উকিল মুনসি হাতির পিঠে
লইড়া চইরা বসে।
সেই হাতি কদম ফেলে
লিলুয়া বাতাসে
ঘোমটা পরা লারুসের মা
ঘোমটার ফাঁকে চায়
তাহারে পাগল করছে
উকিলের মায়ায়।।
লাবুসের মা’র সঙ্গে মাওলানা ইদরিসের কথাবার্তা হলো। মাওলানা কখনোই সরাসরি তাকালেন না। যে-কোনো তরুণীর দিকে দৃষ্টি ফেলা অপরাধ। অথচ লাবুসের মা’র মধ্যে কোনো সঙ্কোচ নেই। যেন মাওলানা তার অনেক দিনের চেনা।
লাবুসের মা বললেন, আমার সাথে ধর্মের ভাইন পাতাইবেন। ও মাওলানা, আমার দিকে চায়া কথা বলেন। ভাই ভইনের দিকে তাকাইতে পারে।
আপন ভাই ভইনের দিকে তাকাতে পারে।
আপন ভাবলেই আপনা। আপন ভাইব্যা। আমার সঙ্গে কথা বলেন।
কী কথা বলব?
বয়স হইছে, শাদি করেন না কেন? আপনে মাওলানা মানুষ, শাদি যে ফরজ এইটা জানেন না?
জানি।
কইন্যা দেখব? আমার সন্ধানে ভালো পাত্রী আছে। ওমা, মাওলানা দেখি লইজ্যা পায়। নাক-মুখ হইছে লাল।
উকিল মুনসি এসেছেন। হরিচরণের বাড়িতে। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। মাওলানা ইদরিস আসেন নি।
লাবুসের মা স্বামীর সঙ্গে এলেও হরিচরণের বাড়িতে ঢুকে আলাদা হয়ে পড়েছেন। পুরুষদের গানের আসরে তিনি কখনো থাকেন না। লাবুসের মা হরিচরণের বাড়িঘর ঘুরে ঘুরে দেখছেন। বাগান দেখছেন। দিঘি দেখছেন।
হরিচরণ দামি কার্পেটে উকিল মুনসিকে বসতে দিয়েছেন। রুপার পানদানিতে পান দেয়া হয়েছে। ইকো প্রস্তুত। আম্বরী তামাকের সুগন্ধ বাতাসে। ইকোর নল হাতে অপেক্ষা করছে জহির। সে মাওলানার বাড়ি ছেড়ে হরিচরণের বাড়িতে চলে এসেছে। কোথাও থিতু হতে পারছে না।
উকিল মুনসি বললেন, এই ছেলে কে?
হরিচরণ বললেন, এর নাম জহির। আমার এখানে থাকে।
মুসলমান ছেলে?
জি।
অতি লাবণ্যময় চেহারা। সে কি ঘাটুগানের ছেলে?
হরিচরণ বললেন, না। সে আমার পুত্ৰসম।
উকিল মুনসি বললেন, গোস্তাকি মাপ হয়। আমি খারাপ কিছু ভেবেছিলেম। বড় মানুষদের এইসব দোষ থাকে। আমি কিশোর বয়সে ঘাটুর দলে ছিলাম। গানবাজনা সেখানে শিখেছি। শৌখিনদার মানুষ ঘাটুছেলে কীভাবে ব্যবহার করে আমি জানি। যাই হোক, আপনি কি গান শুনবেন?
বিচ্ছেদের গান শুনতে আমার আগ্রহ, তবে আপনি আপনার পছন্দের গান করেন।
উকিল মুনসি বললেন, আমারও পছন্দ বিচ্ছেদের গান। কী জন্যে জানেন?
হরিচরণ বললেন, জানি না কী জন্যে?
উকিল মুনসি বললেন, আল্লাহ বা ভগবান যে নামেই তাকে ডাকা হোক, তিনি থাকেন বিচ্ছেদে।
সুন্দর কথা!
