পুরনো রেড ওয়াইনের বোতল খোলা হয়েছে। হিটলার এক চুমুক রেড ওয়াইন খেয়ে মাথা নাড়লেন। তাঁর পছন্দ হয়েছে। দু’রকমের সুপ দেয়া হয়েছে। বেবী কর্ন-এর একটি প্রিপারেশন আছে। আলুভাজা আছে। মাখন মাখানো মাশরুম আছে। শূকরের মাংসের সসেজ এবং লাল করে পোড়ানো খরগোসের মাংস আছে। মাংসের বাটিগুলির ঢাকনা খোলা হয় নি। হিটলার নিরামিষ খাবার পছন্দ করেন, তবে কিছুদিন আগে জেনারেলদের এক সম্মেলনে এক টুকরা খরগোসের মাংস মুখে দিয়েছিলেন বলে বিশেষ আয়োজনের দিনে তার টেবিলে মাংস রাখা হয়। মাছের কোনো আইটেম নেই। ইভা ব্ৰাউন মাছের গন্ধ পছন্দ করেন না।
একটু দূরে গ্রামোফোনে মোৎসার্ট বাজছে। ডাইনিং টেবিলে মোমবাতির আলো। পরিবেশ চমৎকার। হিটলারকে প্ৰসন্ন দেখাচ্ছে। যুদ্ধের ভালো কোনো খবর পেলে তিনি প্ৰসন্ন বোধ করেন। ভালো খবর পাওয়ার তেমন কারণ নেই। ভয়াবহ দুঃসংবাদ একের পর এক আসছে। তারপরেও যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত অঘটন। ঘটে। ইভা ব্ৰাউনের ধারণা তেমন কোনো ঘটনা ঘটেছে।
ইভা ব্ৰাউন ওয়াইন গ্লাস তুলে টোস্ট করলেন— জার্মানির মৃত্যুঞ্জয়ী বীরসৈনিকদের। হিটলারও গ্লাস তুললেন। গ্লাসে গ্লাসে শব্দ হলো। সেই শব্দও সঙ্গীতের মতোই। হিটলার ইশারা করলেন, গ্রামোফোন যেন বন্ধ করা হয়। তিনি ডিনার নীরবেই করেন, তবে মাঝে মাঝে তার কথা বলতে ইচ্ছা করে। আজ সে রকম একটা দিন।
হিটলার আলুভাজা মুখে দিতে দিতে বললেন, জার্মান ফিল্ড মার্শালদের বিশেষত্ব কী তুমি জানো?
ইভা ব্ৰাউন বললেন, তারা ধীমান বীর। মহান যোদ্ধা। সাহসী।
ঠিকই আছে, তবে তাদের প্রধান বিশেষত্ব হলো তারা কখনোই জীবিত অবস্থায় শত্রুর কাছে ধরা পড়ে না। আত্মসমর্পণ করে না। মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যায়। প্রয়োজনে আত্মহত্যা করবে, কিন্তু ধরা দেবে না।
ইভা ব্ৰাউন বললেন, ফিল্ড মার্শালদের এই বিষয়টি জানতাম না।
হিটলার অহংকারের সঙ্গে বললেন, এখন পর্যন্ত কোনো জার্মান ফিল্ড মার্শালকে কেউ জীবিত অবস্থায় বন্দি করতে পারে নি।
ইভা ব্ৰাউন রেড ওয়াইনের গ্লাস আবারো উঁচু করে বললেন, মহান ফিল্ড মার্শালদের উদ্দেশে।
হিটলার বললেন, তুমি জার্মান ফিল্ড মার্শাল বলো নি।
ইভা ব্ৰাউন বললেন, ভুল হয়েছে। সরি। মহান জার্মান ফিল্ড মার্শালদের উদ্দেশে।
হিটলার গম্ভীর গলায় বললেন, এ ধরনের ভুল আমার পছন্দ না।
সময় ১৯৪৩ সনের ফেব্রুয়ারি মাস। তারিখ দুই। হিটলার তখনো জানেন না তার ফিল্ড মার্শালদের একজন, ফিল্ড মার্শাল পাউলাস, স্টেলিনগ্রাদে সোভিয়েতদের কাছে হাত তুলে আত্মসমৰ্পণ করেছেন। তাঁর সঙ্গে আত্মসমৰ্পণ করেছে ৯১ হাজার জার্মান সৈন্য। তারা বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত। শীতে এবং ক্ষুধায় কাতর।
ফিল্ড মার্শাল পাউলাসকে সোভিয়েট মার্শাল জর্জি ঝুকভের তাঁবুতে নেয়া হলো। তাঁবুতে পেতলের কড়াইয়ে আগুন জ্বলছিল। ঝুকভ হাতের দস্তানা খুলে আগুনের সামনে হাত মেলে রেখেছেন। ফিল্ড মার্শাল পাউল্যাসের সঙ্গে তিনি হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, আগুনের আরো কাছে এসে দাঁড়ান, শরীর গরম হোক।
পাউলাস কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর দৃষ্টি ভাবলেশহীন।
ঝুকভ বললেন, গরম এক মগ সামরিক কফি কি দেব? কফি শীত কাটাতে সাহায্য করে। আপনি ক্ষুধার্তা?
