ফজল খবরের কাগজের মধ্যে ডুবে যায়।
ফজল।
ফজল মুখ তুলে তাকায়। আরে জাহিদ ভাই! তুমি কইতন আইলা?
আইলাম বাড়িত্ন। গেছিলাম ভাটিকান্দি। শোনলাম, তোমরা ঘর-দরজা ভাইঙ্গা এই নতুন চরে আইসা পড়ছ।
বাড়ির সব কেমন আছে? চাচি, শহিদ-ভাই, তওহিদ, সেতারা?
সব্বাই ভালো আছে। আমিই খালি ভালো নাই।
ক্যান্, কি অইছে?
এই নানান ঝামেলা। চাচি কই?
ঐ খানে ভাওর ঘরে। চলো যাই। তোমার তো খাওয়া হয় নাই।
না।
জাহিদকে ভাওর ঘরে নিয়ে যায় ফজল। তাকে দেখে খুশি হয় বরুবিবি। তার খাওয়ার ব্যবস্থা করে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে তাদের বাড়ির সকলের কথা।
এরফান মাতব্বরের বড় ভাই এমরান মাতব্বর। সে-ই ছিল এ এলাকার বড় মাতব্বর। বাংলা ১৩২৬ সনের বন্যার পরের বছর যখন লটাবুনিয়া ভেঙে যায় তখন সে তার সব কিছু নিয়ে চলে যায় তার শ্বশুরবাড়ি–দক্ষিণপাড়ের পাইকপাড়া গ্রামে। তার স্ত্রী শরিফ ঘরের মেয়ে। সে বেঁকে বসেছিল, সে আর কোনো দিন চর অঞ্চলে যাবে না। উপায়ান্তর না দেখে সেখানেই সে জমাজমি কিনে বাড়ি-ঘর করে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়। তারপর লটাবুনিয়া কয়েকবারই জেগেছে, আবার ভেঙেছে। নাম বদলে হয়েছে খুনের চর। কিন্তু এমরান মাতব্বর আর চরে ফিরে আসেনি কোনো দিন। স্ত্রীর জেদের কাছে তাকে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। বছর সাতেক আগে সে কলেরায় মারা যায়। জাহিদ তারই মেজো ছেলে।
জাহিদকে নিয়ে ফজল আবার চলে আসে মিস্ত্রিদের কাজের জায়গায়।
জাহিদ ভাই, তুমি না মিলিটারিতে গেছিলা?
হ, না জাইন্যা ঢুকছিলাম পায়োনিয়ার ফোর্সে। আমাগ নিয়া গেছিল চাটগাঁর অনেক দক্ষিণে জঙ্গল সাফ কইর্যা রাস্তা বানাইতে। এমুন সব কাম করতে হুকুম দেয় যা গুষ্ঠীর কেউ কোনোদিন করে নাই। অইসব জাগায় জাপানিরা বোমা মারতে পারে। আমি আইয়া পড়ছি, আর যাইমু না।
পলাইয়া আইছ?
না পলাইমু ক্যান্। ছুটি লইয়া আইছিলাম। আর যাইমু না।
আমাগ কোলশরিক কিতাবালীর পোলা বোরহান পড়ত ক্লাস এইটে। মিলিটারিতে ‘টপ্যাস’ অইয়া ঢুকছিল। সে মনে করছিল রাইফেল-বন্দুক হাতে লইয়া লড়াই করব। আমরা যেমন লড়াই করি ঢাল-শড়কি লইয়া। ও গিয়া দেখে, টপ্যাসের কাজ ঝাড়ু দেওয়া। সে-ও পলাইয়া আইছে। তারে নাকি পলাতক ঘোষণা করছে। তার নামে ওয়ারেন্ট বাইর অইছে।
জাহিদ গলা খাদে নামিয়ে বলে, শোন ফজল, আমার নামেও ওয়ারেন্ট অইছে। সেই জন্যই আইছি তোমায় বাড়ি। এইখানে তো আমারে কেও চিনে না। আমি এইখানেই থাকমু কিছুদিন।
থাকো, যদ্দিন তোমার মনে লয়। কিন্তু পুলিস আমাগ ধরতে আইব। আইজও আইতে পারে, কাইলও আইতে পারে। আমাগ বিরুদ্ধে ঘর পোড়ানের মামলা আছে।
তয় তো বড় মুসিবত। আমি তাইলে এখনি চইল্যা যাই।
না, যাইবা ক্যান্। পুলিস আইলে আগেই খবর পাইমু। আমি ধরা দিমু না। সইর্যা যাইমু। নাও-বাইছা সব তৈয়ার। তুমিও আমার লগে সইর্যা পড়বা।
জাহিদ আশ্বস্ত হয়। কিছুক্ষণ পরে সে বলে, আইচ্ছা, এই চরের অর্ধেক মালিকানা তো আমার বাজানের আছিল। তার অবর্তমানে এখন আমরা মালিক। দূরে আছিলাম বুইল্লা দাবি করি নাই। এহন দাবি করলে আমাগ অংশের জমি দিবা?
