আরো একজন আগুনের খেলা দেখছেন তার গোপন বাংকারে বসে। তার নাম হিটলার। হিটলারের সামনে বৃদ্ধ এক জিপসি। সে দেয়াশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বালিয়ে ভবিষ্যৎ বলতে পারে। জিপসির নাম ইয়ান’র। তার চেহারা সাধু সন্তের মতো। লম্বা দাড়ি, লম্বা চুল। ঘন নীল চোখ।
ইয়ান’র একের পর এক কাঠি জ্বালাচ্ছে। কাঠির দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে। দাড়িতে হাত বুলাচ্ছে। নিজের মনে বিড়বিড় করছে। তার সামনে বিশ্বের অতি ক্ষমতাধর একজন বসে আছে। এই ঘটনা তাকে তেমন আলোড়িত করছে বলে মনে হচ্ছে না।
হিটলার দেয়াশলাইয়ের কাঠির আগুনে জার্মান বাহিনীর ভবিষ্যৎ দেখতে চাচ্ছেন। ভবিষ্যৎ দেখা খেলা তার পছন্দের। টেরাট কার্ড দিয়ে ভবিষ্যৎ বলার কিছু পদ্ধতি তিনি নিজেও জানেন। কার্ড দেখে যুদ্ধে জার্মানির ভবিষ্যৎ বলার খেলা মাঝেমধ্যে তিনি তার বান্ধবী ইভা ব্ৰাউনের সঙ্গে খেলেন।
হিটলার বললেন, কী দেখলে?
জিপসি শিতল গলায় বলল, বরফ পড়ছে।
শীতকালে বরফ পড়বে। শীতকালে আকাশ থেকে কমলা বৃষ্টি হবে না। ভালো করে দেখে বলো, রাশিয়াতে আমার বাহিনীর অবস্থা কী?
বরফ পড়ছে। জার্মানবাহিনী বরফের কাছে পরাজিত।
হিটলার বললেন, বরফ শুধু জার্মানবাহিনীর ওপর পড়ছে না। রুশদের ওপরও পড়ছে।
জার্মানবাহিনী বরফের হাতে পরাজিত। রুশবাহিনী না, রুশরা বরফের সঙ্গে পরিচিত।
তোমার দেশ কোথায়?
আমি জিপসি। আমার কোনো দেশ নেই।
জন্মেছ। কোথায়?
মস্কোর কাছে, ভলগা নদীর তীরে।
জার্মানবাহিনী রুশদের কঠিন শিক্ষা দিয়েছে, এই গল্প তুমি জানো। জার্মানদের প্রতি ক্রোধের কারণে জার্মানবাহিনী সম্পর্কে এধরনের কথা বলছে।
আমি জিপসি, কারো প্রতি আমার কোনো ক্ৰোধ নেই।
হিটলার উঠে দাঁড়ালেন। জিপসি তখনো বসে। এখনো তার হাতে দেয়াশলাইয়ের কাঠি। হিটলার নির্দেশ দিলেন ইহুদিদের সঙ্গে জিপসিদেরও যেন নির্মূল করা হয়। আধুনিক জার্মানি হবে ইহুদি এবং জিপসিমুক্ত।
লেনিনগ্রাদ অবরুদ্ধ। জার্মানরা এই শহরকে একটা মৃত শহরে পরিণত করেছে। চব্বিশ ঘণ্টাই কামানের গোলাবর্ষণ হচ্ছে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী রেলস্টেশন তিখভিন্ন জার্মানদের দখলে। বোমা এবং কামানের আঘাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি মোটামুটি ধ্বংস। শহরে খাদ্য নেই বললেই হয়। কলকারখানার শ্রমিকরা গ্রিজ, কারখানার তেল খাচ্ছে। কাঠের গুড়ি দিয়ে রুটি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। ক্ষুধার্তা মানুষজন কুকুর-বিড়াল সিদ্ধ করে খাচ্ছে। নরমাংস খাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
