হাতের লেখা সুন্দর।
আলহামদুলিল্লাহ। পিতামাতা জীবিত?
হুঁ।
শুকুর। আলহামদুলিল্লাহ। তোমার উপরে আল্লাহপাকের খাস রহমত আছে।
জহির স্পষ্ট গলায় বলল, রহমত নাই।
লাবুসের মা’র হাতের তসবি থেমে গেল। তিনি চমকে তাকালেন। পুতুলের মতো ছেলেটি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। তিনি বললেন, কেউ যদি বলে আমার উপরে আল্লাহর রহমত নাই, তাহলে সে নাফরমানি করে। এই কাজ আর করব না। বিলো, আল্লাহপাক আমাকে ক্ষমা করো।
বলব না।
লাবুসের মা বড়ই অবাক হলেন। ছেলেকে দেখে মনে হয় নরমসরম কিন্তু কথাবার্তায় কাঠিন্য আছে। বাঁশ নুয়ে পড়ে। এই ছেলে কিঞ্চির মতো সোজা। লাবুসের মা বললেন, তুমি অন্যদিকে তাকায়ে আছ কেন? আমার দিকে তাকাও। আসো আমরা গল্প করি।
জহির ফিরে তাকাল। লাবুসের মা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করলেন, ছেলেটার চোখ ভেজা। তিনি বললেন, আমার নাম লাবুসের মা। আমার যখন দুই বছর বয়স তখন থাইকা আমি লাবুসের মা। অথচ আমার কোনো সন্তানাদি নাই। কোনোদিন হইব তারো ঠিক নাই। তারপরও সবার মুখে লাবুসের মা। মজা না?
জহির হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মাথা নাড়ার ফাঁকে চট করে চোখের পানি মুছে নিল।
তোমাকে এখন যদি আমি লাবুস নাম দেই, কেমন হয়?
জহির ফিক করে হেসে ফেলল। লাবুসের মা বললেন, আইজ থাইকা তোমার নাম লাবুস। ওই পুলা, লাবুস!
জহির হাসি চাপিতে চাপতে বলল, জি।
জি কিরে পুলা? আমি লাবুসের মা। তুই আমারে মা ডাকবি না? বল জি भी।
লইজ্যা লাগে।
মা’র কাছে পুলার কী লইজ্যা? ও লাবুইচ্যা!
কী মা?
তুই যাবি আমার লগে?
যাব।
সত্যি যাবি?
হুঁ যাব।
বল–
উপরে আল্লা নিচে মাটি
যে কসম কাটছি। সেই কসম খাঁটি।
জহির বলল—
উপরে আল্লা নিচে মাটি
যে কসম কাটছি। সেই কসম খাঁটি।
উকিল মুনসি যে রাতে জহিরকে নিয়ে রওনা হলেন, সেই রাতে বান্ধবপুরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। জহিরের বাবা সুলেমান তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিল। এই স্ত্রীর নাম হালিমা। সে মোটাসোটা অল্পবুদ্ধির হাসি-খুশি মেয়ে। তার জীবনের একটাই শাখ- সারাদিন পান চিবানো। পান খাওয়ার মতো অতি তুচ্ছ ঘটনাই তালাকের কারণ। সুলেমান বলেছিল— তুই কি ঘোড়া? সারাদিন জাবর কাটস? পান খাইয়া আমার সংসার ড়ুবাইছস। আমারে পথের ফকির করছিস।
সুলেমানের কথায় অতি বিস্মিত হয়ে হালিমা বলেছিল, পান তো আপনের পয়সায় খাই না। পান। আর গুয়া আমার বাপের বাড়ি থাইক্যা আসে।
এই অপমানসূচক কথায় সুলেমানের মাথায় আগুন ধরে যায়। সে বলে, কী এত বড় কথা! বাপের বাড়ির খোটা? যা, বাপের বাড়িত গিয়া পান খাইতে থাক, তোরে তালাক দিলাম। আইন তালাক, বাইন তালাক, গাইন তালাক। তিন তালাক। তুই তোর বান্দি বেটি নিয়া বিদায় হ।
