মাওলানা চুপ করে রইলেন। জুলেখা বলল, কাগজটা কি আপনার কাছে রেখে যাব?
মাওলানা বললেন, না। তুমি চলে যাও।
জুলেখা বলল, এক কথায় চলে যাব? আমি আপনার স্ত্রী। ভাব ভালোবাসার দুইটা কথা বলেন। শুইন্যা যাই।
তুমি চলে যাও।
জুলেখা বলল, আপনার কাছে একটা প্রস্তাব আছে। দোষ না নিলে প্রস্তাবটা দিব। দোষ ধরলেও দিব।
কী প্ৰস্তাব?
চলেন অনেক দূরের কোনো দেশে চইল্যা যাই। যেখানে আপনারে কেউ চিনে না। আমারেও না।
তুমি অতি পাপিষ্ঠ।
জুলেখা হাসতে হাসতে বলল, আপনার মতো এত বড় মাওলানা যার স্বামী তার চিন্তা কী? সে তওবা করায়া আমারে পবিত্র করব।
স্বামী নাম আর কোনোদিন মুখে আনবা না।
আচ্ছা আনব না।
এখন বিদায় হও। তোমার সাথে কথা বলাও পাপ।
জুলেখা বলল, অনেক পুণ্য তো সারাজীবন করেছেন। কিছু পাপ করলেন। এই বিষয়ে আমার ব্যাপজানের একটা গান আছে। শুনবেন?
চুপ বললাম। চুপ।
জুলেখা নিচু গলায় গান ধরল—
ভালো চিনতে মন্দ লাগে
মন্দ চিনতে ভালো।
শাদা কেউ চিনে না বান্ধব
না থাকিলে কালো।
মাওলানা উঁচু গলায় বললেন, বিদায় হও। বিদায়।
জুলেখা হাঁটা শুরু করল। মাওলানা তাকিয়ে আছেন। কালো বোরকার কারণে জুলেখা মুহুর্তের মধ্যেই অন্ধকারে ঢেকে গেল। মাওলানা অনেক রাত পর্যন্ত উঠানে বসে আল্লাহর নাম জপলেন। কিছুক্ষণ পর পর হাত উঠিয়ে মোনাজাত করলেন, হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে একটা ইশারা দাও। বলে দাও আমি কী করব।
মাওলানার শরীর দিয়ে ঘােম পড়ছে। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন পায়ের থপথপ শব্দ। তাকে ঘিরে কে যেন হাঁটছে। নাকে কটু গন্ধ আসছে। পশুদের গা থেকে যেমন গন্ধ আসে তেমন গন্ধ। আকাশে মেঘ করেছিল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলি গরম। এরকম তো কখনো হয় না।
খান সাহেব ধনু শেখ শাল্লার জমিদার বাড়িতে এসেছেন। খান সাহেব হবার পর এটা তার প্রথম আসা। আয়োজন করে আসা উচিত। তা-না, তিনি একা এসেছেন, খালি পায়ে এসেছেন। তাঁর দুই পাভর্তি ধূলা। পায়ের ধূলা ধুয়ে ফেলার জন্যে তাকে রূপার বদনা ভর্তি করে পানি দেয়া হয়েছে। একজন খানসামা তাঁর পায়ে পানি ঢালছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছেন নেয়ামত হোসেন। তার চোখ তীক্ষ্ম। মুখ গভীর। নেয়ামত হোসেন বললেন, খান সাহেব মানুষ খালি পায়ে পথ চলে, এটা কেমন কথা?
ধনু শেখ বললেন, ঠিক করেছি। হাতি খরিদ না করা পর্যন্ত খালি পায়ে হাটব। এইটা আমার একটা জিদ।
খারাপ না। পুরুষমানুষের জিদ থাকা ভালো। আমার কাছে কী জন্যে এসেছেন?
