হতভম্ব হরিচরণ কোনো জবাব দিলেন না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন। লাবুসের মা বললেন, আপনার কোনো কন্যা কি অল্পবয়সে মারা গিয়েছিল?
হরিচরণ বললেন, হ্যাঁ।
লাবুসের মা হতাশ গলায় বললেন, আমি মৃত মানুষজন মাঝে মাঝে দেখতে পারি। কেন যে পারি নিজেও জানি না।
লাবুসের মা হাতির দিকে রওনা হলেন।
জুলেখার ঘরে অতিথি এসেছে। আলাভোলা চেহারা, গায়ে চাদর। পরনে লুঙ্গি। রঙিলা বাড়িতে লুঙ্গি পরে কেউ আসে না। বাবু সেজে আসে। ক্যানের লতিতে আতর দেয়।
অতিথি বললেন, আপনার নাম কী?
জুলেখা বলল, সবার প্রথম প্রশ্ন আপনার নাম? নামের কি প্রয়োজন? আমার নাম ফুলবিবি হলেও যা চানবিবি হলেও তা, আবার জুলেখা হলেও ক্ষতি নাই। মনে করেন আমার নাম জুলেখা। পান খাবেন? ভালো জর্দা আছে। ময়মনসিংহের সাধুবাবা জর্দা।
পান খাব।
জুলেখা পানদান এবং পিক ফেলার পিকদান পাশে এনে রাখল। পিকদান পিতলের। কিছুদিন হলো কিনেছে। রোজ তেঁতুল দিয়ে মাজা হয় বলে ঝকঝাক করে। জুলেখার কাছে মনে হয় ‘সন্নের’ পিকদান।
অতিথি বললেন, জুলেখা, শুনেছি তোমার কণ্ঠস্বর মধুর। আমি দূরদেশ থেকে এসেছি তোমার গান শুনতে। বাদ্যবাজনার প্রয়োজন নাই। খালি গলায় গান করবে, আমি শুনব।
জুলেখা পান সাজতে সাজতে বলল, আমার গানের কথা শুনেছেন। রূপের কথা শুনেন নাই?
রূপের কথাও শুনেছি। স্বীকার পাইলাম তোমার রূপ আছে। শোনা কথা বেশির ভাগ সময় মিলে না। তোমার বেলায় মিলেছে।
জুলেখা অতিথিকে এক খিলি পান দিয়ে নিজে এক খিলি পান মুখে নিল। তার পানে খয়ের বেশি করে দেয়া, যাতে কিছুক্ষণের মধ্যে ঠোঁট টকটকে লাল হয়ে যায়। সে পান চাবাতে চাবাতে বলল, কী গান শুনবেন?
তুমি উকিল মুনসির গান ভালো জানো বলে শুনেছি। তাঁর একটা গান Qasirv8।
তাঁর গান আইজ গাব না। অন্য গান শুনেন।
তাঁর গান গাবা না কেন?
যেদিন আমার মন ভালো থাকে না, সেইদিন উনার গান করি। আইজ আমার মন ভালো।
আমি তোমার কাছে উকিল মুনসির গান শুনতে আসছি। অন্য গান না।
টাকা কত এনেছেন?
বিশটা রুপার টাকা এনেছি। চলবে?
হ্যাঁ, চলবে। জুলেখা পিকদানে চাবানো পান ফেলে ঠোঁট মুছেই গান ধরল—
আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়
নিঠুর বন্ধুরে
বিচ্ছেদের বাজারে গিয়া
তোমার প্ৰেম বিকি দিয়া
করব না প্ৰেম আর যদি কেউ কয়।
জুলেখার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। চোখের কাজল পানিতে ধুয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। তার ফর্সা মুখে তৈরি হচ্ছে কালো রেখার আঁকিবুকি।
গান শেষ করে জুলেখা বলল, আরো কি গাইব?
