বান্ধবপুর জুম্মা মসজিদের জন্যে নতুন ইমাম এসেছেন। আব্দুল করিম কাশেমপুরী। তাঁর জন্মস্থান কাশেমপুরে বলেই কাশেমপুরী টাইটেল। তাঁর বয়স অল্প। তবে ভাবে ভঙ্গিতে অত্যন্ত কঠিন। প্রথম জুম্মার দিনেই তিনি মাওলানা ইদরিসকে নামাজ পড়তে দিলেন না। মাওলানা ইদরিসের অপরাধ, তিনি বাড়িতে যুবতী মেয়েমানুষ পুষছেন। এত বড় গুনার কাজ যে করে সে আমজনতার সঙ্গে নামাজে শরিক হতে পারে না। যুবতী বিদায় করে তওবা করতে হবে, তারপর বিবেচনা। খুতবা শেষ করে মাওলানা আব্দুল করিম কাশেমপুরী প্রথম ফতোয়া দিলেন–
যে মুসলমানের স্ত্রীর চেহারা পরপুরুষ দিনে তিনবারের অধিক দেখে ফেলে তার বিবাহ বাতিল। তার সন্তানরা জারজ বলে গণ্য হবে।
মুসুল্লিরা হতভম্ব হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। মাওলানা আব্দুল করিম বললেন, বিধর্মীদের বিষয়ে সাবধান। তারা সাক্ষাৎ শয়তানের অংশ। শয়তানকে যেমন বিনষ্ট করা প্রয়োজন তাদেরও বিনষ্ট করা প্রয়োজন। কাফেরের বিষয়ে এছলাম ধর্ম কোনো ছাড় দেয় নাই। কাফের বিনদ্ষ্টে যে মুসলমান মৃত্যুবরণ করবেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে শহীদের দরজা পাবেন। তাদের স্থান হবে জান্নাতুল ফেরদৌসে। তারা পরীকালে নজিবী (দঃ)-র আশেপাশে থাকার পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন। বলেন আল্লাহু আকবার।
মুসুল্লিরা আল্লাহ আকবর বললেন, তবে তাদের গলায় তেমন জোর পাওয়া গেল না।
মাওলানা আব্দুল করিম বললেন, যারা আমাদের ধর্মে থেকেও কাফেরদের মতো কাজ কারবার করেন, তারা অতি বড় কাফের এবং মোনাফেক। মোনাফেকদের জন্যে আছে কঠিন শাস্তি। আমাদের মধ্যে যারা মোনাফেক। তারা সাবধান হয়ে যান’। মোনাফেককে কেউ সাহায্য করবেন না। সমাজ থেকে তাকে আলাদা করে রাখবেন। যেমন মাওলানা ইদরিস। তাকে যে চাল-ডাল টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করবেন। তিনি তার নিজের বিপদ ডেকে আনবেন। সবাই বলেন আল্লাহু আকবর।
মাওলানা ইদরিস মহাবিপদে পড়লেন। তাঁর বেতন বন্ধ। গ্রাম থেকে খরচের চাল-ডাল আসা বন্ধ। এক রাতে ঘরে রান্না হলো না। মাওলানা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি সন্তুষ্ট যে আজ আমার ঘরে খানা নাই।
যমুনা বলল, আপনি সন্তুষ্ট কেন?
মাওলানা বললেন, আমাদের নবিজির জীবনে কতবার এরকম ঘটেছে। ঘরে নাই খানা। এটা আল্লাহপাকের এক পরীক্ষা। সবেরে আল্লাহপাক এই পরীক্ষায় ফেলেন না। শুধু তাঁর পেয়ারা বান্দাদের এই পরীক্ষার ভেতর যেতে হয়।
যমুনা বলল, আমার চারগাছি স্বর্ণের চুড়ি আছে। বাজারে নিয়া বিক্রি করেন। চাল ডাল কিনেন।
মাওলানা হতভম্ভ হয়ে বললেন, এইটা তুমি কী বললা?
যা বলেছি ঠিক বলেছি। একবেলা না খেয়ে থাকতে পারবেন, তারপরে কী হবে?
রহমানুর রহিম ব্যবস্থা নিবেন। দেখবা সকালের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়েছে।
কীভাবে?
