?

চোখ তুলে তাকাল। জবাব দিল না।

বোবা কালা না-কি? তোর নাম কী?

লাবুস।

তোর নাম লাবুস? হিন্দু?

মুসলমান।

দেখি চার কলেমা বল। শুনে দেখি মুসলমান কি-না। খৎনা হয়েছে?

লাবুস বলল, তুই কে?

মাওলানা করিম হতভম্ব। বদমাইশ তুই তুই করছে। এত বড় বেয়াদবি এর আগে তার সঙ্গে কেউ করে নাই। মাওলানা করিম বললেন, এখানে বসে আছিস কী জন্যে?

আমার ইচ্ছা।

আমি জুম্মাঘরের ইমাম। আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বল।

তুই আগে আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বল। আদবের সঙ্গে কথা বল।

মাওলানা করিম বললেন, তুই তো বিরাট বেয়াদব। তোকে আগে কখনো দেখি নাই। তুই কোন গ্রামের?

লাবুস বলল, আরেকবার আমারে তুই করে বললে টান দিয়ে তোর লুঙ্গি খুলে ফেলব।

কী বললি?

কী বলেছি তুই শুনেছিস। আমি বলেছি আরেকবার আমাকে তুই বললে আমি টান দিয়ে তোর লুঙ্গি খুলব। তারপরেও তুই করে বলেছিস। এখন লুঙ্গি খোলার টাইম।

লাবুস উঠে দাঁড়াল। গায়ের চাদর খুলে পাশে রাখল। মাওলানা করিম আর এক মুহুৰ্তও দেরি করলেন না। বোঝাই যাচ্ছে এই লোক পাগল। পাগলকে বিশ্বাস নাই। মাওলানা করিম উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন। একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন না। পেছনে তাকালে দেখতেন তাকে কেউ অনুসরণ করছে না। লাবুস আগের জায়গাতেই বসে আছে। মাটিতে ফেলে দেয়া চাদর এখন তার গায়ে।

মাওলানা করিম সোহাগগঞ্জ বাজারের কাছাকাছি এসে থামলেন। অতিরিক্ত পরিশ্রমে তার বুক ধড়ফড় করছে। এখন তিনি লজ্জার মধ্যে পড়েছেন। অনেকেই তাকে দৌড়াতে দেখেছে। তাদের মধ্যে নানান প্রশ্ন জাগবে। কী উত্তর দেবেন? তার লুঙ্গি খুলে ফেলবে এই কথা তো বলা যাবে না। তাঁর এখন অনেক ইজ্জত। লোকজন তাকে মানে। খুৎবার সময় যে কঠিন বক্তৃতা দেন তা শোনে। দোজখের বর্ণনা তাঁর মতো কেউ দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন না। তার সবচে’ বড়গুণ দোজখের বর্ণনা দিতে দিতে ভয়ে অস্থির হয়ে কেঁদে ফেলা। নকল কান্না না। আসল কান্না। এই দৃশ্য বান্ধবপুরের কেউ আগে দেখে নি। তাঁর নাম ফাটছে। জুম্মাবারে দূর দূর থেকে লোকজন নামাজ পড়তে আসছে।

প্রথমবারের মতো তিনি উরসের আয়োজনও করছেন। উরস হবে। মোহাম্মদ আহম্মদ সাহেবের (হরিচরণ) নামে। তিনি স্বপ্নে পেয়েছেন। কবরে শায়িত এই ব্যক্তি অনেক বড় মর্যাদার আসন পেয়েছেন। উরসের তারিখ পড়েছে ২ ফাল্লুন। বৃহস্পতিবার। উরস উপলক্ষ্যে বড় বড় আলেমরা আসবেন। বিয়ান হবে। পাক কোরানের তফসির করা হবে। খানা চলবে সারাদিন। রাত বারোটা এক মিনিটে আখেরি মোনাজাত হবে। মোনাজাত তিনি নিজে পরিচালনা করবেন।

যে মাওলানা অতি অল্পসময়ে বান্ধবপুরে এমন মর্যাদার আসনে চলে গেছেন তিনি লুঙ্গি খুলে ফেলার ভয়ে প্ৰাণপণে দৌড়াচ্ছেন এটা ভেবে মাওলানার চোখে পানি আসার মতো হলো। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, পবিত্র উরসের দিনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বদমায়েশটাকে এমন শাস্তি দেয়া হবে যা সে বাকি জীবন মনে রাখবে।

 

হলুদ চাদর গায়ে অচেনা এক লোক হরিচরণের বাগানে ঘুরঘুর করছে। শশাংক পালের বিরক্তির সীমা রইল না। বাগানে বাইরের লোক যেন না চুকে এমন নিষেধ দেয়া আছে। তারপরেও হুট হাট করে লোকজন কীভাবে ঢুকে? শশাংক পাল লোকটিকে ডেকে পাঠালেন। কঠিন গলায় বললেন, নাম কী?

লাবুস।

বাগানে ঘুরঘুর কর কেন? কী চাও? মতলব কী?

কিছু চাই না। আমার কোনো মতলব নাই।

শশাংক পাল বললেন, ফালতু কথা বলব না। চেহারা দেখেই বোঝা যায় তুমি মতলব নিয়া আসছে। পিতার নাম কী?

সুলেমান।

শশাংক পাল কিছুক্ষণ পিটপিট করে লোকটির দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, তোমার আসল নাম কি জহির?

লোকটি বলল, একসময় নাম জহির ছিল। এখন লাবুস।

লাবুস নামই ভালো। সবেরে এই পরিচয় দিবা। জহির পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন নাই। তা বাবা তুমি দেশান্তরী ছিলা, সেইটাই তো ভালো ছিল। আবার কেন এসেছ?

একটা কাজ সমাধা করার জন্যে এসেছি। কাজ সমাধা করে চলে যাব।

ভালো, খুবই ভালো। যাতায়াতের খরচ আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে। কোনো অসুবিধা নাই। তা বাবা কী কাজ সমাধা করার জন্যে আসছ? আপত্তি না থাকলে তুমি আমারে বলে।

আমি আমার মাকে খুন করতে আসছি। তার নাম জুলেখা।

শশাংক পাল বললেন, তাকে চিনি। ভালোমতো চিনি। তাকে খুন করার বাসনা হওয়া স্বাভাবিক। আমি তার পুত্র হলে আমিও এই কাজ করতাম। সে বান্ধবপুরে নাই। কলিকাতায় থাকে। কলিকাতায় গিয়া খোঁজ নাও। রাহাখরচ আমি দিতেছি।

আপনি কেন দিবেন?

খুশি হয়ে দেব। তোমার পিতার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা আছে, সেই দাবিতে দিব। তাছাড়া আমার শরীর খারাপ। দুই একদিনের মধ্যে জংলি এক চিকিৎসা শুরু করব। মারি না বাঁচি নাই ঠিক। কিছু দান খয়রাত এই কারণে করতে মন চায়। তোমারে দুইশ’ টাকা দেই।

এত টাকা!

আচ্ছা যাও, আরো বাড়ায়া দিলাম। আড়াইশ’। তুমি আজই রওনা দিয়ে দাও।

 

ফাল্গুন মাসের দুই তারিখ মহা ধুমধামে উরশ শুরু হয়েছে। লালসালুর কাপড় দিয়ে পুরো অঞ্চল ঘিরে দেয়া হয়েছে। শত শত আগরবাতি জ্বলছে। দূর থেকে আতরের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মঞ্চ করা হয়েছে। মঞ্চে দু’জন মাওলানা বসে আছেন। তৃতীয় একজন মাওলানার আসার কথা, তিনি এখনো এসে পৌঁছান নি।

শিন্নি গ্ৰহণ করার আলাদা জায়গা করা হয়েছে। গরু শিনি দেয়া নিষেধ (হরিচরণ নাকি স্বপ্নে এরকম নির্দেশই দিয়েছেন) বলেই খাসি, মুরগি, হাঁস আসছে। একজন একটা মহিষ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। মহিষের বিষয়ে কী করা হবে সেই সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। প্রচুর লোকজন জড়ো হয়েছে, আরো আসছে।

 

হরিচরণের বাড়ির সামনেও কিছু লোকজন জড়ো হয়েছে। কারণ শশাংক পাল অদ্ভুত চিকিৎসা শুরু করেছেন। তার ধারণা এই চিকিৎসায় ফল হবে।

শশাংক পাল নগ্ন হয়ে হরিচরণের বাড়ির সামনের শিউলি গাছ জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। তিনঘণ্টা পার হয়ে গেছে। দর্শনার্থীরা ব্যাপার-স্যাপার দেখে কিছুটা ভীত। সাহস করে কেউ কাছে আসছে না। শশাংক পাল সবাইকে ধমকাচ্ছেন— ভাগো। ভাগো। নেংটা মানুষ এর আগে কোনোদিন দেখো নাই? বদের দল।

মওলানা ইদরিসও দেখতে গেলেন। তার চোখে পানি এসে গেল। আহা বেচারা! তিনি ক্ষীণস্বরে বললেন, একটা চাদর দিয়ে ঢেকে দিলে হয় না?

শশাংক পাল ধমকে উঠলেন, ঢাকাঢাকি চলবে না, জংলি চিকিৎসার এইটাই १छ्झ।

মাওলানা বললেন, কিছু আরাম কি বোধ হচ্ছে?

