নাজুবিবির কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। তাকে স্নেহময়ী মায়ের মতোই মনে হয় জরিনার। তাই এ নিঃসহায় শাশুড়িকে তার দেখতেই হয়। সে নিজেও নিঃসঙ্গ, নিঃসহায়। শাশুড়ির ওপর মাঝে মাঝে তার রাগ হয়। কিন্তু অসহায় বুড়ির জন্য তার হৃদয়ে যে মমতা সঞ্চিত হয়ে আছে, তার স্পর্শে সে রাগ পানি হয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই।
ও মা, মাগো, কতা কস না ক্যান? নাজুবিবি কাতর কণ্ঠে আবার বলে।
কী কইমু? আইজও কাম পাই নাই। না খাইয়া থাকতে অইব আইজ।
হঠাৎ জরিনার মনে পড়ে, একটা ডিব্বার ভেতর কিছু খুদ আছে। মুরগির বাচ্চার জন্য সে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চা ফুটবে আর কার উমে? মোরগ-মুরগি যে একটাও নেই! খোপসহ সব ক’টা সে বিক্রি করে দিয়েছে অভাবের তাড়নায়।
জরিনা ঘরে গিয়ে ডিব্বাটা বের করে আনে। পোয়াখানেক খুদ আছে তাতে। কিন্তু ছাতকুরা পড়ে সেগুলো কালচে হয়ে গেছে।
ডিব্বা খোলার শব্দ পেয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকায় নাজুবিবি। ব্যগ্রতার সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করে, কিছু পাইছস, মা?
হ, দুগ্গা খুদ আছে। জাউ রাইন্দা ফালাই।
হ, যা রান্দনের ত্বরাত্বরি রাইন্দা ফ্যা। প্যাডের মইদ্যে খাবল খাবল শুরু অইয়া গেছে।
জরিনা খুদ কটা ধুয়ে চুলো ধরায়। ঘরের চাল থেকে সে গোটা কয়েক লাউয়ের ডগা কেটে নেয়, গাছ থেকে ছিঁড়ে নেয় কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা। তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে সন্ধ্যার আগেই খেয়ে নিতে হবে। বেশ কিছুদিন ধরে কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কোনো বাড়িতেই বাতি জ্বলে না আজকাল। সন্ধ্যার পর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা, নয়তো বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়া–এ ছাড়া অন্ধকারে আর কিছুই করার উপায় নেই।
খাওয়া শেষ করে থালা-বাসন মাজা শেষ না হতেই বেলা ডুবে যায়। দোর-মুখে দাঁড়িয়ে দেশলাই জ্বালে জরিনা। কুপির শুকনো সলতেয় আগুন দিয়ে সে ঘরে সঁঝ-বাতি দেয়। সন্ধ্যার পরই কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করে।
মাগরেবের নামাজ পড়ে বউ ও শাশুড়ি হোগলার বিছানায় বসে থাকে। কিন্তু অন্ধকারে কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়। আবার মশার উৎপাত শুরু হয়েছে।
মশা গাঙ পাড়ি দিয়া আহে ক্যামনে? বিস্মিত প্রশ্ন নাজুবিবির। আগেতো চর-চঞ্চালে এত মশা আছিল না!
মশা আহে মাইনষের লগে লগে। জরিনা বলে। পয়লা পরথম দুই-চাই আহে গায়ে বইস্যা, নায়ে চইড়া। হেরপর চরেই পয়দা অয় হাজারে হাজার।
না গো মা, মশার জ্বালায় আর বইস্যা থাকন যায় না। তুই ত্বরাতৃরি মশারি টাঙাইয়া দে, হুইয়া পড়ি।
মশারির দুই কোনা টাঙানোই ছিল। অন্ধকারে হাতড়ে জরিনা বাকি দুই কোনা টাঙিয়ে ফেলে। তারপর কপাটে খিল লাগিয়ে সে মশারির ভেতর ঢোকে।
চাউলের খবর কি, অ্যা মা? দাম কি কমছে?
