নরেশ বলল, না কর্তা।
খাবার তো আছে। খাবে না কেন?
লক্ষ্মীর মা পনেরোদিন ধইরা ভাত খায় না। তারে থুইয়া আমি খাব না।
লাবুস কিছু বলল না। লক্ষ্মী ডানহাতে ভাত খাচ্ছে, বামহাতে ডিমটা ধরে আছে। যেন কেউ হঠাৎ এসে ডিমটা নিয়ে যাবে। ডিম রক্ষা করা দরকার। নরেশ মেয়ের পিঠে হাত রেখে বলল, আস্তে আস্তে খাও গো মা।
সব আমি একলা খামু বাপজান?
পারলে খাইবা। পারবো?
হুঁ।
লাবুস বলল, নমশুদ্ৰপাড়ার সবারই কি তোমার মতো অবস্থা?
জে কর্তা। ভাতের কষ্ট বিরাট কষ্ট।
লক্ষ্মী খাওয়া শেষ করেছে। সে সামান্যই খেতে পেরেছে। ডিমটা খায় নি। এখনো হাতে ধরা। সে জেদ ধরেছে। গামলার সব ভাত বাড়িতে নিয়ে যাবে। নরেশ কঠিন গলায় বলেছে, না।
বিদায় নেবার সময় নরেশ হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। লক্ষ্মী তার বাবার কাঁদার কারণ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে তার ছোট ছোট হাতে বাবাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছে।
সন্ধ্যাবেলা লাবুস হাদিসকে ডেকে পাঠাল। হাদিস যথারীতি জ্বলন্ত কক্ষেতে ফুঁ দিতে দিতে হুক্কা এনে লাবুসের সামনে রাখল। সে নিশ্চিত কোনো এক বিশেষ দিনে ছোটকৰ্তা হুক্কায় টান দেবেন। কিছুই বলা যায় না। সেই বিশেষ দিনটা আজই হতে পারে।
হাদিস উদ্দিন! আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি ব্যবস্থা কর।
অবশ্যই ব্যবস্থা করব। সিদ্ধান্তটা কী?
বড়গাঙের পাড়ে আমি একটা লঙ্গরখানা দিব।
কী দিবেন?
লঙ্গরখানা। সেখানে যারা খেতে পায় না। তারা একবেলা ভরপেট খাবে।
ছোটকর্তা, পাগলের মতো এইসব কী বলতেছেন! কাঙালের গোষ্ঠী খাওয়ায়া আপনার লাভ কী?
হাদিস উদ্দিন, আমি তো ব্যবসায়ী না যে লাভ লোকসান দেখব।
মাগনার হোটেল চালু করবেন, দুনিয়ার কাঙালি ভিড় করব। কী জন্যে কাজটা করবেন?
লাবুস হাদিস উদ্দিনকে অবাক করে দিয়ে হুক্কার নল টেনে নিল। গুড়ুক গুড়ুক শব্দ হচ্ছে। আধুরী তামাকের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। লাবুস বলল, আমি যে হুক্কা খাচ্ছি। তুমি দেখে আনন্দ পাচ্ছ না?
হাদিস উদ্দিন মুগ্ধ গলায় বলল, ছোটকৰ্তা, খুবই আনন্দ পাইতেছি। এই দেখেন আমার চউক্ষে পানি।
লাবুস বলল, ক্ষুধার্ত মানুষরা যখন আরাম করে খিচুড়ি খাবে, সেই দৃশ্য দেখে আমিও আনন্দ পাব। আনন্দে আমার চোখে পানি আসবে। এরচে’ বড় কিছু আছে?
জে না। তামাক খায়া মজা পাইতেছেন?
