নরেশের স্ত্রী বলেছে, বুধবারে ভাত কই পাইবেন?
নরেশ বলেছে, সেটা আমার বিষয়।
আজ বুধবার। নরেশ মেয়েকে বলেছে, চল দেখি।
লক্ষ্মী বাবার হাত ধরে যাচ্ছে। তার চোখমুখ উজ্জ্বল। কতদিন সে ভাত খায় না। আজ ভাত খাবে ভাবতেই শরীর ঝিমঝিম করছে। মুখ লালায় ভর্তি হয়ে আসছে। লক্ষ্মী বলল, ভাত কী দিয়া খামু বাপজান? শিং, মাছ দিয়া?
নরেশ বলল, ভাত এমন জিনিস যে ভাতের উপরে লবণ ছিটা দিয়া খাইলেও অমৃত। একটা কাঁচামরিচ। যদি থাকে তাইলে তো কথাই নাই। এক নলা ভাত মুখে দিয়া কাঁচামরিচে কামুড়।
লক্ষ্মী বলল, দেশের ভাত কই গেছে বাপজান?
নরেশ বলল, যুদ্ধের কারণে দেশে ভাত নাই। যুদ্ধ শেষ হইলেই ভাত পাইবি। তখন কত ভাত খাইবি খা।
তখন আমি পুরা এক পাতিল ভাত খামু।
আচ্ছা যা খাবি।
যুদ্ধ শেষ হইব কবে? সময় ঘনায়া আসছে।
বাপজান, আমারে ঘাড়ে তোল।
নরেশ মেয়েকে ঘাড়ে উঠিয়ে নিল।
লক্ষ্মীর মুখে হাসি। বাবার কাঁধে চড়তে তার এত ভালো লাগে। ইস্ সে যদি সারাজীবন বাবার ঘাড়ে বসে থাকতে পারত!
নরেশ মেয়েকে এককড়ির দোকানঘরের সামনে ঘাড় থেকে নামাল। এককড়ির এই দোকানঘরটা নতুন। আগের দু’টা ঘর আগুনে পুড়ে যাবার পর এই ঘর বানানো হয়েছে। এককড়ি ক্যাশবাক্সের সামনে বসে ছিলেন। নরেশ দোকানে ঢুকাল না। ঢোকার নিয়ম নেই। যেহেতু কৈবৰ্তরা জল চল জাত না। তারা ঘরে ঢোকা মানে ঘরে রাখা সমস্ত পানি নষ্ট হওয়া।
কর্তা, একটা কথা ছিল।
এককড়ি বিরক্ত মুখে তাকালেন।
নরেশ হাতজোড় করে বলল, এক ছটাক চাউল দেন। মেয়েটা ভাত খাইতে চায়।
এককড়ি বললেন, দেশে কি চাউল আছে যে তোরে দিব? আমি নিজে একবেলা রুটি খাই। গলা দিয়া রুটি নামে না। তারপরেও খাই।
মেয়েটারে বলেছিলাম বুধবার ভাত খাইতে দিব। একটা সপ্তাহ মেয়েটা অপেক্ষা করেছে। কর্তা, আমার বড়ই আদরের সন্তান।
এককড়ি বললেন, পুলাপান অবুঝ হইলে তারারে বুঝ দিতে হয়। তারে বুঝায় বল যে দেশে চাউল নাই। আদর দিয়া নষ্ট করিস না। আদরে হয় বাঁদর।
নরেশ বলল, কর্তা, একটু ব্যবস্থা করেন।
আইজ তরে এক ছটাক চাউল দিলাম, কাইল আসব পঞ্চাশজন। তখন উপায়? আমি কি কুবীর? আমার কুবীরের ভাণ্ডার নাই। দোকানপাট গেছে আগুনে পুইড়া। মন্দির বানায়েছি। ট্যাকা গেছে জলের মতো।
নরেশ হাত কচলাতে কচলাতে বলল, দোকানের কাউরে গিন্নিমার কাছে পাঠান। উনারে বললেই ভাত আসব। মেয়েটা দোকানের সামনে বইসা খাইব। নুনের ছিটা দিয়া চারটা ভাত।
এককড়ি জবাব দিলেন না। কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। খেরো খাতার হিসাব দেখতে লাগলেন। এককড়ি নিশ্চিত নরেশ ঘণ্টাখানিক অপেক্ষা করে চলে যাবে। এদের পেছনে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না।
লক্ষ্মী ফিসফিস করে বলল, ভাত কি দিব বাপজান?
