শিবশংকর বলল, সম্বোধন কী লিখব?
আতর বলল, সম্বোধন লাগবে না। লিখেন–
আমার খুব ইচ্ছা আপনার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়। এটা কি সম্ভব? যদি সম্ভব মনে করেন। তবে বাড়ির সামনে একটা খুঁটি পুতবেন। খুঁটি দেখে বুঝব।
আপনার চিরদিনের দাসী
আতর শিবশংকর বলল, দাসী লিখব কেন?
আতর বলল, আমার দাসী লিখতে ইচ্ছা করতেছে। দাসীর চেয়েও নিচে যদি কিছু থাকত। তাই লিখতে বলতাম।
শিবশংকর বলল, যাকে তুমি এই চিঠি লিখছ সে যে কী খুশি হবে। কয়েকটা খুঁটি পুতবে।
আতর বলল, আমাকে বিয়ে করলে খুশি হবে কেন?
কারণ তুমি ভালো মেয়ে। দেখতেও সুন্দর। সবাই সুন্দর পছন্দ করে।
আপনি করেন?
না।
আপনি কী পছন্দ করেন?
বুদ্ধি।
আতর বলল, আচ্ছা যাই। শিবশংকর বলল, চিঠিটা নিয়ে যাও। আতর বলল, চিঠিটা আপনার জন্যে। আতর ছোট ছোট পা ফেলে যাচ্ছে। সে একবারও পেছনে তাকাল না।
শিবশংকর চিঠি হাতে নিয়ে বসে আছে। তার মুখ ছাইবৰ্ণ। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। যে জ্বর আসব আসব করছিল। সে জ্বর এসে গেছে। চোখ জ্বালাপোড়া করছে। রোদের দিকে তাকাতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে যে-ই তাকে দেখছে সে-ই বুঝে ফেলছে ঘটনা কী। শিবশংকর চিঠিটাকে গুটি পাকিয়ে বলের মতো করেছে। সেই বল হাতের মুঠিতে লুকানো। চিঠিটা সে খুবই গোপন কোনো জায়গায় লুকিয়ে রাখবে। এমন কোনো গোপন জায়গা যেন কেউ কোনোদিন খুঁজে না পায়। সে চিঠি নিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা হবে। গহীন জঙ্গলে ঢুকে পড়বে। বড় কোনো গাছ খুঁজে বের করবে। বড় বড় গাছের কাণ্ডে কাঠবিড়ালি গর্ত তৈরি করে, চিঠিটা রাখতে হবে এমন কোনো গর্তে। কাঠবিড়ালির তৈরি করা গর্তে কখনো বৃষ্টির পানি ঢ়োকে না।
গোপীনাথ বল্লভ শিবশংকরের খোঁজে এসেছেন। তার ছাত্রের শরীর ভালো না। এই অসুস্থ শরীরেও সে যেন কোথায় কোথায় ঘোরে। তিনি খবর পেয়েছেন। শিবশংকর মাঝে মাঝে জঙ্গলে ঢোকে। জঙ্গলে বুনো শূকরের উপদ্রব হয়েছে। দাতাল শূকর নামশুদ্ৰ পাড়ার একজনকে দাঁত বসিয়ে জখম করেছে। গোপীনাথ বল্লভ বললেন, তুমি এখানে?
হুঁ।
কী করা?
কিছু করি না। একটু আগে হাঁটছিলাম, এখন বসে আছি।
তোমার জ্বর কি বেড়েছে? চোখমুখ লাল। চল বাড়িতে চল।
না।
এখানে বসে থাকবে?
এখানে বসেও থাকব না। আমি জঙ্গলে ঢুকব। জঙ্গলে আমার কিছু কাজ আছে। কাজ শেষ করে বাড়িতে যাব।
জঙ্গলে কী কাজ? সেটা আপনাকে বলব না।
গোপীনাথ শিবশংকরের হাত ধরলেন। শিবশংকরের মনে হলো, তার হাতের চিঠি কেড়ে নিতে যাচ্ছে। সে এক ঝটিকায় হাত সরাল। কঠিন গলায় বলল, আমার কাছে আসবেন না।
তোমার কাছে আসব না কেন?
