ধনু শেখের আগামীকাল ভোরেই কোলকাতা যাবার কথা। নিজের লঞ্চে করে যাবেন। কেবিনের ঘর ঝাড়পোছ করা হয়েছে। বিছানা বালিশ তোলা হয়েছে। তখনই আতর ব্যবস্থা নিয়েছে। ধনু শেখকে গিয়ে বলেছে, বাপজান, নয়া মা তো ঘরে নাই। লাবুস চাচার বাড়ির দিকে দৌড়ায়া যাইতে দেখেছি।
ধনু শেখ রঙিলা বাড়িতে। তাকে যত্ন করে রুপার বাটায় পান দেয়া হয়েছে। গোলাপ জলের হুক্কায় তামাক দেয়া হয়েছে। ধনু শেখ নিশ্চিত হয়েছেন রঙিলা বাড়িতে শরিফা নেই। তিনি ফিরে আসতে চাচ্ছেন। মালেকাইন তাকে ছাড়ছেন না। হাতজোড় করে বলেছেন, হুজুর এতদিন পর দয়া করেছেন। আজ রাতে আপনাকে ছাড়ব না। আপনার সম্মানে সারারাত গানবাজনা হবে। ভালো বিদেশী পানি আছে। এক চুমুক হলেও মুখে দিতে হবে। ধনু শেখ দেটিানায় পড়ে গেছেন। মালেকাইন বলল, তের বছরের একটা মেয়ে নতুন এসেছে। ডানাকাটা পরী কেউ দেখে নাই, এই মেয়ে ডানাকাটা পরী।
মেয়ের নাম কী?
মেয়ের নতুন নাম এখনো দেওয়া হয় নাই। আপনি একটা নাম দেন।
আমি নাম দিলাম আঙুর।
ভালো নাম দিয়েছেন। তবে এই মেয়ে আঙুরের অধিক মিষ্ট। তারে কি আনব?
আনো।
শরিফাকে খুঁজতে আজ অনেক পরিশ্রম হয়েছে। এখন বিশ্রাম দরকার।
হামিদ শরিফাকে বোরকা পরিয়ে নৌকায় তুলে দিয়েছে। ছইওয়ালা বড় নৌকা। চারজন মাঝি। এরা সারারাত নৌকা বেয়ে শরিফাকে সেতাবনগরে পৌঁছে দিবে। সেতাবনগরে শরিফার এক ফুফু আছেন। শরিফাকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। আপাতত শরিফা সে বাড়িতেই থাকবে। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
নৌকার ছাঁইয়ের দু’পাশ শাড়ি দিয়ে পর্দা দেয়া। ভেতরটা অন্ধকার। অন্ধকারে গুটিসুটি মেরে শরিফা বসে আছে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে মুক্তি পেয়েছে।
গভীর রাতে নৌকা হাওরের মুখে পড়ল। হাওর এখন শুকিয়ে গেছে। হাওরের মাঝখােন দিয়ে মূল নদীতে সামান্য পানি। নৌকা থেমেছে। মাঝিরা বিড়ি খাচ্ছে। বিড়ির উৎকট গন্ধে শরিফার বমি আসছে। সবাই নৌকা থামিয়ে একসঙ্গে বিড়ি খাচ্ছে কেন শরিফা বুঝতে পারছে না। পর্দার ফাঁক দিয়ে শরিফা দেখল মাঝিদের একজন কুপি জ্বালাচ্ছে। শরিফা বলল, নৌকা থামা কেন?
