খট-খট-খ। কাঠের দরজায় ঘা দিচ্ছে হেকমত।
নাজুবিবি কাশি দিয়ে গলা সাফ করে বলে, ক্যাডারে? হেকমত আইছস নি?
হ, তোমরা হাউজ্যা বেলায় বাত্তি নিবাইয়া হুইয়া পড়ছ!
কি করমু? বাত্তিতে তেল নাই। নাজুবিবি উঠে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে গিয়ে কপাট খুলে দেয়।
কে, মা? তুমি উঠছ ক্যান্, আরেকজন কই?
হুইয়া রইছে। ও মা, ঘুমাইয়া পড়ছস নি?
জরিনা চোখ বুজে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।
ওঠতে কওনা ক্যান্? বাত্তি জ্বালাইতে কও। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হেকমত বলে।
বাত্তি জ্বালাইব ক্যামনে? কইলাম তো কুপিতে তেল নাই।
তেল নাই!
না, কেরাসিন যে পাওয়া যায় না!
কিন্তুক রান তো লাগব। চাউল আনছি।
আর কি আনছস?
আর কিছু তো আনি নাই। তয় খাবি কি দিয়া?
ক্যান, ঘরে নাই কিছু? আণ্ডা তো আছে দুই-একটা।
নারে বাজান, অণ্ডা আইব কইত্তন? মোরগ-মুরগি তো বেবাক বেইচ্যা খাইছি।
ডাইল নাই?
ডাইলও বুঝিন নাই। অ বউ, ডাইল আছে নি?
না। ডাইল তো অনেক দিন ধইর্যা নাই। পয়সা পাইমু কই? জরিনা শুয়ে শুয়েই জবাব দেয়।
এহনও হুইয়া রইছে! ওডে না ক্যান্? চাউলের মইদ্যে ধান আর আখালি। এগুলারে বাছতে অইব।
আন্দারে ক্যামনে বাছমু?
ক্যান্! আন্দারে চুলের জঙ্গল আতাইয়া উকুন বাছতে পারে, আর চাউলের আখালি বাছতে পারব না! দিনের বেলা হলে হেকমতের মুখ ভ্যাঙচানো দেখতে পেত জরিনা।
হ পারমু। নাজুবিবি বলে। কিন্তু ভাত খাবি কি দিয়া? কদুর ডোগা সিদ্দ কইর্যা দিলে খাইতে পারবি?
দুৎ, দুৎ! খালি কদুর ডোগা কি খাওন যায়! ওরে উঠতে কও দেহি। আঁকিজালডা নামাইয়া দিতে কও। দুইডা খেও দিয়া আহি।
জালতো নাই। জরিনা বলে।
নাই! বাড়িত আইয়া খালি হুনতে আছি নাই আর নাই। হেকমত রেগে ওঠে। জাল গেল কই?
দফাদারে লইয়া গেছে। অ্যাকদিনের লেইগ্যা কইয়া নিছিল। অ্যাক মাস পার অইয়া গেছে। এহনও দিয়া যায় নাই।
হায়রে আল্লাহ! কিয়ের লেইগ্যা বাড়িত আইলাম?
একটু থেমে হেকমত বলে, মাছ রাহনের জালিডা আছে তো? না হেইডাও নাই?
হেইডা আছে।
বাইর কইর্যা দে জলদি। দেহি, আতাইয়া কয়ডা গইদ্যা বাইল্যা ধরতে পারি নি।
এই আন্দার রাইতে ক্যামনে যাবি, বাজান?
আমাগ আন্দারে চলনের আদত আছে। আন্দারে কি আমাগ আটকাইতে পারে? আর একটু পর চানও ওড্ব। দুই রাইত আগেইতো গেছে পূন্নিমা।
জরিনা অন্ধের মতো হাতড়াতে মাছ রাখার জালটা খুঁজে পায়।
এই যে ধরুক। জরিনা হাত বাড়িয়ে জালটা হেকমতের হাতে দেয়।
জালের সাথে লাগানো লম্বা সুতলির অন্য প্রান্ত কোমরের তাগায় বাঁধতে বাঁধতে হেকমত বলে, আমি গেলাম। চাউল বাইচ্ছা ভাত চড়াইয়া দে।
ত্বরাত্বরিই আইয়া পড়িস, বাজান। নাজুবিবি বলে।
কোনো কথা না বলে আবছায়ার মতো সরতে সরতে হেকমত আঁধারে মিশে যায়। থলে থেকে কুলায় অল্প অল্প করে চাল ঢেলে অন্ধকারে ধান আর কাকর বাছতে শুরু করে বউ আর শাশুড়ি।
ধানের খুইর মইদ্যে কি আখাইল ভইর্যা থুইছিল নি আল্লায়? নাজুবিবি বলে।
জরিনা অন্য কিছু ভাবছিল। শাশুড়ির কথার শেষটুকু শুধু তার কানে যায়। সে বলে, আম্মাজান কি কইলেন?