কীভাবে জানি না। তবে সমস্যার সমাধান যে হবে এটা জানি।
যমুনা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনার মতো মানুষ যে দুনিয়াতে আছে এইটাই জানতাম না। আমি বড় কোনো পুণ্যের কাজ করেছি বলেই আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।
মাওলানার সমস্যার সমাধান হলো পরদিন দুপুরের আগেই। বিচিত্ৰ ভাবেই হলো। মাওলানা একশ এক টাকার একটা মনি অর্ডার পেলেন। টাকাটা পাঠিয়েছেন কোলকাতা থেকে ধনু শেখ। তিনি মনি অর্ডারের কুপনে লিখেছেন–
মাওলানা ইদরিস,
আসসালামু আলায়কুম। আমি যে মহাবিপদে পতিত হইয়াছি তাহার কোনো কুল কিনারা নাই। বিপদ হইতে উদ্ধারের কোনো আশা দেখিতেছি না। আমার পা যে কাটা গিয়াছে এই সংবাদ নিশ্চয়ই পাইয়াছেন। কাটা পায়ে পচন ধরিবার কারণে আধ হাত উপরে আবার কাটিতে হইয়াছে। সেই স্থানেও পচন ধরিয়াছে। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়াছেন আবার পা কাটিবেন। যে মহাযন্ত্রণায় আছি তার কোনো সীমা নেই। সৰ্বক্ষণ মনে হয় আমার কাটা পা কড়াইয়ের জ্বলন্ত তেলে ফুটিতেছে।
মাওলানা, আপনি সুফি মানুষ। আপনি আমার জন্যে কোরান খতম করিবেন এবং আমার রোগমুক্তির জন্যে খাস দিলে দোয়া করিবেন। মৃত্যু হইলে আমি রক্ষা পাই। কিন্তু আমার মরিতে ইচ্ছা করে না।
ইতি
ধনু শেখ (খান সাহেব)
পুনশ্চ : লোকমুখে শুনিতেছি আমাকে খান বাহাদুর টাইটেল দিবার জন্যে সুপারিশ গিয়াছে। এই বিষয়েও পৃথকভাবে দোয়া করিবেন। মিলাদের আয়োজন করিবেন।
শশাংক পালের শারীরিক অবস্থাও ভয়াবহ। পায়ে পানি এসে ফুলে ঢোল হয়েছে। একেকবার তিনি নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেন। বিড়বিড় করে বলেন, হাতির পা নাকি? এ্যাঁ হাতির পা?
উদ্ভট উদ্ভট সব চিকিৎসার ভেতর দিয়ে তিনি এখন যাচ্ছেন। ফোলা পায়ে মৌমাছি হুল ফোঁটালে আরাম হবে। তিনি মৌমাছির সন্ধানে লোক পাঠিয়েছেন। কাচের বোয়মে কয়েকটা মৌমাছি ধরে আনাও হয়েছে। তিনি বোয়ামের খোলা মুখ পায়ে অনেকবার চেপে ধরেছেন। কোনো মৌমাছি হল ফুটায় নি। হতাশ হয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন— বদ মৌমাছি! এইগুলারে পানিতে চুবায়া মারো। বোয়ামে পানি ঢেলে মৌমাছি চুবিয়ে মারা হয়েছে, তাতে তাঁর পায়ের সমস্যার কোনো সমাধান হয় নি।
মুখ থেকে রুচি সম্পূর্ণ চলে গেছে। জাউ ভাত হজম হয় না। টক ঢেকুর উঠে। বুক জ্বালাপোড়া করে। এর মধ্যে খবর পেয়েছেন মুসলমান বাড়ির বেশি করে তেল মশলা দেয়া মাংস খেলে রুচি ফিরবে। সেই চেষ্টাও করা হয়েছে। তার ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। ক্রমাগত দাস্ত হচ্ছে। সেবাযত্নের চূড়ান্ত করছে সুলেমান। দাস্ত পরিষ্কার করানো, গোসল করানো, পাখা দিয়ে বাতাস- সব একা করছে। এর মধ্যে সবচে’ কষ্টকর কাজ হলো বাতাস করা। কোনো এক বিচিত্র কারণে শশাংক পালের গায়ে সারাক্ষণ মাছি বসে। মাছি তাড়ানোর জন্যেই বাতাসের আয়োজন। সুলেমান শশাংক পালকে মশারির ভেতর রাখার প্ৰস্তাব দিয়েছিল। শশাংক পাল রাজি হন নি। তাঁর নাকি দমবন্ধ লাগে। সুলেমান ক্লান্তিহীন বাতাস করে যায়, শশাংক পাল ক্লান্তিহীন কথা বলতে থাকেন। রোগের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বেশি কথা বলার সমস্যা শুরু হয়েছে। তাঁর সব কথাই রোগব্যাধি নিয়ে।
