আপনারা খবর নেন। যাদের এই চরে আসার কথা, তারা কি সবাই আইস্যা পড়ছে?
হ, সবাই বউ-পোলাপান লইয়া আইছে। বলে জাবেদ লশকর। গরু-বাছুর, হাঁস মুরগি সব লইয়া আইছে।
ফুঁত-ফুঁত।
চাটগাঁ মেল আসছে। সকলেই সেদিকে তাকায়। স্টিমারটা এ চরের উত্তর দিক দিয়ে চলে যায়। তারপাশা, ভাগ্যকুল টেপাখোলা ধরে যায় গোয়ালন্দ।
জাহাজটা অনেক দেরিতে যাইতে আছে আইজ। কদম শিকারি বলে।
চর মাথাভাঙ্গার উত্তর চর পড়তে আছে। জাবেদ লশকর বলে। তার লেইগ্যা ঘুইর্যা আইতে জাহাজের দেরি অইয়া যায়।
শোনেন, একট প্রাইমারি ইস্কুল খুলতে অইব। ফজল বলে। শুরুতে নিজেগই মাস্টারি করণ লাগব।
তা করণ যাইব। মেহের মুনশি বলে।
বাজারের বেইল অইয়া গেছে। রমিজ মিরধা বলে। ট্যাহা লইয়া আহো। আমি আর মুনশি হাশাইল যাইমু। গয়নাগুলা বেবাক ছাড়াইয়া লইয়া আইমু।
লাগবতো আসল দেড় হাজার আর এক মাসের সুদ পঁচাত্তর টাকা। তাই না? ফজল বলে।
হ। এই কয়দিনের লেইগ্যা পুরা এক মাসের সুদ চাইতে পারে।
ফজল উঠে ভাওর ঘরে যায়। লোহার সিন্দুক এনে সেখানেই রাখা হয়েছে। সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে সে কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসে। মেহের মুনশি টাকা গুণে নিয়ে রমিজ মিরধার সাথে হাশাইল রওনা হয়।
.
রোদের তেজ বাড়তে শুরু করেছে। ফজল সবাইকে নিয়ে তাদের ভাওর ঘরের ছায়ায় গিয়ে বসে।
ঘোঁজার দিক থেকে চারজন লোক আসছে। তাদের সাথে করে নিয়ে আসছে উত্তর দিকের একজন পাহারাদার।
এই লোকগুলা আইছে আপনের লগে দ্যাহা করতে। ফজলকে বলে পাহারাদার বাচ্চু।
হ, মাতবরের পো, আপনের কাছে একটা আরজু লইয়া আইছি। আমরা আছিলাম ধানকুনিয়ার চরে। আমাগ চর ভাইঙ্গা গেছে। আমার নাম তোবারক। অনেকদিন ধইর্যা পাতনা দিয়া আছি ডাইনগায়। আর ওনারা চর ভাঙনের পর আসাম মুলুকে চইল্যা গেছিল। আবার ফিরত আইছে। আমাগ কিছু জমি দ্যান।
জমি দিব কইত্যন? কদম শিকারি বলে। জমিতে বেবাক ভাগ-বণ্টন অইয়া গেছে।
এই মিয়া মাতবরের পো ইচ্ছা করলে দিতে পারে। আমাগ বাঁচনের একটা রাস্তা কইর্যা দিলে আমরা না খাইয়া মইরা যাইমু।
না মিয়ারা, জমি দেওনের কোনো উপায় নাই।
দয়া কইর্যা আমাগ বাচনের একটা পথ কইরা দ্যান। তোবারকের সাথের একজন বলে। আমরা এই তিনজন চর ভাঙ্গনের পর গেছিলাম আসাম মুলুক।
আসামে তো অনেক মানুষ যায়। ফজল বলে। গেলেই কি জমি পাওয়া যায়।?
পাওয়া যাইব কইতন? জমিতো কেও দ্যায় না। বন-জঙ্গল সাফ কইরা জমি বানাইতে অয়। আমরাও জমি আবাদ করছিলাম। কিন্তু কালাজ্বরে থাকতে দিল না। কালাজ্বরে আমার মা, দুইডা লায়েক পোলা মরছে। ওনাগ পোলাপানও মরছে। হেষে মরণের মোখেরতন আমরা পলাইয়া আইছি। হঠাৎ লোকটির গলা ধরে যায়। তার চোখ ছলছল করে।
ফজলের মনে সহানুভূতি জাগে। সে জাবেদ লশকর ও কদম শিকারির দিকে তাকিয়ে বলে, আপনারা কি কন?