কইলাম, আল্লায় কি ধানের খুইর মইদ্যে আখালি ভইরা থুইছিল? হেইয়া না অইলে চাউলের লগে আখালি আইল কইত্তন?
আল্লায় ভরব ক্যান? চাউলের দাম তো বেশি। হের লেইগ্যা ধান আর আখালি মিশাইয়া ওজন বাড়াইছে।
দ্যাখ, মানুষ কেমুন জানোয়ার অইয়া গেছে।
এক জানোয়ার কি আরেক জানোয়াররে এম্বায় ঠকাইতে পারে?
উঁহু নাতো! ঠিকই ধরছস। জানোয়ারের মইদ্যে ঠকাঠকির কারবার তো নাই! মানুষ তো দ্যাখতে আছি জানোয়ারেরও অধম অইয়া গেছে।
আমার বাজান কইত, ভালো মানুষ হগল জানোয়ারের থিকা ভালো। আর খারাপ মানুষ খারাপ জানোয়ারের থিকাও খারাপ।
হ, কতাডা ঠিকই কইত তোর বাজান। নে মা, ত্বরাত্বরি আত চালা। ও আবার আইয়া পড়ব।
জরিনা হাত চালাতে চালাতে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তার আজ মহাবিপদ। রাত পোহালে কি হবে? রাতের অন্ধকারে তাকে দেখতে পায়নি হেকমত। কিন্তু রাত পোহালেই তাকে দেখে সব বুঝতে পারবে সে।
ও বউ, ও মা, ও আইলেই কুন্তু সুখবরডা দিতে অইব। ও হুনলে যা খুশি অইব!
দুশ্চিন্তার অথই দরিয়ায় ডুবে আছে জরিনা। শাশুড়ির কথা সে শুনতে পায় না।
ও বউ, চুপ মাইরা রইছস ক্যান? নাজুবিবি হাত দিয়ে ঠেলা দেয় জরিনার হাতে। কী কইছি, হোনছস? ওরে সুখবর দিলে ও যা খুশি অইব!
জরিনার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। সে বলে, না, এত হবিরে কওনের দরকার নাই। চান ওঠলে দ্যাখতেই পাইব।
উঁহু ওরে কইতেই অইব। তুই এহন আর চেঁকির কাম করতে পারবি না। তোরে আর ঐ কাম করতে দিমু না। ওরে কইমু বেশি কইর্যা ট্যাহা দিয়া যাইতে।
কত ট্যাহাই দ্যায় আপনের পোলা! মনে করছেন ট্যাহার থলি বুঝিন লইয়া আইছে।
নাজুবিবি লজ্জিত হয়। সে কথা বলার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।
জরিনা আবার বলে, আপনের কওনের কোনো দরকার নাই। যা কওনের আমিই কইমু। আপনে গিয়া হুইয়া থাকেন। চাউল আর বাছন লাগব না। আমি রাইন্দা-বাইড়া আপনেরে ডাক দিমু।
আবারও খাইতে ডাক দিবিনি? খাইছি তো অ্যাকবার।
ঐ খাওন কি প্যাড ভরছে? আবারও খাইবেন আপনের পোলার লগে।
আইচ্ছা, আমি তয় হুইয়া থাকি গিয়া। ভাত-সালুন রান্দা অইলে আমারে ডাক দিস।
নাজুবিবি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। জরিনা চুলা ধরিয়ে তার ওপর পানি সমেত ভাতের পাতিল বসিয়ে দেয়। চুলার ভেতর ঘাস-পাতা জ্বলছে। সামান্য সে আলো তার কাছে ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়। সে দুজনের ভাতের চাল মেপে, সেগুলো তাড়াতাড়ি কলসির পানিতে ধুয়ে ঢেলে দেয় পাতিলের মধ্যে।