শশাংক পাল বললেন, এখনো কিছু বুঝতে পারছি না। বিষ পিঁপড়ায় কামড়াচ্ছে, এর একটা উপকার থাকতেও পারে।

বৃষ্টি হলে কী করবেন?

ভিজতে হবে, কিছু করার নাই। বাদ জংলিগুলা এই চিকিৎসা বের করেছে। থাপড়ায় এদের দাঁত ফেলে দেয়া দরকার ছিল।

শশাংক পাল চোখ বন্ধ করলেন। কথা বলে নষ্ট করার সময় তার নেই। গাছের কাছে প্রার্থনায় যেতে হবে। হে বৃক্ষ! আমাকে রোগমুক্ত কর।

নগ্ন একজন মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে লজ্জা লাগছে। মাওলানা অন্যদিকে তাকিয়ে বসে আছেন। মানুষটার জন্যে তার হঠাৎ করে বড় মায়া লাগছে।

সন্ধ্যার আগেই বৃষ্টি নামল। শশাংক পাল ভিজছেন। মাওলানাও ভিজছেন। শশাংক পাল মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, আপনার ঘটনা। কী? আপনি কেন ভিজতেছেন? যান, বাড়িতে যান।

মাওলানা তারপরেও বসে রইলেন।

 

রাতের অন্ধকারে কুপকূপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কে একজন মাওলানা ইদরিসের বাড়িতে ঢুকেছে। কালো বোরকায় তার শরীর ঢাকা। মুখ খোলা, তবে মুখ ছাতায় ঢাকা। মহিলা বাড়িতে উঠে বাতি জ্বালাল। উঠানে রাখা কলসির পানিতে পায়ের কাদা মুছতে মুছতে নিচু গলায় গাইল—

যমুনায় জল নাই গো
জল নাই যমুনায়
আইজ রাধা কোনবা গাঙে যায়।

মহিলা কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে এসেছেন। তিনি পুঁটলি খুলে নতুন শাড়ি বের করলেন। শাড়ির রঙ কমলা। তিনি আয়নায় নিজেকে দেখে সামান্য হাসলেন। আর তখনি ছপছপ শব্দ তুলে উঠানে মাওলানা এসে দাঁড়ালেন। অভ্যাস মতো ডাকলেন, বউ!

বাড়ির ভেতর থেকে পরিষ্কার জবাব এলো, কী?

মাওলানা চমকে উঠলেন। চমকে উঠার কোনো কারণ নেই। স্ত্রী ঘরে আছে, ডাকলে সে তো জবাব দেবেই। কিন্তু…

মাওলানা বললেন, বৌ একটা ঘটনা ঘটেছে।

‘কী ঘটনা?’ বলে বাড়ির ভেতর থেকে জুলেখা বের হয়ে এলো। সহজ স্বাভাবিক গলায় বলল, ভেতরে আসেন, বলেন ঘটনা। কী? মন দিয়া শুনি।

মাওলানা অস্থির ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে। সমস্যাটা বুঝতে পারছেন না।

জুলেখা বলল, এইভাবে তাকায়া কী দেখেন?

মাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, বউ, আমার মাথায় কী জানি হয়েছে।

জুলেখা বলল, আমি খবর পেয়েছি। এখন আমি আপনার সঙ্গে আছি। আপনার মাথা আমি ঠিক করে দিব। ইশ, কী ভিজাই না ভিজেছেন! গরম পানি করে দেই, সিনান করেন।

মাওলানা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

 

সময় সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ, ১৯৩৯, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড যুদ্ধ ঘোষণা করেছে জার্মানির বিরুদ্ধে। পৃথিবী অপেক্ষা করছে আর এক মহাযুদ্ধের জন্যে।

মানবজাতি অপেক্ষা পছন্দ করে না। তারপরেও তাকে সবসময় অপেক্ষা করতে হয়। ভালোবাসার জন্যে অপেক্ষা, ঘৃণার জন্যে অপেক্ষা, মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা, আবার মুক্তির জন্যে অপেক্ষা।

শশাংক পাল যেমন গাছ জড়িয়ে ধরে অপেক্ষা করেন, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফাঁসির দড়ির দিকে তাকিয়ে বিপ্লবীরাও অপেক্ষা করেন। অপেক্ষাই মানবজাতির নিয়তি।

[প্রথম খণ্ড সমাপ্ত]

মধ্যাহ্ন – দ্বিতীয় খণ্ড

মধ্যাহ্ন – দ্বিতীয় খণ্ড

কলকাতা সমাচার পত্রিকায় মৎস্যকন্যা বিষয়ে একটা খবর ছাপা হয়েছে। প্রথম পাতায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা সংবাদ। পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি অরুণাভ বিশ্বাস জানাচ্ছেন্ন

জীবিত মৎস্যকন্যা ধৃত
(অরুণাভ বিশ্বাস প্রেরিত)

কালীগঞ্জে গঙ্গার মোহনায় একটি মৎস্যকন্যা জীবিত অবস্থায় ধীবরদের জালে ধূত হয়। মৎস্যকন্যাকে এক নজর দেখিবার জন্যে শত শত লোক কালীগঞ্জে জমায়েত হয়। প্রত্যক্ষদশীর জবানিতে জানা যায়মৎস্যকন্যার চুল সোনালিচক্ষের রঙও সোনালি। গাত্রবর্ণ নীলাভ। ধূত হইবার পর হইতেই সে ক্রমাগত তাহার বাম হস্ত নাড়িতেছিল এবং দুৰ্বোধ্য ভাষায় বিলাপের মতো ধ্বনি করিতেছিল। তাহার চোখ হইতে ঈষৎ বাদামি বর্ণের অশ্রু নির্গত হইতেছিল। ধৃত হইবার দুই ঘণ্টার মধ্যে অঞ্চলের কিছু বিশিষ্টজনের প্ররোচনায় তাহাকে হত্যা করা হয়। অসমর্থিত এক সংবাদে জানা যায় যেমৎস্যকন্যার মাংস আহার করিলে চিরযৌবন লাভ হয়। এই বিশ্বাসে মৎস্যকন্যাকে কাটিয়া তাহার মাংস অতি উচ্চমূল্যে বিক্রয় করা হইয়াছে। এই বিষয়ে পুলিশি মামলা হইয়াছে। পুলিশের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি নিয়া পর্যালোচনা করা হইয়াছে এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। যাহারা এই বর্বর কর্ম করিয়াছেনতাহারা বর্তমানে পলাতক।

কলিকাতা সমাচার বান্ধবপুরে আসে না। সুলতান মিয়া নামে এক লোক পত্রিকা নিয়ে উপস্থিত হলো। শুধু পত্রিকা নাসে মৎস্যকন্যার দুই পিস মাংসও না-কি এনেছেএমন গুজব ছড়িয়ে পড়ল। সুলতান মিয়া নতুন লঞ্চ কোম্পানি লক্ষ্মী নেভিগেশনে বাবুর্চির কাজ করে। সোহাগগঞ্জ বাজারের হোটেলে মাঝেমধ্যে রাত কাটায়। তার বয়স ত্ৰিশের কাছাকাছি। ধূর্ত চোখ। হাত-পা সরু হাঁটে কুজো হয়ে তার থুতনিতে এক গোছা দাড়ির কারণে তাকে দেখায় আলাদিনের চল্লিশ চোরের এক চোরের মতো। লঞ্চ-স্টিমারের বাবুচরা বিনয়ী হয়সে উদ্ধত প্রকৃতির।

সুলতান মিয়া মৎস্যকন্যার মাংস নিয়ে এসেছে শুনে শশাংক পাল তাকে ডেকে পাঠালেন। একজীবনে তিনি নানান ধরনের মাংস খেয়েছেন। মৎস্যকন্যার মাংস খাওয়া হয় নি

শশাংক পালের এখন শেষ সময়। সারা শরীর ফুলে উঠেছেশরীরে সাৰ্ব্বক্ষণিক ব্যথা সেই ব্যথা ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে কালো পিঁপড়ায় কামড়ালে ব্যথা খানিকটা কমে। শশাংক পালের নিজের লোক সুলেমানের প্রধান কাজ হচ্ছেকালো পিপড়া ধরে এনে শশাংক পালের গায়ে ছেড়ে দেয়া। পিঁপড়া ছাড়ার পর পর শশাংক পাল কাতর গলায় বলেনকামড় দে বাবারা কামড় দে। তোদের পায়ে ধরি জমিদার শশাংক পাল তোদের পায়ে ধরছে ঘটনা সহজ না ঠিকমতো কামড় দেপিরিচে মধু ঢেলে তোদের খেতে দিব। আরাম করে মধু খাবি।

পিঁপড়াদের খাবারের জন্যে পিরিচে। সত্যি সতি্যু মধু ঢেলে রাখা হয় বিচিত্র কারণে পিঁপড়ারা মধু খাওয়ার কোনো আগ্রহ দেখায় না। শশাংক পাল নিজের গায়ে মধু মেখে দেখেছেন। পিঁপড়ারা তার সারা শরীরে হাঁটেমধু মাখা অংশের ধায়েকাছে যায় না

