জি আচ্ছা।
শরিফার সাথে আমার সামান্য মনকষাকষি হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এইসব হয়। সে রাগ করে বের হয়ে গেছে। বুঝেছ?
জি। আপনি কি ভেতরে এসে বসবেন?
আমারে ভিতরে নেওয়া আরো ঝামেলা। কোলে কইরা নিতে হবে। তার প্রয়োজন নাই। যেখানে আছি ভালো আছি। তোমার এখানে কি তামাকের ব্যবস্থা আছে? ব্যবস্থা থাকলে তামাক দিতে বলো।
হাদিস উদ্দিন তামাক সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। ধনু শেখ গুড়ুক গুড়ুক করে নল টানছেন। তামাকের ধোঁয়া চিন্তা পরিষ্কারক। ধনু শেখ হাদিস উদিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর নাম কী?
হাদিস উদ্দিন।
লোকমুখে শুনি শশাংক পাল মরে প্রেতিযোনি প্ৰাপ্ত হয়েছেন। এই বাড়ির আশেপাশে তারে দেখা যায়। কথা কি সত্য?
জি সত্য। ষোল আনা সত্য।
তুই কোনোদিন দেখেছিস?
জে না।
তাহলে কীভাবে বললি ষোল আনা সত্য?
শ্ৰীনাথ বাবু দেখেছেন।
শ্ৰীনাথটা কে?
গোমস্তার কাজ করে।
সো কই?
এতক্ষণ আপনার সামনেই ছিল, এখন ছোটকর্তার সঙ্গে অন্দরে গেছেন।
তারে ডাক দিয়া আন। ভূতের কী ঘটনা শুনি।
হাদিস উদ্দিন এক দৌড়ে অন্দরে ঢুকল। গভীর রাতে হঠাৎ এই কর্মব্যস্ততায় সে আনন্দ পাচ্ছে। ধনু শেখ আরাম করে হুক্কা টানছেন, এটাও তার জন্যে আনন্দের। ভালো জিনিসের মর্ম সবাই বুঝে না।
তোমার নাম শ্ৰীনাথ?
জি।
চেহারা-ছবি তো ভালো না। শ্ৰীনাথ নাম না হয়ে বিশ্ৰীনাথ নাম হলে মানানসই হতো। হা হা হা।
নিজের রসিকতায় মুগ্ধ হয়ে ধনু শেখ অনেকক্ষণ হাসলেন। শ্ৰীনাথ শুকনা মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শশাংক পালের ভূত তুমি নাকি দেখেছ?
আজ্ঞে দেখেছি।
কী দেখেছি গুছায়া বলো। তার আগে বলো কতবার দেখেছ?
অনেকবার দেখেছি।
সর্বশেষ কবে দেখেছ? কী দেখেছ?
শ্ৰীনাথ গলা খাঁকারি দিয়ে গল্প শুরু করল। এ ধরনের গল্প বলতে সে খুবই পছন্দ করে। তবে আজ গল্প বলে আরাম পাওয়া যাচ্ছে না। যারা ভূত বিশ্বাস করে না তাদের সঙ্গে ভূতের গল্প করে আরাম নেই। এরা হঠাৎ বেমাক্কা প্রশ্ন করে গল্প উলট-পালট করে ফেলে।
সন্ধ্যাবেলা আমি বাগানে গিয়েছি নিমের ডাল আনব। দাঁত মাজবি। ডাল ভেঙেছি। কী কারণে যেন গাছের উপর চোখ গিয়েছে, দেখি সেখানে কে যেন বসে আছে।
গাছে কি শশাংক পাল বসা?
জি। আমার দিকে তাকায়া আছেন, মুখে হাসি।
তুমি কী করলা? ঝাঁকি দিয়া তারে গাছ থাইকা ফেললা?
শ্ৰীনাথ গল্প বন্ধ করে দিল। এই মানুষকে ভূতের গল্প শোনানোর কোনো অর্থ হয় না। যে-কেউ গাছে ভূত দেখলে দৌড়ে পালাবে। গাছে ঝাঁকি দিয়ে ভূত মাটিতে ফেলবে না। ভূত তো ফল না যে ঝাঁকি দিয়ে গাছ থেকে ফেলতে হবে।
চুপ করলা কেন? তারপর কী হলো বলো। শশাংক পালের ভূত কী করল? গাছের উপর থেকে তোমার শরীরে পেসাব করে দেয় নাই তো? শুনেছি। অনেক দুষ্টভূত এই কাজ করে। পেসাব কি করেছে?
