ধনু শেখ বললেন, অবশ্যই। খাঁটি কথা বলেছেন। এই কথার দাম লাখ টাকার উপরে।
নেয়ামত বললেন, মাঝে মাঝে আমরা দুই ভাই মজলিশে বসব। গানবাজনা হবে। লখনৌ-এর এক বাইজি আমার এখানে আছে। শুনেছেন বোধহয়।
শুনেছি।
তার ঘাঘড়া নৃত্য দেখার মতো জিনিস। আজ রাতেই নাচের ব্যবস্থা করব, যদি মেয়েটার শরীর ভালো থাকে।
ধনু শেখ বললেন, আপনার বিরাট মেহেরবানি।
নিয়ামত বললেন, আমার খাজনা নিয়ে যখন যাবে তখন তাদের সাথে আপনার কয়েকজন বিশ্বাসী লোক দিয়ে দিবেন।
অবশ্যই।
নেয়ামত বললেন, এক কাজ করুন, রাত পর্যন্ত থাকেন। রাতে ভালো আয়োজন করি। সামান্য গানবাজনার আয়োজনও থাকল।
মন্দ না।
ধনু শেখ গিয়েছিলেন খালি পায়ে, ফিরলেন হাতিতে চড়ে। নেয়ামত হোসেন বন্ধুকে হাতিতে করে ফেরত পাঠালেন।
এত করেও শেষরক্ষা হলো না। নেয়ামত হোসেনের খাজনার দলে ডাকাত পড়ল। বন্দুকের গুলিতে নেয়ামত হোসেনের তহসিলদার এবং এক নায়েব মারা গেল। স্বদেশী ডাকাতদের কাজ। এদের জন্যে টাকা পয়সা নিয়ে বের হওয়াই মুশকিল। পুলিশের এসপি সাহেব স্বয়ং নিজে কয়েকবার এসে তদন্ত করে গেলেন। কোনো হদিস পাওয়া গেল না।
ধনু শেখের শরীর ভালো না। জ্বর জ্বর ভাব। সারাদিনই তিনি বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছেন। সন্ধ্যার পর বেদানার সঙ্গ সাপলুড়ু নিয়ে বসেছেন। সাপলুড়ু পুরোপুরি ভাগ্যের খেলা। বেদানার গুটি খাওয়ার পারদর্শীতা সাপলুড়ুতে কাজে লাগে না। তারপরেও এই খেলাতেও সে জেতে। ধনু শেখ ভালোই খেলছিলেন। তার গুটি তরতর করে উঠে যাচ্ছিল। নিরান্নব্বইতে এসে সাপের মুখে পড়ে দুইয়ের ঘরে চলে যেতে হলো। বেদানার মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। দু’জনেরই বড় সুখের সময়।
সুখের সময়ে বাধা পড়ল। সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর এসে খবর দিল, জুম্মাঘরের ইমাম এসেছেন। দেখা করতে চান।
ধনু শেখ বললেন, এখন ব্যস্ত আছি। পরে আসতে বলো। তিন দান লুড়ু খেলা হলো। তিনটিতেই বেদোনা জিতলা। ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, ঐ বান্দি, তোর সাথে পারা মুশকিল।
স্ত্রীর প্রতি অতিরিক্ত মমতা তৈরি হলে ধনু শেখ তাকে ‘বান্দি সম্বোধন করেন এবং তুই তোকারি করেন।
বেদানা বলল, আপনের শরীর কি এখনো খারাপ?
ধনু শেখ বললেন, হঁ। দুই দানা আফিং খাইলে মনে হয় শরীর ঠিক হইত। [সে-সময় আবগারী দোকানে আফিম বিক্রি হতো। যে-কেউ আফিম কিনে খেতে পারত।]
বেদানা বলল, আফিং খান। দুধ জ্বাল দিয়া দিতে বলি, দুধ দিয়া খান।
ধনু শেখ বললেন, শরাব খাইলেও চলে। শরাব শরীর ম্যাজমেজানির আসল ওষুধ।
বেদানা বলল, শরাব খাইতে চাইলে খান। গেলাস দিতে বলি?
বল।
শরাব আর আফিং একসাথে খাইলে কী হয়?
