ইতি
খান সাহেব ধনু শের
কলিকাতা
শশাংক পাল চিঠি পড়ে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে রইলেন। তারপর ডেকে পাঠালেন নায়েবকে। নায়েবের নাম বিনয়। সে নামের মতোই বিনয়ী। হরিচরণের (বর্তমান ধনু শেখের) জমিদারির দেখাশোনার প্রধান দায়িত্ব তার। কাজকর্মে অতি দক্ষ।
বিনয়!
জে আজ্ঞে।
খান সাহেবের কোনো পত্র পেয়েছ?
পেয়েছি।
বিষয় কিছু বুঝেছ?
আজ্ঞে না। তবে বিষয় জটিল।
জটিল ভাবলেই জটিল। জটিল ভাববা না।
আপনে যেমন বলবেন।
ক্যাশে নগদ টাকা-পয়সা যা আছে আমার কাছে দিয়া যাবা।
যা বলবেন করব। চিঠিতে সেই রকম লেখা।
আমার জন্যে বিলাতি একটা বোতল জোগাড় করবা, রঙিলা বাড়িতে পাওয়া যাবে। নিজে যাইতে না চাও অন্যেরে দিয়া আনাইবা।
আচ্ছা।
রাতে মুরগির কোরমা আর পোলাও খাব। জামাই পছন্দ চাউল জোগাড় করতে পার কি-না দেখ।
আপনার শরীরের অবস্থা যেমন গুরুভোজন কি ঠিক হবে?
আমার শরীর আমি বুঝব। তোমার চিন্তার কিছু নাই।
আচ্ছা।
একজন কর্মঠ কাউরে জোগাড় করো যার কাজ আমার সেবা করা। মেয়েছেলে হলে ভালো হয়। পুরুষমানুষ রোগীর সেবা করতে পারে না। মেয়েছেলে পারে। শরীর স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে। মুখের কাটিং ভালো হওয়া প্রয়োজন। বয়স হইতে হবে কুড়ির নিচে।
বিনয় হতাশ গলায় বলল, কই পাব এমন মেয়েছেলে?
শশাংক পাল বললেন, নিচা জাতের মধ্যে খোঁজ। নিচা জাতের মধ্যে পাইবা। চণ্ডাল, হাড়ি, ডোম। এদের মেয়েছেলেদের শরীর স্বাস্থ্য ভালো হয়। এখন আমারে ধরাধরি করে আরাম কেদারায় শোয়ার ব্যবস্থা করো। শরীরটা আজ ভালো ঠেকতেছে।
বিনয় তাকিয়ে আছে। কী বলবে বুঝতে পারছে না। শশাংক পাল বললেন, এক মেয়ে শুনেছি জঙ্গলে পালায়া আছে, তার খোঁজ নিতে পার। আমার আশ্রয়ে থাকবে, অসুবিধা কী?
বিনয় বলল, এইগুলা কী বলেন?
শশাংক পাল বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি যা বলি চিন্তাভাবনা করে বলি। আমার শরীরে পচন ধরেছে, মনে পচন ধরে নাই। বুঝেছ?
হুঁ।
সময় ফুরায়ে আসছে। আনন্দ ফুর্তি যা করার এখনই করতে হবে। হাতে সময় নাই। খাঁটিয়া ঘাড়ে নিয়া বলা হরি হরি বলের সময় আগত।
শরীরটা ঠিক করেন। চলেন কইলকাতা যাই।
কইলকাতা যাব না। কইলকাতার ডাক্তার-কবিরাজ এইখানে নিয়া আসি। সোনার মোহর দিয়া ভিজিট দিব। বুঝেছ? এখন আমার টাকার অভাব নাই। রঙিলা বাড়ির জুলেখার খোঁজ পাও কি-না দেখ। প্রতি সন্ধ্যায়। সে এই বাড়িতে গান করবে। টাকা-পয়সা যা লাগে দিব। নিয়মিত সঙ্গীত শুনলে শরীর আরোগ্য হয়। বুঝেছ?
