শ্ৰীনাথ মূর্তি চুরির বিষয়ে কথা বলার জন্যে ধনু শেখের কাছে গিয়েছে। মূর্তি কে নিয়েছে শ্ৰীনাথ জানে। ধনু শেখের মতো ক্ষমতাবান মানুষ ছাড়া তা উদ্ধার করা যাবে না।
ধনু শেখ তামাক টানতে টানতে বললেন, মূর্তি কে চুরি করেছে তুমি জানো?
শ্ৰীনাথ গলা নামিয়ে বলল, অবশ্যই জানি। লাবুসের ইশারায় চুরিটা হয়েছে। চুরি করেছে ল্যাংড়া হাদিস উদ্দিন।
ধনু শেখ বললেন, গলা নামায়া কথা বলতেছ। কেন? আশেপাশে তো কেউ নাই।
শ্ৰীনাথ বলল, আপনি ব্যবস্থা না নিলে জিনিস উদ্ধার হবে না।
ধনু শেখ বললেন, শুনেছি। রাধাকৃষ্ণ বিরাট দেবদেবী। তারা নিজেরা নিজেদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে পারে না? ধনু শেখের সাহায্য লাগে?
শ্ৰীনাথ বলল, দেবদেবীরা তাদের ক্ষমতা সর্বসাধারণে দেখান না। নিজেদের কাজ অন্যকে দিয়ে করায়ে নেন। উদ্ধারের কাজটা যেমন আপনার মাধ্যমে হবে।
ধনু শেখ তামাক টানা বন্ধ করে হঠাৎ গভীর ভঙ্গিতে বললেন, শশাংক পালের ভূত দেখার গল্পটা তো তুমি শেষ কর নাই। গাছে বসে ছিল ভূত। তুমি বাকি দিয়া ফেললা। তারপরে কী হলো?
শ্ৰীনাথ বলল, ওই গল্প আরেকদিন শেষ করব। আপনি মূর্তির মীমাংসাটা করেন। হাদিস উদ্দিন বদমাইশটা নিয়েছে।
বুঝলা কীভাবে?
পায়ের ছাপ দেইখা বুঝতে পেরেছি। যে চুরি করতে এসেছে তার পায়ের ছাপা পড়েছে। একপায়ের ছাপা গভীর। আরেকটা পাতলা। খোড়া পায়ের ছাপ পাতলা।
ধনু শেখ চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, পায়ের ছাপের কারণেই আমি চুরি করতে বাইর হই না; আমি যেখানেই যাব এক ঠ্যাং-এর ছাপ পড়বে। তোমার মতো বুদ্ধিমান লোক সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলবে চোর ধনু শেখ।
শ্ৰীনাথ দুঃখিত গলায় বলল, জনাব, আপনি পুরা বিষয়টা নিয়া হাসি। তামাশা করতেছেন। এটা হাসি তামাশার কোনো বিষয় না। শুধু যে মূর্তি চুরি করেছে তা-না। হিন্দু জাতিরে বিরাট অপমানও করেছে।
কীভাবে অপমান করেছে?
দুটা কাঁচকলা রেখে গেছে।
ধনু শেখ বললেন, কাঁচকলার মধ্যে অপমানের কী আছে? হিন্দু বিধবারে কলা দুইটা দেও, তারা বড়া বানায়ে খেয়ে ফেলবে।
বিষয়টা নিয়া যে কত বড় সমস্যা হবে। আপনি তা বুঝতে পারতেছেন না। রঙ্গতামাশা করতেছেন। এটা রঙ্গতামাশার বিষয় না।
ধনু শেখ বললেন, এখন তুমি পথে আসছি। রঙ্গতামাশার বিষয় তো অবশ্যই না। মূর্তি চুরি নিয়া হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বাধতে পারে। বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু মুসলমান কাটাকাটি যে শুরু করেছে এটা শুনেছ? মুসলমান পিঁয়াজ খায়, গরু খায়, এইজন্যে কাটাকাটিতে সে আগায়া আছে। এই অঞ্চলে হিন্দু যদিও বেশি, কাটাকাটি শুরু হইলে দেখবা কী অবস্থা।
শ্ৰীনাথ উঠে পড়ল। এই লোকের সঙ্গে কথা বলতে আসাই তার ভুল হয়েছে। উন্মাদশ্রেণীর মানুষ। কী বলে না বলে সে নিজেও জানে না। ধনু শেখ বললেন, বেয়াদবের মতো হুট কইরা উঠে দাড়াইলা, তার কারণ কী?