অবিরাম তুষারপাত হচ্ছে। বসতবাড়িতে বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে না। সামান্য বিদ্যুৎ যা তৈরি হচ্ছে চলে যাচ্ছে কলকারখানাতে। শীতে জমে যাওয়া মানুষজন ঘরের কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র পুড়িয়ে চেষ্টা করছে শরীর উষ্ণ রাখতে। শহরে শিশুখাদ্য শেষ। কর্তৃপক্ষ প্রতিটি শিশুর জন্যে সপ্তাহে ছয়গ্রাম চিনি বরাদ্দ করেছেন। সেই চিনির জন্যে দীর্ঘ লাইন।
জার্মানরা শহরটিতে কোনো খাদ্য আসতে দিচ্ছে না। সব পথ বন্ধ। একটা পথ অবশ্যি খোলা আছে। লাগোদা হ্রদের ওপর দিয়ে ট্রাকে করে খাদ্য নিয়ে আসা। ট্রাক আসার জন্যে হ্রদের পানি জমে কম করে হলেও দু’শ মিলিমিটার পুরো হতে হবে। তার জন্যে আরো তুষারপাত প্রয়োজন। বন্দি লেনিনগ্রাদবাসী শীতে কাঁপতে কাঁপিতে প্রার্থনা করছে আরো দুর্দান্ত শীতের। তুষারপাতের। যেন লাগোদা হ্রদ, জমে লোহার মতো শক্ত হয়ে যায়।
২৬ নভেম্বর (১৯৪২) আটটা ট্রাক লেনিনগ্রাদ থেকে বের হয় এবং লাগোদা হ্রদ পার হয়ে খাদ্য নিয়ে শহরে ফিরে আসে। খাদ্যের পরিমাণ ৩৩ টন।
একই সঙ্গে জাবেরি নামের শহরের সঙ্গে লেনিনগ্রাদের যোগাযোগের জন্যে রাস্তা বানানো হয়। জাবেরি থেকে খাদ্য আনার ব্যবস্থা। মাত্র ২৭ দিনে তৈরি হয় দুশ মাইল রাস্তা। এই সড়কই বিখ্যাত ‘রোড টু লাইফ’। ডিসেম্বরের ছয় তারিখ তিনশ’ ট্রাক খাদ্য নিয়ে লেনিনগ্রাদের দিকে যাত্রা করে।
রুশরা জার্মানদের হাত থেকে দখল করে নেয় রেলস্টেশন তিখাভিন। রুশবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে জার্মানির ওপর।
জার্মানদের পরাজয়ের স্বাদগ্রহণের পালা শুরু হয়।
জুলেখা কলিকাতা বেতার ভবনে
জুলেখা কলিকাতা বেতার ভবনের একটা ঘরে অনেকক্ষণ হলো বসে আছে। ঘরটির বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা— মহিলাদের বিশ্রাম কক্ষ। তিন-চারজন পুরুষ মানুষকে দেখা যাচ্ছে। তারা আসছে যাচ্ছে।
ঘরের মেঝেতে ফরাস পাতা। হারমোনিয়াম তবলা আছে। হারমোনিয়ামের পাশেই বিরাট এক পিকদান। কেউ কেউ পানের পিক ফেলার জন্যেই ঘরে ঢুকছেন। পিক ফেলে চলে যাচ্ছেন।
জুলেখা এসেছে, আজ তাকে একটি গানের সুর দেখিয়ে দেয়া হবে। সে গলায় গান তুলবে। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ইসলামি গান। ইসলামি গানের এখন খুব কদর হয়েছে। ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ গানটির রেকর্ড আছে সব মুসলমানের বাড়িতে। আব্বাসউদ্দিনের সুরেলা গলা এইক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
জুলেখা যে গান গাইবে তার কথা—
ভালোবাসা পায় না যে জন
রসুল তারে ভালোবাসে।
উম্মতেরে ছেড়ে কভু
বেহেশতে যায় না সে।।
যে জন বেড়ায় পিয়াস লয়ে
দ্বারে দ্বারে নিরাশ হয়ে
সবুরেরি মেওয়া নিয়ে
নবীজি তার সামনে আসে।।
যে খেটে খায় হালাল রুজি
তারি দুনিয়াদারি
মোর নবীজি কমিলিওয়ালা
সহায় যে হন তারি
সংসারে যে নয় উদাসীন
খোদার কাজে যে রাহে লীন
রসুল তারে বক্ষে বাঁধেন
রহমাতেরি বাহুর পাশে।
