শাহনেয়াজ বলল, তোমাকে বলেছি।
হামিদার দিকে তাকায়া বলেছেন তো, এই জন্যে ভাবলাম তাকে বলেছেন।
তোমাকেই বলেছি। এখন তুমি বলো দেখি দুপুর’-এর প্রতিশব্দ কী?
জানি না।
হুট করে জানি না বলব না। চিন্তা-ভাবনা করবা। চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন আছে। আচ্ছা দেখি আমি কয়টা বলতে পারি।
শাহনেয়াজ চোখে থেকে চশমা খুলল। চোখ বন্ধ করে গড়গড় করে প্রতিশব্দ বলতে থাকল।
দুপুর
মধ্যাহ্ন
দ্বিপ্রহর
মাঝবেলা
দিবামধ্য
মধ্যদিন
যোহর
আতরের হাসি আসছে। সে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে। শাহনেয়াজ বলল, এখন আসো রাতের প্রতিশব্দ কী জানো বলতে থাক। আতর অনেক ভেবেচিন্তে বলল, নিশা।
শাহনেয়াজ বলল, হয়েছে। আরো বলো।
আর পারব না। আপনি বলেন।
শাহনেয়াজ গড়গড় করে প্রতিশব্দ বলে যাচ্ছে
রাত
রাতি
নিশীথ
রজনী
যামিনী
বিভাবরী
তামসী
ক্ষণদা
নক্ত
অসুরা
যামবতী
আতর খিলখিল করে হেসে ফেলল। শাহনেয়াজ বন্ধ চোখ খুলে বিরক্ত হয়ে বলল, হাসো কেন?
আতর বলল, আপনার যা মনে আসতেছে আপনে বলতেছেন।
কী বললা তুমি? আমি ডিকশনারি মুখস্থ করা লোক। ডিকশনারি মুখস্থ করতে গিয়ে প্রথমবার এম এ সেকেন্ড পার্ট পরীক্ষায় ফেল করেছি।
ও আচ্ছা।
তোমাদের বাড়িতে কি ডিকশনারি আছে?
ডিকশনারি থাকলে তোমার কাছে পরীক্ষা দিতাম।
আতর বলল, পরীক্ষা দিতে হবে না। রাত অনেক হয়েছে, ঘুমাবেন না?
শাহনেয়াজ বলল, রাতে আমি ঘুমাই না। যারা কবি-সাহিত্যিক তাদের জন্যে রাতের ঘুম হারাম। কবি-সাহিত্যিকরা রাতে চিন্তা-ভাবনা করেন। দিনে ভাব আসে না। ভাব আসে রাতে।
আপনি ঘুমান কখন?
দিনে। বলতে গেলে সারাদিনই ঘুমাই। আতর, একটা কলম এনে দাও তো। দেখি কিছু লেখা যায় কি-না। তোমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে রাখি। কবিতার নামটা মাথায় চলে আসছে— ‘মানস প্রিয়া’। মানস প্রিয়া অর্থ কী বুঝেছ? যে প্রিয়া মনে বাস করে।
আমি তো মনে বাস করি না। আমি বান্ধবপুরে বাস করি।
শাহনেয়াজ বিরক্ত হয়ে বলল, বান্ধবপুর কবির মনের বাইরের কোনো জায়গা না। এখন তুমি বলে মনের কী কী প্রতিশব্দ জানো।
আমি কেনোটাই জানি না। আপনি বলেন।
শাহনেয়াজ আগ্রহ নিয়ে প্রতিশব্দ বলছে। প্ৰতিশব্দ বলার সময় সে চোখ বন্ধ করে থাকে। কাজেই হামিদা ঘোমটা তুলে আতরের দিকে তাকিয়ে হাসল।
মন
চিত্ত
অন্তর
মানস
হৃদি
মর্ম
হিয়া
আঁত
দিল
পরান
অন্তকরণ
চিত্তাপট
মনোমন্দির
শাহনেয়াজ চোখ মেলে বলল, আরো তিন চারটা আছে, এখন মনে পড়ছে না। এসব হচ্ছে চর্চার ব্যাপার। অভ্যাসের ব্যাপার। অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস। যাও কাগজকলম নিয়ে আসা। না-কি তোমাদের বাড়িতে কাগজ-কলমের ব্যবহার নাই?
হামিদা কাগজ-কলম আনতে গেল। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে সে ফিরছে না। শাহনেয়াজ বলল, ব্যাপার কী?
