নাম দিয়া কি করবেন? উদ্দার করতে পারবেন আমারে?
দেখি পারি কি না।
কিন্তুক বাড়িত্ আইয়া করমু কি? অ্যাক নল জমিও তো নাই। পারবেন আমারে কিছু জমি দিতে?
তুমি যদি ভালো অইয়া যাও, তয় আমি কথা দিলাম, এই পদ্মার উপরে বইস্যা কথা দিলাম, তোমারে আমি জমি দিমু। এইবার কও কী নাম তোমার মহাজনের।
আইজ থাউক, মিয়াভাই। দুই-অ্যাক দিনের মইদ্যে আপনের বাড়িত গিয়া কানে কানে কইয়া আইমু।
তোমার থলির মইদ্যে কী?
কয় সের চাউল। চাউল এত মাংগা অইয়া গেল ক্যান, মিয়াভাই? ট্যাহায় তিন সের। তা-ও আবার চাউলের মইদ্যে ধান আর আখালি।
ধলছত্রের কাছে আইয়া পড়ছি। বক্কর বলে। আপনে কোহানে নামবেন?
ঐ সামনের ঢোনে নামাইয়া দ্যান।
আন্দারের মইদ্যে যাইতে পরবা তো? ফজল জিজ্ঞেস করে।
হেকমত হেসে উঠে বলে, আমরাতো আন্দারেরই মানুষ। রাইতের আন্দারই আমাগ পথ দ্যাহায়।
হেকমতকে নামিয়ে দিয়ে ডিঙিটা খুনের চরের দিকে এগিয়ে যায়। ফজল তাকিয়ে থাকে পেছনের দিকে, যেদিন দিয়ে যেতে যেতে হেকমত মিশে যায় রাতের অন্ধকারে।
.
৩০.
চার-পাঁচ দিন আগে কাজের সন্ধানে চরদিঘলি গিয়েছিল জরিনা। সেখানেই সে খবর পায়, জঙ্গুরুল্লার দলকে বিতাড়িত করে এরফান মাতব্বরের দল খুনের চর আবার দখল করেছে।
জরিনার মন নেচে ওঠে আনন্দে। তবে কি ফজল জেল থেকে খালাস পেয়ে এসেছে? জরিনার মনে হয়, সে খালাস পেয়ে এসেছে। সে না হলে চর দখলের এত সাহস আর কার হবে?
কয়েকদিন ধরে জরিনা কাজের সন্ধান করছে। খেয়া নৌকায় পার হয়ে সে ঘুরছে এ চর থেকে সে চর। কিন্তু কোথাও কাজ পায়নি। অধিকাংশ গেরস্তের ঘরে খোরাকির ধান নেই। কেউ বেশি দামের আশায় রাখি’ করা পাট বেচে, কেউ নিদানের পুঁজি ভেঙে ধান-চাল কিনছে। অনেকেই হাঁস-মুরগি, খাসি-বকরি বিক্রি করে চাল কিনে খাচ্ছে। চালতো নয় যেন রূপার দানা। চারদিন কামলা খেটে এক টাকা পাওয়া যায়। সেই এক টাকা বেরিয়ে যায় তিন সের চাল কিনতে। যাদের ঘরে পুরো বছরের খোরাকির ধান আছে, তারাও টিপে টিপে হিসেব করে চলছে আজকাল। তাদের বউ-ঝিরাই এখন পেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানছে। ধান-ভানুনিদের আর প্রয়োজন হয় না তাদের। বেহুদা খরচের দিন আর নেই।
কাজ পাবে না জেনেও জরিনা আজ ভোরেই আবার বেরিয়েছিল। গিয়েছিল বিদগাঁও। বাড়ি বাড়ি ঘুরেও সে কাজ পায়নি। প্রায় সকলের মুখে ঐ এক কথা, ধান পাইমু কই? এহন তো চাউল কিন্যা খাইতে আছি। তোমারে কাম দিমু কেম্বায়?