কালো পিঁপড়া কামড়ালে ব্যথা কমেএই তথ্য তিনি আবিষ্কার করেছেন গাছ-চিকিৎসা করতে গিয়ে গাছ-চিকিৎসায় পুরুন্টু কোনো একটা গাছকে জড়িয়ে ধরে থাকতে হয় এবং মনে মনে বলতে হয়- ‘হে বৃক্ষ! তুমি আমার রোগ তোমার শরীরে ধারণ করে আমাকে রোগমুক্ত কর।’ রোগমুক্তি না হওয়া পর্যন্ত গাছ জড়িয়ে থাকার নিয়ম। প্রবল বৃষ্টি এবং গাছের একটা ডাল ভেঙে পড়ার কারণে আট ঘণ্টার মধ্যেই শশাংক পাল বিশেষ এই চিকিৎসার ইতি ঘোষণা করেন। লাভের মধ্যে কালো পিঁপড়ায় কামড়ালে ব্যথা কমে এই তথ্য আবিষ্কার করেন।

সুলতান মিয়া খবর পেয়ে শশাংক পালের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সে সরাসরি তাকাতে পারছে নাকারণ শশাংক পাল সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় পাটিতে শুয়ে আছেন শীতলপাটির উপর কলাপাতা বিছানো একজন নিমগাছের ডাল দিয়ে তাকে বাতাস দিচ্ছে। নিমপাতার হাওয়া শরীরের জন্যে উপকারী শশাংক পাল কিছুক্ষণ আগে বমি করেছেন। মুখ ধোয়া হয় নি। বেশ কিছু পুরুষ্ট নীল রঙের মাছি মুখের চারপাশে উড়াউড়ি করছে। নিমপাতার হাওয়ার কারণে মুখে বসতে পারছে না। তারা হতোদ্যম হয়ে চলেও যাচ্ছে না। রবার্ট ব্রুসের ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা করেই যাচ্ছে।

শশাংক পাল বললেনশরীরে কাপড় রাখতে পারি না। শরীর জ্বালা করে। এই জন্যে ন্যাংটা হয়ে আছি। বুঝেছ?

সুলতান মিয়া হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল

শশাংক পাল বললেনতোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি বিদেশী মানুষ। তুমি কি আমাকে চেনো?

সুলতান মিয়া আবারো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

আমার সম্বন্ধে কী জানো অল্পকথায় বলে সারমর্ম বলবাইতিহাস শুরু করবা না। ইতিহাস শোনার সময় আমার নাই। জীবনের শেষপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছি। এখন ঝটপট বলোআমি কে?

আপনি জমিদার শশাংক পাল

একসময় জমিদার ছিলাম। আমার রক্ষিতা ছিল চারজন। এখন আমি ফালতু। শশাংক পালবালস্য বাল। হা হা হা।

শশাংক পাল হেঁচকি না ওঠা পর্যন্ত হাসলেন। অতি কষ্টে বললেনলোকমুখে শুনেছি। তুমি না-কি মৎস্যকন্যার মাংস নিয়ে এসেছ?

সুলতান মিয়া হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশাংক পাল বললেনমাথা নাড়ােনাড়ি বন্ধ। হ্যাঁ  বলবা কিংবা না বলবা মৎস্যকন্যার মাংস এনেছ?

হ্যাঁ

কতখানি এনেছ?

দুই পিস। এক পিস বিক্রি করে দিয়েছি। আরেক পিস আছে।

মৎস্যকন্যার মাংস খেলে চিরযৌবন লাভ হয়এটা কি সত্য?

জানি না লোকে বলে

তুমি নিজে খেয়েছ?

না

এক পিস মাংস যে বিক্রি করেছকার কাছে বিক্রি করেছতার নাম ঠিকানা বলে

গোয়ালন্দে এক লোকের কাছে বিক্রি করেছি। কাপড়ের ব্যবসা করে নাম জানি না

কত টাকায় বিক্রি করেছ?

কত টাকায় বিক্রি করেছি সেটা আপনারে বলব না

কেন বলবা না?

সুলতান মিয়া চুপ করে রইল। শশাংক পাল বললেনআমার আগের দিন থাকলে বেয়াদবির জন্যে তোমাকে ন্যাংটা করে মাটিতে পুতে ফেলতাম। যাই হোকএখন বলো মাংস কোথায় পেয়েছ?

কালিগঞ্জ থেকে এনেছি। যেখানে মৎস্যকন্যা ধরা পড়েছে সেখান থেকে এনেছি।

তার অর্থ কি এই যেতুমি নিজ চোখে মৎস্যকন্যা দেখেছ?

হুঁ

শশাংক পাল ধমক দিয়ে বললেনই আবার কীআদবের সঙ্গে বলোদেখেছি কি দেখা নাই।

দেখেছি।

আমরা ছবিতে যেরকম দেখি সেরকম?

সুলতান মিয়া অস্পষ্ট গলায় বললসেরকমইতবে মুখ ছোট।

গাত্ৰবৰ্ণ কী?

নীল

তার বুকের সাইজ কীবাঙালি মেয়েদের মতোনা-কি বুকও মুখের মতো ছোট?

খিয়াল নাই

খিয়াল নাই মানেবুক দেখো নাইলজ্জা পেয়েছিলামৎস্যকন্যা উদাম গায়ে পানিতে ঘুরে। সে তো শাড়ি দিয়া শরীর ঢাকে না। তারে নগ্ন দেখাই স্বাভাবিক

সুলতান মিয়া বললআমি যখন দেখেছি তখন উড়না দিয়া তার বুক ঢাকা छिन

উড়না দিয়া বুক ঢাকার প্রয়োজন পড়ল কেন?

সুলতান মিয়া বললঅনেক ছোট ছোট পুলাপান ছিলএইজন্যে ঢাকা হয়েছিল। মাতব্বররা ঢাকতে বললেন

শশাংক পাল বললেনতুমি বিরাট মিথ্যুকএইটা তুমি জানোতুমি কিছুই দেখ নাই। সব বানায়ে বলতেছ। তুমি আছ টাকা কামানোর ধান্দায়। দুই পিস মাংস কোনখান থেকে যোগাড় করে সেটা বিক্রির ধান্দায় আছ। যে মাংস তুমি এনেছ আমার মন বলতেছে সেটা কুকুরের মাংস। তুমি এক ধান্দাবাজআমি তোমার চেয়ে বড় ধান্দাবাজ

সুলতান মিয়া বললআপনার সঙ্গে কথা পাল্টাপাল্টি করব না। অনুমতি gनन अभि यादरे

শশাংক পাল বললেনঅনুমতি দিলাম না। তুমি যে ধান্দাবাজ এটা স্বীকার করে তারপর বিদায় হও

সুলতান মিয়া স্বাভাবিক গলায় হাই তুলতে তুলতে বললআচ্ছা স্বীকার করলাম। এখন বিদায় দেন। আপনার সঙ্গে আমি বাহাস করব না। আপনি যেটা বলেন সেটাই সত্য

আমার সঙ্গে বাহাস করবা না কেন?

আমি কারোর সাথেই বাহাস করি না। আমার কাছে এক টুকরা মাংস আছে দশ হাজার টাকা দাম আপনে ইচ্ছা করলে খরিদ করতে পারেন।

শশাংক পাল বিক্ষিত গলায় বললেনদশ হাজার টাকা দামতুই কন্স কীদশ হাজার টাকায় একজোড়া জীবন্ত মৎস্যকন্যা পাওয়া যায়। তাদের সঙ্গে যৌনকর্ম করা যায়

সুলতান নির্বিকার গলায় বললপাওয়া গেলে খরিদ করেন। যৌনকর্ম করতে চাইলে করেন। আপনার বড় পুসকুনি আছে। পুসকুনিতে ছাড়েন। আমারে তুই তুকারি করবেন নাআমি আপনার কর্মচারী না।

শশাংক পাল নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন এই বিদের বাচ্চার সঙ্গে কথা চালাচালির অর্থ হয় না। মূল প্রসঙ্গে যাওয়াই ভালো। তিনি হাই তুলতে তুলতে বললেনমাংস খাইতে হয় কীভাবেরান্না কইরা খাইতে হয়না-কি কাঁচা খাইতে হয়?

জানি না।

এক হাজার টাকা নগদ দিতে পারি। যদি পোষায় দিয়া যা টাকা নিয়া যা

সুলতান স্পষ্ট গলায় বললনা। বলেই বের হয়ে গেল। এক মুহুর্তের জন্যেও দাঁড়াল না

শশাংক পাল ধাধায় পড়ে গেলেন। সত্যি কি এর কাছে আসল বস্তু আছেচিরযৌবন সহজ ব্যাপার না। এর জন্যে রাজত্ব দিয়ে দেয়া যায়। রাজত্বের কাছে দশ হাজার টাকা কোনো টাকাই না। তাছাড়া টাকা দিয়ে তিনি করবেনইবা কীমৃত্যু মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি মাথা ঘুরাতে পারেন না বলে দেখতে পারেন না এক পিস মৎস্যকন্যার মাংস খেলে চিরযৌবন না পাওয়া গেলেও রোগটা তো সারিতে পারে।

বিষয়টা নিয়ে তিনি কি কারো সঙ্গে আলাপ করবেনআলাপ-আলোচনা করার লোকও নাই। সব ধান্দাবাজ সবাই আছে নিজের ধান্দায় কাউকে বিশ্বাসও করা যায় না মাওলানা ইদরিসকে খবর দিয়ে আনা যায়। সেও গাধা গাধা মাওলানা। হাদিস-কোরানের বাইরে কিছুই জানে না। শশাংক পাল বিরক্ত গলায় ডাকলেনসুলেমান! সুলেমান!

