হয় নাই। শশা লবণের ছিটা দিয়া খাওয়া যায়। আগুন লাগে না।
আতর বলল, লবণ?
না, লবণ না। চিন্তা-ভাবনা করে বলো। যা মনে আসে তাই বলবা না।
শাহনেয়াজ বলল, চাচা, আপনিও চিন্তা-ভাবনা করে প্রশ্ন করেন। এইসব কী প্রশ্ন?
শাহনেয়াজের বড় চাচা উঠে দাড়ালেন। কঠিন গলায় বললেন, তোমার এই বেয়াদবি তো আমি নিব না। সবার সামনে অপমান করেছ। নিজেকে তুমি কী ভাবো? তাকে বসানোর চেষ্টা করা হলো। সব চেষ্টাই বিফলে গেল। তিনি এই মুহুর্তেই নৌকা নিয়ে গ্রামে ফিরবেন। বিরাট হট্টগোল শুরু হলো। এই হট্টগােলের মধ্যে শাহনেয়াজ আতরকে স্পষ্ট গলায় বলল, মেয়ে দেখার নামে আমরা যে অপমান তোমাকে করেছি। তার জন্যে কিছু মনে করো না।
ধনু শেখ শাহনেয়াজের বড় চাচাকে ফেরাবার ব্যবস্থা করলেন। তাঁর লোকজন গিয়ে পায়ে ধরে তাকে ফেরত আনল। গ্রামের মানুষজনের কাছে পায়ে ধরা অনেক বড় জিনিস।
বড় চাচার মাধ্যমেই জানা গেল যে, কন্যাকে সবারই অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে। সুলক্ষণা কন্যা। এখন সবচে’ ভালো হয় মাওলানা ডাকিয়ে বিয়ে পড়িয়ে দিলে। পছন্দ হবার পর বিয়ে ফেলে রাখতে হয় না। কন্যার ওপর জিনের নজর পড়ে। বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলে জিন নজর দিতে পারে না। বিবাহিত মেয়েদের বিষয়ে জিনের কোনো আগ্রহ নাই।
শিবশংকরের ভূত নামানোর ওঝা চলে এসেছে। উঠানে আগুন করা হয়েছে। আগুনের সামনে জলচৌকিতে বসানো হয়েছে শিবশংকরকে। তার চোখ রক্তবর্ণ। মুখ দিয়ে বাচ্চাদের মতো লালা পড়ছে। আগুনে হলুদ পুড়তে দেয়া হয়েছে। ওঝা মন্ত্রপাঠ করছেন
কালীঘাটে কালী মা
হায় আলি হায় ফাতেমা
পুবে গুনাই ঘাট
রাখিলাম জঙ্গল পট
বিষ্ণু হৈলা পোকাম্বর
আদস্ফ শূলপানি। ইত্যাদি…..
মন্ত্রপাড়া শেষ করে শুকনা মরিচপোড়া শিব শংকরের নাকের কাছে ধরা হলো। ওঝা কঠিন গলায় বললেন, তুই কে? তোর নাম কী? তুই থাকাস কই? না বললে বান মাইরা কী করব তার নাই ঠিক। বল কই থাকিস?
শিবশংকর গোঙাতে গোঙাতে বলল, গাছে থাকি।
তুই নারী না পুরুষ, এইটা বল। নারী?
হুঁ।
ওঝা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, যা ভেবেছিলাম। তাই। পেততুনিতে ধরেছে। জঙ্গলায় তিন চাইরটা পেততুনি থাকে- সব কয়টা দুষ্টের সেরা। এই তোর নাম বল। নাম না বললে মরিচ পুড়া নাকের ভিতর ঢুকায়ে দিব।
শিবশংকর বিড়বিড় করে নাম বলল।
পরিষ্কার করে বল। সবাই যেন শুনে, এইভাবে বল। তোর নাম কী?