নরেশ জোরগলায় বলল, অবশ্যই দিব! কর্তার ম্যালা কাজ আমি করছি। সাহায্য কোনোদিন চাই নাই। আইজ প্রথম চাইলাম। চল ছায়াতে বসি, আইজ রইদও পড়ছে কড়া।,
পিতা-কন্যা কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসা। এখান থেকে এককড়ির নতুন মন্দির দেখা যায়। মন্দিরের চূড়া উঁচু হয়ে উঠে গেছে। চূড়ায় পিতলের ত্রিশূল। রোদে ঝকমক করছে। নরেশ মন্দিরের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করল। বাবার দেখাদেখি লক্ষ্মীও করল। সব দেবদেবীকে তুষ্ট রাখা দরকার। দেবদেবীদের যে-কোনো একজন বিরূপ হলে মহাবিপদ।
ভাত মনে হয় আসবে। নরেশ দেখল এককড়ি তার দোকানের এক কর্মচারীকে নিচুগলায় কী যেন বললেন। সে দোকান থেকে বের হয়ে এককড়ির বাড়ির দিকে যাচ্ছে। নরেশ হৃষ্টচিত্তে বিড়ি ধরাল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাত আসন্তাছে। ভাতের জন্যে লোক গেছে।
লক্ষ্মী বলল, কলাপাত কাঁইট্যা আনবা না?
নরেশ বলল, আগে ভাতটা আসুক। কলাপাতা কাটুতে কতক্ষণ?
যে কৰ্মচারী দোকান থেকে বের হয়েছিল সে ফিরল দেড় ঘণ্টা পর। তার হাতে ভাতের গামলা নেই। হিসাবের কিছু খাতপত্র।
নরেশ মেয়েকে নিয়ে উঠে পড়ল। তার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। ভয়ঙ্কর কিছু করতে ইচ্ছা করছে। ভয়ঙ্করটা কী বুঝতে পারছে না। সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, চল বাড়িত যাই। ভাতের চিন্তা বাদ।
লক্ষ্মী সঙ্গে সঙ্গে বলল, আচ্ছা।
জগতে কাকতালীয় কিছু ব্যাপার সবসময় ঘটে। বিশ্বাসীরা এইসব ঘটনায় অলৌকিকত্ব আরোপ করতে পছন্দ করেন। একটা কাকতালীয় ঘটনা নরেশের জীবনে ঘটল। তার সঙ্গে দেখা হলো লাবুসের। লাবুস ছাতা মাথায় দিয়ে হন।হন করে আসছিল।
নরেশকে দেখে ছাতা বন্ধ করে বলল, মেয়েটাকে নিয়ে চল আমার ঘরে। ভাত খাবে।
নরেশ ভাবল সে ভুল শুনছে। ভাতের চিন্তায় অস্থির হয়েছে বলেই ভাতের কথা শুনছে। নরেশ বলল, কর্তা কী কইলেন?
লাবুস বলল, ভাত খেতে বলেছি। মুসলমানের ঘরে খেতে সমস্যা আছে?
নরেশ কিছু বলার আগেই লক্ষ্মী বলল, সমস্যা নাই।
লাবুস বলল, মা, বাপের ঘাড় থেকে নামো। আমার হাত ধর। গল্প করতে করতে যাই।
ঘটনা যতটা কাকতালীয় মনে হচ্ছে ততটা না। এর মধ্যে কোনো অলৌকিকত্ব নেই। এককড়ির দোকানের সামনে এক নমশুদ্ৰ ভাত খাবে বলে বসে আছে, এই খবর লাবুসকে দিয়েছে হাদিস উদ্দিন। সে বাজারে এসেছিল মশুর ডাল কিনতে। তখনি ঘটনা দেখেছে।
লাবুস বলল, ভাত কি দিয়েছে?
হাদিস উদ্দিন বলল, জানি না। বাপ বেটিতে খুঁটি গাইড়া য্যামনে বসছে ভাত না দিয়া উপায় আছে? লাবুস সঙ্গে সঙ্গেই ছাতা নিয়ে বের হয়েছে।
পিতা এবং কন্যা দু’জনকেই খাবার দেয়া হয়েছে। অ্যালমুনিয়ামের গামলাভর্তি ভাত। ভাতের উপর গাওয়া ঘি। একপাশে ডিমের সালুন। আলাদা বাটিতে ডাল। ঘিয়ের গন্ধে জায়গাটা মা মা করছে। নরেশ খাচ্ছে না। হাত গুটিয়ে বসে। আছে। লাবুস বলল, নরেশ, তুমি খাবে না?
