আল্লাহু আল্লাহ! কী দ্যাখলাম!ঘাড়টা ব্যথা করছে ফজলের। বালিশের ওপর ঘাড়টা এ-কাত ও-কাত করে সে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে বিছানায়। পিপাসায় তার গলা শুকিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর ফজল বিছানা ছেড়ে ওঠে। অন্ধকারে হাতড়ে সে খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে রাখা টর্চলাইটটা হাতে নেয়। ওটা জ্বালিয়ে ঘরের এক কোণে রাখা মাটির কলসি থেকে ঢেলে পুরো এক গ্লাস পানি খায়।
রাত আর কতক্ষণ আছে, কে জানে? বেড়ায় সাথে ঝোলানো আছে ঘড়িটা। ফজল টর্চের আলো ফেলে ঘড়ি দেখে। বারোটা বেজে ওটা বন্ধ হয়ে আছে। গত পরশুর পর নানা ঝামেলার জন্য ওটায় আর দম দেয়ার কথা মনে হয়নি।
ফজল ঝাঁপ সরিয়ে খালি পায়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। পায়ের নিচে ভিজে মাটি। মাথার ওপর খোলা আকাশ। লক্ষ কোটি তারা মিটিমিটি জ্বলছে। সন্ধ্যায় দেখা শুক্লপক্ষের আধখানা চাঁদ আর আকাশে নেই। সে আদমসুরত খুঁজে বের করে। আদমসুরতের অবস্থান দেখে সে বুঝতে পারে, রাত পোহাতে ঘণ্টা তিনেক বাকি আছে।
কী একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলাম! ফজল মনে মনে বলে। রূপজানের কোনো বিপদ হয় নাই তো! জরিনা কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে নাই তো!
ওরা কেমন আছে, জানতে প্রবল ইচ্ছে জাগে তার মনে। জেলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের কোনো খবরাখবর সে পায়নি। চোখ দুটো তার আপনা থেকেই একবার উত্তর পুবমুখি নলতার দিকে আর একবার দক্ষিণ-পুব বরাবর নয়াকান্দির দিকে দৃষ্টি ফেলে। ঘন কালো অন্ধকার। কয়েকটা বাতি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। জেলেরা মাছ ধরছে নদীতে। বাতি জ্বলছে তাদের নৌকায়।
ফজল দুদিকেই টর্চের আলো ফেলে। সে আলো চরের সীমানা ছাড়িয়ে খুব বেশি দূর এগোয় না। সে জানে টর্চের আলো নলতা বা নয়াকান্দির অর্ধেকের অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে না। তবুও অযথাই সে ঐ দুদিকে টর্চের আলো ফেলে বারবার। ফজলের দিকে টর্চের আলো আসছে পুবদিকে থেকে। চরের পাহারায়রত তারই লোক তার আলোর জবাবে আলো ফেলছে।
ফজল চরের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকেও টর্চের আলো ফেলে। সেদিক থেকেও টর্চ মেরে জবাব দেয় পাহারাদাররা।
ফজল ধানখেতের আল ধরে এগিয়ে যায় পুবদিকে। পায়ের নিচে প্যাঁচপেচে কাদা। কিছুদূর কাদা মাড়িয়ে, তারপর তিরতিরে পানি ভেঙে সে পুব কিনারায় চলে যায়। অনেকক্ষণ নদীতে ভাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু জোয়ারের পানি এখনো পুরোপুরি নেমে যায়নি।
এখানে কারা আছে পাহারায়? ফজল জিজ্ঞেস করে।
আমি লালু আর সাবু। উত্তর দেয় একজন পাহারাদার। অনেক লটাঘাস বিছিয়ে একটা ঢিবির মতো করা হয়েছে। তারই ওপর দাঁড়িয়ে আছে দু’জন পাহারাদার।
তোরা সাবধানে থাকিস। গাঙ্গে কিন্তু কুমির আছে।
আমাগ কাছে কুমির আইব কি মরতে? ট্যাটা দিয়া এক্কেরে গাঁইথ্যা ফালাইমু।
টিপির উপরে তোগ টঙ বানাইয়া দিতে অইবরে। শীতকাল আইসা পড়তেছে। ছই না থাকলে মাথায় ওস পড়ব। আমাগ বেড়য়ালারা কই? ফাঁকগুলা বানা দিয়া বন্ধ করছে?
