শরিফা বলল, ভাটির দেশে যাই। ভাটির দেশে আমার স্বামী থাকে। তার সাথে ঘর করতে যাই।
তোমার স্বামী আবার কে? আমি তোমার স্বামী।
উঁহু। আপনে আমার কেউ না।
করিম বলল, তোমারে একটা কথা বলব?
শরিফা বলল, আপনের কথা ব্যাঙের মাথা।
করিম মাধাই খালের পাড়ে বসে আছে, একটু পরপর বিড়বিড় করে বলছে, আপনের কথা ব্যাঙের মাথা। করিম বুঝতে পারছে তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একই কথা অসংখ্যবার বলা মাথা খারাপের প্রথম লক্ষণ।
মাথা খারাপ মানুষদের জন্যে অনেক সুবিধা আছে। তাদের জন্যে নামাজ রোজা মাফ। তারা খুন করলেও খুনের বিচার হবে না। একটা খুন করলে না, দশটা খুন করলেও না।
করিম ঠিক করে রেখেছে, পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে সে কয়েকটা খুন করবে। পুরোপুরি পাগল সে এখনো হয় নাই। পুরোপুরি পাগল হলে গায়ে কাপড় রাখতে পারত না। পাগলের শীত-গ্ৰীষ্ম বোধ থাকে না। তার এখনো আছে। গা থেকে কম্বল খুলে দেখেছে। শীত লাগে। পানিতে নামলে শীত লাগে। শীতের কারণে সে গোসল বন্ধ করে দিয়েছে।
করিম উঠে দাঁড়াল। ক্ষুধাবোধ হচ্ছে। কিছু খাওয়া দরকার। সে লাবুসের বাড়ির দিকে রওনা দিল। যাদের সে খুন করবে। সেই তালিকায় লাবুসের নাম আছে, তারপরেও সে যায়। হাদিস উদ্দিন তাকে দেখলেই বলে— ইমাম সাব, কিছু খাবেন? হাত ধুইয়া আসেন, খানা দেই।
হাত ধুইতে পারব না, তুমি খানা দাও। হাত ধুইতে গেলে শীত লাগবে।
ময়লা হাতে খাইবেন?
মাথায় হাত মুইছা খাব। অসুবিধা নাই। পাগলের জন্যে সব মাপ।
করিম লাবুসের বাড়ির কাছাকাছি এসে মত বদলাল। ক্ষুধাটা চলে গেছে। যেহেতু ক্ষুধা নাই ওই বাড়িতে যাওয়ার প্রশ্ন উঠে না। সে জুম্মাঘরের দিকে রওনা হলো। নতুন ইমাম এসেছে, তার সঙ্গে এখনো পরিচয় হয় নাই। পরিচয় থাকা উচিত। তাছাড়া ইমাম নতুন মানুষ। তাকে পরামর্শ দেওয়াও করিমের কর্তব্য। তাকে অঞ্চলের হাবভাব বুঝিয়ে দিতে হবে। নতুন মানুষ বিপদে যেন না পড়ে। একেক অঞ্চলের ভাব একেক রকম। রঙিলা নটিবাড়ির বিষয়টাও ইমাম সাহেবকে বুঝিয়ে দিতে হবে। ভুলেও যেন সেদিকে না যায়। যাওয়া দূরের কথা, ওইদিকে তাকালেও বিরাট পাপ হবে। হাবিয়া দোজখের আগুনে পুড়ে মরতে হবে। নতুন ইমাম সাহেবের জ্ঞান বুদ্ধি, হাদিস কোরানের ওপর দখল কেমন এগুলোও দেখতে হবে। আজান দিয়া নামাজ পড়াতে পারলেই ইমাম হওয়া যায় না।
ডিসট্রিক্ট বোর্ডের সড়কে উঠতে গিয়ে করিম ভুরু কুঁচকে তাকাল। মনিশংকরের ছেলে শিবশংকর আসছে। করিম দ্রুত চিন্তা করল, খুন করার তালিকায় এই ছেলে আছে কি-না।
না, এই ছেলের নাম নেই। করিম হাসিমুখে এগিয়ে গেল। খুনের তালিকায় যাদের নাম নেই, তাদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করা উচিত। করিম বলল, বাবা, কেমন আছ?