বিদগাঁও থেকে ধু-ধু দেখা যায় খুনের চর। সেখানে বড় বড় কয়েকটা টিনের ঘরও দেখা যায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জরিনা জেনে নেয়, ফজল মাতব্বর ভাটিকান্দি ছেড়ে খুনের চরে বাড়ি করেছে।
ঠিকই অনুমান করছিল জরিনা, ফজল জেল থেকে খালাস পেয়ে এসেছে। সে-ই আবার দখল করেছে খুনের চর।
জরিনা বিদগাঁর উত্তর-পশ্চিম দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। নদীর কিনারায় বসে থাকা এক জোড়া মানিকজোড় ভয় পেয়ে উড়ে যায়।
জরিনা পলকহীন চোখে চেয়ে থাকে খুনের চরের দিকে। সেদিকে কোনো খেয়া নৌকা যায় না। খেয়া থাকলে একবার ঘুরে আসতে পারত সে। ফজলের মা এখনো আদর করে তাকে বসতে দেয়। এখনো তাকে বউ বলে ডাকে। ভালো-মন্দ কিছু তৈরি থাকলে খেতে দেয়। অনেক দুর বলে সে-ই যেতে পারে না। এরফান মাতব্বরের মৃত্যুর খবর পেয়ে গিয়েছিল সে। তারপর আর একবারও যাওয়া হয় নি।
মানিকজোড় দুটো সোজা খুনের চরের দিকে উড়ে যাচ্ছে।
আহা রে! তার যদি পাখা থাকতো পাখির মতো!
হঠাৎ জরিনার মনে হয়, আল্লার দুনিয়ায় পাখিই সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। সবচেয়ে সুন্দর প্রাণী। পাখি হাঁটতে পারে, উড়তেও পারে। কে বলে সব সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি মানুষ। মানুষ পাখির মতো উড়তে তো পারেই না, দৌড় দিয়ে ইঁদুরের সাথেও পারে না।
জরিনা বাড়ির দিকে রওনা হয়। খালি হাতে সে যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন বিকেল হয়ে গেছে। শাশুড়ি উঠানে হোগলার ওপর শুয়ে আছে। তার মাথার পাশে পড়ে আছে একটা ছোট কথা। তার ওপর সুই আর সুতা। সে কাঁথা সেলাই করছিল।
জরিনার ঠোঁটের কোণে কৌতুকের হাসি ফুটে ওঠার সাথে সাথেই আবার মিলিয়ে যায়। একটা নিঃশব্দ বেদনা ঘা দেয় তার বুকে। একটা বংশধরের জন্য শাশুড়ির কত যে আকুতি! তার বিয়ের পর থেকেই নাজুবিবি অধীর প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। তার বহু দিনের আশা পূর্ণ হবে এবার। কিন্তু সে যদি জানত তার আশার বাসায় কোন পাখির ডিম!
জরিনার পায়ের শব্দ পেয়ে নাজুবিবি ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। তার দিকে তাকিয়ে সে কিছুটা ক্ষোভের সাথে বলে, দিন কাবার কইর্যা এহন ফিরছস আবাগীর বেডি! নিজের প্যাটা বুঝিন তাজা কইর্যা আইছস?
কী যে কন আম্মাজান! এই আকালের দিনে কে কার লেইগ্যা রাইন্দা থোয়? উম্মা মেশানো জবাব দেয় জরিনা। সে বুঝতে পারে, খিদের জ্বালায় মেজাজ ঠিক নেই শাশুড়ির। খিদেয় পেট জ্বলছে তারও, মাথা ঘুরছে, ঝাঁপসা দেখছে চোখে।
কিন্তু ঘরে যে একটা দানাও নেই!
জরিনার কথায় রাগের আভাস পেয়ে নাজুবিবি একটু দমে যায়। সে আবার সুই-সুতা নিয়ে কাঁথা সেলাই করতে বসে যায়। জরিনা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে আছে দেখে সে বুঝতে পারে জরিনার রাগ পড়েনি। শেষে সে-ই যেচে কথা বলে, ও মা, মাগো, রাগ অইছস? তুই রাগ অইলে আমি কই যাইমু? যেইডারে প্যাডে রাখলাম, বুকের দুধ খাওয়াইলাম, হেইডা তো গেছে অদস্থালে। হেইডায় না দেখল–র কষ্ট, না বুঝল বউর দুষ্ক। তোরে তো প্যাডে রাহি নাই, বুকের দুধ খাওয়াই নাই। তুই তো আমারে ফালাইয়া যাইতে পারস নাই। তুই কাম কইর্যা খাওয়াইতে আছস। তুই না থাকলে কোন দিন মইর্যা মাডির লগে মিশ্যা যাইতাম। নিজের মা-ও এতহানি করত না। তুই আমার মা-জননী। আমার কতায় রাগ অইস না, মা। প্যাডের জ্বালায় কি কইতে কি কইয়া ফালাইছি।
