সদরুল বলল, কথা সত্য।
ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, তুমি দশ বস্তা চাউল আইজ লঙ্গরখানায় পাঠায়া দিবা।
সদরুল ভুল শুনল কি-না বুঝতে পারল না। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে সাহসে কুলালো না। ধনু শেখ চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। মনে হয় ঘুমে। সদরুলের কথা শুনে কাঁচাঘুম ভাঙলে বিরাট সমস্যা হবে।
ধনু শেখ শুধু একা যে সাহায্য পাঠালেন তা-না। বিশেষ এক জায়গা থেকে তিন হাজার টাকা চলে এলো। জায়গার নাম রঙিলা নটিবাড়ি। টাকা নিয়ে এসেছেন রঙিলা বাড়ির মালেকাইন নিজে। বোরকায় তার সারা শরীর ঢাকা। শুধু সুরমা পরা চোখ দেখা যায়।
মালেকাইন বললেন, পাপ মানুষের মধ্যে লেখা থাকে। টাকাতে পাপ লেখা থাকে না। আপনি কি আমাদের টাকা নিবেন?
লাবুস বলল, নিব।
শুনেছি। এখানকার খিচুড়ি খুব ভালো হয়। আমার মেয়েগুলার খুব ইচ্ছা, একবার খিচুড়ি খায়।
আমি খিচুড়ি পাঠায়ে দিব।
মালেকাইন বললেন, আপনার অনেক মেহেরবানি। আমার মেয়েগুলি বলে দিয়েছে, তাদের সবার হয়ে যেন আমি আপনাকে প্ৰণাম করি।
লাবুস কিছু বলার আগেই মালেকাইন মাথা মাটিতে ঠেকিয়ে প্ৰণাম করলেন।
লঙ্গরখানায় শ্ৰীনাথ খুব ঝামেলা করার চেষ্টা করছে। তার বক্তব্য, হিন্দু হয়ে যবনের খাদ্য খাওয়া মহাপাতক হওয়ার ব্যবস্থা। জাত শেষ।
নরেশ বলল, আমরা নমশুদ্ৰ, আমরার আবার জাত কী?
শ্ৰীনাথ বলল, ইহকালের জাত না, পরকালের জাত।
পরকালেও জাত আছে জানতাম না তো।
এখন জানলা। রৌরব নরকে পুড়তে হবে খিয়াল রাখ।
নরেশ বলল, রৌরব নরকে আমরা একলা যাব না। আপনিও যাবেন। লাবুস সাহেবের বাড়িতে আপনি ম্যালা দিন ছিলেন। মুসলমানের খানা খেয়েছেন।
না জেনে কথা বলব না। আমি স্বপাক খেয়েছি। নিজের রান্না নিজে রেঁধেছি।
এইখানেও তো একই ব্যবস্থা। নিজেদের রান্না আমরা নিজেরা রান্দি। ওই দেখেন। দেখছেন? এখন বিদায় হন। আরেকবার যদি লঙ্গিরখানায় আপনেরে দেখি তাইলে ঘটনা আছে।
কী ঘটনা? কী করবা তুমি?
নরেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, পাছা দিয়ে লঙ্গরখানার খিচুড়ি ঢুকায়া দিব।
শ্ৰীনাথ ঝাঁপিয়ে পড়ল। নরেশের ওপর। কিল ঘুসি চড় থাপ্পড় চলতে থাকল। নরেশ চুপ করেই রইল। ব্ৰাহ্মণের গায়ে হাত তোলা যায় না। নিচু জাতের কেউ ব্রাহ্মণের শরীরে হাত তোলা আর ভগবানের গায়ে হাত তোলা একই ব্যাপার। শ্ৰীনাথকে অনেক কষ্টে থামালেন মনিশংকর।
মনিশংকর ছেলেকে নিয়ে লঙ্গরখানা দেখতে এসেছিলেন। শিবশংকরকে নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত। তার শরীর পুরোপুরি গেছে। মাথায়ও মনে হয় কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। প্রায় দেখা যায় সে বাড়ির সামনে খুঁটি পুঁতে ঝিম ধরে বসে থাকে।
আজ তিনি ছেলেকে বুঝিয়ে সুজিয়ে এনেছেন।
মনিশংকর লঙ্গরখানার কর্মকাণ্ড মুগ্ধ হয়ে দেখলেন। শিবশংকর হঠাৎ শরীরের ক্লান্তি এবং অসুস্থতা ঝেড়ে ফেলল। তাকে দেখা গেল একটা কাগজ এবং পেনসিল নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘুরছে। মোট কতজন খাবে, তাদের মধ্যে কতজন শিশু, কতজন মহিলা, সব গুছিয়ে লিখছে। এই কাজটা সে কেন করছে বোঝা যাচ্ছে না। তবে কাজটা করে সে যে আনন্দ পাচ্ছে এটা বোঝা যাচ্ছে। মনিশংকর লাবুসকে ডেকে আড়ালে নিয়ে গেলেন। তিনি তাকে গোপন কিছু কথা বলবেন।
মনিশংকর বললেন, আমি গত রাতে শেষপ্রহরে একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নটা নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করব।
লাবুস তাকিয়ে আছে। স্বপ্ন নিয়ে তার সঙ্গে কী আলাপ তা সে বুঝতে পারছে না।
শিবশংকর বললেন, আমি স্বপ্ন দেখেছি হরিচরণ বাবুকে। তিনি যেন ঘরে এসেছেন। আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমাকে জাগালেন। বিছানায় বসলেন। শিব শংকরের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, ছেলের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তিনি বললেন, তাকে কাজে ব্যস্ত রাখি, শরীর ঠিক হয়ে যাবে।
আমি বললাম, কী কাজে ব্যস্ত রাখব?
উনি বললেন, লঙ্গরখানার কাজ।
তখন ঘুমটা ভেঙে গেল। আমি শিবশংকরকে নিয়ে এসেছি। তুমি তাকে কাজে লাগাও। সে খুব গোছানো ছেলে। যে কাজটা তাকে করতে দিবে। সে গুছিয়ে করবে।
লাবুস হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মনিশংকর বললেন, তুমি যে কর্মকাণ্ড শুরু করেছ, তাতে জলের মতো টাকা যাওয়ার কথা। যাচ্ছে না?
যাচ্ছে।
শিবশংকরের মা তার পিতৃধন হিসেবে কিছু টাকা পেয়েছিল। এই টাকাটা কলিকাতায় শিবশংকরের নামে জমা আছে। আমি টাকাটা আনিয়ে তোমাকে দিব। আমার অর্থ গ্রহণ করতে তোমার আপত্তি নাই তো?
জি-না। আপনি দুর্গা পূজা উপলক্ষে আমার মা’কে একটা লাল শাড়ি দিয়েছিলেন। মা কী যে খুশি হয়েছিলেন! উনি শাড়িটা আমার গায়ে জড়ায়ে দিয়ে বলেছিলেন, কী সুন্দর শাড়ি, তুই একটু পরে দেখ।
তোমার মায়ের কোনো সন্ধান তোমার কাছে আছে?
না।
মনিশংকর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, বাবা, একটা কথা মনে রাখবে। মায়ের গায়ে কোনো দোষ লাগে না। ছেলে কখনো মায়ের ক্রটি দেখবে না। অন্যরা দেখলে দেখবে, সন্তান কখনো না। মনে থাকবে?
থাকবে।
খাবার দেয়া শুরু হয়েছে। একটা খিচুড়ির গামলা শিবশংকরের হাতে। সে মহাউৎসাহে খিচুড়ি দিয়ে যাচ্ছে।
লাবুস খেতে বসেছে। তার একপাশে মীরা, অন্যপাশে নরেশের মেয়ে লক্ষ্মী।
লক্ষ্মীর পাশে বসেছে ইমাম করিম। করিম বলল, এই মেয়ে, গতকাল দেখলাম বিসমিল্লাহ না বলে ভাত মুখে দিলা। আজকেও যদি ভুল হয় তাহলে কী যে করব তার নাই ঠিক।
লক্ষ্মী বলল, আমি তো হিন্দু।
হিন্দু হও আর যাই হও বিসমিল্লাহ বলবা।
