যদি না বলি আপনে কী করবেন?
করিম গম্ভীর গলায় বলল, আমি না খায় উঠে যাব।
সত্যিই?
অবশ্যই। আমি এককথার মানুষ।
লক্ষ্মী বলল, বিসমিল্লাহ।
আঠারোজিনের একটা নতুন দল এসেছে নিশাপুর থেকে। শিবশংকর তাদের কাছে গেল। গম্ভীর গলায় বলল, পরিশ্রম করে এসেছেন, এক্ষুণি খেতে বসবেন না। হাত মুখ ধুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবেন। আগন্তুক দলের অতি বৃদ্ধ একজন বলল, বাবা, খাওয়া থাকব তো?
অবশ্যই থাকবে।
শুনেছি পাঁচক মুসলমান। মুসলমানের রান্না তো বাবা খাব না। আমি ব্ৰাহ্মণ।
ব্ৰাহ্মণ পাঁচকের রান্নাও আছে। আপনার অসুবিধা হবে না।
যিনি খাওন দিচ্ছেন তাঁর জাত কী?
তাঁর মতো বড় ব্ৰাহ্মণ খুব কমই আছে।
বৃদ্ধের সঙ্গীদের মধ্যে একজন বলল, ঠাকুরে কিন্তু ভেজাল থাকে।
বৃদ্ধ বললেন, তা থাকে। তবে ‘বিপদে নিয়ম নাস্তি’।
সবাই এই কথায় একমত হলো।
বৃদ্ধ বলল, তাইলে আর অসুবিধা কিছু দেখি না।
প্রায় দুইশ’ মানুষ একসঙ্গে খাচ্ছে। লাবুস কিছুক্ষণের জন্যে খাওয়া বন্ধ করে চারদিক দেখল। একই সময়ে গভীর আনন্দ এবং গভীর বেদনায় তার হৃদয় পূর্ণ হলো। শুধু মানুষের পক্ষেই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি আবেগ ধারণ করা সম্ভব।
সনটা বলি। ১৯৪৩, জুন মাস। ভারতবর্ষ মানুষের তৈরি করা দুর্ভিক্ষে কাতর। গান্ধিজি আগা খান প্রাসাদে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে বন্দি। বাপুজিকে ছাড়াই চলছে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। ইংরেজকে ভারত ছাড়তেই হবে। ইংরেজ সরকার নির্বিকারে কংগ্রেস কমী গ্রেফতার করে জেলে ঢোকাচ্ছে।
কোলকাতার পথে পথে থালা হাতে নিরন্ন মানুষ। তাদের কাছে ভারত ছাড় আন্দোলন, স্বরাজ, স্বাধীনতা, সব অর্থহীন। তারা ভাত চায়, আর কিছু না। ভাত ভিক্ষা চাইতেও এখন তাদের সংকোচ। তারা ক্ষীণ গলায় বলে, একটু ফ্যান দিবেন। মা-জননী?
এক মা তার কংকালসার শিশুকন্যা নিয়ে ডাস্টবিন ঘাঁটছেন। খাদ্য অনুসন্ধান। একটা নাদুসনুদুস কুকুর আগ্রহ নিয়ে এই দৃশ্য দেখছে। তাদের খাবারে ভাগ বসাতে আসা মানুষ দেখে সে অভ্যস্ত না। ডাস্টবিনে একটা কাক বসে আছে। সেও বিস্মিত হয়ে দৃশ্যটি দেখছে।
কোলকাতার পথেঘাটের অতি সাধারণ একটি দৃশ্য। এই সাধারণ দৃশ্যই এক তরুণ যুবক হাঁটু গেঢ়ে বসে আঁকছে। তরুণের ভরসা হাতে তৈরি কাগজ, পেন্সিল এবং কাঠকয়লা। তার কাধের ঝুলিতে চায়নিজ ইংকের কৌটা এবং তুলিও আছে। যুবকের হাতের টান স্পষ্ট এবং ঋজু। সে মুহুর্তের মধ্যেই দৃশ্যটা কাগজে নিয়ে এলো। যুবকের পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ বললেন, বাহ্!
যুবক বলল, ছবি আপনার পছন্দ হয়েছে?