হরিদাসী।
দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। কারণ অল্প কিছুদিন আগেই হরিদাসী মারা গেছে। তাকে শশানে পুড়িয়ে তার ছাই পাঠানো হয়েছে গঙ্গায় ফেলার জন্যে। তার যে গতি হয় নাই, সে প্রেতিযোনী প্রাপ্ত হয়েছে, এটা বান্ধবপুরের লোকজন জানত না।
আতর তার স্বামীর সঙ্গে বিশাল রেলিং দেয়া খাটের এক কোণে জড়সড় হয়ে আছে। মেঝেতে আতরের দাসী হামিদা বসে আছে। প্রথম বাসরের এই নিয়ম। স্বামী যেন স্ত্রীর খুব কাছে যেতে না পারে তার জন্যে পাহারার ব্যবস্থা। সারারাত সে এখানেই থাকবে।
শাহনেয়াজ নিচু গলায় বলল, আমি যে কবিতা লেখি এটা বোধহয় তুমি জানো না। আমার তিনটা কবিতা সওগাত-এ ছাপা হয়েছে। সওগাত পত্রিকার নাম শুনেছ?
আতর না-সূচক মাথা নাড়ল।
বাংলা পড়তে পার?
আতর হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
শরৎ বাবুর উপন্যাস পড়েছ?
আতর না-সূচক মাথা নাড়ল।
‘আনোয়ারা’ পড়েছ?
আতর আবারো না-সূচক মাথা নাড়ল। শাহনেয়াজ বলল, এখন থেকে গল্পউপন্যাস পড়বে। আমি জোগাড় করে দিব। সাহিত্যবোধ তৈরি না হলে আমার কবিতা বুঝতে পারবে না। এখন তোমাকে বিদ্যাসুন্দর পড়ে শোনাব। মন দিয়ে শোন, বুঝতে পার কি-না দেখ। বিদ্যার রূপ বর্ণনা পড়ব। বিদ্যা ছিল তোমার মতোই রূপবতী। তার রূপের বর্ণনা এবং তোমার রূপের বর্ণনা একই। বুঝেছ?
আতর আবার না-সূচক মাথা নাড়ল, তবে তার ধারণা সে মানুষটাকে বুঝতে পারছে। পাগলা ধরনের মানুষ। পাগলা না হলে বইখাতা নিয়ে কেউ স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করতে আসে না।
শুন রাজা সাবধানে পূর্বে ছিল এই স্থানে
বীরসিংহ নামে নরপতি।
বিদ্যা নামে তার কন্যা আছিল পরম ধন্যা
রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী।
প্ৰতিজ্ঞা করিল সেই বিচারে জিতিবে যেই
পতি হবে সেই যে তাহর।
রাজাপুত্ৰগণ তায় আসিয়া হরিয়া যায়
রাজা ভাবে কী হবে ইহার।।
শাহনেয়াজ মুগ্ধ হয়ে পড়ছে। আতর তাকিয়ে আছে। আতরের হঠাৎ মনে হলো তার জীবনটা মনে হয় সুখেই কাটবে। আজ ভোরেই সে শিবশংকরকে একটা চিঠি দিয়েছে, এই ভেবে এখন খারাপ লাগছে।
বই থেকে চোখ তুলে শাহনেয়াজ বলল, আতর।
জি।
কী পড়ছি বুঝতে পারছ তো?
পারছি।
লোচন অর্থ কী বলো? ওই যে লাইনটা—
বিধি চক্ষু দিল যারে সে যদি না দেখে তারে
তাহার লোচনে কিবা ফল?
আতর বলল, লোচন অর্থ আমি জানি না।
লোচন হলো চক্ষু। লাইন দু’টার অর্থ হলো, বিধি যাকে চোখ দিয়েছেন। সে যদি সেই চোখে না দেখে তাহলে চোখ দিয়ে লাভ কী? বুঝেছ?
জি।
বুঝতে না পারলে বলবে, আমি বুঝিয়ে দেব। হাসে কে? কে যেন হাসল।
হামিদা হাসে। আপনার কথা শুনে মজা পেয়ে হাসে।
শাহনেয়াজ বই থেকে চোখ তুলে মেঝেতে বসে থাকা হামিদার দিকে তাকাল। হামিদা মাথা নিচু করে প্রায় পুঁটলির মতো হয়ে গেল। শাহনেয়াজ বলল, প্রতিশব্দ বলে একটা বিষয় আছে। একই জিনিসের দু’টা তিনটা করে নাম। প্রতিশব্দ শিখতে হবে। কবিতা লেখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। বুঝেছ?
আতর বলল, কথাটা কারে বললেন?
