জি।
ঠান্ডা। আর ঝড়বৃষ্টির কারণে লোকজন সব থাকবে ঘরে। আগুনের কারিগররে কেউ দেখবে না। কথা ঠিক বলেছি?
জি বলেছেন।
এককড়ির দোকানটা অবশ্যই জ্বালাইবা।
জি আচ্ছা।
জুম্মাঘরে আগুন দিতে ভুলব না। কিন্তু।
কথাটা বুঝলাম না।
ধনু শেখ ঠান্ডা গলায় বললেন, দাঙ্গা-হাঙ্গামার পরে ইংরাজ ম্যাজিষ্ট্রেট আসবে। পুলিশ সুপার আসবে। তারা স্বচক্ষে দেখবে মুসলমানের পবিত্র ধৰ্মস্থান হিন্দুরা কীভাবে জ্বালায়ে দিয়েছে। এখন বুঝেছ?
বুঝেছি। আপনার বুদ্ধির কোনো সীমা নাই।
বুদ্ধি অনেকেরই আছে। সবে বুদ্ধি ব্যবহার করে না। আমি করি। পাল্কি ঠিক করতে বলো। রঙিলা বাড়িতে যাব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শীত কমানোর ব্যবস্থা।
আগুনের ব্যবস্থা কি এখনই করব?
অবশ্যই। আগুন দেখতে দেখতে যাব।
প্ৰায় একই সঙ্গে কয়েকটা জায়গায় আগুন জুলল। এককড়ির দুটা দোকান। ভরদ্বাজের বাড়ি। মনিশংকরের বাংলাঘর এবং জুম্মাঘর। বান্ধবপুর অঞ্চল জুড়ে হৈচৈ ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। বাচ্চাদের কান্নাকাটি শোনা যাচ্ছে। অনেক হিন্দু বাড়িতে শঙ্খ বাজানো শুরু হয়েছে। ভয়াবহ দুর্যোগে শঙ্খ বাজানোর নিয়ম।
ধনু শেখ পাঙ্কি করে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখলেন শ্ৰীনাথ দৌড়ে যাচ্ছে। তিনি ডাকলেন, শ্ৰীনাথ, যাও কই?
শ্ৰীনাথ থমকে দাঁড়াল। জবাব দিল না। ধনু শেখ বললেন, যেখানেই যাও ধীরেসুস্থে যাও। রাস্তা পিছল। পিছল রাস্তায় সাবধানে হাঁটতে হয়। বুদ্ধিমান মানুষ সাবধানে হাঁটে। তোমারে বুদ্ধিমান জানতাম।
শ্ৰীনাথ কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলাল। ধনু শেখ বললেন, শশাংক পালের ভূতের বিষয়টা শুনলাম না। ঝাঁকি দিয়া ভূতটারে তুমি যখন নিচে ফেললা তখন কী হইল? আচ্ছা থাক, পরে শুনব। মনে হয়। আইজ তুমি সামান্য ব্যস্ত।
ধনু শেখের পালকি এগুছে। শ্ৰীনাথ কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। আগুন বাড়ছে। বাতাসের কারণে দ্রুত ছড়াচ্ছে।
মালেকাইন ধনু শেখের যত্নের চূড়ান্ত করছেন। বিলাতি পানি আনা হয়েছে। হুক্কায় আম্বুরী তামাক পুড়ছে। পিতলের বড় মালসায় কাঠকয়লার আগুন করে ধনু শেখের পাশে রাখা হয়েছে। হাত গরম করার ব্যবস্থা। ধনু শেখ বললেন, একটা পা না থাকার কারণে আমার এখানে আসা-যাওয়ার বড়ই অসুবিধা। আসতে ইচ্ছা করলেও আসতে পারি না।
মালেকাইন বললেন, আহা আহা!