কিছুই হয় না। ‘নিশা’ ভালো হয়।
দুইটা একসাথে খান। আমিও আপনের সাথে খাব।
মেয়েছেলের এইসব খাওয়া ঠিক না।
ঠিক না হইলেও খাব। আপনের গেলাসে একটা চুমুক দিব।
ধনু শেখ দরাজ গলায় বললেন, আচ্ছা যাও দিও।
অতি আনন্দময় এই মুহূর্তে খবর পাওয়া গেল, মাওলানা ইদরিস যায় নি। এখনো বৈঠকখানায় বসে আছে। ধনু শেখের বিরক্তির সীমা রইল না। তিনি মাওলানাকে শোবার ঘরেই ডাকলেন। বেদানাকে কিছু সময়ের জন্যে বাইরে পাঠালেন। বেদোনা পুরোপুরি গেল না। দরজায় কান পেতে রাখল। পুরুষ মানুষদের জটিল কথা শুনতে তার বড় ভালো লাগে। মামলা মোকদ্দমার কথা, ব্যবসার কথা। এদের কথাবাতাঁর ধরনই অন্যরকম।
আসসালামু আলায়কুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। মাওলানা, তোমার কী ব্যাপার? [ধনু শেখ আগে মাওলানাকে আপনি করে বলতেন। খান সাহেব হবার পর থেকে তুমি বলছেন।]
আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম। শরীরটা ভালো না। কথা শোনার মতো মনের অবস্থা না। তারপরেও বলো।
হরিচরণ বাবুর বিষয়সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা নিয়া একটা দলিল হয়েছিল, এই বিষয়ে কি আপনি জানেন?
ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বললেন, জানব না কেন? দলিল আমার কাছে। আরেকটা কথা, তুমি হরিচরণ হরিচরণ করতেছ। কোন কামে? তার নাম মোহাম্মদ আহম্মদ।
মাওলানা বললেন, আপনার কাছে যে দলিল আছে তার বিষয়ে বলতেছি না। মূল দলিল।
গাধার মতো কথা বলব না। তুমি মাওলানা, গাধা না।
দলিলটা একজনের কাছে রক্ষিত আছে।
তোমার কথা কি শেষ হয়েছে? কথা শেষ হয়ে থাকলে বিদায় হও। লোকমুখে শুনেছি। তুমি হাফেজ পরীক্ষায় ফেল করেছ। এটা কি সত্য?
জি জনাব।
ফেলটুস মাওলানা দিয়ে তো আমাদের চলবে না। তুমি অন্য কোনোখানে কাজ দেখ। আমি পাশ করা ভালো মাওলানার সন্ধানে আছি। বুঝেছি কি বলেছি?
জি।
এখন বিদায় হও। জুমার নামাজের খুতবা ঠিকমতো পড়তে পার তো? নাকি তোমার পেছনে দাঁড়ায়ে আমরা সবাই গুনাগরি হইতেছি? দাঁড়ায়া থাকবা না, যাও বিদায়।
মাওলানা চলে গেলেন। ধনু শেখ শরাব নিয়ে বসলেন। বেদানার এক চুমুক খাওয়ার কথা, সে কয়েক চুমুক খেয়ে ফেলল। মুখ বিকৃত করে বলল, মজা পাইতেছি না তো।
ধনু শেখ বললেন, ঝিমভাব হয়, এইটাই মজা।
আমার তো ঝিমভাব হইতেছে না। আরো একটা চুমুক দিব?
ধনু শেখ দরাজ গলায় বললেন, দেও।
বেদানা বড় করে চুমুক দিয়ে শাড়ির আঁচলে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল, মূল দলিল কার কাছে খোঁজ নেয়া উচিত না?
ধনু শেখ বিস্মিত হয়ে বললেন, দলিলের বিষয়ে তুমি কি জানো?
আড়াল থাইক্যা শুনছি।
কাজটা ঠিক করা নাই।
আপনেরে এক নিমিষ না দেখলে অস্থির লাগে, এইজন্যে দরজার চিপা দিয়া দেখতে ছিলাম। ভুল হইলে মাফ চাই। এই আপনের পায়ে ধরলাম।
