দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে নড়েচড়ে বসল। দেবু বলল, একটা বিষয় কেউ বুঝতেছে না। মহাবিপদ আমরার সামনে।
এক শ্রোতা বলল, বুঝায় বলো বিপদটা কী?
জাপানিরা বাৰ্মা দিয়া ঢুকবে চিটাগাং। সেখান থেকে ময়মনসিংহ-ঢাকা। ময়মনসিংহ-ঢাকা জয় হয়ে গেলে তারা রওনা দিবে কলিকাতা। বান্ধবপুরের উপর দিয়া যেতে হবে। এরা যেদিকে যায় ছারখার করে দিয়ে যায়। যুবক সব মেরে ফেলে। অল্পবয়স্ক মেয়ে সব নিজের দেশে চালান করে দেয়।
কেন?
দেবু বিরক্ত হয়ে বলল, একেকটা প্রশ্ন এমন করেন! মেয়ে ধইরা নিয়া যাবে। কেন বুঝেন না? মা ডাকার জন্য নিবে না।
এককড়ি বললেন, বাজে আলাপ বন্ধ। কাগজ পড়। দেশের মেয়ে নিয়া যাওয়া সহজ না। নেতাজি স্বয়ং আছেন। নেতাজিও সাগু খাওয়া লোক না।
খবর পাঠ চলতে থাকে।
ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে, এই চিন্তার মধ্যে কি কোনো আনন্দ আছে? হয়তো আছে। খবর শুনতে আসা মানুষদের আনন্দিত মনে হয়। মানুষ বড়ই বিচিত্র জীব।
ধনু শেখও খবর শুনছেন। তাকে পড়ে শোনাচ্ছে আতর। ধনু শেখ খাটে হেলান দিয়ে বসেছেন। পায়ের ওপর কম্বল চাপা দেয়া। হাতে তামাকের নল। চোখে চশমা। এমনিতে তিনি চশমা পরেন না। যখন খবর শুনতে বসেন তখন আয়োজন করে চশমা চোখে দেন। ধনু শেখের বাড়িতে যে কাগজ আসে তার নাম যুদ্ধ সংবাদ। সেখানে যুদ্ধের খবর ছাড়া আর কোনো খবর থাকে না। এই ভালো। যুদ্ধের খবর ছাড়া আর সব খবরই এখন গুরুত্বহীন।
খবর পড়া শেষ হয়েছে। আতর চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছে। ধনু শেখ বললেন, একটু বসো। কথা আছে।
আতর বসল।
অনেক দিন ধরে একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাস করব বলে ভেবেছি। জিজ্ঞাস कद्भो श्श नरें।
জিজ্ঞাস করেন।
শরিফারে বাড়ি থেকে পালাবার ব্যবস্থা কি তুমি একই করেছ? না-কি আরো কেউ তোমার সঙ্গে ছিল?
আমি একাই করেছি।
যে কাজটা করেছ, তাতে শরিফার লাভ হয়েছে, না ক্ষতি হয়েছে? ভালোমতো চিন্তা কইরা উত্তর দাও।
ক্ষতি হয়েছে।
অল্প ক্ষতি, না বড় ক্ষতি?
বড় ক্ষতি?
এতে কী প্রমাণিত হয়েছে বলে?
আতর চুপ করে আছে। সে বুঝতে পারছে না। তার বাবা কী উত্তর শুনতে চাচ্ছেন। তিনি যে উত্তর শুনতে চাচ্ছেন সেই উত্তর ছাড়া অন্য কোনো উত্তরেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন না।
ধনু শেখ হুক্কার নিলে লম্বা টান দিয়ে বললেন, এতে প্রমাণিত হয়েছে– ‘নারী বুদ্ধি প্ৰলয়ঙ্করী’। ভবিষ্যতে আর কখনো নিজের বুদ্ধিতে কিছু করব না।
আচ্ছা।
এখন বলে আমারে তুমি কি অপছন্দ করা?
করি।
অল্প অপছন্দ কর, না বেশি?
বেশি।
ঘিন্না করা?
