মাওলানা ইদরিস হাফেজ টাইটেলের পরীক্ষায় ফেল করেছেন। দেওবন্দে চারজন হাফেজের সামনে পরীক্ষা দিতে বসে পদে পদে ভুল করেছেন। চারজন হাফেজই বিরক্ত হয়েছেন, যদিও তাঁরা মনের ভাব প্রকাশ করেন নি।
একজন মাওলানা ইদরিসের কাঁধে হাত রেখে বলেছেন, সবাই হাফেজ হতে পারে না। হওয়ার প্রয়োজনও নাই। আপনি এই পথ ছেড়ে দেন। আল্লাপাকের কালাম ভুলভাল বলে আপনি মহাপাপী হচ্ছেন। প্রয়োজন কী?
মাওলানা বললেন, এক দুই বৎসর পরে আবার আসি? আপনাদের চারজনকে একসঙ্গে দেখে ভয় পেয়েছি বিধায় সব আউলা ঝাউলা হয়েছে।
এক বৎসর পর যখন আসবেন তখনো তো আমরা চারজনই থাকব। তখন কি মাথা আউলা হবে না?
মাওলানা ইদরিস এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন নি। বিষণ্ণ হৃদয়ে বান্ধবপুরে ফিরে এসেছেন। হাফেজ টাইটেল পাওয়ার পর বিবাহ করবেন। এরকম বাসনা ছিল। সেই বাসনা এখন তার আর নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোরান মজিদ আবারো ভালোমতো মুখস্থ করবেন। আবারো দেওবন্দ যাবেন। শুদ্ধ নিয়তের প্রতি আল্লাহপাকের মমতা আছে। তার নিয়ত শুদ্ধ।
বৈশাখ মাসের এক রাত। মসজিদে এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা বাড়ি ফিরে দেখেন ভেতর বাড়িতে হারিকেন জুলছে। তিনি খুবই বিস্মিত হলেন। তার বাড়ি থাকে অন্ধকার। তিনি এসে হারিকেন জ্বালান। কে এসে বাড়িতে হারিকেন জ্বালাবে? তাঁর ক্ষীণ সন্দেহ হলো, জহির হয়তো ফিরে এসেছে। জহিরের নিরুদ্দেশের খবর তিনি উকিল মুনসির মাধ্যমে পেয়েছেন।
মাওলানা উঠানে দাঁড়িয়ে বললেন, কে?
ভেতর থেকে নারীকণ্ঠে কেউ একজন বলল, আমি।
মাওলানা বললেন, আপনার পরিচয়?
আমার নাম জুলেখা, আমি জহিরের মা। মাওলানা সাহেব, আপনাকে আসসালাম।
মাওলানার শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। কী সর্বনাশের কথা! রঙিলা বাড়ির অতি পাপিষ্ঠ নারীদের একজন তার ঘরে। জানাজানি হলে বিরাট সর্বনাশ হবে। জানাজানি না হলেও ঘরদুয়ার অপবিত্র হয়েছে। কুকুর যে ঘরে ঢুকে সেই ঘর নাপাক হয়ে যায়। সেখানে নামাজ হয় না। এরা তারও অধম।
জুলেখা বলল, মাওলানা সাহেব, ভেতরে আসবেন? আপনার সঙ্গে দুইটা কথা বলব।
মাওলানা বললেন, আপনি আমার বাড়িতে এসে বিরাট অন্যায় করেছেন।
অন্যায়ের জন্যে ক্ষমা চাই। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা ছিল বলে এসেছি। কথা শেষ করে চলে যাব।
মাওলানা বললেন, আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নাই। আপনি চলে গেলেন।
বাড়ির ভেতর থেকে মৃদু হাসির শব্দ পাওয়া গেল। এই পরিস্থিতিতে কোনো মেয়ে হাসতে পারে তা মাওলানার কল্পনাতেও নেই। মাওলানা বললেন, আপনাকে আল্লাহর দোহাই লাগে আপনি চলে যান।
জুলেখা বলল, আমি যে আপনার স্ত্রী এইটা কি জানেন?