সুলেমান ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করে। দূর-দূরান্তে চলে যায়। সে এইসব বিষয় জানতে পারে। সুলেমানকে পাওয়া গেল না। জানা গেল কিছুক্ষণ আগে সে ঘোড়া নিয়ে বের হয়েছে। ভিক্ষাবৃত্তির প্রধান সমস্যা হচ্ছেদিনের মধ্যে কিছুক্ষণ ভিক্ষা না করলে পেটের ভাত হজম হয় না।

শশাংক পালের মুখে মাছি বসেছে। নিমপাতা দিয়ে হাওয়া করে মাছি তাড়াবার কেউ নেই। তিনি নিজে হাত দিয়ে তাড়াতে পারেন। তাতে লাভ কী? আবার এসে বসবে

পুকুরঘাটে কে যেন হাঁটাহাঁটি করছে। শুকনা পাতার ওপর হাঁটার শব্দ কানে আসছে। শরীর পুরোপুরি নষ্ট হওয়ায় একটা লাভ হয়েছেকান পরিষ্কার হয়েছে। অনেক দূরের শব্দও শুনতে পান।

শশাংক পাল বললেনহাঁটে কেকাছে আস।

কেউ একজন এসে মাথার পেছনে দাঁড়াল। এমনভাবে সে দাঁড়িয়েছে যে তাকে দেখা যাচ্ছে না।

শশাংক পাল বললেনগাধার মতো মাথার পিছনে দাঁড়ায়েছ। কেনসামনে আসি তোমারে দেখি

সারা গায়ে চাদর জড়ানো একজন শশাংক পালের পায়ের কাছে এসে দাঁড়াল।

তুমি কে?

আমার নাম লাবুস।

সুলেমানের পুলা না?

জি।

শরীরে চাদর কেন? ‘দরবেশ হয়েছএইখানে কী চাও?

বাপজানের খোঁজে আসছি।

সে গেছে ভিক্ষায়। তুমি একটা কাজ করআরেকটা ঘোড়া জোগাড় কর বাপ-বেটায় একসঙ্গে ঘোড়ায় চইড়া ভিক্ষা করবো। মনোহর দৃশ্য। হা হা হা

লাবুস তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না একটি নগ্ন মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে সে কোনোরকম লজ্জা পাচ্ছে। শশাংক পাল বললেননিমের ডাল হাতে নাও। আমারে বাতাস করা। ঘণ্টা হিসাবে পয়সা পাইবা ঘণ্টায় দুই পয়সা রাজি আছ?

লারুসজবাব না দিয়ে নিমের ডাল দিয়ে বাতাস শুরু করল। ঘণ্টায় দুই পয়সা তার জন্যে যথেষ্ট। আজ সকাল থেকে সে কিছু খায় নি। সে বাবার কাছে এসেছিল দুপুরের খাবারের কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি-না সেই খোঁজে।

নিমের ডালের হাওয়ায় আরাম লাগছে। মাছিগুলি যে তাড়া খাচ্ছে এই দৃশ্য দেখেও ভালো লাগছে। শশাংক পাল বললেনমৎস্যকন্যার মাংস নিয়ে একজন যে বান্ধবপুর বাজারে এসেছে এই খবর জানো?

লাবুস বললনা।

হারামজাদা এক পিস মাংসের দাম চায় দশ হাজার টাকা। থাপড়ায়ে এর দাঁত ফেলা দরকার। তাকে থাপড়াতে পারব?

লারুসজবাব দিল না। একমনে বাতাস করতে লাগল। শশাংক পাল বললেনবাজারে তারে খুঁইজ্যা বাহির করা। তারপর তার দুই গালে দুই চড় দেও। প্রতি চড় এক টেকা হিসেবে দুই টেকা পাইবা। রাজি?

লাবুস জবাব দিল না।

শশাংক পাল বললেনকত বড় ধান্দাবাজকুকুরের মাংস নিয়ে এসে বলে মৎস্যকন্যার মাংস! আমার কাছে বেচিতে চায়। ভাবছে কীএই মাংস খাওয়ার চেয়ে গু খাওয়া ভালো। ঠিক না?

লাবুস বললঠিক

 

শশাংক পাল পরদিন দুপুর দুটিার সময় মৎস্যকন্যার মাংস খেলেন। কাঁচাই খেলেন। রান্না করলে যদি গুনাগুণ নষ্ট হয়ে যায়! মাংস খাবার সময় সুলতান সামনে বসে রইল। লবণভর্তি মাংস— খাওয়ার সময় শরীর উল্টে যাবার মতো হলো। শশাংক পাল হাঁপাতে হাঁপাতে বললেননুনা ইলিশের মতো স্বাদ। এর কারণ কী?

সুলতান বললমাংস যাতে নষ্ট হয়ে না যায়। এর জন্যে নুন দিয়ে জারানো। চাবায়ে খাওয়ার দরকার কী! ওষুধের ট্যাবলেটের মতো গিলে ফেলেন। এটা তো ওষুধই

অনেক কষ্টে শশাংক পাল মাংস গিললেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরে জুলুনি শুরু হলো। যেন কেউ নাগা মরিচ বেটে শরীরে মাখিয়ে দিয়েছে। এমন ভয়ঙ্কর জুলুনি যে শশাংক পালের ইচ্ছা করছে নিজেই টান দিয়ে তার গায়ের চামড়া খুলে ফেলেন। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেনআমাকে ধরাধরি করে পুসকুনির পানিতে ড়ুবায়ে রাখা। আমার সর্বাঙ্গ জুলে যাচ্ছে গো সর্বাঙ্গ কেউ যেন আগুন দিয়ে পুড়াচ্ছে। হায় ভগবানএ-কী শাস্তি!

তাঁকে পুকুরের পানিতে ড়ুবানো হলো। দুইজন দুই দিক থেকে হাত ধরে আছে তিনি মাথা ভাসিয়ে আছেন। মাঝে মাঝে মুখে পানির ছিটা দেয়া হচ্ছে। বান্ধবপুরের মানুষ পুকুরের চারদিকে জড়ো হলো। তাদের কৌতূহলের সীমা নাই। শশাংক পাল বললেনদেখ মিনি মাগনার মজা। মৎস্যকন্যার মাংস খেয়ে আমি হয়েছি মৎস্যপুরুষ। পানিতে বাস করা শুরু করেছি। এমন মজা দেখবা না কোনো সার্কাস পাটিতেও এই মজা নাই

সন্ধ্যাবেল তিনি মাওলানা ইদরিসকে খবর দিলেন। ক্ষীণ গলায় বললেনসবাই মজা দেখতে এসেছেআপনি নাইএটা কেমন কথামজা ভালো লাগে না?

মাওলানা বললেনআপনি বিরাট যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। মানুষের যন্ত্রণা দেখতে ইচ্ছা করে না

এটা কী বললেন মাওলানাযন্ত্রণা দেখার মধ্যেই আনন্দ অন্যের যন্ত্রণা হচ্ছেআমার হচ্ছে না— আনন্দ না?

মাওলানা জবাব দিলেন না। শশাংক পাল বললেনআপনাকে ডেকেছি একটা অতি জরুরি এবং অতি গোপন কথা বলার জন্যে খোশগল্প করার জন্যে ডাকি নাই

মাওলানা বললেনবলেন কথা। আমি আছি।

শশাংক পাল ক্ষীণ গলায় বললেনকথাটা শুধু আপনারে বলব। দুইজন আমার হাত ধরে আছে। এখন বললে তারাও শুনবে আমি চাই না তারা শুনুক এই তোরা দুইজন আমাকে শুকনায় তোল। কিছুক্ষণের জন্যে বিদায় হ। মাওলানার সঙ্গে কথা শেষ হবার পর আবার পানিতে নামাবি

শশাংক পাল তার অতি জরুরি গোপন কথা মাওলানাকে বলে শেষ করলেন। তাকে আবারো পানিতে নামানো হলো মধ্যরাত থেকে তিনি বিকারগ্রস্তের প্রলাপ শুরু করলেন। অতি উচ্চকণ্ঠে বলতে শুরু করলেন–

তোমরা যারা আমার আশেপাশে আছ তারা শোন। মন দিয়ে শোন। স্বৰ্গ নরক সবই আছে। আমি অবিশ্বাসী নাস্তিক ছিলাম। এখন আস্তিক আমি ডান চোখে স্বৰ্গ দেখছি। একই সঙ্গে বাম চোখে নরক দেখছি। স্বৰ্গ সম্পর্কে এতদিন যা শুনেছি সবই ভুল। স্বৰ্গ তোমাদের সবার কল্পনার চেয়েও মনোহর। স্বর্গে যারা বাস করেনতারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভাসতে ভাসতে যান। নরকের কথা কিছু বলব না। নরক তোমাদের সবার কল্পনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ভগবানআমাকে ক্ষমা কর। ভয়ঙ্কর নরকের হাত থেকে আমাকে রক্ষা কর।

বিকারগ্রস্তের মতো চিৎকার করতে করতেই শশাংক পালের মৃত্যু হলো।

বড়গাঙের পাশে নিমাই শ্মশান ঘাটে তার চিতার আয়োজন হলো। মুখাগ্নি করার কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরোহিত বললেননিকট আত্মীয়ের অভাবে তাকে পিতৃসম জ্ঞান করতেন এমন কেউ মুখাগ্নি করতে পারেন।

মড়া পোড়ানো দেখতে প্রচুর জনসমাগম হয়েছে। পুরোহিতের কথাতে তাদের মধ্য থেকে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল না।

পুরোহিত বললেনস্বধর্মের স্ববর্ণের যে-কেউ হলেই হবে। প্রয়োজনে নিম্নবর্ণের যে-কেউ আসতে পারেন শাস্ত্রে এই বিধান রাখা হয়েছে।

কেউ এগিয়ে আসছে না। এদিকে আকাশে মেঘা জমতে শুরু করেছে। চৈত্র বৈশাখে ঝড়-বৃষ্টি হয়। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছেআজ বড় ধরনের ঝড় আসবে। বাতাস থমথমে

পুরোহিত বললেনকেউ কি আসবেন?

ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন বললঅন্য ধর্মের কেউ কি এই কাজটা করতে পারেন?

আপনি কে?

আমি হাফেজ ইদরিস

হ্যাঁ  পারবেন।

সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় শশাংক পালকে উপুড় করে শোয়ানো হয়েছে। তার মাথা উত্তরমুখী।

মাওলানা ইদরিস আগুন হাতে নিয়ে পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্র পাঠ করছেন

ওঁ দেবাশ্চাগ্নিমুখী এনং দহন্তু!

মন্ত্র পাঠের শেষে চিতা প্ৰদক্ষিণ শুরু হলো পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেনমাওলানা ইদরিস বিড়বিড় করে সেই মন্ত্র বলছেন

ওঁ কৃত্বা তু দুষ্কৃতং কৰ্ম জানতা বাপ্যজানতা।
মৃত্যুকালবশং প্রাপ্য নরং পঞ্চত্মাগতম।
ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মসমাযুক্তং লোভমোহসমাবৃতম

দহেয়ং সৰ্ব্বগাত্রানি দিব্যান লোকান মা গচ্ছতি

‘তিনি জ্ঞানত বা অজ্ঞানতাবশত অনেক দুষ্কৃত কাজ করেছেন। মানুষের মৃত্যু প্ৰাপ্যপ্রকৃতির এই বিধানে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এই ব্যক্তির ধর্ম অধৰ্ম লোভ-মোহ সমাবৃত হয়েই মৃত্যু হয়েছে। এখন হে অগ্নিদেবআপনি তাকে দহন করে দেবলোকে নিয়ে যান।

মুখে আগুন দেয়ামাত্রই ঝড় শুরু হলো। বাতাস পেয়ে আগুন তেজি হলো নামল বৃষ্টিসেই বৃষ্টিতেও আগুন নিভল না। লোকজন সবাই বিদায় নিয়েছে। পুরোহিত এবং মাওলানা ইদরিস বসে আছেন। আধা টিন কেরোসিন বেঁচে গেছে। এই কেরোসিন পুরোহিতের প্রাপ্য। মাওলানার সামনে এই টিন নিয়ে যেতে তাঁর লজ্জা লাগছে। বিধর্মী মানুষ। নিশ্চয়ই জানে না বেঁচে যাওয়া সবকিছুই পুরোহিতের প্রাপ্য। সে হয়তো ভেবে বসবে লোভী পুরোহিত

 

এককালের অতি প্রতাপশালী জমিদার শশাংক পালের মৃত্যু হলো ১২ই চৈত্র ১৩৪৭ সনে।

ইংরেজি ২৩ মার্চ ১৯৪০ সন বিশেষ একটা দিন। ওই দিন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ‘লাহোর প্রস্তাব’ ঘোষণা করেন। লাহোর প্রস্তাবে উত্তরপশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব ওঠে। লাহোর অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। জার্মান আর্মি গ্রুপ সি বেলজিয়ামের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ে নেদারল্যান্ড আক্রমণ করেছে। অতি অল্প সময়ে তারা ফ্রান্সের গভীরে ঢুকে যায়। দুর্ভেদ্য মাজিনো লাইন কোনো কাজেই আসে না।

লন্ডনে চলতে থাকে টানা বিমান আক্রমণ। ব্রিটিশ সিংহ থমকে দাঁড়ায়। কারণ বোমা পড়ছে বাকিংহাম প্রাসাদে যেখানে বাস করেন। রানি এলিজাবেথ রানিকে প্রাসাদ থেকে গোপন আবাসে সরিয়ে নেয়া হলো। কেউ জানে না। কোথায় রানি। হঠাৎ হঠাৎ গোপন আবাস থেকে বের হন। ইংরেজের প্রিয় খেলা শিয়াল শিকারে বের হন ঘোড়ায় চড়ে শিয়াল তাড়া করেন। আনন্দময় এই খেলাতেও তাঁর মনে বসে না। বড় অস্থির সময় কাটে

ভারতবাসীরা যুদ্ধে কোন পক্ষ সমর্থন করবে। ঠিক বুঝতে পারে না। হিন্দুমুসলমান দুই পক্ষে ভাগ হয়েছে। এক পক্ষ ব্রিটিশ রাজকে সমর্থন করলে অন্য পক্ষ তা করতে পারে না। কোলকাতার মুসলমানদের কেউ কেউ অদ্ভুত স্লোগানও দিতে শুরু করেছে

কানামে বিড়ি
মু মে পান
লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।

এই লড়াই কার বিরুদ্ধেব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধেনা-কি হিন্দুদের বিরুদ্ধে?

 

রাতে মাওলানা খেতে বসেছেন। তাঁর স্ত্রী জুলেখা সন্তানসম্ভবা পিঁড়িতে বসতে কষ্ট হয় বলে স্বামীর খাবার সময় সে পাখা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। খাবার সময় গল্পগুজব মাওলানা পছন্দ করেন না। খাওয়া হচ্ছে ইবাদত। ইবাদতের সময় গল্পগুজব চলে না। তারপরেও মাঝেমধ্যে মনের ভুলে জুলেখা দুএকটা প্রশ্ন করে ফেলে। আজ যেমন করল। কৌতূহলী গলায় বললজমিদার শশাংক বাবু আপনাকে যে গোপন কথাটা বলেছে সেটা কী?

ইদরিস বললেনগোপন কথা তোমাকে কেন বলব?

জুলেখা বললআমি আপনার স্ত্রী এইজন্যে বলবেন।

ইদরিস বললেনতুমি আমার স্বভাব জানো। এই কাজ আমি কখনো করব না।

জুলেখা বললগোপন কথা কি জমিজমার বিলি ব্যবস্থা নিয়ে?

মাওলানা বললেননা। এই বিষয়ে তুমি আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করবা না।

অন্য কোনো বিষয়ে কি কিছু বলব?

বলো।

আপনি নামাজ কালাম ছেড়ে দিয়েছেন কেনলোকমুখে শুনলাম শশাংক পালের মুখাগ্নি করেছেন। আপনি তাঁর কে?

মাওলানা জবাব দিলেন না। তার কপালে কুঞ্চন রেখা দেখা দিল।

জুলেখা নিচু গলায় বললআমি আপনার সঙ্গে বাস করতে আসার পরই আপনি নামাজ কালাম ছেড়েছেন। নিজেকে আমার দোষী মনে হয়

ইদরিস বললেনকে দোষী কে নির্দোষী সেই বিচার আল্লাহপাক করবেন। এইসব নিয়া চিন্তা করবা না

লোকে বলে আপনার মাথা না-কি পুরাপুরি খারাপ হয়েছে। এটা কি সত্যি?

ইদরিস বললেনআমি বাস করি তোমার সাথে। আমার মাথা খারাপ হলে সবের আগে তুমি বুঝবা

জুলেখা বললরাতে আপনি ঘুমান না। উঠানে মোড়ার উপর বসে থাকেন।

চিন্তা করি। এইজন্যে ঘুমাই না। মানুষ ঘুমের মধ্যে চিন্তা করতে পারে না। চিন্তা করতে হয় জাগ্রত অবস্থায়

কী নিয়া চিন্তা করেন?

সেটা তোমারে বলব না

কেন বলবেন নাকেউ তো আপনারে বলে নাই-চিন্তার বিষয় নিয়া তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করবা না কেউ তো আপনারে নিষেধ করে নাই

ইদরিস চাপা গলায় বললেননিষেধ করেছে।

জুলেখা আগ্রহ নিয়ে বললকে নিষেধ করেছে?