আপনাকে নিষেধ করেছি। এই জন্যে। এখন থেকে আমি আপনার কোনো কথা শুনব না। আপনি একজন মূর্থি। স্বাস্থ্যবিদ্যার কিছুই জানেন না। আয়ুৰ্বেদ চিকিৎসারও কিছু জানেন না।
তোমার হয়েছে কী?
শিবশংকর উঠে দাঁড়াল। গোপীনাথ চিন্তিত মুখে বললেন, যাও কই?
জঙ্গলে যাই। আপনি আমার পেছনে পেছনে আসবেন না। যদি আসেন আমি ভয়ঙ্কর কাণ্ড করব।
আমার তো মনে হয় তোমাকে ভূত-পেত্নিতে ধরেছে।
শিবশংকর হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করল। তার হাতের মুঠায় চিঠি। পেছনে পেছনে দৌড়ালেন গোপীনাথ। তবে তিনি শিবশংকরের নাগাল পেলেন না। সে গহীন জঙ্গলে ঢুকে গেল।
দুপুরের পর অনেক ঝামেলা করে তাকে উদ্ধার করা হলো। সে অনেক উঁচুতে একটা কড়ই উঁচুতে একটা কড়ই গাছের ডাল জড়িয়ে ধরে জ্বরের ঘোরে কাঁপছিল। বান্ধবপুরে ছড়িয়ে পড়ল। মনিশংকরের ছেলে শিবশংকরকে ভূতে ধরেছে। ভুত তাকে কড়ই গাছের মাথায় নিয়ে তুলেছিল। ভূত নামানের জন্যে ভূতের ওঝা আনতে লোক ছুটল।
ধনু শেখের বাড়িতে কনে দেখার লোকজন উপস্থিত। দু’একদিনের মধ্যে তাদের আসার কথা, তারা আজই চলে এসেছে। আজ দিনটা না-কি বিশেষ শুভ। বর শাহনেয়াজ এসেছে। তার বাবা, বড় চাচা এবং এক মামা এসেছেন। তাদেরকে সমাদর করে বসানো হয়েছে। মুরুব্বিারা অপেক্ষা করছেন ‘কন্যাসুন্দর আলো’র জন্য। এই আলোয় কুরূপা মেয়েকেও অপরূপ মনে হয়।
শাহনেয়াজ হালকা পাতলা গড়নের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের যুবক। লাজুক স্বভাবের। সহজে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। বেশির ভাগ সময়ই তার দৃষ্টি জানালার দিকে। জানালা দিয়ে বড় গাঙের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। আতর যখন হামিদার হাত ধরে ঘরে ঢুকাল তখনো শাহনেয়াজ জানোলা দিয়ে তাকিয়ে।
আতরকে বেশ কিছু পরীক্ষা দিতে হলো। যেমন, গামলায় দু’পা ড়ুবিয়ে মেঝের ওপর হেঁটে যাওয়া পরীক্ষা। মেঝেতে পায়ের পাতার ছাপ কী রকম পড়ছে তা দেখাই এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য। মেঝেতে ছাপ যত কম পড়বে তত ভালো। এরপর শুরু হলো সুতা পরীক্ষা। পায়ের কোনো আঙুল জোড়া কিনা তা সুতা ঢুকিয়ে দেখা।
ছাপ পরীক্ষার পর ধর্মজ্ঞান বিষয়ক পরীক্ষা। যেমন, বেতরের নামাজের নিয়ত কী? অজুর নিয়ত কী?
ধর্ম পরীক্ষার পর সাধারণ বুদ্ধি পরীক্ষা। যেমন, একসের বেগুন ড়ুবাতে কত সের পানি লাগবে?
সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষার সময় শাহনেয়াজ বিরক্ত হয়ে বলল, যথেষ্ট হয়েছে, আর কত! বেগুন পানিতে ড়ুবানোর দরকার কী?
প্ৰশ্নকর্তা শাহনেয়াজের চাচা। তিনি বললেন, দরকার আছে। তুমি যা বুঝি না। তা নিয়া কথা বলবে না। মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা বলতে হয় আদবের সঙ্গে। তোমার মধ্যে আদবের অভাব দেখলাম। যাই হোক, মা আতর এখন বলো কোন জিনিস বিহনে খাদ্য প্রস্তুত হবে না?
আতর বলল, আগুন।