শ্ৰীনাথ কী বলবে ভেবে পেল না।
শরিফাকে পাওয়া গেল না। ধনু শেখ পান্ধি উঠাতে বললেন। এখন যাবেন রঙিলা বাড়িতে! নটিবাড়িগুলো সুন্দরী মেয়েদের পালায়া থাকার জন্যে ভালো জায়গা। বাড়ির মালেকাইন এদের আগ্রহ করে স্থান দেয়। গানবাজনা শিখিয়ে একসময় কাজে লাগিয়ে দেয়। নটিবাড়িগুলোতে মেয়ের অভাব কখনোই হয় না।
রঙিলা বাড়িতে যাবার পথে ধনু শেখের সঙ্গে করিমের দেখা হয়ে গেল। করিম লঞ্চঘাটে হাঁটাহাঁটি করছে। ধনু শেখ পান্ধি থামিয়ে বললেন, কে? ইমাম করিম না?
করিম উঠে দাঁড়াল। যন্ত্রের মতো বলল, আসসালামু আলায়কুম।
ধনু শেখ বললেন, ওয়ালাইকুম।
শরিফা যে পালায়ে গেছে এই খবর শুনছ?
জি।
নটিবাড়িতে যাইতেছি তার সন্ধানে। যদি দেখি সে নটিবাড়িতে দাখিল হয়েছে তাহলে আর ফিরায়া আনব না। এটা দস্তুর না। আমোদ ফুর্তি করতে চাইলে তখন নটিবাড়িতে যাব। ইচ্ছা করলে তুমিও যাইতে পারবা। নটিবাড়ির মেয়েগুলার সুবিধা আছে। তারা একজনের বউ না। সকলের বউ। ভালো বলেছি না?
করিম তীব্ৰ চোখে তাকিয়ে আছে। ধনু শেখ করিমের তীব্ৰ চাউনি উপেক্ষা করে বললেন, শরিফা জঙ্গলেও লুকায়ে থাকতে পারে। জঙ্গলে লোক পাঠায়েছি। ইচ্ছা করলে তুমিও যেতে পার। ঘোষণা দিয়েছি, যে শরিফারে খুঁজে পাবে তার জন্যে তিনশ’ টাকা পুরস্কার।
করিমের বড় বড় নিঃশ্বাস পড়ছে। সে কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলাল। তার চোখের সামনে দিয়ে ধনু শেখের পালকি নটিবাড়ির দিকে যাচ্ছে। পাল্কি মাত্র দু’জন টানছে। বিশাল বাপু ধনু শেখকে টানতে তাদের কষ্ট হচ্ছে। এই প্ৰবল শীতেও তাদের সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
শরিফা লুকিয়ে আছে ধনু শেখের বাড়িতে। সে আছে আতরের ঘরে রাখা প্ৰকাণ্ড কাঠের সিন্দুকের ভেতরে। সিন্দুক তালাবন্ধ। চাবি আতরের ঘরের আলমারির ওপর। সিন্দুকের ওপর বিছানা করা। সেই বিছানায় ঘুমায় হামিদা। শরিফাকে লুকিয়ে রাখায় হামিদার ভালো ভূমিকা আছে। হামিদা নৌকা ঠিক করে রেখেছে। সময় সুযোগ মতো নৌকা শরিফাকে ভাটির দিকে নিয়ে যাবে। ভাটি অঞ্চলে শরিফার দেশ। কেউ-না-কেউ তাকে আশ্রয় দিবে।
শরিফাকে লুকিয়ে রাখার অসীম সাহসী কাজটি আতর করেছে, কারণ শফিফা তার এই মেয়ের কাছে ধনু শেখের কর্মকাণ্ড সবই কাঁদতে কাঁদতে বলেছে। তাকে কোলকাতায় নিয়ে নাচ শেখানো হবে, তাকে স্বামীর সামনে নগ্ন নৃত্য করতে হবে এই তথ্যও গোপন করে নি।
আতর বলেছে, নয়া মা! বাপজানের কলিকাতা যাওয়ার আগেই আমি ব্যবস্থা নিব। আপনি চিন্তা নিয়েন না।
