এই ঘরের খাটে মাওলানা ইদরিসকে শোয়ানো হয়েছে। যমুনার বড়দা বললেন, আমার ঘর বেদখল হয়ে গেল।
যমুনা বলল, বড়দা! পৃথিবীর পাঁচজন শ্ৰেষ্ঠ মানুষের মধ্যে উনি একজন।
পৃথিবীটাকে এত ছোট করে দেখা কি ঠিক?
মধ্যে একজন। উনার অবস্থা ভালো না। সুরেন বলেছে শ্বাসতন্ত্রে জটিল সংক্রমণ হয়েছে। বড়দা, আমি উনাকে এদেশের সবচে’ বড় ডাক্তার দেখাতে চাই। তুমি বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে আসবে।
সর্বনাশ উনাকে কীভাবে আনবে।
যমুনা বলল, কীভাবে আনবে আমি জানি না। তোমাকে আনতে হবে।
বাংলার কিংবদন্তি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় রোগী দেখতে এসেছেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, রোগীর ঘরে পা দেয়া মাত্র তিনি রোগ ধরতে পারেন। রোগীর গা থেকে আসা গন্ধ তাকে রোগ বলে দেয়।
বিধানচন্দ্র বললেন, রোগীর অবস্থা ভালো না। নিশ্চয় রোগীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। রোগীর দুটা বুকেই নিউমোনিয়া, একইসঙ্গে প্রবল ম্যালিরিয়ার সংক্রমণও হয়েছে। নিউমোনিয়ার চিকিৎসা আগে হওয়া দরকার। কিন্তু আমি ম্যালেরিয়াকে আগে ধরব। রোগীকে গরম পানিতে শুইয়ে রাখতে হবে।
যমুনা বলল, উনি বাঁচবেন?
বিধানচন্দ্র বললেন, মা, তুমি বিধানচন্দ্ৰকে এনেছ? রোগী না বাঁচলে বিধানচন্দ্রের মান কি থাকে?
মাওলানা ইদরিস তাকিয়ে আছেন। তাঁর গায়ে কম্বল। খোলা জানোলা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে কম্বলের ওপর। মাওলানা কিছুক্ষণ রোদ দেখলেন, তারপর দৃষ্টি ফেরালেন ঘরের মেঝের দিকে। সেখানে কৃশকায় কৃষ্ণবর্ণের এক যুবক মাটিতে আসন করে এই শীতে খালি গায়ে বসেছে। তার গায়ের পৈতা ঝকঝক করছে।
যুবক একমনে লিখে যাচ্ছে। একসময় এই যুবক লেখা থেকে চোখ তুললেন।
তখনি মাওলানা ইদরিসের সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হলো।
যুবক বললেন, আজ কি একটু ভালো বোধ করছেন? মাওলানা বললেন, জি জনাব। আপনার নাম?
আমার নাম তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়।
কী লিখছেন?
একটা উপন্যাস লিখছি। উপন্যাসের নাম ‘গণদেবতা’। ভারতবর্ষে নামে একটা পত্রিকা আছে সেখানে ধারাবাহিকভাবে বের হয়।
মাওলানা বললেন, আমি গল্প-উপন্যাস কোনোদিন পাড়ি নাই। হাদিস কোরান পড়েছি। কী লিখেছেন একটু পড়ে শুনাবেন?