ধনু শেখ বললেন, আমার এই অসুবিধা আপনি সহজেই দূর করতে পারেন।
মালেকাইন বললেন, অবশ্যই। আমার চার বেহারিার পালকি আছে। আপনি খবর দিলেই পাল্কি যাবে। আদবের সাথে আপনাকে নিয়ে আসবে।
ধনু শেখ বললেন, পাঙ্কি আমারও আছে।
মালেকাইন বললেন, তাও ঠিক।
ধনু শেখ তামাকে লম্বা টান দিয়ে বললেন, আমার সমস্যা দূর করার সহজ উপায় রঙিলা বাড়ির যাকে আমার পছন্দ তারে পাল্কি দিয়া আমার কাছে পৌঁছায়ে দেয়া।
মালেকাইন বললেন, সেটা সম্ভব না। এই বাড়ির কিছু নিয়ম আছে। অনেক দিনের পুরনো নিয়ম। বাড়ির মেয়ে কোনোখানে পাঠানো যাবে না। এরা থাকবে আলাদা। কোনোখানে যাবে না।
দিনের সাথে নিয়ম পাল্টায়। ইংরেজ আমলের নিয়ম আর স্বরাজ আমলের নিয়ম এক না।
মালেকাইন বললেন, স্বরাজ এখনো হয় নাই। যখন হবে তখন দেখব। তবে রঙিলা বাড়ির নিয়ম। তখনো বহাল থাকবে।
ধনু শেখ বললেন, আপনার প্রয়োজন টাকা। নিয়মের আপনার প্রয়োজন নাই। আমি যখন কাউকে নিজের বাড়িতে নিয়া রাখব ডাবল টাকা দিব।
তিনগুণ টাকাতেও হবে না।
ধনু শেখ বললেন, না হলে কী আর করা। আমি নিজেও নিয়ম মানা মানুষ। নিয়মের বাইরে যাই না। বান্ধবপুরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন লেগেছে। এই খবর কি পেয়েছেন?
পেয়েছি।
আগুন নিয়ম মানে না। সে তার ইচ্ছায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। আপনি সাবধানে থাকবেন যেন রঙিলা বাড়িতে আগুন না ধরে। রঙিলা বাড়ি পুইড়া ছাই হয়ে গেলে আপনার আমার সবেরই অসুবিধা।
মালেকাইন ধনু শেখের গ্রাসে বিলাতি পানি ঢালতে ঢালতে চিন্তিত গলায় বললেন, আপনি কাকে নিজের বাড়িতে নিতে চান?
ধনু শেখ বললেন, শরিফাকে।
আজই নিতে চান?
হুঁ।
রাখবেন কত দিন?
জানি না।
মালেকাইন বললেন, ঠিক আছে নিয়া যান।
ধনু শেখ বললেন, আপনার অনেক মেহেরবাণী।
শরিফা আলাদা পালকিতে ধনু শেখের বাড়িতে যাচ্ছে। তাকে চিন্তিত বা দুঃখিত মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে ক্লান্ত। যেন অনেক দিন শান্তিমতো ঘুমাচ্ছে না। সে পালকিতেই ঘুমিয়ে পড়ল।
বান্ধবপুরের আগুনে পাঁচজন মানুষ মারা গেল। এদের মধ্যে মুসলমান একজন। জুম্মাঘরের নতুন ইমাম মোহাম্মদ সিদ্দিক। আগুন লাগার পর সে দরজা খুলে বের হতে পারে নি। দরজা খুঁজে পায় নি। মসজিদের ভেতর ছোটাছুটি করেছে এবং চিৎকার করেছে— ইবলিশ শয়তান। ইবলিশ। ইবলিশ। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তার ধারণা ছিল— ইবলিশ শয়তান কিছু একটা করছে। ইবলিশের মায়া। আসলে আগুন-টাগুন কিছুই লাগে নি।
গৌরাঙ্গ এককড়ির দোকানেই ঘুমাত। আগুন লাগার পর সে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। দোকানের ক্যাশবাক্স উদ্ধারের জন্যে সে আবার দৌড় দিয়ে জ্বলন্ত ঘরে ঢুকে। তখনি ঘরের চাল তার ওপর পড়ে। ক্যাশবাক্সে ছিল ছয় টাকা সাত আনা।
বাকি তিনজন শিশু। ভরদ্বাজের তিন মেয়ে- সুশিলা, সরাজুবালা এবং দুৰ্গা। উদ্ধারের পর দেখা যায় তিনবোন জড়াজড়ি করে আছে।
বান্ধবপুরে বুনকা বুনকা ধোঁয়া উড়ছে। আগুন জ্বলছে। কিছু জায়গায় এখনো আগুন নেভানোর চেষ্টা হচ্ছে। ধনু শেখ আগ্রহ নিয়ে আগুনের খেলা দেখছেন।