পাউলাস হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নৈশভোজ সারব। আপনি ভাগ্যবান। আপনার জন্যে আমরা দু’বোতল জার্মান রেড ওয়াইন জোগাড় করতে পেরেছি। আমাদের যেমন ভদকা, আপনাদের তেমন রেড ওয়াইন। আমার খুব শখ বার্লিনে বসে আপনাদের রেড ওয়াইন খেয়ে দেখব। যেখানকার জিনিস সেখানে বসেই খাওয়া উচিত।
‘মার্শাল ঝুকভের তাড়া খাইয়া জার্মানবাহিনী বার্লিনের উদ্দেশে ছুটিতেছে…’
এককড়ির দোকানে খবর পড়া হচ্ছে। আজ দুটা পত্রিকা পড়া হবে। কলিকাতা সমাচার এবং ঢাকা প্ৰকাশ। যুদ্ধের খবর এক পত্রিকায় পড়ে মজা পাওয়া যায় না। শ্রোতারা আরো জানতে চায়। যুদ্ধের ফলাফল কী? এখনো পরিষ্কার না। ঢাকা প্রকাশ লিখেছে- তুরুপের তাস এখনো হিটলারের হাতে। তুরুপের তাসটা কী তাও বোঝা যাচ্ছে না।
খবর পাঠক মাথা দুলিয়ে বলল, হিটলারের বিচি তো মাথায় উঠছে। এই বিচি আর নামব না। খবর পাঠকের নাম দেবু। সে গৌরাঙ্গের ভঙ্গিতে খবর পড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেরকম হচ্ছে না। পাখি উড়ে গেলে তার পালক পড়ে থাকে। গৌরাঙ্গ মারা গেছে। কিন্তু তার খবর পাঠ রেখে গেছে।
এককড়ি বললেন, অসভ্য অশ্লীল কথা বলব না।
এক শ্রোতা বলল, ঘটনা সত্য, বলতে অসুবিধা কী?
এককড়ি বললেন, তুমি জানো ঘটনা সত্য? যুদ্ধ তুমি করতেছা? পুরাটাই হিটলারের কৌশল।
কী কৌশল?
এমন ভাব করতেছে যে পরাজিত। রওনা দিয়েছে বার্লিনের দিকে। পিছনে পিছনে আসতেছে রুশরা। ফাঁদে পা দিয়েছে। জার্মান বিমান যখন ঝাপ দিয়া পড়ব তখন বুঝব।
ঘটনা এইরকম আপনেরে বলেছে কে? হিটলার সাব তো আপনের সাথে পরামর্শ করে নাই।
হিটলারকে যে চিনে সে জানে ঘটনা এইরকম। হিটলার সাপ্ত খাওয়া জিনিস না। অন্য জিনিস।
এইটা অবশ্য ঠিক।
হিটলার তো একলা না, তার সাথে আছে মুসৌলিনি। আরেক ধাইন্যা মরিচ। আছে জাপানিরা। জাপানিরা কী এখনো বুঝি নাই? কলিকাতা খালি কইরা সব পালাইছে কোন সুখে? জাপানিরা যখন বোমা ফেলতে শুরু করব আমরার বান্ধবপুর বাদ থাকব এরকম চিন্তা করবা না।