কিছু না বুঝেই বিনয় মাথা নাড়াল। সে বুঝেছে।
যমুনা বেতঝোঁপের উপর
যমুনা বেতঝোঁপের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। ঝোঁপের কাটায় তার শাড়ি আটকে গেছে। হাত এবং গাল কেটেছে। তার মুখে নোনতা ভাব। কাটা গালের রক্ত গড়িয়ে ঠোঁট পর্যন্ত এসেছে। যমুনা অবাক হয়ে লক্ষ করল, রক্তের নোনতা স্বাদ তার খারাপ লাগছে না। সে ঝোঁপের পাশে বসে বেতকাটা থেকে শাড়ি ছাড়াবার চেষ্টা করছে। কাজটা সে করছে যত্ন নিয়ে এবং এই কাজটা করতেও তার ভালো লাগছে। কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা।
জঙ্গলের অন্ধকার তার চোখে সয়ে এসেছে। আবছা আবছা ভাবে অনেক কিছুই চোখে আসছে। জোনাকি পোকার দল বের হয়েছে। অনেকগুলি ছোট ছোট দল। তারা মাঝে মাঝে একত্র হচ্ছে, আবার ছড়িয়ে পড়ছে। তাকে কে যেন বলেছিল জোনাকি পোকার দলের সঙ্গে মা লক্ষ্মী থাকেন। ঘরের বন্দিজীবন যখন তাঁর অসহ্য বোধ হয় তখন তিনি খোলা মাঠে বা জংলায় বেড়াতে বের হন। জোনাকি পোকরা হয় তার খেলার সাথি। জোনাকিদের পেছনে পেছনে তিনি মনের আনন্দে নাচতে নাচতে ছুটেন।
যমুনা জোনাকির ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করে বলল, মা লক্ষ্মী! আমি মহাবিপদে পড়েছি, আমাকে উদ্ধার করা।
যমুনার ঠিক মাথার উপরে একটা ডাল নড়েচড়ে উঠল। কিচকিচি শব্দ হলো। গাছের দিকে না তাকিয়েই যমুনা বুঝল বাঁেদর। এই বনে বাঁেদর আছে। হনুমানও আছে। এরা মানুষ ভয় পায় না। হনুমানও দেবতা। তার কাছেও প্রার্থনা করা যায়। যমুনা গাছের দিকে তাকিয়ে আবারো হাতজোড় করল।
আকাশে সন্ধ্যা থেকেই মেঘের আনাগোনা ছিল। এখন বিজলি চমকাতে লাগল। একেকবার বিজলি চমকায় বন আলোয় ঝিলমিল করে উঠে। বানর এবং হনুমানের দল ঝাপাঝাপি শুরু করে। বজ্ৰপাতের সময় বনে থাকতে নেই। তখন চলে আসতে হয় খোলা প্রান্তরে। তা না করে যমুনা খুঁজে পেতে লম্বা একটা তাল গাছের নিচে দাঁড়াল। তার মন চাচ্ছে এই গাছে একটা বজ্ৰপাত হোক। আকাশের বাজ যখন নেমে আসবে তখন সে তালগাছ দুহাতে জড়িয়ে ধরবে।
পুরো আকাশ ছিন্নভিন্ন করে বিদ্যুৎ চমকাল, আর তখনি যমুনা স্পষ্ট দেখল বেতঝোঁপের উল্টোদিকে কুজো হয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। শুধু যে দাঁড়িয়ে আছে তা-না, হাত ইশারায় যমুনাকে ডাকছে। কুজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সারা শরীর চাদরে ঢাকা। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষটা যে হরিচরণ এই বিষয়ে যমুনার কোনো সন্দেহ নেই। যমুনা অবাক হয়ে ডাকল, হরিকাকু!
ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। আবারো হাত ইশারা করল। যমুনার মনে রইল না, মানুষটা জীবিত না। একজন মৃত মানুষ গভীর বনে উপস্থিত হতে পারে না। যমুনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগুচ্ছে। ছায়ামূর্তি সরে সরে যাচ্ছে। যতবার যমুনা থমকে দাঁড়াচ্ছে ততবার ছায়ামূর্তিও দাঁড়াচ্ছে। তাকে কি ভুলোয় ধরেছে? ভুলো ভয়াবহ জিনিস। সে প্রিয় মানুষের রূপ ধরে কাছে আসে। নাম ধরে ডাকে। তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে পেছনে যেতে হয়। একসময় ভুলো তার শিকারকে জলে ড়ুবিয়ে মারে।
