রাধাকৃষ্ণের এই মূর্তি হরিচরণের পরিবার পূজা করতেন। অষ্টধাতুর মূর্তি। চোখ ফেরানো যায় না। এত সুন্দর।
মূর্তিটি যে চুরি গেছে। লাবুসকে এই খবর দেয়া হয়েছে। খবর দিয়েছে হাদিস উদ্দিন। হাদিস উদ্দিন উত্তেজিত এবং দুঃখিত।
ছোটকৰ্তা, আমি হইলাম ওস্তাদ দরবার মিয়ার সাগরেদ। আমার চোখের সামনে জিনিস চুরি গেল। আমি কিছু বুঝলাম না। এই খবর শুনলে দরবার মিয়া আমার মুখে ‘ছেপ’ দিবেন।
লাবুস বলল, দরবার মিয়া যেহেতু শুনছেন না। কাজেই তোমাকে মুখে ছেপ মাখতে হবে না।
আইজ না শুনলেন, কোনো একদিন তো শুনবেন। তখন কী উপায় হবে?
লাবুস বলল, একটা কিছু উপায় নিশ্চয়ই হবে। শান্ত হও।
ঘরের এমন দামি একটা জিনিস চুরি যাবে, আপনি কিছুই বলবেন না?
লাবুস বলল, চুরি তো যায় নাই। চোখের সামনেই থাকবে। মূর্তি দেখে সবাই আনন্দ পাবে।
হাদিস উদ্দিন বলল, কই আমি তো কোনো আনন্দ পাইতেছি না। আমার তো শইল জুইল্যা যাইতেছে। কপাল দিয়া গরম ভাপ বাইর হইতেছে।
লাবুস হাই তুলতে তুলতে বলল, সময়ে জুলুনি কমবে। এখন সামনে থেকে যাও।
সন্ধ্যাবেলা ধুমধামের সঙ্গে দেবীমূর্তি মঞ্চে স্থাপিত হলো। দেবীকে নৈবেদ্য দেয়া হলো। ভক্তরা প্ৰসাদ পেলেন। প্ৰায় সারারাত নাম জপ হলো। ভোরবেলা দেখা গেল কে বা কারা মূর্তি চুরি করে নিয়ে গেছে। শুধু যে মূর্তি চুরি করেছে তা-না, যেখানে মূর্তি ছিল সেখানে এক তাল কাদা রেখে গেছে। কাদার ওপর দুটা কাঁচকলা পাশাপাশি বসানো।
হাদিস উদ্দিনকে সকাল থেকেই খুব উৎফুল্ল দেখা গেল। সে নামাজ রোজার ধার ধারে না, কিন্তু সেদিন দুপুরে সে গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে মসজিদে জোহরের নামাজ পড়তে গেল। মসজিদে নতুন ইমাম সাহেব এসেছেন। শ্যামগঞ্জের আলীম পাশ বিরাট মাওলানা, নাম মোহাম্মদ সিদ্দিক। নতুন ইমাম কেমন তা জানা প্রয়োজন।
মোহাম্মদ সিদ্দিকের বয়স অল্প। সুন্দর চেহারা। গলার স্বর মিষ্টি। সমস্যা একটাই— তার দাড়ি নেই। ইমাম সাহেবের দাড়ি না থাকলে কীভাবে হবে? ইমামের চাকরি দিতে গিয়ে ধনু শেখ থমকে গেলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, দুনিয়ার ইসলামি পাশ দিয়া বইসা আছ, তোমার দাড়ি কই?
ইমাম মাথা নিচু করে বলল, আমাদের বংশে দাড়ি নাই জনাব।
দাড়ি ছাড়া মাকুন্দা ইমাম লোকজন মানবে কেন?
সিদ্দিক বিনীত ভঙ্গিতে বলল, দাড়ি রাখা সুন্নত। নবীজির দাড়ি ছিল। যাদের দাড়ি হয় না। তারা এই সুন্নত পালন করতে পারে না। এছাড়া আর কোনো সমস্যা নাই।
ধনু শেখ বললেন, সমস্যা যে নাই সেটা তুমি বলতেছ। সমস্যা তোমার না। সমস্যা আমার। লোকজন বলবে, ধনু শেখ ইচ্ছা কইরা মাকুন্দা নিয়া আসছে। যাই হোক, এসে যখন পড়েছ থাক। মুসুন্ত্রিরা কেউ আপত্তি তুললে সঙ্গে সঙ্গে বিদায়।
আপত্তি তুলবে না।
আগ বাড়ায়া কথা বলবে না। আপত্তি তুলবে না। তুমি জানো কীভাবে?