হ, ভাটার টান লাগনের আগেই জাগাইয়া দিছিলাম। সাবু বলে। তারা ফাঁক বুজাইয়া ঘুমাইয়া রইছে ডিঙির মইদ্যে।
জোয়ারের সময় মাছ যাতে কিনারায় আসতে পারে সেজন্য বেড়ের কিছু বানা তুলে দেয়া হয়। ভাটার টান শুরু হওয়ার আগেই সে ফাঁক গুলো আবার বানা দিয়ে বন্ধ করতে হয়। যাতে পানি কমার সাথে সাথে মাছ বেরিয়ে যেতে না পারে।
মোরগের বাকের আগে পানি নামব না। ফজল বলে। পানি বেবাক সইর্যা যাওনের আগেই ওগ জাগাইয়া দিস আবার।
আইচ্ছা।
আর শোন, মাছ বেচতে যারা তারপাশা যাইব, তাগো মনে করাইয়া দিস, তারা যেন খবরের কাগজ আনতে ভোলে না।
ফজল টর্চের আলো ফেলে কিনারা ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যায়। কোথাও পায়ের পাতা সমান, কোথাও আধহাঁটু পানি। সে পুরোটা চরে ঘোরে। পাহারাদাররা সবাই সজাগ, সতর্ক।
সে তাদের সাবধান করে দেয়, কুমির আছে কিন্তু গাঙ্গে। সাবধান!
ফজল ভাওর ঘরে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর শোনা যায় ভোরের আজান।
.
বসত ভিটা উঁচু করা প্রয়োজন। উঁচু না করলে ভরা বর্ষার সময় জোয়ারের পানি ঢুকবে ঘরের মধ্যে। তাই চল্লিশ জন কোলশরিক অন্ধকার থাকতেই ওড়া-কোদাল নিয়ে কাজে লেগে গেছে। ফজলের বাড়ির জন্য নির্ধারিত চৌহদ্দির দক্ষিণ পাশে পুকুর কেটে তারা বসত ভিটায় মাটি ফেলছে। কিন্তু পুকুরটা বেশি গভীর করা যাচ্ছে না। পানি উঠছে নিচে থেকে।
আকু মিস্ত্রি ভোরেই এসে কাজ করতে শুরু করেছে। তার তদারকিতে কাজ করছে। আরো দু’জন মিস্ত্রি।
দক্ষিণ ভিটিতে উঠবে তিরিশের বন্দের কাছারি ঘর। উত্তর ভিটিতে সাতাশের বন্দের ও পশ্চিম ভিটিতে পঁচিশের বন্দের দুটো থাকবার ঘর উঠবে। ঘরগুলোর ঢেউটিনের চালা, পাতটিনের বেড়া আর খুঁটি-খাম্বা সবই তৈরি। এখন মাপ-জোখ নিয়ে, বন্দ ঠিক করে, খুঁটি খাম্বা পুঁততে হবে। খুঁটির ওপর চালা বসিয়ে বেড়াগুলো গজাল মেরে আটকে দিতে হবে। পুবের ভিটিতে চাড়ার দো-চালা ঘর উঠবে। ওটার একদিকে চেঁকিঘর আর একদিকে রসুইঘর হবে।
ফজল বসে বসে মিস্ত্রিদের কাজ দেখছে আর নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে পুলকি মাতব্বরদের সাথে।
ওরা কি থানায় গেছে? জিজ্ঞেস করে ফজল।
গেছে, এডুক খবর পাইছি। মেহের মুনশি বলে। কারে কারে আসামি দিছে, খবর পাই নাই।
