শশাংক পাল বললেন, খান সাহেব, আমরা যাব কবে?
ধনু শেখ বললেন, সময় হলেই যাব। সময় এখনো হয় নাই।
সময় কবে হবে?
ধনু শেখ বিরক্ত গলায় বললেন, ঢাকার কমিশনার সাহেব পাখি শিকারে আসবেন। পাখি শিকারের পরে যাব।
শশাংক পাল বললেন, ততদিন আমি বাঁচব না।
ধনু শেখ নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, মরে গেলে খাঁটি ঘি দিয়ে দাহর ব্যবস্থা করব। চিন্তার কিছু নাই।
শশাংক পাল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। কঠিন কিছু কথা তাঁর ঠোঁটে এসে গেছে। অনেক কষ্টে কথাগুলি আটকালেন। ধনু শেখ এখন এমন ব্যক্তি যার সঙ্গে কঠিন কথা বলা যায় না। সামলে কথা বলতে হয়।
ধনু শেখ গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, সিরাজ ঠাকুর?
সিরাজ ঠাকুর ব্যস্ত হয়ে বললেন, জে খান সাব।
এইবারের কোরবানির ঈদে মসজিদের সামনে আমি কোরবানি দিব বলে মনস্থ করেছি।
মনস্থ করেছি।
হিন্দুরা লাফালাফি ঝাপঝাঁপি করতে পারে। করলে করবে। আপনি কী বলেন?
অবশ্যই। তারা ধর্মকর্ম করবে, আমরা করব না— এটা কেমন কথা? আমাদেরও ধর্মকর্মের হক আছে।
ধনু শেখ বললেন, মাগরিবের নামাজের সময় এরা মন্দিরে ঘণ্টা বাজায়। মুসুল্লিদের নামাজের অসুবিধা হয়। এরও একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘণ্টা বাজাইতে দোষ নাই। নামাজের সময় বাদ দিয়ে।
সিরাজ ঠাকুর জোরের সঙ্গেই বললেন, অবশ্যই।
ধনু শেখ বললেন, ভালো দেখে একটা ঘোড়া খরিদ করা দরকার। ঘোড়া বিনা বিশিষ্ট মানুষের ইজ্জত রক্ষা হয় না।
সিরাজ ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, অবশ্যই। শাদা রঙের ঘোড়া, যেন দূর থেকে নজরে আসে।
শশাংক পাল বললেন, উ ছ। ঘোড়াতে কোনো ইজ্জত নাই। থানার ওসি ঘোড়ায় চড়ে। ইজ্জত হাতিতে। হাতি খরিদ করেন।
ধনু শেখ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তার হাতি-ভাগ্য ভালো না। হরিচরণ বেকুবের মতো তার হাতি আসামের জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন। সেই হাতি ফিরে আসে নি। ধনু শেখ শাল্লার দশআনি জমিদার নেয়ামত হোসেনের কাছে হাতি কিনতে গিয়ে অপদস্ত হয়েছেন। নেয়ামত হোসেন ধনু শেখকে ‘তুমি তুমি’ করে বলেছেন, যেন ধনু শেখ তার অধস্তন কর্মচারী।
হাতি কিনতে চাও?
জি। শুনেছি আপনি আপনার হাতি বিক্রি করবেন। খরিদার অনুসন্ধান করছেন।
হাতি দিয়া তুমি করবা কী?
বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া আসা করতে হয়।
পালকিতে যাওয়া আসা করব। হাতি একটা ইজ্জতের প্রাণী। তার ইজ্জতের দিকে আমাদের লক্ষ রাখা দরকার। যে মুচি, জুতা সেলাই করে, তার বাড়িতে হাতি দেওয়া যায় না। এতে হাতির ইজ্জতের হানি হয়।
ধনু শেখ আহত হয়ে বলেছেন, আমি কি মুচি?
নেয়ামত হোসেন হাই তুলতে তুলতে বলেছেন, কথার কথা বলেছি। নিজের ঘাড়ে টান দিয়া নিবা না। ছোটলোকের স্বভাব কি জানো? সবকথা নিজের ঘাড়ে টান দিয়া নেয়। সে ভাবে সবাই তাকে অপমান করতে নামছে। তুমি বড় মানুষ হওয়ার চেষ্টায় আছ— এইসব শিখবা না?
ধনু বিড় বিড় করে বলেছেন, অবশ্যই। অবশ্যই।
নেয়ামত হোসেন ইকোয় টান দিয়ে উপদেশের ভঙ্গিতে বলেছেন, হাতির চিন্তা বাদ দাও। আমার কথা শোন, হাঁটাহাঁটির মধ্যে থাক। এতে শরীর স্বাস্থ্যু ভালো থাকে। শরীর ঠিক রাখা প্রয়োজন না?