বৃদ্ধ বলল, জি জনাব মাশাল্লাহ্।
বৃদ্ধকে আমরা চিনি। তিনি কোরানে হাফেজ মাওলানা ইদরিস। তার শরীর এখন কিছুটা সেরেছে। মাঝে মধ্যে তিনি কোলকাতা শহর দেখতে বের হন। বেশিদূর যান না, যমুনার বাড়ির আশেপাশেই থাকেন। এই শহর তাঁর পরিচিত না।
ইদরিস যুবকের দিকে তাকিয়ে বললেন, জনাব, আপনার নাম?
তরুণ বলল, আমার নাম জয়নুল আবেদিন।
মুসলমান?
জি।
ইদরিস দুঃখিত গলায় বললেন, তাহলে তো জনাব বিরাট পাপ হয়েছে। যাদের জীবন আছে তাদের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ।
জয়নুল আবেদিন কপালের ঘাম মুছলেন। আজ তীব্ৰ গরম পড়েছে। ইদরিস বললেন, মহিলা এঁকেছেন তার জন্যে পাপ হবে। তার কোলের শিশুটার জন্যে পাপ হবে। কুকুর এবং কাক আঁকার জন্যে পাপ হবে। এদের জীবন আছে।
জয়নুল আবেদিন বললেন, সবচে’ কম পাপ মনে হয় কাকটা আঁকার জন্য হবে। সবচে’ ছোট প্ৰাণ।
আল্লাহপাকের কাছে প্ৰাণের কোনো ছোট বড় নাই। তার কাছে সব প্ৰাণ মূল্যবান।
আপনি মাওলানা?
জি জনাব। আমি কোরানে হাফেজ। আমার নাম ইদরিস। একটা কাজে বগুড়া যাওয়া ধরেছিলাম। জমিদার শশাংক পালের কাজ। আল্লাহপাক আমাকে কলিকাতা নিয়ে এসেছেন। উনার ইচ্ছাই আমাদের ইচ্ছা।
জয়নুল বললেন, আপনি হাফেজ মানুষ। মনে হচ্ছে বিরাট মাওলানা। আপনার দাড়ি নাই কেন?
মাওলানা ইদরিস লজ্জায় পড়ে গেলেন। লজ্জা এবং দুঃখ মেশানো গলায় বললেন, দাড়ি ছিল। শিয়ালদা ইষ্টিশনে অসুখ হলো, তখন চুল দাড়ি সব পড়ে গেল। মনে হয় আমার কোনো পাপের শাস্তি।
আপনি পাপের শাস্তি ভয় পান। সারা দুপুর আমার ছবি আঁকা দেখেছেন, আপনার পাপ হয় নাই?
এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানা নাই। প্রাণীর ছবি অংকন করা পাপ। অংকন দেখা পাপ কি-না জানি না।
আগ্রহ করে ছবি আঁকা দেখলেন, এর কারণ কী?
চক্ষের নিমিষে এমন সুন্দর ছবি আঁকলেন। মন ভরে গেছে। মাশাল্লাহ।
এই ছবির কোনটা আপনার ভালো লেগেছে?
কাকটা।
জয়নুল বিস্মিত হয়ে বললেন, কাক! কেন?
ইদরিস বললেন, কাকটা দেখে মন হয় এক্ষণ উড়াল দিবে।
বাহ, ভালো বলেছেন তো!
ইদরিস ইতস্তত করে বললেন, জনাব, আরেকটা কাক কি আঁকবেন?
অবশ্যই। এই ছবিতেই আরেকটা কাক দিয়ে দেই। একটা উড়াল দেয়ার জন্যে তৈরি, আরেকটা তাকিয়ে আছে ডাস্টবিনের দিকে।
দেখতে দেখতে আরেকটা কাক তৈরি হলো। মাওলানা ইদরিস বললেন, সুবাহানাল্লাহ। জনাব, কাক কীভাবে আঁকেন?
আপনি কি কাক আঁকা শিখতে চান?
জি জনাব।
জয়নুল বিস্মিত হয়ে বললেন, কেন?
আমার একটা মেয়ে আছে, নাম মীরা। তারে কাক ঐকে দেখাব। সে খুশি হবে। পুলাপানরা এইসব জিনিস দেখলে খুশি হয়।
সত্যি সত্যি কাক আঁকা শিখতে চান?
জি জনাব। যদি আপনার তোকলিফ না হয়।
জয়নুল ছবির খাতা বের করলেন। কাঠকয়লা বের করলেন। তিনি ছাত্রকে বসলেন তার পাশে।