পাচ্ছি।
আপনার জন্যে নেত্রকোনা থাইকা আরো ভালো তামাক আনায়ে দিব।
আচ্ছা।
একটা টান দিবেন। বান্ধবপুর জুইড়া বাস ছাড়ব।
ভালো তো।
লাবুস হুক্কা টানছে। গুড়ুক গুড়ুক শব্দ হচ্ছে। হাদিস উদ্দিনের এই দৃশ্যটা দেখে এত ভালো লাগছে। যেন তার দীর্ঘদিনের সাধনা সফল হয়েছে। তার চোখে আবারো পানি এসে গেছে।
ধনু শেখ দুপুরের খাওয়া শেষ করেছেন। এখন একটা চমচম খেয়ে দুপুরের খাবারের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। পানদানিতে পান নিয়ে অপেক্ষা করছে। সদরুল। পান মুখে দিয়ে তিনি বাংলাঘরে পাটি পেতে শুয়ে থাকবেন। সদরুল নরম হাতে পিঠে ইলিবিলি করে তাকে ঘুম পাড়াবে। এই সময় পাংখাবরদার সারাক্ষণ টানা পাখায় তাকে বাতাস দিবে। এক মুহুর্তের জন্যেও থামতে পারবে না। থামা মানেই চাকরি শেষ। এর আগে দুইজনের এইভাবে চাকরি গেছে।
আতরের জন্যে ধনু শেখের মন মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। এই মন খারাপকে তিনি পাত্তা দেন না। মন ভালো করার নানান বুদ্ধি তার কাছে আছে। তাছাড়া তাঁর মেয়ে ভালো আছে এবং সুখে আছে, এই খবর তিনি পেয়েছেন। মেয়েকে তিনি একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। মেয়ে তার উত্তরে এক লাইন লিখেছে— ‘আমি ভালো আছি।’ এই যথেষ্ট। মেয়ে নিয়ে এত চিন্তার কিছু নাই। পৃথিবীতে চিন্তার অনেক বিষয় আছে।
গল্পগুজব করার জন্যে একজন কেউ থাকলে ভালো হতো। শরিফাকে তিনি ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাকে কি আজ আবার আনাবেন? শরিফার জবুথরু ভাব কেটে গেছে। রঙিলা বাড়ির শিক্ষা। সে এখন কথার পিঠে কথা বলা শিখেছে। গুনগুন করে গানও গায়। ধনু শেখ মোটামুটি বিস্মিত হয়ে বললেন, গান কবে শিখলা?
শরিফা বলল, দিন তারিখের প্রয়োজন আছে? গান শুনতে চাইলে বলেন, শুনায়া দিব।
গান ছাড়া আর কিছু শিখেছ?
ভাব ভালোবাসা দিয়া অচেনা পুরুষের মন ভুলাইতে শিখেছি।
দেখি কেমন শিখেছি? আমারে দেখাও। আমার মন ভুলাও।
আপনেরে ভুলাইতে পারব না। আপনের মন নাই। আপনের আছে শরীর। তাও পুরাটা নাই! এক ঠ্যাং বাদ।
কটকটি ধরনের কথা। শুনতে খারাপ লাগে না। ধনু শেখ মাথা থেকে শরিফার বিষয় দূর করার চেষ্টা করতে লাগলেন। সারাক্ষণ এক ‘নটিবেটি’র কথা ভাবলে দিন চলবে না।
পানের পিক ফেলতে ফেলতে ধনু শেখ বললেন, শুনলাম লাবুস বড়গাঙের পারে লিঙ্গরখানা দিয়েছে?
সদরুল বলল, ঠিকই শুনছেন। বিরাট মচ্ছবি বসছে। দুপুর থাইকা খিচুড়ি রান্ধা হয়। চাইরটার সময় খানা দেওয়া হয়। দুই লাইনে খাওয়া। পুরুষ একদিকে, মেয়েছেলে আর পুলাপান আরেকদিকে।
খাওয়ায় কী?
চাইলে ডাইলে খিচুড়ি। সঙ্গে সবজি থাকে। লাবুস সাব নিজেও সবের সাথে বইসা খান।
বলো কী?
উনি আগে থাইকাই শুনেছি, একবেলা খান।
লঙ্গরখানায় লোক কেমন হয়?
দুনিয়ার মানুষ। আশেপাশে থাইকাও খবর পাইয়া আসতেছে। মিনি 39না श्i९33।
হিন্দু-মুসলমান আলাদা?
না, একত্রেই খায়।
লাবুস এই লঙ্গরখানা কতদিন চালাইব?
অতি অল্পদিন। মানুষ যেভাবে আসতেছে রাজার রাজত্বও ফুরায়া যাবে।
ঘুম জড়ানো গলায় ধনু শেখ বললেন, এরে বলে পরের ধনে পোদারি। একটা পয়সা লাবুসের নিজের রোজগার না। হরিচরণের পয়সা। উড়াইতাছে লাবুস।
