দিঘিরপাড়ে চর আর আসুলির জেদাজেদির হা-ডু-ডু খেলার দিন দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ছিল উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা। তার খেলা দেখে সেদিন তারা চমকৃত হয়েছিল। বহুলোক, বিশেষ করে চরের কিশোর-তরুণ-যুবকের দল তার ভক্ত। সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। কুচক্রী জঙ্গুরুল্লার হাত থেকে খুনের চর উদ্ধার করার জন্য সবাই তার ওপর খুশি। তারা তার বাহাদুরির প্রশংসা করে। উত্তরের প্রত্যাশা না করে নানা প্রশ্ন করে।
আক্কেল হালদার বাইরে কোথাও গিয়েছিল। এসে ফজলের পরিচয় পেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, সমাদরের সাথে তার গদিতে নিয়ে যায়। থালা ভরে হরেক রকম মিষ্টি এনে তাকে আপ্যায়ন করে। খেলার তারিখ দিয়ে কেন সে অনুপস্থিত ছিল তার বৃত্তান্ত সে ফজলকে বলে : দক্ষিণপাড় থেকে পাঁচজন নামকরা খেলোয়াড় নিয়ে নৌকা করে ফিরছিল আক্কেল হালদার। পথে তারা গাঙডাকাতের হাতে পড়ে। ডাকাতের ছোরার আঘাতে সে নিজে ও তিনজন খেলোয়াড় আহত হয়।
বিকেল হয়ে গেছে। ফজল চান্দুকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সওদাপাতি কিনে নৌকাঘাটায় আসে।
তাদের ডিঙির কাছে দাঁড়িয়ে বক্করের সাথে কথা বলছে একটা লোক। তার মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। চুল উষ্কখুষ্ক। বিমর্ষ মলিন মুখ। চোখে অসহায় দৃষ্টি। ফজলকে দেখেই লোকটা ডান হাত কপালে ঠেকায়, আস্সালামালেকুম মিয়াভাই, আমারে চিনছেন নি?
কে? তুমি হেকমত না?
হ, মিয়াভাই। কেমুন আছেন?
ভালোই আছি। তুমি কেমন আছ? কইতন আইলা?
আমাগ থাকন আর না থাকন হমান কথা। এহন তো আইলাম হাটেরতন। থাকি অনেক দূরে।
কই যাইবা?
বাড়ি যাইমু। বাড়ির কাছের একটা নাও-ও পাইলাম না। আমারে এট্টু লইয়া যাইবেন আপনাগ নায়?
তোমার বাড়িতে অনেক দক্ষিণে। আমরা তো ঐ দিগ দিয়া যাইমু না।
বেশি দূর যাওন লাগব না। আমারে ধলছত্রের কোণায় নামাইয়া দিলে যাইতে পারমু।
আইচ্ছা ওঠ নায়।
ফজল ও চান্দু নৌকায় ওঠে। তাদের পেছনে ওঠে হেকমত।
এই চান্দু, এই বক্কর, নাও ছাইড়া দে তাড়াতাড়ি। ফজল তাগিদ দেয়। আইজ বাড়িত যাইতে রাইত অইয়া যাইব।
হ, উজান বাইয়া যাইতে দেরি তো অইবই। চান্দু বলে।
উজান স্রোত ভেঙে ছলচ্ছল শব্দ করে ডিঙিটা এগিয়ে চলে।
মিয়াভাই, আইজ হাটে আপনের খুব তারিফ হোনলাম। হেকমত বলে। মাইনষে কইতে আছিল–অ্যাকটা মর্দের মতো মর্দ। বাপের ব্যাডা। জঙ্গুরুল্লা ওনার বাপ-দাদার সম্পত্তি খাবলা দিয়া গিল্যা ফালাইছিল। কিন্তু ওরে ঐ সম্পত্তি আর অজম করতে দেয় নাই। প্যাডের মইদ্যেরতন টাইন্যা বাইর করছে।
কেউ কোনো কথা বলে না অনেকক্ষণ।
নীরবতা ভেঙে এক সময়ে ফজল জিজ্ঞেস করে, তুমি কি করো এখন?