প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মাওলানা খাওয়া শেষ করে হাত ধোয়ার জন্যে বারান্দায় চলে গেলেন। বারান্দায় কলসিভর্তি পানি এবং লোটা রাখা আছে। মাওলানা বারান্দায় এসেই ডান পায়ে মেঝেতে কয়েকবার বাড়ি দিলেন। মাস চারেক হলো বাড়িতে একটা সাপ দেখা যাচ্ছে। বিশাল শঙ্খচূড়। বাস্তুসাপের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না। বাস্তুসােপ গৃহস্থের জন্যে মঙ্গল এবং কল্যাণ নিয়ে আসে। তাছাড়া জুলেখার সন্তান হবে। এই সময়ে কোনো জীবজন্তুকে কষ্ট দেয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। জুলেখা পিতলের একটা বাটিতে প্রতিদিন সাপের জন্যে দুধ রেখে দিচ্ছে। সাপকে কখনো দুধ খেতে দেখা যায় নি। তবে বাটির দুধ থাকছে না। কেউ একজন খেয়ে নিচ্ছে। সাপের কারণে খরচ বেড়েছে। সারারাত খাটের নিচে হারিকেন জ্বলিয়ে রাখতে হয়। যুদ্ধের কারণে কেরোসিনের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। বাজারে বলাবলি হচ্ছে কয়েকদিন পর এক ফোঁটা কেরোসিনও পাওয়া যাবে না। সব কেরোসিন চলে যাচ্ছে ফৌজিদের কাছে। তারা সারাগায়ে কেরোসিন মেখে বনেজঙ্গলে যুদ্ধ করে। কেরোসিন মাখার কারণে সাপখোপ পোকামাকড় তাদের কাছে আসে না

মাওলানা উঠানে তার নির্দিষ্ট জায়গায় মোড়ার ওপর পা তুলে বসেছেন। চিন্তা এখনো শুরু করেন নি। জুলেখা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে পান নিয়ে তাঁর কাছে আসবে। তিনি পান চিবাতে চিবাতে চিন্তা শুরু করবেন। তার আজ রাতের চিন্তার বিষয় ঠিক করা আছে। শশাংক পালের যন্ত্রণা দেখে চিন্তাটা মাথায় এসেছে। তিনি অতি সাধারণ একজন মানুষ হয়েও অন্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেন না। পরম করুণাময় আল্লাহপাক কীভাবে তাঁর সৃষ্ট জগতের যন্ত্রণায় নির্বিকার থাকেন! অনন্ত নরকে তাঁর সৃষ্ট প্রাণী মানুষ জুলতে পুড়তে থাকবেআর তিনি থাকবেন নির্বিকারতাহলে কি তিনি এমন একজন যিনি যন্ত্রণাবোধ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ততাই যদি হয়তাহলে তো তিনি আনন্দবোধ থেকেও মুক্ত। সেরকমই কিছু হবে। সূরা এখলাসে তিনি বলেছেন, ‘ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফু। আন আহাদ।’ যার অর্থ আমার সমকক্ষ কেহই না। মাওলানা মনে করেন— এই অনুবাদ ঠিক না। অনুবাদটা হবে— ‘আমি অন্য কাহারো মতো নই

পান নেন।

ইদরিস পান নিলেন। জুলেখা হাতে করে পিড়ি নিয়ে এসেছে। সে মাওলানার পাশে পিড়ি রেখে পিড়িতে বসতে বসতে বললআজ রাতে আমিও আপনার মতো চিন্তা করব

মাওলানা আগ্রহ নিয়ে বললেনকী নিয়া চিন্তা করবা?

আমার মেয়েটারে নিয়া চিন্তা করব।

তোমার যে মেয়ে হবে এটা তুমি ক্যামনে জানোছেলেও তো হইতে পারে। পেটের সন্তান ছেলে না মেয়ে এই রহস্য আল্লাহপাক ভেদ করেন না জন্মের পরে তিনি রহস্য ভেদ করেন।

জুলেখা বললআমার যে মেয়ে হবে এইটা আমি জানি। তাকায়া দেখেনআমার চেহারা অনেক সুন্দর হয়েছে। এর অর্থ জানেন?

না।

এর অর্থ আমার মেয়ে হবে। মেয়ের মা সুন্দরীছেলের মা বান্দরী।

মাওলানা জবাব দিলেন না। ঝড়বৃষ্টির শেষে চৈত্র মাসের মেঘশূন্য আকাশ। এত বড় চাঁদ উঠেছে। নিশ্চয়ই পূর্ণিমা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে জোছনা গলে গলে পড়ছে। কী অপূর্ব দৃশ্য! শশাংক পাল এই দৃশ্য আজ দেখতে পারছেন না। কিংবা কে জানেএরচেও অনেক সুন্দর দৃশ্য তিনি এখন দেখছেন। আল্লাহপাক তাকে ক্ষমা করেছেন। হয়তো তিনি তাকে বলেছেন— পৃথিবীতে শেষ দিনগুলি তোর অনেক কষ্টে গেছে। এখন আয় আরাম কর। তোকে দিলাম চিরযৌবন।

জুলেখা মিষ্টি করে ডাকলমীরার বাপ!

মাওলানা চমকে উঠে বললেনকী বললা?

জুলেখা চাপা হাসি হাসতে হাসতে বললআপনারে মীরার বাপ বলে ডাকলাম। আমি আমার মেয়ের নাম রাখব মীরা।

হিন্দু নাম?

নামের কোনো হিন্দু মুসলমান নাই। নাম নামাজ রোজা করে নাপূজা করে না। নাম মানুষের একটা পোশাক। পোশাকের কি কোনো ধর্ম থাকে?

ইদরিস বিস্মিত হয়ে বললেনতোমার ভালো বুদ্ধি।

জুলেখা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললআমি জানি আমার ভালো বুদ্ধি। মানুষ আমার রূপটা শুধু দেখেবুদ্ধি দেখে না। আপনি দেখেছেনআমার ভালো লাগল

ইদরিস বললেনআরেকটা পান খাব।

জুলেখা বললপান দিতেছি। তার আগে একটা কথা বলিমন দিয়া শুনেন। শশাংক পাল আপনারে একটা গোপন কথা বলেছেআপনি যেটা আমারে বলেন নাই। আমার একটা গোপন কথা আছেসেটা আপনারে এখন বলব।

বলো।

আমার মেয়েটার জন্মের পর আমি আপনারে ছেড়ে চলে যাব

মাওলানা অবাক হয়ে বললেনকেন?

জুলেখা স্বাভাবিক গলায় বললআমার কারণে আপনি বিরাট বিপদে পড়েছেন। সমাজে পতিত হয়েছেন। নামাজ কালাম ছেড়েছেন। মাথা খারাপের দিকে যাইতেছেন। আমি আপনারে মুক্তি দিব।

মেয়েটাকে কি নিয়ে যাবে?

না। তাকে আপনার কাছে দিয়া যাব। আপনি মেয়েটারে ভালো মানুষ হওয়া শিখাইবেন। আমি চাই আমার মেয়ে আপনার মতো ভালো মানুষ হোক

জুলেখার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। গাল ভেজা। ভেজা গালে চাঁদের আলো চকচক করছে। মাওলানা বিস্মিত হয়ে বললেনকাঁদতেছ কেন?

জুলেখা সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুছে বললআর কাঁদব না। বলেই সে ফিক করে হাসল। মাওলানা মুগ্ধ হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর স্ত্রী যে পৃথিবীর অতি রূপবতীদের একজন এটা তার মনেই থাকে না। হঠাৎ হঠাৎ বুঝতে পারেন। তখন তাঁর বড় বিস্ময় লাগে। পবিত্র কোরান শরিফে বেহেশতের আয়তচক্ষু হুরদের বর্ণনা আছে। তারা কি জুলেখা নামের এই মেয়ের চেয়েও সুন্দরআল্লাহপাক যখন বলেছেন তখন অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্য কী রকমকাকে আমরা সৌন্দর্য বলিফুল সুন্দর লাগে কেনপাতাকে ফুলের মতো সুন্দর লাগে নাঅথচ ফুলকে লাগে ফুলের গন্ধ আছে। এইজন্যে কিগন্ধ ছাড়াও তো ফুল আছে। সেই ফুলও তো সুন্দর।

জুলেখা বললকী চিন্তা করেন?

মাওলানা জবাব না দিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশে পূৰ্ণচন্দ্র। সেই চন্দ্ৰও সুন্দর লাগছে। সুন্দর তাহলে কী?

জুলেখা বললগান শুনবেন?

মাওলানা বললেননা। গানবাজনা নিষেধ আছে।

নিষেধ থাকলেও শুনেন। আপনারে গান শুনাইতে ইচ্ছা করতেছে। বেহেশতে হুরদের গান শুনবেন। দুনিয়াতে আমি শুনাব। তখন তুলনা করবেন।

জুলেখাগান শুনব না।

আপনে চন্দ্ৰ দেখতেছেন। আমি চন্দ্ৰ নিয়া গান করব।

বলেই জুলেখা গান শুরু করল।

ও আমার চন্দ্ৰসখারে
তোর কারণে হইলাম দিওয়ানা
ও আমার চন্দ্ৰসখারে
মিছামিছি হইছি দিওয়ানা

 

আকাশের চাঁদের দিকে আরো একজন তাকিয়ে আছে। তার নাম লাবুস সে বসে আছে লঞ্চঘাটায়। মাঝরাতে ভেঁপু বাজিয়ে লক্ষ্মী নেভিগেশন কোম্পানির শেষ লঞ্চ গোয়ালন্দ থেকে আসে। দূরের লঞ্চটাকে মনে হয় ঝাড়বাতি। ঝাড়বাতিটা আস্তে আস্তে লঞ্চের আকৃতি নেয়। দেখতে ভালো লাগে।

আজকের দিনটা লাবুসের ভালো কেটেছে। দুপুরে খাওয়া না হলেও সন্ধ্যায় ভারপেট খেয়েছে। খাওয়ার আয়োজন শশাংক পালের বাড়িতে। শ্মশানযাত্রীদের জন্যে খিচুড়ির আয়োজন ছিল। খিচুড়ি খেতে কেউ আসে নি।