কী আর কইমু। জাবেদ লশকর বলে। এতে কষ্ট কইর্যা আমরা চর দখল করলাম। আর ওনারা আসমানতন আইয়া কয়, জমি দ্যান।
না মিয়ারা, জমি দেওন যাইব না। কদম শিকারি দৃঢ় কণ্ঠে বলে।
আমাগ বাঁচনের একটা রাস্তা কইর্যা না দিলে বউ-পোলাপান লইয়া দপাইয়া মইর্যা যাইমু। তোবারক বলে। সাড়ে তিন ট্যাহা মনের চাউল দশ ট্যাহা অইয়া গেছে।
আকু মিস্ত্রি হুঁকো টানতে টানতে এসে দাঁড়িয়ে শুনছিল এদের কথা। সে বলে, হ, কাইল ট্যাহায় চাইর সের ভাও গেছে দিঘিরপাড়। হোন মাতবরের পো, আমাগ কিন্তু এহন আষ্ট আনা রোজ দিয়া পারবা না। আমাগ এহন অ্যাক ট্যাহা কইর্যা দিতে অইব।
ওরে আমার আল্লারে, আষ্ট আনারতন এই লাফে অ্যাক টাকা!
চাউলের দামও তো লাফ দিয়া তিন দুনা অইছে, কি কও, দিবা, না দিবা না? না দিলে থাকুক পইড়া তোমার কাম। আমরা বাড়ি চলোম।
না, না, কাম করতে থাকেন। বিবেচনা কইরা দিমু আপনাগ।
আকু মিস্ত্রি গিয়ে আবার কাজে লেগে যায়।
লোকগুলো আবার অনুনয় করে।
জমি দিতে পারমু না। ফজল বলে। তয় তোমাগ বাচনের একটা পথ কইর্যা দিতে পারি।
হ, একটা পথ কইরা দ্যান। তোবারক বলে। আল্লায় আপনের ভালো করব।
শোন, বাড়ির কাছে এত বড় গাঙ থাকতে তোমরা না খাইয়া মরবা ক্যান? এই গাঙ আমাগ যেমন ভোগায়, তার চেয়ে বেশি খাওন যোগায়। আমাগ কোলশরিকরা বেড় দিয়া মাছ। ধরে। সেই মাছ বেইচ্যা তারা সংসার চালায়। পারবা তোমরা মাছ ধরতে?
পারমু, মাতবরের পো। তোমরা কি কও, পারবা?
হ, পারমু। আসাম-ফেরত তিনজন বলে।
যদি পার, চইল্যা আসো এই চরে। থাকনের লেইগ্যা ঘর উঠানের জায়গা আমি দিমু। তোমরা বাঁশ, বেত, নারকেলের কাতা কিন্যা আনো। চাই বানাও, দোয়াইর বানাও, চালি বুনাও। দাউন বড়শি বাইন্দা লও। অবসর সময়ে জাল বোন ইলশা জাল, মই জাল, টানা জাল, ধর্মজাল, ঝাঁকি জাল। আমাগ কোলশরিকরা পুব-দক্ষিণ আর পশ্চিমের ঢালে বেড় পাতছে। বেড় পাতনের আর জায়গা নাই। উত্তর দিকটা ঢালু না, খাই বেশি। ঐ দিগে তোমরা চাই পাতো, দোয়াইর পাতো, দাউন বড়শি পাতো। থাকলে মানুষ পারে না কোন কাম? না খাইয়া মরে কারা? যারা আত-পাও থাকতে হায়-হুঁতাশ করে। বাঁশ, বেত, সূতা কিনতে টাকা লাগলে কর্জ নিও আমারতন।
ফজলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে তারা চলে যায়।
জাবেদ লশকর বলে, বড় খারাপ দিন আইতে আছে। মানুষ চেষ্টা করলেও কি বাইচ্যা থাকতে পারব?