আতর বলল, হামিদা ফিরবে না।
কেন?
তার বুদ্ধি বেশি। এইজন্যে ফিরবে না।
এখানে বুদ্ধি বেশির কি আছে?
আতর বলল, সে ফিরবে না যাতে আপনি আমারে নিয়া ভাব ভালোবাসা করতে পারেন। খাট থেকে নামেন। দরজা বন্ধ করেন। বাতি নিভানি।
কবি শাহনেয়াজ খাট থেকে নামতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। আতর তাকে টেনে তুলল। আতরই দরজা বন্ধ করল, বাতি নেভাল।
শাহনেয়াজ বলল, তোমার নাম আতর না হয়ে হিয়া’ হলে ভালো হতো।
কেন?
অনেক মিল পাওয়া যেত। আতরের সঙ্গে মিলে আতর কাতর পাথর। আর কিছু না। হিয়ার সঙ্গে অনেক কিছু মিলে যেমন—
হিয়া
প্রিয়া
নিয়া
দিয়া
আতর বলল, চুপ করেন তো।
শাহনেয়াজ বলল, বাতিটা একটু জ্বলাও। আমি অন্ধকারে থাকতে পারি না। ভয় লাগে।
কিসের ভয়?
ভূতের। আমাদের বাড়িতে তিন-চারটা ভূত আছে। এর মধ্যে একটা খুবই দুষ্ট। তোমাদের এই বাড়িতে কি ভূত আছে?
আতর হেসে ফেলল। শাহনেয়াজ বলল, রাতে হাসবা না। ভূত প্রেত রাতে হাসির শব্দে আকৃষ্ট হয়। চুম্বক যেমন লোহা টানে— মেয়েদের হাসি তেমন ভূত টানে। কই বাতি জ্বালাতে বললাম না?
আতর বাতি জ্বালালো। *
————-
* ‘মধ্যাহ্ন’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে লিখেছিলাম, মনিশংকরের পুত্র শিবশংকর পরিণত বয়সে মারা যান। প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার এবং পরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংলার। একটি ব্যাপার বলা হয় নি—তিনি চিরকুমার ছিলেন। তাঁর Ph.D গবেষণাপত্র An introduction to Tantric Buddhism উৎসর্গ করেছিলেন একজন মুসলমান কিশোরীকে। তার নাম আতর।
নমশুদ্ৰ পাড়া
বড়গাঙ থেকে এক-দেড়শ হাত দূরে নামশুদ্ৰ পাড়া। বাঁশের খুঁটির ওপর ছনের ছাউনি। শুকানো কলাপাতা এবং চটের বেড়া। কৈবৰ্তরা থাকে উত্তরে। এদের বাড়িঘরের অবস্থা আরো শোচনীয়। বাড়িঘর নৌকার ছাঁইয়ের মতো। এদের জীবিকা মূলত মাছধরা। শুকাতে দেয়া ছেড়া জাল দেখলেই এটা বোঝা যায়। কয়েক ঘর চামার এবং চুলি বাজারের কাছাকাছি থাকে। তাদের কারো ঘরেই চাল নেই। ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করে এদের অভ্যাস আছে। খাদ্য সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব মেয়েরা পালন করে। জঙ্গল খুঁড়ে বন আলু নিয়ে আসে। কচুশাক সিদ্ধ খাদ্য হিসেবে অনেকদিন থেকেই চালু। কচুশাকের অভাব হয় নি। নামশূদ্ররা আগে শামুক-ঝিনুক খেত না। হাঁসের খাবার মানুষ কেন খাবে? ইদানীং খাচ্ছে। কৈবর্ত নরেশ পড়েছে বিপদে। তার মেয়ে লক্ষ্মী ভাত খাবে। সে না-কি স্বপ্নে দেখেছে, সোনার থালায় করে শিং মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। স্বপ্ন দেখার পর থেকেই তার মুখে ভাত ছাড়া অন্য কথা নেই। লক্ষ্মীর বয়স আট। নরেশের ন্যাওর্টা। সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে আছে। বাবা যেখানে যাবে সে সঙ্গে যাবে। লক্ষ্মী গত পাঁচদিন ধরেই ভাত খেতে চাচ্ছে। তার না-কি শুধু একবার ভাত খেলেই হবে। আর ভাত চাইবে না। সোনার থালা লাগবে না। কলাপাতায় দিলেই হবে। নরেশ বলেছে, তোরে বুধবারে ভাত খাওয়ামু যা।