হুঁ।
যারে ঘিন্না কর তারে সব সময় চোখের সামনে দেখা তো ভালো কথা না। কাজেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার বিবাহ দিব। এক ছেলের পিতার সঙ্গে আগে কথা হয়েছিল। তাকে পত্র দিয়েছিলাম ছেলে এবং ছেলের পিতা যেন তোমাকে দেখে যায়। পত্রের উত্তর এসেছে। দুই-একদিনের মধ্যে তারা আসবে। সন্ধ্যাকালে কন্যা’ দেখানো হবে। যদি পছন্দ হয় তাহলে বিবাহের দিন এবং কাবিন ধার্য হবে। এই বিষয়ে কিছু বলতে চাও।
না।
তোমার পাড়াবেড়ানি অভ্যাস আছে আমি জানি। আগামীকাল থাইকা যেন ঘরের বাইরে পা না যায়।
আচ্ছা।
যার সঙ্গে বিবাহের কথাবার্তা হয়েছে তার বিষয়ে কিছু জানতে চাও?
না।
ধনু শেখ বললেন, জানতে না চাইলেও আমার জানানো কৰ্তব্য। ছেলের পারিবারিক অবস্থা ভালো না, তবে ছেলে উচ্চশিক্ষিত। এম.এ পরীক্ষা দিয়েছিল। পাশ হয় নাই। আবার দিবে। বুঝেছ?
হুঁ।
গোটা বান্ধবপুরে এম. এ পরীক্ষা দেওয়া কেউ নাই, এটা খেয়াল রাখবা। ছেলের গাত্ৰবৰ্ণ কালো। তবে পুরুষমানুষের কালো গাত্ৰবৰ্ণ শুভ। ছেলের নাম শাহনেয়াজ। এখন সামনে থেকে বিদায় হও।
আমগাছের চারপাশে শিবশংকর ঘুরছে। তাকে দেখেই মনে হচ্ছে সে অসুস্থ। গত রাতে তার জ্বর এসেছে। এখন জ্বর নেই, তবে মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। মাথা ফাঁকা লাগছে। জ্বর আসার আগে এরকম লাগে।
শিবশংকর ঠিক করেছে। শরীর যখন ঠিক থাকবে, মন ভালো থাকবে, তখন সে clockwise, ঘুরবে। আবার শরীর যখন খারাপ থাকবে, মনও ভালো থাকবে না, তখন ঘুরবে Anti clockwise.. এখন সে এন্টি ক্লিকওয়াইজ ঘুরছে।
আতর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মাথায় ওড়না। ওড়নার রঙ গাঢ় হলুদ। তার পরনের শাড়ির রঙ নীল। সে শাড়ি দিয়ে মাথায় ঘোমটা দেয় নি। ওড়না দিয়ে দিয়েছে। আতর আজ এক আসে নি। হামিদাকে নিয়ে এসেছে। হামিদা যথারীতি বোরকা পরা। সে আতরের মাথায় ছাতা ধরে রেখেছে। হামিদার কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। আতর, হামিদাকে দাড়া করিয়ে এগিয়ে গেল। শিবশংকর বলল, আমি তোমার জন্য সুন্দর একটা নাম খুঁজে বের করেছি।
আতর নামটা কি সুন্দর না?
হ্যাঁ সুন্দর। কিন্তু তারচে’ও সুন্দর। নামটা বলব?
না। এখন পর্যন্ত আতর নামটাই আমার পছন্দ। যেদিন পছন্দ হবে না। আপনার কাছ থেকে নতুন নাম নেব।
তোমার সঙ্গে বোরকা পরা উনি কে?
আমার পাহারাদার। আপনি কি আমার একটা কাজ করে দেবেন?
অবশ্যই। কী কাজ?
একটা চিঠি লিখে দিবেন?
আমি একজনকে একটা চিঠি পাঠাব। জরুরি চিঠি। আজই পাঠাতে হবে।
তুমি তো লিখতে পার।
আমি চাই না যাকে চিঠি লিখব। সে আমার হাতের লেখা দেখে আমাকে চিনে ফেলুক।
কাগজ-কলম তো আনি নাই।
কাগজ-কলম আমার সঙ্গে আছে। দিব?
দাও। আমার হাতের লেখা কিন্তু ভালো না। তবে বানান ভুল হবে না।
আতর হামিদার কাছ থেকে কাগজ এবং কলম এনে দিল। শিবশংকর চিঠি লিখতে বসেছে। আতর পাশে দাঁড়িয়ে।