লাবুস কলাপাতা নিয়ে বসেছে। বাবুর্চি কলাপাতায় খিচুড়ি ঢালতে ঢালতে বললশ্মশানযাত্রীর খাওয়া খায় মুসলমানে! এর নাম কলিকাল

লাবুস বললঅভাবের কোনো হিন্দু মুসলমান নাই।

বাবুর্চি বললকথা কইস না। মুখ বন্ধ কইরা খা যত পারস খা। পাঁচ সের চাউলের খিচুড়ি। সব নষ্ট

লাবুস মুখ বন্ধ করেই খেয়ে গেল। তিন-চারদিনের খাবার একসঙ্গে খেয়ে ফেলার ব্যবস্থা নেই। ব্যবস্থা থাকলে সে খেত। তাহলে আগামী কয়েকদিন তাকে আর খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। মানুষ হবার প্রধান সমস্যাসে জরুরি কোনো জিনিসই জমা করে রাখতে পারে না দিনের খাবার দিনে খেতে হয় দিনের ঘুম দিনে ঘুমাতে হয়। খাওয়া এবং ঘুম কোনোটিই জমা রাখা যায় না।

লঞ্চ ভোঁ দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁকের ভেতর থেকে তাকে দেখা যাবে। আজ আকাশে থালার মতো চাদ। চাঁদের আলো এবং লঞ্চের আলো মিলেমিশে কী সুন্দর দৃশ্যই না হবে! সুন্দর দৃশ্য দেখার আকুলতা লারুসকে ব্যাকুল করল।

তার মতো আরো একজন ব্যাকুল হলেন। তিনি বহুদূর দেশ আমেরিকায় বাস করেন। তাকে বলা হয় ‘জঙ্গলের কবি নাম রবার্ট ফ্রষ্ট। তিনি জঙ্গলের আলোছায়ায় হেঁটে বেড়ান। এবং প্রায়ই বলেনঅদ্ভুত সুন্দর এই পৃথিবীর সঙ্গে তার প্রেমিকের কলহের মতো কলহ

 

I had a lower’s quarrel with the World.
And were an epitaph to be my story
I’d have a short One ready for my own.
I would have written of me on my Stone;
I had a lower’s quarrel with the world.

বান্ধবপুর বাজার

বান্ধবপুর বাজারে এককড়ি সাহার চালের আড়ত। তিনি সামান্য পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলেন। যুদ্ধের কারণে এখন রমরমা অবস্থা। ধান-চালের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। আরো বাড়বে— এরকম গুজব বাতাসে ভাসছে। সব চাল না-কি মিলিটারিরা কিনে নিবে। পাউরুটি খেয়ে যুদ্ধ করা যায় না। ভাত খেয়েও যুদ্ধ হয় না। ভাতে ঘুম পায়। তারপরেও মিলিটারিদের জন্যে রাতে ভাতের ব্যবস্থা। রাতে ভাত খেয়ে তারা আরামে ঘুমায়। দিনে যুদ্ধ শুরু হয়। দেশের চাল সব সরকার কিনছে। এদিকে আবার বাৰ্মা মুলুক থেকে চাল আসা বন্ধ। জাপানিরা বাৰ্মা দিয়ে ভারতবর্ষে ঢুকবে। নাক-চ্যাপটা মগগুলিকে শায়েস্তা করবে। এটা একটা আশার কথা।

এককড়ি সারাদিন ক্যাশবাক্স নিয়ে আড়তে বসে থাকেন। তাঁর মন প্ৰফুল্ল থাকলেও চোখেমুখে গভীর বিষণ্ণতা ফুটিয়ে রাখেন। ব্যবসা ভয়ঙ্কর খারাপ যাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তিনি ধনে-প্ৰাণে মারা পড়বেন— এই ধরনের কথা বলতে পছন্দ করেন। কথা বলার জন্যে সবসময় লোক পাওয়া যায় না। সন্ধ্যার দিকে অনেকেই আসে। যুদ্ধের খবর শুনতে আসে। এককড়ির নামে প্রতিদিন কলিকাতা সমাচার পত্রিকা আসে। দিনেরটা দিনে আসে না, দু’দিন পরে আসে। তাতে সমস্যা কী? খাবার দুদিনে বাসি হয়, খবর কখনো বাসি হয় না। সবাইকে সেই পত্রিকা পড়ে শোনানো হয়। পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন। গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী। তাঁর গলা উঁচু এবং সুরেলা। বিভিন্ন পূজা পার্বণে তিনি সুরেলা গলায় মাথা দুলিয়ে যখন ব্ৰতকথা পাঠ করেন, তখন ভক্তিমতি হিন্দু নারীদের চোখে আবেগে পানি আসে।

‘বিদেশে গেল পতি,
সে হতে সাবিত্রী সতী
দিবা রাতি করিছে রোদন
পতির বিরহে তার
দেহ হলো চৰ্ম্মসার,
ছয় জায়ে করিছে গঞ্জন।’

কলিকাতা সমাচার এককড়ি প্রথম পড়েন। যে কাগজটা খরচপাতি করে আনায় সে-ই প্ৰথম পড়বে এটাই নিয়ম। এককড়ি সময় নিয়ে পড়েন। খবরের কাগজ পাঠ যারা শুনতে এসেছে তাদের আগ্রহ এবং কৌতূহল বাড়ানোর জন্যে দু’একটা মন্তব্য করেন। দু’একটা শিরোনাম গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেই পড়েন।

ইংল্যান্ডে বৃষ্টির মতো বোমাবর্ষণ
ব্রিটিশ সিংহ কম্পমান

ফ্রান্সের গভীরে অপ্রতিরোধ হিটলার

অপেক্ষমাণ জনতার একজন বলে বসিল, হিটলার বাবাজি দেহি ফান্সের গুয়া মাইরা দিছে।

এককড়ি চোখের চশমা ঠিক করতে করতে বললেন, অশ্লীল কথা বলব না। দীননাথ।

দীননাথ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘অশ্লীষ’ কথা কোনটা বলছি! সত্য কথা বলছি। হিটলার সবেরেই গুয়া মারতাছে— এটা সত্য কথা, অশ্লীষ’ না।

গৌরাঙ্গ চক্রবতীর কাছে মূল কাগজ চলে এসেছে। তিনি কয়েকবার কেশে, পানি খেয়ে আয়োজন করে পাঠ শুরু করেছেন। শ্রোতাদের চোখ অগ্রহ এবং উত্তেজনায় চকচক করছে। দূরদেশের যুদ্ধ তাদের স্পর্শ করছে না। হিটলার নামে দুর্ধর্ষ একজন সবাইকে নাস্তানাবুদ করছে, ভাবতেই আনন্দ।

গৌরাঙ্গ পড়ছেন– ‘একদিনে ৭০ বার বোমা হামলা। চাৰ্চিলের মাথায় হাত।’ পড়তে পড়তে গৌরাঙ্গ নিজেও মাথায় হাত দেন। হতাশ ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকান, যেন তিনি নিজে চাৰ্চিল। মাথায় বোমা বর্ষণ চোখের সামনে দেখছেন। শ্রোতারা বড়ই আমোদ পায়।

বান্ধবপুরের লোকজন আগে কখনো হিটলারের নাম শোনে নি। এখন এই নাম চলে আসছে নিত্যদিনের আলোচনায়। যাদের ছেলেসন্তান হচ্ছে, তারা সন্তানের নাম রাখছে- হিটলু কিংবা হিটু। হিটলারের সঙ্গে মিল রেখে নাম।

খবরের কাগজ পড়া শেষ হয়েছে। শ্রোতারা যে যার বাড়িতে চলে গেছে। এককড়ি হারিকেন নিভিয়ে দিয়েছেন। কেপ্লোসিনের সাশ্রয় করতে হবে। দাম যেভাবে বাড়ছে, কিছুদিন পর এই বস্তু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। বাইরে চাঁদের আলো আছে। হারিকেন না জ্বালালেও চলে। আধো অন্ধকারে এককড়ি দোকানের কর্মচারীদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন। গলা নামিয়ে বললেন, চাল কিনা শুরু করা। দাম কিছু বেশি হলেও কিনবা। বড় নৌকা নিয়ে ভাটি অঞ্চলের দিকে যাও। সেখানে ধান চাল দুইই সস্তা।

কর্মচারীদের একজন বলল, কর্তা, কিনা শুরু করব কবে? পঞ্জিকাতে শুভ দিন দেখে শুরু করা উচিত না?

