সংবাদ পেয়েও যায় ফজল। প্রতিপক্ষের প্রস্তুতির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সে আরো খবর পায়, চালের দর বেড়ে যাওয়ায় চরের গরিব চাষীদের মধ্যে হাহাকার পড়ে গেছে। তারা সাহায্যের জন্য যাচ্ছে জঙ্গুরুল্লার কাছে। সাহায্য করার নামে জঙ্গুরুল্লা তাদের দাদন দিচ্ছে। আমন ধান উঠলেই পাঁচ টাকা মন দরে তাকে ধান দিতে হবে দাদনের বিনিময়ে।
.
আজ দিঘিরপাড়ের হাট। প্রয়োজনীয় সওদাপাতির ফর্দ তৈরি করে চান্দু ও বক্করকে ডেকে নিয়ে সে ডিঙিতে উঠে।
চান্দু পাছায় আর বক্কর গলুইয়ে বসে বৈঠা টানছে।
এই চান্দু, আমার হাতে বৈঠা দে। ফজল বলে। অনেকদিন নৌকা বাইনা। মাঝে মইদ্যে না বাইলে নৌকা বাওয়া ভুইল্যা যাইমু।
এইখান দিয়াতো উজান। এট্টু পরেই ভাটির জাগায় গিয়া আপনের আতে–।
আরে না, তুই এখনি দে। ভাটি পানিতে তো বেশি টনতে অয় না। হাইল ধইরা বইস্যা থাকলেই অয়।
চান্দুর হাত থেকে বৈঠা নিয়ে জোরে জোরে টানতে থাকে ফজল।
কিছুদূর গিয়েই সে বাঁ দিকের খাড়িতে ঢুকিয়ে দেয় ডিঙিটা।
ঐ দিগে যান কই? চান্দু বলে। ঐডা দিয়া গেলে তো বহুত ঘোরন লাগব। দাত্রার খড়ি দিয়া যান।
একটু ঘুইর্যাই যাই। নলতার খাড়িতে শুনছি কুমির আছে। খাঁড়ির পশ্চিম দিগের চরে দুইডা কুমির বোলে রউদ পোয়াইতে আছিল।
আমরা তো কোনো দিন হুনি নাই। বক্করের কথার ভেতর ঘোলাটে সন্দেহ।
আরে সব খবর কি সবার কানে আসে। তোরা পশ্চিম দিগের চরটার দিগে চউখ রাখিস।
এহন তো শীতকাল না। আর রউদের তেজও খুব। কুমির কি এহন এই ঠান্ডা রউদে বইয়া রইছে?
তবুও চউখ রাখিস তোরা। দ্যাখ্যা যাইতেও পারে। যদি দ্যাখ্যা যায় রে! দ্যাখা গেলে কি করমু জানস?
কি করবেন? চান্দু জিজ্ঞেস করে।
ফান্দে আটকাইমু। কুমিরের ফান্দা ক্যামনে পাতে, তোরা দ্যাখছস কোনো দিন?
