চেষ্টাতো করতে অইব। ইতিহাসে পড়ছি ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে এই দেশের তিনভাগের এক ভাগ মানুষ মইর্যা গেছিল। সেই সময়েও ব্রিটিশ আছিল। দেশের ফসল মাইর গেছিল। মানুষের টাকা থাকলেও চাউল পাওয়া যায় নাই। সেই সময় তো জাহাজ আছিল না, রেলগাড়ি আছিল না। অন্য দেশের সাথে যোগাযোগ আছিল না। এখন তো একখানের ফসল মাইর গেলে আরেকখানতন আনতে পারা যায়। সরকার কী করতে আছে? এক জেলারতন আরেক জেলায় ধান-চাউল আনতে দেয় না। জাপানিরা বর্মা দখল করছে। ওই খানের পেণ্ড চাউল আর আসব না। আবার মিলিটারির লেইগ্যা ধান-চাউল গুদামে ভরতে আছে। সরকার যদি দেশের মানইনষের দিগে না চায় তয় সেই সরকার থাকন না থাকন সমান। শোনেন, এই বিদেশী সরকার খেদান লাগব। ভারত ছাড়’ আন্দোলন শুরু অইছে। ব্রিটিশ আর বেশিদিন এই দেশে থাকতে পারব না। শোনেন বিদেশী সরকারের উপর ভরসা কইর্যা থাকন যাইব না। এই চরের ধানে কিন্তু বেবাকের সাত-আট মাসের বেশি চলব না। আপনারা চীনা আর কাউনের বীজ যোগাড় করেন। উঁচা জায়গায় ঐ লতা লাগাইয়া দিবেন। যার যার বাড়িত লপ্তে।
গুড়গুড় আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে। সবাই মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। পাঁচটা উড়োজাহাজ আসছে দূর থেকে। তার পেছনে আসছে আরো পাঁচটা।
যুদ্ধ এইবার লাগছে জবর। জাবেদ লশকর বলে। ওগুলা কই যাইতাছে?
ওগুলা যাইব আসামের কোনো ঘাঁটিতে। ফজল বলে। সেইখানতন পেট্টল ভইর্যা যাইব বর্মা মুলুকে, জাপানিগ উপরে বোমা মারতে।
ভয়ঙ্কর বিদঘুঁটে শব্দ করে উড়োজাহাজগুলো মাথার ওপর দিয়ে চলে যায় উত্তর পুবদিকে।
ফজল তার অসমাপ্ত কথার জের টেনে বলে, আপনারা যার যার বাড়ির লপ্তে কদু, কুমড়া, বেগুন, মরিচ, নানান জাতের তরিতরকারির গাছ লাগাইতে শুরু করেন। বাড়ির চুতর্দিগে বেশি কইর্যা, ঘন কইর্যা কলাগাছ লাগান। এতে বাড়ির পর্দাও অইব, কলাও খাওয়ন যাইব। যদি আকাল লাগে, তয় চীনা-কাউনের ভাত, মিষ্টি আলু, কলার বারালি পেটের জামিন দিয়াও বাঁচন যাইব।
ও মিয়া মাতবরের পো। আকু মিস্ত্রি ডাকে ফজলকে। দ্যাহো দেহি ভালো কইর্যা। ব্যাকাত্যাড়া অইয়া গেলনি আবার।
জাবেদ লশকর, কদম শিকারি ও আহাদালীকে নিয়ে ফজল ঘরের কাজ দেখে। খুঁটি খাম্বা ঠিকমত বসানো হয়েছে। মিস্ত্রিদের কাজে কোনো খুঁত পাওয়া যায় না। বসত ভিটায় ও ঘরের ভিটির মাটি ফেলা শেষ হয়েছে। তক্তা দিয়ে পিটিয়ে দুরমুশ করে সমতল ও মজবুত করে মাটি বসাচ্ছে কয়েকজন কোলশরিক।
মিস্ত্রি চাচা, সব ঠিক আছে। এইবার চালগুলা উড়াইয়া খিলাইয়া ফেলেন। বেড়াগুলা লাগাইয়া ফেলেন। চাল উড়াইতে আমাগ ধরন লাগব?