অতিথি বললেন, বিশটা রুপার টাকায় যে কয়টা হয়। সেই কয়টা গান Crs
জুলেখা বলল, উকিল মুনসির একটা গানের দাম এক কলসি সোনার মোহর।
অতিথির ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল। তিনি দ্রুত সেই হাসি মুছে ফেলে বললেন, তোমার ঘরে ঢোল তবলা কিছু থাকলে আমারে দাও, গানের সাথে তাল দেই। তাল বিনা গান গাইতে তোমার অসুবিধা হইতেছে। আচ্ছা থাক, লাগবে না।
অতিথি পিকদান কাছে টেনে নিলেন। হাতের বাড়িতে পিকদান থেকে সুন্দর ধাতব শব্দ হলো।
জুলেখা হাসিমুখে বলল, আপনি তো বিরাট উনসুনি লোক (উনসুনি : সূক্ষ্ম কলাকৌশলে ওস্তাদ ব্যক্তি)। উকিল মুনসির গান পিয়ার করেন?
হুঁ।
জুলেখা দ্বিতীয় গান ধরল—
রজনী প্রভাত হলো ডাকে কোকিলা
কার কুঞ্জে ভুলিয়া ভুলিয়া…
অতিথি বললেন, তুলিয়া ভুলিয়া হবে না। হবে ভুলিয়া রহিলা।
রজনী প্ৰভাত হলো ডাকে কোকিলা
কার কুঞ্জে ভুলিয়া রহিলা।
জুলেখা বলল, আপনার পরিচয় কী?
অতিথি বললেন, আমার নাম উকিল মুনসি।
ঘরে যেন বজ্ৰাঘাত হলো। কিছুক্ষণ নিম্পলক তাকিয়ে থেকে হিন্দুদের প্ৰণামের ভঙ্গিতে জুলেখা উকিল মুনসির পায়ে মাথা রাখল। তার শরীর কেপে কেঁপে উঠছে। চাপা ফোঁপানির শব্দ আসছে।
উকিল মুনসি বললেন, তোমার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি। আমি তোমাকে দোয়া দিলাম।
জুলেখা বলল, কী দোয়া দিলেন?
সব কিছু তোমাকে ছেড়ে গেলেও গান কোনোদিন ছেড়ে যাবে না। পা থেকে মাথা সরাও, আমি এখন উঠব। ঘাটে নাও নিয়া আমি আসছি। নাও-এ। আমার স্ত্রী অপেক্ষা করতেছেন। আমাকে বেশিক্ষণ না দেখলে তিনি অস্থির বোধ করেন।
জুলেখা বলল, আমার মাথা সরাব না। আপনার যদি যেতে হয় পাও দিয়া আমার মাথায় লাথি দিবেন। মাথা সরবে। তারপর আপনি যাবেন।
উকিল মুনসি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। মেয়েটা এখন ঘোরের মধ্যে আছে। তাকে উঠে বসানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন। ঘোরের মধ্যে যে আছে তার ঘোর ভাঙানো কঠিন। ঘোরের বিষয়টা তিনি জানেন।
জুলেখা!
জি।
আরো কয়েকটা গান করো শুনি।
জুলেখা উঠে বসতে বসতে বলল, আমি সারারাত গান করব। অল্প নাচ শিখেছি, যদি বলেন নাচ দেখাব।
নাচের প্রয়োজন নাই। গান করো। ঘাটুগান জানো? ঘাটুগানের সুর অতি মনোহর।
আপনার সামনে আমি আপনার গান করব। অন্য কোনো গান না। জুলেখা গানে টান দিল।
লাবুসের মা নৌকায় অপেক্ষা করছেন। তিনি একা না। নৌকার দু’জন মাঝি ছাড়াও জহির নামের ছেলেটা সঙ্গে আছে। এই ছেলের চেহারা দেবদূতের মতো। অতি রূপবতীদের যেমন বিপদ, অতি রূপবান বালকের তেমন বিপদ। ছেলেটির জন্যে তিনি মমতা বোধ করছেন। লাবুসের মা’র হাতে তসবি। তিনি তসবি টানতে টানতে নিচু গলায় ছেলেটির সঙ্গে গল্প করছেন।
বাংলা পড়তে শিখেছি?
জি।
আলহামদুলিল্লাহ। হাতের লেখা সুন্দর আছে?