ইমাম সিদ্দিক চুপ করে রইল। ধনু শেখ বললেন, খাওয়া থাকা আমার বাড়িতে। বেতন দশ টাকা।
ঠিক আছে জনাব। তবে আপনার বাড়িতে থাকব না। রাতে মসজিদে থাকব।
মসজিদে কেন থাকবে?
আমি রাতে ইবাদত বন্দেগি করি। মসজিদে থাকা আমার জন্যে ভালো।
ধনু শেখ বললেন, তোমার জন্যে ভালো হলে ভালো। থাক মসজিদে, তবে সাবধানে থাকবা। এই মসজিদের কিছু দোষ আছে।
কী দোষ?
এই মসজিদের ইমামদের কিছুদিন পরই মাথা নষ্ট হয়ে যায়। ইমাম ইদরিস ছিল। মাথা হয়ে গেল পুরাপুরি নষ্ট। বাজারের এক মেয়েছেলে বিবাহ করল। এখন যে সে কোথায় আছে। কেউ জানে না। তারপরে আসল করিম। বিরাট মাওলানা। সে এখন আধাপাগল হয়ে ঘুরতেছে। খবর পেয়েছি নিচুজাতের সঙ্গে এখন তার উঠাবাসা। তারা চোলাই মদ বানায়, সেই মদ খায়া সে শুনেছি। এইখানে সেইখানে পড়ে থাকে।
উনার কথা শুনেছি।
ধনু শেখ উগ্র গলায় বললেন, তার কথা শুনলে আমার কথাও নিশ্চয়ই শুনেছ? তার তালাক দেয়া স্ত্রীর সাথে আমার যে বিবাহ হয়েছিল এটা শুনেছি?
জি।
সেই মেয়ে যে রঙিলা নটিবাড়িতে থাকে, এটা শুনেছি?
সিদ্দিক মাথা নিচু করে ফেলল। ধনু শেখ বললেন, মাথা নিচা করলা কেন? তোমার স্ত্রী তো নটিবাড়িতে নাই। শাদি করেছ?
জি-না।
আচ্ছা এখন সামনে থেকে যাও। মিজাজ খারাপ হয়ে গেছে। আরেকটা কথা, আতর মাইখা আমার কাছে আসবা না। আতরের গন্ধে আমার মাথায় যন্ত্রণা হয়।
জোহরের নামাজ পড়তে মুসুল্ল এসেছে মাত্র একজন— হাদিস উদ্দিন। জোহর কাজকর্মের সময়। নামাজি মানুষ এমনিতেই কম আসে। তাছাড়া নতুন ইমাম এসেছে, পাঞ্জেগানা নামাজ আবার শুরু হয়েছে- এই খবর এখনো সবার কাছে পৌঁছে নি।
নামাজ শেষ করে সিদ্দিক হঠাৎ বলল, জনাব, আপনার সঙ্গে যে আল্লাহপাকের দেখা হয়েছিল এটা কি আপনার স্মরণে আছে?
হাদিস উদ্দিন হতভম্ব হয়ে বলল, এটা কী বললেন?
সিদ্দিক হাসিমুখে বলল, না জেনে বলি নাই। জেনে বলেছি।
হাদিস বলল, আপনের মাথা তো আগের দুই মাওলানার চেয়েও খারাপ।
সিদ্দিক খানিকটা ঝুকে এসে বলল, আল্লাহপাক মানুষ সৃষ্টির আগে মানুষের আত্মা সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর তিনি সব আত্মাকে একত্র করে বললেন, বিলো তোমাদের রব কে? আত্মারা সবাই একসঙ্গে বলল, আপনি আমাদের রব। এই কারণেই আপনাকে জিজ্ঞাস করলাম, আল্লাহপাকের সঙ্গে আপনার যে দেখা হয়েছিল। এই ঘটনা ইয়াদ আছে কি-না? সামান্য রহস্য করে বললাম। অপরাধ নিবেন না।
হাদিস উদ্দিন নতুন ইমাম সাহেবের জ্ঞানবুদ্ধিতে এবং বিনয়ে মোহিত হয়ে গেল। সে ঠিক করল, তেমন কোনো কাজকর্ম না থাকলে মাঝেমধ্যে নামাজে আসবে। জীবনযাপন করতে গেলে দুএকটা ছোটখাটো দোষত্রুটি হয়ে যায়। নামাজের মাধ্যমে সে সব কাটান দিতে হয়।