কুপি যে জ্বালাচ্ছে সে বলল, এত দূরের পথ যাব, আমরা চারজনে পাইছি মাত্র দশ টেকা। এইজন্য ঠিক করেছি আপনারে নিয়া আমরা রঙতামাশা করব। চিৎকার দিয়া লাভ নাই। কোনোদিকে জনমানুষ্যি নাই। আপোসে রঙতামাশা করলে আপনের ভালো আমরারও ভালো।
মাঝির কথা শেষ হবার আগেই পেছন দিকের পর্দা সরিয়ে একজন ঢুকে শরিফার মুখ চেপে ধরল। ভারী গলায় বলল, একজন আসা, ঠ্যাং চাইপা ধর। ঠ্যাং দিয়া লাখি দিতে পারে। আরেকজন খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল, আমি ‘বুনি’ চাইপা ধরব। ঠ্যাং ধরব কোন কামে। হিহিহি।
সারারাত রঙতামাশা করে তারা অচেতন শরিফাকে ফেলে গেল পরিত্যক্ত এক বিষ্ণুমন্দিরে। সেখান থেকে তার স্থান হলো রঙিলা নাটিবাড়িতে।
মাওলানা ইদরিস শুয়ে আছেন শিয়ালদা রেলষ্টেশনের প্লাটফরমে। তিনি একা না। তাঁর মতো আরো অনেকেই আছেন। এদেরকে আলাদা করা হয়েছে, কারণ এরা মারা যাচ্ছে।
হাসপাতালে রোগীর জায়গা নেই। স্বেচ্ছাসেবীরা কিছু সাহায্যের চেষ্টা করছে। সেই সাহায্য কোনো কাজে আসছে না। মাওলানাকে সকালবেলা একটা রুটি দেয়া হয়েছে। মাওলানা রুটি খান নি। রুটি তার পাশে পড়ে আছে, সেখানে পিপড়া উঠেছে। মাওলানা আছেন প্রবল ঘোরে। সারাক্ষণই তাঁর মনে হচ্ছে মাথার ভেতর দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে।
কংগ্রেসকমীরা সাহায্যে নেমেছে। ব্যাগে ওষুধপত্র নিয়ে এসেছে। তারা রোগীদের তালিকা তৈরির চেষ্টাও করছে। একজন খাতকলম নিয়ে মাওলানার পাশে বসিল।
আপনার নাম?
ইদরিস। মাওলানা ইদরিস।
গ্রাম? গ্রামের নাম বলুন।
বান্ধবপুর।
কী বললেন? বান্ধবপুর? জেলা কি ময়মনসিংহ?
জি।
আপনি কি কোরানে হাফেজ?
জি।
যমুনা নামের কাউকে চেনেন?
জি-না জনাব।
যমুনার বিয়ে হয়েছিল সুরেন নামে একজনের সঙ্গে। ডাক্তার সুরেন। যমুনা বান্ধবপুরের মেয়ে। চিনেছেন?
না। জনাব আমি আর কথা বলতে পারতেছি না। আমারে ক্ষমা দেন।
মাওলানা ইদরিস প্রবল ঘোরে তলিয়ে গেলেন। ঘোর ভাঙলো অনেক পরে। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন একটা মেয়ে তার দিকে ঝুকে আছে। মেয়েটা ব্যাকুল গলায় বলল, কাকু, আমাকে চিনেছেন?
চিনেছি।
বলুন তো আমি কে?
তুমি ললিতা। বগুড়ার।
ভালো করে আমাকে দেখে তারপর বলুন। আমি ললিতা না।
তুমি জমিদার শশাংক পালের মেয়ে ললিতা। মা কেমন আছ? তোমার পিতা শশাংক পালের ইন্তেকাল হয়েছে।
যমুনা বলল, কাকু, আমি আপনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। যখন আমার কোনো আশ্রয় ছিল না। তখন আপনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন।
ইদরিস ক্ষীণ স্বরে বললেন, কাঁদছ কেন ললিতা?
কাকু, আপনাকে এই অবস্থায় দেখে কাঁদছি।
মাওলানা চোখ বন্ধ করলেন। তার মাথার ভেতর দিয়ে আবার ট্রেন চলাচল শুরু করেছে। একটা না, অনেকগুলো ট্রেন একসঙ্গে চলছে। ট্রেনগুলো আবার লঞ্চ ইষ্টিমারের মতো ভোঁ ভো শব্দে ভেঁপু বাজাচ্ছে।
যমুনার বাড়ি বাগবাজারে। দু’কামরার একতলা বাড়ি। ছোট্ট বারান্দা। বারান্দায় যমুনা আগ্রহ করে অনেক ফুলের টব রেখেছে। প্রতিটি ফুলের টবে মাধুরীলতা। এই ফুল যমুনার খুব পছন্দ। সুরেন মাধুরীলতা বলে না। সুরেন বলে যমুনা লতা।
বাড়ির দু’টি কামরার একটি যুমুনা আলাদা করে রেখেছে। সেখানে তরুণ এক কংগ্রেস কমী থাকেন। মানুষের সেবা করার জন্যে এই মানুষটা সবসময় ব্যস্ত হয়ে থাকেন। যমুনা তাকে বড়দা ডাকে। যমুনার বড়দা লেখালেখি করেন। তিনি লেখেন মেঝেতে বসে। তাঁর সামনে থাকে মাড়োয়ারিদের ক্যাশবাক্সের মতো ছোট্ট টেবিল। যমুনা তরুণ এই লেখকের লেখার জন্যে পশমের একটি আসন নিজের হয়তে বানিয়ে দিয়েছে।