ধনু শেখ মনে মনে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষটা আপনি’ বলা শুরু করেছে। ধনু শেখ বললেন, আপনি কয়েকবার খবর পাঠিয়েছেন দেখা করার জন্য। নানান কাজকর্মে থাকি, সময় করতে পারি নাই। আজ আমি অবসর। ভাবলাম যাই। গফসফ করে আসি। আপনার মতো বিশিষ্ট মানুষ থাকতে আমার গফের মানুষ নাই। এটা আফসোসের বিষয়।
নেয়ামত হোসেন ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আপনি অবসর এই জন্যে এসেছেন এটা বিশ্বাস করা যায় না। কারণ ছাড়া আপনি আসেন নাই। কারণটা বলেন।
সদর খাজনার সময় হয়েছে। টাকার জোগাড় কি হয়েছে?
নেয়ামত হোসেন বললেন, খাজনার টাকা আছে। যদিও কয়েকবার আমার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতরা কিছু নিতে পারে নাই— এই খবর আপনার জানার কথা।
ধনু শেখ বললেন, আমি কী করে জানিব? আমি তো ডাকাতের দলে ছিলাম না। না-কি আপনার ধারণা আমিও ছিলাম?
নেয়ামত কিছু বললেন না। ধনু শেখের এ বাড়িতে আসার উদ্দেশ্য এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না। খারাপ কোনো মতলব আছে। এটা বোঝা যাচ্ছে।
ধনু শেখ বললেন, জমিদার সাব। আপনাকে অত্যধিক চিন্তাযুক্ত মনে হইতেছে। আমি কী কারণে আসছি। বুঝতে পারতেছেন না বইলা চিন্তিত। আমি আসছি আপনাৱে সাবধান করতে।
আমাকে সাবধান করতে এসেছেন?
ধরেন সদর খাজনা নিয়া আপনার ম্যানেজার রওনা হইল। পথে পড়ল ডাকাতের হাতে। বিপদ না? খাজনা দিতে পারলেন না। জমিদারি উঠল। নিলামে। শশাংক পালের ঘটনা।
নেয়ামত হোসেনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি ‘তুমিতে ফিরে গেলেন। কঠিন গলায় বললেন, তুমি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছ? ডাকাতির ভয়?
ধনু শেখ বললেন, আপনি ব্যবস্থা ভালো নিয়েছেন। এমন এক পথে খাজনা যাবে যে পথে কেউ যায় না। খাজনা যাবে ঘোড়ার পিঠে। মিশাখালির বাজারের পথে। ঠিক বলেছি না? আপনার নিজের লোকই যদি সব বলে দেয়। তখন তো ভয় আপনাতেই আসে। তার উপরে দেশ ভর্তি হয়েছে স্বরাজের বোমাবাজাদের দিয়ে। টাকা লুটপাটে এরা ওস্তাদ। এরা পরিচয় দেয় স্বদেশী, বিপ্লবী। আসলে ডাকাত।
নেয়ামত হতভম্ব। সদর খাজনা মিশাখালি বাজার দিয়ে ঘোড়ার পিঠে যাবে। এটা সত্য। এই সত্য বাইরের মানুষের জানার কথা না।
ধনু শেখ উঠে দাঁড়ালেন। চলে যাবার প্রস্তুতি। নেয়ামত হোসেন বললেন, একটু বসেন।
জরুরি কাজ ছিল। একটু আগে বলেছেন। আজ আপনি অবসর। গফসফ করতে এসেছেন। ও আচ্ছা, আসলেই তো আজ কোনো কাজকর্ম নাই। দুপুরে আমার সঙ্গে খানা খান। ধনু শেখ বললেন, মন্দ না। আপনার বাবুর্চির সুনাম শুনেছি। তার হাতের রান্ধন চাখবার সৌভাগ্য হয় নাই। আমি বিরাট ভাগ্যবান।
নেয়ামত বললেন, আপনার সঙ্গে আমি কোনো বিবাদে যেতে চাই না। আপোস করতে চাই। আপনি বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়েছেন। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরে দেখবে এই নিয়ম। আপনি আমার স্বাৰ্থ দেখবেন, আমি আপনার স্বাৰ্থ দেখব।
