করিম বললেন, আর বলতে হবে না। মাশাল্লাহ। আপনার জ্ঞানে আমি মুগ্ধ। আসেন কোলাকুলি করি।
মোহাম্মদ সিদ্দিক বললেন, আপনার সঙ্গে আমি কোলাকুলি করব না। আপনার শরীর এবং কাপড় নোংরা। আপনি কতদিন গোসল করেন না কে জানে।
শীতের কারণে গোসল করতে পারতেছি না। তাছাড়া সাবানও নাই। সাবান ছাড়া গোসল করে ফয়দা কী?
সিদ্দিক বললেন, আমি গরম পানি আর সাবানের ব্যবস্থা করলে গোসল করবেন? গোসল করা উচিত। আমাদের নবী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।
গরম পানি কোথায় পাবেন?
আমি ব্যবস্থা করব।
গোসলের পর পারব কী?
আমি লুঙ্গি, পাঞ্জাবির ব্যবস্থা করব।
করিম বেশকিছু সময় চিন্তা করে বললেন, গোসল করতে রাজি আছি।
মোহাম্মদ সিদ্দিক গরম পানির সন্ধানে গেলেন। গরম পানি, সাবান, পরিষ্কার ধোয়া কাপড় নিয়ে ফিরে এসে দেখোন— করিম নেই।
সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রথমে গুড়িগুড়ি কুয়াশার মতো পড়ছিল। যতই রাত বাড়তে লাগল বৃষ্টিও বাড়তে লাগল। একসময় শিল পড়তে শুরু করল। শীতের দিনে এমন শিলাবৃষ্টি অনেক দিন এই অঞ্চলে হয় নি। ধনু শেখ আগ্ৰহ নিয়ে শিলপাড়া দেখছেন। পা ভালো থাকলে ছোটবেলার মতো শিল কুড়াতেন। মাটির গোল সরায় শিল জমা করতেন। কিছুক্ষণ পর সারা ভাঙলে পাওয়া যেত বরফের গোল বল। ধনু শেখ ডাকলেন, সদরুল।
সদরুল দৌড়ে এলো।
ধনু শেখ বললেন, আমি আবছামতো দেখেছি করিম কদম গাছের নিচে দীড়য়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজতেছে। মাথার মধ্যে শিল পড়তেছে।
তাড়ায়া দিয়া আসি? যদি বলেন বাড়ি দিয়া ঠ্যাং ভাঙ্গব। বড় ত্যক্ত করতেছে।
ধনু শেখ বললেন, না। তারে ধইরা নিয়া আসি। সাবান ডাইল্যা গরম পানি দিয়া গোসল দেও। শুকনা কাপড় দেও। আইজ তারে সঙ্গে নিয়া খানা খাব। তারে দেইখা হঠাৎ মায়া লাগল।
সদরুল বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল।
ধনু শেখ বললেন, এইভাবে তাকায়া আছ কেন? আমার কথা বুঝতে পার নাই?
বুঝেছি।
তাহলে দৌড় দেও।
সদরুল কদম গাছের দিকে ছুটে গেল।
করিম জলচৌকিতে বিপ্লাম ধরে বসে আছে। সদরুল তার গায়ে সাবান ডলছে। অন্য একজন লোটায় করে মাথায় পানি ঢালছে। করিম লজ্জায় মরে যাচ্ছে। খালি গায়ে তাকে গোসল দেয়া হচ্ছে- এই কারণে লজ্জা না। আতর নামের মেয়েটা দূর থেকে তাকে দেখছে এটাই লজ্জা। খুন করার তালিকায় এই মেয়েটা আছে কি-না করিম মনে করতে পারছে না। মনে হয় আছে। মেয়েটাকে সে একটা চিঠি দিয়েছিল। চিঠিটা সে শরিফাকে দেয় নি। যদি দিত অবস্থা ভিন্ন হতো। এই অপরাধ গুরুতর। এই অপরাধের জন্যে অবশ্যই তাকে খুন করা যায়। তবে এ মেয়েছেলে এবং বয়স অল্প। অল্পবয়েসি মেয়েছেলের কারণে তাকে কি ক্ষমা করা যায়? করিম চিন্তা করে কূল পাচ্ছে না।
আতর আজ তার বাবার কিছু অপরাধ ক্ষমা করেছে। বাবা যে মমতা ইমাম করিমকে দেখিয়েছে সেই মমতার হয়তো অন্য অর্থ আছে। কিন্তু এই মুহুর্তে মমতাটাই চোখে পড়ছে। অন্যকিছু না। আতর ছাতি মাথায় দিয়ে শিল কুড়াতে শুরু করল।
করিম মুগ্ধ হয়ে আতরের শিল কুড়ানো দেখছে। শরিফাও শিল কুড়ান্ত। গ্লাসে জমা করে রাখত। শরিফার একটা কাজ আতর করছে, এইজন্যে করিম আতরকে ক্ষমা করে দিল। এবং কোমল গলায় বলল, আম্মাজি, ভালো আছেন? আতর বলল, এখন থেকে আপনি আমাদের বাড়িতে থাকবেন। পথেঘাটে ঘুরবেন না।
করিম বলল, কেন?