মাওলানা হতভম্ব গলায় বললেন, তুমি কী বললা?
মাওলানা এতক্ষণ আপনি করে বলছিলেন, হঠাৎ তুমি সম্বোধনে চলে গেলেন।
জুলেখা শান্ত গলায় বলল, পুরান কথা মনে কইরা দেখেন। আপনের কলেরা হয়েছিল। আপনি মরুতে বসেছিলেন। আমি ছিলাম। আপনার সাথে। আপনার সেবা করেছিলাম। মনে আছে?
মাওলানা চাপা গলায় বললেন, মনে আছে।
জুলেখা বলল, এক রাতে আপনি আমারে বললেন, কোনো অনাত্মীয় তরুণী পুরুষের সেবা করতে পারে না। দুইজনেরই বিরাট পাপ হয়। তখন আমি বললাম, এক কাজ করেন, আমাকে বিবাহ করেন। আপনার কি মনে আছে?
মাওলানা চুপ করে রইলেন। তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এই মেয়েটা ভয়ঙ্কর কথা বলছে। মেয়েটা মিথ্যাও বলছে না। তার আবছা আবছা মনে পড়ছে।
জুলেখা বলল, আপনার মনে না থাকলেও আমি আপনাকে দোষ দিব না। আপনি তখন মরতে বসেছিলেন। মৃত্যুর সময় মানুষ অনেক কিছু করে। আপনি কি উঠানে দাঁড়ায়ে থাকবেন? ভেতরে আসবেন না?
মাওলানা এই প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। তিনি হঠাৎ লক্ষ করলেন, তাঁর কথা বলার শক্তি চলে গেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ইবলিশ শয়তান আশেপাশে আছে এটা বোঝা যাচ্ছে। সে মজা দেখার জন্যে অপেক্ষা করছে। মাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, আল্লাহপাক আমাকে ইবলিশের হাত থেকে বাঁচাও।
জুলেখা ঘরের ভেতর থেকে উঠানে এসে দাঁড়াল। তার সমস্ত শরীর বোরকায় ঢাকা। চিকের পর্দার আড়ালে চোখ। অন্ধকারের কারণে সেই চোখও দেখা যাচ্ছে না। জুলেখা বলল, তখন আপনি আমারে কবুল বলতে বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম। আপনার হাত ধরে তিনবার বলেছি- কবুল, কবুল, কবুল।
মাওলানা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, তুমি বলেছিলে, আমি বলি নাই।
আপনি বলেছিলেন। ইয়াদ করে দেখেন।
আমার ইয়াদ নাই।
আমি আপনারে ফেলে চলে যেতাম না। আমি ভেবেছিলাম আপনার মৃত্যু হয়েছে। চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো পথ ছিল না।
মাওলানা বললেন, এইটাই কি তোমার জরুরি কথা?
জুলেখা বলল, এইটা কোনো জরুরি কথা না। রোগের যন্ত্রণায় আপনি কী করেছেন না করেছেন সেটা কিছু না। আমার কথাবার্তা শুনে আপনি বড়ই অস্থির হয়েছেন। মন শান্ত করেন। মন শান্ত করার জন্য তিনবার তালাক বলে দেন। আমাদের ধর্মে বিবাহ যেমন সোজা তালাকও তেমন সোজা।
ধর্ম নিয়া কথা বলব না।
গোস্তাকি হয়েছে। আর বলব না।
জরুরি কথাটা বলো।
আমার কাছে একটা কাগজ আছে। দানপত্র। জীবনলাল নামের এক লোক পাঠায়েছে। সেখানে আপনার দস্তখত আছে।
মাওলানা দ্বিতীয়বার চমকালেন।
জুলেখা বলল, ধনু শেখ এতবড় অন্যায় করেছে, আপনি সব জেনেও কিছু বলেন নাই।
মাওলানা বিড় বিড় করে বললেন, আমি ছোট মানুষ।
জুলেখা বলল, আপনি আল্লাওলা মানুষ। আল্লাওলা মানুষ জানে মানুষের মধ্যে বড় ছোট নাই। সবাই সমান। আপনি জানেন না?