নেও না। আমার ভাগের অর্ধেক জমি দিমু তোমারে। চাচিরে, ভাবিসাবরে লইয়া আহো গিয়া।
মা তো আইব না। তোমার ভাবিসাবরে লইয়া আইমু। একটু থেমে সে আবার বলে, আইজ হাঁটতে হাঁটতে জান সারা। আমি ভাওর ঘরে গিয়া একটু বিশ্রাম নেই।
.
সবগুলো ঘর উঠে গেছে। কাজ আর বেশি বাকি নেই। দিনের শেষে কাজেরও শেষ হবে বলে মনে হয় ফজলের।
আজও পুলিস আসেনি। ফজল মনে মনে ভাবে, খুবই ভালো হলো। কাল এসে পুলিস প্রমাণ পাবে, এ চরের সত্যিকার মালিক কে?
আকু মিস্ত্রি চালার ওপর উঠে চালার জোড়ায় টুয়া লাগাচ্ছে। এক সময়ে সে গানে টান দেয়:
যেই ঘর আমি বানাইলাম
মনের মতন সাজাইলাম
সেই ঘরেতে হবে না মোর ঠাই রে,
হবে না মোর ঠাই।
সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে
থাকতে হবে চিরতরে
সেই ঘরেতে আলো বাতাস নাই রে,
আলো বাতাস নাই।
২৯-৩২. ঘর পোড়ানোর এজাহার
পাঁচদিন পর ফজল খবর পায় প্রতিপক্ষ ঘর পোড়ানোর এজাহার দিতে পারেনি, কারণ তাদের মিথ্যা কারসাজি বড় দারোগার জেরার চোটে ধরা পড়ে গিয়েছিল।
গত কয়েকদিন বড় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটিয়েছে ফজল ও তার দলের লোকজন। মস্ত বড় একটা বিপদ কেটে যাওয়ায় তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, আনন্দে উল্লসিত হয়। কারো মুখে গালাগালির তুবড়ি ছোটে জঙ্গুরুল্লার উদ্দেশে। দিঘিরপাড় ছিল ফজলের চিত্তবিনোদনের একমাত্র স্থান। সেখানে দেখা হতো তার খেলার সাথী আর স্কুলের বন্ধুদের সাথে, পেত নানা ঘটনার, বিভিন্ন জন-স্বজনের খবরাখবর। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে গল্প গুজব করে মনটাকে তাজা করে, হাট-সওদা নিয়ে সে বাড়ি ফিরত। অন্যদিন না হলেও হাটের দিন সেখানে না গিয়ে সে থাকতে পারত না। অথচ গত আট-নয় মাসের মধ্যে সে একদিনও সেখানে যায় নি, যাওয়ার সুযোগ পায়নি।
বিপদ কেটে যাওয়ার পর থেকেই তার মনটা ছটফট করতে থাকে দিঘিরপাড় যাওয়ার জন্য। কিন্তু জঙ্গুরুল্লার দল কখন যে হামলা করে, ঠিক নেই কিছু।
দুদিন পরে দিঘিরপাড়ের হাট। এ দুদিনের ভেতর জঙ্গুরুল্লার সম্ভাব্য হামলার সংবাদ সংগ্রহ করতেই হবে তাকে।