তারাশংকর বললেন, অবশ্যই।
সোঁ সোঁ শব্দে প্রবল ঝড়। ঝড়ে চালের খড় উড়িতেছে, গাছের ডাল ভাঙিতেছে। বিকট শব্দে ওই কার টিনের ঘরের চাল উড়িয়া গেল। কিছুক্ষণ পরই নামিল ঝমঝম করিয়া বৃষ্টি। দেখিতে দেখিতে চারদিক আচ্ছন্ন করিয়া মুষলধারে বর্ষণ। আঃ পৃথিবী যেন বাঁচিল। ঠান্ডা ঝড়ো হাওয়ায় ভিজা মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধ উঠিতে লাগিল।
নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কমিটির দুর্ভাগ্য, তারা বাংলার এই ঔপন্যাসিকের খোঁজ বের করতে পারেন নি। তাদের পুরস্কারের খাতায় এই মহান কারিগরের নাম উঠে নি।
হে মহান বিশ্ব ঔপন্যাসিক! আপনি মধ্যাহ্নেীর এক সামান্য লেখকের ভক্তি, শ্ৰদ্ধা ও ভালোবাসা গ্ৰহণ করুন।
‘গণদেবতা’ উপন্যাসের জন্যে তারাশংকর ১৯৬৬ সনে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান।
এককড়ি ভোরবেলার কনকনে ঠান্ডায়
এককড়ি ভোরবেলার কনকনে ঠান্ডায় পুকুরে মাথা ড়ুবিয়ে স্নান করেছেন। কোমরে লুঙ্গির মতো পেঁচিয়ে সাদা ধুতি পরে জলচৌকিতে বসেছেন। তাঁর পাশে অবিনাশ ঠাকুর হাতে ঘণ্টা নিয়ে ঘণ্টা বাজাচ্ছেন। অবিনাশ ঠাকুর শাস্ত্ৰজ্ঞ ব্ৰাহ্মণ। তিনি মাঝে মাঝে ঘন্টাধ্বনি বন্ধ করেন। চোখ বন্ধ করে উপনিষদ থেকে শ্লোক আবৃত্তি করেন। দাঁত না থাকার কারণে কথাগুলি জড়িয়ে যায়। মন্ত্র অদ্ভুত শোনায়।
ওঁ আপ্যায়ন্তু মমাঙ্গানি বাক প্ৰাণশ্চক্ষুঃ শ্রোত্রমাথা বলমিন্দ্ৰিয়ানি চ সৰ্বাণি। সৰ্ব্বং ব্রহ্মৌপনিষদম। মাইহাং ব্ৰহ্ম নিরাকুর্যাং, মা মা ব্ৰহ্ম নিরাকারোৎ অনির্যাকরণমস্তু, অনির্যাকরণং মেহত্ত্ব।
আমার সমস্ত অঙ্গ যেন পুষ্ট হয়। তার সঙ্গে আমার প্রাণবায়ু, বাকশক্তি, দৃষ্টি, শ্রবণ এবং অন্যান্য ইন্দ্ৰিয়গুলিও যেন শক্তিশালী হয়। ব্ৰহ্মার কথাই উপনিষদ বলে।
এককড়ির সামনে পিতলের থালা। থালায় জবাফুল, কিছু ধান, আম এবং বটের পাতা। লোকজন আসছে, কৌতূহলী হয়ে দেখছে। ছেলেমেয়েরা সকাল থেকেই ভিড় করে আছে। বান্ধবপুরে ছড়িয়ে গেছে— এককড়ি জোড়া পাঠা বলি দেবেন। সবাইকে পাঠার মাংস ভাগ করে দেয়া হবে।
মেয়েরা দলে দলে আসছে। এককড়ির বৃদ্ধা মা অনেক দূরে সাদা থান পরে দাড়িয়ে আছেন। মেয়ের দল দেখলেই খনখনে গলায় চিৎকার করছেন। সাবধান, বিধবারা কেউ কাছে যাবা না। সাবধান, বিধবারা দূরে। এককড়ির মা নিজেও বিধবা। তিনিও উৎসবে থাকতে পারছেন না।
আজকের উৎসবের কারণ এককড়ির মন্দির বানানো হচ্ছে। নেত্রকোণা থেকে রাজমিন্ত্রি এসেছে। তারা আজ মধ্যদুপুর থেকে ইট গাথা শুরু করবে। প্রথমে তৈরি হবে দেবীর মঞ্চ। মঞ্চে দেবী স্থাপনা হবে সন্ধ্যায়। এরপরেই শুরু হবে দেয়াল গাথা। মধ্যদুপুর লগ্ন শুভ। অবিনাশ ঠাকুর ছক ঐকে বের করেছেন। এই বিশেষ সময়ে মঙ্গল কৃত্তিকা নক্ষত্রে যাবে। অতি শুভ সময়।
মন্দির নির্মাণের যাবতীয় দেখাশোনা শ্ৰীনাথ করছেন। তাঁর আগ্রহের কোনো সীমা নাই। রামমন্দির হচ্ছে না, রাধাকৃষ্ণের মন্দিরই হচ্ছে। রাধাকৃষ্ণের মূর্তি শ্ৰীনাথ লাবুসের বাড়ি থেকে চাদরে জড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। তিনি এটাকে অপরাধ মনে করছেন না। দেবদেবী মুসলমান বাড়িতে অনাদরে অবহেলায় পড়ে ছিলেন। এখন পূজা পাবেন।