না, দাম আর কমব না। বসে বসেই জবাব দেয় জরিনা। যুদু যদ্দিন আছে, দাম বাড়তেই থাকব। কয়দিন আগে আছিল ট্যাহায় চাইর সের। আইজ হুনলাম তিন সের ভাও।
যুদ্দূর লগে চাউলের কোন এমুন দোস্তালি! চাউল ভইর্যা কি কামান দাগায় নি?
হ কামানই দাগায়। জরিনা হাসতে হাসতে বলে। কামান ফুডাইতে যদি চাউল লাগত আর চাউল ভইরা একটা কামান যদি মারত আমাগ বাড়ি, হে অইলে কী মজাই না অইত!
হ, হে অইলে চাউল টোকাইয়া খাইয়া বাঁচতে পারতাম।
হোনেন, চাউলের কাহাত পড়ছে ক্যান্। যুদু অইলে অ্যাক দ্যাশের চাউল অন্য দেশে যাইতে পারে না। আগে দ্যাখছেন না পেগু চাউল? আমাগ দেশে চাউলের আকাল পড়লে বর্শা মুলুকতন ঐ চাউল আইতো।
হ, খালি দেখমু ক্যান্, খাইছিও। ঐ চাউল ভাত অয় গাবের দানার মতন মোড়া মোডা।
এ পেগু চাউল আর আইতে পারব না।
ক্যান?
বর্মা মুলুক হুনছি জাপান দখল করছে।
জরিনা শাশুড়ির পাশে অন্য একটা বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।
এই যুদ্দু কি আর থামব না! কী তাশা শুরু করছে মরার যুদু। চাউল মাংগা, কেরাসিন পাওয়া যায় না।
হুনছি, কয়দিন পর চাউলও পাওয়া যাইব না।
তয়তো মানুষ মইর্যা সাফ অইয়া যাইব!
হ বাঁচনের আর আশা ভস্সা দেহি না।
আমাগ কি অইব? আরেকজন আইতে আছে। তারে ক্যামনে বাচইমু।
জরিনা কোনো কথা বলে না।
অ্যা মা, চুপ কইর্যা আছস ক্যান্? কতা কস না ক্যান?
কতা কইতে আর ভাল্লাগেনা।
তয় ঘুমাইয়া থাক। আমিও দেহি ঘুমাইতে পারি নি। নাজুবিবি চোখ বুজে ঘুমুবার চেষ্টা করে।
শরীর ভারী হওয়ার পর থেকেই একটা দুশ্চিন্তা জরিনার মনে বাসা বেঁধেছে। একা থাকলে, বিশেষ করে অন্ধকারে শুয়ে থাকলে দুশ্চিন্তাটা সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে ওঠে। বিধতে থাকে তার হাড়-পাঁজরায়। শাশুড়ি তো আসমানের চাঁদ ধরবার জন্য ‘ডিলকি’ দিয়ে রয়েছে। কিন্তু আর একজন? তার ছেলে? সে-তো জানে, অমাবস্যা রাতে চাঁদ উঠতেই পারে না।
জরিনা কি করবে ভেবে পায় না। এ বিপদের কথা শুধুমাত্র একজনকেই বলা যায়। সে-ই দিতে পারে পরামর্শ। কিন্তু পরামর্শ দিয়ার আছেই বা কি? তবুও তার কাছে ভেঙে বললে সে হয়তো একটা কিছু বুদ্ধি দিতে পারে। এই সময়ে, এই মুহূর্তে যদি শোনা যেত হট্টিটির ডাক।
বাড়িডা দেহি আন্দার! বাড়ির মানুষ কি মইরা গেছে নি?
হেকমতের গলা। জরিনা আঁতকে ওঠে। কাঁটা দিয়ে ওঠে তার সারা শরীর। তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায় একটা ঠাণ্ডা কাঁপুনি। সে পায়ের কাছ থেকে কথাটা টেনে নিয়ে শরীরটা ঢেকে দেয়।