কী আর করমু। হগলেই তো জানে আমি কী করি। আপনেওতো জানেন। জানেন না?
হ, শুনছিলাম। কিন্তু এই কাম ছাইড়া দিতে পারো না? হালাল রুজি কইর্যা খাওনা ক্যান?
হালাল রুজি করনের কি আর উপায় আছে? আমি এক মহাজনের কাছে বান্দা।
মহাজন! কিসের আবার মহাজন?
থইলতদার। কাপড়ে-চোপড়ে ভর্দ লোক, গেরামের সর্মানী লোক। তারেই আমরা কই মহাজন। বড় দাপটের মহাজন?
তার কাছে বান্দা ক্যান্?
সে অনেক বিত্তান্ত। আমাগ মালপত্র সে সামলাইয়া রাখে। বেইচ্যা যা পায় আমাগ কিছু দ্যায় আর বেবাক ওনার প্যাডে যায়। একবার ধরা পইড়া অনেকদিন হাজতে আছিলাম। উনি বলে ছয়শ ট্যাহা খরচ করছিল আমারে ছাড়াইয়া আনতে। আপনের কাছে গোপন করমু না। হেরপর কত কত চুরি করলাম, কত কত মাল-মাত্তা আইন্যা দিলাম। কিন্তু ঐ ট্যাহা বলে শোদই অয় না। দুই-দুই বার পলাইছিলাম। দুইবারই তার পোষা গুণ্ডা দিয়া ধইর্যা নিছে। নিয়া হেইযে কী যন্ত্রণা দিছে কি কইমু আপনেরে। পিঠমোড়া বান দিয়া শরীলে বিছা ছাইড়া দিছে, শুয়াসম্বল ডইল্যা দিছে, পিডের উপরে বিড়ি নিবাইছে। এই দ্যাহেন।
হেকমত গেঞ্জি খুলে পিঠ দেখায় ফজলকে। সারা পিঠে কালো কালো পোড়া দাগ।
এই দিগে বাড়িত গিয়াও শান্তি নাই। চকিদার-দফাদার খবর পাইলেই দৌড়াইয়া আহে। কয়-ফলনা মারানির পুত, অমুক বাড়িত চুরি করছস। চল থানায়। আমি চর অঞ্চলে এহন চুরি করি না। অথচ কোনোহানে চুরি অইলেই মাইনষে কয়–আর কে করব? হেকমইত্যার কাম। হের লেইগ্যা বাড়িতেও যাইতে ইচ্ছা করে না। মহাজনও বাড়িত যাইতে দ্যায় না। যদি ফির্যা না যাই। চুরির খোঁজ-খবর আননের নাম কইর্যা মিছা কতা কইয়া অনেকদিন পরপর বাড়িত যাই। অ্যাকদিনের বেশি থাকি না।
হেকমত কোমরে লুঙ্গির প্যাঁচে গোঁজা একটা পুটলি বের করতে করতে বলে, আমার শরীলের অবস্থাও ভালো না। শুলবেদনায় বড় কষ্ট পাই। বেদনা উঠলেই প্যাডেরে ঘুস দিতে অয়।
হেকমত পাঁচ আঙ্গুলের মাথা দিয়ে পুঁটলি থেকে এক খাবলা সোডা তুলে বলে, এইডা অইল ঘুস। প্যাডেরে ঘুস না দিলে ছাড়াছাড়ি নাই। এক্কেরে কাবিজ কইর্যা ফালায়।
সে সোডা মুখে দিয়ে নদী থেকে আঁজলা ভরে পানি খায়।
ফজল নিবিষ্ট মনে শুনছিল হেকমতের সব কথা। যে হেকমতের কথা মনে এলে ঘৃণায় তার সমস্ত শরীর কুঁচকে উঠত, সেই হেকমতের জন্য তার বুক ব্যথায় ভরে ওঠে, তার হৃদয়ে দরদ ও সহানুভূতি জাগে। সে বেদনা-বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে হেকমতের দিকে। কথা বলতে পারে না।
অনেকক্ষণ পরে সে জিজ্ঞেস করে, তোমার মহাজন কোথায় থাকে? কী নাম তার?