শ্ৰীনাথ বলল, আমার কথা শেষ, আমি চইলা যাব। বুঝেছি আপনার এখানে কোনো ফয়সালা হবে না।
কে বলেছে। ফয়সালা হবে না? অবশ্যই ফয়সালা হবে। আচ্ছা শ্ৰীনাথ, এই মূর্তি তোমরা পাইছ কই? হরিচরণের ঠাকুরঘরে এমন মূর্তি ছিল। আমি নিজে অনেকবার দেখেছি।
শ্ৰীনাথ হড়বড় করে বলল, আমাদেরটা দেখতে একই রকম, কিন্তু মূর্তি ভিন্ন।
ধনু শেখ বললেন, তা হতে পারে। মানুষও একই চেহারার প্রায়ই পাওয়া যায়। এম এস বাহাদুর নামে আমার একটা লঞ্চ ছিল। সেখানে পাঁচক বামুন যে ছিল তার চেহারা অবিকল তোমার মতো। বিরাট চোর ছিল। একদিন তারে একশবার কানে ধরে উঠবোস করতে বললাম। বিশবার উঠবোস করে সে ধপাস করে পড়ে গেল। মিনমিন করে বলল, কর্তা আর পারব না। শ্ৰীনাথ শোন, মনের ভুলে কোনদিন যে তোমারেও উঠবোস করাই তার নাই ঠিক। একই রকম চেহারার কারণে ভুল হইতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। ভালো কথা, শ্ৰীনাথ, তোমরার দেবদেবীরা ভুল করেন না?
শ্ৰীনাথ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। ধনু শেখের কাছে আসা বিরাট ভুল হয়েছে। তার উচিত ছিল মন্দিরের কাছে থাকা। রাজমিস্ত্রিদের কাজ তদারক করা। মন্দির নির্মাণ বন্ধ হয় নি। কাজ পুরোদমে চলছে।
ধনু শেখ বললেন, বেশি চালাক হওয়া ঠিক না শ্ৰীনাথ। আমি বেশি চালাক হয়েছিলাম, আমার ঠ্যাং চলে গেছে। ইমাম করিম বেশি চালাক হয়েছিল, তার বউ চলে গেছে। তোমার কী যায় কে জানে।
শ্ৰীনাথ বলল, আমার যাওয়ার মতো কিছু নাই।
তাও ঠিক। এখন গল্পটা শেষ কর।
কী গল্প?
শশাংক পালের গল্প। এত বড় জমিদার ভূত হইয়া গাছে বসা। কী লজ্জার কথা! তারপর তুমি কী করলা? ঝাঁকি দিয়া ভূত পাড়লা? ভূত ধুপ্পুস কইরা মাটিতে পড়ল?
ইমাম করিম মাধাই খালের পাড়ে বসে আছে। সকাল থেকেই এই জায়গায় বসে ছিল। এখন মধ্যদুপুর। কাল রাতে সে স্বপ্নে দেখেছে, কলার ভেলায় করে শরিফা খাল বেয়ে আসছে। শরিফার পরনে সুন্দর শাড়ি। বোরকা হাতে পুঁটলি পাকিয়ে ধরা। মাথায় ঘোমটাও দেয় নাই। করিম বলেছে, ছিঃ ছিঃ শরিফা, এইসব কী? বোরকা হাতে নিয়া বইসা আছ কেন? কতজন তোমারে দেখবে!
শরিফা বলল, দেখুক।
করিম বলল, এটা কেমন কথা বললা? সারাজীবন তোমারে পর্দা পুশিদার কথা বলছি।
শরিফা বলল, আপনের কথা ব্যাঙের মাথা। ভেলায় উঠেন দেখি।
করিম স্বপ্লের মধ্যেই ভেলায় উঠলেন। ভেলাটা তখন নৌকা হয়ে গেল। স্বপ্নে এই ব্যাপারগুলি এমনভাবে ঘটে যে মোটেই অস্বাভাবিক লাগে না। করিম বলল, আমরা যাই কই?