শিবশংকর বলল, বেশি ভালো না কাকু। আমার রোজ জ্বর আসছে।
ম্যালেরিয়া হয়েছে। কুইনাইন খাওয়া দরকার।
কুইনাইন খাচ্ছি।
বিসমিল্লাহ বলে খাও না তো? বিসমিল্লাহ বলে খেলে কাজ হবে না। ওষুধপত্র খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলা নিষেধ। তখন বলতে হয় আল্লাহু শাফি। আল্লাহু কাফি।
কাকু, আমি হিন্দু।
সেটা তো জানি। জানিব না কেন? পুরাপুরি পাগল তো হই নাই। যেদিন হব সেদিন হিন্দু-মুসলমান ভেদ থাকবে না। তখন আমার কাছে হিন্দুও যা, মুসলমানও তা।
শিবশংকর দুঃখিত চোখে তাকিয়ে আছে। করিম বলল, বাবা এখন যাই। পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব। যদিও আমার কথা হলো ব্যাঙের মাথা। শরিফা এরকম বলে। শরিফাকে চিনেছ তো? আমার স্ত্রী। সম্পর্কে তোমার চাচি হয়। এখন সে আছে। রঙিলা নটিবাড়িতে। ঠিক করেছি একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে যাব। টাকা-পয়সার জোগাড় হচ্ছে না বলে যেতে পারছি না। তাড়াহুড়াও কিছু নাই। তোমার চাচি তো আর পালায়া যাচ্ছে না। রঙিলাবাড়িতে একবার কেউ ঢুকলে পালাতে পারে না। বাকি জীবন ওইখানে কাটাতে হয়।
নয়া ইমাম মোহাম্মদ সিদ্দিকের জ্ঞান-বুদ্ধিতে করিম সন্তুষ্ট হলো। সব প্রশ্নের জবাব নতুন ইমাম ঠিকঠাক দিলেন। করিম এতটা আশা করে নি।
করিম বলল, ইমাম সাহেব, বলেন দেখি হাবুতি সনটা কী? বাংলা সন, হিজরি সনের কথা সবাই জানে। হাবুতি সনের কথা জানে জ্ঞানীজন। চট করে বলেন হাবুতি সন কী?
মোহাম্মদ সিদ্দিক বললেন, হযরত আদম (আঃ)-এর বেহেশত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের দিন থেকে হাবুতি সন শুরু।
করিম বললেন, হয়েছে। মাশাল্লাহ। এখন বলেন নবীদের মধ্যে সবচে’ দীর্ঘ আয়ু কে পেয়েছেন, স্বল্প আয়ু কে পেয়েছেন?
সবচে’ দীর্ঘ আয়ু পেয়েছেন দুই নবী। হযরত নুহ (আঃ) এবং হযরত আয়ুব (আঃ), দুইজনই ১৪০০ বছর বেঁচেছেন। আর অল্প আয়ু পেয়েছেন দুইজন। হযরত ঈসা (আঃ), উনি বেঁচেছেন মাত্র ৩৩ বৎসর। আমাদের প্ৰাণপ্ৰিয় নবী হযরত মোহাম্মদও (দঃ) অল্প আয়ু পেয়েছিলেন। তিনি বেঁচেছেন মাত্র ৬৩ বৎসর।
মাশাল্লাহ। শেষ প্রশ্ন, এটা না পারলেও ক্ষতি নাই। হযরত আদমের বংশধরদের তালিকা বলেন। নবী বংশ বললেই হবে।
মোহাম্মদ সিদ্দিক চোখ বন্ধ করে তালিকা বলা শুরু করলেন—(এই তালিকার সঙ্গে লুক লিখিত সুমাচারের অদ্ভুত মিল আছে। শুধু কিছু নামের বানান ভিন্ন। —লেখক)
(১) হযরত আদম (আঃ) (২) হযরত শীশ (আঃ) (৩) হযরত ইয়াসিন (আঃ) (৪) হযরত কইনান (আঃ) (৫) হযরত মাহিলীল (আঃ) (৬) হযরত ইয়ারত (আঃ) (৭) হযরত ইদরিস (আঃ) (৮) হযরত আখিমুখ (আঃ) (৯) হযরত শালিখা (আঃ) (১০) হযরত লামক (আঃ) (১১) হযরত নুহ (আঃ) (১২) হযরত সাম (আঃ) (১৩) হযরত আরাফাক শাম (আঃ)