ধনু শেখ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমি উঠি।
নেয়ামত হোসেন দরাজ গলায় বললেন, আরো এখনই কি উঠাবা? শরবত খাও, মিষ্টি খাও। মিষ্টি মুখে না দিয়া আমার বাড়ি থেকে কেউ যায় না। তোমার সঙ্গে আমার বিশেষ জরুরি কিছু কথাও ছিল।
কী কথা?
দুষ্ট লোকে বলে, তুমি নাকি মরা। হরিচরণের আঙুলের ছাপ দিয়া দলিল বানিয়েছ— এটা কি সত্য?
দুষ্ট লোকটা কে?
দুষ্ট লোকের আলাদা পরিচয় থাকে না। তারা গলায় সাইনবোর্ড বুলিয়ে ঘুরে না। কথা সত্য কিনা বলো।
নেয়ামত হোসেন চেয়ারে গা এলিয়ে গড়গড়া টানছেন। তার চোখ বন্ধ। ধনু শেখকে আচমকা এই প্রশ্ন করে ‘তবদা’ বানিয়ে দিতে পারার আনন্দেই তিনি আত্মহারা। তবে ধনু শেখ জবাব দিলেন। এই জবাব শোনার জন্যে নেয়ামত হোসেন প্রস্তুত ছিলেন না। নেয়ামত হোসেন মনে মনে ধনু শেখের সাহসের প্ৰশংসা করলেন।
ধনু শেখ বললেন, দুষ্ট লোক বা শিষ্ট লোক আমার বিষয়ে কী কথা বলেছে আমি জানি না, তবে আপনার কাছে স্বীকার করছি— ঘটনা সত্য!
নেয়ামত হোসেন বললেন, ঘটনা সত্য?
জি জনাব সত্য। হরিচণের না আছে কোনো ওয়ারিশান না আছে কিছু। তার বিষয়সম্পত্তি সাত ভূতে লুটে খাবে, এটা কেমন কথা!। এইসব বিবেচনা করে দখল নিয়েছি। জনাব, উঠি?
হাতি বিষয়ক এইসব কথাবার্তা যখন হয়েছে তখনো ধনু শেখ খান সাহেব হন নাই। জমিদার নেয়ামত হোসেন তাকে অপমান করতে পারে। ধনু শেখ অপমান গায়ে মাখেন নাই। হাসিখুশি অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন। বালিকা বধূর সাথে লুড়ু খেলেছেন। তিন দান খেলা হয়েছে। দুইবারই তিনি জিতেছেন। বেদান লুড়ুতে হারার অপমান নিতে না পেরে কান্নাকাটি করেছে। তাকে শান্ত করতে ধনু শেখের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে।
বেদানাকে ধনু শেখ বড়ই পিয়ার করেন। তাঁর এই বালিকা বধূ ভাগ্যবতী। তাকে বিয়ে করার পরই আচমকা ‘খান সাহেব’ টাইটেল। ইংরেজ জাতি হিসেবে ভালো, তারা উপকারীর উপকার ভোলে না।
ধনু শেখ ধরেই নিয়েছিলেন টাইটেল পাওয়ার পর নেয়ামত হোসেনের বাড়িতে তার দাওয়াত হবে। তা হয় নি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তিনবার লোক মারফত খবর পাঠিয়েছেন। নেয়ামত হোসেন কথা বলতে চান। বিশেষ জরুরি।
প্রথমবার খবর পাঠালেন তার নিজ বাড়িতে ডাকাতি হবার পর। দ্বিতীয়বার খবর পাঠালেন, তার বজরায় ডাকাত দলের গোলাগুলির ঘটনার দিনে। তৃতীয় দফায় খবর পাঠিয়েছেন কিছুদিন আগে। ধনু শেখ ঠিক করে রেখেছেন, যাবেন। সদর খাজনা দেবার তারিখ হবার আগে আগে। নেয়ামত হোসেন যেন সদর খাজনা দিতে না পারেন এই ব্যবস্থা তিনি নিয়ে রেখেছেন। টাকা নিয়ে যারা যাবে তারা ডাকাতের হাতে পড়বে। দুই চারজনের প্রাণহানী ঘটবে। কী আর করা। সবই উপরের হুকুম। জগত চলে উপরের হুকুমে, মানুষের করার কিছু নাই। ভালো ব্যবস্থা। তবে সব ব্যবস্থা সবসময় কাজ করে না।