উকিল মুনসি ঢোলে বাড়ি দিয়ে গান ধরলেন। তিনি এক পায়ে নূপুর পরেছেন। গানের সঙ্গে নূপুর বাজছে। নূপুরের শব্দ করুণ রস তৈরি করে না, কিন্তু এখন করল। হরিচরণের চোখ ছলছল করতে লাগল।
উকিল মুনসি গাইছেন—
সোনা বন্ধুয়া রে।
এত দুঃখু দিলি তুই আমারে
তোর কারণে লোকের নিন্দন, করেছি অঙ্গের বাসন রে।
কুমারিয়ার ঘটিবাটি, কুমার ঘরে পরিপাটি
মাটি দিয়া লেপ দেয়। উপরে।
ভিতরে আগুন দিয়া, কুমার থাকে লুকাইয়া
তেমনি দশা করলি তুই আমারে।
উকিল মুনসি গান শেষ করলেন। হরিচরণ চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আরেকটা গান।
উকিল মুনসি বললেন, নিজের গান না। আমার শিষ্যের লেখা একটা গান করি। তার সমস্ত গানই কাটা বিচ্ছেদ। গান শুনলে কলিজা কাইটা যায়- এই জন্যেই এর নাম কাটা বিচ্ছেদ। শিষ্যের কাছে পরাজিত হওয়ায় আনন্দ আছে। আনন্দের জন্যে গানটা করব।
অবশ্যই করবেন।
আমার শিষ্যের নাম সিরাজ আলি। তার বাড়ি আটপাড়া।
উকিল মুনসি গান ধরলেন—
সোনা বন্ধুরে
অপরাধী হইলেও আমি তোর
আমি তোর পিরিতের মরা
দেখলি না এক নজর।
অপরাধী হইলেও আমি তোর।
অনেক রাতে গানবাজনা শেষ হলো। হরিচরণ বিনীত ভঙ্গিতে হাতজোড় করে বললেন, আপনার কোনো সেবা করতে পারি? এই সৌভাগ্য কি আমার হবে?
সেবা করতে চান?
চাই। অন্তর থেকে চাই।
আমি আপনাদের অঞ্চলে ঘুরতে আসি নাই। বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছি। যে উদ্দেশ্যে এসেছি মাওলানা ইদরিস তার কিছু করতে পারবে না। সে কঠিন মাওলানা।
হরিচরণ বললেন, কী উদ্দেশ্য বলেন। আমি ব্যবস্থা করব।
উকিল মুনসি বললেন, আমি শুনেছি আপনাদের রঙিলা বাড়িতে এক রঙিলা মেয়ে আছে, যার রূপ দেখে বেহেশতের হুররা লজ্জা পায়। তাকে এক নজর দেখব। সে কী লাবুসের মায়ের চেয়ে সুন্দর কি-না তার পরীক্ষা হওয়া দরকার। শুনেছি তার কণ্ঠ কোকিল পক্ষীর কণ্ঠের চেয়েও মধুর। সে না-কি উকিল মুনাসির গান ছাড়া অন্য গান করে না। তার কণ্ঠে আমার একটা গান শুনব।
হরিচরণ বললেন, ব্যবস্থা করে দেব। এই মেয়ের কথা কার কাছে শুনেছেন?
অনেকের কাছেই শুনেছি। মানুষের গুণ বাতাসের আগে যায়।
আর দোষ? দোষ কীভাবে যায়?
দোষ চলে না জনাব। দোষ থাকে নিজের অঞ্চলে। দোষের পা নাই। সে ছুটতে পারে না।
উঠানে হাতি প্ৰস্তৃত। উকিল মুনসি স্ত্রীকে নিয়ে হাতিতে ফিরবেন। ঘোমটা পরা লাবুসের মা হরিচরণের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন, আপনি দরিদ্র এক বাউলকে যে সম্মান করেছেন তার বিনিময়ে আল্লাহপাক আপনাকে আরো সম্মান দেবেন।
হরিচরণ বললেন, মাগো, আমি সম্মানের কাঙালি না। তারপরেও আপনার সুন্দর কথায় খুশি হয়েছি।
আপনি আমাকে মা ডাকলেন। সব মেয়েকেই কি আপনি মা ডাকেন?
হরিচরণ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন। লাবুসের মা বললেন, আমি আপনার দিঘির ঘাটলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে দেখি শিউলি গাছের নিচে অল্পবয়সি বাঁচ্চা একটা মেয়ে হাঁটাহাঁটি করতেছে। গোল মুখ, কোঁকড়ানো চুল। মেয়েটা কে?