আতর বলল, আপনি আমাকে আম্মাজি ডেকেছেন এইজন্যে।
করিমের চোখে পানি এসে গেছে। তার মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে বলে চোখের পানি আলাদা করা যাচ্ছে না।
শীতে ধনু শেখের শরীর জমে যাচ্ছে। বিলাতি পানিতে শীত কমবে। একা একা এই পানি খেয়ে মজা নাই। রঙিলা বাড়িতে যাওয়া যায়। ঝড়বৃষ্টিতে পথ কাদা হয়ে আছে। পাল্কি বরদাররা পা পিছলে পালকি নিয়ে পড়লে অবস্থা কাহিল হবে। ধনু শেখ কী করবেন মনস্থির করতে পারছেন না। রঙিলা বাড়িতে গেলে শরিফার সঙ্গে দেখা হবে। এর আলাদা আনন্দ। নতুন জায়গায় মেয়েটা কেমন আছে স্বচক্ষে দেখা। তার ঘটনা কী জানা! ধনু শেখ ডাকলেন, সদরুল।
সদরুল ছুটে এলো।
শীত কেমন নামল বলো দেখি?
ভালো নামছে।
বুড়াবুড়ি যা আছে। এই শীতে শেষ হবে কি-না বলো? শীত হলো বুড়া মারার কাল। ঠিক বলেছি না?
অবশ্যই ঠিক বলেছেন।
আমি নিজেও তো বুড়ার দলে। শীতে আমারও মরণের কথা।
আপনে কী যে কিনা!
ধনু শেখ বললেন, আমার শীত কমানোর ব্যবস্থা কর। শীত না কমলে আমি শেষ।
সদরুল মাথা চুলকাচ্ছে। শীত কীভাবে কমাবে বুঝতে পারছে না। সে ইতস্তত করে বলল, আগুন করব?
ধনু শেখ বললেন, এটা মন্দ না। শীতের আসল ওষুধ আগুন। বড় করে আগুন কর, কয়েকটা হিন্দু বাড়ি জ্বালায়া দাও।
সদরুল বলল, কথাটা বুঝলাম না।
ধনু শেখ বললেন, কথা না বুঝার কী আছে? সব জায়গায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চলতেছে। এইখানে কিছুই নাই। হিন্দুস্থান পাকিস্তান ভাগাভাগি যখন হবে, তখন দেখা যাবে বান্ধবপুর পড়েছে হিন্দুস্থানে। সেটা ভালো হবে?
জে না।
হিন্দু কিছু কমাইতে হবে। ভোটাভুটিরও ব্যাপার আছে। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন কিছু হিন্দু কমে, কিছু দেশ ছাইড়া পালায়। আইজ আগুন দেওয়া সমস্যা। বৃষ্টিতে সব ভিজা।
ধনু শেখ হতাশ গলায় বললেন, তোমরার বুদ্ধি গরু-ছাগলের বুদ্ধি। পেট্রল ঘরে রাখা আছে না? পানির সাথে মিশলে পেট্ৰল ভালো জ্বলে। বুঝেছ?