না, বহুত মানুষ আছে। তোমাগ ধরন লাগব না।
পুলকি-মাতব্বরদের নিয়ে ফজল আবার এসে বসে ভাওর ঘরের ছায়ায়।
গতকাল দারোগা-পুলিস আসার কথা ছিল। আসে নাই ক্যান্, কে জানে! আজ কিন্তু আসতে পারে। পাহারাদাররা সতর্ক আছে তো?
হ আছে। আহাদালী বলে।
যারা মাছ নিয়ে তারপাশা গিয়েছিল তারা ফিরে আসে। ফজলের জন্য খবরের কাগজ নিয়ে এসেছে তারা।
আনন্দবাজার পত্রিকাটা হাতে নিতে নিতে ফজল বলে, আজাদ পাইলা না?
না, এইডাই শুধু পাওয়া গেল। কোলশরিক জমিরদ্দি জবাব দেয়।
কত পাওয়া গেছে আইজ?
বড় মাছে আঠারো ট্যাকা। আর গুড়া মাছে আট টাকা।
ভালোইতো পাইছ।
হ, মাছের দাম কিছু বাড়ছে।
কিন্তু চাউলের দামের মতন তো বাড়ে নাই।
তারপাশায় চাউলের দামের খোঁজ নিছিলা?
হ, ট্যাহায় চাইর সের। মাইনষে কওয়া-কওয়ি করছিল–দর আরো বাড়ব। হেষে পাওয়াই যাইব না।
জেল থেকে খালাস পেয়ে আসার পর ফজল খবরের কাগজ পড়ার সুযোগ পায়নি। আর খবরের কাগজ হাতে পেয়েই তার পিপাসার্ত চোখ খবরের শিরোনামগুলোর ওপর ঝুঁকে পড়ে।
কি লেখছে মিয়া? জাবেদ লশকর উন্মুখ হয়ে জিজ্ঞেস করে। জোরে জোরে পড়লে আমরাও কিছু জানতে পারি।
উত্তর আফ্রিকায় মিত্রবাহিনীর সাঁড়াশী আক্রমণ। রোমেলের দুর্ধর্ষ বাহিনীর পশ্চাদপসরণ। ব্রিটিশ বিমান হামলায় আকিয়াবের জাপানি ঘাটি বিধ্বস্ত। স্তালিনগ্রাডে প্রচণ্ড যুদ্ধ।
ফজল জোরে জোরে শিরোনামগুলো পড়তে থাকে।
দুপুরের কিছু পরে রমিজ মিরধা ও মেহের মুনশি হাশাইল থেকে ফিরে আসে। তারা গয়নাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
একটা কামের মতো কাম অইছে। জাবেদ লশকর বলে। এহন ছাড়াইয়া না আনলে গয়নাগুলা আর কোনোদিন ছাড়ান যাইত না।
এই গয়নাগুলা নেওনের সময় কত বউ-ঝিরে কান্দাইছি। রমিজ মিরধা বলে। আইজ তাগ মোখে আবার হাসি ঝলমল করব।
ফর্দের সঙ্গে মিলাইয়া গয়নাগুলা আলাদা আলাদা সাজাইয়া নেন। ফজল বলে। তারপর একজন একজন কইর্যা বোলাইয়া যার যার গয়না ফিরত দিয়া দ্যান। পয়লা আমারে দিয়াই শুরু করেন।
রূপজানের গয়নাগুলো বুঝে নিয়ে ফজল সেগুলোকে রুমালে বাঁধে। রুমালের পুটলিটা বুকের সাথে চেপে ধরে সে ভাওর ঘরে যায়। তার মা সেখানে আলগা চুলোয় রান্না করছে।
মা এই নেও গয়না। আইজই মহাজনের ঘরতন টাকা দিয়া ছাড়াইয়া লইয়া আইছি।
গয়নাতো আনছস। কিন্তু গয়নার মানুষটারে তো আনতে পারলি না। গয়নার পুটলিটা হাতে নিয়ে বলে বরুবিবি।
ফজল মাথা নিচু করে সরে যায় সেখান থেকে।
.
দুপুরের খাওয়া সেরে ফজল মিস্ত্রিদের কাজ দেখতে চলে আসে। পুলকি-মাতব্বররা বাড়ি চলে গেছে যার যার। শেষ বিকেলের আগে তারা আর আসবে না।