তিন তালাকের পর আর এই বাড়িতে থাকা যায় না। যে কিছুক্ষণ আগেও স্বামী ছিল, তার মুখ দর্শনও করা যায় না। সে এখন পরপুরুষ। হালিমা কাঁদতে কান্দতে শাড়ির আঁচলে লম্বা ঘোমটা দিয়ে বলল— হোসনার গর্ভ হয়েছে। সে কী করব? (হোসনা, হালিমার দাসী। সে-সময় স্বামী কর্তৃক দাসীদের গর্ভসঞ্চার স্বীকৃত ছিল।)
সুলেমান বলল, সন্তান হোক। সন্তান হইলে সন্তান নিয়া আসব। হোসনা থাকবে তোর সাথে। সে তোর বান্দি। আমার না।
হালিমা কান্দতে কাঁদতে দাসীকে নিয়ে নৌকায় উঠল।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটল ধনু শেখের বাড়িতে। ধনু শেখ তার বাড়িতে লাখের বাতি জ্বালালো। তখনকার নিয়মে নব্যধনীদের সঞ্চিত অর্থ এক লক্ষ অতিক্রম করলে সবাইকে তা জানানোর নিয়ম ছিল। এই জানান দেয়া হতো লাখের বাতি জ্বলিয়ে এবং বাড়িতে ঘাটুগানের আয়োজন করে। যে মানুষটি লাখের বাতি জ্বলিয়েছে, তাকে সমীহ করা দস্তুর ছিল।
ধনু শেখের বাড়ির উঠানে লম্বা বাঁশ টানিয়ে বাঁশের মাথায় হারিকেন ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রচুর লোকজন এসেছে। তাদের জন্যে মিষ্টির ব্যবস্থা হয়েছে। ঘাটুগান শুরু হয়েছে। এই গান সারারাত চলবে। সূর্য উঠার পর গান বন্ধ। তখন শিন্নির ব্যবস্থা। শিন্নি হচ্ছে খাসির মাংস এবং খিচুড়ি। লাখপতির উৎসবের জন্যে চারটা খাসি জবেহ হয়েছে।
ঘাটুগানের অধিকারী তিনটি ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। তিনজনই রূপবান। এরা মেয়েদের ফ্রক পরে মেয়ে সেজেছে। পায়ে নূপুর পরেছে। অধিকারীর ইশারায় গান শুরু হলো। একজন মঞ্চে এসে নারিকেলের মালার বুক চেপে ধরে গান ধরল—
আমার মধু যৌবন কে করিবে পান?
দোহার এবং বাদ্যযন্ত্রীরা বিপুল উৎসাহে বাজনা বাজাতে বাজাতে দোহার ধরিল–
কে করিবে পান গো? কে করিবে পান?
ধনুর একমাত্র স্ত্রী কমলা, চিকের পর্দার আড়াল থেকে ঘটু নাচ দেখছে। তার বুক কাঁপছে। কেন জানি মনে হচ্ছে এই ছেলেটাকে তার স্বামী রেখে দিবে। পালঙ্কে এখন সে আর তার স্বামী শুবে না। তাদের মাঝখানে ঘাটুছেলেটা শুয়ে থাকবে। কী লজ্জা! কী লজ্জা!
ঘাটুছেলেটা যখন নাচছে তখন ঠিক তার বয়সি একজন আসানসোলের এক রুটির দোকানে লেটো নাচের কাহিনী এবং গান লিখছে। আশ্চর্য কাণ্ড! গানে সুরও দিচ্ছে। (ঘাটু এবং লেটো নাচের মধ্যে পার্থক্য তেমন নেই।- লেখক)। তার বয়স এগারো। রুটির দোকানে তার মাসিক বেতন পাঁচ টাকা। কিশোরের নাম কাজী নজরুল ইসলাম। ডাকনাম দুখু মিয়া। কারণ দুঃখে দুঃখেই তার জীবন কাটছে।
বান্ধবপুরের পশ্চিমে মাধাই খাল
বান্ধবপুরের পশ্চিমে মাধাই খালের দু’পাশে পাঁচমিশালি গাছের ঘন জঙ্গল। বাঁশঝাড়, ডেউয়া, বেতঝোপ, ভূতের নিবাস ঝাঁকড়া শ্যাওড়া গাছ। জায়গায় জায়গায় বুনো কাঁঠাল গাছ— যে গাছ কখনো ফল দেয় না। এমনই এক কাঁঠাল গাছের নিচে আজ ভোর রাতে একটা বকনা, গরু জবাই হয়েছে। জবাই করেছেন মাওলানা ইদরিস। ধনু শেখের মানতের গরু। ধনু শেখকে গতবছর কলেরায় ধরেছিল। জীবন যায় যায় অবস্থায় তিনি মানত করেন— যদি এই দফায় প্ৰাণে বাচেন তাহলে গরু শিন্নি দেবেন।