এককড়ির জন্যে তামাক সাজানো হয়েছে। তিনি তামাক টানতে টানতে বললেন, শ্ৰীগণেশের জন্যে সব দিনই শুভ। তারপরেও চৈত্র সংক্রান্তিতে পূজার পরে শুরু করা। এককড়ি তোমাক টানতে লাগলেন।

বাংলার পঞ্চাশের মন্বন্তরের সূচনা শুরু হলো। ভয়াবহ এই মন্বন্তরে বঙ্গদেশে ত্ৰিশ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। বিশ্বযুদ্ধের পাওনা এভাবেই তাদের শোধ করতে হয়। মহান ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ লেখেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘অশনি সংকেত’।

বঙ্গদেশের মানুষ এই ধরনের বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে এর আগেও একবার গিয়েছিল। ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল তখন লর্ড ক্লাইভ। তার সময়ের মন্বন্তরে (ছিয়াতুরের মনন্তর) বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মৃত্যুবরণ করে। তাদের মৃত্যু কখনোই শ্যাম সমান ছিল না।

 

জুমা মসজিদের বর্তমান ইমাম মাওলানা করিম এশার নামাজ শেষ করে ঘরে ফিরছেন। পাকা পুলের কাছে এসে মাওলানা থমকে দাঁড়ালেন। পাকা পুলের রেলিংয়ের ওপর লম্বা কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে সাদা চাদর। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষ হলে মূর্তির হাত-পা নড়ত। বাতাসে গায়ের চাদর নড়ত। সেরকম কিছুই হচ্ছে না, মূর্তি পাথরের মতো স্থির।

করিম আয়াতুল কুরশি পড়ে বুকে ফুঁ দিলেন। পাকা পুল জায়গাটা খারাপ। পুলের কাছেই বিরাট যে তেঁতুলগাছ সেখানে ছায়ামূৰ্তিরা থাকে। অনেকেই দেখেছে। তিনি আজ প্রথম দেখলেন। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। একবার ভাবলেন জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? শেষ পর্যন্ত করলেন না। জিন-ভূতদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করা বিপদজনক। তখন তারা পিছু নেয়।

মাওলানা করিম দ্বিতীয়বার আয়াতুল কুরশি পড়ে হাততালি দিলেন। হাততালির শব্দ যতদূর যাবে জিন-ভূতদের তারচে’ও দূরে যাবার কথা। ছায়ামূর্তি মিলিয়ে গেল না। হাততালির শব্দে ফিরে তাকাল। করিম নিজের অজান্তেই ভীত গলায় বলে ফেললেন, তুই কে?

আমি লাবুস।

এখানে কী করিস?

কিছু করি না।

পুলের উপরে দাঁড়ায়ে আছস কী জন্যে? মানুষরে ভয় দেখানোর জন্যে? আমি যদি আজ খাবড়ায়া তোর দাঁত না ফেলছি। বদমাইশা! পুলের উপর থেকে নাম বললাম।

লাবুস জবাব দিল না। যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, সেভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে শীতল গলায় বলল, আপনি মাওলানা ইদরিসকে গত জুম্মাবারে কাফের ফতোয়া দিয়েছেন। কেন দিলেন?

করিম বললেন, তোর কাছে জবাবদিহি করব না-কি হারামজাদা? সে কাফেরের কাজ করেছে বলে কাফের ফতোয়া দিয়েছি। হিন্দুর মুখাগ্নি করেছে। খবর রাখস না?

লাবুস বলল, লাশের মুখে আগুন দিয়েছে। লাশের আবার হিন্দু-মুসলমান কী? লাশ নামাজ কালাম পড়ে না। মন্দিরে ঘণ্টাও বাজায় না।

বাপরে বাপ! জ্ঞান ফলায়। দেওবন্দের প্রিন্সিপাল স্যার আসছেন। হারামজাদা, তুই জানস না ইদরিস এক বেশ্যামাগির সাথে সংসার করতেছে? মাগির পেটও বাধায়ে ফেলেছে।

জুলেখা লাবুসের মা। করিমের কঠিন কথাতে লাবুসের কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে আগের মতোই শান্ত গলায় বলল, মাওলানা ইদরিসকে কাফের বলার কারণে আজ আমি আপনাকে শাস্তি দিব। এমন শাস্তি যে জনমে ভুলবেন না। যতদিন বাঁচবেন ইয়াদ থাকবে।

করিম থমকে গেলেন। বদমাইশটার কথা বলার ধরন ভালো না। ছুরি চাকু চালাবে কি-না কে জানে! লাবুসের হাতে অবশ্যি ছুরি চাকু কিছু দেখা যাচ্ছে না। বদমাইশটা চাদরের নিচে লুকিয়ে রাখতে পারে। মনে হয় তাই করেছে। চৈত্র মাসের গরমে গায়ে চাদর থাকার কথা না।

করিম বললেন, কী শাস্তি দিবি?

লাবুস বলল, আমি আপনেরে ন্যাংটা করে ছেড়ে দিব। ন্যাংটা অবস্থায় দৌড়াতে দৌড়াতে আপনি ঘরে যাবেন। আপনার স্ত্রী দরজা খুলে দেখবে ন্যাংটা ইমাম।

এই হারামজাদা! তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে?

লাবুস রেলিং থেকে নামতে নামতে বলল, মাথা খারাপ হয় নাই। করিম উল্টাদিকে দৌড় দেবেন কি-না বুঝতে পারছেন না। এই হারামজাদা তাকে ভয় দেখাচ্ছে। এর বেশি কিছু না। এইসব ক্ষেত্রে ভয় পেতে নাই। ভয় পেলেই হারামজাদা বুঝতে পারবে, আরো লাই পাবে।

লাবুস করিমের দিকে এগুচ্ছে। ছোট ছোট পা ফেলে এগুচ্ছে। তার চোখের দৃষ্টি তীব্র এবং তীক্ষ্ণ। করিম দ্রুত ভাবছেন, এখনো দৌড় দেয়ার সময় আছে। তবে দৌড় দেয়াটা হবে বিরাট বোকামি।

লাবুস বলল, পাঞ্জাবিটা খুলে আমার হাতে দেন।

করিম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। পাঞ্জাবির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। উদম গায়ে বাজারের ভেতর দিয়ে যাওয়াও লজ্জার ব্যাপার। তারপরেও কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবেন— অতিরিক্ত গরমের কারণে পাঞ্জাবি খুলে রেখেছেন। কথা মিথ্যাও হবে না। আজ অতিরিক্ত গরম পড়েছে। পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে যাচ্ছে।

করিম পাঞ্জাবি খুলে লাবুসের হাতে দিতে দিতে বললেন, পাঞ্জাবি নিয়ে বাড়িত যা। অপরাধ যা করেছিস তার ক্ষমা নাই। তবে আজ আর কিছু বলব না। কোনো একদিন ফয়সালা হবে।

লাবুস বলল, এখন লুঙ্গি খুলে আমার হাতে দেন।

কী বললি?

একবার তো বলেছি। আবার বলি, লুঙ্গি খুলে আমার হাতে দেন। নিজে না দিলে আমি টান দিয়া খুলব।

করিমের হাত-পা জমে গেল। তার কান দিয়ে মনে হচ্ছে ধোয়া বের হচ্ছে। চোখ বাপসা।

মেঘের ভেতর থেকে চাদ বের হয়েছে। ফকফকা চাঁদের আলো। করিম দুই হাতে লজ্জা ঢেকে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। লাবুসের হাতে মাওলানার লুঙ্গিপাঞ্জাবি। লাবুস সহজ গলায় বলল, বাজারের ভিতর দিয়ে যেতে পারবেন না। বাজারে হরিনাম জপ হচ্ছে। নদীর পাড় দিয়ে চলে যান। কেউ দেখবে না।

বাজারের দিক থেকে বিড়ি টানতে টানতে কে যেন আসছে। দূর থেকে বিড়ির আগুনের ওঠা-নামা দেখা যাচ্ছে। করিম রাস্তা ফেলে নদীর পাড়ের দিকে দৌড় দিলেন। রাত তেমন বেশি হয় নি। ঘাটের নৌকার মাঝিরা নিশ্চয়ই জেগে। আছে। তাদের কেউ-না-কেউ অবশ্যই দেখবে। জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ভালো। রাত গভীর হলে বাড়ি ফিরবেন। জঙ্গলে বসে থাকারও হাজার সমস্যা আছে। সাপখোপের সমস্যা। অতিরিক্ত গরমে তারা সবাই গর্ত থেকে বের হয়েছে। পালপাড়ার এক বৌ গত বুধবার দুপুরে সাপের কামড়ে মারা গেছে। কচুর লতির সন্ধানে সে জঙ্গলে ঢুকেছিল। কচুগাছের নিচে হাত দেয়া মাত্ৰ সাপ ঠোকর দিল। আল্লাহ মারুদ জানে— তাঁর কপালে সাপের হাতে মৃত্যু আছে কি-না।

 

করিমের বাড়ি বাজারের শেষপ্রান্তে। তিনি বছরখানেক আগে ভাটি অঞ্চলের এক মেয়ে বিয়ে করেছেন। মেয়ের বয়স অল্প। কিশোরীর মায়া তার চোখ-মুখ থেকে যায় নি। তার নাম শরিফা। সে উঠানে হারিকেন জ্বলিয়ে স্বামীর জন্যে অপেক্ষা করছে। বাজারে সত্যনারায়ণের ব্ৰতকথা হচ্ছে। উঠান থেকে মোটামুটি শোনা যায়। শরিফার শুনতে ভালো লাগছে। যদিও পরের ধর্মকথা শোনা ঠিক না। পাপ হয়। শরিফার প্রায়ই মনে হয় মুসলমানদের মধ্যে গানবাজনা করে ধৰ্মকথা বলার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো।

গৌরাঙ্গের মিষ্টি গলার সঙ্গে মৃদঙ্গর বাড়ি, শরিফা আগ্রহ নিয়ে শুনছে।

কহিব তোমাকে আ