উঁহু দেহি নাই।
যেইখান দিয়া কুমির রউদ পোয়াইতে উপরে ওডে, সেইখানে তিন কাঁটাওলা বড় বড় অনেকগুলা গ্যারাফি বড়শি শন সুতার মোটা দড়িতে বাইন্দা লাইন কইর্যা পাততে অয়। দড়িগুলারে মাটির তল দিয়া দূরে উপরের দিগে নিয়া শক্ত খুঁড়ার লগে বাইন্দা রাখতে অয়। তারপর যখন কুমির রউদ পোয়াইতে চরের উপরে ওড়ে, তখন উলটাদিক তন দাবড় দিলে কুমির হরহর কইর্যা বড়শির উপর দিয়া দৌড় মারে পানির দিগে। ব্যস কুমিরের ঠ্যাঙ্গে, প্যাডে বড়শি গাইথ্যা যায়। আমি কুট্টিকালে দেখছি, বাজান একবার ফান্দা পাতছিল। একটা বড় আর একটা বাচ্চা কুমির বড়শিতে গাঁথছিল। বড়ডার ঠ্যাংঙ্গে আর ছোড্ডার প্যাডে।
চান্দু ও বক্করের চোখ যখন পশ্চিম দিকের বালুচর, লটাবন, আর কাশবনে কুমিরের সন্ধানে ব্যস্ত তখন ফজলের চোখ জরিপ করছে সামনে পুবদিকের একটা বাড়ি। কলাগাছ ঘেরা বাড়িটা এখনো অনেক দূরে।
তার মনে আবার সেই গানের গুঞ্জরন শুরু হয়।
হলুদ শাড়ি-পরা এক তরুণী কলসি কাঁখে নদীর ঘাটে আসছে। দূর থেকে তাকে চেনা
গেলেও ফজল বুঝতে পারে, সে রূপজান ছাড়া আর কেউ নয়।
ফজল জোরে জোরে বৈঠায় টান মারে। কিন্তু ডিঙিটা অনেক দূরে থাকতেই তরুণীটি কলসিতে পানি ভরে বাড়ি চলে যায়। অদৃশ্য হয়ে যায় কলাগাছের আবডালে।
ইস্! আর কিছুক্ষণ আগে যদি সে রওনা দিত! ফজল নিজের ওপর বিরক্ত হয়। আর দশটা মিনিট আগে রওনা দিলেই ঐ বাড়ির ঘাটের কাছে পৌঁছতে পারত সে। দেখা হয়ে যেত রূপজানের সাথে।
কিন্তু দেখা হলেই বা কি করত ফজল? কি বলত রূপজানকে? রূপজানই বা তাকে কি বলত? ফজল বুঝতে পারে–শুধু চোখে চোখে কথা বলা যেত। চাতক-চোখের পিপাসা কি তাতে কমত, না বাড়ত?
ঠিকমত হাল না ধরায় ডিঙিটা হঠাৎ ঘুরে যাচ্ছিল। ফজল সংবিৎ ফিরে পেয়ে বৈঠার টানে ডিঙিটা সোজা করে। হাল ঠিক রেখে বেয়ে যায় সামনের দিকে।
তোরা কুমিরের সন্ধান পাইছসনিরে? ফজলের মনে কৌতুক, কিন্তু গলার স্বরে কপট গাম্ভীর্য।
না, এহন কি আর দ্যাহা যাইব। বক্কর বলে।
একটা হাঁস আইন্যা কিনারে বাইন্দা ধুইলে কেমন অয়? হাঁসের প্যাক-প্যাক শোনলে কুমিরগুলা ভাইস্যা ওঠব খাওনের লেইগ্যা।
ফজল আর বৈঠা টানছে না এখন। শুধু হাল ধরে বসে থাকে। তার আশা প্রবল বাসনা হয়ে রূপজানের প্রতীক্ষা করে। কিন্তু সে আর নদীর ঘাটে আসে না।
ডিঙিটা রূপজানদের ঘাট ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফজল বৈঠা না টানলে কি হবে। আগা গলুইয়ে বসে বক্করতো টেনেই চলেছে তার বৈঠা। তাকে তো আর বৈঠা টানতে মানা করা যায় না।
ফজল কিছুক্ষণ পর পর ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে দিকে তাকায়। তাকাতে গিয়ে তার ঘাড়ে ব্যথা ধরে যায়। কিন্তু রূপজানকে আর ঘাটে আসতে দেখা যায় না।
.
দিঘিরপাড় পৌঁছতেই পরিচিত লোজন, বন্ধু-বান্ধব ফজলকে স্বাগত জানায়। কেউ কেউ তাকে আবেগভরে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ডাকাতি মামলার এজাহার দিয়ে তাকে হাজতে পাঠানো, জোর করে তালাকনামায় তার টিপ নেয়া, খুনের চরের দখল বেদখল-পুনর্দখলের ঘটনাবলি, তার বিরুদ্ধে ঘর-পোড়ানো মামলা সাজানোর কারসাজি সবই তারা শুনেছে। শুনে তাদের মনে সমবেদনা ও সহানুভূতি জেগেছে। কে একজন বলে, পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা বড় বাইড়া গেছিল। মানুষেরে মানুষ বুইল্লা গিয়ান করে নাই। এইবার ফজল মিয়া ওর মিরদিনা ভাইঙ্গা দিছে। ঘোলাপানি খাওয়াইয়া ঠাণ্ডা করছে।
